📄 হালীমা আস-সা'দিয়্যা
রাসূলুল্লাহর দুধমা হালীমা আস-সা'দিয়্যা রাসূলুল্লাহর বারাকা নিয়ে আমাদের অনিন্দ্য সুন্দর একটি গল্প শুনিয়েছেন।
গল্পটি 'আবদুল্লাহ ইবনু জা'ফার থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “যখন রাসূল জন্মগ্রহণ করেন, তখন হালীমা বিন্ত হারিস বানু সা'দ ইবনু বাক্রের একদল মহিলার সঙ্গে মাক্কায় আসেন। তাদের উদ্দেশ্য—মাক্কায় দুধশিশুর সন্ধান করা। হালীমা বলেন, 'আমি আমার নিজের ঈষৎ সবুজ-সাদা রঙের মাদি- গাধার পিঠে চড়ে মহিলাদের প্রথম দলটির সঙ্গে বেরিয়ে পড়ি। সঙ্গে আমার স্বামী, সা'দ ইবনু বাক্রের অন্যতম সন্তান, হারিস ইবনু 'আবদুল-উয্যা; এরা আবার বানু নাদিরা গোত্রের একটা অংশ।
(দীর্ঘপথ চলার কারণে) আমাদের মাদি-গাধাটির পা রক্তাক্ত হয়ে পড়ে। সঙ্গে আমাদের জরাগ্রস্ত, বুড়ো একটি উটনীও ছিল। আল্লাহর কসম! সেটি একফোঁটা দুধও দিচ্ছিল না। তার ওপর হচ্ছিল না বৃষ্টি। সবুজের লেশমাত্র নেই কোথাও। খাবারের কিছু ছিল না মানুষদের। না খেয়ে খেয়ে সবার মারা যাওয়ার জোগাড়। আমি আমার ছোট ছেলেটিকেও সঙ্গে নিই। তার অবস্থাও ভালো ছিল না; ক্ষুধায় কাতর থাকত বলে রাতে সে আমাদের শান্তিতে ঘুমাতে দিত না। ঘরে কিছুই ছিল না যা দিয়ে তাকে শান্ত করব। এত কিছুর পরও হাল ছেড়ে দিইনি; মনে মনে আশা-আবার বৃষ্টি হবে। একটা ভেড়াও ছিল আমাদের। তাই এর জন্য আমরা আরও বেশি করে বৃষ্টি চাচ্ছিলাম।
এক সময় আমরা মাক্কায় এসে পৌঁছি। রাসূলুল্লাহকে একে একে আমাদের সবার সামনে পেশ করা হয়। আমাদের কেউই রাজি হয়নি তাঁকে নিতে। উপরন্তু আমরা বললাম, 'তিনি তো নিঃস্ব, এতিম। তাঁর পিতা বেঁচে থাকলে তিনি অবশ্যই ধাত্রীদের খাতির-যত্ন করতেন। দান-দক্ষিণায়ও হতেন দরাজ দিল।' আমরা আরও বললাম, 'মনে হয় না তাঁর মা, চাচা কিংবা দাদা আমাদের সঙ্গে ভালো আচরণ করবেন।'
আমার সঙ্গীরা সবাই দুগ্ধপায়ী শিশু পেয়ে যায়। যখন আমি আর কাউকে পাচ্ছিলাম না, তখন অগত্যা নবিজির কাছে ফিরে আসি এবং তাঁকেই নিয়ে নিই। আল্লাহর কসম! আমি যদি অন্য কাউকে পেয়ে যেতাম, তবে অবশ্যই তাঁকে নিতাম না। স্বামীকে বলেছিলাম, 'আল্লাহর কসম, 'আবদুল-মুত্তালিবের বংশের এই এতিমকেই আমার নিতে হবে; হয়তো আল্লাহ এঁর মাধ্যমেই আমাদেরকে বারাকা দেবেন, প্রভূত কল্যাণ দান করবেন। তাছাড়া কাউকে না নিয়ে আমি খালি হাতে ফিরব না। স্বামী বললেন, 'তুমি ঠিকই বলেছ।'
হালীমা বলেন, 'সুতরাং আমি তাঁকে নিলাম এবং তাঁকে সঙ্গে নিয়েই আমাদের তাঁবুতে ফিরে এলাম। তাঁবুর কাছে আসতে না আসতেই, আল্লাহর শপথ, আমার স্তন দুধে ভরে উঠল। এতে আমি তাঁকে তৃপ্ত করে খাওয়ালাম। তাঁর দুধভাইকেও পান করালাম। তাঁর বাবা (দুধবাবা) উঠে আমাদের জরাগ্রস্ত উটনীটার কাছে গেল। সেটিকে ছুঁতে না ছুঁতেই ওলান ভরে উঠল দুধে। সে দুধ দোহন করে আমাকে দিল। আমি তৃপ্ত না হওয়া পর্যন্ত পান করলাম, এবং সে নিজেও তৃষ্ণা নিবারণ করে পান করল। তারপর সে বলল, 'হালীমা, তুমি কি খেয়াল করেছ, আল্লাহর কসম, আমরা তো এক পবিত্র আত্মাকে পেয়েছি। আমরা আশাও করিনি, অথচ আল্লাহ উটনীতে এমনই বারাকা দিয়েছেন।' হালীমা বলেন, 'পরিতৃপ্ত হয়ে নিশ্চিন্ত মনে কী একটা রাতই না কাটালাম আমরা! অথচ ক্ষুধায় কাতর আমাদের সন্তানের সঙ্গে আমরা কত বিনিদ্র রজনি কাটিয়েছি!'
সকালে সঙ্গী-সাথিদের সঙ্গে রওনা দিই এলাকার উদ্দেশে। রাসূলুল্লাহকে নিয়ে আমি আমার গাধার পিঠে চড়ে বসি। যার হাতে আমি হালীমার প্রাণ তাঁর কসম! গাধাটি আমাকে নিয়ে কাফেলার আগে আগে ছুটল। দেখে সঙ্গীরা বলল, 'আরে এত আগে আগে যাচ্ছ কেন? আমাদের জন্য একটু দাঁড়াও। আচ্ছা, এটা তোমার সেই গাধা না, যার পিঠে চড়ে তুমি এসেছ?' আমার উত্তর, 'হ্যাঁ।' তারা বলল, 'আমরা যখন আসছিলাম, রক্তাক্ত হয়ে গাধাটির তো তখন যা-তা অবস্থা হয়েছিল। এখন একি দেখছি আমরা; সে তো সবার আগে আগে ছুটছে!' আমি বললাম, 'আল্লাহর শপথ! এর পিঠের ওপর আমি চড়িয়েছি এক পবিত্র ও কল্যাণময় সন্তান।'
হালীমা বলেন, 'এরপর আমরা আবার যাত্রা শুরু করি। সফরের প্রতিটি দিনেই আল্লাহ আমাদের উত্তোরত্তর কল্যাণ বৃদ্ধি করেই চললেন। অবশেষে এলাকায় যখন ফিরে আসি তখন সেখানে চলছে দুর্ভিক্ষ। আমাদের পশুগুলো সারাদিন চড়ে বেড়াত, সন্ধ্যায় ফিরে আসত। একই সঙ্গে থেকে সা'দ গোত্রের ছাগল ভেড়াগুলো ফিরত খালি পেটে, আর আমারগুলো ভরপেটে। ওলান ভরে উঠত দুধে দুধে। গোত্রের লোকেরা বলাবলি করতে লাগল, 'হারিস ইবনু 'আবদুল-'উয্যা ও হালীমার ভেড়াগুলোর একি অবস্থা! পেট ভরে খাবার খেয়ে, দুগ্ধবতী হয়ে সেগুলো ফেরে। আর তোমাদেরগুলো কিনা ফেরে ক্ষুধা নিয়ে! তোমাদের আর কবে আক্কেল-জ্ঞান হবে বলো তো! তাদের ভেড়াগুলো যে চারণভূমিতে চড়ে বেড়ায় তোমাদেরগুলোকেও সেখানে চড়িয়ে বেড়াও।' তারা তা-ই করল। কিন্তু একসঙ্গে চড়ালে কী হবে, সেগুলো আগের মতোই ক্ষুধা নিয়ে ফিরত। অন্যদিকে আমারগুলো ফিরত আগের মতো পেট ভরে পরিতৃপ্ত হয়ে।
হালীমা বলেন, রাসূল বেড়ে উঠতে লাগলেন। তবে আর দশজন শিশু যেভাবে বেড়ে ওঠে সেভাবে নয়; (প্রথমদিকে) অন্যরা এক বছরে যতটুকু বেড়ে ওঠে, তিনি ততটুকু বেড়ে উঠতেন একদিনে। দুই বছর পূর্ণ হলে আমরা তাঁকে নিয়ে আসি মাক্কায়। আমরা (আমি ও আমার স্বামী) বলাবলি করছিলাম, 'আল্লাহর কসম! আমরা কখনোই তাঁকে আমাদের কাছছাড়া করব না। যথাসাধ্য চেষ্টা করব তিনি যাতে আমাদের চোখের আড়াল না হন।' এরপর আমরা তাঁর মায়ের নিকট এসে তাকে বললাম, 'আল্লাহর কসম! এমন বারাকাময় শিশু আমরা জীবনে দেখিনি। আমাদের ভয়, আমরা যদি তাঁকে এখন এখানে রেখে যাই, তবে মক্কার রোগ-বালাই, মহামারি তাঁকে পেয়ে বসবে। (রাসূলুল্লাহর মা আমিনাও তখন রোগাক্রান্ত ছিলেন)। তাই তাঁকে আমাদের সঙ্গে নিয়ে যেতে দিন; নিদেনপক্ষে আপনি আপনার রোগ থেকে সেরে ওঠা পর্যন্ত সে আমাদের সঙ্গেই থাকুক।' রাসূলুল্লাহর মায়ের সঙ্গে আমরা দীর্ঘ সময় পীড়াপীড়ি করি যাতে তিনি রাজি হন। আমাদের প্রচণ্ড আগ্রহ দেখে শেষ পর্যন্ত তিনি রাজি হন। অনুমতি পেয়ে তাঁকে সঙ্গে নিয়ে আবার আমরা এলাকায় ফেরত আসি। এবার আসার পর তিনি আমাদের সঙ্গে থাকেন তিন কিংবা চার মাস।
এ সময়ে একদিন তিনি ঘর-বাড়ির পেছনে তাঁর দুধ-ভাইয়ের সঙ্গে আমাদের একপাল ছোট ছাগল ও ভেড়াছানার মাঝে খেলা করছিলেন। এমন সময় তাঁর দুধ-ভাই কাঁপতে কাঁপতে আমাদের কাছে এসে বলল, 'জানো! আমি দেখলাম, আমার ওই কুরাইশি ভাইয়ের কাছে দুইজন লোক এলেন। গায়ে তাদের ধবধবে সাদা পোশাক। তারা তাঁকে ধরে মাটিতে শুইয়ে দিলেন। এরপর তাঁর পেট চিড়ে ফেললেন।'
শুনে তো আমাদের অন্তরাত্মা বের হওয়ার জোগাড়। কাঁপতে কাঁপতে আমি ও আমার স্বামী পড়িমড়ি করে ছুটে গেলাম। গিয়ে দেখি তিনি দাঁড়িয়ে আছেন; চেহারার রং বিবর্ণ। আমাদের দেখে দৌড়ে এলেন এবং কেঁদে দিলেন।
হালীমা বলেন, আমি ও আমার স্বামী তাঁকে টেনে নিয়ে বুকের সঙ্গে শক্ত করে আঁকড়ে ধরি। বললাম, 'আমার পিতামাতা তোমার জন্য উৎসর্গ হোক! তোমার কী হয়েছে?’ তিনি বললেন, ‘আমার কাছে দুইজন লোক এসে আমাকে মাটিতে শুইয়ে দিলেন। একটু পর আমার পেট ফেড়ে দিয়ে কী যেন একটা রাখলেন। এরপর পেট আগে যেমন ছিল তেমনই করে দেন তারা।’
আমার স্বামী বলল, ‘আল্লাহর শপথ! আমার এই ছেলের ওপর কিছু একটা ভর করেছে। জলদি তাঁকে তাঁর পরিবারের নিকট নিয়ে চলো। যে ভয়টা আমরা করছি, তা ঘটার আগেই তাঁকে তাদের কাছে রেখে আসো।’
হালীমা বললেন, তাঁকে নিয়ে আমরা তাঁর মায়ের কাছে নিয়ে চললাম। তাঁর মা আমাদের দেখে খুবই অবাক হলেন; আমরা যা করেছি তার জন্য মৃদু ভর্ৎসনা করলেন। বললেন, ‘আমি বলার আগেই কী কারণে আমার ছেলেকে ফেরত নিয়ে এসেছ তোমরা? আগে তো তাঁকে রাখার ব্যাপারে তোমরা ছিলে খুবই উদ্গ্রীব!’
আমরা জানালাম, ‘না, তেমন কিছুই হয়নি। বরং আল্লাহ তাঁর দুগ্ধপানের মেয়াদকাল পূর্ণ করেছেন। এবং তাঁর স্বাস্থ্য দেখে আমরা খুশি।’ আমরা আরও বললাম, ‘তবে আপনারা যদি চান আমরা তাঁকে খুব উত্তমভাবেই রাখব।’ তিনি বললেন, ‘তোমরা কিছু একটা এড়িয়ে যাচ্ছ; আসলে কী হয়েছে আমার কাছে খুলে বলো।’ না বলা পর্যন্ত তিনি আমাদেরকে কিছুতেই ছাড়ছিলেন না। না বলে আর থাকতে পারলাম না। শেষে যা যা ঘটেছে আমরা তার কাছে সব বলে দিই; কিছুই লুকাই না।
তিনি বললেন, ‘না, কখনোই না। আল্লাহর কসম! তিনি তার সঙ্গে এমন কিছু করবেন না। আমার ছেলের একটা মর্যাদা হবে। আমি কি তোমাদেরকে তার সংবাদটা দেবো না? তা হলে শোনো, সে যখন আমার গর্ভে, আল্লাহর শপথ, আমি কোনো ধরনের ভার অনুভব করিনি। আমার পক্ষে তাকে গর্ভে ধারণ করা একদমই কষ্টকর কিছু ছিল পরিচয়। সে যখন আমার গর্ভে তখন একদিন আমাকে (স্বপ্নে) দেখানো হয় যে, আমার থেকে একটি আলোকরশ্মি বের হয়ে বাস্রার উটের গ্রীবাগুলো আলোকিত করে দিয়েছে। (অন্য এক বর্ণনায় এসেছে, তিনি বলেছেন, বাস্ত্রার অট্টালিকাগুলোকে আলোকিত করে দিয়েছে) এরপর তাকে আমি ভূমিষ্ট করলাম এবং আল্লাহর কসম! সে অন্যান্য শিশুর মতো ভূমিষ্ট হয়নি; বরং সে তার দুহাতের ওপর ভর করে, আকাশের দিকে মাথা তুলে জন্মগ্রহণ করে।’ তিনি নবিজিকে বুকে টেনে নেন। আমরা মা ও ছেলেকে এভাবে রেখে হাঁটা ধরি আমাদের পথে।” [১২৫]
শিক্ষা ও উপকারিতা
একটি দুইটি বিষয়ে নয়, হালীমার সংসারের সাথে জড়িত প্রতিটি বিষয়ে রাসূলুল্লাহর বারাকার বহিঃপ্রকাশ ঘটে; নবিজিকে গ্রহণ করার আগপর্যন্ত হালীমার স্তনে বলতে গেলে দুধই ছিল না। যাও-বা ছিল তা নিজের সন্তানেরই হতো না। ক্ষুধার চোটে সারা রাত সে মাকে দুটি চোখ এক করতে দিত না। কিন্তু রাসূল ﷺ যেসময় থেকে হালীমার কোল আলোকিত করেছেন, তখন থেকেই এই বারাকার শুরু। এখন আর তাদের ছেলে ক্ষুধার জ্বালায় আর্তনাদ করে আকাশ মাথায় তোলে না। সে পরিতৃপ্ত হয়ে ঘুমায়। মাও ঘুমাতে পারেন শান্তিতে। হালীমার জরাগ্রস্ত, অতি দুর্বল উটনীটি রাসূল ﷺ তাদের পরিবারে আসার পর থেকে দুধ দেওয়া শুরু করেছে। অথচ শত চেষ্টা করেও ইতঃপূর্বে তার এমন দুধ দোহন করা যেত না।
হালীমার জন্য আল্লাহ তাঁর সবচেয়ে প্রিয় বান্দাকে বাছাই করেছেন। তবে মজার বিষয় হলো, হালীমা কিন্তু প্রথমে এই এতিম ছেলেটিকে এড়িয়ে গিয়েছিলেন। যখন দেখলেন আর কাউকে পাচ্ছেন না তিনি, তখন একান্ত নিরুপায় হয়ে রাসূলুল্লাহকে গ্রহণ করেন। আল্লাহ হালীমার জন্য যে শিশুকে নির্বাচন করেছেন তাতে নিহিত ছিল প্রভূত কল্যাণ। এই বারাকার, এই কল্যাণের শুরু হালীমা তাঁকে গ্রহণ করার সঙ্গে সঙ্গে। ঘটনাটিতে সকল মুসলিমের জন্য রয়েছে অনুপম একটি শিক্ষা। আর তা হলো—আল্লাহ তার কপালে যা লিখে রেখেছেন, তার তাকদির হিসেবে যা নির্ধারণ করেছেন তাতেই সন্তুষ্ট থাকা, তাতেই খুশি থাকা। যা হয়ে গেছে তা নিয়ে হা-হুতাশ না করা এবং যা পায়নি তার জন্য আফসোস না করা।
শাইখ মুহাম্মাদ আল-গাযালি বলেন,
“প্রকৃতির কোলে শিশুরা যেন প্রাণবন্ত থাকে। এর নির্মল বাতাস ও মিষ্টি রোদ খুবই উপকারী। সন্তানদেরকে মরুভূমিতে লালন-পালন করানোটা স্বভাবের পরিশুদ্ধতা, শারীরিক গঠন মজবুত এবং অনুভূতি, চিন্তার স্বাধীনতা ও আবেগের যুক্তিগ্রাহ্যতা সুতীক্ষ্ণ করার জন্য খুবই উপযোগী।
দুঃখজনক হলেও সত্য যে, আমাদের সন্তানরা আজকাল বসবাস করছে পরস্পর লাগোয়া বাসার সংকীর্ণ কিছু ফ্ল্যাটে, যা মুরগির খোয়াড়ের চেয়ে বেশি কিছু না; ভেতরের বাসিন্দারা সারাক্ষণ বন্দি সেখানে। মুক্ত বিহঙ্গের মতো আপন খেয়ালে ছুটে বেড়ানোর আনন্দ থেকে তারা বঞ্চিত। তারা জানে না নির্মল পরিবেশে বেঁচে থাকা এবং বুকভরে শ্বাস নেওয়ার কী স্বাদ!
সন্দেহ নেই, আধুনিক সভ্যতায় স্নায়ু কিংবা পুরো শরীরে যে অসুস্থতা বাসা বেঁধেছে তা মূলত প্রকৃতি থেকে দূরে থাকা এবং কৃত্রিমতায় মেতে থাকার কারণেই। মরুভূমির প্রতি মাক্কাবাসীদের যে ঝোঁক সেটাকে আমরা অবশ্যই সম্মান জানাতে পারি। তারা তাদের সন্তানদেরকে শক্ত-সামর্থ্য করে গড়ে তোলার জন্য প্রথম খেলার মাঠ হিসেবে বেছে নিত মরুভূমির মতো খোলামেলা জায়গাকে। অনেক শিক্ষাবিদই আশা করেন যে, প্রকৃতির অবারিত মাঠ, খোলা আকাশের নিচে বিস্তীর্ণ সবুজের গালিচা, আকাশের গায়ে হেলান দেওয়া পাহাড়সারি- এমন নির্মল পরিবেশই হবে শিশুর প্রাথমিক বিদ্যালয়। ভোরের সোনালি আলো, সন্ধ্যার আবছায়া, আকাশের নীলিমা, দিগন্তের লালিমা, চাঁদের জোৎস্নায় আপ্লুত হবে তারা। মোহাবিষ্ট হয়ে থাকবে প্রকৃতির রহস্য চিন্তায়, খুঁজে ফিরবে এর স্রষ্টাকে। কিন্তু আফসোস, বর্তমান শহুরে সভ্যতায় শিশুদের নিয়ে এমন চিন্তা স্বপ্নেই সম্ভব। বাস্তবায়ন বড়ই কঠিন।” [১২৬]
রাসূল এমন সুযোগ পেয়েছেন। আল্লাহই তাঁকে সুযোগটি করে দেন। তিনি সা'দ গোত্রে থেকে থেকে বিশুদ্ধ আরবি ভাষা রপ্ত করেন। যার কারণে পরবর্তীকালে তিনি হয়ে ওঠেন সৃষ্টির সেরা বিশুদ্ধভাষী। একবার সাহাবি আবু বাক্স রাসূলুল্লাহর কাছে জানতে চান, “হে আল্লাহর রাসূল ! আপনার চেয়ে বেশি বিশুদ্ধভাষী আমি আর কাউকেই দেখিনি।”
রাসূল বললেন, “আমাকে কীসে বাধা দেবে বলো (এমন বিশুদ্ধভাষী হতে)! আমি তো কুরাইশদেরই একজন এবং আমাকে স্তন্যপান করানো হয়েছে সা'দ গোত্রে।” [১২৭]
সা'দ গোত্রে থাকার সময় বক্ষ-বিদীর্ণ করার ঘটনা রাসূলুল্লাহর নুবুওয়াতের একটি অনন্য নিদর্শন এবং মহান দায়িত্বের জন্য আল্লাহ তা'আলা যে তাঁকে বেছে নিয়েছেন তার স্বপক্ষে বড় প্রমাণ। [১২৮]
ইমাম মুসলিম তাঁর সহীহ মুসলিমে ছেলেবেলায় রাসূলুল্লাহর বক্ষ-বিদীর্ণের ঘটনা উল্লেখ করতে গিয়ে বর্ণনা করেন যে, আনাস ইবনু মালিক বলেন,
“রাসূল তখন অন্য ছেলেদের সঙ্গে খেলছিলেন, এমন সময় তাঁর কাছে জিব্রীল আসেন। তাঁকে ধরে তিনি জোর করে মাটিতে শুইয়ে দেন। এরপর বক্ষ-বিদীর্ণ করেন, বের করে আনেন হৃৎপিণ্ড। হৃৎপিণ্ড থেকে আবার বের করেন একটি রক্তপিণ্ড এবং বললেন, 'এটা আপনার ভেতরে শয়তানের অংশ।' এরপর তিনি সেটি একটা স্বর্ণের পাত্রে রেখে যামযামের পানি দিয়ে ধুয়ে দেন। তারপর তিনি হৃৎপিণ্ডকে একত্র করে একটির সঙ্গে আরেকটি লাগিয়ে আগের জায়গায় রেখে দেন। শিশুরা ভয় পেয়ে ছুটে এসে তাঁর দুধ-মার কাছে বলে, 'মুহাম্মদকে মেরে ফেলা হয়েছে।' খবর পেয়ে হন্তদন্ত হয়ে ছুটে আসেন তারা। দেখেন রাসূলুল্লাহর চেহারা বিবর্ণ রং ধারণ করেছে। আনাস বলেন, 'আমি রাসূলুল্লাহর বুকে সেই সেলাইয়ের দাগ দেখেছি।” [১২৯]
শয়তানের অংশ থেকে নবিজিকে পবিত্রকরণ নিঃসন্দেহে নুবুওয়াতের প্রাথমিক একটি নিদর্শন। শির্ক ও গাইরুল্লাহর 'ইবাদাতের থেকে বাঁচিয়ে রাখার প্রস্তুতি পর্ব। তাঁর মন-মগজে একনিষ্ঠ তাওহীদ ছাড়া অন্যকিছু আসন গাড়তে পারেনি। শৈশবে ঘটে যাওয়া এই ঘটনা তাঁকে তাওহীদের ওপর অবিচল থাকতে সহায়তা করে; পাপ-পঙ্কিলতার জালে তিনি আটকে পড়েননি, প্রতিমার সামনে ঝুঁকেনি তাঁর মাথা। [১৩০] যদিও সে সময় কুরাইশদের মধ্যে এ পাপগুলোর চর্চা ছিল ব্যাপক হারে। [১৩১]
বক্ষ-বিদীর্ণের রহস্য উন্মোচন করতে গিয়ে ড. আল-বৃতি বলেন, 'হতে পারে এর পেছনের উদ্দেশ্য হলো-রাসূলুল্লাহর গুরুত্ববার্তা ঘোষণা করা এবং ছোটবেলা থেকে তাঁকে বড় গুনাহ করা থেকে রক্ষা এবং ওয়াহির জন্য জাগতিক উপায়-উপকরণের মাধ্যমে প্রস্তুত করা, যাতে করে মানুষ খুব সহজেই তাঁর প্রতি ঈমান আনে, বিশ্বাস করে তাঁর রিসালাতকে; তাঁর নুবুওয়াতকে। সুতরাং বলা চলে যে, ঘটনাটি আধ্যাত্মিক ও নৈতিক ভিত্তি প্রস্তুতকরণের একটি অস্ত্রোপচার ছিল মাত্র। কিন্তু ঘটনাটি ঘটেছে অনুভূতিগ্রাহ্য জাগতিক প্রক্রিয়ায়। রক্তপিণ্ডটি বের করে রাসূলুল্লাহকে শৈশবের সব নিরর্থক, বেহুদা এবং খেয়ালিপনার অবস্থা থেকে পবিত্র করা হয়েছে। পরিবর্তে তাঁকে একাগ্রতা, বিচক্ষণতা, ভারসাম্যতা এবং সত্যবাদিতাসহ বহুগুণে মহিমান্বিত করা হয়েছে। ঘটনাটি এটারও সপ্রমাণ যে, আল্লাহ তাঁকে আপন মহিমায় রক্ষা করেছেন, যার কারণে শয়তান তার কাছে ভেড়ার কোনো রাস্তা পায়নি।” [১৩২]
টিকাঃ
১২৫. মুসনাদ আবু ইয়া'লা, ১৩/৯৩, হাদীস নং ৭১৬৩; আল-কাবীর, তবারানি, ২৪/২১২, হাদীস নং ৫৪৫; আল-মুজমা', হাইসামি, ৮/২২১; এবং তিনি বলেন, হাদীসটি আবু ইয়া'লা ও তাবারানি যে সূত্রে বর্ণনা করেন তা খুবই শক্তিশালী। ইমাম যাহাবি তাঁর আস-সীরাহ আন-নাবাওয়িয়া, পৃ. ২১-তে হাদীসটি বর্ণনা করেন, এবং তিনি বলেন, হাদীসটির একটি ভালো সনদ রয়েছে। আরও বিস্তারিত জানার জন্য দেখা যেতে পারে ইবনু ইসহাকের সূত্রে বর্ণিত, খুশানির ব্যাখ্যাসংবলিত আস-সীরাহ আন-নাবাওয়িয়া, ১/২১৪; ইবনু ইসহাক স্পষ্ট করে জানিয়েছেন যে, বর্ণনাটি তিনি নিজেই শুনেছেন। (আরেকজন বর্ণনাকারীর কাছ থেকে)
১২৬. দেখুন: ফিকহুস-সীরাহ, পৃ. ৬০, ৬১।
১২৭. আস-সুহাইলি, আর-রওদুল-আনফ, ১/১৮৮।
১২৮. দেখুন: আল-বৃতি, ফিকহুস-সীরাহ, পৃ. ৪৭।
১২৯. সহীহ মুসলিম, অধ্যায়: ঈমান, পরিচ্ছেদ: আল্লাহর রাসূলুল্লাহর আকাশপানে ভ্রমণ, ১/৪৫, হাদীস নং ১৬২।
১৩০. ওরিয়েন্টালিস্ট নিকলসনের ধারণা: "আমি কি তোমার বক্ষ উন্মুক্ত করিনি?” (সূরা আল-ইনশিরাহ, ৯৪:১) আয়াতটির ব্যাখ্যা থেকে উদ্ভূত একটি উপাখ্যান ছাড়া আর কিছুই নয় বক্ষ-বিদীর্ণের ঘটনাটি। সে বলে, "আর ঘটনাটির যদি কোনো সত্যতা থেকে থাকে, তবে আমাদের আন্দাজ করতে অসুবিধা হয় না যে, এটা আসলে মৃগীরোগের প্রতিই ইঙ্গিত করে।' ঘটনাটির প্রশ্নে এসে নিকলসন আসলে তালগোল পাকিয়ে ফেলে। ইতঃপূর্বে মাক্কার মুশরিকরাও এমন ধারণাই পোষণ করত; তারা নবিজিকে পাগল বলে অপবাদ দিয়েছিল। কিন্তু আল্লাহ তাদের এমন জঘন্য অপবাদের জবাব কুরআনে দিয়েছেন। আল্লাহ বলেন, "আর তোমাদের সঙ্গী তো পাগল নয়." (সূরা আত-তাকউঈর, ৮১:২২)
১৩১. আল-'উমরি, আস-সীরাহ আন-নাবাওয়িয়া, ১/১০৪।
১৩২. দেখুন: আবু ফারিস, আস-সীরাহ আন-নাবাওয়িয়া, পৃ. ১০৬, ১০৭।
📄 মায়ের মৃত্যু এবং পর্যায়ক্রমে দাদা ও চাচার দায়িত্বভার গ্রহণ
রাসূল যখন ৬ বছরের বালক তখন তাঁর প্রিয় মা এই পৃথিবী ছেড়ে চলে যান। মাক্কা ও মাদীনার মধ্যবর্তী আবওয়া নামক একটি জায়গাতে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। আমিনা তার ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে নিজের ভাই 'আদি ইবনু নাজ্জার গোত্রের কাছে গিয়েছিলেন। উদ্দেশ্য-ছেলেকে তাদেরকে দেখানো। সেখান থেকে মাক্কায় ফেরার পথেই আমিনা মারা যান। [১৩৩] আবওয়াতেই তাকে দাফন করা হয়।
মায়ের মৃত্যুর পর এবার তাঁর অভিভাকত্ব গ্রহণ করেন দাদা 'আবদুল-মুত্তালিব। তার তত্ত্বাবধানে রাসূলুল্লাহ বেড়ে উঠতে থাকেন। 'আবদুল-মুত্তালিব নিজের ছেলেদের ওপর নাতিকে প্রাধান্য দিতেন। তিনি খুবই গুরুগম্ভীর প্রকৃতির ছিলেন। তার ভয়ে ছেলেদের কেউই বাবার গদিতে বসার সাহস করতেন না। কিন্তু রাসূল অনায়াসেই দাদার গদিতে বসে পড়তেন। তাই দেখে চাচাদের কেউ কেউ বাবার গদি থেকে ভাতিজাকে উঠিয়ে দূরে কোথাও বসানোর চেষ্টা করতেন। 'আবদুল-মুত্তালিব উলটো নাতিকে তার পাশে আদর করে বসাতেন। রাসূলুল্লাহর মাঝে কল্যাণ রয়েছে দেখে নাতিকে তার পাশে বসতে তিনি উদ্বুদ্ধ করতেন। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, তার এই নাতি অন্য আর দশটি ছেলের মতো নয়; বরং ভবিষ্যতে অনন্য এক মর্যাদার আসনে সমাসীন হবে সে। [১৩৪] নাতিকে প্রচণ্ড ভালোবাসতেন দাদা। কোনো কাজে দাদা যদি তাঁকে পাঠাতেন তিনি সঙ্গে সঙ্গে তার ডাকে সাড়া দিতেন এবং সুষ্ঠুভাবে সে কাজটি সম্পন্ন করতেন।
একদিনের ঘটনা। দাদা নাতিকে পাঠালেন তার উটটি খুঁজে আনতে। কিন্তু খুঁজতে গিয়ে রাসূল ফিরে আসতে দেরি করছিলেন। [১৩৫] নাতির আসতে দেরি হচ্ছে দেখে দাদা অস্থির হয়ে যান। কা'বার চারপাশে তাওয়াফ করতে করতে আল্লাহর কাছে নাতিকে ফিরে পাওয়ার ফরিয়াদ করে তিনি বলছিলেন, “হে রব, আমার মুহাম্মাদকে ফিরিয়ে দাও, তাঁকে ফিরিয়ে দিয়ে আমার হিম্মত বাড়িয়ে দাও।”
এরপর উট সঙ্গে নিয়ে রাসূল যখন ফিরে এলেন তখন দাদা তাঁকে বললেন, "আহ! আমি তোমাকে নিয়ে খুবই চিন্তিত হয়ে পড়েছিলাম, তুমি আর কখনো আমাকে ছেড়ে দূরে যাবে না।” [১৩৬]
তারপর একদিন দাদাও চলে গেলেন এ নশ্বর পৃথিবী ছেড়ে। তখন রাসূলুল্লাহর বয়স মাত্র ৮ বছর। [১৩৭] মারা যাওয়ার আগে 'আবদুল-মুত্তালিব নিজ ছেলে আবু তালিবকে নাতির তত্ত্বাবধান করতে জোর ওসিয়ত করেন। এবার চাচা আবু তালিব ভাতিজার দেখভালের দায়িত্ব নেন। [১৩৮]
আল্লাহ ইচ্ছা ছিল তিনি তাঁর রাসূলকে প্রতিপালন করবেন একজন এতিম করে। চাইলেন নবিজি প্রতিপালিত হবেন তাঁর তত্ত্বাবধানে, কেবল তাঁরই রক্ষণাবেক্ষণে; তাঁকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে এমন কোনো অভিভাবকের সাহায্য-সহযোগিতা ছাড়া কিংবা তাঁর আরাম-আয়েশের মাত্রা বাড়িয়ে দেবে— এমন কোনো ধন-সম্পদের প্রাচুর্য থেকে দূরে, বহুদূরে রেখেই তিনি তাঁর রাসূলকে প্রতিপালন করবেন। বড় হয়ে যাতে করে ধন-সম্পদ কিংবা প্রভাব-প্রতিপত্তির মোহে তিনি মোহাবিষ্ট হয়ে না পড়েন। তাঁর চারপাশে নেতৃত্বের যে লোভনীয় হাতছানি তা যেন তিনি উপেক্ষা করতে পারেন অনায়াসে। দুনিয়ার মোহের সঙ্গে নুবুওয়াতের নির্মলতার প্রভেদটা যে বিস্তর, মানুষ যাতে সেটা বুঝতে পারে এবং দুটোকে এক করে তালগোল পাকিয়ে না ফেলে। তারা যাতে তাঁর ব্যাপারে এটাও মনে না করে যে, ধনসম্পদ ও নেতৃত্ব লাভের জন্য তিনি নবি হওয়ার ভান করছেন মাত্র।
রাসূল আশৈশব বহু বিপদ-আপদ সয়েছেন; প্রথমেই হারালেন মাকে, অল্প কদিনের ব্যবধানে চলে গেলেন দাদা। আর পিতার মায়া-মমতা, স্নেহ-ভালোবাসা কাকে বলে তা তো তিনি কোনো দিন জানতেও পারলেন না। তাঁর জন্মের আগেই যে বাবা মারা যান। বিচ্ছেদের এমন পরীক্ষার কারণেই তিনি পরিণত হন কোমল হৃদয় ও সংবেদনশীল ব্যক্তিত্বে। দুঃখ-কষ্ট তাঁকে রূঢ়তা, অহমিকা এবং প্রবঞ্চনার মতো অন্যের সঙ্গে কোনো কঠিন আচরণ না করা থেকে সাহায্য করে। এবং তাঁকে করে তোলে অধিক সংবেদনশীল ও বিনয়ী।
টিকাঃ
১৩৩. সীরাত ইবনু হিশাম, ১/৬৮।
১৩৪. দেখুন: আবু ফারিস, আস-সীরাহ আন-নাবাওয়িয়া, পৃ. ১০১।
১৩৫. আলি, সহীহুস-সীরাহ আন-নাবাওয়িয়া, পৃ. ৫৬; তিনি বলেন, হাকীম এটি বর্ণনা করেছেন, ২/৬০৩, ৬০৪; এবং যাহাবি এটাকে সহীহ স্বীকৃতি দিয়েছেন এবং সহমত পোষণ করেছেন; হাইসামি আল-মুজমা, ৮/২২৪-এ বলেন, আবু ইয়া'লা ও তাবারানিও বর্ণনা করেন এবং এর সনদ বা বর্ণনাসূত্র হাসান।
১৩৬. প্রাগুক্ত।
১৩৭. দেখুন: আবু ফারিস, আস-সীরাহ আন-নাবাওয়িয়া, পৃ. ১০১।
১৩৮. দেখুন: ড. ইয়াহইয়া, মাদখাল লিফাহমিস-সীরাহ, পৃ. ১১৯।
📄 মেষ চরানোর কাজে রাসূল
দাদার মৃত্যুর পর রাসূল চাচা আবু তালিবের তত্ত্বাবধানে বড় হচ্ছিলেন। কিন্তু সেসময় চাচার ব্যবসা-বাণিজ্য ভালো যাচ্ছিল না। চাচার অর্থনৈতিক এমন দুরবস্থা রাসূলুল্লাহর মর্মপীড়ার কারণ হয়। তিনি মেষ চরানোর কাজ নেন। আশা- চাচার সংসারে বোঝা হয়ে না থেকে তার সাহায্যে কাজে লাগা। রাসূল নিজের সম্পর্কে এবং তাঁর ভাই অন্যান্য নবি-রাসূলের সম্পর্কে আমাদের অবহিত করেন যে, তারা সবাই মেষ চরানোর কাজ করেছেন।
রাসূল বালক বয়সেই মক্কাবাসীদের মেষ চরান। নবিদের জন্য মেষ চরানোর কাজ করার যে অমোঘ নিয়তি তা তিনি সেই বয়সেই সম্পাদন করেন। সহীহ হাদীসে এসেছে, রাসূল বলেন, “আল্লাহ এমন কোনো নবিকে পাঠাননি যিনি মেষ-ভেড়া চরাননি।”
শুনে সাহাবিরা জানতে চাইলেন, “আপনিও?”
রাসূল উত্তর করেন, “হ্যাঁ, আমিও কয়েক কীরাতের বিনিময়ে মাক্কাবাসীদের মেষ-ভেড়া চরাতাম।” [১৩৯]
মেষ চরানোর কাজ, নিঃসন্দেহে, রাসূলুল্লাহর জীবনে বয়ে আনে এক অনবিল প্রশান্তি, তাঁর ব্যক্তিসত্তা ঠিক যেমনটি চাচ্ছিল। মরুভূমির বিশালতার সৌন্দর্য তাঁর সামনে ধরা দেয় এ সময়েই। চারপাশের পরিবেশ, ধু-ধু বালুকাবেলা, প্রকৃতিতে সকালের উচ্ছলতা, অলস দুপুরের নির্জীবতা, পড়ন্ত বিকালে সবার ঘরে ফেরার তাড়া—সবকিছুতেই তিনি আল্লাহর মহানুভবতার ছোঁয়া অনুভব করেন। রাতের নিস্তব্ধতায়, চাঁদের জোৎস্নায়, গাছের পাতার মর্মর ধ্বনিতে তিনি হারিয়ে যেতেন নিভৃত আলাপনে। প্রকৃতির কোলে থেকে থেকে তিনি লাভ করেন ধৈর্য, সহিষ্ণুতা, ধীরতা, বিনয়-নম্রতা, দয়া-মায়া, দুর্বলকে সবল হতে সাহায্য করা, বলবানের শক্তিকে খর্ব করে দুর্বলের পথ চলাতে সমতা বিধান করার শিক্ষা। [১৪০]
রাসূলুল্লাহর মেষ চরানোর এই ঘটনা অনেক সহীহ হাদীসে বর্ণিত হয়েছে। পশুপাখির সঙ্গে ভালো ব্যবহার করতে হাদীসগুলো মুসলিমদেরকে উদ্বুদ্ধ করে। [১৪১] তাঁর এই মেষ চরানোর অভিজ্ঞতাটা পরবর্তী সময়ে উম্মাহকে পরিচালনা করতে গিয়েও কাজে দিয়েছে।
টিকাঃ
১৩৯. সহীহ বুখারি, কিতাবুল-ইজারাহ, পরিচ্ছেদ: কীরাতের বিনিময়ে মেষ চরানো, হাদীস নং-২২৬২; দিনার বা দিরহামের একটা অংশের নাম কীরাত।
১৪০. দেখুন: মুহাম্মাদ আস-সাদিক 'উরজুন, মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল, ১/১৭৭।
১৪১. দেখুন: আল-উমরি, আস-সীরাহ আন-নাবাওয়িয়া, ১/১০৬।
📄 মেষ চরানোর মধ্যে নিহিত কল্যাণ
ধৈর্য
সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত একজন রাখালকে তার মেষপাল চরানোর কাজে ব্যস্ত থাকতে হয়। তবে মেষ চরানো কিন্তু সহজ কোনো কাজ নয়; এদের স্বভাবই হলো: তারা ধীরে ধীরে খায়। একাজে একজন রাখালের থাকা চাই প্রচণ্ড ধৈর্য এবং সহনশীলতা। এই যদি হয় মেষ চরানোর বেলায়, তা হলে মানুষ পরিচালনায় ধৈর্যের কত যে প্রয়োজন তা বলার অপেক্ষা রাখে না। [১৪২]
একজন রাখালের যাপিত জীবন সাদামাটা হবে সেটাই স্বাভাবিক। রাজপ্রাসাদে রাজার হালে সে থাকবে তা কেবল স্বপ্নেই সম্ভব। আর এটা তার সাধ্যেরও বাইরে। বরং সে তেজোদীপ্ত সূর্যের প্রখর তাপে চলাফেরা করে। মেষ চরায়। তার ওপর পরিবেশটা যদি হয় আরব উপদ্বীপের মতো তৃষাতপ্ত মরুভূমি, চারপাশে নিরুদ্ধ নিঃশ্বাস তা হলে তো কথাই নেই। রোদের প্রচণ্ডতা সেখানে আরও বেশি। তার পিপাসা মেটানোর জন্য চাই পর্যাপ্ত পানির। যেখানে সামান্য পানিরই বড় অভাব, সেখানে পর্যাপ্ত পানি সে পাবে কোথায়? দিশেহারা হয়ে সে চারপাশে খাবার বা পানি হন্যে হয়ে খুঁজে বেড়ায়। কিন্তু শুষ্ক কিছু তৃণ ছাড়া আর যে কিছুই জোটে না। তখন সে বাধ্য হয়েই এমন রূঢ় পরিবেশের সঙ্গে নিজেকে খাপ খাইয়ে নেয়। ধীরে ধীরে সে সবকিছুতে হয়ে ওঠে অভ্যস্ত, হয়ে ওঠে কষ্টসহিষ্ণু। [১৪৩]
বিনম্রতা
একজন রাখাল রাখালি করতে করতে অন্যদিকে আর খেয়াল থাকে না; তার ধ্যান- জ্ঞান হয়ে ওঠে কেবল তার মেষপালের যত্ন-আত্তি, মেষছানার দেখভাল ও হিংস্র প্রাণীদের আক্রমণ প্রতিহত করে সেগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। এখানেই শেষ নয়, রাতের বেলাতেও মেষপালের কাছাকাছি তাকে ঘুমাতে হয়। পালের পাশে ঘুমাতে গিয়ে হয়তো দেখা গেল মেষের চোনার ছিটেফোঁটা তার নাকে-মুখে এসে পড়ছে। কিংবা পাশ ফিরে শুতে গিয়ে নাদা লেগে গেল হাতে। এত উপদ্রবের পরও রাখাল কিন্তু বিরক্তি প্রকাশ করছে না মোটেই। এভাবে যেতে যেতে একটা সময় এসে সব উপদ্রব তার গা-সয়ে যায়। অহংকার-অহমিকা, গর্ব-বড়াই তিরোহিত হতে থাকে তার চরিত্র থেকে। বিনয়ী হতে শুরু করে সে। [১৪৪]
সহীহ মুসলিমে এসেছে, রাসূল বলেন, “যার অন্তরে শস্যদানা পরিমাণ অহংকার থাকবে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে না।”
তখন একজন লোক জানতে চাইল, “একজন ব্যক্তি ভালোবাসে যে, তার পোশাক সুন্দর হোক এবং তার জুতা দেখতে ভালো দেখাক (তা হলে এটা কি অহংকার হবে?)।” রাসূল উত্তর করেন, “নিশ্চয় আল্লাহ সুন্দর। তিনি সুন্দরকে ভালোবাসেন। অহংকার হলো: সত্যকে অস্বীকার করা এবং মানুষকে অবজ্ঞা করা।” [১৪৫]
বীরত্ব
রাখাল তার পালের প্রতিটি মেষের প্রতি সমান দায়িত্ব পালন করে। তাদের নিরাপত্তা বিধানে সে থাকে সচেষ্ট। ভয়ংকর, বন্য সব প্রাণী কখন আক্রমণ করে ছাগলপালের ওপর এ ভয়ে তটস্থ থাকতে হয় তাকে। চোখ-কান খোলা রেখে চারপাশে বোলাতে হয় সতর্ক নজর। এমন সংকুল পরিবেশই তাকে তার মেষপাল রক্ষার তাগাদায় গড়ে তোলে প্রচণ্ড সাহসী করে। [১৪৬]
দয়া-মায়া
মেষপালের যত্ন-আত্তির অংশ হিসেবে একজন রাখালকে অনেক কাজই আঞ্জাম দিতে হয়। কোন ছাগলটি অসুস্থ তার খোঁজ রাখা, পাহাড়ের ওপর থেকে পাথরে আছড়ে পড়ে কার হাড্ডি গুঁড়া হয়েছে কিংবা গুঁতোগুঁতি করতে গিয়ে কে চোট পেয়েছে-এমন খবরাখবর সবই তার কাছে আছে। সঙ্গে সঙ্গে সে উঠে-পড়ে লেগে যায় এগুলোর সেবা-শুশ্রূষায়। অবলা প্রাণী বলে কথা; মুখ ফুটে বলতে পারে না কিছু ঠিকই। তাই বলে ব্যথা যে পেয়েছে সেটা তো আর মিছে হয়ে যায় না।
এমন কাজের জন্য একজন রাখালের হওয়া চাই দরদদিল মানুষ। তাদের ব্যথা উপশমে, রোগ-চিকিৎসায় তাকে যত্নবান হতে হয়। আর অবলা প্রাণীকে যে ব্যক্তি দয়া করতে শিখল, সে যে মানবের প্রতি অধিক দয়াবান হবে এটাই স্বাভাবিক। বিশেষ করে, তিনি যদি একজন রাসূল হন তবে তো তাঁকে অবশ্যই আরও অধিক দয়াশীল হতে হবে মানুষের প্রতি। কারণ, আল্লাহ তাঁকে পাঠিয়েছেন মানুষকে শিক্ষা দেওয়ার জন্য। জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচার পথ বাতলানো এবং দুনিয়া ও আখিরাতের সৌভাগ্যের খোঁজ মানুষকে দেবেন তিনিই। [১৪৭]
পরিশ্রম করে উপার্জনের প্রতি সহজাত প্রবৃত্তি
আল্লাহ চাইলে নবিজিকে মেষ চরানোর কাজ থেকে বিরত রাখতে পারতেন। কিন্তু তিনি তা করেননি। এটা যেমন রাসূলুল্লাহর জন্য, তেমনই আমাদের জন্যও শিক্ষা। আমাদেরকে পরিশ্রম করে, মাথার ঘাম পায়ে ফেলে, গতর খেটে উপার্জন করে রুটি-রুজির বন্দোবস্ত করতে হবে। আর রাসূলুল্লাহর এই মেষ চরানোটা হাতের কামাই খাওয়ার এমনই একটি অনন্য উদাহরণ মাত্র। ইমাম বুখারি তার সহীহ বুখারিতে মিকদাম থেকে বর্ণনা করেন যে, রাসূল বলেন, “নিজের হাতের কামাই খাওয়ার চেয়ে উত্তম খাবার কেউ কখনোই খায়নি। নিশ্চয়ই আল্লাহর নবি দাউদ নিজ হাতের কামাই খেতেন।” [১৪৮]
সন্দেহ নেই, হালাল উপার্জন মানুষকে খুবই স্বাধীনচেতা করে গড়ে তোলে। অন্যায়-অবিচার, বাতিলের বিরুদ্ধে কথা বলতে তার বুক কাঁপবে না এতটুকু। [১৪৯] কত মানুষকে দেখা যায় বাতিলকে রুখে দাঁড়ানো দূরে থাক, টু শব্দটি পর্যন্ত করার সাহস পায় না। সব অন্যায়-অবিচার দেখেও তারা না দেখার ভান করে পাশ কাটিয়ে চলে যায়। মেনে নেয় সবকিছু মান-সম্মান বিসর্জন দিয়ে। বাতিলের সামনে মাথা নুইয়ে দেয় অবলীলায়। যেন তাদের জন্মই হয়েছে চুপ করে সব দেখে যাবার জন্য। তাদের ভয়-প্রতিবাদ করলেই যে চাকরি খোয়াতে হবে তাকে। পথে বসতে হবে রুটি-রুজির চিন্তায়। [১৫০]
রুটি-রুজি উপার্জনের তাগাদায় রাসূলুল্লাহর মেষ চরানোর কাজ বেছে নেওয়ার পেছনে অবশ্যই কিছু উদ্দেশ্য রয়েছে। রাসূল উন্নত রুচি ও তীক্ষ্ণ অনুভূতিসম্পন্ন ব্যক্তি ছিলেন। আল্লাহ তাঁকে এমন দুটি মহৎ গুণ দিয়ে সৌন্দর্যমণ্ডিত করেছেন। চাচা আবু তালিব তাঁকে খুব ভালোবাসতেন। বাবার স্নেহ-মমতা, আদর-যত্ন দিয়ে তিনি ভাতিজাকে কোলে-পিঠে করে বড় করেন। সেসময় চাচার সংসারের ব্যয়ভার ছিল অনেক বেশি। উপরন্তু তার ব্যবসা-বাণিজ্যও খুব একটা ভালো যাচ্ছিল না। রাসূল দেখলেন চাচার ব্যয়ভার কিছুটা হলেও জোগান দেওয়ার সক্ষমতা তাঁর আছে। যেই ভাবা সেই কাজ। তিনি উপার্জন করতে এগিয়ে আসেন। সাংসারিক খরচ জোগাতে তিনি মাথার ঘাম পায়ে ফেলেন। তিনি যে স্বভাবে উদার, আচার-ব্যবহারে সদাচার এবং সাধ্যের সবটুকু ব্যয় করতে সচেষ্ট ছিলেন, তার একটি বড় প্রমাণ এটি। [১৫১]
আরেকটি বিষয়ও এখান থেকে প্রমাণিত, আল্লাহ তাঁর সৎবান্দাদের জন্য দুনিয়াতে জীবনযাপনের এমন ব্যবস্থাও করে থাকেন। রাসূলুল্লাহর যাপিত জীবনকে আল্লাহ চাইলেই সহজ করে দিতে পারতেন। তিনি ইচ্ছা করলে রাসূলুল্লাহর শৈশবের সূচনায় ভোগ-বিলাসিতা, সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য, আরাম-আয়েশ তাঁর দুপায়ে লুটিয়ে দিতে পারতেন। এতে নবিজিকে আর রিস্ক অনুসন্ধানে, অন্ততপক্ষে ঘাম ঝরানো কোনো কাজ কিংবা মেষ চরানো লাগত না।
কিন্তু আল্লাহর প্রজ্ঞা মহান। তিনি চান আমরা যাতে অনুধাবন করি যে, মানবের উৎকৃষ্ট উপার্জন হলো তার হাতের কামাই এবং সেই উদ্যোগ যা মানুষ সমাজসেবা ও জাতি বিনির্মাণে গ্রহণ করে। [১৫২]
টিকাঃ
১৪২. দেখুন: ড. ইয়াহইয়া, মাদখাল লিফাহমিস-সীরাহ, পৃ. ১২৪।
১৪৩. দেখুন: আবু ফারিস, আস-সীরাহ আন-নাবাওয়িয়া, পৃ. ১১৪, ১১৫।
১৪৪. প্রাগুক্ত, পৃ. ১১৪।
১৪৫. সহীহ মুসলিম, হাদীস নং-১৪৭-(৯১)।
১৪৬. দেখুন: আবু ফারিস, আস-সীরাহ আন-নাবাওয়িয়া, পৃ. ১১৪।
১৪৭. দেখুন: মাদখাল লিফাহমিস-সীরাহ, পৃ. ১২৭।
১৪৮. সহীহ বুখারি, কিতাবুল বুয়ু', হাদীস নং-২০৭২।
১৪৯. দেখুন: মাদখাল লিফাহমিস-সীরাহ, পৃ. ১২৮।
১৫০. দেখুন: গাদবান, ফিকহুস-সীরাহ, পৃ. ৯৩।
১৫১. দেখুন: বৃতি, ফিকহুস-সীরাহ, পৃ. ৫০।
১৫২. প্রাগুক্ত