📘 রউফুর রহীম 📄 খাদীজার ব্যবসার দায়িত্ব গ্রহণ এবং তাঁকে বিবাহ

📄 খাদীজার ব্যবসার দায়িত্ব গ্রহণ এবং তাঁকে বিবাহ


খাদীজা বিনতে খুওয়াইলিদ ছিলেন বিধবা [১৭৪]; মক্কার ধনাঢ্য ও সম্মানিত একজন মহিলা। তিনি বিভিন্ন লোক খাটিয়ে তাঁর ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচালনা করতেন। এমনিভাবে একদিন খাদীজার কাছে নবিজির সততা, আমানাতদারিতা, উন্নত চরিত্রমাধুর্য ও সত্যবাদিতার খবর গিয়ে পৌঁছে যায়। তিনি রাসূলুল্লাহকে অনুরোধ করেন তাঁর বাণিজ্যবহর নিয়ে শামে যাওয়ার জন্য। প্রস্তাব দেন, অন্য ব্যবসায়ীদের তুলনায় তাঁকে ভালো পারিশ্রমিক দেওয়ার। রাসূল তার প্রস্তাবে রাজি হন। খাদীজার দাস মাইসারাকে সঙ্গে নিয়ে তিনি শুরু করেন ব্যবসায়িক সফর। শামে এসে তিনি সঙ্গে করে যেসব বাণিজ্যিক-পণ্য নিয়ে এসেছিলেন, অনন্য দক্ষতায় তার সব পণ্যই বিক্রি করে দেন তিনি। কিছু পণ্য কিনেনও সেখান থেকে। রাসূল মক্কায় ফিরে এসে খাদীজাকে হিসাব-নিকাশ সঠিকভাবে বুঝিয়ে দেন। নতুন পণ্যগুলো তুলে দেন তাঁর হাতে। সেগুলো বিক্রি করে খাদীজার মুনাফা বেড়ে দাঁড়াল দ্বিগুণ।

বাণিজ্যিক এই সফর থেকে রাসূল সন্তোষজনক পারিশ্রমিক লাভ করেন। উপরন্তু নানান অভিজ্ঞতাও অর্জন করেন তিনি। পরবর্তীকালে যে শহরে তিনি হিজরাত করবেন এবং বানাবেন তাঁর দাওয়াতি কার্যক্রমের কেন্দ্র সেই মাদীনার পাশ দিয়ে বাণিজ্যিক সফরে যান। ঐসব দেশও তিনি অতিক্রম করেন যেখানে পরবর্তী সময়ে ইসলাম বিজয় লাভ করবে। তাঁর এই সফর খাদীজাকে বিয়ে করারও একটি কারণ হয়ে দাঁড়ায়; সফর থেকে ফিরে এসে মাইসারা রাসূলুল্লাহর মহানুভবতা, সত্যবাদিতা ও চারিত্রিক মাধুর্য ইত্যাদি যা যা দেখেছে তার সবিস্তার বর্ণনা দেয় খাদীজার কাছে।[১৭৫] খাদীজাও দেখলেন যে, মুহাম্মাদ তাঁর ব্যবসার দায়িত্বভার নেওয়ার পর থেকে তাঁর ধন-সম্পদ বেড়ে গেছে বহুগুণে। ইতঃপূর্বে ব্যবসাতে এমন লাভের মুখ তিনি দেখেননি। এসব কারণে খাদীজা তাঁর মনের কথা বান্ধবী নাফিসা বিনত মুনাব্বার কাছে ব্যক্ত করেন। সব শুনে বান্ধবী নবিজির কাছে যান খাদীজাকে বিয়ে করার প্রস্তাব নিয়ে। [১৭৬]

খাদীজাকে বিয়ে করার প্রস্তাব পেয়ে রাসূল প্রীত হন। কিন্তু পুরো ব্যাপারটি তিনি ন্যস্ত করেন চাচাদের ওপর। তারাও একবাক্যে মেনে নেন। আর চাচারা রাজি হবেনই-বা না কেন? কুরাইশদের অভিজাত ও বিদুষী একজন নারী ছিলেন খাদীজা। তার শেষ স্বামী মারা যাওয়ার পর কুরাইশদের প্রায় সব নেতাই তাকে বিয়ে করার প্রস্তাব পাঠান। অথচ সবিনয়ে সব প্রস্তাব তিনি এড়িয়ে যান। কিন্তু নবিজির গুণমুগ্ধ হয়ে তিনি নিজেই তাঁকে বিয়ে করার ইচ্ছা ব্যক্ত করেন। চাচা হামযা ইবনু 'আবদুল-মুত্তালিবকে সঙ্গে নিয়ে মুহাম্মাদ খাদীজার বাড়ির দিকে রওনা দেন। চাচা খাদীজাকে বিয়ে করতে ভাতিজাকে সম্মত দেন। রাসূল খাদীজাকে ২০ বাক্রা মোহরানার বিনিময়ে বিয়ে করেন। খাদীজাই প্রথম মহিলা যাকে রাসূল বিয়ে করেন। তার জীবদ্দশায় রাসূল দ্বিতীয় আর কাউকে বিয়ে করেননি। খাদীজার গর্ভে রাসূলুল্লাহর দুই ছেলে ও চার মেয়ে জন্ম নেয়। দুই ছেলের নাম যথাক্রমে: কাসিম, এর নামেই নবিজির উপনাম ছিল আবুল কাসিম; আর দ্বিতীয় ছেলের নাম 'আবদুল্লাহ। এই ছেলের উপাধি ছিল তাহির ও তাইয়্যিব। পশুর পিঠে আরোহণে সক্ষম এমন বয়সে কাসিম মারা যান। 'আবদুল্লাহ মারা যান শিশু অবস্থায়, রাসূলুল্লাহর নুবুওয়াত লাভের আগে।

তাঁর কন্যারা হলেন যথাক্রমে: যাইনাব, রুকাইয়া, উম্মু কুলসূম ও ফাতিমা। তারা সবাই ইসলাম গ্রহণ করেন, মাদীনায় হিজরাত করেন এবং তারা বিয়েও করেন। খাদীজাকে বিয়ের সময় নবিজির বয়স ছিল ২৫। অন্যদিকে, খাদীজার বয়স তখন ৪০। [১৭৭]

শিক্ষা ও উপকারিতা
আমানাতদারিতা ও সততা একজন সফল ব্যবসায়ীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুটি গুণ। ব্যবসার বেলায় দরকারি এই দুটি গুণ রাসূলুল্লাহর ব্যক্তিত্বে পুরো মাত্রায় ছিল। এতে খাদীজা অনুপ্রাণিত হয়ে ব্যবসার উদ্দেশ্যে নিজের ধন- সম্পদ নবিজির হাতে দিয়ে শামে পাঠান। আল্লাহ তা'আলা তাঁকে ব্যবসায় বারাকা দেন। খুলে দেন তাঁর জন্য কল্যাণের সবগুলো দুয়ার।

আল্লাহ তা'আলা তাঁর রাসূলকে নবি হওয়ার আগপর্যন্ত যে যে উৎস থেকে রিস্কের বন্দোবস্ত করেছেন তার একটি উৎস ছিল ব্যবসা। রাসূল ধীরে ধীরে ব্যবসা-বাণিজ্যের কলাকৌশলে দক্ষ হয়ে ওঠেন। পরবর্তী সময়ে রাসূল বর্ণনা করেন যে, একজন মুসলিম ব্যবসায়ী যদি বিশ্বস্ত ও সৎ হয় তা হলে তার হাশর হবে সিদ্দীক, শহিদ ও নবিদের সঙ্গে। একজন মুসলিমের জন্য ব্যবসা একটি গুরুত্বপূর্ণ পেশা; ব্যবসায়ীকে অন্যের দাসত্ব, চোখ রাঙানি ও লাঞ্ছনা সহ্য করতে হয় না। থাকতে হয় না অন্যের মুখাপেক্ষী হয়ে। অন্যরাই বরং তার মুখাপেক্ষী। সময়ে সময়ে সততা এবং ব্যবসায় তার অভিজ্ঞতা থেকে অন্যরা উপকৃতও হয়।

খাদীজার সঙ্গে বিয়ে রাসূলুল্লাহর তাকদীরে আল্লাহই লিখে রেখেছেন। নবিজির উপযোগী এবং তাঁকে সাহায্য করবেন এমন একজনকেই তাঁর স্ত্রীরূপে বাছাই করেন আল্লাহ তা'আলা। তিনি স্বামীর দুঃখ-কষ্ট লাঘব করবেন, রিসালাতের দায়িত্ব পালনে তাঁকে সাহায্য করবেন। [১৭৮]

শাইখ মুহাম্মাদ আল-গাজালি বলেন, “খাদীজা একটি সুন্দর উপমার নাম, যিনি একজন মহান মানবের পূর্ণাঙ্গতা দানে ছিলেন সচেষ্ট। নবিরা খুবই স্পর্শকাতর হৃদয়ের হয়ে থাকেন; সমাজকে ভালো পথের দিশা দেখাতে গিয়ে তাদেরকে সহ্য করতে হয় অমানুষিক অত্যাচার। দায়িত্ব পালনে তারা মোটেই গাফেল ছিলেন না। আল্লাহর রিসালাত মানুষের কাছে পৌঁছাতে তারা দিনরাত কঠোর পরিশ্রম করতেন। সুতরাং তাদেরই বেশি প্রয়োজন এমন একজন স্ত্রীর যিনি তাদের নুবৃওয়াতি জীবনে প্রশান্তির কারণ হবেন। খাদীজা এমনই একজন রমণী যিনি এই দায়িত্ব পালনে অগ্রণী ছিলেন। নবিজির জীবনে খাদীজার ভূমিকা ও প্রভাব অপরিসীম।” [১৭৯]

নিজ ছেলেদের হারানোর তিক্ত অভিজ্ঞতা ভোগ করেন মুহাম্মাদ। তারও আগে, তাঁর জীবনের শুরুতে তিনি হারান তার পিতামাতাকে। নবিজির বংশের কোনো পুরুষ বেঁচে থাকবেন—এটা আল্লাহই চাননি; এর মধ্যে চূড়ান্ত কোনো প্রজ্ঞা নিহিত ছিল। লোকেরা যাতে করে রাসূলুল্লাহর মৃত্যুর পর তাদের জন্য নুবুওয়াতি দাবি করে না বসে। তবে হ্যাঁ, আল্লাহ তাঁকে পুত্রসন্তান দিয়েছেন তাঁর মানব-স্বভাবের পূর্ণাঙ্গতা দেওয়ার জন্য, মানব- মনের চাহিদা পূরণার্থে। যাতে কোনো শত্রু তাঁর পৌরুষের ব্যাপারে প্রশ্ন তুলে তাঁর মর্যাদাহানি করতে না পারে; শত্রুরা যাতে কোনো ধরনের কুৎসা রটনার সুযোগ না পায়। এরপর আল্লাহ তাঁর সন্তানদের ছোট বয়সেই নিয়ে নেন। অন্য একটা কারণও থাকতে পারে, আর তা হলো-যারা ছেলেসন্তানের বাবা হতে পারেননি তাদের জন্য এটা একটা সান্ত্বনা। কিংবা যাদের ছেলেসন্তান হয়েছে কিন্তু কিছুদিন পর মারা গেছে, তাদের জন্যও রাসূলুল্লাহর এই ঘটনা সান্ত্বনার বাণী শোনাবে।

শুধু সন্তান হারানোর পরীক্ষাই নয়, মুহাম্মাদ দা'ওয়াতের কাজ করতে গিয়েও অনেক পরীক্ষার সম্মুখীন হন। মানুষদের মধ্যে নবিরাই সবচেয়ে বেশি কষ্ট ভোগ করে থাকেন। [১৮০] কেমন যেন আল্লাহ তা'আলা এই শোক-দুঃখ ও স্পর্শকাতরতাকে আমাদের নবিজির অস্তিত্বের একটা অংশে পরিণত করতে চাইলেন। কারণ, যারা জাতিকে নেতৃত্ব দেবেন তাদেরকে অবশ্যই নমনীয় হতে হবে। জাতির প্রতি তাদের আচরণ হতে হবে সদয়। যে নেতার নিজের জীবন দুঃখ-কষ্টের মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হয়, তিনি অনুসারীদের দুঃখটা বুঝতে পারবেন, তাদের প্রতি সদয় হবেন, সেটাই সংগত। [১৮১]

খাদীজাকে নবিজির বিয়ে করার কারণে ইসলামের শত্রু প্রাচ্যবিদ ও তাদের তাঁবেদার ধর্মনিরপেক্ষবাদীদের মুখ ও কলম চালনা বন্ধ হয়ে যায়। এরা মনে করে যে, রাসূলুল্লাহর বহুবিবাহের কারণে তারা এমন এক মারাত্মক অস্ত্র পেয়ে গেছে, যা দিয়ে তারা ইসলামকে ঘায়েল করতে পারবে অনায়াসে। তারা নবিজিকে এমন এক লোকের অবয়বে ভেবে বসে আছে, যে কিনা নিজের লালসা চরিতার্থ করতে গিয়ে লালসার সাগরে হাবুডুবু খাচ্ছে। অথচ চিত্রটি পুরো বিপরীত-আমারা দেখি রাসূল তাঁর ২৫ বছর বয়স পর্যন্ত নিজের চরিত্রকে নিষ্কলুষ রেখে, এমন এক জাহিলি পরিবেশে বসবাস করেছেন যেখানে অনাচার-ব্যভিচারে সয়লাব ছিল। উপরন্তু বিয়ে করেছেন এমন একজন নারীকে যিনি তাঁর বয়সের তুলনায় অনেক বড়।

আশেপাশের অনাচারের প্রতি কোনো নজর না দিয়ে তিনি তাঁর স্ত্রী খাদীজার সঙ্গেই বসবাস করে গেছেন দীর্ঘ অনেকগুলো বছর। আশেপাশের রং-তামাশায় হারিয়ে যেতে যদি তিনি চাইতেনই, তবে সে রাস্তাও তাঁর সামনে অবারিত ছিল। কিন্তু নিজের চরিত্রে কোনোরূপ কলঙ্কের কালি লেপন না করেই তিনি যৌবন পার করে উপনীত হন প্রৌঢ়ত্বে। এরপর প্রবেশ করেন বার্ধক্যে। খাদীজা ৬৫ বছর বয়সে মারা যাওয়ার আগপর্যন্ত রাসূলুল্লাহর এ বিয়েটাই বহাল ছিল। ৫০ বছর বয়স পর্যন্ত মুহাম্মাদ অন্য কোনো নারীকে বিয়ে করার কথা কল্পনাই করেননি। সাধারণত, মানুষের ২০ থেকে ৫০ পর্যন্ত বয়সটা এমন একটা সময়, যখন নিজ কামনা চরিতার্থ করার জন্য অধিক নারীসঙ্গের প্রতি আগ্রহ থাকে প্রবল।

কিন্তু রাসূল এই সময়ের মধ্যে খাদীজার সঙ্গে আর কোনো মহিলাকে—কি স্ত্রীরূপে কি দাসীরূপে—গ্রহণ করতে চাননি। যদি তিনি এমনটা চাইতেন তবে বহু নারী, বহু দাসী তাঁর স্ত্রী হতে, দাসী হতে উদ্‌গ্রীব ছিল।

এরপর, খাদীজার মৃত্যুর পর রাসূল ‘আয়িশাসহ অন্য উম্মাহাতুল-মু'মিনীনদের বিয়ে করেন। তবে এদের প্রত্যেককে স্ত্রীরূপে গ্রহণ করার পেছনে একটি করে ঘটনা ছিল; ছিল প্রজ্ঞা ও যৌক্তিক কারণ। একজন মুসলিম যখন এই প্রজ্ঞা ও কারণ ঠিকভাবে উপলব্ধি করতে পারবেন, তখনই রাসূলুল্লাহর মাহাত্ম্য, মান-মর্যাদা এবং তাঁর চারিত্রিক পূর্ণতার ওপর তার ঈমান বেড়ে যাবে বহুগুণে। [১৮২]

টিকাঃ
১৭৪. 'আতিক ইবনু 'আ'ইয নামের একজন খাদীজার প্রথম স্বামী; লোকটি মারা গেলে আবু হালাহ নামের অন্য একজন লোক তাকে বিয়ে করে; পরে সেও মারা যায়।
১৭৫. দেখুন: 'উমার 'আহমাদ 'উমার, রিসালাতুল-আম্বিয়া, ৩/২৭।
১৭৬. দেখুন: মাওয়াকিফ তারবাউইয়াহ, পৃ. ৫৬।
১৭৭. দেখুন: আবু ফারিস, আস-সীরাহ আন-নাবাওয়িয়া, পৃ. ১২২।
১৭৮. দেখুন: আবু শু'বাহ, আস-সীরাহ আন-নাবাওয়িয়া, ১/১২২, ১২৩।
১৭৯. দেখুন: গাজালি, ফিকহুস-সীরাহ, পৃ.৭৫।
১৮০. দেখুন: আবু শু'বাহ, আস-সীরাহ আন-নাবাওয়িয়া, ১/২২৩, ২২৪।
১৮১. দেখুন: গাজালি, ফিকহুস-সীরাহ, পৃ. ৭৮।
১৮২. দেখুন: আল-বৃতি, ফিকহুস-সীরাহ আন-নাবাওয়িয়া, পৃ. ৫৩, ৫৪।

📘 রউফুর রহীম 📄 কা‘বা নির্মাণে নবিজির অংশগ্রহণ

📄 কা‘বা নির্মাণে নবিজির অংশগ্রহণ


নবিজির বয়স তখন ৩৫। সে সময় আগুন এবং বন্যার পানির তোড়ে কা'বার দেয়াল ভেঙে পড়ার উপক্রম হলে কুরাইশরা সেটা পুনর্নির্মাণের বিষয়ে আলোচনা করতে একত্র হয়। তখন পর্যন্ত কা'বা ইবরাহীম যে ভিত্তির ওপর নির্মাণ করেছিলেন তেমনই ছিল—লম্বায় একজন স্বাভাবিক মানুষের তুলনায় সামান্য উঁচু ছিল সেটি, একটার ওপর আরেকটা পাথর রেখে রেখে তৈরি করা হয়েছিল এর দেয়াল; এঁটেল মাটি বা সিমেন্ট জাতীয় কোনো ধরনের গাঁথুনি ছিল না তাতে। কা'বা পুনর্নির্মাণের এ উদ্যোগ স্রেফ কোনো সংস্কারের উদ্যোগ ছিল না। কুরাইশরা চাইল পুরাতন কা'বা ঘরটি ভেঙে ছাদসহ নতুন করে আবার নির্মাণ করতে। কিন্তু কা'বা ভাঙতে গিয়ে অধর্মাচরণ হয়ে যায় কিনা এ ভয় তাদেরকে পেয়ে বসে। আশঙ্কা করল, ভেঙে ফেললে তাদের কোনো ক্ষতি হয়ে যাবে। তখন ওয়ালীদ ইবনু মুগিরা, যিনি মাখযূম গোত্রের নেতা, অন্যদের উদ্দেশ্য করে বললেন, “ভাঙার কাজ আমিই শুরু করি।” এ বলে তিনি হাতে তুলে নেন কুড়াল। কা'বার দেয়ালের পাশে দাঁড়িয়ে বলতে লাগলেন, “হে আল্লাহ, আপনার ধর্ম ছেড়ে আমরা বিপথে যাইনি। আমরা ভালো উদ্দেশ্যেই এমনটা করছি।”

শেষ পর্যন্ত সেই বৈঠকে প্রস্তাব উঠল যে, কেবল কা'বার একটা অংশ ভাঙা হবে এবং তারা ওই রাত অপেক্ষা করবেন। সবাই বলে উঠল, “আমরা অপেক্ষা করব। যদি ওই রাতের মধ্যে আমাদের কিছু হয়ই, তা হলে ভাঙাভাঙির কাজে আমরা আর সামনে এগোব না। ভাঙা অংশ জোড়া দিয়ে আগের মতো করে দেবো। আর যদি কোনো ক্ষতি না হয়, তবে বুঝতে হবে আমরা যা করছি আল্লাহ সে ব্যাপারে খুশি আছেন।”

ওই রাতে কোনো অঘটন ঘটেনি। পরদিন সকালে ওয়ালীদ আবার কা'বা ভাঙায় এগিয়ে যান। লোকেরাও তার সঙ্গে ভাঙার কাজে হাত লাগায়। ভাঙতে ভাঙতে একসময় উটের পিঠের কুঁজের মতো দেখতে কিছু সবুজ পাথর দেখতে পেল; পাথরগুলো একটার সঙ্গে আরেকটা লেগে ছিল।

কুরাইশরা কা'বা পুনর্নির্মাণের কাজ নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগি করে নেয়; যাতে করে এমন মহৎ কাজে সবার অংশীদারিত্ব থাকে। কুরাইশ-সর্দার ও প্রবীণদের ভাগে পড়ে পাথর বহন করে নিয়ে কা'বার দেয়ালে গাঁথুনির দায়িত্ব। চাচা 'আব্বাসের সঙ্গে রাসূলুল্লাহও কা'বা ঘর পুনর্নির্মাণের কাজে হাত লাগান। তারা পাথর বহন করে নিয়ে আসছিলেন। এমন সময় 'আব্বাস নবিজিকে বললেন, “একটা কাপড় তোমার কাঁধের ওপর দিয়ে নাও, এতে পাথরের আঘাত আর লাগবে না।”

হঠাৎ করে মুহাম্মাদ মাটিতে পড়ে যান। তাঁর চোখ দুটো তখন আকাশের দিকে স্থির। জ্ঞান ফিরে আসার পর তিনি বলে উঠলেন, “আমার চাদর, আমার চাদর”। এরপর তিনি গায়ে চাদর ভালোভাবে জড়িয়ে নিলেন। [১৮৩]

নির্মাণ কাজ করতে করতে একসময় কুরাইশদের সব কাজই শেষ হয়ে আসছিল। বাকি ছিল কেবল 'হাজরে আসওয়াদ' জায়গামতো রেখে দেওয়ার কাজটি। তখন হাজরে আসওয়াদ রাখা নিয়ে তাদের মধ্যে বেধে গেল তুমুল গণ্ডগোল। প্রত্যেক গোত্রই চাচ্ছিল, হাজরে আসওয়াদ স্থাপনের গৌরব নিজেদের দখলে রাখতে। এ নিয়ে তাদের মধ্যে যুদ্ধ প্রায় বেধে যায় যায় অবস্থা। এমন সময় আবু উমাইয়া ইবনুল- মুগিরা বলে উঠলেন, “হে কুরাইশ সম্প্রদায়! তোমরা যে বিষয় নিয়ে নিজের মধ্যে মতানৈক্য করছ, বিষয়টা ওই ব্যক্তির ওপর ন্যস্ত করো, যে ব্যক্তি আগামীকাল কা'বা চত্বরে প্রথম প্রবেশ করবেন। কুরাইশরা তার সঙ্গে একমত পোষণ করল। দেখা গেল পরদিন রাসূলুল্লাহই প্রথম প্রবেশ করলেন। তারা নবিজিকে দেখেই বলে উঠল, “এ তো দেখছি আল-আমীন; পরম বিশ্বস্ত। আমাদের আর কোনো আপত্তি নেই, আমরা মেনে নিলাম। সমাধানের আশায় এবার তারা রাসূলুল্লাহকে খবরটি জানাল। রাসূল বললেন, “আপনারা একখণ্ড কাপড় নিয়ে আসুন।”

তারা তাঁর কাছে চাদর-জাতীয় কাপড় এনে দিল। তিনি চাদরের একপ্রান্ত দুহাত দিয়ে ধরে বললেন, “প্রত্যেক গোত্রের প্রতিনিধি কাপড়ের একপ্রান্ত ধরবেন, এরপর সবাই একসঙ্গে উত্তোলন করবেন।”

নবিজির কথামতো তারা সবাই কাপড়টি উঁচিয়ে ধরে হাজরে আসওয়াদ রাখার স্থান পর্যন্ত নিয়ে আসে। রাসূল তখন নিজ হাতে পাথরটি জায়গামতো বসিয়ে দিলেন। সবাই তো মহাখুশি নবিজির এমন বুদ্ধিদীপ্ত কাজে। তাঁর এমন বুদ্ধিমত্তার কারণে অবশ্যম্ভাবী অনেক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ এড়ানো সম্ভব হয়েছে।

পুনর্নির্মাণের পর কা'বার উচ্চতা গিয়ে দাঁড়াল ১৮ গজে। মাটির স্তর থেকে কা'বার দরজা এতটুকু পরিমাণ উঁচু করা হয়, যাতে দরজা দিয়ে প্রবেশ করতে হলে সিঁড়ির সাহায্য লাগে। যেকেউ যেন কা'বায় সহজেই প্রবেশ করতে না পারে। তাছাড়া বৃষ্টির পানির ছিটে এর ভেতরে যাতে ঢুকতে না পারে- উঁচু করার পেছনে এটাও ছিল একটা কারণ।

তারা কা'বার ছাদ নির্মাণ করে কাঠের ছয়টি স্তম্ভের ওপর। তবে 'ইসমাঈলের নির্মিত ভিত্তির ওপর পুরো কা'বা ঘরর নির্মাণ করা কুরাইশদের পক্ষে সম্ভব হয়নি। কারণ, নির্মাণ ব্যয়ের জন্য তাদের হালাল উপার্জন মাঝপথেই শেষ হয়ে যায়। অগত্যা কা'বার উত্তরের অংশ 'হিদ্র'কে বাইরে রেখেই কা'বার নির্মাণ কাজ শেষ করে তারা। তবে ভিত্তিটি যে কা'বারই মৌলিক একটা অংশ সেটা প্রমাণে তারা এর চারপাশে ছোট্ট একটা দেয়াল তুলে দেয়; এছাড়া তাদের আর কিছুই করার ছিল না। কারণ, কা'বার পুনর্নির্মাণের কাজে হাত দেওয়ার আগে তারা নিজেরা নিজেদের ওপর এই মর্মে শর্ত আরোপ করে যে, কা'বা নির্মাণের কাজে তারা তাদের কেবল সৎ উপার্জনই ব্যয় করবে; কোনো দেহপসারিণীর কামাই, সুদি কারবারের উপার্জন কিংবা অন্যায়ভাবে অর্জিত কোনো অসৎ উপার্জন তারা এ কাজে ব্যয় করবে না। [১৮৪]

শিক্ষা ও উপকারিতা
আমরা সুনিশ্চিতভাবে জানি যে, কালের পরিক্রমায় চার চারবার কা'বার নির্মাণ কাজ সম্পন্ন হয়:
প্রথমবার: প্রথমে কা'বার নির্মাণ কাজ করেন নবি ইবরাহীম। এ কাজে তাঁকে ছেলে 'ইসমাঈল সাহায্য করেন।
দ্বিতীয়বার: রাসূলুল্লাহর নবি হওয়ার পূর্বে কুরাইশরা দ্বিতীয়বার এর নির্মাণ কাজ করেন। এই নির্মাণ কাজে নবিজির উল্লেখযোগ্য অংশগ্রহণ ছিল।
তৃতীয়বার: ইয়াযীদ ইবনু মু'আওয়িয়ার জমানায় তৃতীয়বারের মতো কা'বার পুনর্নির্মাণের কাজ হয়। সে সময় হুসাইন আস-সুকুনি নামের একজন লোক ইবনুয-যুবাইরকে মাক্কায় অবরোধ করে রাখে। এবং ইবনুয-যুবাইর আত্মসমর্পণ করা পর্যন্ত এ অবরোধ চলতে থাকে। সে সময় তার ওপর মিনজানিক বা ক্ষেপণাস্ত্র থেকে নিক্ষেপকৃত গোলার আগুনে কা'বা ঘর পুড়ে যায়। তাই ইবনুয-যুবাইর কা'বার নির্মাণ কাজ পুনরায় করেন।
চতুর্থবার: ইবনুয-যুবাইর নিহত হওয়ার পর 'আবদুল-মালিক ইবনু মারওয়ানের যুগে চতুর্থবারের মতো কা'বা পুনর্নির্মাণ করা হয়। তিনি চাইলেন নবিজির যুগ থেকে ইবনুয-যুবাইরের সময় পর্যন্ত যে ভিত্তির ওপর কা'বা নির্মিত ছিল সেভাবেই আবার নির্মাণ করতে। [১৮৫] যখন তিনি নির্মাণ কাজ শুরু করেন তখন কা'বার আকার ও আকৃতিতে ব্যাপক পরিবর্তন ঘটান। যৌক্তিক কারণও ছিল এর পেছনে। ইবনুয-যুবাইর ঘরটির ভিত্তি উঁচু করার উদ্যোগ নিয়েছিলেন জীবিত থাকাকালে। এবং কা'বার বাইরে থাকা হিদ্রের দিকে এর পরিধি বাড়ান ৬ গজ। আর উচ্চতায় বাড়ান আরও ১০ গজ। দুটি দরজা করেন-প্রবেশের জন্য একটি, অন্যটি বের হওয়ার।

রাসূল থেকে 'আয়িশার একটি হাদীসই মূলত ইবনুয-যুবাইর এ কাজে উৎসাহ জোগায়। রাসূল 'আয়িশাকে বলেছিলেন, “হে 'আয়িশা!. যদি তোমার জাতির সময়কাল অজ্ঞতার যুগের নিকটবর্তী না হতো, তা হলে অবশ্যই আমি কা'বাকে ভেঙে যে অংশকে সেটা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে সেটা এর অন্তর্ভুক্ত করতে, সেটাকে মাটির সমান করে নিতে এবং এর দুটি দরজা, একটি পূর্ব দরজা ও একটি পশ্চিম দরজা করতে আদেশ দিতাম। এইরূপে আমি সেটাকে ইবরাহীমের ভিত্তির ওপর নিয়ে আসতাম।” [১৮৬]

রাসূলুল্লাহর প্রজ্ঞা, আমানাতদারিতা ও বিশ্বস্ততা তাঁর চারিত্রিক এমন এক গুণ, যা সেদিন হারাম এলাকায় কুরাইশদেরকে নিশ্চিত খুনোখুনির বিপর্যয় থেকে রক্ষা করে। সেদিন তাঁকে দেখে সবাই খুশি হয়েছিল, একবাক্যে তাঁর রায় মেনে নিয়েছিল। কেননা, এ রায় তো একজন আল-আমীনের, একজন পরম বিশ্বস্ত মানুষের, যিনি কারও সঙ্গে অন্যায় আচরণ করেন না। তিনি এমন এক আল-আমীন যিনি কোনো পাপাচার করেন না; সৃষ্টি করেন না কোনো বিশৃঙ্খলা। তিনি কা'বার বিষয়ে আল-আমীন, প্রাণের ব্যাপারে আল-আমীন এবং তিনি রক্তের মর্যাদা রক্ষায় আল-আমীন। [১৮৭]

কা'বা ঘর পুনর্নির্মাণের ঘটনার মধ্য দিয়ে নবিজির শিষ্টাচারপূর্ণ আচরণের দিকটি কুরাইশদের কাছে উন্মোচিত হয়। [১৮৮] এ ঘটনার কারণে রাসূলুল্লাহর দুটি মর্যাদা অর্জিত হয়-কুরাইশদের চরম বাকবিতণ্ডা থেকে যুদ্ধ বেধে যাওয়ার উপক্রমকে নবিজির থামিয়ে দেওয়ার কারণে অর্জিত সম্মান। অন্যটি হলো, হাজরে আসওয়াদ স্থাপনের দ্বারা সম্মান পাওয়ার আশায় সবাই যখন একপ্রকার প্রতিযোগিতায় নেমেছিল তখন আল্লাহ সে সম্মানটা তাঁর রাসূলের জন্য সংরক্ষণ করে রাখেন; তিনি চাদরের ওপরে নিজের পবিত্র দুটি হাত দিয়ে ধরে পাথরটি রাখেন। এরপর চাদর থেকে নিয়ে সেটা আবার কা'বার যথাস্থানে স্থাপন করে দেন। [১৮৯]

একজন মুসলিম কা'বার পুনর্নির্মাণের ঘটনা থেকে আল্লাহর পরিপূর্ণ সুরক্ষা দানের শিক্ষা লাভ করবেন। তিনি লক্ষ করবেন, কীভাবে আল্লাহ তাঁর রাসূলকে এই সমস্যা সমাধানে খুব সহজে ও যৌক্তিকভাবে, ব্যতিক্রমধর্মী এই বুদ্ধি ও শক্তিমত্তা দিলেন। তিনি দেখবেন, নবিজির সারাজীবন ধরেই বিভিন্ন সমস্যার সমাধান দিতেন খুব সহজেই। রাসূলুল্লাহর রিসালাতের অনুপম একটা নিদর্শন এটি। তাঁর রিসালাত বাস্তবতার নিরিখে সবকিছুর সমাধান দিয়েছে খুবই যৌক্তিক, সহজ ও পরিপূর্ণ পদ্ধতিতে। [১৯০]

টিকাঃ
১৮৩. সহীহ বুখারি, কিতাবুল-হাজ্জ; হাদীস নং ১৫৮২。
১৮৪. দেখুন: ওয়াফাকাত তারবাওয়িয়া, পৃ. ৫৭। আরও দেখুন: 'উমার আহমাদ 'উমার, রিসালাতুল- আম্বিয়া, ৩/২৯, ৩০。
১৮৫. আল-বৃতি, আস-সীরাহ আন-নাবাওয়িয়া, পৃ. ৫৭, ৫৮। সহীহ মুসলিম, ৪০২ (১৩৩৩).
১৮৬. সহীহ বুখারি, কিতাবুল-হাজ্জ, হাদীস নং ১৫৮৬。
১৮৭. দেখুন: আবু ফারিস, আস-সীরাহ আন-নাবাওয়িয়া, পৃ.১২৫。
১৮৮. দেখুন: 'উমারি, আস-সীরাহ আন-নাবাওয়িয়া আস-সহীহা, ১/১১৬。
১৮৯. দেখুন: আবু ফারিস, আস-সীরাহ আন-নাবাওয়িয়া, পৃ. ১২৫, ১২৬。
১৯০. দেখুন: আস-সীরাহ আন-নাবাওয়িয়া: আল-আসাস ফিস-সিন্নাহ ওয়া ফিকহুহা, ১/১৭৫।

📘 রউফুর রহীম 📄 নবিজির নুবুওয়াতকে স্বাগত জানানোর জন্য লোকদের প্রস্তুতি

📄 নবিজির নুবুওয়াতকে স্বাগত জানানোর জন্য লোকদের প্রস্তুতি


রাসূলুল্লাহর আগমনের ব্যাপারে নবি-রাসূলগণের সুসংবাদ
নবিজির নুবুওয়াতের বিষয়টি যাতে নতুন কিছু মনে না হয় সেজন্য আল্লাহ তা'আলা চাইলেন মানুষদেরকে বিভিন্নভাবে প্রস্তুত করতে। যেমন:

অন্য কোনো জাতির মধ্য থেকে নয়, আরবদের মধ্য থেকেই একজনকে রাসূল করে পাঠানোর জন্য নবি ইবরাহীম তার রবের নিকট দু'আ করেছিলেন। আল্লাহ তার দু'আ কবুল করেন। তাদের কাছে একজন আরব (মুহাম্মাদ)-কে রাসূল হিসেবে প্রেরণ করেন। আল্লাহ বলেন :
“হে আমাদের রব! তুমি তাদের (আমাদের বংশধরদের) মধ্যে তাদের থেকেই একজন রাসূল পাঠিয়ো, যে তাদেরকে কিতাব ও প্রজ্ঞা শিক্ষা দেবে ও তাদেরকে পরিশুদ্ধ করবে। তুমিই তো পরাক্রমশলী, প্রজ্ঞাময়।” [সূরা বাকারা, ২:১২৯]

কুরআনুল-কারীমে উল্লেখ আছে, আল্লাহ তা'আলা পূর্ববর্তী নবি-রাসূলদের ওপর নাযিলকৃত আসমানি কিতাবে রাসূলুল্লাহর আগমনের সুসংবাদ জানিয়ে দিয়েছিলেন। আল্লাহ বলেন :
“(এরা তো তারাই) যারা সেই রাসূল ও নিরক্ষর নবি (মুহাম্মাদ )-এর অনুসরণ করে, যার কথা তারা তাদের তাওরাত ও ইনজীলে লিখিত পাচ্ছে। সে তাদের জন্য ভালো জিনিসকে বৈধ ও খারাপ জিনিসকে অবৈধ ঘোষণা করে এবং তাদেরকে ভারমুক্ত ও শৃঙ্খলমুক্ত করে। অতএব, যারা তাকে বিশ্বাস, সম্মান ও সাহায্য করে এবং তার সঙ্গে প্রেরিত আলোর অনুসরণ করে তারাই সফলকাম।” [সূরা 'আরাফ, ৭:১৫৭]

নবি 'ঈসা নবিজির আগমনের সুসংবাদ দিয়ে গেছেন। আল্লাহ বলেন,
“(স্মরণ করো) মারইয়ামের পুত্র 'ঈসা বলেছিল, হে বানু ইসরাঈল! আমি তোমাদের কাছে (প্রেরিত) আল্লাহর রাসূল। আমার সামনে যে তাওরাত আছে, আমি তাকে সত্য (কিতাব) বলছি এবং আমার পরে আহমাদ নামের একজন রাসূল আসার সুসংবাদ দিচ্ছি।” [সূরা আস-সফ, ৬১:৬]

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা সব নবি-রাসূলকে তাঁর প্রিয় রাসূলের আগমন- বার্তা আগেই জানিয়ে দেন। এবং তাদেরকে আদেশ করেন যে, তারা যেন তাদের অনুসারীদেরকে নবিজির ওপর ঈমান আনার দা'ওয়াত দিয়ে যান; যদি অনুসারীরা তাদের জীবদ্দশায় নবিজিকে পায়, তবে তারা যেন তাঁর অনুসরণ করে। [১৯১] আল্লাহ বলেন,
“(স্মরণ করো) যখন আল্লাহ নবিদের কাছ থেকে অঙ্গীকার নিয়েছিলেন (আর বলেছিলেন), আমি তোমাদের যে কিতাব ও প্রজ্ঞা দান করেছি তা গ্রহণ করো। অতঃপর তোমাদের কাছে যা আছে তার সমর্থক একজন রাসূল আসবে। তখন অবশ্যই তোমরা তাঁর প্রতি ঈমান আনবে এবং তাকে সাহায্য করবে। তিনি বললেন, তোমরা কি স্বীকার করলে এবং এ ব্যাপারে আমার অঙ্গীকার গ্রহণ করলে? তারা বলল, স্বীকার করলাম। তিনি বললেন, তা হলে তোমরা সাক্ষী থেকো, আর আমিও তোমাদের সাক্ষী থাকলাম।”[সূরা আলু-'ইমরান, ৩:৮১]

বর্তমানে তাওরাত ও ইনজীলের যে কপিগুলো পাওয়া যায় সেগুলো বিকৃত; রাসূলুল্লাহর নাম এগুলো থেকে মুছে দেওয়া হয়েছে। তবে ইসলাম আগমনের পূর্বে আস-সামিরা নামক তাওরাত ও গসপেল অব বারনাবাস নামক কিতাবগুলোতে নবিজির নাম খুঁজে পাওয়া যেত। খ্রিষ্ট পঞ্চম শতকের শেষে এসে গির্জা-শাসন এগুলোর পাঠ নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। বন্ধ করে দেয় এগুলোর প্রচার-প্রসার। সম্প্রতি এর কয়েকটি কপি মৃতসাগর (Dead Sea) অঞ্চলে খুঁজে পাওয়া যায়। গসপেল অব বারনাবাসে নবিজির নাম-সংবলিত বেশ কটি বর্ণনা রয়েছে। যেমন: বইটির ৪১শ (একচত্বারিংশত্তম) সংস্করণের বর্ণনাটি এরকম—
“(২৯) অতঃপর আল্লাহ আড়ালে চলে গেলেন। এবং ফেরেশতা মিখাইল তাদের দুজনকে (আদম ও হাওয়া) ফিরদাউস জান্নাত থেকে বিতাড়ন করেন। (৩০) যখন আদম নজর করলেন তখন দেখলেন যে, দরজার ওপরে লেখা: 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর-রাসূলুল্লাহ'-এই বাক্যটি।” [১৯২]

ইমাম ইবনু তাইমিয়্যা বলেন, “রাসূলুল্লাহর পরিচয় সম্পর্কে আহলে-কিতাবরা তাদের কিতাব থেকে যে তথ্য জানত তা তাদের কাছ থেকে মুতাওয়াতির সূত্রে বর্ণিত হয়েছে।”

“পূর্বের নবি-রাসূলগণ মুহাম্মাদ সম্পর্কে যে সুসংবাদ দিয়েছেন এর জ্ঞানটা বিভিন্নভাবেই জানা যায়:
“প্রথমত, আজকের দিনে আহলে কিতাবদের কাছে তাওরাত ও ইনজীলের যে কিতাবগুলো আছে তার মধ্যে এ জ্ঞান রয়েছে।
“দ্বিতীয়ত, আরও জানা যায়, ওই কিতাবগুলোতে নির্ভরশীল ব্যক্তিদের দেওয়া তথ্য-উপাত্ত থেকে; এদের কেউ কেউ ইসলাম গ্রহণ করেছেন, আর কেউ কেউ গ্রহণ করেননি। বর্ণনাটি আনসারদের থেকে মুতাওয়াতির সূত্রে বর্ণিত। প্রতিবেশী আহলে-কিতাবরাই তাদেরকে মুহাম্মাদ আগমনের সংবাদ জানায়। জানায়- তিনি একদিন আল্লাহর রাসূল হবেন। এ ব্যাপারে তারা পূর্ণ ওয়াকিফহাল; তারা তাঁরই পথপানে চেয়ে অপেক্ষা করছে। নবিজির আগমনের প্রতীক্ষায় আছে আহলে-কিতাবরা—বিষয়টিই আনসারদেরকে ঈমান আনতে উদ্বুদ্ধ করে। তাই যখন রাসূল তাদেরকে ঈমানের পথে আহ্বান করেন; তারা সাথে-সাথেই ইসলাম গ্রহণ করেন এবং নবিজির হাতে আনুগত্যের শপথ নেন।” [১৯৩]

সালামা ইবনু সালামা ইবনু ওয়াশ, বাদর যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী একজন সাহাবি; তিনি বলেন, “আবদুল-আশহাল গোত্রে আমাদের একজন ইহুদি প্রতিবেশী ছিল। রাসূলুল্লাহর নবি হওয়ার আগের ঘটনা। একদিন এই প্রতিবেশী তার ঘর থেকে বের হয়ে ধীরে-সুস্থে ‘আবদুল-আশহাল গোত্রের একটি বৈঠকে এসে বসলেন। আমি সেদিন ওই মাজলিশের সবচেয়ে অল্পবয়স্ক ব্যক্তি ছিলাম। তার গায়ে জড়ানো ছিল একটা চাদর। আমি আমাদের উঠানে শুয়ে ছিলাম। আমার প্রতিবেশী লোকটি সেখানে এসে পুনরুত্থান, কিয়ামাত, হিসাব-নিকাশ, মীযান, জান্নাত-জাহান্নাম ইত্যাদি বিষয়ের আলোচনা পেশ করেন। বৈঠকে বসে যারা তার কথাগুলো শুনছিল তারা ছিল মুশরিক ও মূর্তিপূজারি। তারা বিশ্বাস করত, মৃত্যুর পর উত্থান বলে কোনো কিছুর অস্তিত্বই নেই।

শ্রোতারা তখন সমস্বরে তাকে বলে উঠল, ‘ধিক তোমার জন্য, হে অমুক! তুমি কি আসলেই মনে করো যে, মানুষকে তাদের মৃত্যুর পর আবার উত্থিত করা হবে এমন এক জায়গায় যেখানে জান্নাত-জাহান্নাম বলে কিছু একটা আছে? এবং তুমি কি সত্যিই বিশ্বাস করো যে, সেখানে তাদেরকে তাদের কর্মের প্রতিদান দেওয়া হবে?’ তিনি বললেন, ‘হ্যাঁ, যার নামে কসম করা হয় সে সত্তার কসম, আমি এটা মনে- প্রাণে বিশ্বাস করি।’ এরপর তিনি আরও বলেন, ‘যাকে ওই আগুনে দেওয়া হবে এবং আগুনের প্রথম আঘাত আসার পরই ওই লোকটি আশা করবে যে, ইহজগতেই যদি সে নরকের চেয়েও ভয়াবহ উনুনে দগ্ধ হয়ে পরকালে প্রবেশ করত এবং নরক থেকে পরিত্রাণ পেত!’

তারা বলল, ‘তুমি এসব কী ছাইপাঁশ শোনাচ্ছ? এটা যে ঘটবেই তার কী প্রমাণ?’ তিনি বললেন, ‘একজন নবি, যার আগমন ঘটবে দেশটির এই কোণ থেকে।’—এই বলে তিনি মাক্কা ও ইয়েমেনের দিকে অঙুলি নির্দেশ করেন।

তারা জানতে চাইল, ‘এবং আমরা তাঁর দেখা কবে পাব?’ এই সময় ইহুদি লোকটি আমার দিকে তাকান—সে সময় উপস্থিত লোকদের মধ্যে আমিই সবচেয়ে কমবয়স্ক—এবং বললেন, ‘হয়তো এই কিশোর তার অন্তিম বয়সে সেই নবির সাক্ষাৎ পাবে।’

আল্লাহর কসম! মারা যাওয়ার আগে আমার জীবদ্দশাতেই আল্লাহ তা'আলা তাঁর রাসূলকে প্রেরণ করেন। তিনি আমাদের মাঝে জীবিত ছিলেন। ওই বৈঠকে সেদিন আমরা যারা শ্রোতা ছিলাম, সবাই তাঁর ওপর ঈমান আনি। কিন্তু অবাক ব্যাপার হলো, যে লোকটি আমাদেরকে তাঁর আগমনের সুসংবাদ দিয়েছিল, হিংসা-বিদ্বেষবশত ভ্রষ্টতার কারণে সে তাঁর ওপর ঈমান আনেনি; তাঁকে মেনে নিতে অস্বীকার করে সে। তখন আমরা তাকে বললাম, 'ওহে, তোমার ধ্বংস হোক! তুমিই তো সে ব্যক্তি, যে কিনা আমাদেরকে নবিজির আগমনের বিষয়ে সংবাদ দিয়েছিলে?' সে উত্তর করল, 'হ্যাঁ, অবশ্যই, তবে ইনি সেই লোক নন'।” [১৯৪]

ইমাম ইবনু তাইমিয়্যা (রাহিমাহুল্লাহ) জানান, "আমি যাবুর কিতাবের একটি কপিতে নবিজির নামসহ তাঁর নুবুওয়াতের কথা স্পষ্টভাবে লেখা দেখেছি। কিন্তু আরেকটি কপিতে এর কিছুই দেখিনি।” [১৯৫]

তাওরাতে বিধৃত রাসূলুল্লাহর বৈশিষ্ট্যের কথা বলতে গিয়ে 'আবদুল্লাহ ইবনু 'আমর বলেন, “আল্লাহর কসম! নবিজির যে গুণ-বৈশিষ্ট্য কুরআনে উল্লেখ করা হয়েছে, সেগুলোর কিছু গুণ তাওরাতেও উল্লেখ হয়েছে। যেমন:
“হে নবি! আমি তোমাকে পাঠিয়েছি একজন সাক্ষী, সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারী হিসেবে।” (সূরা আহযাব, ৩৩: ৪৫) (তাওরাতেও গুণগুলোর কথা উল্লেখ আছে, তাছাড়া তাওরাতে বর্ধিতাকারে আরও আছে) মূর্খদের সুরক্ষাকারীরূপেই। তুমি আমার বান্দা ও রাসূল। আমি তোমার নাম রেখেছি মুতাওয়াক্কিল। তুমি না রূঢ়-প্রকৃতির, না কঠোর-হৃদয়ের; আর না হাট-বাজারে চিৎকারকারী। খারাপের প্রতিবাদ খারাপ আচরণ দিয়ে করেন না তিনি; দোষ উপেক্ষা ও ক্ষমা করে দেন বরং। তাঁর মাধ্যমে বক্র জাতিকে সোজা না করা পর্যন্ত আল্লাহ তাঁকে মৃত্যু দিচ্ছেন না। এবং লোকেরা যে পর্যন্ত না বলবে, 'লা ইলাহ ইল্লাল্লাহ' এবং যে পর্যন্ত এই কালিমা দ্বারা তিনি অন্ধ চোখ, বধির কান এবং গাফিল ও অমনোযোগী মন খুলে না দেন।” [১৯৬]

কা'আব আল-আহবার থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, "নিশ্চয়ই আমি তাওরাতে নিচের কথাগুলো লেখা পেয়েছি:
'মুহাম্মাদুর-রাসূলুল্লাহ'-মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল; তিনি অমার্জিত নন, কর্কশও নন। আর না তিনি হাট-বাজারে চিৎকারকারী। তিনি খারাপের বদলা খারাপ আচরণ দিয়ে নেন না; বরং ক্ষমা করে দেন, এড়িয়ে যান তার দোষ-ত্রুটিগুলো। তাঁর উম্মাহ উচ্চপ্রশংসাকারী এক জাতি: জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে তারা আল্লাহর গুণগান গায়, প্রতিটি নড়াচড়ায় আল্লাহর মাহাত্ম্য বর্ণনা করে ('আল্লাহ ‘আল্লাহু আকবার'-এ কথা বলে)। নিজেদের শরীরের অর্ধাংশ পর্যন্ত নিম্নবস্ত্র দিয়ে আবৃত করে নেন তারা এবং উযূ করেন হাত-পায়ের প্রান্তসীমা পর্যন্ত। সালাতের কাতার আর যুদ্ধের সারি তাদের একই; দুটোর মধ্যে কোনো তফাত নেই। তাদের মু'আযযিন আকাশের খোলা অংশে তাদেরকে আহ্বান করেন। এবং গভীর রাতে তারা মৌমাছির গুনগুনানির মতো গুঞ্জরন করেন (শেষরাতে তারা সালাত আদায় এবং কুরআন তিলাওয়াত করেন)। তাঁর (নবিজির) জন্মস্থান মাক্কায়।” হিজরাত করবেন তবায় (মাদীনায়) আর তাঁর রাজত্ব হবে শাম দেশে। [১৯৭]

টিকাঃ
১৯১. দেখুন: রাসূল মুহাম্মাদ -এর ব্যক্তিত্ব: একটি সমীক্ষা, পৃ. ১০১, ১০২।
১৯২. দেখুন: 'উমারি, আস-সীরাহ আন-নাবাওয়িয়া, ১/১১৮।
১৯৩. দেখুন: ইবনু তাইমিয়্যা, আল-জাওয়াবুস-সহীহ, ১/৩৪০।
১৯৪. ইবরাহীম আল-আলি, সহীহ আস-সীরাহ আন-নাবাওয়িয়া, পৃ. ৩১।
১৯৫. আল-জাওয়াবুস-সহীহ, ১/৩৪০।
১৯৬. সহীহ বুখারি, বেচাকেনা অধ্যায়, হাদীস নং ২১২৫; ইমাম বুখারি রহিমাহুল্লাহ হাদীসটি তাফসীর অধ্যায়েও ৪৮৩৪ নং হাদীসে উল্লেখ করেছেন।
১৯৭. সহীহুস-সীরাহ আন-নাবাওয়িয়া, পৃ. ৩০।

📘 রউফুর রহীম 📄 রাসূলুল্লাহর নুবুওয়াত সম্পর্কে আহলুল-কিতাব মনীষীদের সুসংবাদ

📄 রাসূলুল্লাহর নুবুওয়াত সম্পর্কে আহলুল-কিতাব মনীষীদের সুসংবাদ


সালমান ফারসি তাঁর ইসলাম গ্রহণের বিখ্যাত সে-ই ঘটনাটি জানিয়ে গেছেন সবাইকে; সত্যের খোঁজে তিনি সেসময় এক দেশ থেকে আরেক দেশে হন্যে হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। কিছু সময় তিনি একজন পাদ্রীর তত্ত্বাবধানেও থাকেন। একদিন পাদ্রী সালমান ফারসিকে ডেকে বললেন,
“নিশ্চয়ই ইবরাহীমের দীন নিয়ে যে নবির আগমন ঘটবে তাঁর আসার সময় ঘনিয়ে এসেছে। জন্ম নেবেন তিনি আরবে। দুই হাররার [১৯৮] মধ্যকার খেজুর গাছ শোভিত একটি অঞ্চলে তিনি হিজরাত করবেন। তাঁর অনেকগুলো নিদর্শন থাকবে। সবাই দেখতে পাবে সেগুলো। হাদিয়া বা উপঢৌকন হিসেবে যা পাবেন, সেখান থেকে খাবেন তিনি। কিন্তু সাদাকা বা দান-খয়রাত করা হয়েছে এমন কিছু তিনি খাবেন না। দুই কাঁধের মধ্যখানে রয়েছে তাঁর নুবুওয়াতের সিলমোহর। তোমার যদি ওই দেশে গিয়ে তাঁর সঙ্গে দেখা করার সুযোগ হয় তবে তা-ই করো।” [১৯৯]

সালমান ফারসি পাদ্রীর কথানুযায়ী মাদীনায় পৌঁছেন। মাদীনায় আগমন, দাসে পরিণত হওয়াসহ সব ঘটনা বিস্তারিত তুলে ধরেন তিনি। রাসূল তখন হিজরাত করে মাদীনায় অবস্থান করছেন। পাদ্রীর কথার সত্যতা পরীক্ষা করার জন্য নবিজির কাছে গিয়ে হাজির হন সালমান। খাবার এগিয়ে দেন তাঁর দিকে। তবে নবিজিকে তিনি খাবারগুলো সাদাকা হিসেবে দেন। রাসূলুল্লাহর একটা দানা-পানিও মুখে তোলেননি। এরপর সালমান ফারসি আরও খাবার দেন রাসূলুল্লাহকে। তবে এবার তিনি খাবারগুলো সাদাকা হিসেবে না দিয়ে হাদিয়া বা উপহার হিসেবে দেন। এবার রাসূল সেখান থেকে খেলেন। এরপর অন্য এক ছুতোয় সালমান ফারসি তৃতীয় এবং শেষ নিদর্শনটিও নিজ চোখে দেখেন- রাসূলুল্লাহর দুই কাঁধের মাঝে নুবুওয়্যাতের সিল। পাদ্রীর কথা অক্ষরে অক্ষরে মিলে যাচ্ছে দেখে সালমান ফারসি সঙ্গে সঙ্গেই ইসলাম গ্রহণ করেন। [২০০]

এ ধারারই আরেকটি ঘটনা আবু তাইহান নামের এক লোকের। তিনি নিজ দেশ শাম থেকে একবার মাদীনায় আসেন। সেখানে গিয়ে থাকা শুরু করেন সেখানকার কুরাইযা গোত্রে। তবে রাসূলুল্লাহর নবি হওয়ার দু-বছর আগেই আবু তাইহান মারা যান। মৃত্যুশয্যায় কুরাইযা গোত্রের লোকদের ডেকে তিনি বললেন, “হে ইহুদি সমাজ, আচ্ছা বলো তো দেখি, মদ ও ভোগ-বিলাসিতার দেশ শাম ছেড়ে অভাব, দারিদ্র্য ও ক্ষুধায় জর্জরিত একটি দেশে (হিজায অর্থাৎ মাদীনায়) কেন এলাম আমি?”

উত্তরে তারা জানাল, "আপনিই ভালো বলতে পারবেন।” তিনি বললেন, "আমি এ দেশে এসে অপেক্ষা করছি এমন একজন নবির আগমনের, যার আসার সময় ঘনিয়ে এসেছে। আমি আশা করি তাঁর আগমনের (আমার জীবদ্দশাতেই), যাতে আমি তাঁর অনুসরণ করতে পারি।”

আবু তাইহানের এমন কথা গোপন থাকেনি; ছড়িয়ে পড়ে সর্বত্র। ইহুদিরা ছাড়াও অন্যদের মধ্যেও খবরটি জানাজানি হয়ে যায় দ্রুত। বিষয়টি এক সময় তাদের মধ্যে বিদ্বেষ-বিচ্ছিন্নতার পর্যায়ে গিয়ে গড়ায়। এর জের ধরেই ইহুদিরা মাদীনার লোকদের হুমকি দিয়ে বেড়াত, "শেষ নবির আগমনের সময় হয়ে গেছে; এই তিনি এলেন বলে। আমরা তাঁর নেতৃত্বে যুদ্ধে তোমাদেরকে হত্যা করব; ঠিক যেভাবে ইরাম ও 'আদ জাতিকে হত্যা করা হয়েছিল।” [২০১] ইহুদিদের এমন হুমকি-ধমকিতে কোনো কাজ হয়নি; বরং হিতে বিপরীত হয়। দেখা যায়, মাদীনার আউস ও খাযরাজ গোত্র দুইটির অনেক লোক ইহুদিদের এমন কথাবার্তার কারণেই ইসলাম গ্রহণ করেন।

পরবর্তী সময়ে আনসার সাহাবিদের কেউ কেউ বলেন, “আল্লাহর রাহমাত ও তাঁর হিদায়াতে যে যে বিষয় আমাদেরকে ইসলাম গ্রহণে উৎসাহ জোগায় তার একটি হলো, নবিজির আগমনের ব্যাপারে ইহুদিদের বিভিন্ন কথাবার্তা; সে সময়ে আমরা শির্ক করতাম, লিপ্ত থাকতাম মূর্তিপূজায়। অন্যদিকে ইহুদিরা ছিল আহলুল-কিতাব; আসমানি কিতাবধারী। তাদের কাছে কিতাবের এমন এমন জ্ঞান ছিল যা আমাদের ছিল না। তবে তাদের ও আমাদের মধ্যে সদ্ভাব ছিল না; লেগেই থাকত শত্রুতা। তাদের অপছন্দ এমন একটা বিষয় যখন আমরা তাদের কাছ থেকে লাভ করলাম তখন তারা আমাদেরকে ধমকের সুরে বলল, 'শেষ নবির আগমনের সময় হয়ে গেছে; এই তিনি এলেন বলে। আমরা তাঁর নেতৃত্বে তোমাদেরকে হত্যা করব; ঠিক যেভাবে ইরাম ও 'আদ জাতিকে হত্যা করা হয়েছিল'।” [২০২]

রাসূলুল্লাহর চিঠি পেয়ে রোমের শাসক হিরাক্লিয়াস বলেছিল, “আমি জানতাম তিনি (মুহাম্মাদ ) আসছেন। তবে কল্পনাও করতে পারিনি যে, তিনি তোমাদেরই (একজন আরব) একজন হবেন।” [২০৩]

টিকাঃ
১৯৮. হারা বলা হয় এমন এক অঞ্চলকে যা অগ্নিগিরিসদৃশ পাথরে পাথরে ভর্তি; অঞ্চলটি মূলত পূর্ব-পশ্চিম দিককার মাদীনার সীমান্ত অঞ্চল।
১৯৯. ইবনু কাসীর, আস-সীরাহ আন-নাবাওয়িয়া, ১/৩০০।
২০০. 'উমারি, আস-সীরাহ আন-নাবাওয়িয়া, আস-সহীহা, ১/১২২।
২০১. দেখুন: ড. মুহাম্মাদ কল'আজি, দিরাসাহ তাহলীলিয়‍্যাহ, পৃ. ১০৭।
২০২. হাসান সনদে ইবনু হিশাম থেকে বর্ণিত, ১/২৩১।
২০৩. দেখুন: সহীহ আস-সীরাহ আন-নাবাওয়িয়া, পৃ. ১৪৬।

ফন্ট সাইজ
15px
17px