📄 দা‘ওয়াতের ক্ষেত্রে একজন সৎ স্ত্রীর ভূমিকা
নবিজির বুক ধড়ফড় করছিল, তিনি ওই অবস্থাতেই ওয়াহির বাণীগুলো নিয়ে খাদীজা বিন্ত খুওয়াইলিদের কাছে এসে তিনি বললেন, 'ঢেকে দাও আমাকে, তোমরা ঢেকে দাও আমাকে।' তারা তাঁর গায়ে চাদর জড়িয়ে দেন। এতে তাঁর ভয় কেটে যায়। তিনি খাদীজাকে, গুহায় যা যা ঘটেছে, সবকিছু জানিয়ে বললেন, 'আমার প্রাণের ভয় হচ্ছে।' খাদীজা তাঁকে বললেন, 'না, অবশ্যই না। আল্লাহর কসম, তিনি আপনাকে কখনোই লাঞ্ছিত করবেন না; আপনি তো আত্মীয়তার বন্ধন বজায় রাখেন, দুর্বলের বোঝা বহন করেন; উপার্জনক্ষম করেন নিঃস্বকে; আহার দেন অতিথিকে। বিপদ-বিপর্যয়ের সময় মানুষের পাশে গিয়ে দাঁড়ান'।
নবি মুহাম্মাদ যখন ওয়াহির সূচনায় ভয় পেয়ে যান, তখন খাদীজা নবিজির পাশে থেকে তাঁর মনোবল বাড়ানোর অসাধারণ এক ভূমিকা পালন করেন। এটি খাদীজার দৃঢ় মনোবলেরই প্রমাণ। ওয়াহি নাযিলের খবর শুনে তাৎক্ষণিক যে ভূমিকা খাদীজা নিলেন তা তাঁর জ্ঞান ও প্রজ্ঞার গভীরতা ও ব্যাপকতার ইঙ্গিতবাহী। তখনই তিনি বুঝে ফেলেন যে, চারিত্রিক সৌন্দর্যের সুষমায় সুষমিত এমন ব্যক্তিকে আল্লাহ কখনো লাঞ্ছিত করবেন না।
উম্মুল-মু'মিনীন সাইয়্যিদা খাদীজা ঈমানের ডাকে সাড়া দেন সবার আগে। তিনি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করতেন যে, তাঁর স্বামীর মধ্যে উত্তম গুণের সমাবেশ ঘটেছে। নবিজির নুবুওয়াতের সূচনা হয়েছে, তিনি এখন একজন নবি—বিষয়টি প্রমাণের জন্য নবিজির চারিত্রিক গুণাবলিই যথেষ্ট। তারপরও খাদীজা কিন্তু এখানেই ক্ষান্ত দেননি, বরং রাসূলুল্লাহকে নিয়ে ছুটে যান ওয়ারাকা ইবনু নাওফালের কাছে। ওয়ারাকার কথায় নবিজির মনোবল চাঙা হয়ে ওঠে। নবিজির রিসালাতকে সত্য বলে স্বীকার করেছেন ওয়ারাকা ইবনু নাওফাল। ওয়ারাকা একজন জান্নাতবাসী—রাসূল এমন সাক্ষ্য দিয়েছেন পরবর্তী সময়ে।
নবিজির জীবনে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন খাদীজা। দয়া, সহনশীলতা, প্রজ্ঞা ও বুদ্ধিমত্তায় ছিলেন অতুলনীয়। খাদীজার মতো এমন একজন বিদুষী নারীকে বিয়ে করার তাওফীক দেন আল্লাহ তা'আলা তাঁর রাসূলকে। কারণ নবি মুহাম্মাদ বিশ্ববাসীর জন্য অনুকরণীয় আদর্শ এবং বিশেষ করে তাঁর মতো একজন দা'ঈর জন্য উম্মু খাদীজার মতো এমন স্ত্রীর প্রয়োজনীয়তা প্রশ্নাতীত। খাদীজা অনিন্দ্যসুন্দর এক আদর্শের নাম; আল্লাহর পথের একজন দা'ঈর স্ত্রী হিসেবে যে যে ভালো গুণ থাকা দরকার তার সবই তার চরিত্রে ছিল পুরোমাত্রায়।
দা'ঈরাই পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি নিপীড়িত। আপন ঘরবাড়ি থেকে বিতাড়নসহ তাদেরকে দেশ থেকে নির্বাসনে পাঠিয়ে দেওয়ার ভূরি ভূরি নজির আছে। এই দায়িত্ব পালনের শর্তই হলো, এর পেছনে ব্যয় করতে হবে অনেক সময়। এতে তার খাওয়া ও ঘুমের সময় কমে আসবে। স্ত্রী ও সন্তান-সন্ততি বঞ্চিত হবে তাদের পাওনা অধিকার থেকে। সুতরাং দা'ঈদের জীবনে প্রয়োজন এমন একজন স্ত্রীর, যিনি দা’ওয়াতের আবশ্যকতা ও গুরুত্ব খুব ভালোভাবে উপলব্ধি করতে পারবেন। যদি স্ত্রী ঠিকঠাকভাবে এসব কিছু বুঝতে পারেন, তবেই তিনি স্বামীর পাশে দাঁড়াবেন। দাওয়াতের সফলতার জন্য একজন সৎ স্ত্রীর ভূমিকা অগ্রগণ্য। খাদীজা এমনই একজন সৎ স্ত্রী। রাসূল সত্য বলেছেন, "দুনিয়া হলো ক্ষণিকের ধোঁকা; তবে এর মধ্যে সর্বোত্তম সম্পদ হলো একজন সতীসাধ্বী স্ত্রী।”
টিকাঃ
২৪০. দেখুন: আল-হুমাইদি, আত-তারীখ আল-ইসলামি, ১/৬১।
২৪১. প্রাগুক্ত, ১/৬৪।
২৪২. দেখুন: মুহাম্মাদ সাদিক 'উরজুন, মুহাম্মাদুর-রাসূলুল্লাহ, ১/৩০৭।
২৪৩. প্রাগুক্ত, ১/২৩২।
২৪৪. সীরাত ইবনু হিশাম, ১/১৯১, ১৯২।
২৪৫. আল-মুসতাদ্রক, ২/৬০৯। হাকিম বলেন, “ইমাম বুখারি ও মুসলিমের শর্ত মোতাবেক হাদীসটি সহীহ।"
২৪৬. মাজমা'উয-যাওয়াইদ, ৯/৪১৬।
২৪৭. দেখুন: আল-হুমাইদি, আত-তারীখ আল-ইসলামি, ১/৬৯।
২৪৮. দেখুন: আল-বিলালি, ওয়াকাফাত তারবাওয়িয়াহ মিনাস-সীরাহ আন-নাবাওয়িয়াহ, পৃ. ৪০।
২৪৯. দেখুন: আল-হুমাইদি, আত-তারীখ আল-ইসলামি, ১/৬৮।
২৫০. সহীহ মুসলিম, স্তন্যপান অধ্যায়, হাদীস নং ১৪৬৭, পৃ. ১০৯০।
📄 খাদীজার প্রতি নবিজির বিশ্বস্ততা
বিশ্বস্ততা ও পারিবারিক সৌজন্য রক্ষার এক অনুপম আদর্শ ছিলেন নবি মুহাম্মাদ। স্ত্রী খাদীজার বেলায় চূড়ান্ত পর্যায়ের বিশ্বস্ততা রক্ষা করেছেন তিনি। খাদীজার জীবদ্দশায় এবং তাঁর ওফাতের পরও। খাদীজার জীবদ্দশায় রাসূল তাঁকে জান্নাতের সুসংবাদ শোনান। তাঁর কাছে পৌঁছে দেন আল্লাহর সালাম ও ফেরেশতা জিব্রীলের সালাম। সাহাবি আবু হুরাইরা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “রাসূলুল্লাহর কাছে একবার জিব্রীল এসে বলেন, 'হে আল্লাহর রাসূল, ওই যে খাদীজা আপনার কাছে আসছেন। যখন তিনি আপনার নিকট এসে পৌঁছবেন তখন তাঁর রবের সালাম এবং আমার সালাম তাঁকে জানাবেন। এবং জান্নাতে একটি ঘরের সুসংবাদ তাঁকে দেবেন; যেখানে হবে না কোনো শোরগোল, থাকবে না কোনো অবসাদ'।”
খাদীজার মৃত্যুর পরও রাসূল তাঁর প্রতি কেমন বিশ্বস্ত ছিলেন তার উদাহরণ টানতে গিয়ে 'আয়িশা বলেন, “যদিও আমি খাদীজাকে দেখিনি, তবুও তাঁর প্রতি আমার যতটা ঈর্ষা হতো ততটা নবিজির আর কোনো স্ত্রীর প্রতি হতো না। নবিজি তাঁর আলোচনা খুব করতেন। প্রায়ই তিনি ছাগল জবাই করে এর বিভিন্ন অংশ পাঠিয়ে দিতেন খাদীজার বান্ধবীদের বাড়িতে।”
খাদীজার প্রতি শ্রদ্ধাবোধ তাঁর মৃত্যুর পরও নবি মুহাম্মাদ অব্যাহত রেখেছিলেন। নবিজি মাদীনায় হিজরাত করে যাওয়ার পর একদিনের ঘটনা। খাদীজার বোন হালাহ মাক্কা থেকে মাদীনায় এসে রাসূলুল্লাহর সঙ্গে দেখা করার অনুমতি চাইলেন। হালাহর এই অনুমতি চাওয়াটা নবিজিকে খাদীজার কথা মনে করিয়ে দেয়। 'আয়িশা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “খাদীজার বোন হালাহ বিন্ত খুওয়াইলিদ (একদা) নবিজির সঙ্গে সাক্ষাৎ করার জন্য অনুমতি চান। এতে রাসূল খাদীজার অনুমতি চাওয়ার কথা মনে করে পুলকিত হন।” খাদীজাকে বিয়ে করার পর যেসব নারী খাদীজার সঙ্গে দেখা করতে আসতেন, খাদীজার মৃত্যুর পর, তাদেরকেও রাসূল উষ্ণ অভিবাদন জানাতেন এবং আপ্যায়ন করতেন সম্মানের সঙ্গে।
টিকাঃ
২৫১. সহীহ মুসলিম, সাহাবিদের মর্যাদার অধ্যায়, হাদীস নং ২৪৩২, পৃ. ১৮৮৭।
২৫২. সহীহ বুখারি, অধ্যায়: আনসারদের গুণাবলি, ৭/১৩২, হাদীস নং ৩৮১৮।
২৫৩. সহীহ মুসলিম, অধ্যায়: সাহাবিদের মর্যাদা, পৃ. ১৮৮৯, হাদীস নং ২৪৩৭।
২৫৪. দেখুন: আল-হুমাইদি, আত-তারীখ আল-ইসলামি ১/৭১।
📄 যুগে যুগে নবি-রাসূলদের প্রতি মিথ্যারোপ
ওয়ারাকা বলেন, “হায়! আমি যদি যুবক থাকতাম সে সময়। হায়! যখন তোমার জাতি তোমাকে বের করে দেবে, সে সময় আমি যদি জীবিত থাকতাম!” এ কথা শুনে রাসূল বলে উঠলেন, “তারা কি আমাকে বের করে দেবে?” ওয়ারাকা উত্তর করলেন, “হ্যাঁ, তুমি যা নিয়ে এসেছ, তোমার মতো এরূপ যারাই তা নিয়ে এসেছেন তাদের সঙ্গেই শত্রুতা করা হয়েছে। আমি যদি তোমার ওইদিন পাই, তবে তোমাকে প্রাণপণে সাহায্য করব।”
বিভিন্ন জাতি আল্লাহর পথের আহ্বানকারীদের সঙ্গে যেরূপ খারাপ আচরণ করত, তাদেরকে মিথ্যুক বলত, বের করে দিত আপন দেশ থেকে—তারই একটি সচিত্র প্রমাণ উপরের হাদীসটি। যেমন: আল্লাহ তা'আলা লূত জাতি সম্পর্কে বলেন, "উত্তরে তার সম্প্রদায় শুধু বলল, ‘তোমরা লুত-পরিবারকে তোমাদের জনপদ থেকে বের করে দাও। এরা তো এমন লোক যারা নিজেদেরকে বড় পবিত্র রাখতে চায়।’" নবি শু'আইবের জাতি যেমনটি বলেছিল, আল্লাহ বলেন, "তার সম্প্রদায়ের দাম্ভিক প্রধানেরা বলল, ‘হে শু'আইব! আমরা তোমাকে ও তোমার সঙ্গে যারা ঈমান এনেছে তাদেরকে আমাদের গ্রাম থেকে অবশ্যই বের করে দেবো; অথবা তোমরা আমাদের পথে ফিরে আসবে।’" আল্লাহ আরও বলেন, “কাফিররা ওদের রাসূলদেরকে বলেছিল, ‘আমরা আমাদের দেশ থেকে তোমাদেরকে অবশ্যই তাড়িয়ে দেবো, অথবা তোমরা আমাদের ধর্মেই ফিরে আসবে।’ তারপর রাসূলদের কাছে তাদের রব ওয়াহি পাঠালেন, ‘আমি জালিমদেরকে অবশ্যই ধ্বংস করব’।”
টিকাঃ
২৫৫. সহীহ বুখারি, অধ্যায়: ওয়াহির সূচনা, হাদীস নং ৩; সহীহ মুসলিমেও হাদীসটির বর্ণনা রয়েছে; অধ্যায়: ঈমান, ২/১৯৭-২০৪, হাদীস নং ১৬০।
📄 ‘এবং ওয়াহির আগমন কিছু সময় বন্ধ রইল’
নবীন-প্রবীণ সব সীরাত-বিশেষজ্ঞগণই তাদের সীরাতের বইয়ে ওয়াহির বিরতিকাল নিয়ে আলোচনা করেছেন। হাফিজ ইবনু হাজার বলেন, “ওয়াহির বিরতিকাল অর্থ হচ্ছে, কিছুদিন ওয়াহি আগমনের ধারা বন্ধ ছিল। এর পেছনের কারণ হলো, প্রথমবার ওয়াহির সূচনায় রাসূল যে ভয় পেয়েছিলেন, তা যেন দূর হয় এবং তাঁর মনে যাতে ওয়াহি আবার কবে আসবে এমন আকাঙ্ক্ষা জাগ্রত হয়।”
সাহাবি জাবির ইবনু 'আবদুল্লাহ আল-আনসারি থেকে বর্ণিত, তিনি ওয়াহির বিরতিকালের বিষয়ে রাসূল থেকে বর্ণনা করেন যে, রাসূল বলেন, “তখন আমি হাঁটছিলাম। এমন সময় আকাশ থেকে একটি আওয়াজ শুনতে পেয়ে উপরের দিকে তাকাই আমি। দেখি, হেরা গুহায় আমার কাছে যে ফেরেশতা এসেছিলেন, তিনি আকাশ জমিন বিস্তৃত একটা আসনে বসে আছেন। আমি তো তাঁকে দেখেই ভয় পেয়ে যাই। তারপর ফিরে আসি এবং বলি, 'আমাকে চাদরাবৃত করো।' তখন আল্লাহ অবতীর্ণ করেন এই আয়াতগুলো। আল্লাহ বলেন, “হে বস্ত্রাচ্ছাদিত! ওঠো, আর সতর্ক করো। এবং তোমার রবের শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা করো। তোমার পোশাক পবিত্র রাখো। অপবিত্রতা (পৌত্তলিকতা) পরিহার করো।” রাসূল বলেন, “অতঃপর ওয়াহি তীব্রতর হলো এবং ধারাবাহিকভাবে আবার নাযিল হতে লাগল।”
শফিউর রহমান মুবারকপুরি বলেন, “ওয়াহির বিরতিকালের সময় নিয়ে অনেকগুলো মত রয়েছে। বিশুদ্ধ মত হলো, সময়টা ছিল হাতে গোনা কয়েকদিন মাত্র। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট যে, রাসূল এ সময়টাতে খুবই অস্থির থাকতেন। তিনি যতবার পাহাড়ে যেতেন ততবারই জিব্রীল তাঁর সামনে আত্মপ্রকাশ করতেন। তাঁকে সুসংবাদ শোনাতেন যে, তিনি আল্লাহর রাসূল।
টিকাঃ
২৫৬. ফাতহুল-বারি, ১/৩৬।
২৫৭. সহীহ বুখারি, ওয়াহির সূচনা, হাদীস নং: ৪।
২৫৮. দেখুন: আর-রাহীকুল-মাখতুম, পৃ. ৭৯, ৮০।
২৫৯. দেখুন: আস-সুহাইলি, আর-রওদুল-উনুফু, ২/৪৩৩, ৪৩৪।