📘 রউফুর রহীম 📄 নবিজির নুবুওয়াতকে স্বাগত জানানোর জন্য লোকদের প্রস্তুতি

📄 নবিজির নুবুওয়াতকে স্বাগত জানানোর জন্য লোকদের প্রস্তুতি


রাসূলুল্লাহর আগমনের ব্যাপারে নবি-রাসূলগণের সুসংবাদ
নবিজির নুবুওয়াতের বিষয়টি যাতে নতুন কিছু মনে না হয় সেজন্য আল্লাহ তা'আলা চাইলেন মানুষদেরকে বিভিন্নভাবে প্রস্তুত করতে। যেমন:

অন্য কোনো জাতির মধ্য থেকে নয়, আরবদের মধ্য থেকেই একজনকে রাসূল করে পাঠানোর জন্য নবি ইবরাহীম তার রবের নিকট দু'আ করেছিলেন। আল্লাহ তার দু'আ কবুল করেন। তাদের কাছে একজন আরব (মুহাম্মাদ)-কে রাসূল হিসেবে প্রেরণ করেন। আল্লাহ বলেন :
“হে আমাদের রব! তুমি তাদের (আমাদের বংশধরদের) মধ্যে তাদের থেকেই একজন রাসূল পাঠিয়ো, যে তাদেরকে কিতাব ও প্রজ্ঞা শিক্ষা দেবে ও তাদেরকে পরিশুদ্ধ করবে। তুমিই তো পরাক্রমশলী, প্রজ্ঞাময়।” [সূরা বাকারা, ২:১২৯]

কুরআনুল-কারীমে উল্লেখ আছে, আল্লাহ তা'আলা পূর্ববর্তী নবি-রাসূলদের ওপর নাযিলকৃত আসমানি কিতাবে রাসূলুল্লাহর আগমনের সুসংবাদ জানিয়ে দিয়েছিলেন। আল্লাহ বলেন :
“(এরা তো তারাই) যারা সেই রাসূল ও নিরক্ষর নবি (মুহাম্মাদ )-এর অনুসরণ করে, যার কথা তারা তাদের তাওরাত ও ইনজীলে লিখিত পাচ্ছে। সে তাদের জন্য ভালো জিনিসকে বৈধ ও খারাপ জিনিসকে অবৈধ ঘোষণা করে এবং তাদেরকে ভারমুক্ত ও শৃঙ্খলমুক্ত করে। অতএব, যারা তাকে বিশ্বাস, সম্মান ও সাহায্য করে এবং তার সঙ্গে প্রেরিত আলোর অনুসরণ করে তারাই সফলকাম।” [সূরা 'আরাফ, ৭:১৫৭]

নবি 'ঈসা নবিজির আগমনের সুসংবাদ দিয়ে গেছেন। আল্লাহ বলেন,
“(স্মরণ করো) মারইয়ামের পুত্র 'ঈসা বলেছিল, হে বানু ইসরাঈল! আমি তোমাদের কাছে (প্রেরিত) আল্লাহর রাসূল। আমার সামনে যে তাওরাত আছে, আমি তাকে সত্য (কিতাব) বলছি এবং আমার পরে আহমাদ নামের একজন রাসূল আসার সুসংবাদ দিচ্ছি।” [সূরা আস-সফ, ৬১:৬]

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা সব নবি-রাসূলকে তাঁর প্রিয় রাসূলের আগমন- বার্তা আগেই জানিয়ে দেন। এবং তাদেরকে আদেশ করেন যে, তারা যেন তাদের অনুসারীদেরকে নবিজির ওপর ঈমান আনার দা'ওয়াত দিয়ে যান; যদি অনুসারীরা তাদের জীবদ্দশায় নবিজিকে পায়, তবে তারা যেন তাঁর অনুসরণ করে। [১৯১] আল্লাহ বলেন,
“(স্মরণ করো) যখন আল্লাহ নবিদের কাছ থেকে অঙ্গীকার নিয়েছিলেন (আর বলেছিলেন), আমি তোমাদের যে কিতাব ও প্রজ্ঞা দান করেছি তা গ্রহণ করো। অতঃপর তোমাদের কাছে যা আছে তার সমর্থক একজন রাসূল আসবে। তখন অবশ্যই তোমরা তাঁর প্রতি ঈমান আনবে এবং তাকে সাহায্য করবে। তিনি বললেন, তোমরা কি স্বীকার করলে এবং এ ব্যাপারে আমার অঙ্গীকার গ্রহণ করলে? তারা বলল, স্বীকার করলাম। তিনি বললেন, তা হলে তোমরা সাক্ষী থেকো, আর আমিও তোমাদের সাক্ষী থাকলাম।”[সূরা আলু-'ইমরান, ৩:৮১]

বর্তমানে তাওরাত ও ইনজীলের যে কপিগুলো পাওয়া যায় সেগুলো বিকৃত; রাসূলুল্লাহর নাম এগুলো থেকে মুছে দেওয়া হয়েছে। তবে ইসলাম আগমনের পূর্বে আস-সামিরা নামক তাওরাত ও গসপেল অব বারনাবাস নামক কিতাবগুলোতে নবিজির নাম খুঁজে পাওয়া যেত। খ্রিষ্ট পঞ্চম শতকের শেষে এসে গির্জা-শাসন এগুলোর পাঠ নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। বন্ধ করে দেয় এগুলোর প্রচার-প্রসার। সম্প্রতি এর কয়েকটি কপি মৃতসাগর (Dead Sea) অঞ্চলে খুঁজে পাওয়া যায়। গসপেল অব বারনাবাসে নবিজির নাম-সংবলিত বেশ কটি বর্ণনা রয়েছে। যেমন: বইটির ৪১শ (একচত্বারিংশত্তম) সংস্করণের বর্ণনাটি এরকম—
“(২৯) অতঃপর আল্লাহ আড়ালে চলে গেলেন। এবং ফেরেশতা মিখাইল তাদের দুজনকে (আদম ও হাওয়া) ফিরদাউস জান্নাত থেকে বিতাড়ন করেন। (৩০) যখন আদম নজর করলেন তখন দেখলেন যে, দরজার ওপরে লেখা: 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর-রাসূলুল্লাহ'-এই বাক্যটি।” [১৯২]

ইমাম ইবনু তাইমিয়্যা বলেন, “রাসূলুল্লাহর পরিচয় সম্পর্কে আহলে-কিতাবরা তাদের কিতাব থেকে যে তথ্য জানত তা তাদের কাছ থেকে মুতাওয়াতির সূত্রে বর্ণিত হয়েছে।”

“পূর্বের নবি-রাসূলগণ মুহাম্মাদ সম্পর্কে যে সুসংবাদ দিয়েছেন এর জ্ঞানটা বিভিন্নভাবেই জানা যায়:
“প্রথমত, আজকের দিনে আহলে কিতাবদের কাছে তাওরাত ও ইনজীলের যে কিতাবগুলো আছে তার মধ্যে এ জ্ঞান রয়েছে।
“দ্বিতীয়ত, আরও জানা যায়, ওই কিতাবগুলোতে নির্ভরশীল ব্যক্তিদের দেওয়া তথ্য-উপাত্ত থেকে; এদের কেউ কেউ ইসলাম গ্রহণ করেছেন, আর কেউ কেউ গ্রহণ করেননি। বর্ণনাটি আনসারদের থেকে মুতাওয়াতির সূত্রে বর্ণিত। প্রতিবেশী আহলে-কিতাবরাই তাদেরকে মুহাম্মাদ আগমনের সংবাদ জানায়। জানায়- তিনি একদিন আল্লাহর রাসূল হবেন। এ ব্যাপারে তারা পূর্ণ ওয়াকিফহাল; তারা তাঁরই পথপানে চেয়ে অপেক্ষা করছে। নবিজির আগমনের প্রতীক্ষায় আছে আহলে-কিতাবরা—বিষয়টিই আনসারদেরকে ঈমান আনতে উদ্বুদ্ধ করে। তাই যখন রাসূল তাদেরকে ঈমানের পথে আহ্বান করেন; তারা সাথে-সাথেই ইসলাম গ্রহণ করেন এবং নবিজির হাতে আনুগত্যের শপথ নেন।” [১৯৩]

সালামা ইবনু সালামা ইবনু ওয়াশ, বাদর যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী একজন সাহাবি; তিনি বলেন, “আবদুল-আশহাল গোত্রে আমাদের একজন ইহুদি প্রতিবেশী ছিল। রাসূলুল্লাহর নবি হওয়ার আগের ঘটনা। একদিন এই প্রতিবেশী তার ঘর থেকে বের হয়ে ধীরে-সুস্থে ‘আবদুল-আশহাল গোত্রের একটি বৈঠকে এসে বসলেন। আমি সেদিন ওই মাজলিশের সবচেয়ে অল্পবয়স্ক ব্যক্তি ছিলাম। তার গায়ে জড়ানো ছিল একটা চাদর। আমি আমাদের উঠানে শুয়ে ছিলাম। আমার প্রতিবেশী লোকটি সেখানে এসে পুনরুত্থান, কিয়ামাত, হিসাব-নিকাশ, মীযান, জান্নাত-জাহান্নাম ইত্যাদি বিষয়ের আলোচনা পেশ করেন। বৈঠকে বসে যারা তার কথাগুলো শুনছিল তারা ছিল মুশরিক ও মূর্তিপূজারি। তারা বিশ্বাস করত, মৃত্যুর পর উত্থান বলে কোনো কিছুর অস্তিত্বই নেই।

শ্রোতারা তখন সমস্বরে তাকে বলে উঠল, ‘ধিক তোমার জন্য, হে অমুক! তুমি কি আসলেই মনে করো যে, মানুষকে তাদের মৃত্যুর পর আবার উত্থিত করা হবে এমন এক জায়গায় যেখানে জান্নাত-জাহান্নাম বলে কিছু একটা আছে? এবং তুমি কি সত্যিই বিশ্বাস করো যে, সেখানে তাদেরকে তাদের কর্মের প্রতিদান দেওয়া হবে?’ তিনি বললেন, ‘হ্যাঁ, যার নামে কসম করা হয় সে সত্তার কসম, আমি এটা মনে- প্রাণে বিশ্বাস করি।’ এরপর তিনি আরও বলেন, ‘যাকে ওই আগুনে দেওয়া হবে এবং আগুনের প্রথম আঘাত আসার পরই ওই লোকটি আশা করবে যে, ইহজগতেই যদি সে নরকের চেয়েও ভয়াবহ উনুনে দগ্ধ হয়ে পরকালে প্রবেশ করত এবং নরক থেকে পরিত্রাণ পেত!’

তারা বলল, ‘তুমি এসব কী ছাইপাঁশ শোনাচ্ছ? এটা যে ঘটবেই তার কী প্রমাণ?’ তিনি বললেন, ‘একজন নবি, যার আগমন ঘটবে দেশটির এই কোণ থেকে।’—এই বলে তিনি মাক্কা ও ইয়েমেনের দিকে অঙুলি নির্দেশ করেন।

তারা জানতে চাইল, ‘এবং আমরা তাঁর দেখা কবে পাব?’ এই সময় ইহুদি লোকটি আমার দিকে তাকান—সে সময় উপস্থিত লোকদের মধ্যে আমিই সবচেয়ে কমবয়স্ক—এবং বললেন, ‘হয়তো এই কিশোর তার অন্তিম বয়সে সেই নবির সাক্ষাৎ পাবে।’

আল্লাহর কসম! মারা যাওয়ার আগে আমার জীবদ্দশাতেই আল্লাহ তা'আলা তাঁর রাসূলকে প্রেরণ করেন। তিনি আমাদের মাঝে জীবিত ছিলেন। ওই বৈঠকে সেদিন আমরা যারা শ্রোতা ছিলাম, সবাই তাঁর ওপর ঈমান আনি। কিন্তু অবাক ব্যাপার হলো, যে লোকটি আমাদেরকে তাঁর আগমনের সুসংবাদ দিয়েছিল, হিংসা-বিদ্বেষবশত ভ্রষ্টতার কারণে সে তাঁর ওপর ঈমান আনেনি; তাঁকে মেনে নিতে অস্বীকার করে সে। তখন আমরা তাকে বললাম, 'ওহে, তোমার ধ্বংস হোক! তুমিই তো সে ব্যক্তি, যে কিনা আমাদেরকে নবিজির আগমনের বিষয়ে সংবাদ দিয়েছিলে?' সে উত্তর করল, 'হ্যাঁ, অবশ্যই, তবে ইনি সেই লোক নন'।” [১৯৪]

ইমাম ইবনু তাইমিয়্যা (রাহিমাহুল্লাহ) জানান, "আমি যাবুর কিতাবের একটি কপিতে নবিজির নামসহ তাঁর নুবুওয়াতের কথা স্পষ্টভাবে লেখা দেখেছি। কিন্তু আরেকটি কপিতে এর কিছুই দেখিনি।” [১৯৫]

তাওরাতে বিধৃত রাসূলুল্লাহর বৈশিষ্ট্যের কথা বলতে গিয়ে 'আবদুল্লাহ ইবনু 'আমর বলেন, “আল্লাহর কসম! নবিজির যে গুণ-বৈশিষ্ট্য কুরআনে উল্লেখ করা হয়েছে, সেগুলোর কিছু গুণ তাওরাতেও উল্লেখ হয়েছে। যেমন:
“হে নবি! আমি তোমাকে পাঠিয়েছি একজন সাক্ষী, সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারী হিসেবে।” (সূরা আহযাব, ৩৩: ৪৫) (তাওরাতেও গুণগুলোর কথা উল্লেখ আছে, তাছাড়া তাওরাতে বর্ধিতাকারে আরও আছে) মূর্খদের সুরক্ষাকারীরূপেই। তুমি আমার বান্দা ও রাসূল। আমি তোমার নাম রেখেছি মুতাওয়াক্কিল। তুমি না রূঢ়-প্রকৃতির, না কঠোর-হৃদয়ের; আর না হাট-বাজারে চিৎকারকারী। খারাপের প্রতিবাদ খারাপ আচরণ দিয়ে করেন না তিনি; দোষ উপেক্ষা ও ক্ষমা করে দেন বরং। তাঁর মাধ্যমে বক্র জাতিকে সোজা না করা পর্যন্ত আল্লাহ তাঁকে মৃত্যু দিচ্ছেন না। এবং লোকেরা যে পর্যন্ত না বলবে, 'লা ইলাহ ইল্লাল্লাহ' এবং যে পর্যন্ত এই কালিমা দ্বারা তিনি অন্ধ চোখ, বধির কান এবং গাফিল ও অমনোযোগী মন খুলে না দেন।” [১৯৬]

কা'আব আল-আহবার থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, "নিশ্চয়ই আমি তাওরাতে নিচের কথাগুলো লেখা পেয়েছি:
'মুহাম্মাদুর-রাসূলুল্লাহ'-মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল; তিনি অমার্জিত নন, কর্কশও নন। আর না তিনি হাট-বাজারে চিৎকারকারী। তিনি খারাপের বদলা খারাপ আচরণ দিয়ে নেন না; বরং ক্ষমা করে দেন, এড়িয়ে যান তার দোষ-ত্রুটিগুলো। তাঁর উম্মাহ উচ্চপ্রশংসাকারী এক জাতি: জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে তারা আল্লাহর গুণগান গায়, প্রতিটি নড়াচড়ায় আল্লাহর মাহাত্ম্য বর্ণনা করে ('আল্লাহ ‘আল্লাহু আকবার'-এ কথা বলে)। নিজেদের শরীরের অর্ধাংশ পর্যন্ত নিম্নবস্ত্র দিয়ে আবৃত করে নেন তারা এবং উযূ করেন হাত-পায়ের প্রান্তসীমা পর্যন্ত। সালাতের কাতার আর যুদ্ধের সারি তাদের একই; দুটোর মধ্যে কোনো তফাত নেই। তাদের মু'আযযিন আকাশের খোলা অংশে তাদেরকে আহ্বান করেন। এবং গভীর রাতে তারা মৌমাছির গুনগুনানির মতো গুঞ্জরন করেন (শেষরাতে তারা সালাত আদায় এবং কুরআন তিলাওয়াত করেন)। তাঁর (নবিজির) জন্মস্থান মাক্কায়।” হিজরাত করবেন তবায় (মাদীনায়) আর তাঁর রাজত্ব হবে শাম দেশে। [১৯৭]

টিকাঃ
১৯১. দেখুন: রাসূল মুহাম্মাদ -এর ব্যক্তিত্ব: একটি সমীক্ষা, পৃ. ১০১, ১০২।
১৯২. দেখুন: 'উমারি, আস-সীরাহ আন-নাবাওয়িয়া, ১/১১৮।
১৯৩. দেখুন: ইবনু তাইমিয়্যা, আল-জাওয়াবুস-সহীহ, ১/৩৪০।
১৯৪. ইবরাহীম আল-আলি, সহীহ আস-সীরাহ আন-নাবাওয়িয়া, পৃ. ৩১।
১৯৫. আল-জাওয়াবুস-সহীহ, ১/৩৪০।
১৯৬. সহীহ বুখারি, বেচাকেনা অধ্যায়, হাদীস নং ২১২৫; ইমাম বুখারি রহিমাহুল্লাহ হাদীসটি তাফসীর অধ্যায়েও ৪৮৩৪ নং হাদীসে উল্লেখ করেছেন।
১৯৭. সহীহুস-সীরাহ আন-নাবাওয়িয়া, পৃ. ৩০।

📘 রউফুর রহীম 📄 রাসূলুল্লাহর নুবুওয়াত সম্পর্কে আহলুল-কিতাব মনীষীদের সুসংবাদ

📄 রাসূলুল্লাহর নুবুওয়াত সম্পর্কে আহলুল-কিতাব মনীষীদের সুসংবাদ


সালমান ফারসি তাঁর ইসলাম গ্রহণের বিখ্যাত সে-ই ঘটনাটি জানিয়ে গেছেন সবাইকে; সত্যের খোঁজে তিনি সেসময় এক দেশ থেকে আরেক দেশে হন্যে হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। কিছু সময় তিনি একজন পাদ্রীর তত্ত্বাবধানেও থাকেন। একদিন পাদ্রী সালমান ফারসিকে ডেকে বললেন,
“নিশ্চয়ই ইবরাহীমের দীন নিয়ে যে নবির আগমন ঘটবে তাঁর আসার সময় ঘনিয়ে এসেছে। জন্ম নেবেন তিনি আরবে। দুই হাররার [১৯৮] মধ্যকার খেজুর গাছ শোভিত একটি অঞ্চলে তিনি হিজরাত করবেন। তাঁর অনেকগুলো নিদর্শন থাকবে। সবাই দেখতে পাবে সেগুলো। হাদিয়া বা উপঢৌকন হিসেবে যা পাবেন, সেখান থেকে খাবেন তিনি। কিন্তু সাদাকা বা দান-খয়রাত করা হয়েছে এমন কিছু তিনি খাবেন না। দুই কাঁধের মধ্যখানে রয়েছে তাঁর নুবুওয়াতের সিলমোহর। তোমার যদি ওই দেশে গিয়ে তাঁর সঙ্গে দেখা করার সুযোগ হয় তবে তা-ই করো।” [১৯৯]

সালমান ফারসি পাদ্রীর কথানুযায়ী মাদীনায় পৌঁছেন। মাদীনায় আগমন, দাসে পরিণত হওয়াসহ সব ঘটনা বিস্তারিত তুলে ধরেন তিনি। রাসূল তখন হিজরাত করে মাদীনায় অবস্থান করছেন। পাদ্রীর কথার সত্যতা পরীক্ষা করার জন্য নবিজির কাছে গিয়ে হাজির হন সালমান। খাবার এগিয়ে দেন তাঁর দিকে। তবে নবিজিকে তিনি খাবারগুলো সাদাকা হিসেবে দেন। রাসূলুল্লাহর একটা দানা-পানিও মুখে তোলেননি। এরপর সালমান ফারসি আরও খাবার দেন রাসূলুল্লাহকে। তবে এবার তিনি খাবারগুলো সাদাকা হিসেবে না দিয়ে হাদিয়া বা উপহার হিসেবে দেন। এবার রাসূল সেখান থেকে খেলেন। এরপর অন্য এক ছুতোয় সালমান ফারসি তৃতীয় এবং শেষ নিদর্শনটিও নিজ চোখে দেখেন- রাসূলুল্লাহর দুই কাঁধের মাঝে নুবুওয়্যাতের সিল। পাদ্রীর কথা অক্ষরে অক্ষরে মিলে যাচ্ছে দেখে সালমান ফারসি সঙ্গে সঙ্গেই ইসলাম গ্রহণ করেন। [২০০]

এ ধারারই আরেকটি ঘটনা আবু তাইহান নামের এক লোকের। তিনি নিজ দেশ শাম থেকে একবার মাদীনায় আসেন। সেখানে গিয়ে থাকা শুরু করেন সেখানকার কুরাইযা গোত্রে। তবে রাসূলুল্লাহর নবি হওয়ার দু-বছর আগেই আবু তাইহান মারা যান। মৃত্যুশয্যায় কুরাইযা গোত্রের লোকদের ডেকে তিনি বললেন, “হে ইহুদি সমাজ, আচ্ছা বলো তো দেখি, মদ ও ভোগ-বিলাসিতার দেশ শাম ছেড়ে অভাব, দারিদ্র্য ও ক্ষুধায় জর্জরিত একটি দেশে (হিজায অর্থাৎ মাদীনায়) কেন এলাম আমি?”

উত্তরে তারা জানাল, "আপনিই ভালো বলতে পারবেন।” তিনি বললেন, "আমি এ দেশে এসে অপেক্ষা করছি এমন একজন নবির আগমনের, যার আসার সময় ঘনিয়ে এসেছে। আমি আশা করি তাঁর আগমনের (আমার জীবদ্দশাতেই), যাতে আমি তাঁর অনুসরণ করতে পারি।”

আবু তাইহানের এমন কথা গোপন থাকেনি; ছড়িয়ে পড়ে সর্বত্র। ইহুদিরা ছাড়াও অন্যদের মধ্যেও খবরটি জানাজানি হয়ে যায় দ্রুত। বিষয়টি এক সময় তাদের মধ্যে বিদ্বেষ-বিচ্ছিন্নতার পর্যায়ে গিয়ে গড়ায়। এর জের ধরেই ইহুদিরা মাদীনার লোকদের হুমকি দিয়ে বেড়াত, "শেষ নবির আগমনের সময় হয়ে গেছে; এই তিনি এলেন বলে। আমরা তাঁর নেতৃত্বে যুদ্ধে তোমাদেরকে হত্যা করব; ঠিক যেভাবে ইরাম ও 'আদ জাতিকে হত্যা করা হয়েছিল।” [২০১] ইহুদিদের এমন হুমকি-ধমকিতে কোনো কাজ হয়নি; বরং হিতে বিপরীত হয়। দেখা যায়, মাদীনার আউস ও খাযরাজ গোত্র দুইটির অনেক লোক ইহুদিদের এমন কথাবার্তার কারণেই ইসলাম গ্রহণ করেন।

পরবর্তী সময়ে আনসার সাহাবিদের কেউ কেউ বলেন, “আল্লাহর রাহমাত ও তাঁর হিদায়াতে যে যে বিষয় আমাদেরকে ইসলাম গ্রহণে উৎসাহ জোগায় তার একটি হলো, নবিজির আগমনের ব্যাপারে ইহুদিদের বিভিন্ন কথাবার্তা; সে সময়ে আমরা শির্ক করতাম, লিপ্ত থাকতাম মূর্তিপূজায়। অন্যদিকে ইহুদিরা ছিল আহলুল-কিতাব; আসমানি কিতাবধারী। তাদের কাছে কিতাবের এমন এমন জ্ঞান ছিল যা আমাদের ছিল না। তবে তাদের ও আমাদের মধ্যে সদ্ভাব ছিল না; লেগেই থাকত শত্রুতা। তাদের অপছন্দ এমন একটা বিষয় যখন আমরা তাদের কাছ থেকে লাভ করলাম তখন তারা আমাদেরকে ধমকের সুরে বলল, 'শেষ নবির আগমনের সময় হয়ে গেছে; এই তিনি এলেন বলে। আমরা তাঁর নেতৃত্বে তোমাদেরকে হত্যা করব; ঠিক যেভাবে ইরাম ও 'আদ জাতিকে হত্যা করা হয়েছিল'।” [২০২]

রাসূলুল্লাহর চিঠি পেয়ে রোমের শাসক হিরাক্লিয়াস বলেছিল, “আমি জানতাম তিনি (মুহাম্মাদ ) আসছেন। তবে কল্পনাও করতে পারিনি যে, তিনি তোমাদেরই (একজন আরব) একজন হবেন।” [২০৩]

টিকাঃ
১৯৮. হারা বলা হয় এমন এক অঞ্চলকে যা অগ্নিগিরিসদৃশ পাথরে পাথরে ভর্তি; অঞ্চলটি মূলত পূর্ব-পশ্চিম দিককার মাদীনার সীমান্ত অঞ্চল।
১৯৯. ইবনু কাসীর, আস-সীরাহ আন-নাবাওয়িয়া, ১/৩০০।
২০০. 'উমারি, আস-সীরাহ আন-নাবাওয়িয়া, আস-সহীহা, ১/১২২।
২০১. দেখুন: ড. মুহাম্মাদ কল'আজি, দিরাসাহ তাহলীলিয়‍্যাহ, পৃ. ১০৭।
২০২. হাসান সনদে ইবনু হিশাম থেকে বর্ণিত, ১/২৩১।
২০৩. দেখুন: সহীহ আস-সীরাহ আন-নাবাওয়িয়া, পৃ. ১৪৬।

📘 রউফুর রহীম 📄 সেসময়কার মানুষদের সাধারণ চিত্র

📄 সেসময়কার মানুষদের সাধারণ চিত্র


প্রফেসর আবুল হাসান আন-নাদওয়ি তদানীন্তন আরব ও অনারবদের অবস্থার সাধারণ চিত্র তুলে ধরতে গিয়ে বলেন:

“খ্রিষ্ট ষষ্ঠ শতকের মাঝামাঝিতে মানুষ বিশৃঙ্খলার এমন এক পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছে যে, কোনো সংস্কারক কিংবা কোনো শিক্ষক যে সেই অবস্থার পরিবর্তন ঘটাবেন তা মনে হচ্ছিল না। বিশ্বাসগত সংস্কার, আচরণগত সংস্কার, 'ইবাদাত কবুল হওয়ার বিষয়ে সংস্কার কিংবা সামাজিক কোনো অসংগতির সংস্কারের মতো হাতেগোনা দু-একটা বিষয় ছিল না; ছিল অগুনতি। সংস্কারের বিষয় এমন দু- একটি হলে সময়ের সংস্কারক ও শিক্ষকগণের পক্ষে সেগুলো শোধরানো হয়তো কোনো ব্যাপার ছিল না।

বরং যুগ যুগ ধরে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মের মাঝে জাহিলিয়্যাত বা মূর্খতার বীজ রোপিত হয়, বিস্তৃত হয় মূর্তিপূজার শেকড়। এই মূর্খতা ও মূর্তিপূজার মূলোৎপাটন করাই ছিল সংস্কারের মূল ক্ষেত্রে। এই মূর্খতার নিচে চাপা পড়ে যায় নবি-রাসূলগণের শিক্ষা, হারিয়ে যায় সংস্কারকগণের কষ্টের ফসল, ভঙ্গুর হয়ে পড়ে মজবুত সামাজিক বন্ধন। সুতরাং এমন পরিস্থিতিতে সংস্কার সাধনে প্রতিষ্ঠা করতে হবে সুদৃঢ় ভিত্তির ওপর সুউচ্চ এক শক্ত কাঠামো। সংকীর্ণ গণ্ডির ভেতরে আবদ্ধ না থেকে পৃথিবীর বিস্তীর্ণ প্রান্তরে বিস্তৃত হবে এই সংস্কার কাজ। কোনো একক জাতিকে নিয়ে সে পড়ে থাকবে না, আপন করে নেবে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাইকে। নতুন এক প্রজন্ম গড়ে তুলবে সংস্কার কাজটি; যারা প্রাচীনদের তুলনায় ভালো কাজে এগিয়ে থাকবে অনন্য এক মাত্রায়। এদেরকে দেখে মনে হবে, কেমন যেন মানুষ নতুন করে জন্ম নিল আবার, কেমন যেন সে নতুন করে গড়ে তুলল তার আবাসন। আল্লাহ বলেন:

“যে ব্যক্তি মৃত ছিল, তারপর আমি যাকে জীবিত করেছি এবং একটি আলো দান করেছি যার সাহায্যে সে মানুষের মধ্যে চলাফেরা করতে পারে, সে কি ওই ব্যক্তির মতো হতে পারে, যে অন্ধকারের মধ্যে আছে এবং সেখান থেকে বের হচ্ছে না? এভাবেই কাফিরদের দৃষ্টিতে তাদের নিজেদের কাজকে শোভন করে দেওয়া হয়েছে।” [সূরা আন'আম, ৬:১২২]

ভ্রান্তির বীজ উৎপাটন, প্রতিমার শেকড় উপড়ানোই হলো সংস্কার সাধনের প্রধান লক্ষ্য। তবে উপড়ানোর বিষয়টি এমনভাবে করতে হবে যাতে করে তা সমূলে বিনাশ হয়। সঙ্গে সঙ্গে মানুষের মন-মননে গেঁথে দিতে হবে আল্লাহর একত্ববাদ তথা তাওহীদের আকীদা-বিশ্বাস। চূড়ান্ত পর্যায়ে এ বিশ্বাস তাদের মনে বদ্ধমূল করে দিতে হবে। মনে সৃষ্টি করতে হবে আল্লাহর সন্তুষ্টি ও তাঁর 'ইবাদাতের প্রতি ঝোঁক। মানবসেবা ও সত্যকে সাহায্য করার স্পৃহা জাগিয়ে তুলতে হবে তার। সে নিজের খেয়াল-খুশির ওপর আল্লাহর ইচ্ছাকে প্রাধান্য দেবে। দমন করবে নিজের কুপ্রবৃত্তিকে। সকল অপযুদ্ধ ধুয়ে-মুছে সাফ করবে। মোট কথা, সংস্কার কাজটি মানবতার জন্য ধ্বংসাত্মক সকল দিক সামলাবে; যে ধ্বংসাত্মক দিকটি তার সব শক্তি একত্র করেছে দুনিয়া ও আখিরাতকে জাহান্নামে পরিণত করতে। এরপর এটা পরিচালিত হবে এমন এক পথে যার শুরুটা সৌভাগ্য দিয়ে; জ্ঞানী মু'মিনরা যা লাভ করবেন। আর এর শেষ গন্তব্যটা চিরস্থায়ী জান্নাতে; যার প্রতিশ্রুতি আল্লাহ দিয়েছেন কেবল মুত্তাকিদের জন্য। রাসূলুল্লাহকে নবি করে পাঠানোর মাধ্যমে আল্লাহ মানবজাতিকে যে অনুগ্রহ করেছেন তার বর্ণনা কুরআন এভাবে দিচ্ছে, আল্লাহ বলেন:

“তোমরা সবাই আল্লাহর রশিকে শক্ত করে ধরো, পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ো না। তোমাদের প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহ স্মরণ করো। তোমরা পরস্পর শত্রু ছিলে, তারপর তিনি তোমাদের অন্তরে হৃদ্যতা সঞ্চার করেছেন, ফলে তোমরা তাঁর অনুগ্রহে পরস্পর ভাই হয়ে গিয়েছ। তোমরা এক অগ্নিকুণ্ডের প্রান্তে অবস্থান করছিলে, তিনি তোমাদেরকে সেখান থেকে উদ্ধার করেছেন। এভাবেই আল্লাহ তোমাদের জন্য তাঁর নিদর্শনগুলো প্রকাশ করেন, যাতে তোমরা দিকনির্দেশনা পাও।” [সূরা আলু-'ইমরান, ৩:১০৩]” [২০৪]

টিকাঃ
২০৪. আন-নাদওয়ি, আস-সীরাহ আন-নাবাওয়িয়া, পৃ. ৫৮, ৫৯; আল-আসাস ফিস-সুন্নাহ বইয়ের লেখক নাদওয়ি থেকে বর্ণনাটি তার বইয়ে উদ্ধৃত করেন, ১/১৮০, ১৮১।

📘 রউফুর রহীম 📄 নবিজির নুবুওয়াতের নিদর্শন

📄 নবিজির নুবুওয়াতের নিদর্শন


নবিজির নুবুওয়াতের নিদর্শনের সংখ্যা অনেক। এর একটি হলো, নবি হওয়ার পূর্বে হাজরে আসওয়াদকে ঘিরে প্রায় সংঘটিত যাওয়া একটা বিবাদের সুষ্ঠু সমাধান। সাহাবি জাবির ইবনু সামুরাহ থেকে বর্ণিত যে, রাসূল একবার বলেছেন, “নিশ্চয়ই নবি হওয়ার পূর্বে মাক্কার একটা পাথরের কথা আমার জানা আছে। আমাকে (নবি হিসেবে) পাঠানোর আগেই পাথরটিকে (ঘিরে সৃষ্ট বিবাদ মিটানোর ভার) ন্যস্ত করা হয়েছিল আমার কাছে; আমার এখনো মনে আছে।” [২০৫]

রাসূলুল্লাহর নুবুওয়াতের অন্য একটি নিদর্শন হলো—সত্য স্বপ্ন। এই সত্য স্বপ্নের মাধ্যমেই ওয়াহির সূচনা ঘটে। তিনি যে স্বপ্নই দেখতেন সেটা উদ্ভাসিত হতো সকালের আলোর মতো। [২০৬]

নির্জনতা ও ধ্যানমগ্নতা তাঁর কাছে প্রিয় করা হলো। মাক্কা থেকে উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত 'হেরা গুহা' নামক একটি পাহাড়ে তিনি নির্জন সময় কাটাতেন। 'ইবাদাত-বন্দেগি করতেন একনাগাড়ে কয়েক রাত—কখনো দশ রাত, আবার কখনো এক মাস পর্যন্ত তিনি সেখানে কাটিয়ে দিতেন। এরপর তিনি বাড়ি ফিরে আসতেন। সেখানে কাটাতেন অল্পকিছু সময়। আবার নির্জন সময় কাটানোর জন্য নতুন পাথেয় সংগ্রহ করে ফেরত আসতেন হেরা গুহায়। তাঁর কোনো এক নির্জন অবস্থানের সময় ওয়াহি আসার আগপর্যন্ত এভাবেই তিনি হেরা গুহায় নির্জন সময় কাটাতেন। এমনই কোনো এক নির্জনতার মধ্যে এক সময় তাঁর কাছে জিব্রীল ওয়াহি নিয়ে হাজির হন। [২০৭]

টিকাঃ
২০৫. সহীহ মুসলিম, কিতাবুল-ফাদাইল, পরিচ্ছেদ: নবিজির বংশমর্যাদা এবং নবি হওয়ার পূর্বে হাজরের বিষয়টি তাঁর কাছে ন্যস্ত, হাদীস নং ২২৭৭।
২০৬. সহীহ বুখারি, অধ্যায়: ওয়াহির প্রারম্ভ, হাদীস নং ৩।
২০৭. দেখুন: আল-বৃতি, ফিকহুস-সীরাহ আন-নাবাওয়িয়া, পৃ. ৬০。

ফন্ট সাইজ
15px
17px