📄 পিতা 'আবদুল্লাহর বিয়ে ও মাতা আমিনার স্বপ্ন
'আবদুল্লাহ ইবনু 'আবদুল-মুত্তালিব তার পিতার সবচেয়ে স্নেহধন্য পুত্র ছিলেন। তিনি যখন নির্ঘাত জবাই হওয়া থেকে বেঁচে ফিরে এলেন, তখন তার পিতা 'আবদুল- মুত্তালিব তার জানের বদলে দুইশো উট উৎসর্গ করেন। এরপর সম্ভ্রান্ত বংশের কন্যা আমিনা বিন্ত ওয়াহাব ইবনু 'আব্দ-মানাফ ইবনু যুহরা ইবনু কিলাবের সঙ্গে ছেলের বিয়ে দেন। [১১৫]
আমিনা গর্ভবতী হওয়ার কিছুদিনের মাথায় রাসুলুল্লাহর পিতা 'আবদুল্লাহ মারা যান। মাদীনায় 'আদি ইবনু আন-নাজ্জার বংশের তার মামাদের পাশে, তাকে দাফন করা হয়। তিনি এক বাণিজ্যিক সফরে শামে যাচ্ছিলেন। ফিরতি পথে মাদীনায় তিনি মারা যান। কিন্তু মারা যাওয়ার আগেই তিনি পবিত্র এক প্রাণ রেখে যান আমিনার গর্ভে। নিয়তি কেমন যেন তাকে বলছিল, তোমার জীবনের মিশন শেষ; তুমি খুব সুষ্ঠুভাবেই তা সম্পন্ন করতে পেরেছ। পবিত্র এই ভ্রূণকে আল্লাহ তা'আলা আপন হিকমা, রাহমাহ ও জ্ঞানের মাধ্যমে লালন-পালন করবেন। শিষ্টাচার ও তারবিয়া শেখাবেন। এমনভাবে গড়ে তুলবেন যাতে করে তিনি মানবতাকে নিকষ আঁধার ছিঁড়ে নিয়ে আসেন উদ্ভাসিত আলোক রেখায়।
কেবল আমিনাকে 'আবদুল্লাহর বিয়ে করাটাই নবিজির নবি হয়ে পৃথিবীতে আগমনের পথ সুগম হওয়ার সূচনা নয়; কারণ, নবিজিকে এ নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেছিলেন,
"আমি হলাম আমার পিতা ইবরাহীমের দু'আর ফসল, 'ঈসার সুসংবাদের বাস্তবায়ন; আমার মা স্বপ্নে তার থেকে একটা নূর বের হতে দেখেছিলেন; সেই নূর, সেই আলোকপ্রভা শামের প্রাসাদগুলোকে আলোয় উদ্ভাসিত করেছিল।”
নবি ইবরাহীমের করা দু'আটি কুরআনে এভাবে এসেছে :
“হে আমাদের রব! তুমি তাদের মধ্য থেকে তাদের কাছে একজন রাসূল প্রেরণ করো, যে তোমার আয়াত তাদের কাছে তিলাওয়াত করবে, তাদেরকে কিতাব ও প্রজ্ঞা শিক্ষা দেবে এবং তাদেরকে পবিত্র করবে। তুমি তো পরাক্রমশলী, তত্ত্বজ্ঞানী।” [সূরা বাকারা, ২:১২৯]
রাসূলুল্লাহকে নিয়ে 'ঈসার সুসংবাদ এমন, যা আল্লাহ কুরআনে তার ঘটনা বর্ণনা করতে গিয়ে বলেছেন,
“স্মরণ করো, মারইয়াম-পুত্র 'ঈসা বলেছিল, 'হে বনি-ইসরাঈল! আমি তোমাদের নিকট (প্রেরিত) আল্লাহর রাসূল। আমার আগে থেকে তোমাদের কাছে যে তাওরাত আমি তার সমর্থক; আর পরে আহমাদ নামে যে রাসূল আসবেন, আমি তাঁরও সুসংবাদদাতা।” [সূরা আস-সফ, ৬১:৬]
আর রাসূল যে বলেছেন, “আমার মা স্বপ্নে তার থেকে একটা নূর বের হতে দেখেছিলেন। সেই নূর, সেই আলোকপ্রভা শামের প্রাসাদগুলোকে আলোয় উদ্ভাসিত করেছিল।” এ সম্পর্কে ইবনু রাজাব বলেন,
“রাসূল ভূমিষ্ট হওয়ার সময় আলোটি বের হওয়ার একটি অর্থ রয়েছে। আর তা হলো—এমন এক নূরের আগমন ঘটতে চলেছে যে, সেই আলোয় পথের দিশা পাবে পৃথিবীবাসী এবং এ আলোয় শির্কের অন্ধকার দূরে পালাবে। যেমন: আল্লাহ বলেন, “হে আহল-কিতাবগণ! তোমাদের কাছে আমার রাসূল এসেছে, তোমরা কিতাবের যা যা গোপন করতে, তিনি তার অনেকে কিছু তোমাদের কাছে প্রকাশ করে এবং অনেক কিছু উপেক্ষা করে থাকে। তোমাদের কাছে আল্লাহর কাছ থেকে এক জ্যোতি ও একটি স্পষ্ট কিতাব তো এসেছে। যারা আল্লাহর সন্তুষ্টি কামনা করে, এ (কুরআন) দিয়ে তিনি তাদেরকে শান্তির পথ দেখান, আর নিজের ইচ্ছায় তাদেরকে আঁধার থেকে আলোতে বের করে আনেন এবং তাদেরকে সরল পথে পরিচালিত করেন।" [সূরা মা'ইদা, ৫:১৫, ১৬]
ইবনু কাসীর বলেন, তাঁর (রাসূলুল্লাহর) নূর প্রকাশ পাওয়ার জন্য শাম দেশকে বেছে নেওয়ার পেছনে ইঙ্গিত হলো: রাসূলুল্লাহর আনীত দীন ইসলাম স্থির ও স্থায়ী হবে এ শাম দেশেই; শেষ জমানায়, কিয়ামাতের পূর্বে, ইসলাম ও মুসলিমদের জন্য এক দুর্ভেদ্য দুর্গ হয়ে উঠবে শাম দেশ। নবি 'ঈসা ইবনু মারইয়াম দামেস্কের শ্বেত-শুভ্র মিনারের পশ্চিম দিকে আসমান থেকে নেমে আসবেন। সহীহ বুখারি ও মুসলিমে বর্ণিত আছে, রাসূল বলেন, “আমার উম্মাহর একটি দল সর্বদা সত্যের ওপর দৃঢ়, অটল ও অবিচল থাকবে। অপমানকারী ও বিরুদ্ধবাদীদের কেউই তাদের কোনো ক্ষতি করতে পারবে না। আল্লাহর হুকুম (কিয়ামাত) আসার আগপর্যন্ত তারা সত্যকে আঁকড়ে থাকবে।” সহীহ বুখারিতে বাড়তি যোগ হয়েছে এ কথাটি: তারা শামেই থাকবে। [১১৮]
টিকাঃ
১১৫. আহমাদ ফারীদ, ওয়াকাফাত তারবাওয়িয়া মা'আস-সীরাহ, পৃ. ৪৬।
১১৬. প্রাগুক্ত, পৃ. ৪৬।
১১৭. আহমাদ, ৫/২৬২, হাদীস নং ২২,২৬১; মুআস্সাসাতুর-রিসালাহ সংকরণের সম্পাদকগণ হাদীসটিকে 'সহীহ লিগাইরিহি' বলেছেন; আল-হাকিম ২/৬০০; হাকিম বলেন, “এর সনদ সহীহ, তবে সহীহ বুখারি ও মুসলিম তাদের কিতাবে হাদীসটি নিয়ে আসেননি। ইমাম যাহাবি তার সঙ্গে সহমত পোষণ করেন। মাজমা'উয-যাওয়াইদ, ৮/২২২। তিনি বলেন, "ইমাম আহমাদ বর্ণিত সনদটি হাসান, এবং সাক্ষ্য-প্রমাণও হাদীসটি শক্তিশালী হওয়ার স্বপক্ষে।"
১১৮. দেখুন: ইবনু কাসীর, ১/১৮৪। ইমাম বুখারি তাঁর সহীহতে কিতাবুল-মানাকিব, ২৮ নং পরিচ্ছেদ, হাদীস নং ৩৬৪১-তে বর্ণনা করেন।
📄 রাসূলুল্লাহর জন্ম
রাসূল সোমবারে জন্মেছেন, এ ব্যাপারে বিজ্ঞজনরা একমত। অধিকাংশের মত, তিনি রাবি'উল-আওয়াল মাসের ১২ তারিখ রাতে জন্মগ্রহণ করেন। [১১৯] তবে তিনি যে হাতির ঘটনার বছরে পৃথিবীতে জন্মগ্রহণ করেন, এ বিষয়টিতে কেউই দ্বিমত করেননি। [১২০] বানু হাশিমের উপত্যকায়, আবু তালিবের ঘরে রাসূল ভূমিষ্ট হন। [১২১]
প্রখ্যাত কবি আমিরুশ-শু'আরা আহমাদ শাওকি রাসূলুল্লাহর জন্ম উপলক্ষ্যে একটি কবিতা রচনা করেন। তিনি বলেন,
জন্ম নিয়েছেন হিদায়াতের আলো সৃষ্টিকুলে
আলোর সমাহার যুগের মুখে ফুটছে হাসি
দূর হলো সব আঁধার কালো।
জিব্রীল ও ফেরেশতাকুল দীন ও দুনিয়ার তরে
শুনিয়ে যাচ্ছেন সুসংবাদ এক- এসেছেন এক মহান রাসূল।”
টিকাঃ
১১৯. ইবরাহীম আল-আলি, সহীহুস-সীরাহ আন-নাবাওয়িয়া, পৃ. ৪৭।
১২০. ইবনু কাসীর, আস-সীরাহ আন-নাবাওয়িয়া, ১/২০৩।
১২১. দেখুন: ওয়াফাকাত মা'আস-সীরাহ আন-নাবাওয়িয়া, পৃ. ৪৭।
📄 নবিজিকে স্তন্যদান
পিতা 'আবদুল্লাহর দাসী উম্মু আইমান বারাকা হাবাশিয়্যা ছিলেন রাসূলুল্লাহর দাইমা। চাচা আবু লাহাবের দাসী সুওয়াইবাই প্রথম নবিজিকে দুধ পান করান। [১২২]
যাইনাব বিন্ত আবু সালামা থেকে বর্ণিত যে, উম্মু হাবীবা তাকে জানান, একবার তিনি নবিজিকে বলেন, “হে আল্লাহর রাসূল , আপনি আমার বোন আবু সুফিয়ানের কন্যাকে বিয়ে করুন।”
রাসূল জানতে চান, “এমনটা হোক তুমি কি তা পছন্দ করো?”
“হ্যাঁ। এমনিতেও তো আমি আপনার একমাত্র স্ত্রী নই। কাজেই কল্যাণকর বিষয়ে আমার সঙ্গে যারা অংশীদার, তাদের মধ্যে আমার বোনের অংশীদারিত্ব থাকাটা আমি পছন্দ করি।”
“বিষয়টি আমার জন্য কোনোভাবেই বৈধ নয়।” (কারণ, দু-বোনকে একসঙ্গে স্ত্রীরূপে গ্রহণ করা আল্লাহ হারাম করেছেন)
“লোকে বলাবলি করছে যে, আপনি নাকি আবু সালামার কন্যাকে বিয়ে করতে চান।"
রাসূল অবাক হয়ে জানতে চান, “উম্মু সালামার কন্যাকে?”
“হ্যাঁ।”
“সে তো আমার তত্ত্বাবধানে পালিত আমার স্ত্রীর কন্যা (তাই সে আমার জন্য হালাল হতে পারে না, আর যদি এমনটা নাও হতো) তবু সে আমার জন্য হালাল হতো না। কারণ, সে আমার দুধ-ভাইয়ের মেয়ে; সুওয়াইবা আমাকে ও আবু সালামাকে দুধ পান করিয়েছিলেন। তাই তোমরা তোমাদের কন্যা ও তোমাদের বোনদেরকে বিয়ের জন্য আমার সামনে পেশ কোরো না।” [১২৩]
উম্মু আইমান ছিলেন উসামা ইবনু যাইদের মা। তিনি মূলত রাসূলুল্লাহর পিতা 'আবদুল্লাহ ইবনু 'আবদুল-মুত্তালিবের পরিচারিকা ছিলেন। আবিসিনায় তার বাড়ি। পিতা 'আবদুল্লাহর মৃত্যুর কিছুদিন পর রাসূল যখন জন্ম নেন, তখন উম্মু আইমান রাসূলুল্লাহর দাইমার কাজ করেন। বড় হয়ে রাসূল উম্মু আইমানকে আর দাসী করে রাখনেনি; স্বাধীন করে দিয়ে যাইদ ইবনু হারিসার সঙ্গে তার বিয়ে দেন। রাসূলুল্লাহর মৃত্যুর পাঁচ মাস পর উম্মু আইমান মারা যান। [১২৪]
টিকাঃ
১২২. দেখুন: ওয়াফাকাত মা'আস-সীরাহ আন-নাবাওয়িয়া, পৃ. ৪৮।
১২৩. সহীহ বুখারি, কিতাবুন-নিকাহ, পরিচ্ছেদ, “তোমাদের সেই মায়েরা যারা তোমাদেরকে স্তন্য দান করেছেন।” হাদীস নং ৫১০১।
১২৪. সহীহ মুসলিম, কিতাবুল-জিহাদ; পরিচ্ছেদ, আনসারদের নিকট মুহাজিরদের গাছ ও ফলের মতো কিছু উপহার পাঠানো। হাদীস নং ১৭৭১।
📄 হালীমা আস-সা'দিয়্যা
রাসূলুল্লাহর দুধমা হালীমা আস-সা'দিয়্যা রাসূলুল্লাহর বারাকা নিয়ে আমাদের অনিন্দ্য সুন্দর একটি গল্প শুনিয়েছেন।
গল্পটি 'আবদুল্লাহ ইবনু জা'ফার থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “যখন রাসূল জন্মগ্রহণ করেন, তখন হালীমা বিন্ত হারিস বানু সা'দ ইবনু বাক্রের একদল মহিলার সঙ্গে মাক্কায় আসেন। তাদের উদ্দেশ্য—মাক্কায় দুধশিশুর সন্ধান করা। হালীমা বলেন, 'আমি আমার নিজের ঈষৎ সবুজ-সাদা রঙের মাদি- গাধার পিঠে চড়ে মহিলাদের প্রথম দলটির সঙ্গে বেরিয়ে পড়ি। সঙ্গে আমার স্বামী, সা'দ ইবনু বাক্রের অন্যতম সন্তান, হারিস ইবনু 'আবদুল-উয্যা; এরা আবার বানু নাদিরা গোত্রের একটা অংশ।
(দীর্ঘপথ চলার কারণে) আমাদের মাদি-গাধাটির পা রক্তাক্ত হয়ে পড়ে। সঙ্গে আমাদের জরাগ্রস্ত, বুড়ো একটি উটনীও ছিল। আল্লাহর কসম! সেটি একফোঁটা দুধও দিচ্ছিল না। তার ওপর হচ্ছিল না বৃষ্টি। সবুজের লেশমাত্র নেই কোথাও। খাবারের কিছু ছিল না মানুষদের। না খেয়ে খেয়ে সবার মারা যাওয়ার জোগাড়। আমি আমার ছোট ছেলেটিকেও সঙ্গে নিই। তার অবস্থাও ভালো ছিল না; ক্ষুধায় কাতর থাকত বলে রাতে সে আমাদের শান্তিতে ঘুমাতে দিত না। ঘরে কিছুই ছিল না যা দিয়ে তাকে শান্ত করব। এত কিছুর পরও হাল ছেড়ে দিইনি; মনে মনে আশা-আবার বৃষ্টি হবে। একটা ভেড়াও ছিল আমাদের। তাই এর জন্য আমরা আরও বেশি করে বৃষ্টি চাচ্ছিলাম।
এক সময় আমরা মাক্কায় এসে পৌঁছি। রাসূলুল্লাহকে একে একে আমাদের সবার সামনে পেশ করা হয়। আমাদের কেউই রাজি হয়নি তাঁকে নিতে। উপরন্তু আমরা বললাম, 'তিনি তো নিঃস্ব, এতিম। তাঁর পিতা বেঁচে থাকলে তিনি অবশ্যই ধাত্রীদের খাতির-যত্ন করতেন। দান-দক্ষিণায়ও হতেন দরাজ দিল।' আমরা আরও বললাম, 'মনে হয় না তাঁর মা, চাচা কিংবা দাদা আমাদের সঙ্গে ভালো আচরণ করবেন।'
আমার সঙ্গীরা সবাই দুগ্ধপায়ী শিশু পেয়ে যায়। যখন আমি আর কাউকে পাচ্ছিলাম না, তখন অগত্যা নবিজির কাছে ফিরে আসি এবং তাঁকেই নিয়ে নিই। আল্লাহর কসম! আমি যদি অন্য কাউকে পেয়ে যেতাম, তবে অবশ্যই তাঁকে নিতাম না। স্বামীকে বলেছিলাম, 'আল্লাহর কসম, 'আবদুল-মুত্তালিবের বংশের এই এতিমকেই আমার নিতে হবে; হয়তো আল্লাহ এঁর মাধ্যমেই আমাদেরকে বারাকা দেবেন, প্রভূত কল্যাণ দান করবেন। তাছাড়া কাউকে না নিয়ে আমি খালি হাতে ফিরব না। স্বামী বললেন, 'তুমি ঠিকই বলেছ।'
হালীমা বলেন, 'সুতরাং আমি তাঁকে নিলাম এবং তাঁকে সঙ্গে নিয়েই আমাদের তাঁবুতে ফিরে এলাম। তাঁবুর কাছে আসতে না আসতেই, আল্লাহর শপথ, আমার স্তন দুধে ভরে উঠল। এতে আমি তাঁকে তৃপ্ত করে খাওয়ালাম। তাঁর দুধভাইকেও পান করালাম। তাঁর বাবা (দুধবাবা) উঠে আমাদের জরাগ্রস্ত উটনীটার কাছে গেল। সেটিকে ছুঁতে না ছুঁতেই ওলান ভরে উঠল দুধে। সে দুধ দোহন করে আমাকে দিল। আমি তৃপ্ত না হওয়া পর্যন্ত পান করলাম, এবং সে নিজেও তৃষ্ণা নিবারণ করে পান করল। তারপর সে বলল, 'হালীমা, তুমি কি খেয়াল করেছ, আল্লাহর কসম, আমরা তো এক পবিত্র আত্মাকে পেয়েছি। আমরা আশাও করিনি, অথচ আল্লাহ উটনীতে এমনই বারাকা দিয়েছেন।' হালীমা বলেন, 'পরিতৃপ্ত হয়ে নিশ্চিন্ত মনে কী একটা রাতই না কাটালাম আমরা! অথচ ক্ষুধায় কাতর আমাদের সন্তানের সঙ্গে আমরা কত বিনিদ্র রজনি কাটিয়েছি!'
সকালে সঙ্গী-সাথিদের সঙ্গে রওনা দিই এলাকার উদ্দেশে। রাসূলুল্লাহকে নিয়ে আমি আমার গাধার পিঠে চড়ে বসি। যার হাতে আমি হালীমার প্রাণ তাঁর কসম! গাধাটি আমাকে নিয়ে কাফেলার আগে আগে ছুটল। দেখে সঙ্গীরা বলল, 'আরে এত আগে আগে যাচ্ছ কেন? আমাদের জন্য একটু দাঁড়াও। আচ্ছা, এটা তোমার সেই গাধা না, যার পিঠে চড়ে তুমি এসেছ?' আমার উত্তর, 'হ্যাঁ।' তারা বলল, 'আমরা যখন আসছিলাম, রক্তাক্ত হয়ে গাধাটির তো তখন যা-তা অবস্থা হয়েছিল। এখন একি দেখছি আমরা; সে তো সবার আগে আগে ছুটছে!' আমি বললাম, 'আল্লাহর শপথ! এর পিঠের ওপর আমি চড়িয়েছি এক পবিত্র ও কল্যাণময় সন্তান।'
হালীমা বলেন, 'এরপর আমরা আবার যাত্রা শুরু করি। সফরের প্রতিটি দিনেই আল্লাহ আমাদের উত্তোরত্তর কল্যাণ বৃদ্ধি করেই চললেন। অবশেষে এলাকায় যখন ফিরে আসি তখন সেখানে চলছে দুর্ভিক্ষ। আমাদের পশুগুলো সারাদিন চড়ে বেড়াত, সন্ধ্যায় ফিরে আসত। একই সঙ্গে থেকে সা'দ গোত্রের ছাগল ভেড়াগুলো ফিরত খালি পেটে, আর আমারগুলো ভরপেটে। ওলান ভরে উঠত দুধে দুধে। গোত্রের লোকেরা বলাবলি করতে লাগল, 'হারিস ইবনু 'আবদুল-'উয্যা ও হালীমার ভেড়াগুলোর একি অবস্থা! পেট ভরে খাবার খেয়ে, দুগ্ধবতী হয়ে সেগুলো ফেরে। আর তোমাদেরগুলো কিনা ফেরে ক্ষুধা নিয়ে! তোমাদের আর কবে আক্কেল-জ্ঞান হবে বলো তো! তাদের ভেড়াগুলো যে চারণভূমিতে চড়ে বেড়ায় তোমাদেরগুলোকেও সেখানে চড়িয়ে বেড়াও।' তারা তা-ই করল। কিন্তু একসঙ্গে চড়ালে কী হবে, সেগুলো আগের মতোই ক্ষুধা নিয়ে ফিরত। অন্যদিকে আমারগুলো ফিরত আগের মতো পেট ভরে পরিতৃপ্ত হয়ে।
হালীমা বলেন, রাসূল বেড়ে উঠতে লাগলেন। তবে আর দশজন শিশু যেভাবে বেড়ে ওঠে সেভাবে নয়; (প্রথমদিকে) অন্যরা এক বছরে যতটুকু বেড়ে ওঠে, তিনি ততটুকু বেড়ে উঠতেন একদিনে। দুই বছর পূর্ণ হলে আমরা তাঁকে নিয়ে আসি মাক্কায়। আমরা (আমি ও আমার স্বামী) বলাবলি করছিলাম, 'আল্লাহর কসম! আমরা কখনোই তাঁকে আমাদের কাছছাড়া করব না। যথাসাধ্য চেষ্টা করব তিনি যাতে আমাদের চোখের আড়াল না হন।' এরপর আমরা তাঁর মায়ের নিকট এসে তাকে বললাম, 'আল্লাহর কসম! এমন বারাকাময় শিশু আমরা জীবনে দেখিনি। আমাদের ভয়, আমরা যদি তাঁকে এখন এখানে রেখে যাই, তবে মক্কার রোগ-বালাই, মহামারি তাঁকে পেয়ে বসবে। (রাসূলুল্লাহর মা আমিনাও তখন রোগাক্রান্ত ছিলেন)। তাই তাঁকে আমাদের সঙ্গে নিয়ে যেতে দিন; নিদেনপক্ষে আপনি আপনার রোগ থেকে সেরে ওঠা পর্যন্ত সে আমাদের সঙ্গেই থাকুক।' রাসূলুল্লাহর মায়ের সঙ্গে আমরা দীর্ঘ সময় পীড়াপীড়ি করি যাতে তিনি রাজি হন। আমাদের প্রচণ্ড আগ্রহ দেখে শেষ পর্যন্ত তিনি রাজি হন। অনুমতি পেয়ে তাঁকে সঙ্গে নিয়ে আবার আমরা এলাকায় ফেরত আসি। এবার আসার পর তিনি আমাদের সঙ্গে থাকেন তিন কিংবা চার মাস।
এ সময়ে একদিন তিনি ঘর-বাড়ির পেছনে তাঁর দুধ-ভাইয়ের সঙ্গে আমাদের একপাল ছোট ছাগল ও ভেড়াছানার মাঝে খেলা করছিলেন। এমন সময় তাঁর দুধ-ভাই কাঁপতে কাঁপতে আমাদের কাছে এসে বলল, 'জানো! আমি দেখলাম, আমার ওই কুরাইশি ভাইয়ের কাছে দুইজন লোক এলেন। গায়ে তাদের ধবধবে সাদা পোশাক। তারা তাঁকে ধরে মাটিতে শুইয়ে দিলেন। এরপর তাঁর পেট চিড়ে ফেললেন।'
শুনে তো আমাদের অন্তরাত্মা বের হওয়ার জোগাড়। কাঁপতে কাঁপতে আমি ও আমার স্বামী পড়িমড়ি করে ছুটে গেলাম। গিয়ে দেখি তিনি দাঁড়িয়ে আছেন; চেহারার রং বিবর্ণ। আমাদের দেখে দৌড়ে এলেন এবং কেঁদে দিলেন।
হালীমা বলেন, আমি ও আমার স্বামী তাঁকে টেনে নিয়ে বুকের সঙ্গে শক্ত করে আঁকড়ে ধরি। বললাম, 'আমার পিতামাতা তোমার জন্য উৎসর্গ হোক! তোমার কী হয়েছে?’ তিনি বললেন, ‘আমার কাছে দুইজন লোক এসে আমাকে মাটিতে শুইয়ে দিলেন। একটু পর আমার পেট ফেড়ে দিয়ে কী যেন একটা রাখলেন। এরপর পেট আগে যেমন ছিল তেমনই করে দেন তারা।’
আমার স্বামী বলল, ‘আল্লাহর শপথ! আমার এই ছেলের ওপর কিছু একটা ভর করেছে। জলদি তাঁকে তাঁর পরিবারের নিকট নিয়ে চলো। যে ভয়টা আমরা করছি, তা ঘটার আগেই তাঁকে তাদের কাছে রেখে আসো।’
হালীমা বললেন, তাঁকে নিয়ে আমরা তাঁর মায়ের কাছে নিয়ে চললাম। তাঁর মা আমাদের দেখে খুবই অবাক হলেন; আমরা যা করেছি তার জন্য মৃদু ভর্ৎসনা করলেন। বললেন, ‘আমি বলার আগেই কী কারণে আমার ছেলেকে ফেরত নিয়ে এসেছ তোমরা? আগে তো তাঁকে রাখার ব্যাপারে তোমরা ছিলে খুবই উদ্গ্রীব!’
আমরা জানালাম, ‘না, তেমন কিছুই হয়নি। বরং আল্লাহ তাঁর দুগ্ধপানের মেয়াদকাল পূর্ণ করেছেন। এবং তাঁর স্বাস্থ্য দেখে আমরা খুশি।’ আমরা আরও বললাম, ‘তবে আপনারা যদি চান আমরা তাঁকে খুব উত্তমভাবেই রাখব।’ তিনি বললেন, ‘তোমরা কিছু একটা এড়িয়ে যাচ্ছ; আসলে কী হয়েছে আমার কাছে খুলে বলো।’ না বলা পর্যন্ত তিনি আমাদেরকে কিছুতেই ছাড়ছিলেন না। না বলে আর থাকতে পারলাম না। শেষে যা যা ঘটেছে আমরা তার কাছে সব বলে দিই; কিছুই লুকাই না।
তিনি বললেন, ‘না, কখনোই না। আল্লাহর কসম! তিনি তার সঙ্গে এমন কিছু করবেন না। আমার ছেলের একটা মর্যাদা হবে। আমি কি তোমাদেরকে তার সংবাদটা দেবো না? তা হলে শোনো, সে যখন আমার গর্ভে, আল্লাহর শপথ, আমি কোনো ধরনের ভার অনুভব করিনি। আমার পক্ষে তাকে গর্ভে ধারণ করা একদমই কষ্টকর কিছু ছিল পরিচয়। সে যখন আমার গর্ভে তখন একদিন আমাকে (স্বপ্নে) দেখানো হয় যে, আমার থেকে একটি আলোকরশ্মি বের হয়ে বাস্রার উটের গ্রীবাগুলো আলোকিত করে দিয়েছে। (অন্য এক বর্ণনায় এসেছে, তিনি বলেছেন, বাস্ত্রার অট্টালিকাগুলোকে আলোকিত করে দিয়েছে) এরপর তাকে আমি ভূমিষ্ট করলাম এবং আল্লাহর কসম! সে অন্যান্য শিশুর মতো ভূমিষ্ট হয়নি; বরং সে তার দুহাতের ওপর ভর করে, আকাশের দিকে মাথা তুলে জন্মগ্রহণ করে।’ তিনি নবিজিকে বুকে টেনে নেন। আমরা মা ও ছেলেকে এভাবে রেখে হাঁটা ধরি আমাদের পথে।” [১২৫]
শিক্ষা ও উপকারিতা
একটি দুইটি বিষয়ে নয়, হালীমার সংসারের সাথে জড়িত প্রতিটি বিষয়ে রাসূলুল্লাহর বারাকার বহিঃপ্রকাশ ঘটে; নবিজিকে গ্রহণ করার আগপর্যন্ত হালীমার স্তনে বলতে গেলে দুধই ছিল না। যাও-বা ছিল তা নিজের সন্তানেরই হতো না। ক্ষুধার চোটে সারা রাত সে মাকে দুটি চোখ এক করতে দিত না। কিন্তু রাসূল ﷺ যেসময় থেকে হালীমার কোল আলোকিত করেছেন, তখন থেকেই এই বারাকার শুরু। এখন আর তাদের ছেলে ক্ষুধার জ্বালায় আর্তনাদ করে আকাশ মাথায় তোলে না। সে পরিতৃপ্ত হয়ে ঘুমায়। মাও ঘুমাতে পারেন শান্তিতে। হালীমার জরাগ্রস্ত, অতি দুর্বল উটনীটি রাসূল ﷺ তাদের পরিবারে আসার পর থেকে দুধ দেওয়া শুরু করেছে। অথচ শত চেষ্টা করেও ইতঃপূর্বে তার এমন দুধ দোহন করা যেত না।
হালীমার জন্য আল্লাহ তাঁর সবচেয়ে প্রিয় বান্দাকে বাছাই করেছেন। তবে মজার বিষয় হলো, হালীমা কিন্তু প্রথমে এই এতিম ছেলেটিকে এড়িয়ে গিয়েছিলেন। যখন দেখলেন আর কাউকে পাচ্ছেন না তিনি, তখন একান্ত নিরুপায় হয়ে রাসূলুল্লাহকে গ্রহণ করেন। আল্লাহ হালীমার জন্য যে শিশুকে নির্বাচন করেছেন তাতে নিহিত ছিল প্রভূত কল্যাণ। এই বারাকার, এই কল্যাণের শুরু হালীমা তাঁকে গ্রহণ করার সঙ্গে সঙ্গে। ঘটনাটিতে সকল মুসলিমের জন্য রয়েছে অনুপম একটি শিক্ষা। আর তা হলো—আল্লাহ তার কপালে যা লিখে রেখেছেন, তার তাকদির হিসেবে যা নির্ধারণ করেছেন তাতেই সন্তুষ্ট থাকা, তাতেই খুশি থাকা। যা হয়ে গেছে তা নিয়ে হা-হুতাশ না করা এবং যা পায়নি তার জন্য আফসোস না করা।
শাইখ মুহাম্মাদ আল-গাযালি বলেন,
“প্রকৃতির কোলে শিশুরা যেন প্রাণবন্ত থাকে। এর নির্মল বাতাস ও মিষ্টি রোদ খুবই উপকারী। সন্তানদেরকে মরুভূমিতে লালন-পালন করানোটা স্বভাবের পরিশুদ্ধতা, শারীরিক গঠন মজবুত এবং অনুভূতি, চিন্তার স্বাধীনতা ও আবেগের যুক্তিগ্রাহ্যতা সুতীক্ষ্ণ করার জন্য খুবই উপযোগী।
দুঃখজনক হলেও সত্য যে, আমাদের সন্তানরা আজকাল বসবাস করছে পরস্পর লাগোয়া বাসার সংকীর্ণ কিছু ফ্ল্যাটে, যা মুরগির খোয়াড়ের চেয়ে বেশি কিছু না; ভেতরের বাসিন্দারা সারাক্ষণ বন্দি সেখানে। মুক্ত বিহঙ্গের মতো আপন খেয়ালে ছুটে বেড়ানোর আনন্দ থেকে তারা বঞ্চিত। তারা জানে না নির্মল পরিবেশে বেঁচে থাকা এবং বুকভরে শ্বাস নেওয়ার কী স্বাদ!
সন্দেহ নেই, আধুনিক সভ্যতায় স্নায়ু কিংবা পুরো শরীরে যে অসুস্থতা বাসা বেঁধেছে তা মূলত প্রকৃতি থেকে দূরে থাকা এবং কৃত্রিমতায় মেতে থাকার কারণেই। মরুভূমির প্রতি মাক্কাবাসীদের যে ঝোঁক সেটাকে আমরা অবশ্যই সম্মান জানাতে পারি। তারা তাদের সন্তানদেরকে শক্ত-সামর্থ্য করে গড়ে তোলার জন্য প্রথম খেলার মাঠ হিসেবে বেছে নিত মরুভূমির মতো খোলামেলা জায়গাকে। অনেক শিক্ষাবিদই আশা করেন যে, প্রকৃতির অবারিত মাঠ, খোলা আকাশের নিচে বিস্তীর্ণ সবুজের গালিচা, আকাশের গায়ে হেলান দেওয়া পাহাড়সারি- এমন নির্মল পরিবেশই হবে শিশুর প্রাথমিক বিদ্যালয়। ভোরের সোনালি আলো, সন্ধ্যার আবছায়া, আকাশের নীলিমা, দিগন্তের লালিমা, চাঁদের জোৎস্নায় আপ্লুত হবে তারা। মোহাবিষ্ট হয়ে থাকবে প্রকৃতির রহস্য চিন্তায়, খুঁজে ফিরবে এর স্রষ্টাকে। কিন্তু আফসোস, বর্তমান শহুরে সভ্যতায় শিশুদের নিয়ে এমন চিন্তা স্বপ্নেই সম্ভব। বাস্তবায়ন বড়ই কঠিন।” [১২৬]
রাসূল এমন সুযোগ পেয়েছেন। আল্লাহই তাঁকে সুযোগটি করে দেন। তিনি সা'দ গোত্রে থেকে থেকে বিশুদ্ধ আরবি ভাষা রপ্ত করেন। যার কারণে পরবর্তীকালে তিনি হয়ে ওঠেন সৃষ্টির সেরা বিশুদ্ধভাষী। একবার সাহাবি আবু বাক্স রাসূলুল্লাহর কাছে জানতে চান, “হে আল্লাহর রাসূল ! আপনার চেয়ে বেশি বিশুদ্ধভাষী আমি আর কাউকেই দেখিনি।”
রাসূল বললেন, “আমাকে কীসে বাধা দেবে বলো (এমন বিশুদ্ধভাষী হতে)! আমি তো কুরাইশদেরই একজন এবং আমাকে স্তন্যপান করানো হয়েছে সা'দ গোত্রে।” [১২৭]
সা'দ গোত্রে থাকার সময় বক্ষ-বিদীর্ণ করার ঘটনা রাসূলুল্লাহর নুবুওয়াতের একটি অনন্য নিদর্শন এবং মহান দায়িত্বের জন্য আল্লাহ তা'আলা যে তাঁকে বেছে নিয়েছেন তার স্বপক্ষে বড় প্রমাণ। [১২৮]
ইমাম মুসলিম তাঁর সহীহ মুসলিমে ছেলেবেলায় রাসূলুল্লাহর বক্ষ-বিদীর্ণের ঘটনা উল্লেখ করতে গিয়ে বর্ণনা করেন যে, আনাস ইবনু মালিক বলেন,
“রাসূল তখন অন্য ছেলেদের সঙ্গে খেলছিলেন, এমন সময় তাঁর কাছে জিব্রীল আসেন। তাঁকে ধরে তিনি জোর করে মাটিতে শুইয়ে দেন। এরপর বক্ষ-বিদীর্ণ করেন, বের করে আনেন হৃৎপিণ্ড। হৃৎপিণ্ড থেকে আবার বের করেন একটি রক্তপিণ্ড এবং বললেন, 'এটা আপনার ভেতরে শয়তানের অংশ।' এরপর তিনি সেটি একটা স্বর্ণের পাত্রে রেখে যামযামের পানি দিয়ে ধুয়ে দেন। তারপর তিনি হৃৎপিণ্ডকে একত্র করে একটির সঙ্গে আরেকটি লাগিয়ে আগের জায়গায় রেখে দেন। শিশুরা ভয় পেয়ে ছুটে এসে তাঁর দুধ-মার কাছে বলে, 'মুহাম্মদকে মেরে ফেলা হয়েছে।' খবর পেয়ে হন্তদন্ত হয়ে ছুটে আসেন তারা। দেখেন রাসূলুল্লাহর চেহারা বিবর্ণ রং ধারণ করেছে। আনাস বলেন, 'আমি রাসূলুল্লাহর বুকে সেই সেলাইয়ের দাগ দেখেছি।” [১২৯]
শয়তানের অংশ থেকে নবিজিকে পবিত্রকরণ নিঃসন্দেহে নুবুওয়াতের প্রাথমিক একটি নিদর্শন। শির্ক ও গাইরুল্লাহর 'ইবাদাতের থেকে বাঁচিয়ে রাখার প্রস্তুতি পর্ব। তাঁর মন-মগজে একনিষ্ঠ তাওহীদ ছাড়া অন্যকিছু আসন গাড়তে পারেনি। শৈশবে ঘটে যাওয়া এই ঘটনা তাঁকে তাওহীদের ওপর অবিচল থাকতে সহায়তা করে; পাপ-পঙ্কিলতার জালে তিনি আটকে পড়েননি, প্রতিমার সামনে ঝুঁকেনি তাঁর মাথা। [১৩০] যদিও সে সময় কুরাইশদের মধ্যে এ পাপগুলোর চর্চা ছিল ব্যাপক হারে। [১৩১]
বক্ষ-বিদীর্ণের রহস্য উন্মোচন করতে গিয়ে ড. আল-বৃতি বলেন, 'হতে পারে এর পেছনের উদ্দেশ্য হলো-রাসূলুল্লাহর গুরুত্ববার্তা ঘোষণা করা এবং ছোটবেলা থেকে তাঁকে বড় গুনাহ করা থেকে রক্ষা এবং ওয়াহির জন্য জাগতিক উপায়-উপকরণের মাধ্যমে প্রস্তুত করা, যাতে করে মানুষ খুব সহজেই তাঁর প্রতি ঈমান আনে, বিশ্বাস করে তাঁর রিসালাতকে; তাঁর নুবুওয়াতকে। সুতরাং বলা চলে যে, ঘটনাটি আধ্যাত্মিক ও নৈতিক ভিত্তি প্রস্তুতকরণের একটি অস্ত্রোপচার ছিল মাত্র। কিন্তু ঘটনাটি ঘটেছে অনুভূতিগ্রাহ্য জাগতিক প্রক্রিয়ায়। রক্তপিণ্ডটি বের করে রাসূলুল্লাহকে শৈশবের সব নিরর্থক, বেহুদা এবং খেয়ালিপনার অবস্থা থেকে পবিত্র করা হয়েছে। পরিবর্তে তাঁকে একাগ্রতা, বিচক্ষণতা, ভারসাম্যতা এবং সত্যবাদিতাসহ বহুগুণে মহিমান্বিত করা হয়েছে। ঘটনাটি এটারও সপ্রমাণ যে, আল্লাহ তাঁকে আপন মহিমায় রক্ষা করেছেন, যার কারণে শয়তান তার কাছে ভেড়ার কোনো রাস্তা পায়নি।” [১৩২]
টিকাঃ
১২৫. মুসনাদ আবু ইয়া'লা, ১৩/৯৩, হাদীস নং ৭১৬৩; আল-কাবীর, তবারানি, ২৪/২১২, হাদীস নং ৫৪৫; আল-মুজমা', হাইসামি, ৮/২২১; এবং তিনি বলেন, হাদীসটি আবু ইয়া'লা ও তাবারানি যে সূত্রে বর্ণনা করেন তা খুবই শক্তিশালী। ইমাম যাহাবি তাঁর আস-সীরাহ আন-নাবাওয়িয়া, পৃ. ২১-তে হাদীসটি বর্ণনা করেন, এবং তিনি বলেন, হাদীসটির একটি ভালো সনদ রয়েছে। আরও বিস্তারিত জানার জন্য দেখা যেতে পারে ইবনু ইসহাকের সূত্রে বর্ণিত, খুশানির ব্যাখ্যাসংবলিত আস-সীরাহ আন-নাবাওয়িয়া, ১/২১৪; ইবনু ইসহাক স্পষ্ট করে জানিয়েছেন যে, বর্ণনাটি তিনি নিজেই শুনেছেন। (আরেকজন বর্ণনাকারীর কাছ থেকে)
১২৬. দেখুন: ফিকহুস-সীরাহ, পৃ. ৬০, ৬১।
১২৭. আস-সুহাইলি, আর-রওদুল-আনফ, ১/১৮৮।
১২৮. দেখুন: আল-বৃতি, ফিকহুস-সীরাহ, পৃ. ৪৭।
১২৯. সহীহ মুসলিম, অধ্যায়: ঈমান, পরিচ্ছেদ: আল্লাহর রাসূলুল্লাহর আকাশপানে ভ্রমণ, ১/৪৫, হাদীস নং ১৬২।
১৩০. ওরিয়েন্টালিস্ট নিকলসনের ধারণা: "আমি কি তোমার বক্ষ উন্মুক্ত করিনি?” (সূরা আল-ইনশিরাহ, ৯৪:১) আয়াতটির ব্যাখ্যা থেকে উদ্ভূত একটি উপাখ্যান ছাড়া আর কিছুই নয় বক্ষ-বিদীর্ণের ঘটনাটি। সে বলে, "আর ঘটনাটির যদি কোনো সত্যতা থেকে থাকে, তবে আমাদের আন্দাজ করতে অসুবিধা হয় না যে, এটা আসলে মৃগীরোগের প্রতিই ইঙ্গিত করে।' ঘটনাটির প্রশ্নে এসে নিকলসন আসলে তালগোল পাকিয়ে ফেলে। ইতঃপূর্বে মাক্কার মুশরিকরাও এমন ধারণাই পোষণ করত; তারা নবিজিকে পাগল বলে অপবাদ দিয়েছিল। কিন্তু আল্লাহ তাদের এমন জঘন্য অপবাদের জবাব কুরআনে দিয়েছেন। আল্লাহ বলেন, "আর তোমাদের সঙ্গী তো পাগল নয়." (সূরা আত-তাকউঈর, ৮১:২২)
১৩১. আল-'উমরি, আস-সীরাহ আন-নাবাওয়িয়া, ১/১০৪।
১৩২. দেখুন: আবু ফারিস, আস-সীরাহ আন-নাবাওয়িয়া, পৃ. ১০৬, ১০৭।