📄 সামাজিক অবস্থা
আরবদের সামাজিক অবস্থা খুব ভালো ছিল বলা চলে না। পূর্ববর্তীদের অন্ধ অনুকরণ-অনুসরণ, বিভিন্ন প্রথা ও কুসংস্কার মেনে চলাই ছিল তাদের সামাজিক জীবনের প্রধান উপজীব্য। এমন কিছু সামাজিক প্রথা ছিল যা তাদের জাত-পাত, কুল-বংশের সঙ্গে ছিল ওতপ্রোতভাবে জড়িত। গোত্রগুলোর পারস্পরিক সম্পর্ক, গোত্রের সঙ্গে ব্যক্তির সম্পর্ক নিরূপণেও ছিল প্রথাগুলোর অগ্রণী ভূমিকা। সামাজিক অবস্থার সংক্ষিপ্ত কিছু দিক নিচে দেওয়া হলো:
বংশ কৌলিন্যের অহমিকা
আরবরা পৃথিবীর এমন এক জাতি, যারা নিজ গোত্রের বংশধারা রক্ষা, রক্ত বিশুদ্ধ রাখার ব্যাপারে ছিল অত্যন্ত সচেতন; অন্য গোত্রের লোকদের সঙ্গে নিজেদের বিয়ে-শাদির রেওয়াজ তাদের সামাজিক প্রথায় ছিল প্রায় হারাম। বিয়ে-শাদি হতো কেবল নিজ নিজ গোত্রের ছেলেমেয়েদের মধ্যে। এরপর ইসলাম এল। অন্য গোত্রের সঙ্গে বিয়ে-শাদির সম্পর্ক স্থাপন করা যাবে না-অবসান ঘটাল এই কুপ্রথার। ঘোষণা দিল, শ্রেষ্ঠত্ব নিরূপিত হবে কেবল তাকওয়া ও সৎকাজের ভিত্তিতে।
ভাষার বিশুদ্ধতা নিয়ে গর্ব
ভাষার বিশুদ্ধতা, শব্দের শ্রুতিমধুরতা ও উচ্চাঙ্গশৈলীতে আরবরা থাকত বিমোহিত হয়ে। তাদের বাক্যচয়নে থাকত মুনশিয়ানার ছাপ। অসাধারণ সব শব্দশৈলীতে তারা অনায়াসেই দিব্যি কথা বলে যেতে পারত ঘণ্টার পর ঘণ্টা। তাদের রচিত কবিতার পরতে পরতে খুঁজে পাওয়া যেত নিজেদের গৌরবগাথা, বংশের নামডাক, আবেগ-অনুভূতি, সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না, তাদের জ্ঞান-গরিমা ইত্যাদির অত্যুজ্জ্বল বিভিন্ন দিকের আলোকপাত। এটা খুব অস্বাভাবিক নয় যে, এদের মধ্য থেকেই জন্ম নেবে কোনো স্বভাব-কবি কিংবা জাদুকরী কোনো বক্তা। হয়তো কবিতার একটি পঙ্ক্তিই পারে নিজ গোত্রের উত্থানের সোপান হতে। আবার কবিতার একটি পঙ্ক্তিই যথেষ্ট ছিল উন্নতির পরম সোপান থেকে অবনতির চরম ঠিকানায় পৌঁছে দিতে। আজকের দুনিয়ায় একটি দেশ কোনো খেলার বিশ্ব আসরে স্রেফ সুযোগ পাওয়াতেই যে আনন্দ মিছিল করে, তৎকালীন আরব গোত্রে একজন কবি জন্ম নিলে তাদের আনন্দ এর চেয়ে কোনো অংশেই কম ছিল না।
আরব সমাজে নারী
নারীকে পণ্য-সামগ্রীর চেয়ে বেশি কিছু ভাবতে পারত না আরবের অনেক গোত্রই। সাধারণ সম্পদের মতো নারীদেরকেও মীরাসি-পণ্য হিসেবে বণ্টন করা হতো। বাবার মৃত্যুর পর ছেলের অধিকার ছিল তার সৎমাকে বিয়ে করার। কিংবা অন্য কোথাও বিয়ে দেওয়ার ব্যাপারে বাধা দেওয়ার অধিকারও সংরক্ষণ করত সে। ইসলাম এসে এ জঘন্য প্রথাকে হারাম ঘোষণা করে। আল্লাহ বলেন: “তোমাদের পিতৃপুরুষ (বাবা, দাদা, নানা) যেসব নারীকে বিয়ে করেছে, তোমরা তাদেরকে বিয়ে করো না। তবে পূর্বে যা হয়ে গিয়েছে (তা ভিন্ন কথা)। অবশ্যই এ তো ছিল অশ্লীল, বড়ই ঘৃণার ব্যাপার ও জঘন্য প্রথা।” [সূরা আন-নিসা, ৪:২২]
আরবরা যৌনাচারের বেলায় যদিও অস্বাভাবিক জীবনযাপন করত, তা সত্ত্বেও উৎসমূলে বিয়ে করাকে তারা হারাম বলে ঘোষণা করে। উৎসমূলের মধ্যে পড়ে নিজের মা, নানি এবং তার থেকে উপরের দিকে। এমনিভাবে শাখা-প্রশাখার মধ্যেও এই নিষেধাজ্ঞা বলবৎ ছিল, যেমন: মেয়ে। বাবার ধারার মধ্যে যাদেরকে বিয়ে করা যেত না, যেমন: বোন। দাদা ও নানার ধারার খালা, বাবার ধারার ফুফুদেরকেও বিয়ে করা যেত না।।[৪৯]
আরবরা কন্যা, স্ত্রী ও শিশুদেরকে কোনো ধরনের উত্তরাধিকার সম্পদ দিত না। যেসব নারী পুরুষের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে যুদ্ধ করতে পারত, শত্রুর আক্রমণ থেকে নিজ জাতিকে রক্ষা করতে জানত, কেবল তারাই কিছুটা গানীমাতের ভাগ পেত। যুদ্ধ করতে অক্ষম মহিলা ও শিশু উত্তরাধিকার-সম্পত্তি প্রাপ্তি থেকে ছিল পুরোপুরি বঞ্চিত। নারীদের উত্তরাধিকার-সম্পত্তি দেওয়া যাবে না-এটা একরকম অঘোষিত নিয়ম ছিল আরবদের মধ্যে। দীর্ঘদিন থেকে চলে আসছিল এটা প্রথা হিসেবে; আর এটা কার না জানা যে, প্রথা অনেক সময় বিধিবদ্ধ আইন থেকেও অধিক শক্তিশালী হয়। কিন্তু রাসূলুল্লাহর যুগে এসে এ কুপ্রথার বিলুপ্তি ঘটে। আউস ইবনু সাবিত নামের এক সাহাবি মারা যান সেসময়। তার ছিল দুই মেয়ে ও এক ছেলে। মেয়ে দুটো ছিল খুবই অসুন্দর। এই সুযোগে আউসের দুই চাচাতো ভাই তার রেখে যাওয়া সমুদয় সম্পত্তি নিয়ে নেয়। তখন তার স্ত্রী তাদেরকে বললেন, তোমরা দুজনই মেয়ে দুটিকে বিয়ে করো। অসুন্দর হওয়াতে মেয়ে দুটোকে বিয়ে করতে অস্বীকৃতি জানায় তারা। উপায়ান্তর না দেখে রাসূলুল্লাহর নিকট এসে অভিযোগ করলেন সেই মহিলা। বললেন, “হে আল্লাহর রাসূল, আউস মারা যাওয়ার সময় ছোট একটা ছেলে ও দুটি মেয়ে রেখে যায়। পরে একদিন তাঁর দুই চাচাতো ভাই, সুওয়াইদ ও 'আরফাতা, এসে তার রেখে যাওয়া সমুদয় সম্পদ সঙ্গে করে নিয়ে যায়। আমি তাদেরকে বলেছিলাম, 'ভালো হয়, তোমরা তার দুই মেয়েকে বিয়ে করো।' কিন্তু তারা তাতে রাজি হয়নি।” সব শুনে রাসূল ﷺ সে দুজনকে বললেন, "তোমরা এই উত্তরাধিকার-সম্পত্তির কোনো কিছুরই নড়চড় করো না।”।৫০) এরই পরিপ্রেক্ষিতে নাযিল হয় কুরআনের আয়াত যাতে আল্লাহ বলেন:
“পিতামাতা ও আত্মীয়স্বজনদের রেখে যাওয়া সম্পত্তিতে পুরুষদের অংশ আছে। আর পিতামাতা ও আত্মীয়স্বজনদের রেখে যাওয়া সম্পত্তিতে নারীদেরও অংশ আছে; হোক অল্প কিংবা বেশি, কিন্তু তা নির্ধারিত অংশ।” [সূরা আন-নিসা, ৪:৭]
আরবরা মেয়েদেরকে ঠাট্টা-বিদ্রুপ, উপহাস ও তামাশার পাত্রের চেয়ে বেশি কিছু ভাবত না। তারা মনে করত, মেয়েরা যুদ্ধ করতে পারে না, যত নির্ভরতা তাদের পুরুষের ওপর। পুরুষদের মতো তারা রুজি-কামাই করতে পারে না। যুদ্ধের সময় নারীরা যদি শত্রুর হাতে বন্দি হয়, তবে গ্রেফতারকারী তাদের সঙ্গে দাসীর মতো আচরণ করে, চরিতার্থ করে তার যৌন-অভিলাষ। এমনকি কোনো কোনো মহিলাকে তো তারা বেশ্যাবৃত্তিতে বাধ্য করাত; দিনশেষে মনিব তার সারাদিনের বেশ্যাবৃত্তির কামাই নিয়ে যেত। এমন সব ঘৃণ্য কাজে আরবদের বিরক্তভাব আসা তো দূরে থাক, বরং তা একপ্রকার অনুমোদিত কাজে পরিণত হয় তাদের সমাজে। ভয়, লজ্জা ও এসব সামাজিক রীতি ওঠার কারণে কারও ঘরে কন্যাসন্তান জন্ম নিলে তাকে পেয়ে বসত রাজ্যের সব দুশ্চিন্তা, মলিন হয়ে যেত তার মুখখানি। এই অবস্থার কথা কুরআন আমাদের সামনে এভাবে তুলে ধরেছে। আল্লাহ বলেন:
“তাদের কাউকেও যখন কন্যাসন্তান জন্মের সুসংবাদ দেওয়া হয়, তখন তার মুখ কালো (মলিন) হয়ে যায় ও সে বিষণ্ণ হয়ে পড়ে। তাকে যে সংবাদ দেওয়া হয় তার লজ্জায় সে নিজের সম্প্রদায় থেকে নিজেকে লুকিয়ে রাখে। সে ভাবে অপমান সহ্য করেও কি সে তাকে রেখে দেবে, না মাটিতে পুঁতে ফেলবে! জেনে রাখো, তারা যেভাবে বিচার করে তা অত্যন্ত জঘন্য।” [সূরা আন-নাহল, ১৬: ৫৮, ৫৯]
অনেক বাবাই কন্যাসন্তানের জনক হওয়ার লজ্জাকে চাপা দিত নিজের ঔরসজাত মেয়েটিকে জীবন্ত মাটিচাপা দিয়ে! কন্যার অপরাধ? কিছুই না। কন্যা হয়ে জন্মানোটাই যেন তার আজন্ম পাপ। ৫১। তাদের এই জঘন্যতাকে কুরআন চরম অবজ্ঞা করেছে। আল্লাহ বলেন:
“যখন জীবন্ত-কবর-দেওয়া কন্যাকে জিজ্ঞেস করা হবে, কী দোষে তাকে হত্যা করা হয়েছিল?” [সূরা আত-তাকভীর, ৮১: ৮, ৯]
কোনো কোনো বাবা স্রেফ দারিদ্র্যের কারণে কিংবা মেয়ের পেছনে ব্যয় করে দরিদ্র হয়ে যাবে এই ভয়ে আপন কন্যাকে খুন করত। ভাবত, মেয়ে সন্তানকে লালন- পালন করতে গেলে তাদেরকে পথে বসতে হবে, মরতে হবে না খেয়ে। তারপর ইসলাম এল। এগুলোকে হারাম বলে ঘোষণা দিল। আল্লাহ বলেন :
"বলো, 'এসো, তোমাদের রব তোমাদের জন্য যা হারাম করেছেন তা আমি তোমাদের পড়ে শোনাই। তা এই যে—তোমরা তাঁর সঙ্গে কোনো কিছু শরিক করবে না, পিতামাতার সাথে সদ্ব্যবহার করবে, দারিদ্র্যের ভয়ে তোমরা তোমাদের সন্তানদেরকে হত্যা করবে না; আমিই তোমাদের ও তাদেরকে আহার দিয়ে থাকি। প্রকাশ্যে হোক বা গোপনে হোক, অশ্লীল আচরণের কাছে যেয়ো না। আল্লাহ যার হত্যা নিষিদ্ধ করেছেন, যথার্থ কারণ ছাড়া তাকে হত্যা কোরো না। তোমাদেরকে তিনি এ নির্দেশ দিয়েছেন যাতে তোমরা বুঝতে পারো।” [সূরা আন'আম, ৬:১৫১]
আল্লাহ আরও বলেন:
“তোমরা তোমাদের সন্তানদেরকে দারিদ্র্যের ভয়ে হত্যা করো না। ওদেরকে ও তোমাদেরকে আমিই জীবিকা দিয়ে থাকি। নিশ্চয়ই ওদেরকে হত্যা করা মহাপাপ।” [সূরা ইসরা', ১৭:৩১]
এত অনাচারের মাঝেও কিছু গোত্র ছিল যারা কন্যাদের হত্যা করা থেকে বিরত থাকত। এমন লোকও ছিলেন, যারা জঘন্য এই পাপকে ঘৃণা করতেন মনে-প্রাণে। এদেরই একজন হলেন যাইদ ইবনু 'আম্র ইবনু নুফাইল।।৫২।
আবার এমন গোত্রও ছিল যারা নারীদের সম্মান করত, চলত সমীহ করে; বিয়ে-শাদির বেলায় নারীদের মতামত গুরুত্বের সঙ্গেই নিত। একজন আরব স্বাধীন নারী খুবই সাহসী হতো; চাইলেই যুদ্ধের ময়দান পর্যন্ত ছুটে যেত স্বামী-যোদ্ধাদের সঙ্গে, পাশে থেকে উৎসাহ দিয়ে যেত অবিরত। প্রয়োজন হলে শত্রুর মোকাবিলায় দাঁড়িয়ে যেত অস্ত্র হাতে নিয়ে। অন্যদিকে, একজন আরব বেদুইন নারী তার স্বামীর সঙ্গে মাঠে গবাদি পশু চরাত। পাশাপাশি পশম ধুনত, পোশাক বুনত।।৫৩)
বিয়ে-শাদি
বিচিত্র সব বিয়ের প্রচলন ছিল আরবদের মাঝে। এই নিয়ে তাদের কেউ কাউকে দোষারোপ করত না। সায়্যিদা 'আয়িশা আমাদেরকে জানান, জাহিলি যুগে চার ধরনের বিয়ের প্রচলন ছিল; এর একটি হলো: বর্তমান যুগের সাধারণ বিয়ের মতো। এ ব্যবস্থায়, বিয়ে-ইচ্ছুক ব্যক্তি অন্য একজন লোকের কাছে গিয়ে তার পোষ্য কিংবা মেয়েকে বিয়ের করার প্রস্তাব ব্যক্ত করত। তিনি রাজি হলে বিয়ে-ইচ্ছুক ব্যক্তি কনেকে দেনমোহর প্রদান করে বিয়ে করে নিয়ে আসত। ইসলাম আসার পর এ ধারার বিয়েকে সঠিক বলে স্বীকৃতি দেয়; বর্তমান মুসলিম সমাজের বিবাহচর্চা এমন ধারারই।
দ্বিতীয় ধারার বিয়ের ধরন ছিল এ রকম: স্ত্রী যখন মাসিক থেকে পবিত্র হতো তখন স্বামী তাকে বলত, তুমি অমুক ব্যক্তির নিকট যাও। এরপর তার সঙ্গে তাকে মিলিত হতে বলত। তার দ্বারা গর্ভবতী হওয়ার ব্যাপারটি স্পষ্ট হওয়া পর্যন্ত স্বামী নিজ স্ত্রীর সঙ্গে সব ধরনের যৌনসম্পর্ক স্থাপন থেকে দূরে থাকত। এমনকি এ সময়ে তাকে স্পর্শ পর্যন্ত করত না। গর্ভধারণের বিষয় নিয়ে যখন আর কোনো সন্দেহ থাকত না, স্বামী মন চাইলে তার কাছে আসত; তার আগপর্যন্ত না। এমন রুচিহীন অশ্লীল কাজের পেছনে জাহিলি আরবদের উদ্দেশ্য—মেধাবী ও বীর সন্তানের জনক হওয়ার খায়েশ। এ ধারার বিয়ে 'নিকাহুল-ইসতিবদা' নামেই পরিচিত。
তৃতীয় ধারার বিয়ে ছিল এ রকম: ১০ জনের চেয়ে কমসংখ্যক লোকের একটি দল একত্র হয়ে কোনো একজন নারীর নিকট গমন করত। পালাক্রমে সবাই তার সঙ্গে মিলিত হতো। এরপর এক সময় মহিলা যথারীতি গর্ভধারণ করে। অতঃপর সে জন্ম দেয় কোনো সন্তানের। কদিন যাওয়ার পর মহিলা দলটির সবাইকে ডেকে পাঠাত। একে একে সবাই তার কাছে গিয়ে জমায়েত হতো; একজনও না এসে পারত না। মহিলা তখন তাদেরকে বলত, আমার সাথে তোমাদের কি হয়েছে না- হয়েছে তা তোমরা ভালো করেই জানো। যে সন্তান জন্ম নিয়েছে, হে অমুক, তা তোমারই। সন্তানটির জনক হিসেবে সে যাকে পছন্দ করত তার নাম উল্লেখ করত সেখানে। সন্তানটি তখন থেকেই সে লোকটির পরিচয়ে বড় হতো। চাইলেই লোকটি দায়িত্ব এড়াতে পারত না।
চতুর্থ ধারার বিয়ে ছিল এ রকম: অনেক লোক একসাথে হয়ে কোনো একজন নারীর দরজায় কড়া নাড়ত। সে কাউকেই বাধা দিত না। একে একে সবাই তার সঙ্গে যৌনাচারে লিপ্ত হতো। এমন নারীরা ছিল সমাজের স্বীকৃত বেশ্যাশ্রেণির। খদ্দেরদের আহ্বান করে দরজায় সেঁটে দিত সাইনবোর্ড। যে কারোরই সুযোগ ছিল তাদের সাথে যৌনাচার করার। একসময় এদের কেউ একজন গর্ভবতী হয়ে জন্মদান করত কোনো সন্তানের। অতঃপর একে একে লোকগুলো মহিলার পাশে ভিড় জমাত। তাদের মধ্যে যে চায় তাকে সন্তানটি দিয়ে দেওয়া হতো। তখন থেকে সন্তানটির লালন-পালনের ভার বর্তাত লোকটির ওপর। আর তার সন্তান বলেই লোকজন তাকে সম্বোধন করত। সন্তানটির বাবা হওয়ার দায়িত্বটি কেউই এড়াতে পারত না।
এরপর আল্লাহ মুহাম্মাদ -কে পৃথিবীতে নবি করে পাঠালেন। প্রথম প্রকারের বিয়ে ছাড়া, নবিজি জাহিলি যুগের সব ধরনের বিবাহ-প্রথার মূলোৎপাটন করেন। [৫৪] সায়্যিদা 'আয়িশা উল্লেখ করেননি এমন আরও কিছু বিবাহ-প্রথার কথা অনেক বিজ্ঞ 'আলিমের বর্ণনায় পাওয়া যায়। যেমন: 'নিকাহুল-খাদান'-এতে ইচ্ছে করলে যেকেউ একজন ছেলেবন্ধু কিংবা মেয়েবন্ধু গ্রহণ করতে পারত। এটাকে কোনোভাবেই বিয়ে বলা চলে না, বরং বলা চলে এক ধরনের যিনা-ব্যভিচার ও লাম্পট্য। এর আলোচনা কুরআনে আল্লাহ এভাবে করেছেন:
“সুতরাং তোমরা তাদের মালিকদের অনুমতি নিয়ে তাদেরকে বিয়ে করবে। আর তারা যদি ব্যভিচার না করে বা উপপতি না নিয়ে সচ্চরিত্রের হয়, তবে তাদেরকে ন্যায়সংগতভাবে মোহর দেবে।” [সূরা আন-নিসা, ৪:২৫]
আরবরা বলাবলি করত, এ বিয়ে যদি গোপনীয়তা রক্ষা করে হয়, তা হলে এতে কোনো আপত্তি নেই। তবে প্রকাশ পেয়ে গেলে সেটা নিন্দনীয়। আরও যে সমস্ত বিয়ের চল ছিল তা হলো:
নিকাহুল-মুত'আ: এ বিয়ে হতো কেবল নির্দিষ্ট কিছুদিনের জন্য-এক মাস, দুই মাস, এমনকি এক বছরও হতে পারে এ বিয়ের মেয়াদ। অর্থাৎ বিয়ের উভয় পক্ষ যে কদিনের জন্য চুক্তিবদ্ধ হতো, সে কদিনের জন্য। ইসলামের প্রথম দিকে এ ধারার বিয়ে বৈধ ছিল। পরে সেটা হারাম ঘোষিত হয়। এ ঘোষণা কিয়ামাত পর্যন্ত বলবৎ।
নিকহুল-বাল: জাহিলি যুগে এক ব্যক্তি আরেক ব্যক্তিকে বলত, “তোমার বউকে আমার কাছে পাঠাও, আমি তোমার কাছে আমার বউকে পাঠাচ্ছি। সঙ্গে পাবে উপরি পাওনা।”(৫৫)
নিকাহুশ-শিগার: অবৈধ এ ধারার বিয়েটি ছিল এ রকম—এক ব্যক্তি তার কন্যাকে বিয়ে দিত আরেক ব্যক্তির সঙ্গে; শর্ত একটাই— সেই লোকের মেয়েকেও তার সঙ্গে বিয়ে দিতে হবে। কোনো ধরনের দেনমোহর দেওয়া-নেওয়ার ব্যাপার ছিল না এখানে।[৫৬]
একই সঙ্গে দুই বোন বিয়ে করাকে বৈধ মনে করত ইসলাম-পূর্ব আরব সমাজ। লোকদের সুযোগ ছিল একই সঙ্গে বহুসংখ্যক বিয়ে করার। এমন অনেক লোকই ছিল যারা চারের অধিক বিয়ে করেছিল। [৫৭] ইসলাম আসার পরও দেখা গেল, তাদের কারও কারও দশ কিংবা তারও অধিক স্ত্রী রয়েছে। কারও আবার দশের কম। ইসলাম নিয়ম করে দিল— চারের অধিক নয়। সঙ্গে জুড়ে দিল শর্ত: যদি কেউ তাদের ভরণ-পোষণ না দিতে পারে কিংবা সবার মধ্যে সমতা-বিধান করে চলতে না পারে, তবে তাকে একটা নিয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হবে। স্ত্রীদের মধ্যে সমতা-বিধান করার রীতি জাহিলি যুগে ছিল না। জঘন্য আচরণ করত তারা স্ত্রীদের সাথে, দিত না তাদের প্রাপ্য অধিকার। ইসলামই প্রথম নারীকে দেখাল আশার আলো; ইনসাফপূর্ণ আচরণ করল তার সঙ্গে। পুরুষদেরকে জোর উপদেশ দিল নিজ স্ত্রীর সাথে ভালো আচরণের। আরও আদেশ দিল পুরুষদের প্রতি নারীর অধিকার প্রতিপালনের, সম্পূর্ণরূপে বুঝিয়ে দিতে তার প্রাপ্যটুকু।[৫৮]
তালাক
জাহিলি আরবে ব্যাপকহারে চর্চা হতো তালাকের। একজন স্ত্রীকে ঠিক কয়টা তালাক দেওয়া যাবে এর কোনো সীমারেখা ছিল না তাদের কাছে; স্বামীর মন চাইল তো বউকে তালাক দিল, আবার মন-মরজি ঠিক আছে তো তাকে নিয়ে এল। একটু পর খেয়াল চাপল তো আবার তালাক দিল। মনঃপূত হলো না? ঠিক আছে আবার নিয়ে এল। এভাবেই চলত তাদের তালাক দেওয়া-নেওয়ার খেলা। ইসলাম আসার পরও কিছুদিন এই চর্চা বহাল ছিল।।[৫৯] এরপর কুরআনে এই বিষয়ের সুনির্দিষ্ট বিধান দেওয়া হলো। তখন তারা এমন আচরণ করা থেকে নিবৃত্ত হলো। আল্লাহ বলেন: “তালাক দুবার; এরপর (স্ত্রীকে) হয় যথোচিতভাবে রাখবে, না হয় সদয়ভাবে বিদায় দেবে।” [সূরা বাকারা, ২:২২৯]
ইসলাম এসে তালাক দেওয়ার এই বেপরোয়া গতি থামিয়ে দেয়, নির্ধারণ করে দেয় তালাক দেওয়ার নিয়মনীতি ও সংখ্যা। স্বামীদের সুযোগ দেয় বিষয়টির প্রতিকার করার। বলে দেয়, তালাক দেওয়ার পর দুবার সুযোগ আছে স্ত্রীকে ফিরিয়ে নেওয়ার। যদি স্বামী স্ত্রীকে তিন তালাক দিয়ে দেয়, তবে বৈবাহিক বন্ধন ছিন্ন হবে, যৌন- মেলামেশার বৈধতা তখন থেকেই রহিত হয়ে যাবে; এই মহিলাকে অন্য একজন বিয়ে করে যদি (স্বেচ্ছাপ্রণোদিত হয়ে, কারও চোখ রাঙানির ভয়ে কিংবা কারও দ্বারা প্ররোচিত না হয়ে) তালাক দেয়, তবে আগের স্বামী দ্বিতীয়বার নতুন করে মহিলাকে বিয়ে করে ঘর-সংসার করতে চাইলে সে সুযোগ তার জন্য আছে। আল্লাহ বলেন :
“তারপর স্বামী যদি ওই স্ত্রীকে (তৃতীয়বারের মতো) তালাক দেয়, তবে যে পর্যন্ত না ওই স্ত্রী অন্য স্বামীকে বিবাহ করছে, তার পক্ষে সে বৈধ হবে না। তারপর যদি সে (দ্বিতীয় স্বামী) তাকে তালাক দেয়, তবে তারা পরস্পরের কাছে ফিরে গেলে তাদের কোনো পাপ হবে না; যদি দুজনে ভাবে যে, তারা আল্লাহর বিধান বজায় রেখে চলতে পারবে।” [সূরা বাকারা, ২:২৩০]
তালাকের মতো আরেকটা বিষয় চালু ছিল তদানীন্তন আরব সমাজে। সেটা ছিল যিহার। যিহার বলা হয়: স্বামী তার স্ত্রীকে বলবে, “তুমি আমার কাছে আমার মায়ের পিঠের মতো।”
এমন কথা বলার পর স্ত্রী তার কাছে আর হালাল বলে বিবেচিত হতো না। মনে করত, আজীবনের জন্য স্ত্রীকে ধরা-ছোঁয়া যাবে না। ইসলাম এসে একে আখ্যায়িত করল ঘৃণ্য কথা এবং মিথ্যা বলে। কোনো স্বামী এ ঘৃণ্য কাজ করলে তার ওপর আরোপ করা হবে কাফফারা। (৬০) আল্লাহ বলেন:
“যারা তাদের স্ত্রীদের সঙ্গে যিহার করে ও পরে তাদের উক্তি প্রত্যাহার করে, (অর্থাৎ স্ত্রীর সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করার সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসে) তাদের প্রায়শ্চিত্ত: পরস্পরের সংস্পর্শে আসার আগে (কাফ্ফারাস্বরূপ) একটি দাসের মুক্তি দেওয়া; তোমাদেরকে এ উপদেশই দেওয়া হচ্ছে। তোমরা যা করো, আল্লাহ তার খবর রাখেন। কিন্তু যার এ সামর্থ্য থাকবে না তার প্রায়শ্চিত্ত: যৌন- কামনায় একে অপরকে স্পর্শ করার পূর্বে একটানা দুমাস রোজা রাখা; যে তা করতেও অসমর্থ সে ৬০ জন মিসকিনকে খাওয়াবে। এটা এজন্য যে, তোমরা যেন আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে বিশ্বাস করো। এগুলো আল্লাহর নির্ধারিত শাস্তি। আর কাফিরদের জন্য রয়েছে মর্মন্তুদ শাস্তি।” [সূরা মুজাদালাহ, ৫৮:৩-৪]
যুদ্ধ-বিগ্রহ, চুরি-ডাকাতি, রাহাজানি-হানাহানি ও জবর-দখল
জাহিলি আরবদের যুদ্ধ বাধাতে কিংবা রক্ত ঝরানোর জন্য বড় ধরনের কোনো কারণ লাগত না; তুচ্ছ কোনো কারণে তারা বাধিয়ে দিত যুদ্ধ। সামাজিক ভাবাদর্শ রক্ষার নামে যুদ্ধ বাধাতে, গোত্রের আদর্শ সমুন্নত রাখার নামে মানুষের প্রাণ সংহরণ করতে তাদের মনে কোনো কুণ্ঠাবোধ কাজ করত না। ভেবে দেখত না, যে জন্য তারা যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ছে, সেটা আদৌ যৌক্তিক কি না। জাহিলি আরবদের জীবনপ্রণালি বলতে গিয়ে ইতিহাস আমাদেরকে যা জানাচ্ছে তা এ কথাই প্রমাণ করে যে, তারা বিবেক-বুদ্ধির ধার না ধেরে, নিছক আপন খেয়ালবশে, আবেগতাড়িত হয়ে যুদ্ধে মেতে উঠত। ইসলাম-পূর্ব যুগে এক যুদ্ধবাজ জাতি ছিল আরবরা। সম্ভবত, এমন যুদ্ধংদেহি জাতি হওয়ার জন্য দায়ী তাদের পরিবেশ ও ছেলেবেলার শিক্ষাদীক্ষা。
দুটো উদাহরণ থেকে বোঝা যাবে, আরবরা কতটা যুদ্ধবাজ জাতি ছিল: সে সময়কার এমনই একটি বিখ্যাত যুদ্ধের নাম 'ইয়াওমুল বাসুস'। সংঘটিত হয় বাক্র ও তাগলিব নামের দুটি গোত্রের মধ্যে। আহামরি কোনো কারণ ছিল না যুদ্ধ লাগার পেছনে। যুদ্ধের শুরুটা কীভাবে তা হলে? বাক্স গোত্রে জারমা নামের একজন লোকের একটা উটনী ছিল। জাসসাস ইবনু মুররার খালা বাসূস বিনত মানকায নামের একজন ভদ্রমহিলা ছিল তার প্রতিবেশী। মূলত জারমার উটনীকে নিয়েই এই যুদ্ধ। একদিনের ঘটনা। তাগলিব গোত্রের সর্দার, কুলাইব, তার উট নিয়ে যায় নিজের একটি বিশেষ জায়গায় বেঁধে রাখতে। গিয়ে দেখে, পথ হারিয়ে কোত্থেকে যেন একটা উটনী (জারমার উটনী) তার উটের পালের মধ্যে এসে হাজির। সঙ্গে সঙ্গে সে আঘাত করে বসে অপরিচিত উটনীটিকে। আঘাতে উটনীটি মারা যায়। এ খবর শুনে জারমা ও তার প্রতিবেশী বাসূস ক্রোধে ফেটে পড়ে। বাসূসের ভাগ্নে জাসসাসও ততক্ষণে জেনে যায় খবরটি। হিতাহিত জ্ঞানহারা হয়ে পড়ে সে। জাসসাস একটি বারও ভাবল না যে, বড় আকার ধারণ করার আগেই কুলাইবের কাছে গিয়ে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করা উচিত। কিংবা এ কথা তো অন্ততপক্ষে বলতে পারে যে, উটনীর মূল্য তোমাকে পরিশোধ করতেই হবে। কিন্তু এসব না করে সে যা করল-সোজা গিয়ে কুলাইবকে হত্যা করে বসল। সেই শুরু। যুদ্ধের দামামা বেজে ওঠে। উভয় গোত্র মুখোমুখি হয় রণক্ষেত্রে। টানা দীর্ঘ চল্লিশ বছর চলে যুদ্ধটি।।৬১!
স্রেফ তুচ্ছ ঘটনা নিয়ে যুদ্ধ বাধানোর আরেকটি ঘটনা 'ইয়াওমু দাহিস ওয়া আল-গাবরা'। একটি ঘোড়দৌড়কে কেন্দ্র করে যুদ্ধটি সংঘটিত হয়। দাহিস ও গাবরা দুটি ঘোড়ার নাম; দাহিসের মালিক কইস ইবনু যুহাইর। গাবরার মালিক হুযাইফা ইবনু বাদ্র। একদিন, ঘোড়া দুটির মধ্যে, শুরু হয় দৌড় প্রতিযোগিতা। হুযাইফা ইবনু বাদ্র এক লোককে ইঙ্গিত করে—সে যাতে উপত্যকার এক বাঁকে গিয়ে ওত পেতে থাকে। যদি দেখে, প্রতিযোগিতায় দাহিস এগিয়ে গেছে, তবে সে যেন তাৎক্ষণিকভাবে তার ঘোড়াটির গতিরোধ করে দেয়। হুযাইফার তলপিদার হুকুমটি তামিল করল অক্ষরে অক্ষরে; দাহিসকে আঘাত করে ফেলে দেয়। ফাঁকতালে গাবরার ঘোড়াটি প্রতিযোগিতায় জিতে যায়। হুযাইফার জোচ্চুরির বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর বেজে ওঠে যুদ্ধের দামামা। বদলা নেওয়ার প্রচণ্ড জিদ চেপে বসে কইস ইবনু যুহাইরের মাথায়। 'আবাস ও যুবইয়ান গোত্র দুটি ঝাঁপিয়ে পড়ে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে। ৬৯।
বড় বড় এ দুটি যুদ্ধ ছাড়াও জাহিলি যুগে আরও অনেক যুদ্ধ সংঘটিত হয়। মাদীনার আউস ও খাযরাজ গোত্রের মধ্যে সে সময় সংঘটিত হয় এরকম অনেকগুলো যুদ্ধ। অথচ গোত্র দুটি একে অপরের সঙ্গে রক্তের সম্পর্কে সম্পর্কিত; সবাই হারিসা ইবনু সা'লাবা আল-আযদির বংশধর। সে হিসেবে চাচাতো-জ্যাঠাতো ভাই সবাই। বিখ্যাত 'আরিম বন্যার পর গোত্র দুটি ইয়াসরিবে (যা পরবর্তীকালে 'মাদীনা' নাম ধারণ করে) এসে বসবাস করা শুরু করে। তাদের পরে ইহুদিরাও রোমানদের নির্যাতনের শিকার হয়ে মাদীনায় আবাস গাড়ে।
প্রথম দিকে গোত্রগুলো মিলেমিশে শান্তিপূর্ণভাবেই বসবাস করতে থাকে; সংঘাত-সংহার, যুদ্ধ-বিগ্রহ কিছুই ছিল না। আস্তে আস্তে যুদ্ধ শান্তির জায়গা দখলে নিয়ে নেয়। ইসলাম আসার আগপর্যন্ত এভাবে নিজেদের মধ্যে যুদ্ধ লেগেই থাকত তাদের। ইহুদিরা নিজেদের ফায়দা লোটার জন্য একবার এ গোত্রের সঙ্গে তো আরেকবার ওই গোত্রের সঙ্গে মিত্রচুক্তিতে আবদ্ধ হতো। এক গোত্রের ভালো চায় বলে তাদেরকে টাকা-পয়সা দিয়ে, রণ-সরঞ্জাম দিয়ে অপর গোত্রের বিরুদ্ধে লাগিয়ে দিত যুদ্ধ। অন্যদিকে, অপর গোত্রের কাছে গিয়ে প্রমাণ করে, আমরা তোমাদের কল্যাণকামী। যুদ্ধ করতে তোমাদের যা যা প্রয়োজন, যত টাকা-পয়সা দরকার, সব আমরা দেবো; ওদেরকে ছেড়ে কথা বলা যাবে না। এগুলো করার পেছনে ইহুদিদের উদ্দেশ্য স্বীয় স্বার্থ চরিতার্থ করা বই কিছু নয়। আউস ও খাযরাজের শক্তি খর্ব করে, মাদীনার আধিপত্য একচ্ছত্রভাবে নিজেদের হাতে নেওয়াই ছিল তাদের লক্ষ্য।
আউস ও খাযরাজ গোত্রের মধ্যে সংঘটিত শেষ যুদ্ধ 'বু'আস যুদ্ধের' আগপর্যন্ত অনেক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ হয় তাদের মধ্যে। এভাবেই আউস ও খাযরাজদের মধ্যে সংঘটিত বহু যুদ্ধে ইন্ধন জোগাচ্ছিল ইহুদিরা। বছরের পর বছর যুদ্ধ বাধিয়ে রেখে গোত্রদুটিকে তারা নিঃশেষ করে ছাড়ে। প্রত্যেক গোত্র অপর গোত্রের বিরুদ্ধে নিজেদের মিত্র গোত্রগুলোর সাহায্য-সহযোগিতা নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ত হিংস্রভাবে। শেষ পর্যন্ত যুদ্ধের পরিসমাপ্তি ঘটে আউস গোত্র শান্তির পক্ষে, কল্যাণের পক্ষে অবস্থান নেওয়ার কারণে।।৬৩।
সে সময় কিছু গোত্র ছিল যারা যুদ্ধ-বিগ্রহ করত না; তবে চুরি-ডাকাতি, রাহাজানি-হানাহানি, লুণ্ঠন-ছিনতাই, স্বাধীন মানুষদের ধরে নিয়ে বন্দি করে দাস হিসেবে বিক্রি করাসহ নানা অপকর্ম করে বেড়াত। প্রসিদ্ধ কিছু সাহাবিকে, তখনও তারা ইসলাম গ্রহণ করেননি, এই গোত্রগুলো তাদেরকে ধরে বন্দি করে নিয়ে দাস বানিয়ে রাখে। উল্লেখযোগ্য এমন দুজনের একজন হলেন যাইদ ইবনু হারিসা; তিনি আরবের একজন মানুষ ছিলেন। অন্যজন সালমান ফারসি; তিনি পারস্যের একজন স্বাধীন মানুষ ছিলেন। এমন আরও অনেক স্বাধীন লোককে ধরে ধরে নিয়ে গিয়ে তারা হাটে-বাজারে বিক্রি করে দিত।
ইসলাম এসে এই নৈরাজ্যের অবসান ঘটায়। নিশ্চিত করে সবার অবাধ নিরাপত্তার; এমন নিরাপত্তা, যার ছায়াতলে একজন নারীও সান'আ থেকে হাদরামাওত পর্যন্ত সফর করতে পারত নির্বিঘ্নে। এ দীর্ঘ সফরে কোনো মানুষ তাদের ক্ষতি করবে-এমন কোনো ভয় তাদের মনে কাজ করত না। আল্লাহকে ছাড়া এই সময়ে আর কিছুরই ভয় করেনি তারা।।৬৪।
আরবদের সাক্ষরতা
সমকালীন আহলুল-কিতাব, ইহুদি ও খিষ্টানদের মতো আরবরা পড়ালেখা জানত না। মূর্খতা, নিরক্ষরতা তাদের মাঝে ছেয়ে গিয়েছিল ব্যাপক হারে। বাপ-দাদাদের অন্ধ অনুকরণ এবং প্রাচীন ধ্যান-ধারণা পোষণে- সেগুলো যতই অযৌক্তিক হোক—তাতে তারা ছিল অনড়। এক কথায়, তারা ছিল অজ্ঞ এক জাতি; লিখতে, পড়তে হিসাব- নিকাশ করতে জানত না। মোটামুটি সবাই এমন ছিল। হাতেগোনা দু-একজন ছিলেন যারা লিখতে পড়তে পারতেন। তবে, নিরক্ষরতা ও জ্ঞানের স্বল্পতা থাকা সত্ত্বেও তাদের প্রচণ্ড মেধাশক্তি, বুদ্ধিমত্তা, প্রত্যুৎপন্নমতিত্ব, কোমল অনুভূতি, সুতীক্ষ্ণ দৃষ্টি, মননশীলতা, অজানাকে জানার উদ্গ্রীব বাসনা, উপলব্ধি করতে পারলে সত্যকে মেনে নেওয়ার সৎসাহস-এমন বহু ব্যক্তিত্বপূর্ণ মহৎ গুণের জন্য তারা ছিলেন জগদ্বিখ্যাত。
যখন আরব উপদ্বীপে আগমন ঘটল ইসলামের, তারা একেকজন হয়ে উঠলেন বিদ্বান, প্রাজ্ঞ, ফকীহ। নিরক্ষরতা আর রইল পণ্ডিত। জ্ঞান-বিজ্ঞান হয়ে উঠল তাদের পরিচয়ের প্রতিশব্দ; কেউ কেউ মুনশিয়ানা দেখালেন ছন্দশাস্ত্রে। কেউ-বা নাম কুড়ালেন চিকিৎসক হিসেবে। তৎকালীন আরবের এমন একজন বিখ্যাত চিকিৎসকের নাম হারিস ইবনু কালাদা। কোনো কুসংস্কারের বিশ্বাসে নয়, জীবন ও পরিবেশ- প্রতিবেশ থেকে অর্জিত অভিজ্ঞতা-নির্ভর ছিল তার চিকিৎসা সেবা।[৬৫]
টিকাঃ
৪৯. রাসূল মুহাম্মাদ -এর ব্যক্তিত্ব: একটি বিশ্লেষণ, পৃ. ২২-২৪।
৫০. তাফসীর আল-কুরতুবি, ৫/৪৫।
৫১. দেখুন: রাসূল মুহাম্মাদ -এর ব্যক্তিত্ব: একটি বিশ্লেষণ, পৃ. ২৫, ২৬।
৫২. দেখুন: আবু শাহবা, আস-সীরাহ আন-নাবাওয়িয়া, পৃ. ১/৯২।
৫৩. দেখুন: আবু শাহবা, আস-সীরাহ আন-নাবাওয়িয়া, পৃ. ১/৮৮।
৫৪. সহীহ বুখারি, কিতাবুন-নিকাহ, পরিচ্ছেদ: যারা বলে, কোনো অভিভাবকের অনুমতি ছাড়া কোনো বিবাহ নেই, হাদীস নং ৫১২৭।
৫৫. ফাতহুল-বারি, ৯/১৫০, ইবনু হাজার আদ-দার কুতনি থেকে, তিনি আবার আবু হুরাইরা থেকে বর্ণনা করেন। বিস্তারিত জানার জন্য দেখা যেতে পারে।
৫৬. দেখুন: আবু শাহবা, আস-সীরাহ আন-নাবাওয়িয়া, ১/৯০।
৫৭. দেখুন: রাসূল মুহাম্মাদ -এর ব্যক্তিত্ব: একটি বিশ্লেষণ, পৃ. ২৫।
৫৮. দেখুন: আবু শাহবা, আস-সীরাহ আন-নাবাওয়িয়া, ১/৮৮।
৫৯. রাসূল মুহাম্মাদ -এর ব্যক্তিত্ব: একটি বিশ্লেষণ, পৃ. ২৫।
৬০. দেখুন: আবু শাহমাহ, আস-সীরাহ আন-নাবাওয়িয়া, ১/১/৯১।
৬১. ইবনুল-আসীর, আল-কামিল ফী আত-তারীখ, ১/৩১২।
৬২. প্রাগুক্ত, ১/৩৪৩।
৬৩. ড. 'আবদুল-আযীয আল-হামীদি, আত-তারীখ আল-ইসলামি, ১/৫৫।
৬৪. দেখুন: আবু শাহবা, আস-সীরাহ আন-নাবাওয়িয়া, ১/৯৩।
৬৫. প্রাগুক্ত, ১/৯৩।
📄 চারিত্রিক অবস্থান ও নৈতিকতা
চারিত্রিক ও নৈতিকতার বিচারে জাহিলি আরবদের চরম অবনতি ঘটে। মদ্যপান এবং জুয়া খেলায় তাদের আসক্তি চরমে ওঠে। ছিনতাই, বাণিজ্য-কাফেলা লুণ্ঠন, সাম্প্রদায়িকতা ও নির্যাতন, খুনোখুনি, প্রতিশোধ-স্পৃহা, অবৈধভাবে অন্যের সম্পদ লুট, এতিমের সম্পদ ভক্ষণ, সুদি-কারবার, চুরি-ডাকাতি, যিনা-ব্যভিচার ইত্যাদির চর্চা ছিল নিত্যদিন। এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে যে, যিনা-ব্যভিচারের চর্চা বেশি ছিল দাসী, দেহপসারিণী ও বারবণিতাদের মধ্যে। তবে স্বাধীন নারীরাও কদাচিৎ এমন নিম্নরুচির কাজে জড়িত হতো। স্বাধীন নারীদের এমন পাপাচারে জড়িত হওয়ার সবচেয়ে বড় প্রমাণ হলো একটি বাই'আত-মাক্কা বিজয়ের পর রাসূল ﷺ নারীদের থেকে এ মর্মে বাই'আত গ্রহণ করেন যে, “তারা আল্লাহর সঙ্গে কোনো কিছুর শরিক করবে না, চুরি করবে না এবং যিনা- ব্যভিচারে লিপ্ত হবে না।” নবিজির এ কথা শুনে সাইয়্যিদা হিন্দ বিনতে 'উতবা, আবু সুফিয়ানের স্ত্রীর অবাক প্রশ্ন-“স্বাধীন মহিলারাও ব্যভিচারে লিপ্ত হতে পারে নাকি?” [৬৬]
তবে সবাই যে এই অনাচারে নিমজ্জিত ছিল ব্যাপারটি আদৌ সে রকম নয়; তাদের অনেকেই ছিল যারা যিনা-ব্যভিচার করত না, মদ খাওয়া দূরে থাক, ছুঁয়েও দেখত না। খুনোখুনি করত না, কারও ওপর জুলুম-নির্যাতন চালাত না। ছিল না এতিমের মাল ভক্ষণের বিন্দুমাত্র আগ্রহ। রুটি-রুজির ব্যাপারে তাদের নির্ভরতা ছিল না সুদি-কারবারে।।৬৭] এমন আরও বহু ভালো গুণের দেখা পাওয়া যেত তাদের মধ্যে, যা পরবর্তী সময়ে তাদেরকে প্রস্তুত করেছিল ইসলামের ঝান্ডা বহন করতে। এমনই কিছু গুণের সঙ্গে পরিচিত হওয়া যাক :
ধীশক্তি ও বিচক্ষণতা
জাহিলি আরবদের অন্তর ছিল নির্মল, নিষ্কলুষ। সংস্কার কঠিনসাধ্য হবে এমন কোনো ফিলোসফি-দর্শন, পৌত্তলিক-কাহিনি কিংবা খুরাফাত-কুসংস্কার তাদের নির্মল মনন- জগৎকে খুব বেশি উলট-পালট করে দিতে পারেনি। তবে তাদের সমসাময়িক হিন্দু, রোমান, গ্রীক ও পারসিক জাতির মন-মগজ এমনতর নির্মল ছিল না; তারা প্রতিনিয়ত নতুন ও জটিল ধরনের নানা রকম দর্শন আওড়াত। আরবদের এমন নির্মল মন কেমন যেন প্রস্তুত হয়েছিল পৃথিবীর সবচেয়ে মহান মিশন ইসলামের দা'ওয়াতের পতাকা বহনের দায়িত্বভার নিতে।
তৎকালীন জমানার সবচেয়ে মুখস্থশক্তিসম্পন্ন জাতি হিসেবে আরবদের সুনাম ছিল মানুষের মুখে মুখে। ইসলাম তাদের এই স্বভাবজাত মুখস্থশক্তি, তাদের ধীশক্তিকে ইসলাম রক্ষার কাজে লাগায়। তাদের চিন্তাশক্তি, সত্যকে গ্রহণ করার সহজাত গুণ ইত্যাদি তাদের মধ্যে বিদ্যমান ছিল পুরোমাত্রায়। কাল্পনিক ফিলোসফি, মনগড়া কথাবার্তা, নিষ্ফল ও অকেজো বাইজেন্টাইন বাকবিতণ্ডা এবং যুক্তি-তর্কের জটিল জটিল মারপ্যাঁচ তাদের এমন ভালো গুণের গায়ে আঁচড় বসাতে পারেনি সামান্যতম।।৬৮]
তাদের ভাষা
আরবি ব্যাপক-বিস্তৃত একটি ভাষা; প্রচুর সমার্থক শব্দবহুল। পৃথিবীর আর যেকোনো ভাষাতেই এমন সমাহার বিরল। মধুর আরবি 'আসাল'-এর রয়েছে আশিটি সমার্থক শব্দ। শিয়ালের আরবি 'সা'লাব'-এর রয়েছে দুইশো প্রতিশব্দ। সিংহের আরবি 'আসাদ' এর রয়েছে পাঁচশো প্রতিশব্দ। 'জামাল' বা উটের জন্য আছে এক হাজার শব্দ। তরবারি এবং ধূর্তামি বা ক্ষিপ্রতা বোঝানোর জন্য আছে চার হাজার শব্দ। কোনো সন্দেহ নেই-এতগুলো নাম মুখস্থ করা চাট্টিখানি কথা নয়; এর জন্য চাই প্রচণ্ড মুখস্থশক্তি ও তীক্ষ্ণ স্মরণশক্তি।।৬৯]
তাদের ধীশক্তি, তাদের বিচক্ষণতা এমন এক পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছেছিল যে, কোনো একটি বাক্য, কোনো একটি টেক্সট পুরোপুরি বলার আগেই তারা বুঝে ফেলত বাক্যটি কী বোঝাতে চাচ্ছে। ইতিহাসে এমন উদাহরণ ভূরি ভূরি।[৭০]
বদান্যতা
বদান্যতা, মহানুভবতার গুণের চর্চা ছিল আরবদের মজ্জাগত। হয়তো দেখা গেল, এক ব্যক্তির বাড়িতে মেহমান এসে হাজির। তার নিকট একটি ঘোড়া কিংবা একটি উট ছাড়া মেহমানদারি করার মতো আর কিছুই নেই। সে দ্বিতীয়বার চিন্তা না করে তার পোষা সেই ঘোড়া কিংবা উটটিকে জবাই করে দেবে। এমন লোকও ছিল আরবে যারা কেবল মানুষকেই খাওয়াত না, বরং জীব-জন্তু, পশু-পাখিদের খাওয়ানোরও জোগাড়-যন্ত্র করত। দাতা হাতেম তা'ইয়ের কথা কে না জানে! প্রবাদে পরিণত হয়েছে তার বদান্যতার খ্যাতি। আজও কেউ বদান্যতার পরিচয় দিলে লোকে তাকে 'হাতেম তা'ই' বলে ডাকে।[৭১]
বীরত্ব ও নির্ভীকতা
রণপ্রান্তরে জীবন উৎসর্গ করতে পারাকে আরবরা দেখত সম্মানের চোখে। বিছানায় শুয়ে শুয়ে আরামে মারা যাওয়াকে তারা দেখত নিন্দার চোখে। একদিন এক ব্যক্তি তার ভাইয়ের মৃত্যুসংবাদ শুনল। কোনো প্রকার ভাবিত না হয়ে সে বলল, সে যদি যুদ্ধের ময়দানে মারা গিয়েই থাকে, তবে এতে অবাক হওয়ার আর কীই-বা আছে? সে-ই প্রথম না; তার বাবা, ভাই এবং চাচাও লড়াই করতে গিয়েই মারা গেছেন। নিশ্চয়ই, আল্লাহর কসম! আমরা স্বাভাবিক মৃত্যুবরণ করি না। হয় বর্শার তীক্ষ্ণ ফলার আঘাতে আমরা জর্জরিত হব, কিংবা আমাদের মরণ ঘাপটি মেরে বসে আছে তরবারির ছায়াতলে।
মান-সম্মানের প্রশ্নে আরবদের নীতি ছিল-'যায় যাক জান, তবু দিব না মান'। ইজ্জত, মর্যাদা এবং আপন স্ত্রীর ইজ্জত-আব্রু রক্ষায় তারা জান পর্যন্ত বাজি রাখতে পারত। তবুও সম্মানহানি হতে দিত না।
জাহিলি আরব কবি 'আনতারা মান-সম্মানের একটি চিত্র এঁকেছেন তার কয়েকটি পঙ্ক্তিতে। তিনি বলেন: দাসত্ব জীবনের পেয়ালা পান করায়ো না মোরে আপত্তি নাই দাও যদি সম্মানের হেমলক ভরে। অপমানের জীবন নয় তো জীবন- এ তো এক নরক, সম্মানের জীবন হোক না কষ্টের- সে-ই তো মোর সড়ক।।৭২।
আত্মসম্মানবোধ ও মানবদরদ
জাহিলি আরবদের সহজাত গুণ। বলবানের হাতে দুর্বল, অক্ষম, নারী ও বৃদ্ধের মার খাওয়াকে তারা প্রচণ্ড ঘৃণা করত। প্রাণভয়ে কোনো লোক তাদের নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করলে তারা আশ্রয় দিত। এই আশ্রয় দেওয়াটাকে তারা তাদের পরম কর্তব্য বলে জ্ঞান করত。
স্বাধীনচেতা শৃঙ্খলহীনতা, বন্ধনমুক্তি, স্বাধীনতার জন্য ভালোবাসা আরবদের জন্মগত। স্বাধীনতার জন্য তারা বাঁচত; এর কারণে তারা মরত। জাহিলি আরবদের বেড়ে ওঠা এমন এক মুক্ত পরিবেশে, শৃঙ্খলহীনভাবে, যেখানে কারো কর্তৃত্ব চলে না। লাঞ্ছিত হয়ে, অপমান সহ্য করে, কারো অনুগ্রহভাজন হয়ে, মান-সম্মান খুইয়ে, ইজ্জত-আব্রু বিসর্জন দিয়ে বেঁচে থাকাকে তারা কোনোভাবেই মেনে নিত না। তাকে অপমান করার ধৃষ্টতা কেউ যদি দেখাত, তা হলে তার নিস্তার ছিল না; তাকে খুন করতে সে দ্বিতীয়বার আর চিন্তা করত না। আবার স্বাধীনতা রক্ষার জন্য জীবন দিতেও তারা দ্বিধা করত না।।৭৩] তাদের স্বাধীনতা রক্ষার কিছু উদাহরণ শোনা যাক।
একদিনের ঘটনা। হিরা রাজ্যের শাসক 'আম্র ইবনু হিন্দ তার সভাসদদের নিয়ে আড্ডা দিচ্ছিলেন। এমন সময় সভাসদদের তিনি প্রশ্ন করেন, “আচ্ছা, তোমরা কি এমন কোনো আরবের কথা জানো, যার মা আমার মায়ের সেবাদাসী হতে নাক সিটকায়?”
তারা বলে, “হ্যাঁ, আমরা চিনি। তিনি হলেন সা'লুক বা হতদরিদ্র কবি 'আমর ইবনু কুলসুমের মা।”
শাসক কবি 'আমর ইবনু কুলসুমকে তার সঙ্গে এবং তার মাকে নিজের মায়ের সাথে দেখা করার জন্য ডেকে পাঠান। নিজ মায়ের সঙ্গে শলাপরামর্শ করে শাসক কবি ও কবির মায়ের জন্য আয়োজন করেন ভোজসভার। নির্ধারিত একটি পাত্রের খাবারে বিষ মিশিয়ে রাখা হয়। সবাই খাবার টেবিলে উপস্থিত। শাসকের মা কবির মাকে স্বাগত জানায়, “আসুন। বসুন। আপনার সামনের ডিশ থেকে খাবার গ্রহণ করুন।” তখন কবির মা তাকে বলে, “প্রয়োজনের তাগিদেই মানুষ আপন পথ খুঁজে নেয়।”
কিন্তু শাসকের মা এত সহজেই দমবার পাত্র নয়। বিষমিশ্রিত পাত্রের দিকে ইঙ্গিত করে সে বারবার কবির মাকে তাড়া দিতে থাকে। ত্যক্ত-বিরক্ত হয়ে কবির মা লাইলা চিৎকার চেঁচামেচি জুড়ে দেয়- “তাগলিব গোত্র আজ কোথায়! তাদের আজ লাঞ্ছনার দিন।”
কাছে-ধারেই ছিল কবি। মায়ের আওয়াজ শুনেই সে বুঝে ফেলে কী হতে চলেছে। জিদ চেপে যায় তার মাথায়। দেখে হলঘরে ঝুলে আছে শাসকের একটি তরবারি। হাতে নিয়ে দৌড়ে গিয়ে ঢুকে সেখানে। সোজা গিয়ে আঘাত হানে শাসক 'আম্র ইবনু হিন্দের মাথায়। খবরটি রাষ্ট্র হয়ে যায় অতি দ্রুত। তাগলিব বেঁধে ফেলে কবিতার লাইন।
সত্যনিষ্ঠা, প্রতিশ্রুতি রক্ষা ও সততার জন্য ভালোবাসা
আরবরা সাধারণত নিজেদের জীবনে মিথ্যার চর্চা করত না। মিথ্যা বলাকে তারা মনে-প্রাণে ঘৃণা করত। প্রতিশ্রুতি রক্ষায় তাদের জুড়ি মেলা ভার। মুখে এক কথা, অন্তরে আরেক কথা-এমন নীতি-দর্শন ছিল না তাদের। এজন্যই আমরা দেখি, ইসলামে প্রবেশের জন্য তাদের মুখে শাহাদাতের উচ্চারণই ছিল যথেষ্ট।
মিথ্যা বলাকে আরবরা কতটা যে ঘৃণা করত, তার একটা চিত্র আমরা এখন দেখব। ঘটনাটি আবু সুফিয়ানের; তখনও তিনি ইসলাম গ্রহণ করেননি, বরং ইসলামের প্রথম সারির একজন শত্রু। মুসলিমদের সঙ্গে তখনও পর্যন্ত তাদের যুদ্ধ চলছিল। একবার বাণিজ্য-কাফেলা নিয়ে তিনি রোমে যাত্রা করেন। রোম-সম্রাট হিরাক্লিয়াস তাকে রাসূলুল্লাহ সম্পর্কে জানতে চেয়ে বেশকিছু প্রশ্ন করেন। সম্রাটের প্রশ্নের উত্তরে মিথ্যার আশ্রয় নেননি আবু সুফিয়ান একবারও। তিনি বলেন: “যদি এই আশঙ্কা না থাকত যে, লোকে আমাকে মিথ্যাবাদী বলবে, তবে আমি তাঁর ব্যাপারে মিথ্যা বলতাম।” (৭৪)
এবার আসা যাক জাহিলি আরবদের প্রতিশ্রুতি রক্ষার কথায়। প্রতিশ্রুতি রক্ষা করার গুণটি আরবদের স্বভাবজাত একটি বিষয়। কদাচিৎ তারা এ মহৎ গুণটি রক্ষার বিষয়ে ভুল করেছে। তবে মাঝেমধ্যে তারা প্রতিশ্রুতি রক্ষার নামে বাড়াবাড়ি পর্যন্ত করে ফেলত; দরকার নেই বা এ প্রতিশ্রুতি রক্ষাটা দাঁড়িয়ে আছে পুরোপুরি মিথ্যার ওপর ভিত্তি করে—এমন বিষয়েও তারা প্রতিশ্রুতি রক্ষার নজির রেখেছে।
এরপর ইসলাম এল। প্রতিশ্রুতি রক্ষার যথোচিত দিকনির্দেশ করল তাদেরকে। বলে দিল কোথায় প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে হবে, আর কোথায় করতে হবে না। কোনো ব্যক্তির যতই জৌলুস থাক কিংবা লোকটি তাদের কারও নিকটাত্মীয় হোক বা বন্ধু; সে যদি অপরাধী হয়, তবে ইসলাম এমন পাপীকে সমর্থন করার ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। আবার ইসলাম ওই ব্যক্তির সঙ্গেও অনমনীয় আচরণ করেছে, যে লোক কোনো মুহদিসকে (সাওয়াবের অভিপ্রায় নিয়ে যে ব্যক্তি দীনের মধ্যে দীনের নাম করে নতুন কিছু আবিষ্কার এবং তা সম্পাদন করে) আশ্রয়-প্রশ্রয় দিত ও সাহায্য-সমর্থন করত। রাসূল বলেন, “যে ব্যক্তি কোনো মুহদিসকে আশ্রয় দিল, তার ওপর আল্লাহর অভিশাপ।”(৭৫)
জাহিলি আরবদের প্রতিশ্রুতি রক্ষার কিছু প্রামাণিক ঘটনা(৭৬)
“হারিস ইবনু 'ইবাদ তাগলিব গোত্রের বিরুদ্ধে এক যুদ্ধে বাক্স গোত্রগুলোকে নেতৃত্ব দেয়; তাগলিব গোত্রের নেতা মুহালহাল বাসূস যুদ্ধে হারিসের ছেলেকে হত্যা করে। গোত্রে গোত্রে যুদ্ধ লাগলেও হারিসের মনে কিন্তু ছেলে হত্যার প্রতিশোধস্পৃহা কাজ করছিল। সে সুযোগ খুঁজছিল, মুহালহালকে বাগে পেলে তার ছেলেহত্যার প্রতিশোধ নেবে। যুদ্ধের এক পর্যায়ে হারিস মুহালহালকে বন্দি করে। মজার ব্যাপার হলো-বন্দি কী হবে, হারিস কিন্তু মুহালহালকে চিনে উঠতে পারেনি একটুও। হারিস বন্দিকে বলল, “তুমি যদি আমাকে মুহালহাল ইবনু রাবি'আর সন্ধান দিতে পারো, তবে আমি তোমাকে মুক্ত করে দেবো।”
মুহালহাল তাকে বলল, “ঠিক বলছ তো? যদি আমি তোমাকে মুহালহালের খোঁজ ঠিক ঠিক দিতে পারি, তা হলে আমাকে ছেড়ে দেবে!” হারিস বলল, "হ্যাঁ, অবশ্যই। কথা যখন দিয়েছি, তখন এর নড়চড় হবে না।
মুহালহাল বলল, “তুমি যাকে খুঁজছ, আমিই সেই মুহালহাল ইবনু রাবি'আ। কোনোরূপ দ্বিধা ছাড়াই হারিস মুহালহালকে বন্দি দশা থেকে মুক্ত করে দেয়। প্রতিশ্রুতি রক্ষার পুরুষোচিত এমন নজির খুবই বিরল।” [৭৭] আরেকটি উদাহরণ।
পারস্য সম্রাট খসরু একবার নু'মান ইবনু মুনযিরের কন্যাক বিয়ে করার প্রস্তাব পাঠায়। কিন্তু নু'মান সবিনয়ে তা প্রত্যাখ্যান করে। সেদিন থেকে নু'মান ভয়ে অস্থির; খসরুর হাতে নিজের প্রাণ যাওয়ার আশঙ্কা পেয়ে বসে তাকে। টিকতে না পেরে শেষ পর্যন্ত সমুদয় সম্পত্তি, অস্ত্রশস্ত্র ও নিজের স্ত্রীকে হানি ইবনু মাস'ঊদ আশ-শাইবানির জিম্মায় রেখে নু'মান খসরুর সঙ্গে দেখা করতে যাত্রা করে। খসরু তার সঙ্গে রূঢ় আচরণ করে এবং তাকে পাকড়াও করে। এরপর নু'মানের সয়-সম্পত্তি চেয়ে খসরু হানিকে তলব করে। হানি খসরুর এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে সরাসরি। রেগেমেগে খসরু হানিকে মারার জন্য সৈন্য পাঠায়। খবর পেয়ে হানি নিজ গোত্র বাক্সকে জমায়েত করে জ্বালাময়ী এক ভাষণ দেয়। সে বলে:
“হে বাক্স সম্প্রদায়! যুদ্ধের ময়দান থেকে মৃত্যুভয়ে পালিয়ে যাওয়া কাপুরুষতার পরিচয়। পালিয়ে না গিয়ে বীর-বিক্রমে লড়াই করতে করতে যে নিহত হয় সে-ই উত্তম। মনে রাখবে, সতর্কতা কখনোই তোমাকে বাঁচাতে পারবে না। জানোই তো, কপালের লিখন না যায় খণ্ডন। বিজয়ের জন্য চাই পাহাড়সম ধৈর্য; সবুরেই মেওয়া ফলে। আমরা মরতে রাজি; অপমানিতের শতায়ুর চেয়ে আমরা সিংহের মতো একদিন বাঁচতে চাই। পালিয়ে বাঁচার চেয়ে কণ্ঠনালীতে একটা আঘাত এসে আমার মরণ হবে তাও ভালো। আমরা যখন মরতে শিখেছি, আমাদেরকে দমাতে পারে কে এমন আছে? হে আমার জাতি, লড়াই করো, যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ো। রণে ভঙ্গ দিয়ো না। মৃত্যু আসা পর্যন্ত লড়তেই থাকো।” [৭৮]
তার ভাষণে প্রদৃপ্ত হয়ে বাক্স গোত্র পারস্য বাহিনীকে যূ-কার যুদ্ধে পর্যদুস্ত করে ছাড়ে। তৎকালীন যুগের এক পরাশক্তি পারস্যের বিশাল বাহিনীকে কেবল একটি গোত্রীয় বাহিনী নিয়ে হারানোটা চাট্টিখানি কথা ছিল না। এমনটা সম্ভব হয়েছে শুধুমাত্র হানির দৃঢ়চেতা ব্যক্তিত্বের কারণে; সে যে কারও বশ্যতাকে স্বীকার করে নিয়ে বেঁচে থাকাকে মনে করত চরম লাঞ্ছনার বিষয় বলে। প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে গিয়ে মরণকে বরণ করে নিতে পর্যন্ত সে কুণ্ঠাবোধ করেনি।
কষ্ট-সহিষ্ণুতা ও অল্পে তুষ্টি
আরবদের একটা রীতি ছিল- কম খেত তারা। খাবার শেষ করেই তারা বলে উঠত,
করো যদি উদরপূর্তি কমে যাবে তোমার বুদ্ধি।
অতিভোজী পেটুকদেরকে জাহিলি আরবরা ভালো চোখে দেখত না; দেখত অবজ্ঞাভরে। এক আরব কবি বলেন : "কষ্টে হা-হুতাশ না করা, বিপদাপদে ধৈর্যধারণ করার এক অত্যাশ্চর্য শক্তি ছিল আরবদের। তাদের এমন শক্তি থাকবেই-বা না কেন; শুষ্ক মরুভূমিতে বেড়ে ওঠার কারণে এমন শক্তি তাদের জন্মগত। চোখ জুড়ানোর মতো শস্য-শ্যামল নয়নাভিরাম দৃশ্যের অপ্রতুলতা, পানির অভাব তাদেরকে পদে পদে বাধ্য করেছে কষ্ট সহিষ্ণু হতে। দুর্গম, এবড়োখেবড়ো পাহাড়ে তৈরি করে নিয়েছে নিজেদের চলার পথ। দুপুরের তপ্ত রোদ মাথায় নিয়ে আর তপ্ত বালুরাশি পদতলে নিয়ে হেঁটে গেছে আপন গন্তব্যে। শীত, গ্রীষ্ম, গিরিপথ, পথের দূরত্ব, ক্ষুৎপিপাসা কোনো কিছুই তাদের জীবনযাত্রার গতিকে রোধ করতে পারেনি। এরাই যখন ইসলামের সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে ইসলাম গ্রহণ করে তখন তারা ধৈর্যে, সহিষ্ণুতায় এক অনন্য নজির স্থাপন করে। ছিল না খাই খাই স্বভাব; তারা অল্পেই তুষ্ট থাকত। তাদের কেউ একজন মাত্র অল্প কটা খেজুর খেয়ে বেঁচে থাকত অনেক দিন, ভেজাত সামান্য ক-ফোঁটা পানি দিয়ে নিজের তপ্ত কলিজা।[৭৯]
ক্ষমাশীলতা ও প্রতিবেশীর সুরক্ষা দান
মানসিক দৃঢ়তার পাশাপাশি শারীরিক শক্তির জন্যও আরবরা সুপরিচিত। এ মানসিক দৃঢ়তা ও শারীরিক শক্তির মিশেল যাদের মধ্যে ঘটবে, তাদের শক্তি যে বেড়ে যাবে বহুগুণে তা বলাই বাহুল্য। হ্যাঁ, এমনই ঘটেছিল আরবরা যখন ইসলাম গ্রহণ করে। জাহিলি আরবরা শত্রুকে হাতের নাগালে পেয়েও হত্যা না করে তাকে ছেড়ে দিয়েছে, এমন অনেক নজির আছে। সুযোগ থাকা সত্ত্বেও অনেক সময় শত্রুর প্রতি দয়ালু হয়ে ক্ষমা করে দিয়েছে, সুযোগ দিয়েছে চলে যাওয়ার জন্য। আহতকে তারা বাগে পেয়েও পালটা আঘাতে জর্জরিত করেনি।
জাহিলি আরবরা প্রতিবেশীর অধিকার প্রদানেও ছিল সচেষ্ট। বিশেষত নারীদের হেফাজতে তারা থাকত সজাগ।
বিপদে পড়ে, নিরুপায় হয়ে কোনো লোক তাদের কাছে আশ্রয় চাইলে তারা তাকে নিরাশ করত না, আশ্রয় দিত। অনেক সময় এমনও হতো যে, আশ্রিত ব্যক্তির সুরক্ষায় তারা তাদের নিজের কিংবা ছেলের জীবন ও অর্জিত ধন-সম্পদ উৎসর্গ করতেও কার্পণ্য করত না।
এমন চারিত্রিক সুষমা ও মানবিক মহৎ গুণ মানুষের মনে আরবদেরকে উঁচু মর্যাদার আসনে বসিয়েছিল। ইসলাম এসে একে আরও উন্নীত করে, শক্তিশালী করে; নিয়োজিত করে কল্যাণ ও সত্যের কাজে। ইসলাম তাদের কর্মকাণ্ডকে জান্নাতি দূত মালাইকাদের চেয়ে উত্তম করে গড়ে তোলে। বিজয়ের ঝান্ডা নিয়ে ছড়িয়ে পড়েন তারা পৃথিবীর দিদিগন্তে। যেখানে একসময় চর্চা হতো কুফরির, অন্ধকারের, সেখানটা আজ ভরে উঠল ঈমান ও আলোতে। জুলুম-নির্যাতনে নিষ্পেষিত মানুষদেরকে তারা শোনালেন ইনসাফের কথা। সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঘাপটি মেরে থাকা অশালীনতা আর বেলেল্লাপনাকে ঝেটিয়ে বিদায় করে ঢেকে দিলেন শালীনতার পর্দায়। অকল্যাণ, অমঙ্গলের স্রোতের বিপরীতে দাঁড়িয়ে তারা মানবতাকে দেখালেন সত্য ও কল্যাণের দিশা।।৮০।
জাহিলি আরব সমাজের নৈতিকতার কিছু নমুনা মাত্র ছিল এগুলো। একজন আরব এমন ভালো ভালো সব গুণ নিয়েই বেড়ে উঠত। সমসাময়িক বিশ্বের আর কোনো সমাজে একসঙ্গে এমন সব মহৎগুণের সমাহার ছিল বিরল। নবিজিকে রাসূল করে পাঠানোর জন্য আল্লাহ বেছে নিলেন এ আরব সমাজকেই। তাঁকে বেছে নেওয়া হলো সমগ্র মানবসমাজের জন্য।
এমন বিরল ধাঁচের প্রকৃতি পৃথিবীতে আর একটি নেই। জ্ঞান-বিজ্ঞানের জগতে পারস্যদের অবাধ বিচরণ। দর্শনে ছিল ভারতীয়দের প্রভূত উন্নতি সাধন। চারু ও কারুকলায় ছিল রোমানদের একচ্ছত্র আধিপত্য, চিত্রকল্প ও কাব্য-কবিতায় গ্রীকদের প্রতিভার ছাপ-এত কিছু সত্ত্বেও রাসূল তাদের কাছে প্রেরিত হননি। তিনি প্রেরিত হলেন নির্মল এক পরিবেশে; কারণ, আরব ছাড়া অন্যান্য জাতির আর যা-ই থাকুক না থাকুক, কিছু গুণের বড়ই অভাব ছিল তাদের মাঝে আর তা হলো-আল্লাহ প্রদত্ত স্বভাব বা ফিতরাতের নিষ্কলুষতা, চিত্তের স্বাধীনতা এবং আত্মিক উন্নতি সাধনে একাগ্রতা। এগুলো পুরোমাত্রায় বিদ্যমান ছিল একটা জাতির মাঝেই; তা হলো আরব।।৮১।
টিকাঃ
৬৬. প্রাগুক্ত, ১/৯৪।
৬৭. দেখুন: আবু শাহবা, আস-সীরাহ আন-নাবাওয়িয়া, ১/৯৪।
৬৮. দেখুন: আস-সীরাহ আন-নাবাওয়িয়া, পৃ. ১২।
৬৯. বুলুগুল-আরিব, ১/৩৯-৪০।
৭০. দেখুন: মাদখাল লিফিকহিস-সীরাহ, পৃ. ৭৯,৮০।
৭১. দেখুন: আবু শাহবা, আস-সীরাহ আন-নাবাওয়িয়া, ১/৯৫।
৭২. ড. ফারুক আত-তিবা', দিওয়ান 'আনতারা, পৃ. ২৫২।
৭৩. আবু শাহবা, আস-সীরাহ আন-নাবাওয়িয়া, ১/৯৫।
৭৪. সহীহ বুখারি, ওয়াহির সূচনা অধ্যায়, হাদীস নং: ৭।
৭৫. সহীহ মুসলিম, আত্মত্যাগের অধ্যায়, হাদীস নং: ১৯৭৮।
৭৬. দেখুন: মাদখাল লিফাহমিস-সীরাহ, পৃ. ৯০।
৭۷. প্রাগুক্ত, পৃ. ৯১।
৭৮. তারীখ আত-তবারি, যু-কার-যুদ্ধ সম্পর্কিত অধ্যায়, ২/২০৭।
৭৯. দেখুন: আবু শাহবা, আস-সীরাহ আন-নাবাওয়িয়া, ১/৯৬, ৯৭।
৮০. প্রাগুক্ত, ১/৯৭।
৮১. দেখুন: ইমাম হাসান আল-বান্না, নাযারাত ফিস-সীরাহ, পৃ. ১৪।