📄 হাতিবাহিনীর কাহিনি
হাতিবাহিনীর ঘটনাটি কুরআন ও সুন্নাহতে সুস্পষ্টভাবে আলোচিত হয়েছে। সবিস্তারে আলোচনা এসেছে সীরাহ ও ইতিহাসের বইগুলোতে। মুফাসসিরগণ তাদের কিতাবেও ক্ষেত্রবিশেষে এ ঘটনার উল্লেখ করেছেন। আল্লাহ বলেন:
“তুমি কি দেখোনি, তোমার রব হস্তিবাহিনীর সাথে কী করেছিলেন? তিনি কি তাদের চক্রান্ত ভণ্ডুল করে দেননি? ওদের বিরুদ্ধে তিনি পাঠিয়েছিলেন ঝাঁকে ঝাঁকে পাখি; যারা ওদের ওপর নিক্ষেপ করেছিল পোড়া মাটির কঙ্কর। তারপর তিনি ওদেরকে চর্বিত চর্বণের মতো করে দিয়েছিলেন।”
এই ঘটনার প্রতি নবিজির ইঙ্গিত [সূরা ফীল, ১০৫:১-৫]
হুদায়বিয়ার সময় রাসূল যখন মাদীনা থেকে বের হয়ে সানিয়্যা নামক জায়গায় এসে পৌঁছলেন, তখন তাঁর উটনী সেখানে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ে; সামনে আর অগ্রসর হচ্ছিল না। লোকজন তখন বলে উঠল, 'হাল! হাল!'-এটা এমন এক শব্দ যা তখনই বলা হয় যখন কোনো উট আর সামনে এগুতে চায় না। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হলো না; উটনীটি আগের মতোই বসে রইল। আশপাশের লোকজন বলল, “কসওয়া (রাসূলুল্লাহর বাহন-উটনীর নাম) সামনে না আগাতে গোঁ ধরেছে!”
রাসূল বললেন, “কসওয়া গোঁ ধরেনি, আর এটা ওর স্বভাবও নয়। বরং (আবরাহার) হাতিকে সামনে এগুতে যিনি বাধা দিয়েছিলেন, সেই তিনিই ওকে এখন সামনে যেতে দিচ্ছেন না।” (৯০)
আবু হাতিমের আস-সীরাতুন-নাবাওয়িয়া বইতে হস্তিবাহিনীর ঘটনাটি এসেছে যেভাবে
ইয়েমেন দখলকারী একজন রাজা, যার আসল বাড়ি আবিসিনিয়ায়, সে আবরাহা নামেই পরিচিত। এই লোকটিকে কেন্দ্র করেই হাতির কাহিনি ঘটেছিল। ইয়েমেনের রাজধানী সান'আতে সে একটি গির্জা তৈরি করে; নাম দেয় 'কুল্লাইস'। তার ধারণা, আরবের হাজিদের সে তার গির্জা অভিমুখী করে ছাড়বে। শপথ করে, মাক্কায় গিয়ে সে কা'বা ধ্বংস করবেই。
পথিমধ্যে হিমইয়ারের একজন রাজা, যূ-নাফার, নিজ জাতির অনুসারীদের নিয়ে আবরাহাকে বাধা দিতে গিয়ে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েন। কিন্তু তিনি ও তার বাহিনী পরাজিত হন। যূ-নাফার হন বন্দি। আবরাহার কাছে নিয়ে এলে যূ-নাফার তাকে বললেন, “হে রাজা, আমাকে মারবেন না। আমার নিহত হওয়ার চেয়ে (আপনাকে সাহায্য করার জন্য) আমার জীবিত থাকাটাই বরং আপনার বেশি দরকার।” কথা শুনে আবরাহা তাকে আর মারল না। তবে তার থেকে তাকে সাহায্য করার প্রতিশ্রুতি আদায় করে নিল।
এরপর আবরাহা বাহিনী কা'বার দিকে আবার ছুটল। একসময় তারা পৌঁছল মক্কার নিকটবর্তী খাস'আম উপজাতীয়দের এলাকায়। খবর পেয়ে নুফাইল ইবনু হাবীব আল-খাস'আমি তার সমর্থক ইয়েমেনের কিছু গোত্রকে সঙ্গে নিয়ে আবরাহার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ালেন। কিন্তু নুফাইলও যুদ্ধে সদলবলে পরাজিত হন এবং তিনি বন্দি হন। নুফাইল আবরাহার কাছে অনুনয় করে বললেন, “হে রাজা, আরব ভূখণ্ড আমার নখদর্পণে; এর পথঘাট সব আমার জানা। তাই আমাকে হত্যা করবেন না। আর আমার জাতি আমার খুবই অনুগত; আমার দুই হাতের ইশারায় তারা জীবন পর্যন্ত দিতে প্রস্তুত। আমি তাদেরকে আপনার যেকোনো কাজে লাগাতে পারব।” আবরাহা নুফাইলকে মুক্তি দিলে পথ দেখিয়ে দেখিয়ে তিনি তাদের সঙ্গে নিয়ে চললেন।
একটা সময় তারা এসে পৌঁছে তায়িফে। খবর পেয়ে সাকীফ গোত্রের কিছু লোকবল সঙ্গে নিয়ে মাস'ঊদ ইবনু মু'আত্তাব আবরাহার সঙ্গে দেখা করে বলল, “হে রাজা, আমরা আপনার গোলাম, আপনার একান্ত অনুগত দাস। আপনার আদেশের অন্যথা আমরা করব না। আমাদের পরম আরাধ্য লাত উপাস্য যা চায় তা নিয়ে আমাদের ও আপনাদের মাঝে কোনো ধরনের বিরোধ নেই। লাতের চাওয়াও মাক্কার ওই কা'বা ঘরটিই। আমরা আপনার সঙ্গে এমন একজন লোককে পাঠাব যে আপনাকে ওই ঘরটি চিনিয়ে দেবে।”
আবু রিগাল নামের নিজেদের একজন দাসকে তারা আবরাহার সঙ্গে পাঠায়। আবরাহা দলবল নিয়ে মুগাম্মাস ৯১ নামক একটা জায়গায় এসে পৌঁছলে আবু রিগাল মারা যায়। পরবর্তী সময়ে আরবদের কাছে ঘৃণার প্রতীকে পরিণত হয় তার কবর। সেখানে তারা ঘৃণাভরে পাথর নিক্ষেপ করত। ঘৃণাভরে পাথর নিক্ষেপের ধারাটি এখনো চলছে; আজও তার কবরে লোকেরা ঘৃণাভরে পাথর ছুড়ে মারে।
মুগাম্মাসে যাত্রা বিরতিকালে আসওয়াদ ইবনু মাকসূদ নামের একজনকে আবরাহা তার বাহিনীর অগ্রগামী করে মাক্কার খোঁজখবর নিতে পাঠায়। কী হয়েছে দেখার জন্য মাক্কার বাসিন্দারা আসওয়াদ ও তার দলবলের পাশে ভিড় জমায়। ফেরার পথে আরাক নামক উপত্যকা থেকে তারা 'আবদুল-মুত্তালিবের দুইশো উট ধরে সঙ্গে করে নিয়ে আসে।
'আবদুল-মুত্তালিবের দুইশো উট আটক করে নিয়ে আসার ঘটনার পর হুনাতা আল-হিমইয়ারিকে আবরাহা মাক্কায় পাঠাবার সময় বলে দিল, “তাদের মধ্যে সবচেয়ে অভিজাত ও সম্মানিত ব্যক্তির খোঁজ নেবে আগে। তারপর তাকে আমার এ সংবাদ জানিয়ে দেবে যে, আমি যুদ্ধ করতে আসিনি। কেবল কা'বা ঘর ধ্বংস করাই আমার উদ্দেশ্য।”
হুনাতা রওনা দিয়ে মক্কায় এসে পৌঁছল। 'আবদুল-মুত্তালিব ইবনু হিশামের সঙ্গে দেখা করে তাকে বলল, “রাজা আমাকে আপনার কাছে এই খবর দেওয়ার জন্য পাঠিয়েছেন যে, তিনি যুদ্ধ করতে আসেননি। তবে আপনারা বাধা দিতে এলে ভিন্ন কথা; তখন তাকে বাধ্য হয়ে যুদ্ধে লিপ্ত হতে হবে। শুধু এ কা'বা ঘরকে ভাঙার জন্যই তিনি এসেছেন। এর পরই তিনি চলে যাবেন।”
জবাবে 'আবদুল-মুত্তালিব বললেন: “তার সঙ্গে যুদ্ধ করার মুরোদ আমাদেরও নেই। আমরা তার এবং এই ঘরের মধ্যে বাধা হয়ে দাঁড়াব না। আল্লাহই পারেন আবরাহা এবং এ ঘরে মধ্যে বাধা হয়ে দাঁড়াতে। অন্যথায়, আল্লাহর কসম, আমাদের একরত্তি শক্তি নেই যে তাদের মোকাবিলা করি।”
সে বলল, "তা হলে আমার সঙ্গে তার কাছে চলুন।”
এরপর তিনি লোকটির সঙ্গে রওনা দিয়ে আবরাহার সেনাছাউনিতে এসে পৌঁছেন। গিয়ে দেখেন তার পুরোনো বন্ধু যু-নাফার সেখানে হাজির। কাছে গিয়ে তিনি তাকে বললেন, “হে যূ-নাফার! আমাদের ওপর যে বিপদ নেমে এসেছে তা প্রতিকারে তুমি কি আমাদের কোনো উপকারে আসতে পারো?”
উত্তরে যূ-নাফার তাকে বললেন, “সকাল কিংবা সন্ধ্যায় প্রতি মুহূর্তে যে লোক মৃত্যুর প্রহর গুনছে, এমন একজন বন্দি কী আর সাহায্য করতে পারে, বলো! তবে আনিস নামের একজন মাহুত (হস্তিচালক) আছে, আমার পরিচিত। আমি তাকে বলে দিচ্ছি সে যাতে আবরাহার কাছে তোমার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা-তদবির করে। সে তোমার গুরুত্ব ও উচ্চমর্যাদার কথা রাজাকে জানাবে।”
এরপর যূ-নফার আনিসের খোঁজে লোক পাঠালেন। আনিস এলে 'আবদুল- মুত্তালিবকে দেখিয়ে যূ-নাফার তাকে বললেন, “তোমার সামনে যাকে দেখছ তিনি খুবই সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি, কুরাইশ সর্দার, মাক্কার বণিক সমাজের অধিপতি। তিনি সমতল ভূমির বাসিন্দা এবং পাহাড়-পর্বতের বন্য পশুর খাদ্য সরবরাহকারী হিসেবে সুপরিচিত। রাজা তার দুইশো উট ধরে নিয়ে এসেছেন। তোমার যদি সম্ভব হয় তা হলে তার উপকারটা করে দাও। তিনি আমার একজন পরম বন্ধু।”
'আবদুল-মুত্তালিবকে নিয়ে আনিস আবরাহার কাছে গিয়ে বলল, “মহামান্য রাজা! ইনি কুরাইশ সর্দার, মাক্কার বণিক সমাজের অধিপতি। তিনি সমতল ভূমির বাসিন্দা মানুষ এবং পাহাড়-পর্বতের বন্য পশুর খাদ্য সরবরাহকারী হিসেবে সুপরিচিত। আপনার কাছে আসার অনুমতি প্রার্থনা করছেন তিনি। আমার আশা, আপনি তাকে অনুমতি দেবেন। আপনাকে আশ্বাস দিতে পারি যে, বৈরিতা কিংবা আপনাকে হুমকি-ধমকি দেওয়ার জন্য তিনি এখানে আসেননি।” সব শুনে আবরাহা 'আবদুল-মুত্তালিবকে ভেতরে আসার অনুমতি দিল।
'আবদুল-মুত্তালিব ছিলেন বৃহদাকার, সুঠামদেহী, সুদর্শন একজন ব্যক্তি। দেখার সঙ্গে সঙ্গে আবরাহা তাকে সসম্মানে অভিবাদন জানাল। 'আবদুল-মুত্তালিব তার সঙ্গে একই আসনে বসবে, এটা সে পছন্দ করল না। আবার সে ওপরে রাজকীয় আসনে বসে থাকবে, আর 'আবদুল-মুত্তালিব নিচে বসবেন - আবরাহা এটাকেও সমীচীন মনে করল না। অগত্যা আবরাহা রাজকীয় আসন ছেড়ে নিচে নেমে এসে 'আবদুল- মুত্তালিবের সঙ্গে একই গালিচায় বসল।
'আবদুল-মুত্তালিব তাকে বললেন, “রাজা সাহেব! আপনার লোকেরা আমার অনেক বড় সম্পত্তি নিয়ে এসেছে, সেগুলো আমাকে ফেরত দেওয়ার ব্যবস্থা করুন।”
আবরাহা তাকে বলল, "আপনাকে প্রথমে দেখার সঙ্গে সঙ্গেই আপনার প্রতি আমার একটা সমীহভাব জেগেছিল, আমি সত্যিই অভিভূত হয়েছিলাম। কিন্তু এ মুহূর্তে সেই সমীহভাবটা উবে গেছে। আপনার প্রতি আমি এখন ভীষণ বীতশ্রদ্ধ।”
'আবদুল-মুত্তালিব জানতে চাইলেন, “কেন?”
সে বলল, "আমি এমন এক ঘর ভাঙতে এসেছি যা নিছক একটি ঘরই নয়; আপনার, আপনার বাপ-দাদার সবার ধর্ম এই ঘর। এই ঘরকে কেন্দ্র করেই আপনাদের ধর্মাচার। আপনাদের আশ্রয়, আপনাদের নিরাপত্তার প্রতীক এই ঘরটি। আমার আসার উদ্দেশ্য, এই ঘরকে চিরতরে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া – আপনি তা ভালো করেই জানেন। অথচ আপনি নির্বিকার, টু শব্দটি পর্যন্ত করলেন না। কা'বার কথা না বলে আপনি কীসের কথা পাড়লেন? – আপনার উটের কথা!”
'আবদুল-মুত্তালিব বললেন, “এই উটগুলোর মালিক আমি, আমায় সেগুলো ফেরত দিন। আর এই ঘরের একজন মালিক আছেন, তিনি একে রক্ষা করবেন।” আবরাহার সদম্ভ উচ্চারণ, “না, তিনি আমার হাত থেকে একে রক্ষা করতে পারবেন না।”
'আবদুল-মুত্তালিব বললেন, “তা একান্ত আপনার চাওয়া। এবং সেটা এ ঘরের রব ও আপনার ব্যাপার।”
এরপর আবরাহা 'আবদুল-মুত্তালিবের উট ফেরত দেওয়ার জন্য তার লোকদের বলে দেয়। উট নিয়ে 'আবদুল-মুত্তালিব ফিরে আসেন। যা যা হয়েছে তিনি কুরাইশদের জানান। আদেশ করেন সবাই যাতে পাহাড়ের ওপর নিরাপদ জায়গায় আশ্রয় নেয়। পরদিন সকাল বেলা। মুগাম্মাসে সৈন্যসমাবেশ করে মাক্কায় প্রবেশের প্রস্তুতি নেয় আবরাহা। সৈন্যদের আদেশ করে মালসামানা, অস্ত্রশস্ত্র ঠিকঠাক করে সঙ্গে নেওয়ার জন্য। তার হাতিকে তার কাছে আনা হলো। না বসিয়ে দাঁড়ানো অবস্থাতেই একে একে অনেক বোঝা চাপানো হলো হাতির পিঠে।
আবরাহা বাহিনী মাক্কায় প্রবেশের জন্য সবাই প্রস্তুত। সামনে বাড়তে খোঁচা মারলে হাতি বেঁকে বসে – দাঁড়িয়ে থাকে, সামনে বাড়ে না। হাঁটু গেড়ে মাটিতে গাঁট বেঁধে বসে পড়ে; ওঠার কোনো নামগন্ধ নেই। তার মাথার ওপর লোকেরা গাঁতির আঘাত হানে। কিন্তু কিছুতেই কিছু হলো না। সে আরও বেঁকে বসে। এক ইঞ্চি আগে বাড়ে না। উপায় না পেয়ে তারা হাতির মাংসল পা ও কনুইতে অনবরত মাথাবাঁকা লাঠি দিয়ে আঘাত করতে থাকে। তারপরও সে অনঢ়। যেই না তারা হাতির মুখ ইয়েমেনের দিকে ঘুরিয়ে দিল, অমনি সে সেদিকে ছুটতে আরম্ভ করল। কিন্তু একটু পরেই তারা আবার হাতির মুখ মাক্কা অভিমুখে ঘুরিয়ে দিলে সে পূর্বের মতোই আচরণ করতে থাকে। এরপর সেটি পাশের একটা পাহাড়ের দিকে ছুট লাগায়।
ঠিক সে সময় আল্লাহ তা'আলা সাগরের দিক থেকে বালাসান (বাদামি ঠোঁটওয়ালা ছোট কালো পাখি)-এর মতো দেখতে এক ধরনের পাখি পাঠালেন। প্রতিটি পাখির সঙ্গে আবার তিনটি করে পাথর-দুইটি দুই পায়ে, আর অন্যটি ঠোঁটে। মটর-দানা ও মসুরের মতো দেখতে ছিল পাথরগুলো। আবরাহা বাহিনীর ওপর দিয়ে উড়ে যাওয়ার সময় পাথরগুলো পাখিরা ছুড়ে মারে তাদের গায়ে। যার গায়েই পাথর পড়েছে, সে-ই মরেছে। তবে তাদের অনেকে পালিয়ে যাওয়ার কারণে পাথরের আঘাত থেকে বেঁচে যায়। আল্লাহ তা'আলা বলেন:
“তুমি কি দেখোনি, তোমার রব হস্তিবাহিনীর সঙ্গে কীরূপ আচরণ করেছেন? তিনি কি ওদের চক্রান্ত ভণ্ডুল করে দেননি? তিনি ওদের বিরুদ্ধে পাঠিয়েছিলেন ঝাঁকে ঝাঁকে পাখি; যারা ওদের ওপর কঙ্কর নিক্ষেপ করেছিল। তারপর তিনি ওদেরকে চর্বিত চর্বণের মতো করে ফেলেন।" [সূরা ফীল, ১০৫:১-৫]
আল্লাহ তা'আলা আবরাহার শরীরে এক ধরনের রোগ ছড়িয়ে দেন। তার সৈন্যরা পাগলের মতো ঊর্দ্ধশ্বাসে পালাতে থাকে ইয়েমেনের দিকে। যাওয়ার পথে প্রতিটি জায়গায় তাদের শরীরের গলিত অংশ ঝরে ঝরে পড়তে লাগল। আবরাহার শরীরের পচন শুরু হয় আঙুলের মাথা থেকে। যখনই একটা করে আঙুলের মাথা খসে পড়তে লাগল, তখনই বেরিয়ে আসতে লাগল পুঁজ এবং সঙ্গে পচা রক্ত। এভাবে ধুঁকে ধুঁকে, কষ্ট পেয়ে পেয়ে আবরাহা অবশেষে ইয়েমেনে এসে পৌঁছে। জীবিত অন্যান্য সাথির মধ্যে তার অবস্থাটা তখন ওই পাখির মতো, প্রচণ্ড ঝড়-ঝাপটায় যার প্রাণবায়ু ওষ্ঠাগত। এরপর আবরাহা মারা যায়।”।(৯২)
ঐতিহাসিক ইবনু ইসহাক এবং ইবনু হিশাম তাদের সীরাতগ্রন্থে উল্লেখ করেন যে, যখন আবরাহা তার বাহিনী নিয়ে মাক্কা অভিমুখে এগোচ্ছিল, তখন 'আবদুল- মুত্তালিব কা'বার দরজার আংটা ধরে দাঁড়ালেন। সঙ্গে কুরাইশের একদল লোকও ছিল। তারা আল্লাহ তা'আলার নিকট বিনীতভাবে দু'আ করলেন। সাহায্য চাইলেন আবরাহা ও তার বাহিনীর বিরুদ্ধে। কা'বার দরজার আংটা ধরে 'আবদুল-মুত্তালিব বলে উঠলেন, “হে রব, আমাদেরই কোনো লোক, আপনার বান্দা, সে আপ্রাণ চেষ্টা করে তার বাহিনীকে বিপদ-আপদ থেকে রক্ষা করতে। আজ আপনি আপনার অনুগত বান্দাদেরকে রক্ষা করুন। আপনার শক্তির ওপর ওদের ক্রুশ এবং বল-বিক্রম যাতে কোনোভাবেই জিততে না পারে। আমাদের কিবলা আপনার এ ঘরকে, আপনি যদি ওদের হাতে ছেড়ে দেন, তা হলে তা একান্তই আপনার ব্যাপার; আপনার যা ইচ্ছে তা-ই করতে পারেন।”
দু'আ শেষ করে 'আবদুল-মুত্তালিব কা'বার দরজার আংটা ছেড়ে দিয়ে, সঙ্গী- সাথিদের নিয়ে গিয়ে উঠলেন কাছের একটি পাহাড়ের চূড়ায়; তীক্ষ্ণ নজর রাখলেন মাক্কায় প্রবেশ করে আবরাহা কী করে না-করে তার ওপর। ঐতিহাসিকদ্বয় এরপর আবরাহা ও তার বাহিনী ধ্বংস হওয়ার ঘটনা বিশদ বর্ণনা করে যান।। ৯৩)
টিকাঃ
৯০. ফাতহুল বারি ৫/৩৩৫।
৯১. মাক্কার নিকটবর্তী তায়িফগামী একটি স্থানের নাম; এখানেই আবু রিগাল মারা যায়।
৯২. আবু হাতিম আল-বুসতি, আস-সীরাহ আন-নাবাওয়িয়া, পৃ. ৩৪-৩৯। আরও দেখুন: ইবনু কাসীর, আস-সীরাহ আন-নাবাওয়িয়া, ১/৩০-৩৭।
৯৩. ইবনু হিশাম, আস-সীরাহ আন-নাবাওয়িয়া; পাশাপাশি বইটির আবু যার আল-খুশানি কর্তৃক ব্যাখ্যার বইটি দ্রষ্টব্য, ১/৮৪-৯১。
📄 হাতিবাহিনীর ঘটনার শিক্ষা
কা'বার মর্যাদা
কা'বার সম্মান-মর্যাদার কথা সর্বজনবিদিত। এমনকি আরবের মুশরিকরা পর্যন্ত একে সম্মান করত, পবিত্র বলে জ্ঞান করত। কা'বার ওপর অন্য কিছুকে প্রাধান্য দিতে তারা ছিল নারাজ। কা'বার প্রতি তাদের এমন সম্মান প্রদর্শন দ্বারা বোঝা যায় যে, সামান্য হলেও নবি ইবরাহীম ও 'ইসমাঈলের ধর্মের প্রভাব তখনও পর্যন্ত তাদের মধ্যে অবশিষ্ট ছিল। আর ছিল বলেই আবরাহা এ ঘরকে ভাঙতে এলে তারা রবের কাছে একে রক্ষা করার মিনতি জানায়।
মাক্কার ওপর খ্রিষ্টানদের হিংসা-বিদ্বেষ
আল্লাহর ঘর কা'বার প্রতি আরবদের সম্মান ছিল প্রশ্নাতীত। ঘরটির প্রতি এমন প্রীতি ও সম্মান খ্রিষ্টান আবরাহার সহ্য হলো না; বিপরীতে কুল্লাইস নামের একটি গির্জা তৈরি করে সে। উদ্দেশ্য-আল্লাহর ঘরের প্রতি আরবদের সম্মানকে তার গির্জার দিকে ঘুরিয়ে দেওয়া। উদ্দেশ্য হাসিলে সে নানা রকম কৌশল আঁটে, ফন্দি-ফিকির করে। তারপরও আরবরা এতে কোনোরূপ উৎসাহবোধ করেনি। বরং আবরাহার হীন উদ্দেশ্য কোনোভাবেই যাতে সফল না হয় সেজন্য তারা অনেক চেষ্টা-তদবির চালায়। বিষয়টি এতদূর পর্যন্ত গড়ায় যে, কুল্লাইস গির্জায় যে দুর্ঘটনাটি ঘটে তার মূল নায়ক একজন আরব বেদুইন। ফাখরুদ্দীন আর-রাযি সূরা ফীলের নিচের আয়াতটির ব্যাখ্যা এভাবে করেন:
“তিনি কি ওদের চক্রান্ত ভণ্ডুল করে দেননি?” তিনি বলেন যে, “এখানে الكيد দ্বারা বোঝায় উদ্দেশ্য-গোপনে অন্যের ক্ষতি করার ইচ্ছা। যদি কেউ প্রশ্ন তোলে, এটা কী করে গোপন চক্রান্ত হয়? আবরাহা তো প্রকাশ্যেই কা'বা ধ্বংসের ঘোষণা দিয়ে এসেছে? এ প্রশ্নের উত্তরে আমরা বলব, হ্যাঁ, এটা গোপন চক্রান্তই বটে! তবে সেটা আবরাহা তার মনে পুষে রেখেছিল, যা প্রকাশ পেয়ে যায়। কারণ, মনে মনে সে আরবদেরকে হিংসা করত। সে দেখে আর কিছুই না, কা'বাই তাদের এত মর্যাদার কারণ। তাদের মর্যাদা দেখে সে ঈর্ষাকাতর হয়ে ওঠে; যেকোনো মূল্যে নিজের জন্য, নিজ জাতির জন্য ও দেশের জন্য ছিনিয়ে আনতে চায় সেই মর্যাদা।” [৯৪]
পুণ্যভূমির জন্য জীবনবাজি
হিমইয়ারের একজন রাজা যখন খবর পেল যে, আবরাহা তার সাঙ্গপাঙ্গ নিয়ে কা'বা ধ্বংসের অভিপ্রায় নিয়ে সেদিকে এগুচ্ছে; কালবিলম্ব না করে তিনি আবরাহাকে বাধা দিতে এগিয়ে আসেন। কিন্তু তিনি আবরাহার বিশাল বাহিনীর বিরুদ্ধে পেরে ওঠেননি; বন্দি হন।
নুফাইল ইবনু হাবীব আল-খাস'আমি তার কাছে আগত ইয়েমেনের বিভিন্ন গোত্রের লোকদের সঙ্গে নিয়ে আবরাহার সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে প্রচণ্ড যুদ্ধে। তবে আবরাহার সৈন্যদের সামনে তারা বেশিক্ষণ টিকতে পারেনি, তারা পরাস্ত হয়। পুণ্যভূমির পবিত্রতা রক্ষায় তারা বিলিয়ে দেয় নিজেদের জীবন।
আবহমান কাল ধরেই পুণ্যভূমি কিংবা পবিত্র স্থান রক্ষা করা এবং এর জন্য জীবন উৎসর্গ করা মানুষের সহজাত একটা স্বভাব।
বিশ্বাসঘাতকদের করুণ পরিণতি
কা'বা ঘর ধ্বংসের উদ্দেশ্যে এগিয়ে এলে আবরাহাকে বাধা না দিয়ে উলটো কিছু লোক সেদিন তার কাজে পূর্ণ সমর্থন দেয়; তাকে সাহায্য করে। তারা ইতিহাসের ধিকৃত আঁস্তাকুড়ে নিক্ষিপ্ত হয়েছে। তাদের কেউ কেউ গোয়েন্দা সেজে আবরাহাকে খবরাখবর সরবরাহ করেছে, কেউ-বা তার পাশে পাশে থেকে সাহস জুগিয়েছে। আবার কেউ প্রাচীন ঘরটি ধ্বংস করার জন্য আবরাহাকে পথ দেখিয়ে নিয়ে গেছে। তারা দুনিয়া ও আখিরাতে অভিশপ্ত। লোকেরা আজও তাদেরকে শাপ-শাপান্ত করে; আল্লাহর লা'নাত, আল্লাহর অভিশাপ তো আছেই। দালালি, গাদ্দারি ও বিশ্বাসঘাতকতার একটা ঘৃণ্য প্রতীক হয়ে ওঠে আবু রিগালের কবর। মানুষের মনে তার জন্য ঘৃণা ছাড়া কিছুই নেই। তার কবরের পাশ দিয়ে যেই যায়, ঘৃণাভরে পাথর ছুঁড়ে মারে。
আল্লাহ ও তাঁর শত্রুদের মধ্যে যুদ্ধের প্রকৃতি
'আবদুল-মুত্তালিব যখন আবরাহার কথার উত্তরে বলেছিলেন, “আমরা বিষয়টি কা'বার মালিকের ওপর ছেড়ে দিলাম। আমরা বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছি না। আল্লাহ যদি ঘরটি ধ্বংস হওয়া থেকে আবরাহাকে বাধা না দেন, তবে আমাদের কোনো শক্তি নেই যে আমরা আবরাহাকে প্রতিরোধ করব।” 'আবদুল-মুত্তালিবের এ কথার মধ্যেই পাওয়া যায়, আল্লাহ ও তাঁর শত্রুদের মধ্যকার যুদ্ধের প্রকৃতির যথার্থ ইঙ্গিত-শত্রু যতই শক্তিশালী হোক, জনবলে যতই বলীয়ান হোক; আল্লাহর কুদরত, আল্লাহর শক্তি, তাঁর পাকড়াও এবং তাঁর প্রতিশোধপরায়ণতার সামনে এক মুহূর্তের জন্যও কেউ দাঁড়াতে পারবে fix না। তিনি সর্বশক্তিমান। তিনি মহান। তিনিই জীবনদাতা এবং যখন যাকে ইচ্ছে করবেন নিয়ে নেবেন যেকোনো সময়। [৯৫]
শাইখ কাসিমি বর্ণনা করেন যে, শাইখ কাশানিউ বলেন, “হাতিবাহিনীর ঘটনাটি খুবই বিখ্যাত। রাসূলুল্লাহর যুগের কিছু আগে ঘটনাটি ঘটে। আল্লাহর কুদরতের একটি নিদর্শন এটি। যে ঘরকে আল্লাহ হারাম বা পবিত্র করে সৃষ্টি করেছেন, যারা সে ঘর ধ্বংসের পাঁয়তারা করেছিল তাদের বিরুদ্ধে আল্লাহর ক্রোধের বহিঃপ্রকাশ ছিল ঘটনাটি।”
কা'বা ও কুরাইশের প্রতি মানুষের ভক্তি-শ্রদ্ধা
আবরাহার মতো দুষ্ট লোকদের হাত থেকে আল্লাহ তা'আলা তাঁর ঘরকে রক্ষা করার পর কা'বার প্রতি আরবদের শ্রদ্ধা বেড়ে যায় বহুগুণে। [৯৬] অন্য আরবরাও কুরাইশদের শ্রদ্ধা করতে শুরু করে। কুরাইশদের ব্যাপারে অন্যদের মন্তব্য হলো—
“তারা আল্লাহর আহল; আল্লাহর লোক। তাদের হয়ে আল্লাহ তা'আলা যুদ্ধ করেছেন। শত্রুর মোকাবিলায় তাদের জন্য আল্লাহ তা'আলাই যথেষ্ট ছিলেন।” এটি ছিল আল্লাহ তা'আলার একটি অনন্য নিদর্শন; নবিজির আগমনের উপক্রমণিকা—এই নবি মাক্কা নগরেই জন্মগ্রহণ করবেন, মূর্তির আখড়া দূর করে কা'বাকে করে তুলবেন পবিত্র, অনন্য এক উন্নত আসনে অধিষ্ঠিত করবেন কা'বাকে। [৯৭]
হাতির ঘটনা নুবুওয়াতের নিদর্শন
ইমাম মাওয়ারদি ও ইবনু তাইমিয়্যাহসহ বেশ কয়েকজন 'আলিম মনে করেন যে, হাতির ঘটনা নুবুওয়াতের একটি নিদর্শন ও প্রমাণ। মাওয়ারদি বলেন,
“ঘটনাটি আবরাহা রাজার অহমিকার উদাহরণ, নুবুওয়াতের আগাম নিদর্শন। ঘটনার পরিণতি দিবালোকের ন্যায় এতটাই স্পষ্ট যে, সত্য-মিথ্যা, আসল-নকলে তালগোল পাকানোর কোনো সুযোগ নেই। যখন রাসূলুল্লাহর জন্মলগ্ন ঘনিয়ে এল তখন থেকেই মূলত নুবুওয়াতের কিছু কিছু নিদর্শন প্রকাশ পেতে থাকে। এর সবচেয়ে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত—হাতিবাহিনীর ঘটনা...।”
“হাতির ঘটনার সময় রাসূল মক্কায় তাঁর মায়ের গর্ভে ছিলেন। ঘটনার ৫০ দিন পর তিনি জন্মগ্রহণ করেন। পিতার মৃত্যুর পর রবি'উল-আওয়াল মাসের ১২ তারিখ সোমবার তিনি জন্ম নেন। দুটি দৃষ্টিকোণ থেকে ঘটনাটি নুবুওয়াতের অনন্য নিদর্শন:
যদি সেদিনের ঘটনায় আবরাহা ও তার বাহিনী কোনোভাবে জিতে যেত, তবে আরবদেরকে তারা বন্দি করত, দাস বানাত। কিন্তু আল্লাহ তা'আলা তা হতে দিলেন না; ধ্বংস করলেন আবরাহা বাহিনীকে। এভাবেই আল্লাহ তা'আলা একজন দাস হয়ে জন্ম নেওয়া থেকে রক্ষা করলেন তাঁর রাসূলকে।
আবরাহা বাহিনীর মোকাবিলা করার মতো সমর্থ ছিল না তৎকালীন কুরাইশরা। উপরন্তু, তারা আহলে-কিতাবও নয়; তাদের কেউ কেউ পূজা করত মূর্তির, কারও-বা ধর্ম পৌত্তলিকতা। তারপরও ইসলাম প্রকাশের মাধ্যমে নুবৃওয়াতি ভিত্তির দৃঢ়তা ও কা'বার সম্মান বাড়ানোর জন্যই আল্লাহ তা'আলা হাতিবাহিনীকে ধ্বংস করেন...।
আরবের চারদিকে এই ঘটনার কথা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। হারামের সম্মান তাদের কাছে বেড়ে যায়। ইতঃপূর্বে কা'বার প্রতি তাদের এমন সম্মান ছিল না। এ ঘটনার পর কুরাইশদের প্রতি মান্যতাও বেড়ে যায় আরবদের। তারা বলত, “এরা আল্লাহর আহল; আল্লাহর লোক। তাদের হয়ে আল্লাহ যুদ্ধ করেছেন। শত্রুদের চক্রান্ত রুখে দিতে তিনিই যথেষ্ট ছিলেন।” কুরাইশদের প্রতি লোকেরা সম্মান প্রদর্শন আরও বাড়িয়ে দেয়। বিনিময়ে কুরাইশরা তাদের জন্য ব্যবস্থা করে পানির ও মেহমানদারির। কা'বার রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বও ছিল তাদের কাঁধে। কুরাইশরা তাদের আয়ের একটা অংশ দিয়ে প্রত্যেক বছর হাজ্জের সময় মিনার ময়দানে হাজিদের পেট ভরে খাওয়াত। ধীরে ধীরে কুরাইশরা ধার্মিকদের ইমাম, অনুসারীদের নেতা হয়ে ওঠে। আর পরবর্তী প্রজন্মের জন্য এভাবেই হাতিবাহিনীর ঘটনা হয়ে থাকে দৃষ্টান্ত হয়ে। (৯৮)
ইবনু তাইমিয়্যা বলেন, “হাতিবাহিনীর ঘটনার সালটি ছিল রাসূলুল্লাহর জন্মসাল। কা'বার আশপাশের মানুষজন আকণ্ঠ নিমজ্জিত ছিল শির্কে। তারা মনে করত, খ্রিষ্টধর্ম তাদের ধর্মের তুলনায় ঢের ভালো। এর থেকে বোঝা যায়, কা'বার তখনকার মুশরিক প্রতিবেশীদের জন্য আল্লাহ তাঁর ঘর রক্ষা করেননি, বরং কা'বার মর্যাদার কারণেই আল্লাহ আবরাহা বাহিনীকে ধ্বংস করেন; কিংবা হতে পারে এর কারণ নবি মুহাম্মাদ। ওই বছরই কা'বার নিকট জন্ম নেন তিনি। অথবা হতে পারে কা'বা ঘর ও নবি মুহাম্মাদ উভয়ের জন্যই আল্লাহ তা'আলা হাতিবাহিনীকে ধ্বংস করেন। হাতিবাহিনী ধ্বংসের কারণ যা-ই হোক না কেন, ঘটনাটি নবিজির নুবৃওয়াতের পূর্বাভাস।” (৯৯)
হাতির কাহিনি আলোচনা করতে গিয়ে ইবনু কাসীর বলেন, “রাসূলুল্লাহর আবির্ভাবের উপক্রম ছিল এই ঘটনা। কারণ, প্রসিদ্ধ একটি মত হলো, তিনি ওই বছরই জন্মগ্রহণ করেন। ঘটনাটির মধ্য দিয়ে আল্লাহ কেমন যেন বলতে চাচ্ছেন, হে কুরাইশ সম্প্রদায়, তোমরা আবিসিনিয়ান লোকদের থেকে উত্তম আর তারা অধম-এ কারণে আল্লাহ তা'আলা তোমাদের সাহায্য করেননি। বরং প্রাচীন ঘর কা'বার সম্মানেই আল্লাহ তা'আলা তোমাদের সেদিন রক্ষা করেছেন। সর্বশেষ নবি, উম্মি নবি মুহাম্মাদকে প্রেরণ করে এই ঘরের মর্যাদা আমি আরও বৃদ্ধি করব।” (১০০)
কা'বা ঘরকে আল্লাহর সুরক্ষা দান
আল্লাহ তাঁর এই প্রাচীন ঘরকে ধ্বংস হওয়া থেকে রক্ষা করেছেন; কা'বার কর্তৃত্ব তখনও পর্যন্ত মুশরিকদের হাতে। তা সত্ত্বেও খ্রিষ্টান আবরাহা ও তার সৈন্যদেরকে কা'বা ধ্বংস করে পুণ্যভূমিতে কর্তৃত্ব করার সুযোগ করে দেননি তিনি। কা'বা হবে সব ধরনের শির্কমুক্ত-এটাই সংগত। কিন্তু আরব মুশরিকরা কা'বার পবিত্রতা মলিন করে দেয় শির্কের পঙ্কিলতায়। আল্লাহ তা'আলার অভিপ্রায় অনুযায়ী মাক্কা আর কা'বাকে তিনি প্রজাপীড়ক ও স্বৈরশাসকের অপশাসন থেকে রক্ষা করেন। তাদের চক্রান্তের হাত কা'বার গায়ে লাগতে দেননি। এভাবেই আল্লাহ তা'আলা কা'বার স্বাধীনতা ও মর্যাদাকে আপন কুদরতে রক্ষা করেন। যাতে এই মুক্ত পরিবেশে পরবর্তী সময়ে গড়ে ওঠে নতুন বিশুদ্ধ একটি বিশ্বাস, একটি আকীদা। সেই স্বাধীন পরিবেশে থাকবে না কোনো শাসকের চোখ রাঙানি, কোনো স্বৈরাচারীর স্বেচ্ছাচারিতায় পিষ্ট হবে না বিশ্বাসী মানুষগণ। এ পরিবেশের দীন হবে 'ইসলাম'। অবিশ্বাসীদের মানুষের দাসত্বের শৃঙ্খল থেকে মুক্তি দিতে এ দীনের আগমন। মানুষকে শোষণ করতে নয়, অন্যের অপশাসনের নাগপাশ থেকে স্বাধীন করে, আঁধার গলি-ঘুপচি থেকে বের করে এনে আলোর দিশা দেখানোই এ দীনের উদ্দেশ্য। নিজের ঘর ও দীন রক্ষার এমনই পরিকল্পনা ছিল আল্লাহ তা'আলার। এমনকি তখন পর্যন্তও কেউ জানত না যে, দীন ইসলামের নবি এ বছরই (হাতির বছরে) জন্ম নিতে চলেছেন।[১০১]
হাতির এ ঘটনা থেকে আমরা সুসংবাদ নিতে পারি। পেতে পারি প্রশান্তি। যখন আল্লাহ আবরাহা বাহিনীর হাত থেকে কা'বাকে রক্ষা করেন, তখনও কা'বার কর্তৃত্ব ছিল মূর্তিপূজারি মুশরিকদের হাতে। আজ মাক্কা ও মাদীনা ইসলামের দুইটি পুণ্যভূমি মুসলিমদের হাতে ঠিকই; এই দুই পুণ্যভূমিসহ বায়তুল-মাকদিসকে নিয়ে ক্রুসেড খ্রিষ্টান ও ইহুদীদের গভীর ষড়যন্ত্র চলছে। কিন্তু আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস-আল্লাহ তাদের নিকৃষ্ট ষড়যন্ত্রের কূটজাল ছিন্ন করবেনই। আবরাহার হাতিবাহিনীকে ছোট ছোট পাখির হাতে যেভাবে নাস্তানাবুদ করে চর্বিত তৃণের মতো করে দেন, সেভাবে ইন শা আল্লাহ, ফেরেববাজ, প্রতারক, প্রবঞ্চকদের প্রতারণাকেও তিনি সফল হতে দেবেন না।।১০২)
ক্যালেন্ডারে পরিণত হয় এ ঘটনা
আর কোনো ঘটনা আরবদের মনে হাতির ঘটনার মতো দাগ কাটতে পারেনি। কেননা, জীবনে এমন অলৌকিক কাহিনি তারা আর একটিও দেখেনি। যার কারণে ঘটনার স্থান-কাল কিছুই তারা বিস্মৃত হয়নি। হাতির বছরকে তারা বর্ষপঞ্জিকায় পরিণত করে। সন-তারিখ নিয়ে কিছু বলতে গেলে তারা এভাবে বলত,
“এ ঘটনা হাতির সালে ঘটেছে।” কিংবা “অমুক ব্যক্তি হাতির সালে জন্মেছে।” অথবা “এটি হাতির সালের এত বছর পরের ঘটনা” ইত্যাদি। হাতির ঘটনা ঘটেছিল খ্রিষ্ট ৫৭০ অব্দে। (১০৩)
টিকাঃ
৯৪. দেখুন: তাফসীর আর-রাযি, ৩৩/৯৪。
৯৫. আবু ফারিস, আস-সীরাহ আন-নাবাওয়িয়া, পৃ. ১১২。
৯৬. দেখুন: কাসিমি, মাহাসিনুত-তা'উঈল, ১৭/২৬২。
৯৭. আবুল হাসান আন-নাদওয়ি, আস-সীরাহ আন-নাবাওয়িয়া, পৃ. ৯২。
৯৮. দেখুন: আবুল হাসান আন-নাদওয়ি, আস-সীরাহ আন-নাবাওয়িয়া, পৃ. ৯২。
৯৯. দেখুন: মাওয়ারদি, আ'লামুন-নুবৃওয়াহ, পৃ. ৮৫-১৮৯。
১০০. দেখুন: তাফসীর ইবনু কাসীর, ৪/৫৪৮, ৫৪৯。
১০১. আবু ফারিস, আস-সীরাহ আন-নাবাওয়িয়া, পৃ. ১১৩。
১০২. ফী যিলালিল-কুরআন, ৬/৩৯৮০。
১০৩. দেখুন: নাদওয়ি, আস-সীরাহ আন-নাবাওয়িয়া, পৃ. ৮২।