📘 রউফুর রহীম 📄 সেসময়কার মানুষদের সাধারণ চিত্র

📄 সেসময়কার মানুষদের সাধারণ চিত্র


প্রফেসর আবুল হাসান আন-নাদওয়ি তদানীন্তন আরব ও অনারবদের অবস্থার সাধারণ চিত্র তুলে ধরতে গিয়ে বলেন:

“খ্রিষ্ট ষষ্ঠ শতকের মাঝামাঝিতে মানুষ বিশৃঙ্খলার এমন এক পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছে যে, কোনো সংস্কারক কিংবা কোনো শিক্ষক যে সেই অবস্থার পরিবর্তন ঘটাবেন তা মনে হচ্ছিল না। বিশ্বাসগত সংস্কার, আচরণগত সংস্কার, 'ইবাদাত কবুল হওয়ার বিষয়ে সংস্কার কিংবা সামাজিক কোনো অসংগতির সংস্কারের মতো হাতেগোনা দু-একটা বিষয় ছিল না; ছিল অগুনতি। সংস্কারের বিষয় এমন দু- একটি হলে সময়ের সংস্কারক ও শিক্ষকগণের পক্ষে সেগুলো শোধরানো হয়তো কোনো ব্যাপার ছিল না।

বরং যুগ যুগ ধরে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মের মাঝে জাহিলিয়্যাত বা মূর্খতার বীজ রোপিত হয়, বিস্তৃত হয় মূর্তিপূজার শেকড়। এই মূর্খতা ও মূর্তিপূজার মূলোৎপাটন করাই ছিল সংস্কারের মূল ক্ষেত্রে। এই মূর্খতার নিচে চাপা পড়ে যায় নবি-রাসূলগণের শিক্ষা, হারিয়ে যায় সংস্কারকগণের কষ্টের ফসল, ভঙ্গুর হয়ে পড়ে মজবুত সামাজিক বন্ধন। সুতরাং এমন পরিস্থিতিতে সংস্কার সাধনে প্রতিষ্ঠা করতে হবে সুদৃঢ় ভিত্তির ওপর সুউচ্চ এক শক্ত কাঠামো। সংকীর্ণ গণ্ডির ভেতরে আবদ্ধ না থেকে পৃথিবীর বিস্তীর্ণ প্রান্তরে বিস্তৃত হবে এই সংস্কার কাজ। কোনো একক জাতিকে নিয়ে সে পড়ে থাকবে না, আপন করে নেবে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাইকে। নতুন এক প্রজন্ম গড়ে তুলবে সংস্কার কাজটি; যারা প্রাচীনদের তুলনায় ভালো কাজে এগিয়ে থাকবে অনন্য এক মাত্রায়। এদেরকে দেখে মনে হবে, কেমন যেন মানুষ নতুন করে জন্ম নিল আবার, কেমন যেন সে নতুন করে গড়ে তুলল তার আবাসন। আল্লাহ বলেন:

“যে ব্যক্তি মৃত ছিল, তারপর আমি যাকে জীবিত করেছি এবং একটি আলো দান করেছি যার সাহায্যে সে মানুষের মধ্যে চলাফেরা করতে পারে, সে কি ওই ব্যক্তির মতো হতে পারে, যে অন্ধকারের মধ্যে আছে এবং সেখান থেকে বের হচ্ছে না? এভাবেই কাফিরদের দৃষ্টিতে তাদের নিজেদের কাজকে শোভন করে দেওয়া হয়েছে।” [সূরা আন'আম, ৬:১২২]

ভ্রান্তির বীজ উৎপাটন, প্রতিমার শেকড় উপড়ানোই হলো সংস্কার সাধনের প্রধান লক্ষ্য। তবে উপড়ানোর বিষয়টি এমনভাবে করতে হবে যাতে করে তা সমূলে বিনাশ হয়। সঙ্গে সঙ্গে মানুষের মন-মননে গেঁথে দিতে হবে আল্লাহর একত্ববাদ তথা তাওহীদের আকীদা-বিশ্বাস। চূড়ান্ত পর্যায়ে এ বিশ্বাস তাদের মনে বদ্ধমূল করে দিতে হবে। মনে সৃষ্টি করতে হবে আল্লাহর সন্তুষ্টি ও তাঁর 'ইবাদাতের প্রতি ঝোঁক। মানবসেবা ও সত্যকে সাহায্য করার স্পৃহা জাগিয়ে তুলতে হবে তার। সে নিজের খেয়াল-খুশির ওপর আল্লাহর ইচ্ছাকে প্রাধান্য দেবে। দমন করবে নিজের কুপ্রবৃত্তিকে। সকল অপযুদ্ধ ধুয়ে-মুছে সাফ করবে। মোট কথা, সংস্কার কাজটি মানবতার জন্য ধ্বংসাত্মক সকল দিক সামলাবে; যে ধ্বংসাত্মক দিকটি তার সব শক্তি একত্র করেছে দুনিয়া ও আখিরাতকে জাহান্নামে পরিণত করতে। এরপর এটা পরিচালিত হবে এমন এক পথে যার শুরুটা সৌভাগ্য দিয়ে; জ্ঞানী মু'মিনরা যা লাভ করবেন। আর এর শেষ গন্তব্যটা চিরস্থায়ী জান্নাতে; যার প্রতিশ্রুতি আল্লাহ দিয়েছেন কেবল মুত্তাকিদের জন্য। রাসূলুল্লাহকে নবি করে পাঠানোর মাধ্যমে আল্লাহ মানবজাতিকে যে অনুগ্রহ করেছেন তার বর্ণনা কুরআন এভাবে দিচ্ছে, আল্লাহ বলেন:

“তোমরা সবাই আল্লাহর রশিকে শক্ত করে ধরো, পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ো না। তোমাদের প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহ স্মরণ করো। তোমরা পরস্পর শত্রু ছিলে, তারপর তিনি তোমাদের অন্তরে হৃদ্যতা সঞ্চার করেছেন, ফলে তোমরা তাঁর অনুগ্রহে পরস্পর ভাই হয়ে গিয়েছ। তোমরা এক অগ্নিকুণ্ডের প্রান্তে অবস্থান করছিলে, তিনি তোমাদেরকে সেখান থেকে উদ্ধার করেছেন। এভাবেই আল্লাহ তোমাদের জন্য তাঁর নিদর্শনগুলো প্রকাশ করেন, যাতে তোমরা দিকনির্দেশনা পাও।” [সূরা আলু-'ইমরান, ৩:১০৩]” [২০৪]

টিকাঃ
২০৪. আন-নাদওয়ি, আস-সীরাহ আন-নাবাওয়িয়া, পৃ. ৫৮, ৫৯; আল-আসাস ফিস-সুন্নাহ বইয়ের লেখক নাদওয়ি থেকে বর্ণনাটি তার বইয়ে উদ্ধৃত করেন, ১/১৮০, ১৮১।

📘 রউফুর রহীম 📄 নবিজির নুবুওয়াতের নিদর্শন

📄 নবিজির নুবুওয়াতের নিদর্শন


নবিজির নুবুওয়াতের নিদর্শনের সংখ্যা অনেক। এর একটি হলো, নবি হওয়ার পূর্বে হাজরে আসওয়াদকে ঘিরে প্রায় সংঘটিত যাওয়া একটা বিবাদের সুষ্ঠু সমাধান। সাহাবি জাবির ইবনু সামুরাহ থেকে বর্ণিত যে, রাসূল একবার বলেছেন, “নিশ্চয়ই নবি হওয়ার পূর্বে মাক্কার একটা পাথরের কথা আমার জানা আছে। আমাকে (নবি হিসেবে) পাঠানোর আগেই পাথরটিকে (ঘিরে সৃষ্ট বিবাদ মিটানোর ভার) ন্যস্ত করা হয়েছিল আমার কাছে; আমার এখনো মনে আছে।” [২০৫]

রাসূলুল্লাহর নুবুওয়াতের অন্য একটি নিদর্শন হলো—সত্য স্বপ্ন। এই সত্য স্বপ্নের মাধ্যমেই ওয়াহির সূচনা ঘটে। তিনি যে স্বপ্নই দেখতেন সেটা উদ্ভাসিত হতো সকালের আলোর মতো। [২০৬]

নির্জনতা ও ধ্যানমগ্নতা তাঁর কাছে প্রিয় করা হলো। মাক্কা থেকে উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত 'হেরা গুহা' নামক একটি পাহাড়ে তিনি নির্জন সময় কাটাতেন। 'ইবাদাত-বন্দেগি করতেন একনাগাড়ে কয়েক রাত—কখনো দশ রাত, আবার কখনো এক মাস পর্যন্ত তিনি সেখানে কাটিয়ে দিতেন। এরপর তিনি বাড়ি ফিরে আসতেন। সেখানে কাটাতেন অল্পকিছু সময়। আবার নির্জন সময় কাটানোর জন্য নতুন পাথেয় সংগ্রহ করে ফেরত আসতেন হেরা গুহায়। তাঁর কোনো এক নির্জন অবস্থানের সময় ওয়াহি আসার আগপর্যন্ত এভাবেই তিনি হেরা গুহায় নির্জন সময় কাটাতেন। এমনই কোনো এক নির্জনতার মধ্যে এক সময় তাঁর কাছে জিব্রীল ওয়াহি নিয়ে হাজির হন। [২০৭]

টিকাঃ
২০৫. সহীহ মুসলিম, কিতাবুল-ফাদাইল, পরিচ্ছেদ: নবিজির বংশমর্যাদা এবং নবি হওয়ার পূর্বে হাজরের বিষয়টি তাঁর কাছে ন্যস্ত, হাদীস নং ২২৭৭।
২০৬. সহীহ বুখারি, অধ্যায়: ওয়াহির প্রারম্ভ, হাদীস নং ৩।
২০৭. দেখুন: আল-বৃতি, ফিকহুস-সীরাহ আন-নাবাওয়িয়া, পৃ. ৬০。

ফন্ট সাইজ
15px
17px