📄 চারিত্রিক অবস্থান ও নৈতিকতা
চারিত্রিক ও নৈতিকতার বিচারে জাহিলি আরবদের চরম অবনতি ঘটে। মদ্যপান এবং জুয়া খেলায় তাদের আসক্তি চরমে ওঠে। ছিনতাই, বাণিজ্য-কাফেলা লুণ্ঠন, সাম্প্রদায়িকতা ও নির্যাতন, খুনোখুনি, প্রতিশোধ-স্পৃহা, অবৈধভাবে অন্যের সম্পদ লুট, এতিমের সম্পদ ভক্ষণ, সুদি-কারবার, চুরি-ডাকাতি, যিনা-ব্যভিচার ইত্যাদির চর্চা ছিল নিত্যদিন। এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে যে, যিনা-ব্যভিচারের চর্চা বেশি ছিল দাসী, দেহপসারিণী ও বারবণিতাদের মধ্যে। তবে স্বাধীন নারীরাও কদাচিৎ এমন নিম্নরুচির কাজে জড়িত হতো। স্বাধীন নারীদের এমন পাপাচারে জড়িত হওয়ার সবচেয়ে বড় প্রমাণ হলো একটি বাই'আত-মাক্কা বিজয়ের পর রাসূল ﷺ নারীদের থেকে এ মর্মে বাই'আত গ্রহণ করেন যে, “তারা আল্লাহর সঙ্গে কোনো কিছুর শরিক করবে না, চুরি করবে না এবং যিনা- ব্যভিচারে লিপ্ত হবে না।” নবিজির এ কথা শুনে সাইয়্যিদা হিন্দ বিনতে 'উতবা, আবু সুফিয়ানের স্ত্রীর অবাক প্রশ্ন-“স্বাধীন মহিলারাও ব্যভিচারে লিপ্ত হতে পারে নাকি?” [৬৬]
তবে সবাই যে এই অনাচারে নিমজ্জিত ছিল ব্যাপারটি আদৌ সে রকম নয়; তাদের অনেকেই ছিল যারা যিনা-ব্যভিচার করত না, মদ খাওয়া দূরে থাক, ছুঁয়েও দেখত না। খুনোখুনি করত না, কারও ওপর জুলুম-নির্যাতন চালাত না। ছিল না এতিমের মাল ভক্ষণের বিন্দুমাত্র আগ্রহ। রুটি-রুজির ব্যাপারে তাদের নির্ভরতা ছিল না সুদি-কারবারে।।৬৭] এমন আরও বহু ভালো গুণের দেখা পাওয়া যেত তাদের মধ্যে, যা পরবর্তী সময়ে তাদেরকে প্রস্তুত করেছিল ইসলামের ঝান্ডা বহন করতে। এমনই কিছু গুণের সঙ্গে পরিচিত হওয়া যাক :
ধীশক্তি ও বিচক্ষণতা
জাহিলি আরবদের অন্তর ছিল নির্মল, নিষ্কলুষ। সংস্কার কঠিনসাধ্য হবে এমন কোনো ফিলোসফি-দর্শন, পৌত্তলিক-কাহিনি কিংবা খুরাফাত-কুসংস্কার তাদের নির্মল মনন- জগৎকে খুব বেশি উলট-পালট করে দিতে পারেনি। তবে তাদের সমসাময়িক হিন্দু, রোমান, গ্রীক ও পারসিক জাতির মন-মগজ এমনতর নির্মল ছিল না; তারা প্রতিনিয়ত নতুন ও জটিল ধরনের নানা রকম দর্শন আওড়াত। আরবদের এমন নির্মল মন কেমন যেন প্রস্তুত হয়েছিল পৃথিবীর সবচেয়ে মহান মিশন ইসলামের দা'ওয়াতের পতাকা বহনের দায়িত্বভার নিতে।
তৎকালীন জমানার সবচেয়ে মুখস্থশক্তিসম্পন্ন জাতি হিসেবে আরবদের সুনাম ছিল মানুষের মুখে মুখে। ইসলাম তাদের এই স্বভাবজাত মুখস্থশক্তি, তাদের ধীশক্তিকে ইসলাম রক্ষার কাজে লাগায়। তাদের চিন্তাশক্তি, সত্যকে গ্রহণ করার সহজাত গুণ ইত্যাদি তাদের মধ্যে বিদ্যমান ছিল পুরোমাত্রায়। কাল্পনিক ফিলোসফি, মনগড়া কথাবার্তা, নিষ্ফল ও অকেজো বাইজেন্টাইন বাকবিতণ্ডা এবং যুক্তি-তর্কের জটিল জটিল মারপ্যাঁচ তাদের এমন ভালো গুণের গায়ে আঁচড় বসাতে পারেনি সামান্যতম।।৬৮]
তাদের ভাষা
আরবি ব্যাপক-বিস্তৃত একটি ভাষা; প্রচুর সমার্থক শব্দবহুল। পৃথিবীর আর যেকোনো ভাষাতেই এমন সমাহার বিরল। মধুর আরবি 'আসাল'-এর রয়েছে আশিটি সমার্থক শব্দ। শিয়ালের আরবি 'সা'লাব'-এর রয়েছে দুইশো প্রতিশব্দ। সিংহের আরবি 'আসাদ' এর রয়েছে পাঁচশো প্রতিশব্দ। 'জামাল' বা উটের জন্য আছে এক হাজার শব্দ। তরবারি এবং ধূর্তামি বা ক্ষিপ্রতা বোঝানোর জন্য আছে চার হাজার শব্দ। কোনো সন্দেহ নেই-এতগুলো নাম মুখস্থ করা চাট্টিখানি কথা নয়; এর জন্য চাই প্রচণ্ড মুখস্থশক্তি ও তীক্ষ্ণ স্মরণশক্তি।।৬৯]
তাদের ধীশক্তি, তাদের বিচক্ষণতা এমন এক পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছেছিল যে, কোনো একটি বাক্য, কোনো একটি টেক্সট পুরোপুরি বলার আগেই তারা বুঝে ফেলত বাক্যটি কী বোঝাতে চাচ্ছে। ইতিহাসে এমন উদাহরণ ভূরি ভূরি।[৭০]
বদান্যতা
বদান্যতা, মহানুভবতার গুণের চর্চা ছিল আরবদের মজ্জাগত। হয়তো দেখা গেল, এক ব্যক্তির বাড়িতে মেহমান এসে হাজির। তার নিকট একটি ঘোড়া কিংবা একটি উট ছাড়া মেহমানদারি করার মতো আর কিছুই নেই। সে দ্বিতীয়বার চিন্তা না করে তার পোষা সেই ঘোড়া কিংবা উটটিকে জবাই করে দেবে। এমন লোকও ছিল আরবে যারা কেবল মানুষকেই খাওয়াত না, বরং জীব-জন্তু, পশু-পাখিদের খাওয়ানোরও জোগাড়-যন্ত্র করত। দাতা হাতেম তা'ইয়ের কথা কে না জানে! প্রবাদে পরিণত হয়েছে তার বদান্যতার খ্যাতি। আজও কেউ বদান্যতার পরিচয় দিলে লোকে তাকে 'হাতেম তা'ই' বলে ডাকে।[৭১]
বীরত্ব ও নির্ভীকতা
রণপ্রান্তরে জীবন উৎসর্গ করতে পারাকে আরবরা দেখত সম্মানের চোখে। বিছানায় শুয়ে শুয়ে আরামে মারা যাওয়াকে তারা দেখত নিন্দার চোখে। একদিন এক ব্যক্তি তার ভাইয়ের মৃত্যুসংবাদ শুনল। কোনো প্রকার ভাবিত না হয়ে সে বলল, সে যদি যুদ্ধের ময়দানে মারা গিয়েই থাকে, তবে এতে অবাক হওয়ার আর কীই-বা আছে? সে-ই প্রথম না; তার বাবা, ভাই এবং চাচাও লড়াই করতে গিয়েই মারা গেছেন। নিশ্চয়ই, আল্লাহর কসম! আমরা স্বাভাবিক মৃত্যুবরণ করি না। হয় বর্শার তীক্ষ্ণ ফলার আঘাতে আমরা জর্জরিত হব, কিংবা আমাদের মরণ ঘাপটি মেরে বসে আছে তরবারির ছায়াতলে।
মান-সম্মানের প্রশ্নে আরবদের নীতি ছিল-'যায় যাক জান, তবু দিব না মান'। ইজ্জত, মর্যাদা এবং আপন স্ত্রীর ইজ্জত-আব্রু রক্ষায় তারা জান পর্যন্ত বাজি রাখতে পারত। তবুও সম্মানহানি হতে দিত না।
জাহিলি আরব কবি 'আনতারা মান-সম্মানের একটি চিত্র এঁকেছেন তার কয়েকটি পঙ্ক্তিতে। তিনি বলেন: দাসত্ব জীবনের পেয়ালা পান করায়ো না মোরে আপত্তি নাই দাও যদি সম্মানের হেমলক ভরে। অপমানের জীবন নয় তো জীবন- এ তো এক নরক, সম্মানের জীবন হোক না কষ্টের- সে-ই তো মোর সড়ক।।৭২।
আত্মসম্মানবোধ ও মানবদরদ
জাহিলি আরবদের সহজাত গুণ। বলবানের হাতে দুর্বল, অক্ষম, নারী ও বৃদ্ধের মার খাওয়াকে তারা প্রচণ্ড ঘৃণা করত। প্রাণভয়ে কোনো লোক তাদের নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করলে তারা আশ্রয় দিত। এই আশ্রয় দেওয়াটাকে তারা তাদের পরম কর্তব্য বলে জ্ঞান করত。
স্বাধীনচেতা শৃঙ্খলহীনতা, বন্ধনমুক্তি, স্বাধীনতার জন্য ভালোবাসা আরবদের জন্মগত। স্বাধীনতার জন্য তারা বাঁচত; এর কারণে তারা মরত। জাহিলি আরবদের বেড়ে ওঠা এমন এক মুক্ত পরিবেশে, শৃঙ্খলহীনভাবে, যেখানে কারো কর্তৃত্ব চলে না। লাঞ্ছিত হয়ে, অপমান সহ্য করে, কারো অনুগ্রহভাজন হয়ে, মান-সম্মান খুইয়ে, ইজ্জত-আব্রু বিসর্জন দিয়ে বেঁচে থাকাকে তারা কোনোভাবেই মেনে নিত না। তাকে অপমান করার ধৃষ্টতা কেউ যদি দেখাত, তা হলে তার নিস্তার ছিল না; তাকে খুন করতে সে দ্বিতীয়বার আর চিন্তা করত না। আবার স্বাধীনতা রক্ষার জন্য জীবন দিতেও তারা দ্বিধা করত না।।৭৩] তাদের স্বাধীনতা রক্ষার কিছু উদাহরণ শোনা যাক।
একদিনের ঘটনা। হিরা রাজ্যের শাসক 'আম্র ইবনু হিন্দ তার সভাসদদের নিয়ে আড্ডা দিচ্ছিলেন। এমন সময় সভাসদদের তিনি প্রশ্ন করেন, “আচ্ছা, তোমরা কি এমন কোনো আরবের কথা জানো, যার মা আমার মায়ের সেবাদাসী হতে নাক সিটকায়?”
তারা বলে, “হ্যাঁ, আমরা চিনি। তিনি হলেন সা'লুক বা হতদরিদ্র কবি 'আমর ইবনু কুলসুমের মা।”
শাসক কবি 'আমর ইবনু কুলসুমকে তার সঙ্গে এবং তার মাকে নিজের মায়ের সাথে দেখা করার জন্য ডেকে পাঠান। নিজ মায়ের সঙ্গে শলাপরামর্শ করে শাসক কবি ও কবির মায়ের জন্য আয়োজন করেন ভোজসভার। নির্ধারিত একটি পাত্রের খাবারে বিষ মিশিয়ে রাখা হয়। সবাই খাবার টেবিলে উপস্থিত। শাসকের মা কবির মাকে স্বাগত জানায়, “আসুন। বসুন। আপনার সামনের ডিশ থেকে খাবার গ্রহণ করুন।” তখন কবির মা তাকে বলে, “প্রয়োজনের তাগিদেই মানুষ আপন পথ খুঁজে নেয়।”
কিন্তু শাসকের মা এত সহজেই দমবার পাত্র নয়। বিষমিশ্রিত পাত্রের দিকে ইঙ্গিত করে সে বারবার কবির মাকে তাড়া দিতে থাকে। ত্যক্ত-বিরক্ত হয়ে কবির মা লাইলা চিৎকার চেঁচামেচি জুড়ে দেয়- “তাগলিব গোত্র আজ কোথায়! তাদের আজ লাঞ্ছনার দিন।”
কাছে-ধারেই ছিল কবি। মায়ের আওয়াজ শুনেই সে বুঝে ফেলে কী হতে চলেছে। জিদ চেপে যায় তার মাথায়। দেখে হলঘরে ঝুলে আছে শাসকের একটি তরবারি। হাতে নিয়ে দৌড়ে গিয়ে ঢুকে সেখানে। সোজা গিয়ে আঘাত হানে শাসক 'আম্র ইবনু হিন্দের মাথায়। খবরটি রাষ্ট্র হয়ে যায় অতি দ্রুত। তাগলিব বেঁধে ফেলে কবিতার লাইন।
সত্যনিষ্ঠা, প্রতিশ্রুতি রক্ষা ও সততার জন্য ভালোবাসা
আরবরা সাধারণত নিজেদের জীবনে মিথ্যার চর্চা করত না। মিথ্যা বলাকে তারা মনে-প্রাণে ঘৃণা করত। প্রতিশ্রুতি রক্ষায় তাদের জুড়ি মেলা ভার। মুখে এক কথা, অন্তরে আরেক কথা-এমন নীতি-দর্শন ছিল না তাদের। এজন্যই আমরা দেখি, ইসলামে প্রবেশের জন্য তাদের মুখে শাহাদাতের উচ্চারণই ছিল যথেষ্ট।
মিথ্যা বলাকে আরবরা কতটা যে ঘৃণা করত, তার একটা চিত্র আমরা এখন দেখব। ঘটনাটি আবু সুফিয়ানের; তখনও তিনি ইসলাম গ্রহণ করেননি, বরং ইসলামের প্রথম সারির একজন শত্রু। মুসলিমদের সঙ্গে তখনও পর্যন্ত তাদের যুদ্ধ চলছিল। একবার বাণিজ্য-কাফেলা নিয়ে তিনি রোমে যাত্রা করেন। রোম-সম্রাট হিরাক্লিয়াস তাকে রাসূলুল্লাহ সম্পর্কে জানতে চেয়ে বেশকিছু প্রশ্ন করেন। সম্রাটের প্রশ্নের উত্তরে মিথ্যার আশ্রয় নেননি আবু সুফিয়ান একবারও। তিনি বলেন: “যদি এই আশঙ্কা না থাকত যে, লোকে আমাকে মিথ্যাবাদী বলবে, তবে আমি তাঁর ব্যাপারে মিথ্যা বলতাম।” (৭৪)
এবার আসা যাক জাহিলি আরবদের প্রতিশ্রুতি রক্ষার কথায়। প্রতিশ্রুতি রক্ষা করার গুণটি আরবদের স্বভাবজাত একটি বিষয়। কদাচিৎ তারা এ মহৎ গুণটি রক্ষার বিষয়ে ভুল করেছে। তবে মাঝেমধ্যে তারা প্রতিশ্রুতি রক্ষার নামে বাড়াবাড়ি পর্যন্ত করে ফেলত; দরকার নেই বা এ প্রতিশ্রুতি রক্ষাটা দাঁড়িয়ে আছে পুরোপুরি মিথ্যার ওপর ভিত্তি করে—এমন বিষয়েও তারা প্রতিশ্রুতি রক্ষার নজির রেখেছে।
এরপর ইসলাম এল। প্রতিশ্রুতি রক্ষার যথোচিত দিকনির্দেশ করল তাদেরকে। বলে দিল কোথায় প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে হবে, আর কোথায় করতে হবে না। কোনো ব্যক্তির যতই জৌলুস থাক কিংবা লোকটি তাদের কারও নিকটাত্মীয় হোক বা বন্ধু; সে যদি অপরাধী হয়, তবে ইসলাম এমন পাপীকে সমর্থন করার ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। আবার ইসলাম ওই ব্যক্তির সঙ্গেও অনমনীয় আচরণ করেছে, যে লোক কোনো মুহদিসকে (সাওয়াবের অভিপ্রায় নিয়ে যে ব্যক্তি দীনের মধ্যে দীনের নাম করে নতুন কিছু আবিষ্কার এবং তা সম্পাদন করে) আশ্রয়-প্রশ্রয় দিত ও সাহায্য-সমর্থন করত। রাসূল বলেন, “যে ব্যক্তি কোনো মুহদিসকে আশ্রয় দিল, তার ওপর আল্লাহর অভিশাপ।”(৭৫)
জাহিলি আরবদের প্রতিশ্রুতি রক্ষার কিছু প্রামাণিক ঘটনা(৭৬)
“হারিস ইবনু 'ইবাদ তাগলিব গোত্রের বিরুদ্ধে এক যুদ্ধে বাক্স গোত্রগুলোকে নেতৃত্ব দেয়; তাগলিব গোত্রের নেতা মুহালহাল বাসূস যুদ্ধে হারিসের ছেলেকে হত্যা করে। গোত্রে গোত্রে যুদ্ধ লাগলেও হারিসের মনে কিন্তু ছেলে হত্যার প্রতিশোধস্পৃহা কাজ করছিল। সে সুযোগ খুঁজছিল, মুহালহালকে বাগে পেলে তার ছেলেহত্যার প্রতিশোধ নেবে। যুদ্ধের এক পর্যায়ে হারিস মুহালহালকে বন্দি করে। মজার ব্যাপার হলো-বন্দি কী হবে, হারিস কিন্তু মুহালহালকে চিনে উঠতে পারেনি একটুও। হারিস বন্দিকে বলল, “তুমি যদি আমাকে মুহালহাল ইবনু রাবি'আর সন্ধান দিতে পারো, তবে আমি তোমাকে মুক্ত করে দেবো।”
মুহালহাল তাকে বলল, “ঠিক বলছ তো? যদি আমি তোমাকে মুহালহালের খোঁজ ঠিক ঠিক দিতে পারি, তা হলে আমাকে ছেড়ে দেবে!” হারিস বলল, "হ্যাঁ, অবশ্যই। কথা যখন দিয়েছি, তখন এর নড়চড় হবে না।
মুহালহাল বলল, “তুমি যাকে খুঁজছ, আমিই সেই মুহালহাল ইবনু রাবি'আ। কোনোরূপ দ্বিধা ছাড়াই হারিস মুহালহালকে বন্দি দশা থেকে মুক্ত করে দেয়। প্রতিশ্রুতি রক্ষার পুরুষোচিত এমন নজির খুবই বিরল।” [৭৭] আরেকটি উদাহরণ।
পারস্য সম্রাট খসরু একবার নু'মান ইবনু মুনযিরের কন্যাক বিয়ে করার প্রস্তাব পাঠায়। কিন্তু নু'মান সবিনয়ে তা প্রত্যাখ্যান করে। সেদিন থেকে নু'মান ভয়ে অস্থির; খসরুর হাতে নিজের প্রাণ যাওয়ার আশঙ্কা পেয়ে বসে তাকে। টিকতে না পেরে শেষ পর্যন্ত সমুদয় সম্পত্তি, অস্ত্রশস্ত্র ও নিজের স্ত্রীকে হানি ইবনু মাস'ঊদ আশ-শাইবানির জিম্মায় রেখে নু'মান খসরুর সঙ্গে দেখা করতে যাত্রা করে। খসরু তার সঙ্গে রূঢ় আচরণ করে এবং তাকে পাকড়াও করে। এরপর নু'মানের সয়-সম্পত্তি চেয়ে খসরু হানিকে তলব করে। হানি খসরুর এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে সরাসরি। রেগেমেগে খসরু হানিকে মারার জন্য সৈন্য পাঠায়। খবর পেয়ে হানি নিজ গোত্র বাক্সকে জমায়েত করে জ্বালাময়ী এক ভাষণ দেয়। সে বলে:
“হে বাক্স সম্প্রদায়! যুদ্ধের ময়দান থেকে মৃত্যুভয়ে পালিয়ে যাওয়া কাপুরুষতার পরিচয়। পালিয়ে না গিয়ে বীর-বিক্রমে লড়াই করতে করতে যে নিহত হয় সে-ই উত্তম। মনে রাখবে, সতর্কতা কখনোই তোমাকে বাঁচাতে পারবে না। জানোই তো, কপালের লিখন না যায় খণ্ডন। বিজয়ের জন্য চাই পাহাড়সম ধৈর্য; সবুরেই মেওয়া ফলে। আমরা মরতে রাজি; অপমানিতের শতায়ুর চেয়ে আমরা সিংহের মতো একদিন বাঁচতে চাই। পালিয়ে বাঁচার চেয়ে কণ্ঠনালীতে একটা আঘাত এসে আমার মরণ হবে তাও ভালো। আমরা যখন মরতে শিখেছি, আমাদেরকে দমাতে পারে কে এমন আছে? হে আমার জাতি, লড়াই করো, যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ো। রণে ভঙ্গ দিয়ো না। মৃত্যু আসা পর্যন্ত লড়তেই থাকো।” [৭৮]
তার ভাষণে প্রদৃপ্ত হয়ে বাক্স গোত্র পারস্য বাহিনীকে যূ-কার যুদ্ধে পর্যদুস্ত করে ছাড়ে। তৎকালীন যুগের এক পরাশক্তি পারস্যের বিশাল বাহিনীকে কেবল একটি গোত্রীয় বাহিনী নিয়ে হারানোটা চাট্টিখানি কথা ছিল না। এমনটা সম্ভব হয়েছে শুধুমাত্র হানির দৃঢ়চেতা ব্যক্তিত্বের কারণে; সে যে কারও বশ্যতাকে স্বীকার করে নিয়ে বেঁচে থাকাকে মনে করত চরম লাঞ্ছনার বিষয় বলে। প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে গিয়ে মরণকে বরণ করে নিতে পর্যন্ত সে কুণ্ঠাবোধ করেনি।
কষ্ট-সহিষ্ণুতা ও অল্পে তুষ্টি
আরবদের একটা রীতি ছিল- কম খেত তারা। খাবার শেষ করেই তারা বলে উঠত,
করো যদি উদরপূর্তি কমে যাবে তোমার বুদ্ধি।
অতিভোজী পেটুকদেরকে জাহিলি আরবরা ভালো চোখে দেখত না; দেখত অবজ্ঞাভরে। এক আরব কবি বলেন : "কষ্টে হা-হুতাশ না করা, বিপদাপদে ধৈর্যধারণ করার এক অত্যাশ্চর্য শক্তি ছিল আরবদের। তাদের এমন শক্তি থাকবেই-বা না কেন; শুষ্ক মরুভূমিতে বেড়ে ওঠার কারণে এমন শক্তি তাদের জন্মগত। চোখ জুড়ানোর মতো শস্য-শ্যামল নয়নাভিরাম দৃশ্যের অপ্রতুলতা, পানির অভাব তাদেরকে পদে পদে বাধ্য করেছে কষ্ট সহিষ্ণু হতে। দুর্গম, এবড়োখেবড়ো পাহাড়ে তৈরি করে নিয়েছে নিজেদের চলার পথ। দুপুরের তপ্ত রোদ মাথায় নিয়ে আর তপ্ত বালুরাশি পদতলে নিয়ে হেঁটে গেছে আপন গন্তব্যে। শীত, গ্রীষ্ম, গিরিপথ, পথের দূরত্ব, ক্ষুৎপিপাসা কোনো কিছুই তাদের জীবনযাত্রার গতিকে রোধ করতে পারেনি। এরাই যখন ইসলামের সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে ইসলাম গ্রহণ করে তখন তারা ধৈর্যে, সহিষ্ণুতায় এক অনন্য নজির স্থাপন করে। ছিল না খাই খাই স্বভাব; তারা অল্পেই তুষ্ট থাকত। তাদের কেউ একজন মাত্র অল্প কটা খেজুর খেয়ে বেঁচে থাকত অনেক দিন, ভেজাত সামান্য ক-ফোঁটা পানি দিয়ে নিজের তপ্ত কলিজা।[৭৯]
ক্ষমাশীলতা ও প্রতিবেশীর সুরক্ষা দান
মানসিক দৃঢ়তার পাশাপাশি শারীরিক শক্তির জন্যও আরবরা সুপরিচিত। এ মানসিক দৃঢ়তা ও শারীরিক শক্তির মিশেল যাদের মধ্যে ঘটবে, তাদের শক্তি যে বেড়ে যাবে বহুগুণে তা বলাই বাহুল্য। হ্যাঁ, এমনই ঘটেছিল আরবরা যখন ইসলাম গ্রহণ করে। জাহিলি আরবরা শত্রুকে হাতের নাগালে পেয়েও হত্যা না করে তাকে ছেড়ে দিয়েছে, এমন অনেক নজির আছে। সুযোগ থাকা সত্ত্বেও অনেক সময় শত্রুর প্রতি দয়ালু হয়ে ক্ষমা করে দিয়েছে, সুযোগ দিয়েছে চলে যাওয়ার জন্য। আহতকে তারা বাগে পেয়েও পালটা আঘাতে জর্জরিত করেনি।
জাহিলি আরবরা প্রতিবেশীর অধিকার প্রদানেও ছিল সচেষ্ট। বিশেষত নারীদের হেফাজতে তারা থাকত সজাগ।
বিপদে পড়ে, নিরুপায় হয়ে কোনো লোক তাদের কাছে আশ্রয় চাইলে তারা তাকে নিরাশ করত না, আশ্রয় দিত। অনেক সময় এমনও হতো যে, আশ্রিত ব্যক্তির সুরক্ষায় তারা তাদের নিজের কিংবা ছেলের জীবন ও অর্জিত ধন-সম্পদ উৎসর্গ করতেও কার্পণ্য করত না।
এমন চারিত্রিক সুষমা ও মানবিক মহৎ গুণ মানুষের মনে আরবদেরকে উঁচু মর্যাদার আসনে বসিয়েছিল। ইসলাম এসে একে আরও উন্নীত করে, শক্তিশালী করে; নিয়োজিত করে কল্যাণ ও সত্যের কাজে। ইসলাম তাদের কর্মকাণ্ডকে জান্নাতি দূত মালাইকাদের চেয়ে উত্তম করে গড়ে তোলে। বিজয়ের ঝান্ডা নিয়ে ছড়িয়ে পড়েন তারা পৃথিবীর দিদিগন্তে। যেখানে একসময় চর্চা হতো কুফরির, অন্ধকারের, সেখানটা আজ ভরে উঠল ঈমান ও আলোতে। জুলুম-নির্যাতনে নিষ্পেষিত মানুষদেরকে তারা শোনালেন ইনসাফের কথা। সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঘাপটি মেরে থাকা অশালীনতা আর বেলেল্লাপনাকে ঝেটিয়ে বিদায় করে ঢেকে দিলেন শালীনতার পর্দায়। অকল্যাণ, অমঙ্গলের স্রোতের বিপরীতে দাঁড়িয়ে তারা মানবতাকে দেখালেন সত্য ও কল্যাণের দিশা।।৮০।
জাহিলি আরব সমাজের নৈতিকতার কিছু নমুনা মাত্র ছিল এগুলো। একজন আরব এমন ভালো ভালো সব গুণ নিয়েই বেড়ে উঠত। সমসাময়িক বিশ্বের আর কোনো সমাজে একসঙ্গে এমন সব মহৎগুণের সমাহার ছিল বিরল। নবিজিকে রাসূল করে পাঠানোর জন্য আল্লাহ বেছে নিলেন এ আরব সমাজকেই। তাঁকে বেছে নেওয়া হলো সমগ্র মানবসমাজের জন্য।
এমন বিরল ধাঁচের প্রকৃতি পৃথিবীতে আর একটি নেই। জ্ঞান-বিজ্ঞানের জগতে পারস্যদের অবাধ বিচরণ। দর্শনে ছিল ভারতীয়দের প্রভূত উন্নতি সাধন। চারু ও কারুকলায় ছিল রোমানদের একচ্ছত্র আধিপত্য, চিত্রকল্প ও কাব্য-কবিতায় গ্রীকদের প্রতিভার ছাপ-এত কিছু সত্ত্বেও রাসূল তাদের কাছে প্রেরিত হননি। তিনি প্রেরিত হলেন নির্মল এক পরিবেশে; কারণ, আরব ছাড়া অন্যান্য জাতির আর যা-ই থাকুক না থাকুক, কিছু গুণের বড়ই অভাব ছিল তাদের মাঝে আর তা হলো-আল্লাহ প্রদত্ত স্বভাব বা ফিতরাতের নিষ্কলুষতা, চিত্তের স্বাধীনতা এবং আত্মিক উন্নতি সাধনে একাগ্রতা। এগুলো পুরোমাত্রায় বিদ্যমান ছিল একটা জাতির মাঝেই; তা হলো আরব।।৮১।
টিকাঃ
৬৬. প্রাগুক্ত, ১/৯৪।
৬৭. দেখুন: আবু শাহবা, আস-সীরাহ আন-নাবাওয়িয়া, ১/৯৪।
৬৮. দেখুন: আস-সীরাহ আন-নাবাওয়িয়া, পৃ. ১২।
৬৯. বুলুগুল-আরিব, ১/৩৯-৪০।
৭০. দেখুন: মাদখাল লিফিকহিস-সীরাহ, পৃ. ৭৯,৮০।
৭১. দেখুন: আবু শাহবা, আস-সীরাহ আন-নাবাওয়িয়া, ১/৯৫।
৭২. ড. ফারুক আত-তিবা', দিওয়ান 'আনতারা, পৃ. ২৫২।
৭৩. আবু শাহবা, আস-সীরাহ আন-নাবাওয়িয়া, ১/৯৫।
৭৪. সহীহ বুখারি, ওয়াহির সূচনা অধ্যায়, হাদীস নং: ৭।
৭৫. সহীহ মুসলিম, আত্মত্যাগের অধ্যায়, হাদীস নং: ১৯৭৮।
৭৬. দেখুন: মাদখাল লিফাহমিস-সীরাহ, পৃ. ৯০।
৭۷. প্রাগুক্ত, পৃ. ৯১।
৭৮. তারীখ আত-তবারি, যু-কার-যুদ্ধ সম্পর্কিত অধ্যায়, ২/২০৭।
৭৯. দেখুন: আবু শাহবা, আস-সীরাহ আন-নাবাওয়িয়া, ১/৯৬, ৯৭।
৮০. প্রাগুক্ত, ১/৯৭।
৮১. দেখুন: ইমাম হাসান আল-বান্না, নাযারাত ফিস-সীরাহ, পৃ. ১৪।