📄 অবিরাম দা‘ওয়াত
নবি মুহাম্মাদ গোপনে গোপনে তাঁর দা'ওয়াতের কাজ চালিয়ে যান। এ সময়ে তিনি বন্ধুবান্ধব ও আত্মীয়স্বজনদের অনেককেই ইসলামের পথে আহ্বান করেন। দা'ওয়াতের এই সঙ্কটমুহূর্তে রাসূল ও তাঁর সাহাবিরা নানা বাধাবিপত্তির সম্মুখীন হন। ক্ষতির আশঙ্কা না থাকার ব্যাপারটি নিশ্চিত হয়েই তাঁরা কাউকে ইসলামের দিকে আহ্বান করতেন। অর্থাৎ দা'ওয়াতের কাজ চলছিল অত্যন্ত ধীরে, খুবই সতর্ক পদক্ষেপে। এমনকি সালাত পড়তে চাইলে মুসলিমরা বিভিন্ন গুহা কিংবা উপত্যকায় চলে যেতেন।
ইসলামের প্রাথমিক এ যুগের গুরুত্বপূর্ণ দিকটি হলো: মুসলিমদের ছোট দলটির নিরাপত্তার প্রশ্নে গোপনীয়তা রক্ষা করে চলা। এমনকি নিকটজনদের কাছেও বিষয়টি গোপন রাখা হতো। রাসূল তাঁর সাহাবিদেরকে ছোট ছোট কয়েকটি দলে সাজান; দুইজন গরিব মুসলিম লোক একজন ধনী ব্যক্তির দায়িত্বে থাকতেন। তিনি নতুন এ দুইজন মুসলিমকে নিজের কাছে রাখতেন। রাসূলুল্লাহ ﷺ তাঁর অনুসারীদের দীক্ষা দিতেন কুরআনের নির্দেশিত পথে।
মাক্কায় নিরাপত্তার বীজ রোপিত হয়, যা ধীরে ধীরে বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়ে দা'ওয়াতের বিস্তৃতির সঙ্গে সঙ্গে। মুসলিমদের প্রতিরক্ষা বিষয়ে গুরুত্বারোপ তাদেরকে বাঁচিয়ে দেবে কারও প্রত্যাশিত শত্রুতা কিংবা আকস্মিক আক্রমণ থেকে। রাসূল তাঁর সাহাবিদেরকে ছোট ছোট দলে ভাগ করে দিতেন; যাতে তাঁরা গোপনে দীনি শিক্ষার উদ্দেশ্যে পরস্পরে দেখা-সাক্ষাৎ করতে পারেন। যেমন: 'উমার ইবনুল-খাত্তাবের বোন ফাতিমা বিন্ত আল-খাত্তাব ও তাঁর স্বামী সা'ঈদ ইবনু যাইদ। খাব্বাব ইবনুল-আরাত ছিলেন তাঁদের শিক্ষক।
রাসূল বুঝতে পেরেছিলেন, জমায়েত হওয়ার বিষয়টি হতে হবে চূড়ান্ত গোপনীয়তা রক্ষা করেই; নেতার সঙ্গে অনুসারীদের সাক্ষাৎটা যাতে হয় সবার অগোচরে। যদি নিতান্তই দা'ওয়াতের বাণী মানুষের কাছে পৌঁছানোই উদ্দেশ্য হতো, তা হলে এর জন্য কা'বার চেয়ে উত্তম জায়গা আর হয় না। কিন্তু তিনি পূর্ণাঙ্গ গোপনীয়তা বেছে নিলেন। এবং বেছে নিলেন নিরাপদ এমন এক স্থানের, যেখানে তিনি তাঁর সাহাবিদেরকে ইসলাম শেখাতে পারবেন।
সীরাতের বইয়ে উল্লেখ আছে, মুসলিম ও কাফিরদের মধ্যে প্রথম মুখোমুখি অবস্থানে সা'দ ইবনু আবু ওয়াক্কাসের অংশগ্রহণের পর 'আরকামের বাড়িকে মুসলিমদের গোপনে জমায়েত হওয়ার জায়গা হিসেবে বাছাই করা হয়। 'আরকামের বাড়িটি হয়ে ওঠে দা'ওয়াতের নতুন প্রাণকেন্দ্র। মুসলিমরা এখানে জমায়েত হন। এখানেই তাঁরা নবিজির কাছ থেকে ওয়াহির নতুন বাণীগুলো গ্রহণ করেন। সরাসরি নিজের তত্ত্বাবধানে রেখে তিনি তাঁদেরকে হাতেকলমে দীক্ষা দেন; ঠিক যেভাবে আল্লাহর তত্ত্বাবধানে থেকে তিনি দীক্ষা পান।
টিকাঃ
২৯১. দেখুন: সালমান আল-'আওদাহ, আল-গুরাবা আল-আওয়ালুন।
২৯২. দেখুন: ইসলামে সমর অনুসন্ধান (পৃ. ১১১, ১১২)।
২৯৩. দেখুন: ড. 'আবদুল-গাফ্ফার মুহাম্মাদ 'আযীয, আদ-দা'ওয়াতুল-ইসলামিয়্যাহ (পৃ. ৯৬)।
২৯৪. দেখুন: রাসূলুল্লাহর রাষ্ট্র: শিকড় থেকে শিখরে (পৃ. ২১৮)।
২৯৫. দেখুন: ইবনু হিশাম (১/২৩৬)।
২৯৬. দেখুন: আত-তারবিয়াতুল-কিয়াদিয়্যাহ (১/১৯৮)।
📄 প্রথম প্রজন্মের মুসলিমদের কিছু প্রশংসনীয় বৈশিষ্ট্য
রাসূলুল্লাহর কাছে দীক্ষা পাওয়া প্রথম প্রজন্মের মুসলিমদের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ এমন কিছু বৈশিষ্ট্য ছিল যা অন্য কারও মধ্যে দেখা যায় না। তাঁরা ব্যক্তিগত পর্যায় থেকে শুরু করে সর্বক্ষেত্রেই চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যে অনন্য ছিলেন।
প্রথম বৈশিষ্ট্য হলো অনুপুঙ্খ ওয়াহির নির্দেশ মেনে চলা। আকীদাবিশ্বাস, বিধিবিধান ও আদবকেতাসহ সব বিষয়ের সঠিক জ্ঞান ও সঠিক অনুধাবন কেবল ওয়াহির আলোকেই সম্ভব। আল্লাহ যাদেরকে সঠিক ঈমান দিয়েছেন, সেই সাহাবিদের জীবন পরিচালনার একমাত্র মানহাজ ছিল শার'ঈ দলিল-প্রমাণ গ্রহণ। কুরআন-সুন্নাহর দলিল-প্রমাণ থেকে সকল প্রজন্মের চেয়ে সাহাবিরাই বেশি উপকৃত হতে পেরেছিলেন। এর প্রধানতম কারণ ছিল সাহাবিদের অন্তরের পরিশুদ্ধতা।
দ্বিতীয়ত, সাহাবিরা সরাসরি জড়িত ছিলেন এমন অনেক ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে কুরআন-সুন্নাহর মূলপাঠের অবতরণ ঘটে। নবিজির কাছে যখন ওয়াহি নাযিল হতো, তখন প্রথম প্রজন্মের মুসলিমরা তা প্রত্যক্ষ করতেন। কোন আয়াত কোন পটভূমিতে নাযিল হয়েছে, রাসূল কোন ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে কোন কথাটি বলেছেন—এসবের জ্ঞান সাহাবিরাই সবচেয়ে ভালো জানতেন।
ওয়াহি ও ঈমানের প্রভাবে তাঁদের মধ্যে আধ্যাত্মিকতার জাগরণ ঘটেছিল। কুরআন-সুন্নাহর বিশুদ্ধ জ্ঞানই ছিল তাঁদের জীবন চলার একমাত্র পাথেয়। এ জ্ঞানের ভিত্তিতেই তাঁরা আল্লাহকে ভালোবাসেন এবং তাঁর সাক্ষাতের আশা করেন। সাহাবিরা দিনের বেলায় যুদ্ধ করতেন, রাতের বেলায় সেজদায় অবনত থাকতেন। তাঁদের জ্ঞান ও আল্লাহভীতি পার্থিব কাজে তাঁদের সামনে বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি; তাঁরা ধর্মকর্ম যেমন করেছেন তেমনিভাবে হাটবাজারে গিয়েছেন, বেচাকেনা করেছেন এবং পরিবার-পরিজনের দেখাশোনা করেছেন।
টিকাঃ
২৯৭. দেখুন: সালমান আল-'আওদাহ, সিফাতুল-গুরাবা (পৃ. ৮৩)।
২৯৮. প্রাগুক্ত (পৃ. ৯৪)।
২৯৯. প্রাগুক্ত (পৃ. ৯৭)।
📄 নবিজির ব্যক্তিত্বের প্রভাব
মানব ইতিহাসের শিক্ষা-দীক্ষার সবচেয়ে মহান বিদ্যাপীঠটির নাম ‘দারুল-আরকাম ইবনুল-আরকাম’। আর এটি মহান হবেই না বা কেন, যখন এর শিক্ষক রাসূল ﷺ নিজেই। দারুল-'আরকামে রাসূল ﷺ প্রথম প্রজন্মের মুসলিমদেরকে আল্লাহর অনুগ্রহে এমনভাবে গড়ে তোলেন যে, তাঁরা মানব ইতিহাসে দা’ওয়াতের মহান কাজগুলো সহজেই সম্পাদন করতে সক্ষম হন।
রাসূল ﷺ গোপনে দা’ওয়াত দেওয়ার ওই সময়ে দারুল-'আরকামে অনন্যসাধারণ এমন একদল লোককে প্রশিক্ষিত করতে সক্ষম হন যাঁরা, তাঁর মৃত্যুর পরও, তাওহীদ, দা’ওয়াত ও জিহাদের পতাকা বহন করেন। নুবুওয়াতি জীবনের প্রথম তিন বছরের মধ্যে দা’ওয়াতের প্রধান ব্যক্তিদের বাছাইয়ে রাসূল ﷺ অত্যন্ত বিচক্ষণতার পরিচয় দেন। তিনি তাঁদেরকে নেতার আনুগত্যের অর্থ, নেতৃত্বের সুলুকসন্ধান এবং এর রীতিনীতি হাতেকলমে শেখান।
দারুল-'আরকামে দীক্ষা দানে সবচেয়ে বড় নিয়ামক হিসেবে কাজ করেছে নবিজির ব্যক্তিত্ব। যেকোনো লোক এসেই তাঁর এমন ব্যক্তিত্ব দেখে বিমোহিত হয়ে যেত। নবিজির ব্যক্তিত্ব ইসলামের জন্য চালিকাশক্তি ও উদ্দীপকের কাজ করত। তাঁর ব্যক্তিত্বে মানুষকে সহজে আপন করে নেওয়ার মতো অসাধারণ একটি গুণ ছিল। মু'মিনরা তাঁর ব্যক্তিত্বের কারণে যেমনি ভালোবাসতেন, তেমনি ভালোবাসতেন আল্লাহর পক্ষ থেকে তাঁর কাছে ওয়াহি আসার কারণে তাঁদের সম্পর্ক সরাসরি রবের সঙ্গে স্থাপিত হলো বলেও। এভাবেই রাসূলুল্লাহর ব্যক্তিত্বে দুটি গুণের সমন্বয় ঘটে: তিনি একাধারে একজন মহামানব ও একজন মহান রাসূল।
টিকাঃ
৩০০. দেখুন: রাসূলুল্লাহর রাষ্ট্র: শিকড় থেকে শিখরে (পৃ. ২১৯)।
৩০১. প্রাগুক্ত (পৃ. ২২০)।
৩০২. দেখুন: মুহাম্মাদ কুতুব, মানহাজুত-তারবিয়াতিল-ইসলামিয়্যাহ (পৃ. ৩৪, ৩৫)।
📄 দারুল-আরকামের পাঠ্যসূচি
রাসূল ﷺ দারুল-'আরকামে যে পাঠ্যসূচির আলোকে পাঠদান করতেন তা ছিল আল-কুরআন; কুরআন আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রাপ্ত জ্ঞানের প্রধানতম উৎস। সাহাবিদের জ্ঞানের প্রধানতম উৎস যাতে এ কুরআনই হয় সে বিষয়ে রাসূল ﷺ ছিলেন সচেষ্ট। তিনি চাইতেন কুরআনই যাতে এ বিদ্যাপীঠের একমাত্র মানহাজ হয়। যার আলোকে পরিচালিত হবে একজন মুসলিমের ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সামাজিক জীবন।
ওয়াহির অমিয় বাণী তাঁদের হৃদয় ছুঁয়ে যেত, অন্তরে গেঁথে যেত। দারুল-'আরকামে সাহাবিরা শিখলেন যে, কুরআন ও নবিজির সুন্নাহই দা'ওয়াত, জীবন, রাষ্ট্র ও সভ্যতা পরিচালনার সবচেয়ে বড় ও সুপ্রীম সংবিধান। প্রথম প্রজন্ম কুরআনকে গ্রহণ করেন ঐকান্তিকভাবে, প্রচণ্ড নিষ্ঠার সাথে। তাঁরা উদগ্রীব ছিলেন কুরআন অনুধাবনে এবং জীবনে তাঁর পরিপূর্ণ বাস্তবায়নে।
এভাবেই ইসলামের প্রথম প্রজন্ম গড়ে ওঠে কুরআনের আলোকে; রব-প্রদত্ত এ নির্দেশনাগুলো কাজে পরিণত করার জীবন্ত ছবি হয়ে ওঠেন তাঁরা। কুরআন ছিল তাঁদের জন্য আল্লাহ প্রদত্ত নির্দেশনার বিদ্যালয়। ইসলামের এ প্রজন্মের মুসলিমরা কুরআনের দীক্ষায় গ্র্যাজুয়েশন শেষে বের হয়ে পৃথিবীর সব সমাজে অনন্যতার ছাপ রাখেন।
টিকাঃ
৩০৩. দেখুন: রাসূলুল্লাহর রাষ্ট্র: শিকড় থেকে শিখরে (পৃ. ২২৫)।
৩০৪. দেখুন: রাসূলুল্লাহর রাষ্ট্র: শিকড় থেকে শিখরে (পৃ. ৩৩৫)।