📄 দারুল-'আরকামকে বেছে নেওয়ার কারণ
অনেকগুলো গুরুত্বপূর্ণ কারণ রয়েছে দারুল-'আরকামকে দীনের প্রথম বিদ্যালয় হিসেবে বেছে নেওয়ার পেছনে। এর কয়েকটি নিম্নরূপ:
* 'আরকাম প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়ে ইসলাম গ্রহণ করেননি। তাই সংগত কারণেই কেউ কল্পনাও করতে পারেনি যে, সাহাবিরা নবিজির সঙ্গে 'আরকামের বাড়িতে গোপনে দেখা-সাক্ষাৎ করেন।
* 'আরকাম ইবনু আবুল-'আরকাম ছিলেন মাখযূম গোত্রের লোক। আর মাখযূম গোত্রের শত্রুতা ছিল হাশিম গোত্রের সঙ্গে। তাঁর ঘরে মুসলিমদের জমায়েত হওয়ার মানেই হচ্ছে: মুসলিমরা জেনেশুনেই শত্রু ঘাঁটির কলিজায় বসে রাসূলুল্লাহর সঙ্গে তাঁদের নিয়মিত দেখা-সাক্ষাৎ করে যাচ্ছে।
* ইসলাম গ্রহণকালে 'আরকামের বয়স খুব বেশি ছিল না; ষোলো ছুঁই ছুঁই করছিল। তখন যদি কুরাইশদের মনে ইসলামি দাওয়াতের কেন্দ্র খোঁজার চিন্তা মাথায় আসতও, তবুও এত অল্প বয়সি এক সাহাবির ঘরে খোঁজার কথা তাঁদের মাথায় আসত না ঘুণাক্ষরেও। এ কারণেই বলা যায়, নিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকে 'আরকামের বাড়িকে বেছে নেওয়াটা ছিল চূড়ান্ত প্রজ্ঞার পরিচায়ক।
টিকাঃ
৩০৫. দেখুন: আল-গদবান, আল-মিনহাজুল-হারাকি (১/৪৯)।
📄 প্রথম প্রজন্মের মুসলিমদের কিছু বৈশিষ্ট্য
মাক্কা যুগে মু'মিনরা গড়ে ওঠেন ধীরেসুস্থে, ধাপে ধাপে এবং গোপনীয়তা মেনে চলে। সূরা কাহফ্ফের ২৮ নং আয়াতটি সাহাবিদের অনেকগুলো গুণ প্রতিভাত করে:
১. ধৈর্যধারণ: সাহাবিরা নিশ্চিত ক্ষতির হাত থেকে বেঁচে যাওয়ার জন্য ধৈর্যের পরিচয় দিয়েছেন। ইসলামে ধৈর্যের এতটাই গুরুত্ব যে, নিশ্চিত ক্ষতির হাত থেকে বেঁচে যাওয়া মুসলিমদের চারটি গুণের একটির নাম ধৈর্য।
২. আল্লাহর কাছে বারবার মিনতি করা: সাহাবিরা সকাল-সন্ধ্যায় তাঁদের রবকে ডাকতেন। রবের কাছে জানাতেন নিজেদের মনের আকুতি-মিনতি। কারণ, দীনের কাজে আল্লাহর সাহায্য পাওয়ার সবচেয়ে বড় ও শক্তিশালী মাধ্যমটির নাম দু'আ।
৩. নিষ্ঠা: সাহাবিদের সবকিছুই ছিল একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের আশায়। রবকে ডাকার পেছনে কোনো পার্থিব প্রাপ্তি বা সামাজিক মান-মর্যাদার আশা কাজ করেনি তাঁদের মধ্যে।
৪. সত্যের ওপর অবিচলতা: পার্থিব জীবনের শোভা কামনা না করে তাঁরা সত্যের ওপর অবিচল ছিলেন। ঈমান, পৌরুষত্ব ও সততা—এই তিনটি গুণ তাঁদেরকে চারিত্রিক অবক্ষয়ের হাত থেকে রক্ষা করত।
টিকাঃ
৩০৬. দেখুন: হুসাইন ইবনু মুহসিন, আত-তরীকু 'ইলা জামাআ'তিল-মুসলিমীন (পৃ. ১৭০)।
৩০৭. দেখুন: আয-যিলাল, (৬/৩৯৬৮)।
৩০৮. দেখুন: ফিকহুত-তামকীন মিনাল-কুরআনিল-কারীম (পৃ. ২২১)।
৩০৯. দেখুন: ড. আলি জারীশাহ, দা'ওয়াতুল্লাহ বাইনাত-তাকউঈন ওয়াত-তামকীন (পৃ. ৯১, ৯২)।
📄 ইসলামের দা‘ওয়াতের প্রচার ও এর বিশ্বজনীনতা
বিশেষ কোনো গোত্রের প্রতি আলাদা নজর না দিয়ে, রাসূলুল্লাহর গোপনে দা'ওয়াত দেওয়ার সময়ে, ইসলামের প্রচার ছিল কুরাইশের সব গোত্রের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রেখে। সবার সঙ্গে উদার ভারসাম্যপূর্ণ এমন সুন্দর আচরণ করার কারণেই কুরাইশের সব শাখাগোত্রের মধ্যে ইসলামের প্রচার করাটা ছিল অনেক সহজ। ইসলাম গ্রহণে অগ্রগামী এ দলের লোকেরা কুরাইশের বিভিন্ন শাখাগোত্র এবং বাইরের অন্যান্য গোত্র থেকেও এসেছিলেন।
রাসূল ﷺ ভালোভাবেই জানতেন, দা'ওয়াতের নির্দেশ তাঁর কাছে এজন্য আসেনি যে, তা আজীবনই গোপন থাকবে। বরং তা এসেছে বিশ্বাবাসীর সবার কাছে। বিশ্বমানবতাকে ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে আশ্রয় দেওয়ার জন্যই তাঁর আগমন। মাক্কা যুগেই কুরআন দাওয়াতের ব্যাপ্তি ও এর বিশ্বজনীনতার বর্ণনা দিয়েছে।
রাসূলুল্লাহর দা'ওয়াত-জীবনের প্রথম দিকে গোপনে দাওয়াত দেওয়াটা ছিল ব্যতিক্রম ঘটনা। অবস্থার নিরীখে তখন গোপনে দাওয়াত দেওয়া ছাড়া উপায় ছিল না। তবে দা’ওয়াতের প্রকৃতিই হলো, আল্লাহর দীন ও তাঁর শারী’আহ্র ঘোষণা দেওয়া এবং সব মানুষকে সে পথে আহ্বান করা। রাসূলুল্লাহ তাঁর নুবুওয়াতের ঘোষণা থেকে শুরু করে মানুষকে প্রকাশ্যে দা’ওয়াত দেওয়ার পরও অনেকগুলো বিষয় গোপন করে রাখতেন, যা ছিল নিছক সাময়িক এবং বৃহত্তর কল্যাণের জন্য।
টিকাঃ
৩১০. দেখুন: 'উমারি, আস-সীরাহ আন-নাবাওয়িয়া আস-সহীহা (১/১৩০)।
৩১১. দেখুন: আল-গুরাবা আল-আওয়ালুন (পৃ. ১২৪-১২৬)।