📄 আল্লাহর বাণী প্রচারের নির্দেশ
মুহাম্মাদ জানলেন, খুব ভালোভাবেই জানলেন যে, তিনি আল্লাহর নবি হয়েছেন। জিব্রীল যখন তাঁর কাছে দ্বিতীয়বারের মতো আসেন, তখন আল্লাহ তা'আলা তাঁর নবির ওপর এই আয়াতগুলো নাযিল করেন। তিনি বলেন, “হে বস্ত্রাচ্ছাদিত! ওঠো, আর সতর্ক করো। এবং তোমার রবের শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা করো। তোমার পোশাক পবিত্র রাখো।”
ধারাবাহিকভাবে নাযিলকৃত এই আয়াতগুলো নবিজিকে জানান দিচ্ছে যে, অতীত শেষ হয়েছে তাঁর ঘুম ও বিশ্রামে; সামনে রয়েছে পর্বতপ্রমাণ মহান কাজ; এই কাজের জন্য দরকার সদা সতর্কতা, প্রস্তুতি, ধৈর্য ও কঠোর পরিশ্রম। যাতে তিনি এই রিসালাত বহন করেন। দিক-নির্দেশনা দেন মানুষকে। এবং ওয়াহির মাধ্যমে তিনি যেন প্রবোধ দেন নিজেকে। সর্বোপরি এর মাধ্যমেই তিনি যেন লাঘব করেন তাঁর দুঃখ-কষ্ট। কারণ, তাঁর রিসালাতের উৎস ও দা'ওয়াতের পাথেয় হচ্ছে এই ওয়াহি।
সূরা মুদ্দাস্সিরের এই আয়াতগুলোকে ধরা হয় ইসলামের শিক্ষা পৌঁছানোর প্রথম নির্দেশসংবলিত আয়াত। অনেকগুলো দিক উঠে এসেছে সূরাটিতে। নবিজির দা'ওয়াতের সারনির্যাস, ইসলামের যথার্থতা, যার ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে গোটা ইসলামের বুনিয়াদ, তথা আল্লাহর একত্ববাদ, আখিরাতে বিশ্বাস, আত্মশুদ্ধি, সমাজকে অনাচার মুক্ত রাখা এবং এর উপকার সাধন; অর্থাৎ দুষ্টের দমন, শিষ্টের লালন।
এই আয়াতগুলো আল্লাহর বাণী মানুষের দ্বারে দ্বারে পৌঁছাতে যে দুঃখক্লেশ পেতে হয় তার প্রতি ভ্রুক্ষেপ না করতে নবিজির সংকল্পকে আরও জাগিয়ে তোলে। এতে করে ইসলামের দা'ওয়াত নিয়ে তিনি সর্বত্র চষে বেড়াবেন; কোনো বাধা-বিপত্তির পরোয়া করবেন না। এই কোমল আহ্বান—হে বস্ত্রাচ্ছাদিত—ছিল সংকল্প দৃঢ় করার ঘোষণা। ঘুম ও বিশ্রামের ক্ষণ বিদায়ের ইঙ্গিতবাহী।
আহ্বানসূচক আয়াতটির পরের আয়াতেই জেগে উঠার নির্দেশ, “ওঠুন।” প্রাণবন্ত সংকল্প, প্রত্যয়ী সাহসিকতার এই নির্দেশ দা'ওয়ার আবশ্যকতা বাস্তবায়ন অভিমুখী পথের সন্ধান দিচ্ছে। ওয়াহির ধারাবাহিকতায় কিছুদিন ছেদ পড়ার পর প্রথম সম্বোধনে, সুসংবাদ না দিয়ে, নবিজিকে সতর্ক করার নির্দেশসংবলিত আয়াত এই ঘোষণাই দিচ্ছে: তাঁর রিসালাতের মহান দায়িত্ব নির্ভর করে কষ্টসহিষ্ণু লড়াই ও নিরবচ্ছিন্ন সাধনার ওপর। আয়াতগুলো নবিজির প্রত্যয়কে আরও দৃঢ় করে তোলে। সাহায্য করে কোমর সোজা করে দাঁড়াতে। আদিষ্ট বিষয়ের চূড়ান্ত শিখরে পৌঁছতে অনুপ্রেরণা জোগায়। এ পথে বাধা-বিপত্তি আসবেই। কিন্তু সেদিকে ভ্রুক্ষেপ না করে এগিয়ে যেতে হবে উদ্দিষ্ট পানে।
তারপর রাসূলুল্লাহকে বলা হয়েছে, “তোমার রবের শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা করো।” অর্থাৎ সৃষ্টির কোনো বিষয়কেই আপনি বড় মনে করবেন না এবং সেগুলোর কিছুই যাতে আপনাকে বড় মনে না করে। তাদের কোনো কাজকে আপনি হুমকি মনে করবেন না এবং তাদের কাউকে ভয়ও পাবেন না। আপনি কেবল আল্লাহর মাহাত্ম্যই বর্ণনা করবেন; যিনি আপনাকে প্রতিপালন ও রক্ষণাবেক্ষণ করেছেন। জন্মলগ্ন থেকে শুরু করে তিনি তাঁর দয়া-মায়া, স্নেহ-ভালোবাসায় আপনাকে লালন-পালন করেছেন, বড় করেছেন। এমনকি এক সময়ে এসে আপনাকে মানুষের কাছে নবি ও রাসূল করে পাঠিয়েছেন। তবে তারও আগে আপনাকে আল্লাহ নুবুওয়াতের মহান দায়িত্ব পালনে সৃষ্টিগত ও চরিত্রগত সর্ববিষয়ে প্রস্তুত করে নিয়েছেন। “তোমার রবের শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা করো।” সুতরাং সকল মাহাত্ম্য, সকল বড়ত্ব, সকল সম্মান-মর্যাদার অধিকারী কেবল আল্লাহই; এতে তাঁর সঙ্গে আর কেউ শরিক নেই কিংবা তাঁর সৃষ্টির আর কিছুই ভাগ বসাতে পারে না এতে।
তারপর আল্লাহ বলেন, “তোমার পোশাক পবিত্র রাখো।” আয়াতটিতে কেমন যেন তাঁকে বলা হচ্ছে: আপনি আপনার পবিত্রতার ওপরই আছেন। আপনার পবিত্রতা স্বভাবজাত; আল্লাহ আপনাকে উত্তম চারিত্রিক সুষমা দিয়েই তৈরি করেছেন। আজকের এই দিনের জন্য তিনি আপনাকে নুবুওয়াত-উপযোগী সব ধরনের যোগ্যতা দিয়েই প্রস্তুত করেছেন। তবে এখন থেকে নুবুওয়াতের মতো মহান কাজের জন্য আত্মিক বিশুদ্ধতার প্রয়োজন আরও বেশি। মানুষের সঙ্গে তো অবশ্যই, অন্যান্য ক্ষেত্রেও চারিত্রিক পূর্ণতা সাধনের দরকার রয়েছে। আজকের এই দিন থেকে আপনি আল্লাহর রাসূল; প্রেরিত হয়েছেন মানুষ ও জিন উভয় জাতির কাছেই। তবে রিসালাতের দা'ওয়াত যথার্থভাবে প্রচার করতে হলে ধৈর্য, সহনশীলতা, ক্ষমার উদারতা, দয়া-মায়া, কার্য-সম্পাদনের প্রতি ঐকান্তিকতা ইত্যাদি চারিত্রিক মহৎ গুণাবলি অর্জনে আপনাকে হতে হবে পরিপূর্ণ একজন মানুষ।
আল্লাহর বাণী, “আর অপবিত্রতা (পৌত্তলিকতা) থেকে দূরে থাকো।” আয়াতটিতে কেমন যেন নবিজিকে বলা হচ্ছে: আল্লাহ আপনাকে যে স্বভাবজাত পবিত্রতা দিয়ে সৃষ্টি করেছেন তার কারণে আপনি এমনিতেই পৌত্তলিকতার নাপাকি থেকে মুক্ত ছিলেন; তবে মন-মগজে যাতে এর চিন্তা ঘুণাক্ষরেও ঠাঁই না পায় সেদিকেও রাখতে হবে তীক্ষ্ণ নজর। যাতে করে আপনার উম্মাহর জন্য আপনি হতে পারেন উত্তম আদর্শ।
টিকাঃ
২৬০. দেখুন: ফিকহুস-সীরাহ, আল-গজালি (পৃ. ৯০)।
২৬১. দেখুন: ড. কামিল সালামা, রাসূলের রাষ্ট্র: শিকড় থেকে শিখরে (পৃ. ১৮১)।
২৬২. দেখুন: মুহাম্মাদ আস-সাদিক ‘উরজুন, মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (১/৫৮৯, ৫৯০, ৫৯১)।
২৬৩. প্রাগুক্ত (১/৫৯২, ৫৯৩)।
📄 গোপনীয়তা রক্ষা করে দা‘ওয়াতের সূচনা
সূরা মুদ্দাস্সিরের এই আয়াতগুলো অবতীর্ণের অব্যাহতির পর রাসূলুল্লাহ মানুষকে আল্লাহর পথে, ইসলামের পথে আহ্বান করতে গোপনে নেমে পড়েন। সংগত কারণেই তিনি দাওয়াাত সূচনা করেন তাঁর পরিবার, বন্ধুবান্ধব ও একান্ত কাছের লোকদেরকে আহ্বান জানানোর মধ্য দিয়ে।
নারীদের মধ্যে, বরং বলা ভালো নারী-পুরুষ সবার মধ্যে প্রথম ইসলাম গ্রহণ করেন সাইয়্যিদা খাদীজা। তিনিই প্রথম রাসূলুল্লাহর মুখ থেকে ওয়াহির অমিয় বাণী শোনার সৌভাগ্য অর্জন করেন। নবিজির কাছ থেকে শোনার পর তিনিই কুরআনুল-কারিম তিলাওয়াতকারী প্রথম মানুষ। তিনিই প্রথম রাসূল থেকে সালাত পড়ার নিয়ম-কানুন রপ্ত করেন। খাদীজার ঘরেই প্রথম ওয়াহির তিলাওয়াত হয়; হেরা গুহার ঘটনার পর নবিজির অন্তরে জিব্রীল সেই ওয়াহি বয়ে নিয়ে আসেন খাদীজার ঘরেই। তাওহীদের বিধান প্রতিষ্ঠার পর আল্লাহ তা'আলা সালাত প্রতিষ্ঠার বিধান ফার্দ বলে সাব্যস্ত করেন।
কীভাবে উযূ করতে হয় ও কীভাবে সালাত পড়তে হয়—রাসূল স্ত্রী খাদীজাকে হাতেকলমে শেখানোর আলোচনা বিভিন্ন বর্ণনায় উঠে এসেছে। আর রাসূলুল্লাহ এ নিয়ম-কানুনগুলো শেখেন জিব্রীলের কাছে থেকে। একদিনের ঘটনা। নবিজি তখন মাক্কার একটি উঁচু জায়গায় অবস্থান করছিলেন। এমন সময় সেখানে জিব্রীল এসে হাজির। এসে তিনি উযূ করেন। পাশে দাঁড়িয়ে নবিজি দেখছিলেন এবং শিখছিলেন—কীভাবে সালাতের জন্য পবিত্রতা অর্জন করতে হয়। এরপর রাসূলুল্লাহ যেভাবে জিব্রীলকে উযূ করতে দেখেন সেভাবে উযূ করেন। জিব্রীল এরপর তাঁকে নিয়ে সালাত আদায় করেন। নবিজিও অনুরূপভাবে সালাত পড়েন। নবিজির সালাত শেষ হলে জিব্রীল চলে যান। পরে রাসূলুল্লাহ খাদীজার কাছে ফিরে এসে তাঁর সামনে উযূ করেন। তাকে দেখালেন কীভাবে সালাতের জন্য পবিত্রতা অর্জন করতে হয়। এবার খাদীজা রাসূলুল্লাহর মতো করেই উযূ সারেন। নবিজি খাদীজাকে সঙ্গে নিয়ে সালাত আদায় করেন।
সাইয়্যিদা খাদীজার ইসলাম গ্রহণের পর ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় নেন 'আলি ইবনু আবু তালিব; শিশুদের মধ্যে তিনিই প্রথম ঈমান আনেন। বিশুদ্ধ মতে, তখন তাঁর বয়স ১০ বছর। আল্লাহ 'আলিকে ইসলাম আগমনের পূর্বে নবিজির তত্ত্বাবধানে প্রতিপালিত হওয়ার সৌভাগ্য দিয়েছেন। নবিজি ও খাদীজার পর সালাত কায়েমকারী তৃতীয় ব্যক্তি ছিলেন 'আলি। কোনো কোনো 'আলিমের মতে, সালাতের সময় হলে নবিজি মাক্কার গিরি গুহায় চলে যেতেন। সঙ্গে যেতেন 'আলিও। তবে তিনি তাঁর পিতা, চাচা ও গোত্রের অন্য লোকদের চোখের আড়ালে থেকে গোপনে গোপনে রাসূলুল্লাহর সঙ্গে বের হতেন। সেখানে তাঁরা সালাত পড়তেন এবং সন্ধ্যার দিকে বাড়ি ফিরে আসতেন।
মুক্ত দাসদের মধ্যে প্রথম ইসলাম গ্রহণ করেন যাইদ ইবনু হারিসা। নবিজির খুবই প্রিয়ভাজন এবং তাঁর মুক্ত করা দাস ছিলেন তিনি। নবিজি তাকে দত্তক নেন। যাইদ তাঁর নিজ পিতা ও পরিবারের চেয়েও বেশি প্রাধান্য দেন রাসূলুল্লাহকে। নবিজির কন্যা যাইনাব, উম্মু কুলসূম, ফাতিমা ও রুকাইয়্যা রাদিয়াল্লাহু আনহুন্না সবাই ছিলেন ইসলাম গ্রহণে অগ্রগামীদের দলে। মাক্কা যুগের এ পরিবারটিই হয়ে ওঠে আল্লাহর ওপর ঈমান আনয়নকারী এবং ইসলামি বিধি-বিধান পালনে অনুগত প্রথম পরিবার।
মুক্ত, স্বাধীন ও সম্মানিত ব্যক্তিদের মধ্যে প্রথম ইসলাম গ্রহণ করেন আবু বাক্ আস-সিদ্দীক। নবি হওয়ার আগ থেকেই রাসূলুল্লাহর প্রিয়ভাজনদের একজন ছিলেন আবু বাক্র। তাঁর সম্পর্কে রাসূল বলেন, "আমি যাকেই ইসলামের দিকে আহ্বান করেছি হয় সে আমতা আমতা করেছে, বা তাঁর মধ্যে কোনো দ্বিধা কাজ করেছে, কিংবা সে বিতর্ক করেছে। ব্যতিক্রম কেবল আবু বাক্র।"
আবু বাক্স ছিলেন এক অমূল্য রত্ন; আল্লাহ তা'আলা তাঁর নবির জন্যই সঞ্চয় করেন এ রত্নটি। তাঁর মাধ্যমেই সমাজের সেরা মানুষগুলো ইসলাম গ্রহণ করেন। তাঁরা হলেন: 'উসমান ইবনু 'আফফান, 'আবদুর-রাহমান ইবনু 'আওফ, সা'দ ইবনু আবি ওয়াক্কাস, যুবাইর ইবনুল-'আওয়াম এবং তালহা ইবনু 'উবাইদুল্লাহ। ইসলামের এই পাঁচজন মহান বীরপুরুষ আবু বাক্ সিদ্দীকের দা'ওয়াতের প্রথম ফসল।
ইসলাম গ্রহণকারী প্রথম দলের পরই শুরু হয় দ্বিতীয় একটি দলের ইসলাম গ্রহণের পালা। দ্বিতীয় ধাপে ইসলাম গ্রহণকারীদের মধ্যে রয়েছেন: আবু 'উবাইদা ইবনুল-জাররা, আবু সালামা, 'আরকাম ইবনু আবুল-'আরকাম, 'উসমান ইবনু মায'ঊন, সা'ঈদ ইবনু যাইদ, 'আসমা বিন্ত আবু বাক্র, 'আয়িশা বিন্ত আবু বাক্র এবং খাব্বাব ইবনুল-আরাত রাদিয়াল্লাহু 'আনহুম। এরপর তৃতীয় ধাপে আরও অনেক বিশিষ্ট সাহাবি ইসলাম গ্রহণ করেন, যাঁদের মধ্যে রয়েছেন 'আবদুল্লাহ ইবনু মাস'ঊদ, জা'ফার ইবনু আবু তালিব, 'আম্মার ইবনু ইয়াসির, আবু যার গিফারি এবং বিলাল ইবনু রাবা।
টিকাঃ
২৬৪. দেখুন: ড. আসমত উদ্দীন, নবিজির যুগে নারী (পৃ. ৩৬)।
২৬৫. দেখুন: ইবনু হিশাম (১/২৪৪), এবং সালিহ আশ-শামি, মা'ঈন আস-সীরাহ (পৃ. ৪১)।
২৬৬. আবু শুহবা, আস-সীরাহ আন-নাবাওয়িয়া (১/২৮৪)।
২৬৭. ইবনু হিশাম (১/২৪৬)।
২৬৮. ইবনু সাইয়্যিদিন্নাস, ‘উয়ূনুল-আসার (১/১১৫)।
২৬৯. দেখুন: ড. আসমাত উদ্দীন, নবিজির যুগে নারী (পৃ. ৪২)।
২৭০. দেখুন: ড. মুহাম্মাদ কল 'আজি, রাসূলুল্লাহর ব্যক্তিত্ব: একটি পর্যালোচনা (পৃ. ১৯১)।
২৭১. দেখুন: আবু শুহবা, আস-সীরাহ আন-নাবাওয়িয়া (১/২৮৪)।
২৭২. দেখুন: ড. আসমাত উদ্দীন, নবির যুগে নারী (পৃ. ৪৩)।
২৭৩. দেখুন: ড. আসমাত উদ্দীন, নবির যুগে নারী (পৃ. ৪৫)।
২৭৪. দেখুন: ড. কামিল সালামা, রাসূলের রাষ্ট্র: শিকড় থেকে শিখরে (পৃ. ২০৮)।
২৭৫. প্রাগুক্ত (পৃ. ২০৮)।
২৭৬. দেখুন: আবু শুহবা, আস-সীরাহ আন-নাবাওয়িয়া (১/২৮৪)।
২৭৭. দেখুন: ইবনু হিশাম, আস-সীরাহ আন-নাবাওয়িয়া (১/৩৭১)।
২৭৮. সহীহ আল-জামি' আস-সগীর-এ আলবানি হাদীসটি নিয়ে এসেছেন (খণ্ড ১/৩০৮, হাদীস নং ৯০৮)।
২৭৯. দেখুন: আল-গাদবান, আত-তারবিয়াহ আল-কিয়াদিয়্যাহ (১/১১৫)
২৮০. দেখুন: আত-তারবিয়াহ আল-কিয়াদিয়্যাহ, (১/১১৬)
২৮১. দেখুন: 'উরজুন, মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (১/৫৩৩)।
২৮২. দেখুন: ড. ইয়াহইয়া আল-ইয়াহইয়া, আল-ওয়াহয়ু ওয়া তাবলীগুর-রিসালাহ (পৃ. ৬২)।
২৮৩. দেখুন: আবু যাহরাহ, খাতামুন্নাবিয়্যীন (পৃ. ৩৯৮)।
📄 অবিরাম দা‘ওয়াত
নবি মুহাম্মাদ গোপনে গোপনে তাঁর দা'ওয়াতের কাজ চালিয়ে যান। এ সময়ে তিনি বন্ধুবান্ধব ও আত্মীয়স্বজনদের অনেককেই ইসলামের পথে আহ্বান করেন। দা'ওয়াতের এই সঙ্কটমুহূর্তে রাসূল ও তাঁর সাহাবিরা নানা বাধাবিপত্তির সম্মুখীন হন। ক্ষতির আশঙ্কা না থাকার ব্যাপারটি নিশ্চিত হয়েই তাঁরা কাউকে ইসলামের দিকে আহ্বান করতেন। অর্থাৎ দা'ওয়াতের কাজ চলছিল অত্যন্ত ধীরে, খুবই সতর্ক পদক্ষেপে। এমনকি সালাত পড়তে চাইলে মুসলিমরা বিভিন্ন গুহা কিংবা উপত্যকায় চলে যেতেন।
ইসলামের প্রাথমিক এ যুগের গুরুত্বপূর্ণ দিকটি হলো: মুসলিমদের ছোট দলটির নিরাপত্তার প্রশ্নে গোপনীয়তা রক্ষা করে চলা। এমনকি নিকটজনদের কাছেও বিষয়টি গোপন রাখা হতো। রাসূল তাঁর সাহাবিদেরকে ছোট ছোট কয়েকটি দলে সাজান; দুইজন গরিব মুসলিম লোক একজন ধনী ব্যক্তির দায়িত্বে থাকতেন। তিনি নতুন এ দুইজন মুসলিমকে নিজের কাছে রাখতেন। রাসূলুল্লাহ ﷺ তাঁর অনুসারীদের দীক্ষা দিতেন কুরআনের নির্দেশিত পথে।
মাক্কায় নিরাপত্তার বীজ রোপিত হয়, যা ধীরে ধীরে বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়ে দা'ওয়াতের বিস্তৃতির সঙ্গে সঙ্গে। মুসলিমদের প্রতিরক্ষা বিষয়ে গুরুত্বারোপ তাদেরকে বাঁচিয়ে দেবে কারও প্রত্যাশিত শত্রুতা কিংবা আকস্মিক আক্রমণ থেকে। রাসূল তাঁর সাহাবিদেরকে ছোট ছোট দলে ভাগ করে দিতেন; যাতে তাঁরা গোপনে দীনি শিক্ষার উদ্দেশ্যে পরস্পরে দেখা-সাক্ষাৎ করতে পারেন। যেমন: 'উমার ইবনুল-খাত্তাবের বোন ফাতিমা বিন্ত আল-খাত্তাব ও তাঁর স্বামী সা'ঈদ ইবনু যাইদ। খাব্বাব ইবনুল-আরাত ছিলেন তাঁদের শিক্ষক।
রাসূল বুঝতে পেরেছিলেন, জমায়েত হওয়ার বিষয়টি হতে হবে চূড়ান্ত গোপনীয়তা রক্ষা করেই; নেতার সঙ্গে অনুসারীদের সাক্ষাৎটা যাতে হয় সবার অগোচরে। যদি নিতান্তই দা'ওয়াতের বাণী মানুষের কাছে পৌঁছানোই উদ্দেশ্য হতো, তা হলে এর জন্য কা'বার চেয়ে উত্তম জায়গা আর হয় না। কিন্তু তিনি পূর্ণাঙ্গ গোপনীয়তা বেছে নিলেন। এবং বেছে নিলেন নিরাপদ এমন এক স্থানের, যেখানে তিনি তাঁর সাহাবিদেরকে ইসলাম শেখাতে পারবেন।
সীরাতের বইয়ে উল্লেখ আছে, মুসলিম ও কাফিরদের মধ্যে প্রথম মুখোমুখি অবস্থানে সা'দ ইবনু আবু ওয়াক্কাসের অংশগ্রহণের পর 'আরকামের বাড়িকে মুসলিমদের গোপনে জমায়েত হওয়ার জায়গা হিসেবে বাছাই করা হয়। 'আরকামের বাড়িটি হয়ে ওঠে দা'ওয়াতের নতুন প্রাণকেন্দ্র। মুসলিমরা এখানে জমায়েত হন। এখানেই তাঁরা নবিজির কাছ থেকে ওয়াহির নতুন বাণীগুলো গ্রহণ করেন। সরাসরি নিজের তত্ত্বাবধানে রেখে তিনি তাঁদেরকে হাতেকলমে দীক্ষা দেন; ঠিক যেভাবে আল্লাহর তত্ত্বাবধানে থেকে তিনি দীক্ষা পান।
টিকাঃ
২৯১. দেখুন: সালমান আল-'আওদাহ, আল-গুরাবা আল-আওয়ালুন।
২৯২. দেখুন: ইসলামে সমর অনুসন্ধান (পৃ. ১১১, ১১২)।
২৯৩. দেখুন: ড. 'আবদুল-গাফ্ফার মুহাম্মাদ 'আযীয, আদ-দা'ওয়াতুল-ইসলামিয়্যাহ (পৃ. ৯৬)।
২৯৪. দেখুন: রাসূলুল্লাহর রাষ্ট্র: শিকড় থেকে শিখরে (পৃ. ২১৮)।
২৯৫. দেখুন: ইবনু হিশাম (১/২৩৬)।
২৯৬. দেখুন: আত-তারবিয়াতুল-কিয়াদিয়্যাহ (১/১৯৮)।
📄 প্রথম প্রজন্মের মুসলিমদের কিছু প্রশংসনীয় বৈশিষ্ট্য
রাসূলুল্লাহর কাছে দীক্ষা পাওয়া প্রথম প্রজন্মের মুসলিমদের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ এমন কিছু বৈশিষ্ট্য ছিল যা অন্য কারও মধ্যে দেখা যায় না। তাঁরা ব্যক্তিগত পর্যায় থেকে শুরু করে সর্বক্ষেত্রেই চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যে অনন্য ছিলেন।
প্রথম বৈশিষ্ট্য হলো অনুপুঙ্খ ওয়াহির নির্দেশ মেনে চলা। আকীদাবিশ্বাস, বিধিবিধান ও আদবকেতাসহ সব বিষয়ের সঠিক জ্ঞান ও সঠিক অনুধাবন কেবল ওয়াহির আলোকেই সম্ভব। আল্লাহ যাদেরকে সঠিক ঈমান দিয়েছেন, সেই সাহাবিদের জীবন পরিচালনার একমাত্র মানহাজ ছিল শার'ঈ দলিল-প্রমাণ গ্রহণ। কুরআন-সুন্নাহর দলিল-প্রমাণ থেকে সকল প্রজন্মের চেয়ে সাহাবিরাই বেশি উপকৃত হতে পেরেছিলেন। এর প্রধানতম কারণ ছিল সাহাবিদের অন্তরের পরিশুদ্ধতা।
দ্বিতীয়ত, সাহাবিরা সরাসরি জড়িত ছিলেন এমন অনেক ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে কুরআন-সুন্নাহর মূলপাঠের অবতরণ ঘটে। নবিজির কাছে যখন ওয়াহি নাযিল হতো, তখন প্রথম প্রজন্মের মুসলিমরা তা প্রত্যক্ষ করতেন। কোন আয়াত কোন পটভূমিতে নাযিল হয়েছে, রাসূল কোন ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে কোন কথাটি বলেছেন—এসবের জ্ঞান সাহাবিরাই সবচেয়ে ভালো জানতেন।
ওয়াহি ও ঈমানের প্রভাবে তাঁদের মধ্যে আধ্যাত্মিকতার জাগরণ ঘটেছিল। কুরআন-সুন্নাহর বিশুদ্ধ জ্ঞানই ছিল তাঁদের জীবন চলার একমাত্র পাথেয়। এ জ্ঞানের ভিত্তিতেই তাঁরা আল্লাহকে ভালোবাসেন এবং তাঁর সাক্ষাতের আশা করেন। সাহাবিরা দিনের বেলায় যুদ্ধ করতেন, রাতের বেলায় সেজদায় অবনত থাকতেন। তাঁদের জ্ঞান ও আল্লাহভীতি পার্থিব কাজে তাঁদের সামনে বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি; তাঁরা ধর্মকর্ম যেমন করেছেন তেমনিভাবে হাটবাজারে গিয়েছেন, বেচাকেনা করেছেন এবং পরিবার-পরিজনের দেখাশোনা করেছেন।
টিকাঃ
২৯৭. দেখুন: সালমান আল-'আওদাহ, সিফাতুল-গুরাবা (পৃ. ৮৩)।
২৯৮. প্রাগুক্ত (পৃ. ৯৪)।
২৯৯. প্রাগুক্ত (পৃ. ৯৭)।