📄 পারস্পরিক আচরণের ক্ষেত্রে রাসূলুল্লাহর প্রগাঢ় অনুধাবন
যে পথে একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা পায়, যে পথে একটি জাতি তাঁদের শিক্ষাদীক্ষা সম্পন্ন করে এবং যে পথে তাঁরা উন্নতি লাভ করে সে পথগুলো অবশ্যই প্রাকৃতিক কিছু নিয়মনীতির ভিত্তিতেই পরিচালিত হয়। রাসূলুল্লাহর জীবনীগ্রন্থ গভীরভাবে অধ্যয়ন করে আমাদেরকে এই ভেবে অবাক হতে হয় যে, তিনি রীতিনীতিগুলোকে কত চমৎকারভাবেই না অনুধাবন করেছিলেন! এবং কী প্রখর বুদ্ধিমত্তার সঙ্গেই না তিনি সেগুলোকে ইসলামের কল্যাণে কাজে লাগিয়েছেন!
সৃষ্টির শুরু থেকে চলে আসা মানুষসহ সকল সৃষ্টির প্রকৃতিতে দেওয়া বিধানগুলোই সেই প্রাকৃতিক নিয়ম। সেগুলো স্থান-কাল-পাত্রের ভিন্নতা সত্ত্বেও অভিন্ন প্রকৃতির। প্রকৃতিতে দেওয়া আল্লাহ প্রদত্ত বিধানগুলো নিঃসন্দেহে অনেক। তবে আমরা আমাদের এ বইয়ে মুসলিম জাতির উন্নতির সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত বিধানগুলোই তুলে ধরব।
কুরআনের গবেষক ও চিন্তাশীল ব্যক্তিমাত্রই খুঁজে পাবেন যে, প্রকৃতিতে দেওয়া আল্লাহর এ রীতিনীতিগুলোতে কোনো পরিবর্তন-পরিবর্ধন নেই। কুরআন এ রীতিনীতিগুলোর দিকে মুসলিমদের দৃষ্টি গভীরভাবে আকর্ষণ করে। ফলে তাঁরা এগুলো থেকে শিখবে এবং সে অনুযায়ী চলতে পারবে। যুগ যুগ ধরে এগুলো অনুযায়ীই ব্যক্তি, সমাজ, রাষ্ট্র ও জগতের সবকিছু পরিচালিত হয়ে আসছে। সেই পৃথিবীর শুরু থেকে প্রকৃতি যেভাবে আল্লাহর বিধান মেনে চলে আসছে, আজও কোনোরূপ পরিবর্তন ছাড়াই সেভাবেই চলছে। পৃথিবীতে কোনো কিছুই আপন খেয়ালবশে, অনর্থকভাবে চলে না। বরং সবকিছুই রীতিসিদ্ধ বিধান মেনেই চলে। মুসলিমরা যখন এ বিধানগুলো নিয়ে গভীর অধ্যয়ন করবে এবং এগুলো পেছনে নিহিত প্রজ্ঞা অনুধাবন করবে, তখন তারা পৃথিবীতে প্রতিনিয়ত ঘটা কারণগুলোর পেছনের রহস্যও বুঝতে পারবে। বুঝতে পারবে তাঁদেরকে এ বিধানগুলোর আলোকেই চলতে হবে। আর ঠিক তখনই, সফলতা ও প্রতিষ্ঠা পাওয়ার প্রশ্নে, তারা কর্মহীন ভরসার ওপর ভিত্তি করে বসে থাকবে না; সঙ্গে সঙ্গে বস্তুগত এমন পদক্ষেপও গ্রহণ করবেন যা তাঁদেরকে সফলতা অর্জনে সহায়তা করবে।
প্রাকৃতিক শাশ্বত যে রীতিনীতিগুলো মানুষের জীবনকে এক সুতোয় গেঁথে রেখেছে তাঁর উপযোগিতা কখনো কালের আবর্তনে হারিয়ে যাওয়ার নয়, বরং তাঁর উপযোগিতা সর্বজনীন, সর্বকালীন।
আল্লাহর রীতিনীতি এবং ব্যক্তি, সমাজ ও বিভিন্ন জাতির ক্ষেত্রে প্রাকৃতিক যে নিয়ম রয়েছে সুষ্ঠুরূপে সেগুলো বাস্তবায়নের প্রথম শর্তই হলো, আমাদেরকে তা বুঝতে হবে। বরং বলা ভালো, এর খুঁটিনাটি প্রতিটি দিক, এর ব্যাপ্তি আমাদেরকে অনুধাবন ও হৃদয়ংগম করতে হবে।
অধ্যাপক হাসান আল-বান্না রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “তোমরা প্রকৃতির মধ্যে নিহিত আল্লাহর রীতিনীতির সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ো না। কারণ, এগুলো অর্জিত হয়েছে বড় বড় বিজয় লাভের মাধ্যম। বরং এগুলো রপ্ত করো, সঠিকভাবে ব্যবহার করো। এদের গতিপথের প্রবহমানতা পালটে দাও। এসবের কিছু রীতিকে অন্য কিছু রীতির প্রভাব প্রতিকারে কাজে লাগাও। এবং এর পরই, কেবল এর পরই, সাহায্য ও চূড়ান্ত বিজয় আসার জন্য অপেক্ষা করো। তখন বিজয় তোমাদের থেকে থাকবে মাত্র কয়েক পা দূরে।”
এখান থেকে গুরুত্বপূর্ণ অনেকগুলো দিক আমরা শিখতে পারি। যেমন: প্রাকৃতিক রীর্তির সাথে সংঘাতে না জড়ানো; বিজয়ের জন্য প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা; রীতিনীতির সঠিক ব্যবহার; প্রবহমানতা পালটাতে অব্যাহত সাধনা; কিছু রীতিনীতির প্রভাব প্রতিকারে অন্য কিছু রীতিনীতিকে সুষ্ঠুরূপে কাজে লাগানো; বিজয়-মুহূর্তের জন্য অধীর আগ্রহে থাকা।
অধ্যাপক আল-বান্নার উপরের কথা থেকে স্পষ্টত প্রতীয়মান যে, রাসূলুল্লাহর সীরাত, ইসলামের ইতিহাস ও বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী সম্পর্কে তাঁর অত্যন্ত ব্যাপক পড়াশোনা ছিল। যে সমাজে তিনি বসবাস করতেন সে সমাজের বাস্তবতা সম্পর্কেও তাঁর ছিল সঠিক অনুধাবন। কোন অসুখের কোন ঔষধ — সে বিষয়েও সম্যক অবহিত ছিলেন তিনি।
দা'ওয়াতের কার্যক্রম সুবিন্যস্ত করা, রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা এবং আল্লাহর অনুগত, সুসভ্য ও আদর্শবান মানুষ তৈরির জন্য রাসূল ইসলামের প্রথম দিকে যে চেষ্টা করেছিলেন, তা কিন্তু এসব রীতিনীতিকে মান্য করেই; সংক্ষিপ্তাকারে সেগুলোর কিছু কিছু দিক আমরা পূর্বে উল্লেখ করেছি। যেমন: সভ্যতা বিনির্মাণে সুষ্ঠু নেতৃত্বের গুরুত্ব, মিথ্যা প্রতিরোধে সুসংগঠিত একদল মু'মিনের প্রয়োজনীয়তা। একইসাথে এমন একটি মানহাজ ও পদ্ধতি প্রণয়নের গুরুত্ব, যাকে ভিত্তি করে প্রণীত হবে বিশুদ্ধ বিশ্বাস, অনুপম চরিত্র, আল্লাহর নিকট গ্রহণযোগ্য 'ইবাদাত, উন্নত মূল্যবোধ এবং নির্দোষ ভাবাবেগের নীতি। পৃথিবীতে আল্লাহর রীতিনীতির একটা ধারা রয়েছে। ধারাটি হলো, ধীরে এগোও বা ক্রমান্বয়ে অগ্রগতি। এ ধারা তাঁর সৃষ্টি জগতের সব জায়গাই বিরাজমান। এটি গুরুত্বপূর্ণ এমন একটি নিয়ম, মুসলিম উম্মাহর উচিত তা মেনে চলা। যখন তাঁরা জাতি গঠন এবং তাঁদেরকে সুস্থির করার জন্য প্রাণপণে চেষ্টা করবেন, তখন এ নিয়ম মানার বিকল্প নেই।
ক্রমান্বয়ে অগ্রগতির পথ সংক্ষিপ্ত কোনো পথের নাম নয়; এর যাত্রা পথ দীর্ঘ। বিশেষ করে, আমাদের এ যুগে এসে এ পথে চলাটা তো প্রায় অসম্ভব একটা ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে; যখন সর্বত্র মূর্খতা আসন গেঁড়ে বসে আছে। সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে অনিয়ম ও দুর্নীতি ছেয়ে গেছে। সুতরাং মাটির অনেক গভীরে গেঁড়ে বসা অনিয়মের এ শিকড় মূলোৎপাষ্টনের জন্য প্রয়োজন 'ক্রমান্বয়ে অগ্রগতি'র নীতি মেনে ধীরে-সুস্থে, পরিকল্পনা করে করে সামনে এগোনো।
ইসলামের প্রথম যুগে 'ধীরে এগোও' নীতির ভূরি ভূরি উদাহরণ পাওয়া যাবে রাসূলুল্লাহর দা'ওয়াতের মধ্যে। তিনি তাঁর দা'ওয়াতের কার্যক্রম চালাচ্ছিলেন ধীরে ধীরে, ক্রমান্বয়ে। যেমন: নবিজির দা'ওয়াতের প্রথম ধাপে মুসলিমরা ছিলেন বাছাইকৃত ও প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত। দ্বিতীয় ধাপে মুসলিমরা ইসলামের শত্রুদের মুখোমুখি হন এবং তাঁদের প্রতিরোধে এগিয়ে আসেন। তৃতীয় ও শেষ ধাপটি ছিল মুসলিমদের বিজয় অর্জন এবং পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠা লাভের। এ তিনটি ধাপ একই সময়ে একই সঙ্গে শুরু করা সম্ভব ছিল না। সম্ভব ছিল না প্রথম ধাপকে শেষে, আর শেষের ধাপকে প্রথমে আনাও; এতে বরং জটিলতা বা অসংগতিই সৃষ্টি হতো কেবল।
বর্তমানে দা'ওয়াতের ক্ষেত্রে নীতিটিকে আরও গুরুত্বসহ নিতে হবে। কারণ, “ইসলামি দা'ওয়াতের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত এমন অনেকেই বিশ্বাস করেন যে, সফলতা লাভ ও পৃথিবীতে আল্লাহর দীন রাতারাতি প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব। আবার কেউ কেউ সমাজটাকে আগাগোড়া পরিবর্তন করে চোখের পলকে মুসলিম উম্মাহর উপযোগী করে গড়ে তুলতে চান। কিন্তু তাঁরা ভেবে দেখেন না যে, এ কাজ করতে গিয়ে তাঁদেরকে কী কী বাধার মুখে পড়তে হবে। এ কাজে নামলে তাঁর ফলাফল কী দাঁড়াবে সেটাও তাঁরা ধর্তব্যে আনেন না। বাস্তবতাকেও তাঁরা গোনায় ধরেন না। এখন তাঁদের এমন কাজের জন্য পরিবেশ অনুকূলে কি না— সেটাও ভাবেন না। এমনকি, বাস্তবতা ও স্থায়িত্বের প্রশ্নে, পরিবর্তন আনার জন্য প্রয়োজনীয় পূর্ব প্রস্তুতিটাও তাঁরা সেরে নেন না।”
“কুরআন-সুন্নাহ গভীর অধ্যয়নে আমরা দেখি যে, ইসলাম কীভাবে ধীরে ধীরে ও ক্রমান্বয়ে, রাসূলুল্লাহর হাত ধরে, প্রথমে আরব ভূখণ্ডে পরে সমগ্র বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে।”
“আজ আমরা যদি প্রকৃত ইসলামি সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে চাই, তা হলে কোনো নেতা, রাজা, শাসক কিংবা পার্লামেন্টের কোনো সদস্য একটা প্রজ্ঞাপন জারি করলেই সে চাওয়াটা আমাদের নিকট আপনাআপনি ধরা দেবে—এমন ভাবাটা আমাদের উচিত হবে না। ওই উদ্দেশ্যটি অর্জিত হবে কেবল ক্রমান্বয়ের পথ ধরে; প্রস্তুতি ও ব্যক্তিগত চিন্তাধারা পরিবর্তনের মাধ্যমে। ব্যক্তির হাত ধরে পর্যায়ক্রমে সমাজের ইতিবাচক পরিবর্তনের মধ্য দিয়েই।
“এটা এমন এক মানহাজ, জাহিলি জীবনধারাকে পরিবর্তন করে ইসলামি জীবনধারায় রূপান্তর করতে, রাসূল এ মানহাজটিরই অনুসরণ করেন। নুবৃওয়াতি জীবনের তেরোটি বছর তিনি মাক্কায় পার করেন। এখানে তিনি মু'মিনদেরকে প্রশিক্ষিত করার দিকে পুরোপুরি মনোনিবেশ করেন। যাতে তাঁরা দা'ওয়াতের পথের কষ্টস্বীকার, জিহাদের দায়িত্বপালন এবং ইসলামকে পৃথিবীর দিদিগন্তে ছড়িয়ে দেওয়ার মতো যোগ্য হয়ে ওঠেন। এজন্যই রাসূলুল্লাহর নুবুওয়াতি জীবনের মাক্কা যুগটা বিধিবিধানের যুগ ছিল না, বরং সময়টা ছিল ব্যক্তিচরিত্রের উন্নতি ও প্রশিক্ষণের সময়।”
টিকাঃ
৩১২. দেখুন: ফী যিলালিল-কুরআন (১/৪৭৮)।
৩১৩. দেখুন: ফী যিলালিল-কুরআন (১/৪৭৮)।
৩১৪. দেখুন: কারাদাউই, জীলুন-নাসরিল-মানশূদ (পৃ. ১৫)।
৩১৫. দেখুন: ইমাম আল-বান্নার চিন্তার পঠন: উম্মাহর জাগরণে ইসলামি আইনানুগ বিধি (পৃ. ৫৮)।
৩১৬. দেখুন: রিসালাতুল-মু'তামির আল-খামিস (পৃ. ১২৭)।
৩১৭. উম্মাহর জাগরণে ইসলামি আইনানুগ বিধি (পৃ. ৫৮)।
৩১৮. দেখুন: আত-তামকীন লিল-উম্মাহ আল-ইসলামিয়্যাহ (পৃ. ২২৭)।
৩১৯. দেখুন: 'আফাত 'আলা আত-তরীক (১/৫৭)।
৩২০. দেখুন: আত-তামকীন লিল-উম্মাহ আল-ইসলামিয়্যাহ [সায়্যিদ আবুল-'আলা আল-মাউদূদি-এর উদ্ধৃতি] (পৃ. ২২৯)।
৩২১. দেখুন: আল-খসাইসুল-'আম্মাহ লিল-ইসলাম (পৃ. ১৬৮)।
📄 পরিবর্তনের রীতি এবং আকীদা-বিশ্বাসের সঙ্গে এর সংশ্লিষ্টতা
ব্যক্তিগত, পারিবারিক কিংবা সামাজিক জীবনের যেকোনো পর্যায়ে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আনতে গুরুত্বপূর্ণ যতগুলো রীতি রয়েছে তাঁর মধ্যে একটি আল্লাহ এভাবে বিধৃত করেছেন, “মানুষের জন্য তাঁর সামনে ও পেছনে রয়েছে একের পর এক প্রহরী; ওরা আল্লাহর আদেশে তাঁর রক্ষণাবেক্ষণ করে। নিশ্চয় আল্লাহ কোনো সম্প্রদায়ের অবস্থা পরিবর্তন করেন না, যতক্ষণ না তাঁরা নিজেরা নিজেদের অবস্থা পরিবর্তন করে। আর কোনো সম্প্রদায়কে যদি আল্লাহ শাস্তি দিতে চান, তবে তা কেউ ফেরাতে পারে না। তিনি ছাড়া তাঁদের কোনো বন্ধুও নেই।” [সূরা আর-রা'দ, ১৩:১১]
মুসলিমদের সফলতার সঙ্গে আল্লাহর দেওয়া এ রীতিটির সম্পর্ক খুবই স্পষ্ট। কারণ, মুসলিমদের প্রতিষ্ঠা পাওয়া, তাঁদের সফলতা বিরাজমান পরিবেশে থেকে অর্জন করা সম্ভব নয়। এর জন্য দরকার পরিবর্তন। এমনিভাবে ওই জাতির জন্যও প্রতিষ্ঠা পাওয়া এবং সফল হওয়া সম্ভব নয়, যারা নিজেদের অপমানিত জীবন, পিছিয়ে পড়ে থাকা নিয়ে বেশ সন্তুষ্ট। এ জীবন থেকে উত্তরণ কিংবা বন্দিদশা থেকে মুক্ত হতে তাঁরা বিন্দুমাত্র চেষ্টা করে না।
এবং সন্দেহ নেই যে, আল্লাহর বেঁধে দেওয়া নীতি মেনে নিয়ে রাসূল পরিবর্তনের যে উদ্যোগ নিয়েছিলেন তিনি তাঁর শুরুটা করেছিলেন মানুষের মন-মানসিকতা পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে; তাঁদেরকে মহান মানুষ করে গড়ে তোলার মধ্য দিয়ে। এরপর তাঁর সাহাবি এ মহান মানুষদের সঙ্গে নিয়ে তিনি এগিয়ে যান সমাজে বড় ধরনের পরিবর্তন সাধনের দিকে। মানুষকে তিনি আঁধার থেকে এনে আলোর দিশা দেখান। মূর্খতার কুয়া থেকে তুলে এনে জ্ঞানের সাগরে অবগাহন করান। সমাসীন করেন পশ্চাৎপদতা থেকে ইতিবাচক উন্নতির আসনে। তাঁদের নিয়ে তিনি এমন এক সভ্যতার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন, যার নজির পৃথিবীতে দ্বিতীয়টি নেই।
সাহাবিদের বিশ্বাস, চিন্তা-ভাবনা, আচার-আচরণ ও আবেগ-অনুভূতির জগতে পরিবর্তন আনার জন্য রাসূল কুরআনের মানহাজ অনুসরণ করেন। ফলে পুরো পৃথিবীতে পরিবর্তনের হাওয়া লাগে। পরিবর্তনের শুরুটা হয় মাদীনাতে। তাঁর পর মাক্কায়। তাঁর পর আরব উপদ্বীপে। এবং সবশেষে পারস্য ও রোম সাম্রাজ্যে গিয়ে আছড়ে পড়ে সে পরিবর্তনের ঢেউ। পরিবর্তনটা বিশ্বজনীনতার রূপ ধরে এগিয়ে যায়। সারাবিশ্ব এখন সকাল-সন্ধ্যায় রবের তাসবীহ ও তাঁর গুণগান করে।
মাক্কা যুগে মানুষের বিশ্বাস বা আকীদা বিশুদ্ধ করার বিষয়ে কুরআন সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়। বিভিন্ন শৈলীতে, নানান পদ্ধতিতে কুরআন সেগুলো উপস্থাপন করত। ফলে সাহাবিদের অন্তর ঈমানের আলোয় আলোকিত হতো। ঈমানের প্রকৃত অর্থ তাঁদের মধ্যে এনেছিল মহা এক পরিবর্তন।
টিকাঃ
৩২২. দেখুন: আত-তামকীনু লিল-উম্মাতিল-ইসলামিয়্যাহ (পৃ. ২১০)।
৩২৩. দেখুন: তাওফীক মুহাম্মাদ সাব' নুফুস ওয়া দুরূস ফী ইতারি আত-তাসউঈরিল-কুরআনি (পৃ. ৩৬৭)।
📄 সাহাবিদের আকীদার সংশোধন
রাসূল নবি হওয়ার পূর্বে, সাহাবিদের কাছে ইসলামের আহ্বান পৌঁছার পূর্বে, আল্লাহর ব্যাপারে তাঁরা বিকৃত ও ভুল আকীদা পোষণ করতেন। যেমন: আল্লাহর নাম ও সিফাতের বিষয়ে সত্য অনুধাবন থেকে তাঁরা ছিলেন অনেক দূরে। আল্লাহ বলেন, “আল্লাহর জন্য সুন্দর সুন্দর নাম রয়েছে। অতএব, তোমরা তাঁকে সেসব নামেই ডাকবে; আর যারা তাঁর নামসমূহ বিকৃত করে তাঁদেরকে বর্জন করবে। অচিরেই তাঁদের কৃতকর্মের ফল তাঁদেরকে দেওয়া হবে।” [সূরা 'আরাফ, ৭: ১৮০]
এর পর কুরআন আগমন করেছে বিশুদ্ধ আকীদার বীজ বপন করতে, এর শিকড় মু'মিনদের অন্তরে গেড়ে দিতে এবং পৃথিবীর সব মানুষের কাছে সেগুলো স্পষ্টভাবে তুলে ধরতে। কুরআন এসে ঘোষণা দিল: আল্লাহই একমাত্র সৃষ্টিকর্তা, পালনকর্তা এবং রিজিকদাতা (তাওহীদ আর-রুবুবিয়্যাহ); 'ইবাদাত পাওয়ার যোগ্য কেবল আল্লাহই (তাওহীদ উলুহিয়্যাহ); এবং সবচেয়ে সুন্দর নাম ও নিখুঁত গুণাবলির অধিকারী কেবল তিনিই (তাওহীদ আল-'আসমা ওয়াস-সিফাত)। ইসলামের প্রথম যুগে নবি মুহাম্মাদ লোকদেরকে ঈমান আনতে বলতেন: আল্লাহর প্রতি, ফেরেশতাদের প্রতি, আসমানি কিতাবসমূহের প্রতি, নবি-রাসূলগণের প্রতি, তাকদীরের ভালোমন্দের প্রতি, আখিরাতের প্রতি এবং রাসূলদের রিসালাত ও তাঁরা যা যা জানিয়ে গেছেন সেগুলোর প্রতি।
প্রথম প্রজন্মের মুসলিমরা আল্লাহর সুন্দর সুন্দর নাম ও নিখুঁত গুণাবলি বিষয়ে পরিপূর্ণ বুঝ নিয়েই গড়ে ওঠেন। এবং এ তাওহীদ আল-'আসমা ওয়াস-সিফাতের দাবি অনুযায়ীই তাঁরা আল্লাহর 'ইবাদাত করেন। অন্তরে আল্লাহর মর্যাদাকেই তাঁরা সর্বোচ্চ স্থান দেন। তাঁদের জীবনের চূড়ান্ত লক্ষ্য ছিল আল্লাহর সন্তুষ্টি পাওয়া; দিন শেষে তাঁরা হিসেব করতেন আল্লাহ তাঁদের কাজে কতটুকু খুশি হলেন, কিংবা কতটুকু বেজার হলেন। রব তাঁদেরকে দেখছেন—এমন অনুভূতি তাঁদের অন্তরে সদা জাগ্রত ছিল।
রাসূল সাহাবিদেরকে তাওহীদের যে দীক্ষা দিয়েছেন, তারই ওপর মূলত দাঁড়িয়ে আছে ইসলামের বুনিয়াদ। পূর্ববর্তী নবি-রাসূলগণ সবাই এ পদ্ধতিতেই তাঁদের দাওয়াাতের কাজ আঞ্জাম দিয়েছিলেন।
সাহাবিদেরকে রাসূলুল্লার প্রশিক্ষণ একটা সুন্দর ও কল্যাণপূর্ণ ফলাফল বয়ে আনে। ফলে, এককথায়, তাওহীদ আল-উলুহিয়্যা, তাওহীদ আর-রুবুবিয়্যা ও তাওহীদ আল-'আসমা ওয়াস-সিফাত না মেনে সমাজে যত কার্যক্রম চলত তাঁর বিপরীতে অবস্থান ছিল সাহাবিদের; তাঁরা আল্লাহ ছাড়া আর কারও কাছে বিচার চাইতেন না। আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও আনুগত্য করতেন না। আল্লাহ অখুশি হবেন এমন কাউকে অনুসরণ করতেন না। আল্লাহকে যেভাবে ভালোবাসতেন এমন করে আর কাউকে তাঁরা ভালোবাসতেন না। ভয় কেবল আল্লাহকেই করতেন। আল্লাহ ছাড়া আর কারও ওপর আস্থা রাখতেন না। আশ্রয় খুঁজতেন শুধু তাঁরই কাছে। মিনতি জানাতেন তাঁরই দরবারে। পাপের জন্য অনুতপ্ত হয়ে তাঁরই নিকট ক্ষমা চাইতেন। অন্য কারও নামে নয়, কেবল আল্লাহর নামেই তাঁরা জবেহ করতেন। মানত করতেন তাঁরই নামে। আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও কাছে সাহায্য চাইতেন না। অন্য কারও জন্যে নয়, তাঁরা রুকু' ও সিজদা করতেন আল্লাহর জন্য। হাজ্জ, তাওয়াফ ও অন্যান্য 'ইবাদাত করতেন তাঁকেই খুশি করার জন্য। সৃষ্টিজগতের কোনো কিছুর সঙ্গেই তাঁরা রবের মিল-অমিল খুঁজতে যেতেন না; বরং তাঁরা আল্লাহর পবিত্রতার ঘোষণা দিতেন দিবারাত সর্বদা।
মাক্কি কুরআন সাহাবিদের মনে তাওহীদের বিভিন্ন প্রকার এবং রাসূল ও রিসালাত বিষয়ক বিশুদ্ধ আকীদা যেভাবে গেঁথে দিয়েছে, ঠিক সেভাবেই কুরআন ঈমানের অন্য সব 'আরকান বা ভিত্তি সম্পর্কে তাঁদের বিশ্বাসকে বিশুদ্ধ করে দিয়েছে।
টিকাঃ
৩২৪. দেখুন: আ'লি আল-'উলয়ানি, ইসলামি দা'ওয়াহ প্রসারে জিহাদের গুরুতব (পৃ. ৪৭)।
৩২৫. প্রাগুক্ত (পৃ. ৫৩)।
৩২৬. দেখুন: ইসলামি 'দাওয়াহ প্রসারে জিহাদের গুরুতব (পৃ. ৫৪, ৫৫)।
📄 সাহাবিদের ওপর জান্নাতের বর্ণনার প্রভাব
নবিজির মাক্কি যুগে অবতীর্ণ কুরআন সবচেয়ে বেশি জোর দিয়েছে শেষ-দিবসে বিশ্বাসের ওপর; খুব কমই মাক্কি সূরা পাওয়া যাবে যেখানে কিয়ামাতের প্রসঙ্গ আলোচনা হয়নি। কারা আল্লাহর অনুগ্রহ পাবেন, আর কারা তাঁর শাস্তি ভোগ করবে—তাঁর আলোচনাও উঠে এসেছে সূরাগুলোতে। কীভাবে মানুষকে একত্র করা হবে এবং একে একে কীভাবে তাঁদের হিসাব নেওয়া হবে—কিয়ামাতের এ আলোচনাগুলো এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে সূরাগুলোতে যে, কেমন যেন মানুষ কিয়ামাতের ভয়াবহতাকে তাঁদের চোখের সামনেই দেখতে পাচ্ছে।
কুরআনের বহু আয়াতেই বিশদভাবে জান্নাতের বর্ণনা দেওয়া হয়েছে; পৃথিবীতে জান্নাতের সাদৃশ্য পাওয়া সম্ভব নয় কোনো দিনই। জান্নাতের এমন সুন্দর সুন্দর আলোচনায় সাহাবিরা প্রবলভাবে প্রভাবিত হন। জান্নাতের নি'আমাত বা অনুগ্রহ এমন এক বস্তু যা কেবল আল্লাহ তাঁর মুত্তাকি বান্দাদের জন্যই প্রস্তুত করেছেন; এটা তাঁদের জন্য আল্লাহর একান্ত দান ও দয়া। আল্লাহ কুরআনে জান্নাতের কিছু কিছু নি'আমাতের কথা আমাদের সামনে তুলে ধরেছেন। তবে অধিকাংশ নি'আমাতের কথাই তিনি আমাদেরকে জানাননি; আর সেগুলোর কথা কারও পক্ষে জানাও সম্ভব নয়।
জান্নাতবাসীদের উত্তম যে যে বস্তু দেওয়া হবে রাসূল বলেন, "জান্নাতিরা যখন জান্নাতে প্রবেশ করবে, তখন আল্লাহ তাঁদেরকে বলবেন, 'তোমরা কি কিছু চাও, তা হলে আমি বাড়িয়ে দেবো?' তখন তাঁরা বলবে, 'আপনি কি আমাদের চেহারা আলোকিত করেননি? আপনি কি আমাদেরকে জান্নাতে প্রবেশ করাননি এবং জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেননি?' রাসূল বলেন, 'এর পর পর্দা সরে যাবে, ফলে তাঁরা সবাই আল্লাহর চেহারা দেখতে পাবে। তাঁদেরকে যা কিছু দেওয়া হবে তাঁর মধ্যে আল্লাহকে দেখার চেয়ে উত্তম আর কিছুই নেই'।”
অন্য একটি বর্ণনায় এসেছে, এর পর রাসূল ﷺ নিচের আয়াতটি তিলাওয়াত করেন— “যারা ভালো কাজ করে তাঁদের জন্য আছে মঙ্গল এবং আরও অধিক। কোনো কালিমা কিংবা হীনতা তাঁদের মুখকে আচ্ছন্ন করবে না। তাঁরাই জান্নাতের অধিবাসী, সেখানে তাঁরা চিরকাল থাকবে।” [সূরা ইউনুস, ১০:২৬]
জান্নাতের মনোহরি ছবি এবং এর ওপর দৃঢ় বিশ্বাস মুসলিম উম্মাহর জাগরণে খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়; যখনই কোনো মুসলিমের মনের আয়নায় জান্নাতের ছবি ভেসে উঠবে, তখনই সে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনে ছুটে আসবে। বড় কোনো কাজে এগিয়ে আসতে তাঁদের মনে কোনো দ্বিধা কাজ করবে না। মৃত্যুর দিকে তাঁরা ঘৃণার চোখে তাকাবে না। এটা তাঁদেরকে আল্লাহর দীনের পতাকা উঁচু করতে উৎসাহ জোগাবে।