📘 রউফুর রহীম 📄 মায়ের মৃত্যু এবং পর্যায়ক্রমে দাদা ও চাচার দায়িত্বভার গ্রহণ

📄 মায়ের মৃত্যু এবং পর্যায়ক্রমে দাদা ও চাচার দায়িত্বভার গ্রহণ


রাসূল যখন ৬ বছরের বালক তখন তাঁর প্রিয় মা এই পৃথিবী ছেড়ে চলে যান। মাক্কা ও মাদীনার মধ্যবর্তী আবওয়া নামক একটি জায়গাতে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। আমিনা তার ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে নিজের ভাই 'আদি ইবনু নাজ্জার গোত্রের কাছে গিয়েছিলেন। উদ্দেশ্য-ছেলেকে তাদেরকে দেখানো। সেখান থেকে মাক্কায় ফেরার পথেই আমিনা মারা যান। [১৩৩] আবওয়াতেই তাকে দাফন করা হয়।

মায়ের মৃত্যুর পর এবার তাঁর অভিভাকত্ব গ্রহণ করেন দাদা 'আবদুল-মুত্তালিব। তার তত্ত্বাবধানে রাসূলুল্লাহ বেড়ে উঠতে থাকেন। 'আবদুল-মুত্তালিব নিজের ছেলেদের ওপর নাতিকে প্রাধান্য দিতেন। তিনি খুবই গুরুগম্ভীর প্রকৃতির ছিলেন। তার ভয়ে ছেলেদের কেউই বাবার গদিতে বসার সাহস করতেন না। কিন্তু রাসূল অনায়াসেই দাদার গদিতে বসে পড়তেন। তাই দেখে চাচাদের কেউ কেউ বাবার গদি থেকে ভাতিজাকে উঠিয়ে দূরে কোথাও বসানোর চেষ্টা করতেন। 'আবদুল-মুত্তালিব উলটো নাতিকে তার পাশে আদর করে বসাতেন। রাসূলুল্লাহর মাঝে কল্যাণ রয়েছে দেখে নাতিকে তার পাশে বসতে তিনি উদ্বুদ্ধ করতেন। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, তার এই নাতি অন্য আর দশটি ছেলের মতো নয়; বরং ভবিষ্যতে অনন্য এক মর্যাদার আসনে সমাসীন হবে সে। [১৩৪] নাতিকে প্রচণ্ড ভালোবাসতেন দাদা। কোনো কাজে দাদা যদি তাঁকে পাঠাতেন তিনি সঙ্গে সঙ্গে তার ডাকে সাড়া দিতেন এবং সুষ্ঠুভাবে সে কাজটি সম্পন্ন করতেন।

একদিনের ঘটনা। দাদা নাতিকে পাঠালেন তার উটটি খুঁজে আনতে। কিন্তু খুঁজতে গিয়ে রাসূল ফিরে আসতে দেরি করছিলেন। [১৩৫] নাতির আসতে দেরি হচ্ছে দেখে দাদা অস্থির হয়ে যান। কা'বার চারপাশে তাওয়াফ করতে করতে আল্লাহর কাছে নাতিকে ফিরে পাওয়ার ফরিয়াদ করে তিনি বলছিলেন, “হে রব, আমার মুহাম্মাদকে ফিরিয়ে দাও, তাঁকে ফিরিয়ে দিয়ে আমার হিম্মত বাড়িয়ে দাও।”

এরপর উট সঙ্গে নিয়ে রাসূল যখন ফিরে এলেন তখন দাদা তাঁকে বললেন, "আহ! আমি তোমাকে নিয়ে খুবই চিন্তিত হয়ে পড়েছিলাম, তুমি আর কখনো আমাকে ছেড়ে দূরে যাবে না।” [১৩৬]

তারপর একদিন দাদাও চলে গেলেন এ নশ্বর পৃথিবী ছেড়ে। তখন রাসূলুল্লাহর বয়স মাত্র ৮ বছর। [১৩৭] মারা যাওয়ার আগে 'আবদুল-মুত্তালিব নিজ ছেলে আবু তালিবকে নাতির তত্ত্বাবধান করতে জোর ওসিয়ত করেন। এবার চাচা আবু তালিব ভাতিজার দেখভালের দায়িত্ব নেন। [১৩৮]

আল্লাহ ইচ্ছা ছিল তিনি তাঁর রাসূলকে প্রতিপালন করবেন একজন এতিম করে। চাইলেন নবিজি প্রতিপালিত হবেন তাঁর তত্ত্বাবধানে, কেবল তাঁরই রক্ষণাবেক্ষণে; তাঁকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে এমন কোনো অভিভাবকের সাহায্য-সহযোগিতা ছাড়া কিংবা তাঁর আরাম-আয়েশের মাত্রা বাড়িয়ে দেবে— এমন কোনো ধন-সম্পদের প্রাচুর্য থেকে দূরে, বহুদূরে রেখেই তিনি তাঁর রাসূলকে প্রতিপালন করবেন। বড় হয়ে যাতে করে ধন-সম্পদ কিংবা প্রভাব-প্রতিপত্তির মোহে তিনি মোহাবিষ্ট হয়ে না পড়েন। তাঁর চারপাশে নেতৃত্বের যে লোভনীয় হাতছানি তা যেন তিনি উপেক্ষা করতে পারেন অনায়াসে। দুনিয়ার মোহের সঙ্গে নুবুওয়াতের নির্মলতার প্রভেদটা যে বিস্তর, মানুষ যাতে সেটা বুঝতে পারে এবং দুটোকে এক করে তালগোল পাকিয়ে না ফেলে। তারা যাতে তাঁর ব্যাপারে এটাও মনে না করে যে, ধনসম্পদ ও নেতৃত্ব লাভের জন্য তিনি নবি হওয়ার ভান করছেন মাত্র।

রাসূল আশৈশব বহু বিপদ-আপদ সয়েছেন; প্রথমেই হারালেন মাকে, অল্প কদিনের ব্যবধানে চলে গেলেন দাদা। আর পিতার মায়া-মমতা, স্নেহ-ভালোবাসা কাকে বলে তা তো তিনি কোনো দিন জানতেও পারলেন না। তাঁর জন্মের আগেই যে বাবা মারা যান। বিচ্ছেদের এমন পরীক্ষার কারণেই তিনি পরিণত হন কোমল হৃদয় ও সংবেদনশীল ব্যক্তিত্বে। দুঃখ-কষ্ট তাঁকে রূঢ়তা, অহমিকা এবং প্রবঞ্চনার মতো অন্যের সঙ্গে কোনো কঠিন আচরণ না করা থেকে সাহায্য করে। এবং তাঁকে করে তোলে অধিক সংবেদনশীল ও বিনয়ী।

টিকাঃ
১৩৩. সীরাত ইবনু হিশাম, ১/৬৮।
১৩৪. দেখুন: আবু ফারিস, আস-সীরাহ আন-নাবাওয়িয়া, পৃ. ১০১।
১৩৫. আলি, সহীহুস-সীরাহ আন-নাবাওয়িয়া, পৃ. ৫৬; তিনি বলেন, হাকীম এটি বর্ণনা করেছেন, ২/৬০৩, ৬০৪; এবং যাহাবি এটাকে সহীহ স্বীকৃতি দিয়েছেন এবং সহমত পোষণ করেছেন; হাইসামি আল-মুজমা, ৮/২২৪-এ বলেন, আবু ইয়া'লা ও তাবারানিও বর্ণনা করেন এবং এর সনদ বা বর্ণনাসূত্র হাসান।
১৩৬. প্রাগুক্ত।
১৩৭. দেখুন: আবু ফারিস, আস-সীরাহ আন-নাবাওয়িয়া, পৃ. ১০১।
১৩৮. দেখুন: ড. ইয়াহইয়া, মাদখাল লিফাহমিস-সীরাহ, পৃ. ১১৯।

📘 রউফুর রহীম 📄 মেষ চরানোর কাজে রাসূল

📄 মেষ চরানোর কাজে রাসূল


দাদার মৃত্যুর পর রাসূল চাচা আবু তালিবের তত্ত্বাবধানে বড় হচ্ছিলেন। কিন্তু সেসময় চাচার ব্যবসা-বাণিজ্য ভালো যাচ্ছিল না। চাচার অর্থনৈতিক এমন দুরবস্থা রাসূলুল্লাহর মর্মপীড়ার কারণ হয়। তিনি মেষ চরানোর কাজ নেন। আশা- চাচার সংসারে বোঝা হয়ে না থেকে তার সাহায্যে কাজে লাগা। রাসূল নিজের সম্পর্কে এবং তাঁর ভাই অন্যান্য নবি-রাসূলের সম্পর্কে আমাদের অবহিত করেন যে, তারা সবাই মেষ চরানোর কাজ করেছেন।

রাসূল বালক বয়সেই মক্কাবাসীদের মেষ চরান। নবিদের জন্য মেষ চরানোর কাজ করার যে অমোঘ নিয়তি তা তিনি সেই বয়সেই সম্পাদন করেন। সহীহ হাদীসে এসেছে, রাসূল বলেন, “আল্লাহ এমন কোনো নবিকে পাঠাননি যিনি মেষ-ভেড়া চরাননি।”

শুনে সাহাবিরা জানতে চাইলেন, “আপনিও?”

রাসূল উত্তর করেন, “হ্যাঁ, আমিও কয়েক কীরাতের বিনিময়ে মাক্কাবাসীদের মেষ-ভেড়া চরাতাম।” [১৩৯]

মেষ চরানোর কাজ, নিঃসন্দেহে, রাসূলুল্লাহর জীবনে বয়ে আনে এক অনবিল প্রশান্তি, তাঁর ব্যক্তিসত্তা ঠিক যেমনটি চাচ্ছিল। মরুভূমির বিশালতার সৌন্দর্য তাঁর সামনে ধরা দেয় এ সময়েই। চারপাশের পরিবেশ, ধু-ধু বালুকাবেলা, প্রকৃতিতে সকালের উচ্ছলতা, অলস দুপুরের নির্জীবতা, পড়ন্ত বিকালে সবার ঘরে ফেরার তাড়া—সবকিছুতেই তিনি আল্লাহর মহানুভবতার ছোঁয়া অনুভব করেন। রাতের নিস্তব্ধতায়, চাঁদের জোৎস্নায়, গাছের পাতার মর্মর ধ্বনিতে তিনি হারিয়ে যেতেন নিভৃত আলাপনে। প্রকৃতির কোলে থেকে থেকে তিনি লাভ করেন ধৈর্য, সহিষ্ণুতা, ধীরতা, বিনয়-নম্রতা, দয়া-মায়া, দুর্বলকে সবল হতে সাহায্য করা, বলবানের শক্তিকে খর্ব করে দুর্বলের পথ চলাতে সমতা বিধান করার শিক্ষা। [১৪০]

রাসূলুল্লাহর মেষ চরানোর এই ঘটনা অনেক সহীহ হাদীসে বর্ণিত হয়েছে। পশুপাখির সঙ্গে ভালো ব্যবহার করতে হাদীসগুলো মুসলিমদেরকে উদ্বুদ্ধ করে। [১৪১] তাঁর এই মেষ চরানোর অভিজ্ঞতাটা পরবর্তী সময়ে উম্মাহকে পরিচালনা করতে গিয়েও কাজে দিয়েছে।

টিকাঃ
১৩৯. সহীহ বুখারি, কিতাবুল-ইজারাহ, পরিচ্ছেদ: কীরাতের বিনিময়ে মেষ চরানো, হাদীস নং-২২৬২; দিনার বা দিরহামের একটা অংশের নাম কীরাত।
১৪০. দেখুন: মুহাম্মাদ আস-সাদিক 'উরজুন, মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল, ১/১৭৭।
১৪১. দেখুন: আল-উমরি, আস-সীরাহ আন-নাবাওয়িয়া, ১/১০৬।

📘 রউফুর রহীম 📄 মেষ চরানোর মধ্যে নিহিত কল্যাণ

📄 মেষ চরানোর মধ্যে নিহিত কল্যাণ


ধৈর্য
সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত একজন রাখালকে তার মেষপাল চরানোর কাজে ব্যস্ত থাকতে হয়। তবে মেষ চরানো কিন্তু সহজ কোনো কাজ নয়; এদের স্বভাবই হলো: তারা ধীরে ধীরে খায়। একাজে একজন রাখালের থাকা চাই প্রচণ্ড ধৈর্য এবং সহনশীলতা। এই যদি হয় মেষ চরানোর বেলায়, তা হলে মানুষ পরিচালনায় ধৈর্যের কত যে প্রয়োজন তা বলার অপেক্ষা রাখে না। [১৪২]

একজন রাখালের যাপিত জীবন সাদামাটা হবে সেটাই স্বাভাবিক। রাজপ্রাসাদে রাজার হালে সে থাকবে তা কেবল স্বপ্নেই সম্ভব। আর এটা তার সাধ্যেরও বাইরে। বরং সে তেজোদীপ্ত সূর্যের প্রখর তাপে চলাফেরা করে। মেষ চরায়। তার ওপর পরিবেশটা যদি হয় আরব উপদ্বীপের মতো তৃষাতপ্ত মরুভূমি, চারপাশে নিরুদ্ধ নিঃশ্বাস তা হলে তো কথাই নেই। রোদের প্রচণ্ডতা সেখানে আরও বেশি। তার পিপাসা মেটানোর জন্য চাই পর্যাপ্ত পানির। যেখানে সামান্য পানিরই বড় অভাব, সেখানে পর্যাপ্ত পানি সে পাবে কোথায়? দিশেহারা হয়ে সে চারপাশে খাবার বা পানি হন্যে হয়ে খুঁজে বেড়ায়। কিন্তু শুষ্ক কিছু তৃণ ছাড়া আর যে কিছুই জোটে না। তখন সে বাধ্য হয়েই এমন রূঢ় পরিবেশের সঙ্গে নিজেকে খাপ খাইয়ে নেয়। ধীরে ধীরে সে সবকিছুতে হয়ে ওঠে অভ্যস্ত, হয়ে ওঠে কষ্টসহিষ্ণু। [১৪৩]

বিনম্রতা
একজন রাখাল রাখালি করতে করতে অন্যদিকে আর খেয়াল থাকে না; তার ধ্যান- জ্ঞান হয়ে ওঠে কেবল তার মেষপালের যত্ন-আত্তি, মেষছানার দেখভাল ও হিংস্র প্রাণীদের আক্রমণ প্রতিহত করে সেগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। এখানেই শেষ নয়, রাতের বেলাতেও মেষপালের কাছাকাছি তাকে ঘুমাতে হয়। পালের পাশে ঘুমাতে গিয়ে হয়তো দেখা গেল মেষের চোনার ছিটেফোঁটা তার নাকে-মুখে এসে পড়ছে। কিংবা পাশ ফিরে শুতে গিয়ে নাদা লেগে গেল হাতে। এত উপদ্রবের পরও রাখাল কিন্তু বিরক্তি প্রকাশ করছে না মোটেই। এভাবে যেতে যেতে একটা সময় এসে সব উপদ্রব তার গা-সয়ে যায়। অহংকার-অহমিকা, গর্ব-বড়াই তিরোহিত হতে থাকে তার চরিত্র থেকে। বিনয়ী হতে শুরু করে সে। [১৪৪]

সহীহ মুসলিমে এসেছে, রাসূল বলেন, “যার অন্তরে শস্যদানা পরিমাণ অহংকার থাকবে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে না।”

তখন একজন লোক জানতে চাইল, “একজন ব্যক্তি ভালোবাসে যে, তার পোশাক সুন্দর হোক এবং তার জুতা দেখতে ভালো দেখাক (তা হলে এটা কি অহংকার হবে?)।” রাসূল উত্তর করেন, “নিশ্চয় আল্লাহ সুন্দর। তিনি সুন্দরকে ভালোবাসেন। অহংকার হলো: সত্যকে অস্বীকার করা এবং মানুষকে অবজ্ঞা করা।” [১৪৫]

বীরত্ব
রাখাল তার পালের প্রতিটি মেষের প্রতি সমান দায়িত্ব পালন করে। তাদের নিরাপত্তা বিধানে সে থাকে সচেষ্ট। ভয়ংকর, বন্য সব প্রাণী কখন আক্রমণ করে ছাগলপালের ওপর এ ভয়ে তটস্থ থাকতে হয় তাকে। চোখ-কান খোলা রেখে চারপাশে বোলাতে হয় সতর্ক নজর। এমন সংকুল পরিবেশই তাকে তার মেষপাল রক্ষার তাগাদায় গড়ে তোলে প্রচণ্ড সাহসী করে। [১৪৬]

দয়া-মায়া
মেষপালের যত্ন-আত্তির অংশ হিসেবে একজন রাখালকে অনেক কাজই আঞ্জাম দিতে হয়। কোন ছাগলটি অসুস্থ তার খোঁজ রাখা, পাহাড়ের ওপর থেকে পাথরে আছড়ে পড়ে কার হাড্ডি গুঁড়া হয়েছে কিংবা গুঁতোগুঁতি করতে গিয়ে কে চোট পেয়েছে-এমন খবরাখবর সবই তার কাছে আছে। সঙ্গে সঙ্গে সে উঠে-পড়ে লেগে যায় এগুলোর সেবা-শুশ্রূষায়। অবলা প্রাণী বলে কথা; মুখ ফুটে বলতে পারে না কিছু ঠিকই। তাই বলে ব্যথা যে পেয়েছে সেটা তো আর মিছে হয়ে যায় না।

এমন কাজের জন্য একজন রাখালের হওয়া চাই দরদদিল মানুষ। তাদের ব্যথা উপশমে, রোগ-চিকিৎসায় তাকে যত্নবান হতে হয়। আর অবলা প্রাণীকে যে ব্যক্তি দয়া করতে শিখল, সে যে মানবের প্রতি অধিক দয়াবান হবে এটাই স্বাভাবিক। বিশেষ করে, তিনি যদি একজন রাসূল হন তবে তো তাঁকে অবশ্যই আরও অধিক দয়াশীল হতে হবে মানুষের প্রতি। কারণ, আল্লাহ তাঁকে পাঠিয়েছেন মানুষকে শিক্ষা দেওয়ার জন্য। জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচার পথ বাতলানো এবং দুনিয়া ও আখিরাতের সৌভাগ্যের খোঁজ মানুষকে দেবেন তিনিই। [১৪৭]

পরিশ্রম করে উপার্জনের প্রতি সহজাত প্রবৃত্তি
আল্লাহ চাইলে নবিজিকে মেষ চরানোর কাজ থেকে বিরত রাখতে পারতেন। কিন্তু তিনি তা করেননি। এটা যেমন রাসূলুল্লাহর জন্য, তেমনই আমাদের জন্যও শিক্ষা। আমাদেরকে পরিশ্রম করে, মাথার ঘাম পায়ে ফেলে, গতর খেটে উপার্জন করে রুটি-রুজির বন্দোবস্ত করতে হবে। আর রাসূলুল্লাহর এই মেষ চরানোটা হাতের কামাই খাওয়ার এমনই একটি অনন্য উদাহরণ মাত্র। ইমাম বুখারি তার সহীহ বুখারিতে মিকদাম থেকে বর্ণনা করেন যে, রাসূল বলেন, “নিজের হাতের কামাই খাওয়ার চেয়ে উত্তম খাবার কেউ কখনোই খায়নি। নিশ্চয়ই আল্লাহর নবি দাউদ নিজ হাতের কামাই খেতেন।” [১৪৮]

সন্দেহ নেই, হালাল উপার্জন মানুষকে খুবই স্বাধীনচেতা করে গড়ে তোলে। অন্যায়-অবিচার, বাতিলের বিরুদ্ধে কথা বলতে তার বুক কাঁপবে না এতটুকু। [১৪৯] কত মানুষকে দেখা যায় বাতিলকে রুখে দাঁড়ানো দূরে থাক, টু শব্দটি পর্যন্ত করার সাহস পায় না। সব অন্যায়-অবিচার দেখেও তারা না দেখার ভান করে পাশ কাটিয়ে চলে যায়। মেনে নেয় সবকিছু মান-সম্মান বিসর্জন দিয়ে। বাতিলের সামনে মাথা নুইয়ে দেয় অবলীলায়। যেন তাদের জন্মই হয়েছে চুপ করে সব দেখে যাবার জন্য। তাদের ভয়-প্রতিবাদ করলেই যে চাকরি খোয়াতে হবে তাকে। পথে বসতে হবে রুটি-রুজির চিন্তায়। [১৫০]

রুটি-রুজি উপার্জনের তাগাদায় রাসূলুল্লাহর মেষ চরানোর কাজ বেছে নেওয়ার পেছনে অবশ্যই কিছু উদ্দেশ্য রয়েছে। রাসূল উন্নত রুচি ও তীক্ষ্ণ অনুভূতিসম্পন্ন ব্যক্তি ছিলেন। আল্লাহ তাঁকে এমন দুটি মহৎ গুণ দিয়ে সৌন্দর্যমণ্ডিত করেছেন। চাচা আবু তালিব তাঁকে খুব ভালোবাসতেন। বাবার স্নেহ-মমতা, আদর-যত্ন দিয়ে তিনি ভাতিজাকে কোলে-পিঠে করে বড় করেন। সেসময় চাচার সংসারের ব্যয়ভার ছিল অনেক বেশি। উপরন্তু তার ব্যবসা-বাণিজ্যও খুব একটা ভালো যাচ্ছিল না। রাসূল দেখলেন চাচার ব্যয়ভার কিছুটা হলেও জোগান দেওয়ার সক্ষমতা তাঁর আছে। যেই ভাবা সেই কাজ। তিনি উপার্জন করতে এগিয়ে আসেন। সাংসারিক খরচ জোগাতে তিনি মাথার ঘাম পায়ে ফেলেন। তিনি যে স্বভাবে উদার, আচার-ব্যবহারে সদাচার এবং সাধ্যের সবটুকু ব্যয় করতে সচেষ্ট ছিলেন, তার একটি বড় প্রমাণ এটি। [১৫১]

আরেকটি বিষয়ও এখান থেকে প্রমাণিত, আল্লাহ তাঁর সৎবান্দাদের জন্য দুনিয়াতে জীবনযাপনের এমন ব্যবস্থাও করে থাকেন। রাসূলুল্লাহর যাপিত জীবনকে আল্লাহ চাইলেই সহজ করে দিতে পারতেন। তিনি ইচ্ছা করলে রাসূলুল্লাহর শৈশবের সূচনায় ভোগ-বিলাসিতা, সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য, আরাম-আয়েশ তাঁর দুপায়ে লুটিয়ে দিতে পারতেন। এতে নবিজিকে আর রিস্ক অনুসন্ধানে, অন্ততপক্ষে ঘাম ঝরানো কোনো কাজ কিংবা মেষ চরানো লাগত না।

কিন্তু আল্লাহর প্রজ্ঞা মহান। তিনি চান আমরা যাতে অনুধাবন করি যে, মানবের উৎকৃষ্ট উপার্জন হলো তার হাতের কামাই এবং সেই উদ্যোগ যা মানুষ সমাজসেবা ও জাতি বিনির্মাণে গ্রহণ করে। [১৫২]

টিকাঃ
১৪২. দেখুন: ড. ইয়াহইয়া, মাদখাল লিফাহমিস-সীরাহ, পৃ. ১২৪।
১৪৩. দেখুন: আবু ফারিস, আস-সীরাহ আন-নাবাওয়িয়া, পৃ. ১১৪, ১১৫।
১৪৪. প্রাগুক্ত, পৃ. ১১৪।
১৪৫. সহীহ মুসলিম, হাদীস নং-১৪৭-(৯১)।
১৪৬. দেখুন: আবু ফারিস, আস-সীরাহ আন-নাবাওয়িয়া, পৃ. ১১৪।
১৪৭. দেখুন: মাদখাল লিফাহমিস-সীরাহ, পৃ. ১২৭।
১৪৮. সহীহ বুখারি, কিতাবুল বুয়ু', হাদীস নং-২০৭২।
১৪৯. দেখুন: মাদখাল লিফাহমিস-সীরাহ, পৃ. ১২৮।
১৫০. দেখুন: গাদবান, ফিকহুস-সীরাহ, পৃ. ৯৩।
১৫১. দেখুন: বৃতি, ফিকহুস-সীরাহ, পৃ. ৫০।
১৫২. প্রাগুক্ত

📘 রউফুর রহীম 📄 সকল পাপাচার থেকে সুরক্ষা

📄 সকল পাপাচার থেকে সুরক্ষা


আল্লাহ তা'আলা তাঁর রাসূলকে সুরক্ষা দেন শির্ক ও মূর্তিপূজার মতো জাহিলিয়্যাতের সব ধরনের পঙ্কিলতা থেকে। ইমাম আহমাদ তার মুসনাদে হিশাম ইবনু 'উরওয়াহ থেকে বর্ণনা করেন, তিনি তার বাবা থেকে বর্ণনা করেন যে,

“খাদীজার এক প্রতিবেশী আমাকে বলেন, তিনি খাদীজাকে উদ্দেশ করে রাসূলুল্লাহকে বলতে শুনেছেন, 'খাদীজা, আল্লাহর কসম! আমি কখনোই লাতের পূজা করিনি এবং আল্লাহর কসম, আমি কখনোই 'উযযার পূজা করিনি'।” [১৫৩] বেদিমূলে উৎসর্গকৃত জবেহ করা প্রাণীর গোস্তও খেতেন না রাসূল। যাইদ ইবনু 'আম্র ইবনু নুফাইলও এমনটিই করতেন; তিনিও বেদিমূলে জবেহকৃত প্রাণীর গোস্ত খেতেন না।” [১৫৪]

“যৌবনে অসংযত আচরণের কারণে লজ্জাজনক, অরুচিকর ও গর্হিত অনেক কাজই করে ফেলে মানুষ। কিন্তু আল্লাহ তা'আলা নবিজিকে এমন সব বিষয় থেকেও হেফাজত করেছেন আপন কৃপায়। কারণ, আলোর পথের দিশারি এবং হিদায়াতের বাণী প্রচারকদের এমন তুচ্ছ ব্যাপার চর্চা করাও সাজে না।” [১৫৫]

'আলি ইবনু আবু তালিব থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “আমি রাসূলুল্লাহকে বলতে শুনেছি, তিনি বলেন, 'সচরাচর জাহিলি যুগের মানুষেরা যেসব মন্দ কাজের মনস্থ করত, এমন কাজের অভিপ্রায় আমি কখনো করিনি। তবে জীবনের দুটো সময় ছিল এর ব্যতিক্রম; কিন্তু আল্লাহ দুবারই আমাকে রুচিহীন কাজ করা থেকে রক্ষা করেন। এক রাতের ঘটনা। আমি মাক্কার উত্তরে একটা স্থানে অবস্থান করছিলাম। সঙ্গে কুরাইশের এক যুবক। তার পরিবারের মেষপাল তার সাথে ছিল। সে এগুলো দেখাশোনার দায়িত্বে ছিল। আমি তাকে বললাম, 'আমার মেষ-ভেড়াগুলোর দিকে একটু খেয়াল রেখো। আজ রাতে মাক্কার আসরে গল্পগুজব করে একটু আড্ডা দিয়ে আসি। যেভাবে অন্য যুবকরা গল্পের আসরে মেতে থাকে।' সে বলল, 'ঠিক আছে।'
'এরপর আমি বেরিয়ে পড়ি। শহরের কাছাকাছি এলে গান, দফের বাজনা এবং বাঁশির আওয়াজ শুনতে পাই। জানতে চাই, 'এটা কী?' উপস্থিত লোকেরা বলল, 'অমুক ব্যক্তি অমুক মেয়েকে বিয়ে করেছে। লোকটি ছিল কুরাইশেরই এক ব্যক্তি, সে কুরাইশেরই আরেক মহিলাকে বিয়ে করেছে। আমি সে গান এবং সে বাজনার প্রতি কিছুটা আকৃষ্ট হই। একসময় হঠাৎ ঘুমে আমার দুচোখ লেগে আসে এবং অঘোরে ঘুমিয়ে পড়ি। সূর্যের তাপে (সকাল বেলায়) জেগে উঠি। এরপর ফিরে আসি। সেই (রাখাল) জানতে চাইল, 'কী করেছেন?' আমি তাকে জানালাম।

আরেক রাতে তাকে আবার একই অনুরোধ করি। সে রাজি হয়ে যায়। আমি বেরিয়ে পড়ি। আবার আগের মতো একই জিনিস শুনতে পাই। জানতে চাইলে লোকেরা আমাকে আগের মতোই উত্তর করে। যা শুনেছি তার প্রতি কিছুটা আকৃষ্ট হই। এক সময় ঘুমিয়েও পড়ি আমি। সকালের সূর্যের আলো এসে আমাকে জাগিয়ে তোলে। এরপর আমার ওই সাথির কাছে ফিরে আসি। সে বলল, 'কী করলেন?' বললাম, 'কিছুই করিনি'।”

রাসূল বলেন, “আল্লাহর কসম! জাহিলি যুগের লোকেরা যে খারাপ কাজগুলো করত, ওই ঘটনার পর থেকে আমি আর কখনোই খারাপ কাজের প্রতি আকৃষ্ট হইনি। এরপর আল্লাহ তো আমাকে তাঁর নবি করে সম্মানিত করেছেন।” [১৫৬]

হাদীসটি আমাদের সামনে গুরুত্বপূর্ণ দুটি দিক প্রতিভাত করে: মুহাম্মাদ একজন নবি ও রাসূল। তবে একইসাথে তাঁর মাঝে সৃষ্টিগতভাবে বিদ্যমান মানবীয় সব বৈশিষ্ট্যই বিদ্যমান ছিল। তিনিও আর সব যুবকের মতো স্বভাবজাত নানান প্রবণতার প্রতি একটা টান অনুভব করতেন নিজের মধ্যে। স্বভাবজাত এই প্রবণতাগুলো আল্লাহই মানুষের মধ্যে সৃষ্টি করেন। ফলে স্বাভাবিকভাবেই তিনি গল্পগুজব ও অনর্থক কাজের প্রতি একটা টান অনুভব করেন এবং এর উপভোগ্য দিকটাকে বুঝতে চেষ্টা করেন। তাঁর মন তাঁকে বলত, অন্যদের মতো তিনিও যদি এর কিছুটা উপভোগ করতে পারতেন!

আল্লাহ তা'আলা তা সত্ত্বেও নবিজিকে বাহ্যিক সকল বিচ্যুতি থেকে রক্ষা করেন। দা'ওয়াতের দাবির পরিপন্থি সব ধরনের কাজ থেকেও আল্লাহ তাঁর রাসূলকে আপন কৃপায় রক্ষা করেন। [১৫৭]

টিকাঃ
১৫৩. আল-মুসনাদ, হাদীস নং ১৭, ৯৪৭, মুআস্সাসাতুর-রিসালাহ সংস্করণের সম্পাদকগণ বলেন, এর বর্ণনা-সূত্রটি সহীহ। আরও দেখুন: আহমাদ ফারীদ, ওয়াকাফাত তারবাওয়িয়া, পৃ. ৫১।
১৫৪. দেখুন: আহমাদ ফারীদ, ওয়াকাফাত তারবাওয়িয়া, পৃ. ৫১।
১৫৫. দেখুন: মুহাম্মাদ 'উরজন, মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল, ১/১৯৩।
১৫৬. ইবরাহীম আল-'আলি, সহীহুস-সীরাহ আন-নাবাওয়িয়া, পৃ. ৫৭।
১৫৭. দেখুন: আল-বৃতি, ফিকহুস-সীরাহ, পৃ. ৫০, ৫১।

ফন্ট সাইজ
15px
17px
🎤 ভাষা বেছে নিন
🇧🇩
বাংলা
Bengali
🕌
আরবি
العربية