📄 পরিবর্তনের রীতি এবং আকীদা-বিশ্বাসের সঙ্গে এর সংশ্লিষ্টতা
ব্যক্তিগত, পারিবারিক কিংবা সামাজিক জীবনের যেকোনো পর্যায়ে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আনতে গুরুত্বপূর্ণ যতগুলো রীতি রয়েছে তাঁর মধ্যে একটি আল্লাহ এভাবে বিধৃত করেছেন, “মানুষের জন্য তাঁর সামনে ও পেছনে রয়েছে একের পর এক প্রহরী; ওরা আল্লাহর আদেশে তাঁর রক্ষণাবেক্ষণ করে। নিশ্চয় আল্লাহ কোনো সম্প্রদায়ের অবস্থা পরিবর্তন করেন না, যতক্ষণ না তাঁরা নিজেরা নিজেদের অবস্থা পরিবর্তন করে। আর কোনো সম্প্রদায়কে যদি আল্লাহ শাস্তি দিতে চান, তবে তা কেউ ফেরাতে পারে না। তিনি ছাড়া তাঁদের কোনো বন্ধুও নেই।” [সূরা আর-রা'দ, ১৩:১১]
মুসলিমদের সফলতার সঙ্গে আল্লাহর দেওয়া এ রীতিটির সম্পর্ক খুবই স্পষ্ট। কারণ, মুসলিমদের প্রতিষ্ঠা পাওয়া, তাঁদের সফলতা বিরাজমান পরিবেশে থেকে অর্জন করা সম্ভব নয়। এর জন্য দরকার পরিবর্তন। এমনিভাবে ওই জাতির জন্যও প্রতিষ্ঠা পাওয়া এবং সফল হওয়া সম্ভব নয়, যারা নিজেদের অপমানিত জীবন, পিছিয়ে পড়ে থাকা নিয়ে বেশ সন্তুষ্ট। এ জীবন থেকে উত্তরণ কিংবা বন্দিদশা থেকে মুক্ত হতে তাঁরা বিন্দুমাত্র চেষ্টা করে না।
এবং সন্দেহ নেই যে, আল্লাহর বেঁধে দেওয়া নীতি মেনে নিয়ে রাসূল পরিবর্তনের যে উদ্যোগ নিয়েছিলেন তিনি তাঁর শুরুটা করেছিলেন মানুষের মন-মানসিকতা পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে; তাঁদেরকে মহান মানুষ করে গড়ে তোলার মধ্য দিয়ে। এরপর তাঁর সাহাবি এ মহান মানুষদের সঙ্গে নিয়ে তিনি এগিয়ে যান সমাজে বড় ধরনের পরিবর্তন সাধনের দিকে। মানুষকে তিনি আঁধার থেকে এনে আলোর দিশা দেখান। মূর্খতার কুয়া থেকে তুলে এনে জ্ঞানের সাগরে অবগাহন করান। সমাসীন করেন পশ্চাৎপদতা থেকে ইতিবাচক উন্নতির আসনে। তাঁদের নিয়ে তিনি এমন এক সভ্যতার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন, যার নজির পৃথিবীতে দ্বিতীয়টি নেই।
সাহাবিদের বিশ্বাস, চিন্তা-ভাবনা, আচার-আচরণ ও আবেগ-অনুভূতির জগতে পরিবর্তন আনার জন্য রাসূল কুরআনের মানহাজ অনুসরণ করেন। ফলে পুরো পৃথিবীতে পরিবর্তনের হাওয়া লাগে। পরিবর্তনের শুরুটা হয় মাদীনাতে। তাঁর পর মাক্কায়। তাঁর পর আরব উপদ্বীপে। এবং সবশেষে পারস্য ও রোম সাম্রাজ্যে গিয়ে আছড়ে পড়ে সে পরিবর্তনের ঢেউ। পরিবর্তনটা বিশ্বজনীনতার রূপ ধরে এগিয়ে যায়। সারাবিশ্ব এখন সকাল-সন্ধ্যায় রবের তাসবীহ ও তাঁর গুণগান করে।
মাক্কা যুগে মানুষের বিশ্বাস বা আকীদা বিশুদ্ধ করার বিষয়ে কুরআন সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়। বিভিন্ন শৈলীতে, নানান পদ্ধতিতে কুরআন সেগুলো উপস্থাপন করত। ফলে সাহাবিদের অন্তর ঈমানের আলোয় আলোকিত হতো। ঈমানের প্রকৃত অর্থ তাঁদের মধ্যে এনেছিল মহা এক পরিবর্তন।
টিকাঃ
৩২২. দেখুন: আত-তামকীনু লিল-উম্মাতিল-ইসলামিয়্যাহ (পৃ. ২১০)।
৩২৩. দেখুন: তাওফীক মুহাম্মাদ সাব' নুফুস ওয়া দুরূস ফী ইতারি আত-তাসউঈরিল-কুরআনি (পৃ. ৩৬৭)।
📄 সাহাবিদের আকীদার সংশোধন
রাসূল নবি হওয়ার পূর্বে, সাহাবিদের কাছে ইসলামের আহ্বান পৌঁছার পূর্বে, আল্লাহর ব্যাপারে তাঁরা বিকৃত ও ভুল আকীদা পোষণ করতেন। যেমন: আল্লাহর নাম ও সিফাতের বিষয়ে সত্য অনুধাবন থেকে তাঁরা ছিলেন অনেক দূরে। আল্লাহ বলেন, “আল্লাহর জন্য সুন্দর সুন্দর নাম রয়েছে। অতএব, তোমরা তাঁকে সেসব নামেই ডাকবে; আর যারা তাঁর নামসমূহ বিকৃত করে তাঁদেরকে বর্জন করবে। অচিরেই তাঁদের কৃতকর্মের ফল তাঁদেরকে দেওয়া হবে।” [সূরা 'আরাফ, ৭: ১৮০]
এর পর কুরআন আগমন করেছে বিশুদ্ধ আকীদার বীজ বপন করতে, এর শিকড় মু'মিনদের অন্তরে গেড়ে দিতে এবং পৃথিবীর সব মানুষের কাছে সেগুলো স্পষ্টভাবে তুলে ধরতে। কুরআন এসে ঘোষণা দিল: আল্লাহই একমাত্র সৃষ্টিকর্তা, পালনকর্তা এবং রিজিকদাতা (তাওহীদ আর-রুবুবিয়্যাহ); 'ইবাদাত পাওয়ার যোগ্য কেবল আল্লাহই (তাওহীদ উলুহিয়্যাহ); এবং সবচেয়ে সুন্দর নাম ও নিখুঁত গুণাবলির অধিকারী কেবল তিনিই (তাওহীদ আল-'আসমা ওয়াস-সিফাত)। ইসলামের প্রথম যুগে নবি মুহাম্মাদ লোকদেরকে ঈমান আনতে বলতেন: আল্লাহর প্রতি, ফেরেশতাদের প্রতি, আসমানি কিতাবসমূহের প্রতি, নবি-রাসূলগণের প্রতি, তাকদীরের ভালোমন্দের প্রতি, আখিরাতের প্রতি এবং রাসূলদের রিসালাত ও তাঁরা যা যা জানিয়ে গেছেন সেগুলোর প্রতি।
প্রথম প্রজন্মের মুসলিমরা আল্লাহর সুন্দর সুন্দর নাম ও নিখুঁত গুণাবলি বিষয়ে পরিপূর্ণ বুঝ নিয়েই গড়ে ওঠেন। এবং এ তাওহীদ আল-'আসমা ওয়াস-সিফাতের দাবি অনুযায়ীই তাঁরা আল্লাহর 'ইবাদাত করেন। অন্তরে আল্লাহর মর্যাদাকেই তাঁরা সর্বোচ্চ স্থান দেন। তাঁদের জীবনের চূড়ান্ত লক্ষ্য ছিল আল্লাহর সন্তুষ্টি পাওয়া; দিন শেষে তাঁরা হিসেব করতেন আল্লাহ তাঁদের কাজে কতটুকু খুশি হলেন, কিংবা কতটুকু বেজার হলেন। রব তাঁদেরকে দেখছেন—এমন অনুভূতি তাঁদের অন্তরে সদা জাগ্রত ছিল।
রাসূল সাহাবিদেরকে তাওহীদের যে দীক্ষা দিয়েছেন, তারই ওপর মূলত দাঁড়িয়ে আছে ইসলামের বুনিয়াদ। পূর্ববর্তী নবি-রাসূলগণ সবাই এ পদ্ধতিতেই তাঁদের দাওয়াাতের কাজ আঞ্জাম দিয়েছিলেন।
সাহাবিদেরকে রাসূলুল্লার প্রশিক্ষণ একটা সুন্দর ও কল্যাণপূর্ণ ফলাফল বয়ে আনে। ফলে, এককথায়, তাওহীদ আল-উলুহিয়্যা, তাওহীদ আর-রুবুবিয়্যা ও তাওহীদ আল-'আসমা ওয়াস-সিফাত না মেনে সমাজে যত কার্যক্রম চলত তাঁর বিপরীতে অবস্থান ছিল সাহাবিদের; তাঁরা আল্লাহ ছাড়া আর কারও কাছে বিচার চাইতেন না। আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও আনুগত্য করতেন না। আল্লাহ অখুশি হবেন এমন কাউকে অনুসরণ করতেন না। আল্লাহকে যেভাবে ভালোবাসতেন এমন করে আর কাউকে তাঁরা ভালোবাসতেন না। ভয় কেবল আল্লাহকেই করতেন। আল্লাহ ছাড়া আর কারও ওপর আস্থা রাখতেন না। আশ্রয় খুঁজতেন শুধু তাঁরই কাছে। মিনতি জানাতেন তাঁরই দরবারে। পাপের জন্য অনুতপ্ত হয়ে তাঁরই নিকট ক্ষমা চাইতেন। অন্য কারও নামে নয়, কেবল আল্লাহর নামেই তাঁরা জবেহ করতেন। মানত করতেন তাঁরই নামে। আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও কাছে সাহায্য চাইতেন না। অন্য কারও জন্যে নয়, তাঁরা রুকু' ও সিজদা করতেন আল্লাহর জন্য। হাজ্জ, তাওয়াফ ও অন্যান্য 'ইবাদাত করতেন তাঁকেই খুশি করার জন্য। সৃষ্টিজগতের কোনো কিছুর সঙ্গেই তাঁরা রবের মিল-অমিল খুঁজতে যেতেন না; বরং তাঁরা আল্লাহর পবিত্রতার ঘোষণা দিতেন দিবারাত সর্বদা।
মাক্কি কুরআন সাহাবিদের মনে তাওহীদের বিভিন্ন প্রকার এবং রাসূল ও রিসালাত বিষয়ক বিশুদ্ধ আকীদা যেভাবে গেঁথে দিয়েছে, ঠিক সেভাবেই কুরআন ঈমানের অন্য সব 'আরকান বা ভিত্তি সম্পর্কে তাঁদের বিশ্বাসকে বিশুদ্ধ করে দিয়েছে।
টিকাঃ
৩২৪. দেখুন: আ'লি আল-'উলয়ানি, ইসলামি দা'ওয়াহ প্রসারে জিহাদের গুরুতব (পৃ. ৪৭)।
৩২৫. প্রাগুক্ত (পৃ. ৫৩)।
৩২৬. দেখুন: ইসলামি 'দাওয়াহ প্রসারে জিহাদের গুরুতব (পৃ. ৫৪, ৫৫)।
📄 সাহাবিদের ওপর জান্নাতের বর্ণনার প্রভাব
নবিজির মাক্কি যুগে অবতীর্ণ কুরআন সবচেয়ে বেশি জোর দিয়েছে শেষ-দিবসে বিশ্বাসের ওপর; খুব কমই মাক্কি সূরা পাওয়া যাবে যেখানে কিয়ামাতের প্রসঙ্গ আলোচনা হয়নি। কারা আল্লাহর অনুগ্রহ পাবেন, আর কারা তাঁর শাস্তি ভোগ করবে—তাঁর আলোচনাও উঠে এসেছে সূরাগুলোতে। কীভাবে মানুষকে একত্র করা হবে এবং একে একে কীভাবে তাঁদের হিসাব নেওয়া হবে—কিয়ামাতের এ আলোচনাগুলো এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে সূরাগুলোতে যে, কেমন যেন মানুষ কিয়ামাতের ভয়াবহতাকে তাঁদের চোখের সামনেই দেখতে পাচ্ছে।
কুরআনের বহু আয়াতেই বিশদভাবে জান্নাতের বর্ণনা দেওয়া হয়েছে; পৃথিবীতে জান্নাতের সাদৃশ্য পাওয়া সম্ভব নয় কোনো দিনই। জান্নাতের এমন সুন্দর সুন্দর আলোচনায় সাহাবিরা প্রবলভাবে প্রভাবিত হন। জান্নাতের নি'আমাত বা অনুগ্রহ এমন এক বস্তু যা কেবল আল্লাহ তাঁর মুত্তাকি বান্দাদের জন্যই প্রস্তুত করেছেন; এটা তাঁদের জন্য আল্লাহর একান্ত দান ও দয়া। আল্লাহ কুরআনে জান্নাতের কিছু কিছু নি'আমাতের কথা আমাদের সামনে তুলে ধরেছেন। তবে অধিকাংশ নি'আমাতের কথাই তিনি আমাদেরকে জানাননি; আর সেগুলোর কথা কারও পক্ষে জানাও সম্ভব নয়।
জান্নাতবাসীদের উত্তম যে যে বস্তু দেওয়া হবে রাসূল বলেন, "জান্নাতিরা যখন জান্নাতে প্রবেশ করবে, তখন আল্লাহ তাঁদেরকে বলবেন, 'তোমরা কি কিছু চাও, তা হলে আমি বাড়িয়ে দেবো?' তখন তাঁরা বলবে, 'আপনি কি আমাদের চেহারা আলোকিত করেননি? আপনি কি আমাদেরকে জান্নাতে প্রবেশ করাননি এবং জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেননি?' রাসূল বলেন, 'এর পর পর্দা সরে যাবে, ফলে তাঁরা সবাই আল্লাহর চেহারা দেখতে পাবে। তাঁদেরকে যা কিছু দেওয়া হবে তাঁর মধ্যে আল্লাহকে দেখার চেয়ে উত্তম আর কিছুই নেই'।”
অন্য একটি বর্ণনায় এসেছে, এর পর রাসূল ﷺ নিচের আয়াতটি তিলাওয়াত করেন— “যারা ভালো কাজ করে তাঁদের জন্য আছে মঙ্গল এবং আরও অধিক। কোনো কালিমা কিংবা হীনতা তাঁদের মুখকে আচ্ছন্ন করবে না। তাঁরাই জান্নাতের অধিবাসী, সেখানে তাঁরা চিরকাল থাকবে।” [সূরা ইউনুস, ১০:২৬]
জান্নাতের মনোহরি ছবি এবং এর ওপর দৃঢ় বিশ্বাস মুসলিম উম্মাহর জাগরণে খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়; যখনই কোনো মুসলিমের মনের আয়নায় জান্নাতের ছবি ভেসে উঠবে, তখনই সে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনে ছুটে আসবে। বড় কোনো কাজে এগিয়ে আসতে তাঁদের মনে কোনো দ্বিধা কাজ করবে না। মৃত্যুর দিকে তাঁরা ঘৃণার চোখে তাকাবে না। এটা তাঁদেরকে আল্লাহর দীনের পতাকা উঁচু করতে উৎসাহ জোগাবে।
📄 সাহাবিদের মনে জাহান্নামের বর্ণনার প্রভাব
সাহাবিরা আল্লাহকে ভয় করতেন, তাঁর আদেশ-নিষেধ মেনে চলতেন। ভয়ের সঙ্গে সঙ্গে তাঁর কাছে তাঁদের আশাও ব্যক্ত করতেন। নবিজির দীক্ষার বিরাট প্রভাব পড়েছিল তাঁদের মনে। নবি মুহাম্মাদ ﷺ কুরআনের যে পদ্ধতি অনুসরণ করে তাঁদেরকে প্রশিক্ষণ দিয়েছিলেন সেটা ভালো কাজ করেছিল সাহাবিদের মনে। কারণ, কুরআন কিয়ামাতের ভয়াবহতা, তাঁর নিদর্শন পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে তুলে ধরেছে: পৃথিবী সংকুচিত হওয়ার আলোচনা থেকে শুরু করে একে একে পৃথিবীর চূর্ণ-বিচূর্ণ হওয়া, আকাশের ভাঁজ হওয়া, পাহাড়ের পশমের মতো ধুনিত হওয়া, সাগরের উথলে ওঠা, আকাশের ফেটে পড়া, সূর্যের গুটিয়ে যাওয়া, চাঁদে গ্রহণ লাগা, নক্ষত্রের খসে পড়াসহ কিয়ামাতের অনেক কিছুই কুরআন বর্ণনা করেছে সবিস্তারে। কুরআন কাফিরদের করুণ দশারও ছবি এঁকেছে। বর্ণনা দিয়েছে তাঁদের লাঞ্ছনা, অপমান, অপদস্থতা, দুঃখ, আফসোস নিজেদের কাজের ব্যর্থতা ইত্যাদিরও। কাফিরদেরকে জাহান্নামের কাছে একত্র করার কথা, মু'মিনদের পুল-সিরাত পার হওয়ার বর্ণনাও দিয়েছে কুরআন।
কুরআনে বিষয়গুলোর এত সুন্দর উপস্থাপন মু'মিনদের হৃদয়ে ইতিবাচক দারুণ প্রভাব ফেলে। জাহান্নামের শাস্তির বিভিন্ন ধরন এমনভাবে কুরআন চিত্রায়িত করেছে যে, প্রথম প্রজন্মের মুসলিমদের কাছে মনে হতো তাঁরা যেন সেগুলোকে তাঁদের চোখের সামনেই দেখছে।
টিকাঃ
৩২৭. দেখুন: আল-ওয়াসাতিয়্যাতু ফিল-কুরআনিল-কারীম (পৃ. ৪০২)।