📘 রউফুর রহীম 📄 সাহাবিদের ওপর জান্নাতের বর্ণনার প্রভাব

📄 সাহাবিদের ওপর জান্নাতের বর্ণনার প্রভাব


নবিজির মাক্কি যুগে অবতীর্ণ কুরআন সবচেয়ে বেশি জোর দিয়েছে শেষ-দিবসে বিশ্বাসের ওপর; খুব কমই মাক্কি সূরা পাওয়া যাবে যেখানে কিয়ামাতের প্রসঙ্গ আলোচনা হয়নি। কারা আল্লাহর অনুগ্রহ পাবেন, আর কারা তাঁর শাস্তি ভোগ করবে—তাঁর আলোচনাও উঠে এসেছে সূরাগুলোতে। কীভাবে মানুষকে একত্র করা হবে এবং একে একে কীভাবে তাঁদের হিসাব নেওয়া হবে—কিয়ামাতের এ আলোচনাগুলো এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে সূরাগুলোতে যে, কেমন যেন মানুষ কিয়ামাতের ভয়াবহতাকে তাঁদের চোখের সামনেই দেখতে পাচ্ছে।

কুরআনের বহু আয়াতেই বিশদভাবে জান্নাতের বর্ণনা দেওয়া হয়েছে; পৃথিবীতে জান্নাতের সাদৃশ্য পাওয়া সম্ভব নয় কোনো দিনই। জান্নাতের এমন সুন্দর সুন্দর আলোচনায় সাহাবিরা প্রবলভাবে প্রভাবিত হন। জান্নাতের নি'আমাত বা অনুগ্রহ এমন এক বস্তু যা কেবল আল্লাহ তাঁর মুত্তাকি বান্দাদের জন্যই প্রস্তুত করেছেন; এটা তাঁদের জন্য আল্লাহর একান্ত দান ও দয়া। আল্লাহ কুরআনে জান্নাতের কিছু কিছু নি'আমাতের কথা আমাদের সামনে তুলে ধরেছেন। তবে অধিকাংশ নি'আমাতের কথাই তিনি আমাদেরকে জানাননি; আর সেগুলোর কথা কারও পক্ষে জানাও সম্ভব নয়।

জান্নাতবাসীদের উত্তম যে যে বস্তু দেওয়া হবে রাসূল বলেন, "জান্নাতিরা যখন জান্নাতে প্রবেশ করবে, তখন আল্লাহ তাঁদেরকে বলবেন, 'তোমরা কি কিছু চাও, তা হলে আমি বাড়িয়ে দেবো?' তখন তাঁরা বলবে, 'আপনি কি আমাদের চেহারা আলোকিত করেননি? আপনি কি আমাদেরকে জান্নাতে প্রবেশ করাননি এবং জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেননি?' রাসূল বলেন, 'এর পর পর্দা সরে যাবে, ফলে তাঁরা সবাই আল্লাহর চেহারা দেখতে পাবে। তাঁদেরকে যা কিছু দেওয়া হবে তাঁর মধ্যে আল্লাহকে দেখার চেয়ে উত্তম আর কিছুই নেই'।”

অন্য একটি বর্ণনায় এসেছে, এর পর রাসূল ﷺ নিচের আয়াতটি তিলাওয়াত করেন— “যারা ভালো কাজ করে তাঁদের জন্য আছে মঙ্গল এবং আরও অধিক। কোনো কালিমা কিংবা হীনতা তাঁদের মুখকে আচ্ছন্ন করবে না। তাঁরাই জান্নাতের অধিবাসী, সেখানে তাঁরা চিরকাল থাকবে।” [সূরা ইউনুস, ১০:২৬]

জান্নাতের মনোহরি ছবি এবং এর ওপর দৃঢ় বিশ্বাস মুসলিম উম্মাহর জাগরণে খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়; যখনই কোনো মুসলিমের মনের আয়নায় জান্নাতের ছবি ভেসে উঠবে, তখনই সে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনে ছুটে আসবে। বড় কোনো কাজে এগিয়ে আসতে তাঁদের মনে কোনো দ্বিধা কাজ করবে না। মৃত্যুর দিকে তাঁরা ঘৃণার চোখে তাকাবে না। এটা তাঁদেরকে আল্লাহর দীনের পতাকা উঁচু করতে উৎসাহ জোগাবে।

📘 রউফুর রহীম 📄 সাহাবিদের মনে জাহান্নামের বর্ণনার প্রভাব

📄 সাহাবিদের মনে জাহান্নামের বর্ণনার প্রভাব


সাহাবিরা আল্লাহকে ভয় করতেন, তাঁর আদেশ-নিষেধ মেনে চলতেন। ভয়ের সঙ্গে সঙ্গে তাঁর কাছে তাঁদের আশাও ব্যক্ত করতেন। নবিজির দীক্ষার বিরাট প্রভাব পড়েছিল তাঁদের মনে। নবি মুহাম্মাদ ﷺ কুরআনের যে পদ্ধতি অনুসরণ করে তাঁদেরকে প্রশিক্ষণ দিয়েছিলেন সেটা ভালো কাজ করেছিল সাহাবিদের মনে। কারণ, কুরআন কিয়ামাতের ভয়াবহতা, তাঁর নিদর্শন পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে তুলে ধরেছে: পৃথিবী সংকুচিত হওয়ার আলোচনা থেকে শুরু করে একে একে পৃথিবীর চূর্ণ-বিচূর্ণ হওয়া, আকাশের ভাঁজ হওয়া, পাহাড়ের পশমের মতো ধুনিত হওয়া, সাগরের উথলে ওঠা, আকাশের ফেটে পড়া, সূর্যের গুটিয়ে যাওয়া, চাঁদে গ্রহণ লাগা, নক্ষত্রের খসে পড়াসহ কিয়ামাতের অনেক কিছুই কুরআন বর্ণনা করেছে সবিস্তারে। কুরআন কাফিরদের করুণ দশারও ছবি এঁকেছে। বর্ণনা দিয়েছে তাঁদের লাঞ্ছনা, অপমান, অপদস্থতা, দুঃখ, আফসোস নিজেদের কাজের ব্যর্থতা ইত্যাদিরও। কাফিরদেরকে জাহান্নামের কাছে একত্র করার কথা, মু'মিনদের পুল-সিরাত পার হওয়ার বর্ণনাও দিয়েছে কুরআন।

কুরআনে বিষয়গুলোর এত সুন্দর উপস্থাপন মু'মিনদের হৃদয়ে ইতিবাচক দারুণ প্রভাব ফেলে। জাহান্নামের শাস্তির বিভিন্ন ধরন এমনভাবে কুরআন চিত্রায়িত করেছে যে, প্রথম প্রজন্মের মুসলিমদের কাছে মনে হতো তাঁরা যেন সেগুলোকে তাঁদের চোখের সামনেই দেখছে।

টিকাঃ
৩২৭. দেখুন: আল-ওয়াসাতিয়্যাতু ফিল-কুরআনিল-কারীম (পৃ. ৪০২)।

📘 রউফুর রহীম 📄 তাকদীরের সঠিক অনুধাবনের প্রভাব

📄 তাকদীরের সঠিক অনুধাবনের প্রভাব


নুবুওয়াতের মাক্কি যুগে কুরআন তাকদীরের বিষয় আলোচনাকে অত্যন্ত গুরুত্বারোপ করেছে। যেমন: আল্লাহ বলেন, "আমি সবকিছুই সৃষ্টি করেছি নির্ধারিত পরিমাপে।” [সূরা কুমার, ৫৪:৪৯]

নবিজিও সাহাবিদের মনে খুব ভালোভাবেই তাকদীরের অনুধাবনকে রোপণ করে দিতেন। তাঁদের কাছে ব্যাখ্যা করে স্পষ্টভাবে বুঝিয়ে দিতেন যে, পৃথিবীতে যা কিছু ঘটছে তাঁর সবকিছুই আল্লাহ নির্ধারণ করে রেখেছেন। সাহাবিদের মনে তাকদীরের যে সঠিক বুঝ ও সুদৃঢ় বিশ্বাসের জন্ম নেয় তাঁর ফলাফল খুবই ইতিবাচক ছিল। এই ইতিবাচক ফলাফলের কিছু দিক হলো:
* আল্লাহর 'ইবাদাত যথাযথভাবে আদায় করা।
* তাকদীরে বিশ্বাস স্থাপন শির্ক থেকে নিষ্কৃতির একমাত্র পথ। কারণ, একজন মু'মিন মনে-প্রাণে বিশ্বাস করেন: ক্ষতি সাধন, উপকার প্রদান, সম্মানিত করা, অপমানিত করা, উত্থান কিংবা পতন ঘটানোর ক্ষমতা ও শক্তি-সামর্থ্য কেবল আল্লাহই রাখেন।
* বীরত্ব ও সাহসিকতা: তাকদীর বিষয়ে সাহাবিদের পূর্ণ আস্থা থাকার কারণে মৃত্যু-ভয় তাঁদের থেকে দূর হয়ে যায়; তাঁরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন যে, কেবল আল্লাহর হাতেই রয়েছে মৃত্যুর বিষয়টি।
* ধৈর্যধারণ, সওয়াব প্রাপ্তির প্রত্যাশা এবং কষ্ট সহ্য করার ক্ষমতা অর্জন।
* অন্তরের প্রশান্তি ও বিবেকের পরিতুষ্টি লাভ।
* আত্মমর্যাদা ও প্রত্যয় অর্জন এবং সৃষ্টির দাসত্ব থেকে মুক্তি।

সাহাবিদেরকে রাসূলুল্লাহর প্রশিক্ষণ ঈমানের বিষষগুলো শিক্ষাদানেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং মানুষ, জীবন ও পৃথিবী সম্পর্কে তাঁদের যে ভুল ধারণা ছিল, তাও তিনি শুধরে দেন। যাতে করে একজন মুসলিম আল্লাহর দেওয়া আলোর পথে চলতে পারে। অনুধাবন করতে পারে পৃথিবীতে তাঁর আগমনের উদ্দেশ্য। আল্লাহ তাঁর কাছে যা চেয়েছেন সেটা যাতে চূড়ান্তভাবে বাস্তবায়ন করতে পারে। অলীক কল্পনা ও কুসংস্কার থেকে যেন বেঁচে থাকতে পারে।

টিকাঃ
৩২৮. দেখুন: ইসলামি দা'ওয়াহ প্রসারে জিহাদের গুরুতব (পৃ. ৫৯)।

📘 রউফুর রহীম 📄 মানুষের প্রকৃতি সম্পর্কে সাহাবিদের অনুধাবন

📄 মানুষের প্রকৃতি সম্পর্কে সাহাবিদের অনুধাবন


মানুষের সামনে আল্লাহ ও আখিরাতের পরিচয় তুলে ধরার পর কুরআন মানুষকে তাঁর নিজের সঙ্গেই পরিচয় করিয়ে দেয়। এবং মানুষের কৌতূহলী মনের অনেক না জানা প্রশ্নেরও উত্তর দেয়। যেমন: আমি কে? কোথা থেকে এসেছি? এবং কোথায় যাব? একজন দুজন না, সব মানুষের মনেই এ প্রশ্নগুলো ঘুরপাক খায় সমানভাবে। সে এগুলোর সঠিক উত্তরও জানতে চায়।

কুরআন সাহাবিদের সামনে মানুষ-সৃষ্টির রহস্য, গতি-প্রকৃতি ইত্যাদি সম্পর্কে সবিস্তার আলোচনা তুলে ধরে। তাঁদের আদি নিবাস সম্পর্কেও কুরআন তাঁদেরকে অবহিত করে যেখানে তাঁরা আবার ফিরে যাবে। জানিয়ে দেয় দুনিয়ার জীবনে তাঁদের কী করণীয় আর কী বর্জনীয়। মৃত্যুর পরের ঠিকানা সম্পর্কেও কুরআন তাঁদেরকে স্পষ্ট ধারণা দেয়।

টিকাঃ
৩২৯. দেখুন: মুহাম্মাদ কুতুব, মানহাজুত-তারবিয়াহ আল-ইসলামিয়্যাহ (২/৫৪)।

ফন্ট সাইজ
15px
17px