📘 রউফুর রহীম 📄 মেষ চরানোর মধ্যে নিহিত কল্যাণ

📄 মেষ চরানোর মধ্যে নিহিত কল্যাণ


ধৈর্য
সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত একজন রাখালকে তার মেষপাল চরানোর কাজে ব্যস্ত থাকতে হয়। তবে মেষ চরানো কিন্তু সহজ কোনো কাজ নয়; এদের স্বভাবই হলো: তারা ধীরে ধীরে খায়। একাজে একজন রাখালের থাকা চাই প্রচণ্ড ধৈর্য এবং সহনশীলতা। এই যদি হয় মেষ চরানোর বেলায়, তা হলে মানুষ পরিচালনায় ধৈর্যের কত যে প্রয়োজন তা বলার অপেক্ষা রাখে না। [১৪২]

একজন রাখালের যাপিত জীবন সাদামাটা হবে সেটাই স্বাভাবিক। রাজপ্রাসাদে রাজার হালে সে থাকবে তা কেবল স্বপ্নেই সম্ভব। আর এটা তার সাধ্যেরও বাইরে। বরং সে তেজোদীপ্ত সূর্যের প্রখর তাপে চলাফেরা করে। মেষ চরায়। তার ওপর পরিবেশটা যদি হয় আরব উপদ্বীপের মতো তৃষাতপ্ত মরুভূমি, চারপাশে নিরুদ্ধ নিঃশ্বাস তা হলে তো কথাই নেই। রোদের প্রচণ্ডতা সেখানে আরও বেশি। তার পিপাসা মেটানোর জন্য চাই পর্যাপ্ত পানির। যেখানে সামান্য পানিরই বড় অভাব, সেখানে পর্যাপ্ত পানি সে পাবে কোথায়? দিশেহারা হয়ে সে চারপাশে খাবার বা পানি হন্যে হয়ে খুঁজে বেড়ায়। কিন্তু শুষ্ক কিছু তৃণ ছাড়া আর যে কিছুই জোটে না। তখন সে বাধ্য হয়েই এমন রূঢ় পরিবেশের সঙ্গে নিজেকে খাপ খাইয়ে নেয়। ধীরে ধীরে সে সবকিছুতে হয়ে ওঠে অভ্যস্ত, হয়ে ওঠে কষ্টসহিষ্ণু। [১৪৩]

বিনম্রতা
একজন রাখাল রাখালি করতে করতে অন্যদিকে আর খেয়াল থাকে না; তার ধ্যান- জ্ঞান হয়ে ওঠে কেবল তার মেষপালের যত্ন-আত্তি, মেষছানার দেখভাল ও হিংস্র প্রাণীদের আক্রমণ প্রতিহত করে সেগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। এখানেই শেষ নয়, রাতের বেলাতেও মেষপালের কাছাকাছি তাকে ঘুমাতে হয়। পালের পাশে ঘুমাতে গিয়ে হয়তো দেখা গেল মেষের চোনার ছিটেফোঁটা তার নাকে-মুখে এসে পড়ছে। কিংবা পাশ ফিরে শুতে গিয়ে নাদা লেগে গেল হাতে। এত উপদ্রবের পরও রাখাল কিন্তু বিরক্তি প্রকাশ করছে না মোটেই। এভাবে যেতে যেতে একটা সময় এসে সব উপদ্রব তার গা-সয়ে যায়। অহংকার-অহমিকা, গর্ব-বড়াই তিরোহিত হতে থাকে তার চরিত্র থেকে। বিনয়ী হতে শুরু করে সে। [১৪৪]

সহীহ মুসলিমে এসেছে, রাসূল বলেন, “যার অন্তরে শস্যদানা পরিমাণ অহংকার থাকবে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে না।”

তখন একজন লোক জানতে চাইল, “একজন ব্যক্তি ভালোবাসে যে, তার পোশাক সুন্দর হোক এবং তার জুতা দেখতে ভালো দেখাক (তা হলে এটা কি অহংকার হবে?)।” রাসূল উত্তর করেন, “নিশ্চয় আল্লাহ সুন্দর। তিনি সুন্দরকে ভালোবাসেন। অহংকার হলো: সত্যকে অস্বীকার করা এবং মানুষকে অবজ্ঞা করা।” [১৪৫]

বীরত্ব
রাখাল তার পালের প্রতিটি মেষের প্রতি সমান দায়িত্ব পালন করে। তাদের নিরাপত্তা বিধানে সে থাকে সচেষ্ট। ভয়ংকর, বন্য সব প্রাণী কখন আক্রমণ করে ছাগলপালের ওপর এ ভয়ে তটস্থ থাকতে হয় তাকে। চোখ-কান খোলা রেখে চারপাশে বোলাতে হয় সতর্ক নজর। এমন সংকুল পরিবেশই তাকে তার মেষপাল রক্ষার তাগাদায় গড়ে তোলে প্রচণ্ড সাহসী করে। [১৪৬]

দয়া-মায়া
মেষপালের যত্ন-আত্তির অংশ হিসেবে একজন রাখালকে অনেক কাজই আঞ্জাম দিতে হয়। কোন ছাগলটি অসুস্থ তার খোঁজ রাখা, পাহাড়ের ওপর থেকে পাথরে আছড়ে পড়ে কার হাড্ডি গুঁড়া হয়েছে কিংবা গুঁতোগুঁতি করতে গিয়ে কে চোট পেয়েছে-এমন খবরাখবর সবই তার কাছে আছে। সঙ্গে সঙ্গে সে উঠে-পড়ে লেগে যায় এগুলোর সেবা-শুশ্রূষায়। অবলা প্রাণী বলে কথা; মুখ ফুটে বলতে পারে না কিছু ঠিকই। তাই বলে ব্যথা যে পেয়েছে সেটা তো আর মিছে হয়ে যায় না।

এমন কাজের জন্য একজন রাখালের হওয়া চাই দরদদিল মানুষ। তাদের ব্যথা উপশমে, রোগ-চিকিৎসায় তাকে যত্নবান হতে হয়। আর অবলা প্রাণীকে যে ব্যক্তি দয়া করতে শিখল, সে যে মানবের প্রতি অধিক দয়াবান হবে এটাই স্বাভাবিক। বিশেষ করে, তিনি যদি একজন রাসূল হন তবে তো তাঁকে অবশ্যই আরও অধিক দয়াশীল হতে হবে মানুষের প্রতি। কারণ, আল্লাহ তাঁকে পাঠিয়েছেন মানুষকে শিক্ষা দেওয়ার জন্য। জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচার পথ বাতলানো এবং দুনিয়া ও আখিরাতের সৌভাগ্যের খোঁজ মানুষকে দেবেন তিনিই। [১৪৭]

পরিশ্রম করে উপার্জনের প্রতি সহজাত প্রবৃত্তি
আল্লাহ চাইলে নবিজিকে মেষ চরানোর কাজ থেকে বিরত রাখতে পারতেন। কিন্তু তিনি তা করেননি। এটা যেমন রাসূলুল্লাহর জন্য, তেমনই আমাদের জন্যও শিক্ষা। আমাদেরকে পরিশ্রম করে, মাথার ঘাম পায়ে ফেলে, গতর খেটে উপার্জন করে রুটি-রুজির বন্দোবস্ত করতে হবে। আর রাসূলুল্লাহর এই মেষ চরানোটা হাতের কামাই খাওয়ার এমনই একটি অনন্য উদাহরণ মাত্র। ইমাম বুখারি তার সহীহ বুখারিতে মিকদাম থেকে বর্ণনা করেন যে, রাসূল বলেন, “নিজের হাতের কামাই খাওয়ার চেয়ে উত্তম খাবার কেউ কখনোই খায়নি। নিশ্চয়ই আল্লাহর নবি দাউদ নিজ হাতের কামাই খেতেন।” [১৪৮]

সন্দেহ নেই, হালাল উপার্জন মানুষকে খুবই স্বাধীনচেতা করে গড়ে তোলে। অন্যায়-অবিচার, বাতিলের বিরুদ্ধে কথা বলতে তার বুক কাঁপবে না এতটুকু। [১৪৯] কত মানুষকে দেখা যায় বাতিলকে রুখে দাঁড়ানো দূরে থাক, টু শব্দটি পর্যন্ত করার সাহস পায় না। সব অন্যায়-অবিচার দেখেও তারা না দেখার ভান করে পাশ কাটিয়ে চলে যায়। মেনে নেয় সবকিছু মান-সম্মান বিসর্জন দিয়ে। বাতিলের সামনে মাথা নুইয়ে দেয় অবলীলায়। যেন তাদের জন্মই হয়েছে চুপ করে সব দেখে যাবার জন্য। তাদের ভয়-প্রতিবাদ করলেই যে চাকরি খোয়াতে হবে তাকে। পথে বসতে হবে রুটি-রুজির চিন্তায়। [১৫০]

রুটি-রুজি উপার্জনের তাগাদায় রাসূলুল্লাহর মেষ চরানোর কাজ বেছে নেওয়ার পেছনে অবশ্যই কিছু উদ্দেশ্য রয়েছে। রাসূল উন্নত রুচি ও তীক্ষ্ণ অনুভূতিসম্পন্ন ব্যক্তি ছিলেন। আল্লাহ তাঁকে এমন দুটি মহৎ গুণ দিয়ে সৌন্দর্যমণ্ডিত করেছেন। চাচা আবু তালিব তাঁকে খুব ভালোবাসতেন। বাবার স্নেহ-মমতা, আদর-যত্ন দিয়ে তিনি ভাতিজাকে কোলে-পিঠে করে বড় করেন। সেসময় চাচার সংসারের ব্যয়ভার ছিল অনেক বেশি। উপরন্তু তার ব্যবসা-বাণিজ্যও খুব একটা ভালো যাচ্ছিল না। রাসূল দেখলেন চাচার ব্যয়ভার কিছুটা হলেও জোগান দেওয়ার সক্ষমতা তাঁর আছে। যেই ভাবা সেই কাজ। তিনি উপার্জন করতে এগিয়ে আসেন। সাংসারিক খরচ জোগাতে তিনি মাথার ঘাম পায়ে ফেলেন। তিনি যে স্বভাবে উদার, আচার-ব্যবহারে সদাচার এবং সাধ্যের সবটুকু ব্যয় করতে সচেষ্ট ছিলেন, তার একটি বড় প্রমাণ এটি। [১৫১]

আরেকটি বিষয়ও এখান থেকে প্রমাণিত, আল্লাহ তাঁর সৎবান্দাদের জন্য দুনিয়াতে জীবনযাপনের এমন ব্যবস্থাও করে থাকেন। রাসূলুল্লাহর যাপিত জীবনকে আল্লাহ চাইলেই সহজ করে দিতে পারতেন। তিনি ইচ্ছা করলে রাসূলুল্লাহর শৈশবের সূচনায় ভোগ-বিলাসিতা, সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য, আরাম-আয়েশ তাঁর দুপায়ে লুটিয়ে দিতে পারতেন। এতে নবিজিকে আর রিস্ক অনুসন্ধানে, অন্ততপক্ষে ঘাম ঝরানো কোনো কাজ কিংবা মেষ চরানো লাগত না।

কিন্তু আল্লাহর প্রজ্ঞা মহান। তিনি চান আমরা যাতে অনুধাবন করি যে, মানবের উৎকৃষ্ট উপার্জন হলো তার হাতের কামাই এবং সেই উদ্যোগ যা মানুষ সমাজসেবা ও জাতি বিনির্মাণে গ্রহণ করে। [১৫২]

টিকাঃ
১৪২. দেখুন: ড. ইয়াহইয়া, মাদখাল লিফাহমিস-সীরাহ, পৃ. ১২৪।
১৪৩. দেখুন: আবু ফারিস, আস-সীরাহ আন-নাবাওয়িয়া, পৃ. ১১৪, ১১৫।
১৪৪. প্রাগুক্ত, পৃ. ১১৪।
১৪৫. সহীহ মুসলিম, হাদীস নং-১৪৭-(৯১)।
১৪৬. দেখুন: আবু ফারিস, আস-সীরাহ আন-নাবাওয়িয়া, পৃ. ১১৪।
১৪৭. দেখুন: মাদখাল লিফাহমিস-সীরাহ, পৃ. ১২৭।
১৪৮. সহীহ বুখারি, কিতাবুল বুয়ু', হাদীস নং-২০৭২।
১৪৯. দেখুন: মাদখাল লিফাহমিস-সীরাহ, পৃ. ১২৮।
১৫০. দেখুন: গাদবান, ফিকহুস-সীরাহ, পৃ. ৯৩।
১৫১. দেখুন: বৃতি, ফিকহুস-সীরাহ, পৃ. ৫০।
১৫২. প্রাগুক্ত

📘 রউফুর রহীম 📄 সকল পাপাচার থেকে সুরক্ষা

📄 সকল পাপাচার থেকে সুরক্ষা


আল্লাহ তা'আলা তাঁর রাসূলকে সুরক্ষা দেন শির্ক ও মূর্তিপূজার মতো জাহিলিয়্যাতের সব ধরনের পঙ্কিলতা থেকে। ইমাম আহমাদ তার মুসনাদে হিশাম ইবনু 'উরওয়াহ থেকে বর্ণনা করেন, তিনি তার বাবা থেকে বর্ণনা করেন যে,

“খাদীজার এক প্রতিবেশী আমাকে বলেন, তিনি খাদীজাকে উদ্দেশ করে রাসূলুল্লাহকে বলতে শুনেছেন, 'খাদীজা, আল্লাহর কসম! আমি কখনোই লাতের পূজা করিনি এবং আল্লাহর কসম, আমি কখনোই 'উযযার পূজা করিনি'।” [১৫৩] বেদিমূলে উৎসর্গকৃত জবেহ করা প্রাণীর গোস্তও খেতেন না রাসূল। যাইদ ইবনু 'আম্র ইবনু নুফাইলও এমনটিই করতেন; তিনিও বেদিমূলে জবেহকৃত প্রাণীর গোস্ত খেতেন না।” [১৫৪]

“যৌবনে অসংযত আচরণের কারণে লজ্জাজনক, অরুচিকর ও গর্হিত অনেক কাজই করে ফেলে মানুষ। কিন্তু আল্লাহ তা'আলা নবিজিকে এমন সব বিষয় থেকেও হেফাজত করেছেন আপন কৃপায়। কারণ, আলোর পথের দিশারি এবং হিদায়াতের বাণী প্রচারকদের এমন তুচ্ছ ব্যাপার চর্চা করাও সাজে না।” [১৫৫]

'আলি ইবনু আবু তালিব থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “আমি রাসূলুল্লাহকে বলতে শুনেছি, তিনি বলেন, 'সচরাচর জাহিলি যুগের মানুষেরা যেসব মন্দ কাজের মনস্থ করত, এমন কাজের অভিপ্রায় আমি কখনো করিনি। তবে জীবনের দুটো সময় ছিল এর ব্যতিক্রম; কিন্তু আল্লাহ দুবারই আমাকে রুচিহীন কাজ করা থেকে রক্ষা করেন। এক রাতের ঘটনা। আমি মাক্কার উত্তরে একটা স্থানে অবস্থান করছিলাম। সঙ্গে কুরাইশের এক যুবক। তার পরিবারের মেষপাল তার সাথে ছিল। সে এগুলো দেখাশোনার দায়িত্বে ছিল। আমি তাকে বললাম, 'আমার মেষ-ভেড়াগুলোর দিকে একটু খেয়াল রেখো। আজ রাতে মাক্কার আসরে গল্পগুজব করে একটু আড্ডা দিয়ে আসি। যেভাবে অন্য যুবকরা গল্পের আসরে মেতে থাকে।' সে বলল, 'ঠিক আছে।'
'এরপর আমি বেরিয়ে পড়ি। শহরের কাছাকাছি এলে গান, দফের বাজনা এবং বাঁশির আওয়াজ শুনতে পাই। জানতে চাই, 'এটা কী?' উপস্থিত লোকেরা বলল, 'অমুক ব্যক্তি অমুক মেয়েকে বিয়ে করেছে। লোকটি ছিল কুরাইশেরই এক ব্যক্তি, সে কুরাইশেরই আরেক মহিলাকে বিয়ে করেছে। আমি সে গান এবং সে বাজনার প্রতি কিছুটা আকৃষ্ট হই। একসময় হঠাৎ ঘুমে আমার দুচোখ লেগে আসে এবং অঘোরে ঘুমিয়ে পড়ি। সূর্যের তাপে (সকাল বেলায়) জেগে উঠি। এরপর ফিরে আসি। সেই (রাখাল) জানতে চাইল, 'কী করেছেন?' আমি তাকে জানালাম।

আরেক রাতে তাকে আবার একই অনুরোধ করি। সে রাজি হয়ে যায়। আমি বেরিয়ে পড়ি। আবার আগের মতো একই জিনিস শুনতে পাই। জানতে চাইলে লোকেরা আমাকে আগের মতোই উত্তর করে। যা শুনেছি তার প্রতি কিছুটা আকৃষ্ট হই। এক সময় ঘুমিয়েও পড়ি আমি। সকালের সূর্যের আলো এসে আমাকে জাগিয়ে তোলে। এরপর আমার ওই সাথির কাছে ফিরে আসি। সে বলল, 'কী করলেন?' বললাম, 'কিছুই করিনি'।”

রাসূল বলেন, “আল্লাহর কসম! জাহিলি যুগের লোকেরা যে খারাপ কাজগুলো করত, ওই ঘটনার পর থেকে আমি আর কখনোই খারাপ কাজের প্রতি আকৃষ্ট হইনি। এরপর আল্লাহ তো আমাকে তাঁর নবি করে সম্মানিত করেছেন।” [১৫৬]

হাদীসটি আমাদের সামনে গুরুত্বপূর্ণ দুটি দিক প্রতিভাত করে: মুহাম্মাদ একজন নবি ও রাসূল। তবে একইসাথে তাঁর মাঝে সৃষ্টিগতভাবে বিদ্যমান মানবীয় সব বৈশিষ্ট্যই বিদ্যমান ছিল। তিনিও আর সব যুবকের মতো স্বভাবজাত নানান প্রবণতার প্রতি একটা টান অনুভব করতেন নিজের মধ্যে। স্বভাবজাত এই প্রবণতাগুলো আল্লাহই মানুষের মধ্যে সৃষ্টি করেন। ফলে স্বাভাবিকভাবেই তিনি গল্পগুজব ও অনর্থক কাজের প্রতি একটা টান অনুভব করেন এবং এর উপভোগ্য দিকটাকে বুঝতে চেষ্টা করেন। তাঁর মন তাঁকে বলত, অন্যদের মতো তিনিও যদি এর কিছুটা উপভোগ করতে পারতেন!

আল্লাহ তা'আলা তা সত্ত্বেও নবিজিকে বাহ্যিক সকল বিচ্যুতি থেকে রক্ষা করেন। দা'ওয়াতের দাবির পরিপন্থি সব ধরনের কাজ থেকেও আল্লাহ তাঁর রাসূলকে আপন কৃপায় রক্ষা করেন। [১৫৭]

টিকাঃ
১৫৩. আল-মুসনাদ, হাদীস নং ১৭, ৯৪৭, মুআস্সাসাতুর-রিসালাহ সংস্করণের সম্পাদকগণ বলেন, এর বর্ণনা-সূত্রটি সহীহ। আরও দেখুন: আহমাদ ফারীদ, ওয়াকাফাত তারবাওয়িয়া, পৃ. ৫১।
১৫৪. দেখুন: আহমাদ ফারীদ, ওয়াকাফাত তারবাওয়িয়া, পৃ. ৫১।
১৫৫. দেখুন: মুহাম্মাদ 'উরজন, মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল, ১/১৯৩।
১৫৬. ইবরাহীম আল-'আলি, সহীহুস-সীরাহ আন-নাবাওয়িয়া, পৃ. ৫৭।
১৫৭. দেখুন: আল-বৃতি, ফিকহুস-সীরাহ, পৃ. ৫০, ৫১।

📘 রউফুর রহীম 📄 বুহাইরা পাদরির সাক্ষাৎ

📄 বুহাইরা পাদরির সাক্ষাৎ


কোনো এক বাণিজ্যিক সফরে আবু তালিব ভাতিজা মুহাম্মাদ -সহ কুরাইশ গোত্রের প্রধান ব্যক্তিদের নিয়ে শামে যাত্রা করেন। পথে তারা যাত্রা বিরতি করেন খ্রিষ্টান পাদরি বুহাইরার গির্জার কাছে। একে একে গাট্টি-বোঁচকা নামিয়ে রাখেন। বন্দোবস্ত করতে থাকেন থাকার। খবর পেয়ে বুহাইরা পাদরি তাদের সঙ্গে দেখা করতে আসেন। এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে যে, কুরাইশদের এটাই প্রথম বাণিজ্যিক কোনো সফর নয়; ইতঃপূর্বেও এ পথে বাণিজ্যিক-কাফেলা নিয়ে বহুবার যাওয়া- আসা করেছেন তারা। কিন্তু বুহাইরা এর আগে তাদের কাছে আসা তো দূরে থাক, নজরও করেননি ঠিকভাবে।

কুরাইশরা নিজেদের মাল-সামানা সামলে রাখছিল। এমন সময় পাদরি এসে হাজির সেখানে। তাদের মধ্যে ঘোরাঘুরি করতে থাকেন। একপর্যায়ে রাসূলুল্লাহর কাছে এসে তাঁর হাত ধরে বলে ওঠেন, “এই ব্যক্তি বিশ্বজাহানের সর্দার। ইনি বিশ্বজাহানের রব আল্লাহর রাসূল। আল্লাহ তাঁকে বিশ্ববাসীর জন্য রাহমাতরূপে পাঠাবেন।”

কুরাইশের সর্দাররা বলে ওঠেন, “আপনি জানলেন কী করে?”
তিনি উত্তর করেন, "আপনারা যখনই 'আকাবা থেকে এখানে এসে পৌঁছান, তখন এমন কোনো গাছ ও পাথর ছিল না যারা সিজদায় লুটিয়ে পড়েনি। হ্যাঁ, তারা সবাই নবির জন্যই কুর্নিশ করেছে। তাঁর কাঁধের নিচের কোমলাস্থিত নুবুওয়াতের সীল দেখেই আমি তাঁকে শনাক্ত করি। এই কোমালাস্থি দেখতে আপেলের মতো।”

এরপর পাদরি ফিরে আসেন গির্জায়। কুরাইশ-দলটির জন্য আয়োজন করেন খাবারদাবারের। তৈরি হলে পরে সেগুলো নিয়ে হাজির হন কুরাইশদের মাঝে। রাসূল সেখানে ছিলেন না; তখন তিনি পেছনে তাদের উটগুলো দেখভালের দায়িত্ব নিয়ে ব্যস্ত। পাদরি অনুরোধ করলেন, “তোমরা তাঁকে ডেকে নিয়ে এসে তোমাদের সঙ্গে বসাও।”

রাসূল ﷺ এলেন। মেঘমালা তাঁকে তখন ছায়া দিচ্ছিল। লোকদের কাছাকাছি এলে পাদরি নজর করে দেখলেন, আর কারও সঙ্গে নয়, কেবল রাসূলুল্লাহর সাথে সাথে গাছের ছায়া এগিয়ে আসছে। রাসূল বসলে গাছের ছায়া তাঁর ওপর এসে পড়ে। সব দেখে পাদরি বলে ওঠেন, “দেখুন, গাছ কীভাবে তাঁকে ছায়া দিচ্ছে!”

রাসূল তখনও আসর থেকে উঠে যাননি, এমন সময় পাদরি কুরাইশ নেতাদের কাছে এসে নবিজিকে রোমে না নেওয়ার অনুরোধ জানান। কারণ, রোমানরা যদি তাঁকে চিনে ফেলে, তবে তাঁকে নির্ঘাত মেরে ফেলবে। পাদরি কুরাইশদেরকে যখন এ কথাগুলো বলছিলেন তখন পাশ ঘুরে দেখেন রোমের দিক থেকে সাতজন লোক এগিয়ে আসছে। পাদরি এগিয়ে যান সেদিকে। জানতে চান, তারা কী চায়। তারা জানাল, “আমরা জানতে পেরেছি যে, প্রতীক্ষিত নবি এই মাসের মধ্যেই আগমন করছেন। এমন কোনো রাস্তা বাকি নেই যেখানে তাঁর খোঁজে লোক পাঠানো হয়নি। আমাদেরকেও তাঁর খোঁজ করতে আপনার এই পথে পাঠানো হয়েছে।”

পাদরি বললেন, "মনে করো, আল্লাহ কোনো একটি বিষয় বাস্তবায়ন করতে চাচ্ছেন, মানুষের কি সাধ্য আছে তা ঠেকানোর?” তারা একবাক্যে স্বীকার করল, “না, নেই।” তখন তিনি বললেন, “তা হলে তোমরা সবাই তাঁর বাই'আত (আনুগত্যের শপথ) গ্রহণ করো এবং তাঁর সঙ্গে থাকো।”

আগত রোমান লোকেরা পরে কুরাইশদের সাথে যোগ দেয় এবং রাসূলুল্লাহর কোনো ক্ষতি করা থেকে বিরত থাকে। পাদরি এবার কুরাইশ দলটির দিকে ফিরে বললেন, “আমি সনির্বন্ধ অনুরোধ করছি, আমাকে বলো তো তোমাদের মধ্যে কে তাঁর অভিভাবক?” তারা বলল, “আবু তালিব।” আবু তালিবকে পাদরি জোর অনুরোধ করেন, তাঁকে রোমে না নিয়ে যাওয়ার জন্য। অবশেষে আবু তালিব ভাতিজাকে পাঠিয়ে দেন মাক্কায়। [১৫৮]

শিক্ষা ও উপকারিতা
আহলুল-কিতাবদের মধ্যে সত্যবাদী পাদরিরা জানতেন যে, নবিজিই মানবতার রাসূল। তারা তাদের আসমানি কিতাবে বর্ণিত নবিজির গুণাগুণ ও বিভিন্ন নিদর্শন দেখেই তাঁকে শনাক্ত করতে পারেন।

আল্লাহর আদেশে নবিজির উদ্দেশে গাছ ও পাথরের অবনত হওয়া এবং মেঘমালা ও গাছ ঝুঁকে পড়ে তাঁকে ছায়াবৃত করার বিষয়টি বিভিন্ন বর্ণনায় সত্য বলে প্রমাণিত।

চাচা আবু তালিব, বিশেষ করে কুরাইশ সর্দারদের সঙ্গে তার এই সফর থেকে রাসূল ﷺ প্রভূত উপকৃত হন। সেই সাথে পথিমধ্যে ভিনদেশি বিভিন্ন গোত্রের জীবনাচার, তাদের জীবিকা-নির্বাহ ইত্যাদি সম্পর্কেও সম্যক ধারণা পান তিনি। অভিজ্ঞ এই কুরাইশ সর্দারদের বিভিন্ন বিষয়ে রায়প্রদানের অসাধারণ মুনশিয়ানা, প্রায় সর্ববিষয়ে তাদের দক্ষতা, তাদের বুদ্ধিমত্তা থেকেও তিনি উপকৃত হন সমানভাবে এবং জীবনে এখনো সম্মুখীন হননি, এমন এমন অভিজ্ঞতাও অর্জন করেন এই বাণিজ্যিক সফর থেকেই।

খ্রিষ্টানদের থেকে সতর্ক থাকতে বুহাইরা পাদরির হুঁশিয়ারি। চাচা আবু তালিব ও কুরাইশ-সর্দারদের তিনি নবিজিকে রোমে না নেওয়ার জন্য জোর তাগাদা দেন। কারণ, রাসূলুল্লাহর নিদর্শন দেখে রোমানরা যদি একবার চিনে ফেলে, তবে নিশ্চিত তাঁকে মেরে ফেলবে; তারা জানতে পারে যে, প্রতিক্ষীত নবি তাদের সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবেন। নবিজিকে তারা নিজেদের সাম্রাজ্যের হুমকি বলে মনে করে। তাই একবার তাঁকে খুঁজে পেলেই হত্যা করবে তারা।

টিকাঃ
১৫৮. দেখুন: সহীহুস-সীরাহ আন-নাবাওয়িয়া, পৃ. ৫৮, ৫৯; ও তার টীকা-টিপ্পনি।

📘 রউফুর রহীম 📄 ফিজার যুদ্ধ

📄 ফিজার যুদ্ধ


ফিজার জাহিলি আরবে সংঘটিত একটি ঐতিহাসিক যুদ্ধ। কুরাইশ তাদের মিত্র কিনানাকে সঙ্গে নিয়ে হাওয়াযিন গোত্রের বিরুদ্ধে এ যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। যুদ্ধটি লাগার পেছনে বড় কোনো কারণই ছিল না। তুচ্ছ একটা কলহকে কেন্দ্র করে ধাপে ধাপে সেটা ভয়াবহ যুদ্ধে গিয়ে গড়ায়। 'উরওয়াহ আর-রহহাল ইবনু 'উতবা ইবনু হাওয়াযিন একবার নু'মান ইবনুল-মুনযিরকে 'উকাজ মেলায় যাওয়ার জন্য তাঁর পণ্যবাহী বহরকে প্রতিরক্ষা দেন। বারাদ ইবনু কাইস ইবনু কিনানা 'উরওয়ার কাছে জানতে চায়, “তুমি কিনানা গোত্রের বিরুদ্ধে নু'মানকে প্রতিরক্ষা দিলে?” উত্তরে সে জানাল, “হ্যাঁ, এবং দরকার হলে সকল মানুষের বিরুদ্ধেও তাঁকে প্রতিরক্ষা দেবো।” এরপর 'উরওয়া নু'মানকে সঙ্গে করে সে বহর নিয়ে মেলায় যায়। বারাদও খুব কাছ থেকে তাকে অনুসরণ করতে করতে এগিয়ে আসে। সুযোগ খুঁজতে থাকে হত্যা করার জন্য 'উরওয়ার একটা অসতর্ক মুহূর্তের। পরিস্থিত পর্যবেক্ষণ করে সুযোগমতো হাওয়াযিন গোত্রের প্রতিশোধ নেওয়া যাবে-এ আশায় তার গোত্র কিনানা হাওয়াযিন গোত্রকে কিছুই বুঝতে না দিয়ে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিয়ে বেরিয়ে পড়ে। কিন্তু খবরটি বেশিক্ষণ চাপা থাকেনি। হাওয়াযিনরা একসময় জেনে যায়; 'উরওয়াহ ও তার গোত্র হাওয়াযিন টের পেয়ে যায় তাদেরকে অনুসরণ করা হচ্ছে। সঙ্গে সঙ্গে তারা ঘুরে যায় কিনানা গোত্রের দিকে। মুহূর্তের মধ্যে চিত্র পালটে যায়; শিকার এখন শিকারে পরিণত। হারাম এলাকায় (মাক্কার যে অংশে রক্তপাত নিষেধ) আশ্রয় নেওয়ার পূর্বে কিনানাকে পেয়েও যায় তারা। প্রচণ্ড যুদ্ধ শুরু হয় উভয় পক্ষে। সারা দিন তুমুল যুদ্ধ হলো। রাতে কিনানার লোকেরা হারামের ভেতরে গিয়ে আশ্রয় নেয়। হাওয়াযিনও কিনানাদের হত্যা করা থেকে বিরত হয়। কিন্তু পরদিন হারাম এলাকাতেই আবার যুদ্ধ। চলল টানা কয়েকদিন। কুরাইশরা কিনানা গোত্রের প্রতি সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়। [১৫৯] রাসূলুল্লাহরও অংশগ্রহণ ছিল এ যুদ্ধে; অল্প কিছুদিন। চাচারা সঙ্গে করে রণাঙ্গণে নিয়ে যান তাঁকে।

আরবরা মাক্কার হারাম এলাকাকে পবিত্র বলে জ্ঞান করত; জাহিলি যুগেও তারা এই পবিত্রতাকে মেনে চলত। কেউই সীমালঙ্ঘন করত না। কিন্তু এই যুদ্ধে যেহেতু মাক্কার পবিত্রতা লঙ্ঘিত হয়েছে, তাই যুদ্ধটির নামকরণ হয় ফিজার যুদ্ধ। [১৬০] পরবর্তীকালে রাসূল ফিজার যুদ্ধের কথা উল্লেখ করতে গিয়ে বলেন,

“আমি শত্রুদের নিক্ষিপ্ত তিরগুলি ঠেকিয়ে দিতাম এবং তা কুড়িয়ে কুড়িয়ে চাচাদের হাতে তুলে দিতাম।” [১৬১]

ফিজার যুদ্ধের সময় রাসূলুল্লাহর বয়স ছিল চৌদ্দ কি পনেরো। কারও কারও মতে, বিশ বছর। যারা বলেন সে সময় রাসূলুল্লাহর বয়স ছিল চৌদ্দ তাদের যুক্তি হলো, রাসূল তখন শত্রুদের নিক্ষিপ্ত তিরগুলো কেবল কুড়িয়ে এনে চাচাদের কাছে বয়ে নিতেন। তিনি যুদ্ধ করেননি। যা প্রমাণ করে যে, তাঁর বয়স তখন খুব বেশি ছিল না; চৌদ্দ কি পনেরো।

তবে রাসূল এ যুদ্ধে অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে অর্জন করেন সাহসিকতা, নির্ভীকতা ও বীরত্ব। যৌবনের শুরুতেই যুদ্ধের একটা প্রশিক্ষণও হয়ে যায় তাঁর। আরবদের অধিকাংশ যুদ্ধের মতো ফিজার যুদ্ধটাও একসময় শেষ হয়...। আল্লাহ তাদের মধ্যে হৃদ্যতা সৃষ্টি করে দেন। পরবর্তীকালে তাদের মধ্যে ইসলামের আলো ছড়িয়ে দিয়ে অপসারিত করেন তাদের সকল ভ্রষ্টতা। [১৬২]

টিকাঃ
১৫৯. কিনানা গোত্রেরই একটি শাখা এই কুরাইশরা।
১৬০. ওয়াকাফাত তারবাওয়িয়া মা'আস-সীরাহ আন-নাবাওয়িয়া, পৃ. ৫৩।
১৬১. ইবনু হিশাম, আস-সীরাহ আন-নাবাওয়িয়া, ১/২২১-২২৪। আস-সীরাহ আল-হালাবিয়্যাহ, ১/১২৭-১২৯।
১৬২. ওয়াফাকাত তারবাওয়িয়া, পৃ. ৫৩।

ফন্ট সাইজ
15px
17px