📘 রউফুর রহীম 📄 ওয়াহির অবতরণ

📄 ওয়াহির অবতরণ


অবশেষে, প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে, নবিজির নিকট সত্য এসে পৌঁছল। ফেরেশতা জিব্রীল তাঁর নিকট এসে তাঁকে বললেন, 'পড়ুন।' রাসূল বলেন, “আমি বললাম, আমি তো পড়তে জানি না।' তিনি আমাকে তৃতীয়বারের মতো ধরে জোর করে চেপে ধরলেন। এরপর আমাকে ছেড়ে দিলেন এবং বললেন, 'পড়ো তোমার রবের নাম নিয়ে, যিনি সৃষ্টি করেছেন। সৃষ্টি করেছেন মানুষকে 'আলাক থেকে। পড়ো, তোমার রব তো মহামহিমান্বিত। যিনি কলমের সাহায্যে শিক্ষা দিয়েছেন। শিক্ষা দিয়েছেন মানুষকে যা সে জানত না'।”

এই আয়াতগুলোই মহিমান্বিত কুরআনের নাযিলকৃত প্রথম আয়াত। এখানে মানুষ সৃষ্টির রহস্য নিয়ে আলোচনা হয়েছে। বলা হয়েছে, আল্লাহ মানুষকে জামাটবাঁধা রক্ত থেকে সৃষ্টি করেছেন। মানুষ যা জানত না আল্লাহ তাকে তা শিক্ষা দিয়েছেন—আল্লাহর অপার এই করুণার কথাও এখানে আলোচিত হয়েছে; জ্ঞানের মাধ্যমে আল্লাহ মানুষকে সম্মানিত করেছেন, মর্যাদা দিয়েছেন। এই জ্ঞানের কারণেই ফেরেশতাদের মধ্যে প্রথম মানব আদম বিশেষ সম্মান লাভ করেছিলেন। জ্ঞান কখনো বিবেকের দুয়ারে কড়া নাড়ে, কখনো সে অনূদিত হয় মানবের বাচনভঙ্গিতে, আবার কখনো সে নিজেকে সজ্জিত করে কলমের ডগায়।

নবিজির নুবুওয়াতের সূচনা ঘটে এই আয়াতগুলো নাযিলের মধ্য দিয়ে। ওয়াহি নাযিলের ঘটনাটি ছিল নিঃসন্দেহে এক মহান ঘটনা। শহিদ সাইয়্যিদ কুতুব তাঁর বিখ্যাত তাফসীরগ্রন্থ 'ফী যিলালিল কুরআন'-এ ওয়াহি নাযিলের ঘটনাকে এভাবে তুলে ধরেন— “ওয়াহি নাযিলের এই ঘটনা প্রকৃত প্রস্তাবেই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি ঘটনা এবং নিঃসন্দেহে খুবই বিশাল ঘটনা; এর বিশালতার কোনো সীমা-পরিসীমা নেই। আজকের এই দিনে, এই সময়ে আমরা এই বিশালতার কিছু অংশকেও যদি আয়ত্তে আনতে চাই তা সম্ভব না, কিছুতেই না। আমাদের কল্পনা শক্তি তার ধারে কাছেও পৌঁছতে সক্ষম হবে না। ঘটনাটির গুরুত্ব বোঝার জন্য অনেক প্রচেষ্টাই হয়েছে, কিন্তু সেগুলো এর প্রয়োজনের তুলনায় নিতান্তই কম। ওই ঘটনার মধ্যে এমন অনেক বিষয়ই আছে যা আজও আমাদের দৃষ্টির আড়ালে রয়ে গেছে। বাড়াবাড়ি না করেও বলা যায়, ওয়াহি নাযিলের ঘটনার গুরুত্ব ও তাৎপর্য মানব ইতিহাসে এত বেশি যে, এর সঙ্গে অন্যকিছুর তুলনাই চলতে পারে না।

এখন প্রশ্ন হলো, এই সময়ে এই ঘটনাটি ঘটার পেছনে রহস্য কী? এর প্রকৃত রহস্য হলো, আল্লাহ তা'আলা তাঁর শক্তি ও ক্ষমতাসহ বর্তমান আছেন। তিনি যা ইচ্ছা তা-ই করতে পারেন। তিনি বিশ্ব-জগতের মালিক। সর্বত্র কেবল তাঁরই আধিপত্য। সম্ভ্রম, বড়ত্ব ও শ্রেষ্ঠত্বের মালিক আর কেউ না, শুধু তিনিই। তিনি বড় দয়া করে তাঁর সৃষ্টির ক্ষুদ্র এক জীব মানুষকে দয়া করলেন। অথচ এই মানুষের বসবাস মহাশূন্যের 'পৃথিবী' নামক এমন এক গ্রহে যা প্রায় দেখাই যায় না। আল্লাহ তা'আলা তাঁর এই সৃষ্টিকে সম্মানিত করলেন; তাদেরই মধ্য থেকে একজনকে বাছাই করে তাকে তাঁর হিদায়াতের নূর দিলেন, বানালেন তাঁকে ওয়াহি ধারণ করার পাত্র। আল্লাহ তাঁর এই নগণ্য সৃষ্টিকে কাঙ্ক্ষিত সম্মান পাওয়ার যোগ্য বানালেন।

কলমের প্রয়োজনীয়তা, জাতি গঠনে জ্ঞানের গুরুত্বের অপরিসীমতা বোঝানোই প্রথম ওয়াহির মূল প্রতিপাদ্য। এখানে আরেকটি ইঙ্গিতও পাওয়া যায়, মানুষদেরকে বিশেষায়িত করার মাপকাঠি হওয়া উচিত জ্ঞান; জ্ঞানের ভিত্তিতেই তিনি নিরূপিত হবেন।

এই ঘটনার মধ্য দিয়ে ইসলাম জ্ঞানের মর্যাদাকে সুপ্রতিষ্ঠিত করেছে; রাসূলুল্লাহর নিকট পৌঁছানো প্রথম কালিমাটি, প্রথম শব্দটি ছিল 'পড়ো' এমন আদেশ-সংবলিত। আল্লাহ বলেন, "পড়ো তোমার রবের নাম নিয়ে, যিনি সৃষ্টি করেছেন।” ইসলাম যতদিন থাকবে ততদিন জ্ঞান আহরণে, বিদ্যা অর্জনে সে অনুপ্রাণিত করেই যাবে। অন্যকিছু নয়, ইসলামই প্রথম জ্ঞানীর কদর করেছে। অন্যদের থেকে জ্ঞানীকে করেছে অনন্য বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত। কল্যাণকর জ্ঞানের একমাত্র উৎস আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা; তিনি মানুষকে কলমের সাহায্যে শিখিয়েছেন। মানুষকে শিখিয়েছেন এমন বিষয় যা সে জানত না। মানুষ যখন তার জ্ঞানের উৎসমূল থেকে দূরে সরে পড়ে, দূরতম সম্পর্কও না রেখে অন্য জ্ঞান অন্বেষণে ঝুঁকবে, সে জ্ঞান তার সত্যিকার কোনো উপকার সাধন করবে না, বরং সেটা তার বিনাশের কারণও হতে পারে।

জিব্রীল পড়ার জন্য বারবার তাগাদা দিচ্ছিলেন নবিজিকে; তাঁকে ধরে একের পর এক চাপ দিচ্ছিলেন; এতে রাসূলুল্লাহর কষ্টের তীব্রতা চরমে পৌঁছে। তিনি ক্লান্ত ও দুর্বল হয়ে পড়েন। এরপর থেকে তিনি যখনই ওয়াহি গ্রহণ করতেন, প্রচণ্ড চাপ, ক্লান্তি ও ভার অনুভব করতেন। যেমন আল্লাহ বলেন, “আমরা তোমার ওপর এক ভারী (গুরুত্বপূর্ণ) বাণী অবতীর্ণ করব।”

ওয়াহির বাণী গ্রহণে নবিজির এমন কষ্ট হওয়ার পেছনে, নিশ্চিত, বড় ধরনের কোনো প্রজ্ঞা লুক্কায়িত আছে। হতে পারে, দীন-ইসলামের গুরুত্ব ও মাহাত্ম্য বর্ণনাই এর উদ্দেশ্য। আবার এমনও হতে পারে, মুসলিম উম্মাহকে এ কথা জানানো যে, যে দীন দিয়ে তাদেরকে অনুগ্রহ করা হয়েছে, যে দীনের পরিচয়ে তারা আজ মুসলিম, সেই দীন এমনি এমনি আসেনি; বরং অনেক কষ্ট ও ত্যাগ স্বীকারের পর এ দীন আমাদের কাছে এসেছে।

ওয়াহির আগমন, নিশ্চয়ই, এমন এক মু'জিযা, এমন এক অলৌকিক ঘটনা, প্রচলিত রীতিনীতির সঙ্গে যার মিল খুঁজে পাওয়া যাবে না। রাসূল আল্লাহর বাণী কুরআন পেয়েছেন জিব্রীলের মাধ্যমে। এ কথা বলার কোনো সুযোগ নেই যে, তিনি ওয়াহি পেয়েছেন মনের কোণে উঁকি দেওয়া কোনো ভাবনা থেকে। বরং ওয়াহির আগমন বাতিনি কোনো ধারায় নয়, বরং এর আগমন হয়েছে সম্পূর্ণ বাহ্যিকরূপে। এই ওয়াহি তথা কুরআনের ব্যাখ্যা বা তাফসীর প্রকাশ পেয়েছে নবিজির কথায়; তাঁর অগণিত হাদীসের পরতে।

ওয়াহির প্রকৃতির ওপরই দাঁড়িয়ে আছে দীনের যাবতীয় বিধি-বিধান, আকীদা-বিশ্বাস, আইন-কানুন ও আচার-আচরণ। এই কারণেই প্রাচ্যবিদ ও তাদের তাঁবেদার নাস্তিকরা ওয়াহির প্রকৃতিকে আঘাত করতে, তাদের সন্দেহের তির ওয়াহির গায়ে বিদ্ধ করতে চেষ্টার কোনো ত্রুটি রাখেনি। কিন্তু বাস্তবতা কী বলছে দেখুন: রাসূল অন্যদিনের মতো সেদিনও ছিলেন হেরা গুহায়। আচমকা তাঁর সামনে ফেরেশতা জিব্রীল এসে হাজির। রাসূল তাঁকে নিজ চোখেই সম্মুখে দাঁড়ানো দেখেন। দূত তাঁকে বলছিলেন, 'পড়ুন'। ব্যাপারটি আসলে কী বোঝাচ্ছে? এতে প্রমাণিত যে, ওয়াহির আগমন কোনোভাবেই রাসূলুল্লাহর মনের কোণে উঁকি দেওয়া কোনো বিষয় ছিল না। এটা বাতিনিভাবে ঘটেছে এমনও নয়। বরং বস্তুগতভাবেই জিব্রীল তাঁকে জোরে চেপে ধরেছিলেন। চাপের চোটে তিনি কষ্টের চরম সীমায় গিয়ে পৌঁছেন। এই চেপে ধরা, তার ফলে নবিজির কষ্ট হওয়া এবং জিব্রীলের তাঁকে পড়তে বলা—সবকিছুই ওয়াহির আগমন বাহ্যিকভাবে হওয়ার জোর তাগিদ প্রমাণ করে।

রাসূলুল্লাহর প্রতিক্রিয়া তখন কেমন? যা দেখলেন এবং যা শুনলেন তাতে প্রচণ্ড ভয় পান তিনি। এতে প্রমাণিত, ভার বহন করতে হবে এবং মানুষের কাছে সেই বার্তা পৌঁছাতেও হবে—এমন রিসালাতের জন্য তিনি উৎসুক ছিলেন না।

ওয়াহি আগমনের প্রেক্ষাপট, এর গতি-প্রকৃতি সূক্ষ্মভাবে পর্যালোচনা করলে সন্দেহকারীর কোনো আপত্তিই ধোপে টিকবে না। বিশেষ করে সাইয়্যিদা 'আয়িশা থেকে বর্ণিত সহীহ হাদীসটির সামনে কোনোভাবেই তারা দাঁড়াতে পারবে না। ড. আল-বৃতী ওয়াহির প্রকৃতি-সংশ্লিষ্ট নিচের চারটি দিক তুলে ধরেছেন:

* কুরআন ও হাদীসের মধ্যকার পার্থক্য খুবই স্পষ্ট; কুরআন অবতীর্ণ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে একে লিখে ফেলার আদেশ ছিল। অপরদিকে, হাদীস লেখার জন্য কোনো তাগিদ ছিল না। তবে কুরআন হলো তা-ই যার প্রতিটি অক্ষর এবং প্রতিটি বাক্য আল্লাহর কাছ থেকে জিব্রীলের মাধ্যমে নবিজির নিকট প্রত্যাদেশ করা হয়। কিন্তু হাদীসের ব্যাপারটি এ রকম নয়; এর অর্থ আল্লাহর পক্ষ থেকে, আর কথাগুলো নবিজির মুখনিঃসৃত।

* নবিজিকে অনেক সময় এমন অনেক বিষয়ে প্রশ্ন করা হতো যার উত্তর তিনি জানতেন না। কখনো কখনো তিনি উত্তর না দিয়েই অনেকদিন চুপ থাকতেন। অপেক্ষা করতেন, কখন এ সম্পর্কে অবতীর্ণ হবে কুরআনের আয়াত।

* আবার কখনো কখনো রাসূল হয়তো কিছু বিষয়ে একটা নির্ধারিত পন্থা অবলম্বন করতেন। তারপর দেখা গেল সংশ্লিষ্ট বিষয়টি নিয়ে কুরআনের আয়াত নাযিল হলো, যেখানে তাঁকে সে পন্থাটি পরিত্যাগ করতে বলা হতো।

* রাসূল ছিলেন একজন নিরক্ষর মানুষ। নবি ইউসুফের কাহিনি, নবি মূসার মা মূসাকে সাগরে নিক্ষেপ করার কাহিনি এবং ফিরাউনের কাহিনি একজন নিরক্ষর মানুষের পক্ষে জানা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। এগুলো জানা সম্ভব হতে পারে কেবল ওয়াহির মাধ্যমে।

জীবনের ৪০ বছর পর্যন্ত রাসূল তাঁর জাতির নিকট সততার এক উজ্জ্বল প্রতীক ছিলেন। তাই যখন নবিজি হেরা গুহার অভিজ্ঞতা ব্যক্ত করলেন, তিনি উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন যে, নতুন যে অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন তার সত্যতার ব্যাপারে সন্দেহের বিন্দুমাত্র কোনো অবকাশ নেই। বর্ণিত আছে যে, সূরা ইউনুসের ৯৪ নং আয়াতটি অবতীর্ণ হওয়ার পর রাসূল বলেছিলেন, “আমি সন্দেহ পোষণ করব না এবং আমি জিজ্ঞেসও করব না।”

টিকাঃ
২২৩. দেখুন: তাফসীর ইবনু কাসীর, ৪/৫২৮।
২২৪. ফি যিলালিল-কুরআন, ৬/৩৯৩৬, ৩৯৩৭।
২২৫. দেখুন: আবু শুহবাহ, আস-সীরাহ আন-নাবাওয়িয়া, ১/২৬০।
২২৬. ড. ইয়াহয়া আল-ইয়াহয়া, আল-ওয়াহয়ু ওয়া তাবলীগুর-রিসালা, পৃ. ৩৪।
২২৭. প্রাগুক্ত, পৃ. ৩০, ৩১।
২২৮. দেখুন: আল-উমরি, আস-সীরাহ আন-নাবাওয়িয়া আস-সহীহা, ১/১২৯।
২২৯. দেখুন: আল-বুতি, ফিকহুস-সীরাহ আন-নাবাওয়িয়া, পৃ. ৬৪।
২৩০. প্রাগুক্ত, পৃ. ৬৪।
২৩১. কতাদাহর সনদে তবারি হাদীসটি বর্ণনা করেছেন (১৫/২০২-১৭৮৯৪), তাফসীরে কুরতুবিতেও হাদীসটি বর্ণিত হয়েছে (৮/৩৪০)।

📘 রউফুর রহীম 📄 ওয়াহি অবতীর্ণের বিভিন্ন পদ্ধতি

📄 ওয়াহি অবতীর্ণের বিভিন্ন পদ্ধতি


ওয়াহি অবতীর্ণের বিভিন্ন পদ্ধতির আলোচনা করতে গিয়ে ইবনুল-কাইয়্যিম ৬ প্রকারের কথা উল্লেখ করেন। যথা:

১. সত্যস্বপ্ন: সত্যস্বপ্ন দেখার মাধ্যমে রাসূলুল্লাহর নিকট ওয়াহি অবতীর্ণের সূত্রপাত। উদ্ভাসিত প্রভাতের মতো স্পষ্ট হয়ে তাঁর কাছে স্বপ্ন ধরা দিত। হাদীসে এসেছে, “নবিদের স্বপ্ন ওয়াহি।”

২. ইলহাম বা অনুপ্রেরণা: ইলহাম পদ্ধতিতে ওয়াহি অবতীর্ণের ধারাটি ছিল এ রকম: রাসূলুল্লাহর অন্তরে ফেরেশতা ওয়াহি এমনভাবে ফুঁকে দিতেন যে, তিনি ফেরেশতাকে দেখতে পেতেন না। যেমন: রাসূল বলেন, “রুহুল-কুদুস (জিব্রীল) আমার অন্তরে সেটা ফুঁকে দিতেন। নিশ্চয়, নিজের পাওনা, নিজের রিজিক পূর্ণ করা ছাড়া কোনো ব্যক্তিই মারা যাবে না।”

৩. ঘণ্টাধ্বনির মতো ওয়াহির আগমন: এ পদ্ধতিতে ওয়াহি আগমনের সময় প্রচণ্ড শব্দে ঘণ্টাধ্বনির মতো বাজতে থাকত। যত প্রকারে, যতভাবে ওয়াহি আসত তার মধ্যে এ পদ্ধতিতে ওয়াহি আগমনের সময় রাসূলুল্লাহর সবচেয়ে বেশি কষ্ট হতো। উম্মুল-মু'মিনীন 'আয়িশার হাদীসে যেমনটি এসেছে, রাসূল বলেন, “কখনো ঘণ্টার শব্দের মতো আমার কাছে আসে। তবে এটা আমার জন্য সবচেয়ে কষ্টদায়ক। আবার কখনো কখনো ফেরেশতা মানুষের অবয়বে আমার কাছে আসে এবং কথা বলে আমার সঙ্গে।”

৪. ফেরেশতাদের কোনো রকম মধ্যস্থতা ছাড়াই নবিজির কাছে আল্লাহ সরাসরি ওয়াহি করেন: এ পদ্ধতির প্রকৃষ্ট উদাহরণ হলো, নবি মূসার সঙ্গে আল্লাহ কথা বলেছেন। আর নবিজির কাছে এ পদ্ধতিতে ওয়াহির আগমন ইসরার ঘটনায় প্রমাণিত।

৫. নিজ আকৃতিতে জিব্রীলের অবতরণ: এ পদ্ধতিতে আল্লাহ যা চেয়েছেন তা নবির কাছে ওয়াহি করেছেন। জিব্রীলকে যে আকৃতিতে সৃষ্টি করা হয়েছে সে আসল রূপে নবি তাকে দুইবার দেখেছেন। প্রথমবার দেখেছেন হেরা গুহায়, দ্বিতীয়বার দেখেন ইস্রার ঘটনার রাতে।

৬. মানুষের আকৃতিতে জিব্রীলের আগমন: এ পদ্ধতিতে ওয়াহি অবতীর্ণের ঘটনায় কখনো কখনো সাহাবিরা জিব্রীলকে মানুষের আকৃতিতে দেখেন। যেমন: এক ঘটনায় জিব্রীল রাসূলুল্লাহর কাছে আসেন বেদুইনের বেশ ধরে।

রাসূলুল্লাহর ওপর ওয়াহি অবতীর্ণ হওয়ার ঘটনা নিঃসন্দেহে এক নবযুগের সূচনা করে মানবজাতির জীবনে। নবি 'ঈসার পর অনেক দিন ওয়াহি আসা বন্ধ ছিল। ওয়াহি আসার প্রক্রিয়াটি রাসূলুল্লাহর জন্য খুবই কষ্টের ছিল। তাঁর হাদীস থেকেই এটা প্রমাণিত। অথচ আমরা জানি, তিনি ছিলেন তাঁর জাতির মধ্যে সবচেয়ে সাহসী ও দৃঢ় মনোবলের অধিকারী একজন মানুষ। ওয়াহির দায়িত্ব অনেক বড়। প্রথম ওয়াহি অবতীর্ণের ঘটনাটি নবিজির জন্য ছিল ভীতিকর একটা অবস্থা।

নবিজির ওপর ওয়াহি অবতীর্ণের তীব্রতার বর্ণনা বুখারি ও মুসলিম, হাদীসের বিশুদ্ধ এই দুইটি কিতাবেই বর্ণিত হয়েছে। ইমাম বুখারি ও ইমাম মুসলিম 'আয়িশা থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেন, “আমি একবার তাঁর (রাসূল) ওপর প্রচণ্ড শীতের দিনে ওয়াহি নাযিল হতে দেখেছিলাম। ওয়াহি নাযিল শেষ হওয়ার পর দেখলাম, তাঁর কপাল থেকে বিন্দু বিন্দু ঘাম ঝরছে।” অন্য একটি বর্ণনায়, 'উবাদা ইবনু সামিত বলেন, “রাসূলুল্লাহর ওপর যখন ওয়াহি নাযিল হতো, তখন তাঁর নিদারুণ যন্ত্রণা হতো। তাঁর চেহারার রং পরিবর্তন হয়ে সাদা থেকে কালো রং ধারণ করত।”

টিকাঃ
২৩২. যাদুল-মা'আদ (১/৭৮), মু'আস্সাসাতুর-রিসালা। হাদীসটিকে সহীহ বলে স্বীকৃত।
২৩৩. প্রাগুক্ত, যাদুল-মা'আদ (১/৭৯)।
২৩৪. সহীহ বুখারি, ওয়াহির সূচনা অধ্যায়, হাদীস নং ২।
২৩৫. দেখুন: উসামাহ 'আবদুল-কাদির, আর-রু'আ ওয়াল-আহলাম ফিন-নুসূসিশ-শার'য়িয়‍্যাহ, পৃ. ১০৮।
২৩৬. দেখুন: যাদুল-মা'আদ, ১/৩৩, ৩৪।
২৩৭. দেখুন: আল-হুমাইদি, আত-তারীখ আল-ইসলামি: মাওয়াকিফ ওয়া 'ইবার, ১/৬০।
২৩৮. সহীহ বুখারি, ওয়াহির সূচনা অধ্যায়, হাদীস নং ২; মুসলিম, কিতাবুল-ফাদাইল, হাদীস নং ২৩৩৩।
২৩৯. মুসলিম, কিতাবুল-ফাদাইল, হাদীস নং ২৩৩৪।

📘 রউফুর রহীম 📄 দা‘ওয়াতের ক্ষেত্রে একজন সৎ স্ত্রীর ভূমিকা

📄 দা‘ওয়াতের ক্ষেত্রে একজন সৎ স্ত্রীর ভূমিকা


নবিজির বুক ধড়ফড় করছিল, তিনি ওই অবস্থাতেই ওয়াহির বাণীগুলো নিয়ে খাদীজা বিন্ত খুওয়াইলিদের কাছে এসে তিনি বললেন, 'ঢেকে দাও আমাকে, তোমরা ঢেকে দাও আমাকে।' তারা তাঁর গায়ে চাদর জড়িয়ে দেন। এতে তাঁর ভয় কেটে যায়। তিনি খাদীজাকে, গুহায় যা যা ঘটেছে, সবকিছু জানিয়ে বললেন, 'আমার প্রাণের ভয় হচ্ছে।' খাদীজা তাঁকে বললেন, 'না, অবশ্যই না। আল্লাহর কসম, তিনি আপনাকে কখনোই লাঞ্ছিত করবেন না; আপনি তো আত্মীয়তার বন্ধন বজায় রাখেন, দুর্বলের বোঝা বহন করেন; উপার্জনক্ষম করেন নিঃস্বকে; আহার দেন অতিথিকে। বিপদ-বিপর্যয়ের সময় মানুষের পাশে গিয়ে দাঁড়ান'।

নবি মুহাম্মাদ যখন ওয়াহির সূচনায় ভয় পেয়ে যান, তখন খাদীজা নবিজির পাশে থেকে তাঁর মনোবল বাড়ানোর অসাধারণ এক ভূমিকা পালন করেন। এটি খাদীজার দৃঢ় মনোবলেরই প্রমাণ। ওয়াহি নাযিলের খবর শুনে তাৎক্ষণিক যে ভূমিকা খাদীজা নিলেন তা তাঁর জ্ঞান ও প্রজ্ঞার গভীরতা ও ব্যাপকতার ইঙ্গিতবাহী। তখনই তিনি বুঝে ফেলেন যে, চারিত্রিক সৌন্দর্যের সুষমায় সুষমিত এমন ব্যক্তিকে আল্লাহ কখনো লাঞ্ছিত করবেন না।

উম্মুল-মু'মিনীন সাইয়্যিদা খাদীজা ঈমানের ডাকে সাড়া দেন সবার আগে। তিনি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করতেন যে, তাঁর স্বামীর মধ্যে উত্তম গুণের সমাবেশ ঘটেছে। নবিজির নুবুওয়াতের সূচনা হয়েছে, তিনি এখন একজন নবি—বিষয়টি প্রমাণের জন্য নবিজির চারিত্রিক গুণাবলিই যথেষ্ট। তারপরও খাদীজা কিন্তু এখানেই ক্ষান্ত দেননি, বরং রাসূলুল্লাহকে নিয়ে ছুটে যান ওয়ারাকা ইবনু নাওফালের কাছে। ওয়ারাকার কথায় নবিজির মনোবল চাঙা হয়ে ওঠে। নবিজির রিসালাতকে সত্য বলে স্বীকার করেছেন ওয়ারাকা ইবনু নাওফাল। ওয়ারাকা একজন জান্নাতবাসী—রাসূল এমন সাক্ষ্য দিয়েছেন পরবর্তী সময়ে।

নবিজির জীবনে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন খাদীজা। দয়া, সহনশীলতা, প্রজ্ঞা ও বুদ্ধিমত্তায় ছিলেন অতুলনীয়। খাদীজার মতো এমন একজন বিদুষী নারীকে বিয়ে করার তাওফীক দেন আল্লাহ তা'আলা তাঁর রাসূলকে। কারণ নবি মুহাম্মাদ বিশ্ববাসীর জন্য অনুকরণীয় আদর্শ এবং বিশেষ করে তাঁর মতো একজন দা'ঈর জন্য উম্মু খাদীজার মতো এমন স্ত্রীর প্রয়োজনীয়তা প্রশ্নাতীত। খাদীজা অনিন্দ্যসুন্দর এক আদর্শের নাম; আল্লাহর পথের একজন দা'ঈর স্ত্রী হিসেবে যে যে ভালো গুণ থাকা দরকার তার সবই তার চরিত্রে ছিল পুরোমাত্রায়।

দা'ঈরাই পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি নিপীড়িত। আপন ঘরবাড়ি থেকে বিতাড়নসহ তাদেরকে দেশ থেকে নির্বাসনে পাঠিয়ে দেওয়ার ভূরি ভূরি নজির আছে। এই দায়িত্ব পালনের শর্তই হলো, এর পেছনে ব্যয় করতে হবে অনেক সময়। এতে তার খাওয়া ও ঘুমের সময় কমে আসবে। স্ত্রী ও সন্তান-সন্ততি বঞ্চিত হবে তাদের পাওনা অধিকার থেকে। সুতরাং দা'ঈদের জীবনে প্রয়োজন এমন একজন স্ত্রীর, যিনি দা’ওয়াতের আবশ্যকতা ও গুরুত্ব খুব ভালোভাবে উপলব্ধি করতে পারবেন। যদি স্ত্রী ঠিকঠাকভাবে এসব কিছু বুঝতে পারেন, তবেই তিনি স্বামীর পাশে দাঁড়াবেন। দাওয়াতের সফলতার জন্য একজন সৎ স্ত্রীর ভূমিকা অগ্রগণ্য। খাদীজা এমনই একজন সৎ স্ত্রী। রাসূল সত্য বলেছেন, "দুনিয়া হলো ক্ষণিকের ধোঁকা; তবে এর মধ্যে সর্বোত্তম সম্পদ হলো একজন সতীসাধ্বী স্ত্রী।”

টিকাঃ
২৪০. দেখুন: আল-হুমাইদি, আত-তারীখ আল-ইসলামি, ১/৬১।
২৪১. প্রাগুক্ত, ১/৬৪।
২৪২. দেখুন: মুহাম্মাদ সাদিক 'উরজুন, মুহাম্মাদুর-রাসূলুল্লাহ, ১/৩০৭।
২৪৩. প্রাগুক্ত, ১/২৩২।
২৪৪. সীরাত ইবনু হিশাম, ১/১৯১, ১৯২।
২৪৫. আল-মুসতাদ্রক, ২/৬০৯। হাকিম বলেন, “ইমাম বুখারি ও মুসলিমের শর্ত মোতাবেক হাদীসটি সহীহ।"
২৪৬. মাজমা'উয-যাওয়াইদ, ৯/৪১৬।
২৪৭. দেখুন: আল-হুমাইদি, আত-তারীখ আল-ইসলামি, ১/৬৯।
২৪৮. দেখুন: আল-বিলালি, ওয়াকাফাত তারবাওয়িয়াহ মিনাস-সীরাহ আন-নাবাওয়িয়াহ, পৃ. ৪০।
২৪৯. দেখুন: আল-হুমাইদি, আত-তারীখ আল-ইসলামি, ১/৬৮।
২৫০. সহীহ মুসলিম, স্তন্যপান অধ্যায়, হাদীস নং ১৪৬৭, পৃ. ১০৯০।

📘 রউফুর রহীম 📄 খাদীজার প্রতি নবিজির বিশ্বস্ততা

📄 খাদীজার প্রতি নবিজির বিশ্বস্ততা


বিশ্বস্ততা ও পারিবারিক সৌজন্য রক্ষার এক অনুপম আদর্শ ছিলেন নবি মুহাম্মাদ। স্ত্রী খাদীজার বেলায় চূড়ান্ত পর্যায়ের বিশ্বস্ততা রক্ষা করেছেন তিনি। খাদীজার জীবদ্দশায় এবং তাঁর ওফাতের পরও। খাদীজার জীবদ্দশায় রাসূল তাঁকে জান্নাতের সুসংবাদ শোনান। তাঁর কাছে পৌঁছে দেন আল্লাহর সালাম ও ফেরেশতা জিব্রীলের সালাম। সাহাবি আবু হুরাইরা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “রাসূলুল্লাহর কাছে একবার জিব্রীল এসে বলেন, 'হে আল্লাহর রাসূল, ওই যে খাদীজা আপনার কাছে আসছেন। যখন তিনি আপনার নিকট এসে পৌঁছবেন তখন তাঁর রবের সালাম এবং আমার সালাম তাঁকে জানাবেন। এবং জান্নাতে একটি ঘরের সুসংবাদ তাঁকে দেবেন; যেখানে হবে না কোনো শোরগোল, থাকবে না কোনো অবসাদ'।”

খাদীজার মৃত্যুর পরও রাসূল তাঁর প্রতি কেমন বিশ্বস্ত ছিলেন তার উদাহরণ টানতে গিয়ে 'আয়িশা বলেন, “যদিও আমি খাদীজাকে দেখিনি, তবুও তাঁর প্রতি আমার যতটা ঈর্ষা হতো ততটা নবিজির আর কোনো স্ত্রীর প্রতি হতো না। নবিজি তাঁর আলোচনা খুব করতেন। প্রায়ই তিনি ছাগল জবাই করে এর বিভিন্ন অংশ পাঠিয়ে দিতেন খাদীজার বান্ধবীদের বাড়িতে।”

খাদীজার প্রতি শ্রদ্ধাবোধ তাঁর মৃত্যুর পরও নবি মুহাম্মাদ অব্যাহত রেখেছিলেন। নবিজি মাদীনায় হিজরাত করে যাওয়ার পর একদিনের ঘটনা। খাদীজার বোন হালাহ মাক্কা থেকে মাদীনায় এসে রাসূলুল্লাহর সঙ্গে দেখা করার অনুমতি চাইলেন। হালাহর এই অনুমতি চাওয়াটা নবিজিকে খাদীজার কথা মনে করিয়ে দেয়। 'আয়িশা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “খাদীজার বোন হালাহ বিন্ত খুওয়াইলিদ (একদা) নবিজির সঙ্গে সাক্ষাৎ করার জন্য অনুমতি চান। এতে রাসূল খাদীজার অনুমতি চাওয়ার কথা মনে করে পুলকিত হন।” খাদীজাকে বিয়ে করার পর যেসব নারী খাদীজার সঙ্গে দেখা করতে আসতেন, খাদীজার মৃত্যুর পর, তাদেরকেও রাসূল উষ্ণ অভিবাদন জানাতেন এবং আপ্যায়ন করতেন সম্মানের সঙ্গে।

টিকাঃ
২৫১. সহীহ মুসলিম, সাহাবিদের মর্যাদার অধ্যায়, হাদীস নং ২৪৩২, পৃ. ১৮৮৭।
২৫২. সহীহ বুখারি, অধ্যায়: আনসারদের গুণাবলি, ৭/১৩২, হাদীস নং ৩৮১৮।
২৫৩. সহীহ মুসলিম, অধ্যায়: সাহাবিদের মর্যাদা, পৃ. ১৮৮৯, হাদীস নং ২৪৩৭।
২৫৪. দেখুন: আল-হুমাইদি, আত-তারীখ আল-ইসলামি ১/৭১।

ফন্ট সাইজ
15px
17px