📄 খাদীজার প্রতি নবিজির বিশ্বস্ততা
বিশ্বস্ততা ও পারিবারিক সৌজন্য রক্ষার এক অনুপম আদর্শ ছিলেন নবি মুহাম্মাদ। স্ত্রী খাদীজার বেলায় চূড়ান্ত পর্যায়ের বিশ্বস্ততা রক্ষা করেছেন তিনি। খাদীজার জীবদ্দশায় এবং তাঁর ওফাতের পরও। খাদীজার জীবদ্দশায় রাসূল তাঁকে জান্নাতের সুসংবাদ শোনান। তাঁর কাছে পৌঁছে দেন আল্লাহর সালাম ও ফেরেশতা জিব্রীলের সালাম। সাহাবি আবু হুরাইরা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “রাসূলুল্লাহর কাছে একবার জিব্রীল এসে বলেন, 'হে আল্লাহর রাসূল, ওই যে খাদীজা আপনার কাছে আসছেন। যখন তিনি আপনার নিকট এসে পৌঁছবেন তখন তাঁর রবের সালাম এবং আমার সালাম তাঁকে জানাবেন। এবং জান্নাতে একটি ঘরের সুসংবাদ তাঁকে দেবেন; যেখানে হবে না কোনো শোরগোল, থাকবে না কোনো অবসাদ'।”
খাদীজার মৃত্যুর পরও রাসূল তাঁর প্রতি কেমন বিশ্বস্ত ছিলেন তার উদাহরণ টানতে গিয়ে 'আয়িশা বলেন, “যদিও আমি খাদীজাকে দেখিনি, তবুও তাঁর প্রতি আমার যতটা ঈর্ষা হতো ততটা নবিজির আর কোনো স্ত্রীর প্রতি হতো না। নবিজি তাঁর আলোচনা খুব করতেন। প্রায়ই তিনি ছাগল জবাই করে এর বিভিন্ন অংশ পাঠিয়ে দিতেন খাদীজার বান্ধবীদের বাড়িতে।”
খাদীজার প্রতি শ্রদ্ধাবোধ তাঁর মৃত্যুর পরও নবি মুহাম্মাদ অব্যাহত রেখেছিলেন। নবিজি মাদীনায় হিজরাত করে যাওয়ার পর একদিনের ঘটনা। খাদীজার বোন হালাহ মাক্কা থেকে মাদীনায় এসে রাসূলুল্লাহর সঙ্গে দেখা করার অনুমতি চাইলেন। হালাহর এই অনুমতি চাওয়াটা নবিজিকে খাদীজার কথা মনে করিয়ে দেয়। 'আয়িশা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “খাদীজার বোন হালাহ বিন্ত খুওয়াইলিদ (একদা) নবিজির সঙ্গে সাক্ষাৎ করার জন্য অনুমতি চান। এতে রাসূল খাদীজার অনুমতি চাওয়ার কথা মনে করে পুলকিত হন।” খাদীজাকে বিয়ে করার পর যেসব নারী খাদীজার সঙ্গে দেখা করতে আসতেন, খাদীজার মৃত্যুর পর, তাদেরকেও রাসূল উষ্ণ অভিবাদন জানাতেন এবং আপ্যায়ন করতেন সম্মানের সঙ্গে।
টিকাঃ
২৫১. সহীহ মুসলিম, সাহাবিদের মর্যাদার অধ্যায়, হাদীস নং ২৪৩২, পৃ. ১৮৮৭।
২৫২. সহীহ বুখারি, অধ্যায়: আনসারদের গুণাবলি, ৭/১৩২, হাদীস নং ৩৮১৮।
২৫৩. সহীহ মুসলিম, অধ্যায়: সাহাবিদের মর্যাদা, পৃ. ১৮৮৯, হাদীস নং ২৪৩৭।
২৫৪. দেখুন: আল-হুমাইদি, আত-তারীখ আল-ইসলামি ১/৭১।
📄 যুগে যুগে নবি-রাসূলদের প্রতি মিথ্যারোপ
ওয়ারাকা বলেন, “হায়! আমি যদি যুবক থাকতাম সে সময়। হায়! যখন তোমার জাতি তোমাকে বের করে দেবে, সে সময় আমি যদি জীবিত থাকতাম!” এ কথা শুনে রাসূল বলে উঠলেন, “তারা কি আমাকে বের করে দেবে?” ওয়ারাকা উত্তর করলেন, “হ্যাঁ, তুমি যা নিয়ে এসেছ, তোমার মতো এরূপ যারাই তা নিয়ে এসেছেন তাদের সঙ্গেই শত্রুতা করা হয়েছে। আমি যদি তোমার ওইদিন পাই, তবে তোমাকে প্রাণপণে সাহায্য করব।”
বিভিন্ন জাতি আল্লাহর পথের আহ্বানকারীদের সঙ্গে যেরূপ খারাপ আচরণ করত, তাদেরকে মিথ্যুক বলত, বের করে দিত আপন দেশ থেকে—তারই একটি সচিত্র প্রমাণ উপরের হাদীসটি। যেমন: আল্লাহ তা'আলা লূত জাতি সম্পর্কে বলেন, "উত্তরে তার সম্প্রদায় শুধু বলল, ‘তোমরা লুত-পরিবারকে তোমাদের জনপদ থেকে বের করে দাও। এরা তো এমন লোক যারা নিজেদেরকে বড় পবিত্র রাখতে চায়।’" নবি শু'আইবের জাতি যেমনটি বলেছিল, আল্লাহ বলেন, "তার সম্প্রদায়ের দাম্ভিক প্রধানেরা বলল, ‘হে শু'আইব! আমরা তোমাকে ও তোমার সঙ্গে যারা ঈমান এনেছে তাদেরকে আমাদের গ্রাম থেকে অবশ্যই বের করে দেবো; অথবা তোমরা আমাদের পথে ফিরে আসবে।’" আল্লাহ আরও বলেন, “কাফিররা ওদের রাসূলদেরকে বলেছিল, ‘আমরা আমাদের দেশ থেকে তোমাদেরকে অবশ্যই তাড়িয়ে দেবো, অথবা তোমরা আমাদের ধর্মেই ফিরে আসবে।’ তারপর রাসূলদের কাছে তাদের রব ওয়াহি পাঠালেন, ‘আমি জালিমদেরকে অবশ্যই ধ্বংস করব’।”
টিকাঃ
২৫৫. সহীহ বুখারি, অধ্যায়: ওয়াহির সূচনা, হাদীস নং ৩; সহীহ মুসলিমেও হাদীসটির বর্ণনা রয়েছে; অধ্যায়: ঈমান, ২/১৯৭-২০৪, হাদীস নং ১৬০।
📄 ‘এবং ওয়াহির আগমন কিছু সময় বন্ধ রইল’
নবীন-প্রবীণ সব সীরাত-বিশেষজ্ঞগণই তাদের সীরাতের বইয়ে ওয়াহির বিরতিকাল নিয়ে আলোচনা করেছেন। হাফিজ ইবনু হাজার বলেন, “ওয়াহির বিরতিকাল অর্থ হচ্ছে, কিছুদিন ওয়াহি আগমনের ধারা বন্ধ ছিল। এর পেছনের কারণ হলো, প্রথমবার ওয়াহির সূচনায় রাসূল যে ভয় পেয়েছিলেন, তা যেন দূর হয় এবং তাঁর মনে যাতে ওয়াহি আবার কবে আসবে এমন আকাঙ্ক্ষা জাগ্রত হয়।”
সাহাবি জাবির ইবনু 'আবদুল্লাহ আল-আনসারি থেকে বর্ণিত, তিনি ওয়াহির বিরতিকালের বিষয়ে রাসূল থেকে বর্ণনা করেন যে, রাসূল বলেন, “তখন আমি হাঁটছিলাম। এমন সময় আকাশ থেকে একটি আওয়াজ শুনতে পেয়ে উপরের দিকে তাকাই আমি। দেখি, হেরা গুহায় আমার কাছে যে ফেরেশতা এসেছিলেন, তিনি আকাশ জমিন বিস্তৃত একটা আসনে বসে আছেন। আমি তো তাঁকে দেখেই ভয় পেয়ে যাই। তারপর ফিরে আসি এবং বলি, 'আমাকে চাদরাবৃত করো।' তখন আল্লাহ অবতীর্ণ করেন এই আয়াতগুলো। আল্লাহ বলেন, “হে বস্ত্রাচ্ছাদিত! ওঠো, আর সতর্ক করো। এবং তোমার রবের শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা করো। তোমার পোশাক পবিত্র রাখো। অপবিত্রতা (পৌত্তলিকতা) পরিহার করো।” রাসূল বলেন, “অতঃপর ওয়াহি তীব্রতর হলো এবং ধারাবাহিকভাবে আবার নাযিল হতে লাগল।”
শফিউর রহমান মুবারকপুরি বলেন, “ওয়াহির বিরতিকালের সময় নিয়ে অনেকগুলো মত রয়েছে। বিশুদ্ধ মত হলো, সময়টা ছিল হাতে গোনা কয়েকদিন মাত্র। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট যে, রাসূল এ সময়টাতে খুবই অস্থির থাকতেন। তিনি যতবার পাহাড়ে যেতেন ততবারই জিব্রীল তাঁর সামনে আত্মপ্রকাশ করতেন। তাঁকে সুসংবাদ শোনাতেন যে, তিনি আল্লাহর রাসূল।
টিকাঃ
২৫৬. ফাতহুল-বারি, ১/৩৬।
২৫৭. সহীহ বুখারি, ওয়াহির সূচনা, হাদীস নং: ৪।
২৫৮. দেখুন: আর-রাহীকুল-মাখতুম, পৃ. ৭৯, ৮০।
২৫৯. দেখুন: আস-সুহাইলি, আর-রওদুল-উনুফু, ২/৪৩৩, ৪৩৪।