📄 ধর্মীয় অবস্থা
ধর্মীয় অবস্থার বিবেচনায় আরবরা ছিল চরমভাবে পিছিয়ে পড়া এক জাতি। ধর্মীয় গোঁড়ামো, কাদামাটি আর কাঠ-পাথরের প্রতিমার পূজায় আকণ্ঠ ডুবে ছিল তারা। চারিত্রিক অবনমন, সামাজিক বিশৃঙ্খলা, রাজনৈতিক অরাজকতাও চলছিল সমান তালে। নৈরাজ্যকর অবস্থার প্রান্ত সীমায় গিয়ে ঠেকে তারা। জোর যার মুল্লুক তার— এমনই ছিল তাদের নীতি। তাদের মান-মর্যাদা নামতে নামতে একেবারে তলানিতে গিয়ে ঠেকে। নিক্ষিপ্ত হয় ইতিহাসের আস্তাকুড়ে। সেরা সময়েও তারা পারস্য কিংবা রোমান সাম্রাজ্যের তাঁবেদারি করা ছাড়া ভালো কিছু করতে পারেনি。
বাপ-দাদার প্রতি তাদের আনুগত্য ছিল প্রশ্নাতীত। তাদের রেখে যাওয়া ধর্মের প্রতি ছিল অন্ধবিশ্বাস। এতই অন্ধ যে—বক্রতা, ভ্রষ্টতা ও অনিয়মে ভরে আছে যে ধর্মটি, তা একটু খতিয়ে দেখার প্রয়োজনও বোধ করত না। ফলে তারাও পূজা করত দেবদেবীর। প্রত্যেক গোত্রের ছিল একটা স্বতন্ত্র উপাস্য-মূর্তি। হুযাইল ইবনু মুদরিকা গোত্র উপাসনা করত সুওয়াআ'-এর, কাল্ব গোত্র পূজা করত ওয়াদ্দ-এর, মাযহিজ গোত্রের উপাস্যের নাম ছিল ইয়াগূস, খাইয়াওয়ান কবিলার উপাস্য ছিল ইয়া'উক, হিময়ার গোত্র মাথা ঠুকত নাস্ত্র প্রতিমার সামনে। ইসাফ ও না'ইলাহর অর্চনা করত কুরাইশ ও খুযাআ' উভয় গোত্র। মানাত মূর্তির অবস্থান ছিল সমুদ্র সৈকতে; সারা আরবের লোক, বিশেষ করে আউস ও খাযরাজ গোত্রের লোকদের নিকট প্রতিমাটি ছিল চরম পূজনীয়। লাতের অবস্থান ছিল সাকীফ গোত্রে। যাত-'আরিক নামক এলাকায় ছিল উয্যা মূর্তির অবস্থান। কুরাইশদের ধারণায়, এই উয্যা ও লাত ছিল সবচেয়ে বড় মা'বুদ।।৩৮।
প্রধান প্রধান এই মূর্তির পাশাপাশি ছোট-বড় আরও অগুনতি মূর্তি ছিল তাদের; বহনে সহজসাধ্য ছোট মূর্তিগুলো তারা তাদের সফরে-ভ্রমণে সঙ্গে নিত কিংবা ঘরবাড়িতে যেখানে ইচ্ছা সেখানে বানিয়ে নিত পূজাঘর।
ইমাম বুখারি তার সহীহ বুখারিতে আবু রজা আল-'উতারিদি থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেন, “আমরা একসময় পাথরের পূজা করতাম। পাথরটির তুলনায় আমরা যদি উত্তম কোনো পাথর পেতাম, তা হলে প্রথমটিকে দূরে ছুড়ে ফেলে আমরা নতুনটাকে নিতাম। যদি এমন হতো যে, আমরা কোনো পাথরই খুঁজে পাচ্ছিা না, তবে মাটির কিছু ঢেলা জোগাড় করে আনতাম। তারপর একটা ভেড়ী এনে ঢেলার ওপর দুধ দোহন করতাম। এরপর এর চারপাশে তাওয়াফ করতাম দল বেঁধে!”
এই প্রতিমাপূজা-চর্চা আরবদেরকে আল্লাহর পরিচয়, তাঁর একত্ব, মাহাত্ম্য, তাঁর প্রতি ঈমান এবং পরকালে বিশ্বাসের মতো ইত্যাদি বিষয় জানার ক্ষেত্রে সৃষ্টি করে এক বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতা। তারা মনে করত, আল্লাহ ও তাদের মধ্যে সেতুবন্ধনের কাজ করে এই প্রতিমাগুলো। কিন্তু তাদের এই দাবির কোনো ভিত্তি ছিল না; অযৌক্তিক দাবি নিঃসন্দেহে। কল্পিত এই উপাস্যগুলো তাদের মন-মগজ, কাজকর্ম, আচার-আচরণ, চলাফেরা এবং জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে একেবারে জেঁকে বসে। ফলে, তাদের অন্তরে আল্লার প্রতি সম্মানবোধ ধীরে ধীরে কমে যায়। আল্লাহ বলেন :
"যারা মন দিয়ে শোনে শুধু তারাই সাড়া দেয়। আর মৃতকে আল্লাহ পুনর্জীবিত করে ওঠাবেন; তারপর তাঁর দিকেই তাদেরকে ফিরিয়ে আনা হবে।” [সূরা আন'আম, ৬:৩৬]
যদিও কিছু মানুষ তখনও পর্যন্ত নবি ইবরাহীমের দীনের অনুসরণ করত। তবে তাদেরকেও পেয়ে বসেছিল নানা বিচ্যুতি, বক্রতা, ভ্রষ্টতা। তাদের সেই দীনে সাধিত হয় অনেক পরিবর্তন ও পরিবর্ধন। আশ্চর্যের বিষয় হলো-তারা হাজ্জ করতে আসত ঠিকই, কিন্তু পূজা করত মূর্তির। উপরন্তু হাজ্জের মতো 'ইবাদাতকে তারা নিজেদের শৌর্য-বীর্য, গর্ব-অহংকার প্রদর্শনের মৌসুমি এক আনুষ্ঠানিকতায় পরিণত করে। নবি ইবরাহীমের দীন-হানীফ তথা একনিষ্ঠ দীনের যে কয়টা বিশ্বাস তখন পর্যন্ত বাকি ছিল, তাতেও বিকৃতি ঘটে। বিপরীতে, বিশুদ্ধ আকীদা-বিশ্বাসের বদলে অনেক কুসংস্কার-খুরাফাত, পৌরাণিক কিচ্ছা-কাহিনিতে ভরে যায় সেই ধর্ম।
তবে এত কিছুর পরও কিছু মানুষ ছিলেন যারা সত্যিকারভাবেই ইবরাহীমের দীন-হানীফ অনুযায়ী জীবনযাপন করতেন। প্রতিমা-পূজা করতেন না, বিশ্বাস রাখতেন না এর সঙ্গে জড়িত আচার-প্রথা ও আকীদা-বিশ্বাসে। তারা হানীফ নামে পরিচিত ছিলেন সবার কাছে। ইবরাহীমের রেখে যাওয়া দীনের বিশুদ্ধ অনুসারীকেই হানীফ বলা হয়। আল্লাহ কুরআনে নবি ইবরাহীমকে হানীফ বলে উল্লেখ করেছেন। আল্লাহ বলেন,
"ইবরাহীম ইহুদিও ছিল না, খ্রিষ্টানও ছিল না; সে ছিল এক আল্লাহয় বিশ্বাসী। কোনোভাবেই সে মুশরিক ছিল না।"[সূরা আলু-'ইমরান, ৩:৬৭]
তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য একজন হলেন যাইদ ইবনু 'আমর ইবনু নুফাইল। তিনি বেদিমূলে কোনো প্রাণীকে বলি দিতেন না, খেতেন না রক্ত কিংবা মৃত প্রাণী। তিনি লাত, উয্যা, মানাত কিংবা অন্যকোনো মূর্তির পূজা-অর্চনা করতেন না। তিনি বলতেন:
একজন রব নাকি হাজারটা? এত এত ধর্ম-মাঝে সত্য কোনটা? লাতকে ছেড়েছি, উয্যাকে মানি না আল্লাহর 'ইবাদাত ছাড়া আর কিছু চাই না। উয্যার পূজা নয়, না তার দু-কন্যার না 'আমর বংশের আযুর প্রতিমার। বলতে বলতে কবিতার শেষদিকে এসে তিনি বলেন: কিন্তু আমি 'ইবাদাত করি রাহমান-এর তিনি আমার রব। যাতে গফুর ক্ষমা করেন- আমার গুনা সব। [৪০]
দীন-হানীফ-এর আরেকজন অনুসারী হলেন কুস্স ইবনু সা'ইদাহ আল- ইয়াদি; তিনি নবি ইবরাহীম ও 'ইসমাঈলের শারী'আহ মেনে চলতেন। বাগ্মিতা, বিচক্ষণতা, প্রজ্ঞা, দূরদৃষ্টি, জ্ঞান-গরিমা এবং উত্তম চরিত্রের জন্য তিনি সবার প্রিয় ব্যক্তিত্ব ছিলেন। এক আল্লাহর 'ইবাদাতের পথে তিনি মানুষকে ডাকতেন; বলতেন প্রতিমা-পূজা ছেড়ে দিতে। তিনি বিশ্বাস করতেন মৃত্যুর পরের জীবনে। এমনকি ইসলাম- পূর্ব সময়েও তিনি মানুষদেরকে নবিজির আগমনের সুসংবাদ-বার্তা শুনিয়েছিলেন।
দালাইলুন-নুবুওওয়াহ নামক গ্রন্থে আবু নু'আইম সাহাবি ইবনু আব্বাস থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন,
"কুস্স্স ইবনু সা'ইদার অভ্যাস ছিল-তিনি উকায মেলায় তার জাতির সামনে উপদেশমূলক বিভিন্ন কথাবার্তা বলতেন; ভাষণ দিতেন। এমনই এক ভাষণে তিনি বলেন, 'অচিরেই, এই দিকটি থেকে সত্য উদ্ভাসিত হবে।'-এই বলে মাক্কার দিকে অঙ্গুলিনির্দেশ করেন তিনি। উপস্থিত জনতা জানতে চাইল, সেই সত্যটা কী? তিনি উত্তর করলেন, 'লুওয়াই ইবনু গালিবের বংশের একজন ব্যক্তি; তিনি তোমাদেরকে তাওহীদ, চিরস্থায়ী আবাস, অনিঃশেষ নেয়ামাতরাজির প্রতি আহ্বান করবেন। তখন তোমরা তাঁর ডাকে সাড়া দিয়ো। তাঁর কথা মেনে নিয়ো। হায়! আমি যদি জানতাম যে, আমি তাঁর আগমন পর্যন্ত বেঁচে থাকব, তা হলে সেদিন তাঁর ডাকে সাড়া দিয়ে সবার আগে আমিই তাঁর দিকে দৌড়ে যাব।' জীবদ্দশায়ই তিনি নবিজিকে পেয়েছিলেন। তবে তাঁকে নবি হিসেবে পাননি; তার পূর্বেই মারা যান তিনি।।৪১]
আরবের সবাই যে কুস্স ইবনু সা'ইদাহ কিংবা যাইদ ইবনু 'আমরের মতো ছিল তা কিন্তু নয়; এর বিপরীত একটা চিত্রও ছিল সেখানে। তাদের কেউ কেউ বাপ-দাদার ধর্ম ছেড়ে খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণ করে। আবার কেউ-বা হয়ে যায় ইহুদি। তবে অধিকাংশই পূজা-অর্চনা করত মূর্তির。
টিকাঃ
৩৮. দেখুন: আল-গুরাবা আল-আওওয়ালুন, পৃ. ৬০।
৩৯. সহীহ বুখারি, কিতাবুল-মাগাযi; হানীফা গোত্রের প্রতিনিধি দল, ৫/১১৯, হাদীস নং ৪৩৭৭।
৪০. দেখুন: ইবনু কাসীর, আস-সীরাহ আন-নাবাওয়িয়া, ১/১৬৩।
৪১. কুরআন-সুন্নাহর আলোকে নবিজির সীরাত, ১/৮০।
📄 রাজনৈতিক অবস্থা
আরব উপদ্বীপের বাসিন্দারা বেদুইন ও শহুরে এই দুভাগে বিভক্ত ছিল। তাদের শাসনব্যবস্থা ছিল গোত্রকেন্দ্রিক; আরবের সর্বত্রই ছিল এই গোত্রশাসন। এমনকি উপদ্বীপের অনেক সভ্য রাজ্যতেও এর ব্যতিক্রম ঘটেনি। দক্ষিণের ইয়েমেন রাজ্য, উত্তর-পূর্বের হীরাহ রাজ্য এবং উত্তর-পশ্চিমের গাস্সাসিনা রাজ্যগুলোতে গোত্রশাসন- ব্যবস্থা চালু ছিল।
আরবের এক একটি গোত্রে থাকত অনেক অনেক মানুষ। রক্তের সম্পর্কে নিরূপিত হতো নিজেদের গোত্রপ্রীতি; সবাই ছিল একই রক্তধারার। এই রক্তসম্পর্ক ও গোত্রীয় একতা তাদের মধ্যে একটা সামাজিক মেলবন্ধনের কাজ করত। এর আলোকেই রচিত হতো তাদের সামাজিক রীতিনীতি, যা ব্যক্তি ও সমষ্টির মধ্যে মজবুত সম্পর্ক স্থাপন করত। গোত্রের প্রতিটি সদস্যের কিছু অধিকার যেমন ছিল, তেমনই ছিল কিছু দায়িত্বও। সামাজিক এই রীতিনীতি গোত্রগুলো মেনে চলত তাদের রাজনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে।।৪১।
প্রত্যেক গোত্রের একজন করে গোত্রপ্রধান বা সর্দার থাকত। গোত্রপ্রধান যে কেউ হতে পারত না। একজন গোত্রপতি নির্বাচনের মাপকাঠি ছিল: বংশমর্যাদা, উত্তম চারিত্রিক গুণাবলি, সর্বজন-গ্রহণযোগ্যতা, মানসম্মান, সাহসিকতা, বীরত্ব, মানবিকতা, বদান্যতা ইত্যাদির মতো উত্তম বৈশিষ্ট্যের সর্বোৎকৃষ্টতা অর্জন করা। গোত্রের লোকেরা তাকে সম্মান করত, তার সঙ্গে সৌজন্য আচরণ করত। তার আদেশ শিরোধার্য ছিল তাদের কাছে। বিনা বাক্যব্যয়ে মেনে নিত তার আচার-বিচার। চূড়ান্ত রায় জ্ঞান করে মাথা পেতে গ্রহণ করত তার সালিশি।
গোত্রের লোকেরা তার আর্থিক অধিকারও সংরক্ষণ করত; গানীমাত বা যুদ্ধলব্ধ মালের অংশ থেকে তার জন্য বরাদ্দ ছিল 'আল-মিরবা' অর্থাৎ গানীমাতের এক- চতুর্থাংশ। আবার গানীমাতের মাল সবার মধ্যে বণ্টনের পূর্বেই ভালো জিনিসগুলো নিজের জন্য বেছে নেওয়ার অধিকার রাখতেন তিনি; এর নাম ছিল 'আস-সফায়া'। শত্রুর সঙ্গে যুদ্ধে জড়িয়ে যাওয়ার পূর্বেই তাদের যে মাল হস্তগত হতো এখান থেকেও বরাদ্দ ছিল তার জন্য; এর নাম 'আন-নাশীতা'। গানীমাতের আরেকটা অংশ 'আল-ফুদূল' যা তাকে না দিয়ে কোনোভাবেই বণ্টন করা যেত না। একজন আরব কবি সুন্দর করে বলেছেন: “আমাদের মধ্যে আপনার জন্য বরাদ্দ 'আল-মিরবা' 'আস-সফায়া' গানীমাতখণ্ড। আরও আছে- 'আন-নাশীতা' 'আল-ফুদুল' ও শাসনদণ্ড।”।[৪৩]
এতকিছু প্রাপ্তির বিনিময়ে একজন গোত্র-প্রধানের দায়িত্ব নেহাতই কম ছিল না। গোত্রের লোকজনের মধ্যে শান্তি বজায় থাকা অবস্থায় তিনি হলেন একজন হৃদয়বান ব্যক্তিত্ব। গোত্রের লোকদেরকে দান করেন উদার হস্তে। বলা চলে, তখন তিনি দাতা হাতেম তা'ই। আবার যুদ্ধ-বিগ্রহের সময় তিনি পেছনের সারিতে নয়, লড়াই করেছেন সামনের কাতারে দাঁড়িয়ে। যদি দেখেন, যুদ্ধ এখন ক্ষান্ত দেওয়া উচিত, শান্তিচুক্তি করলেই বরং তার গোত্রের লাভ, তখন তিনি যুদ্ধ-বিরতি ঘোষণা করে শান্তিচুক্তি করেন।
গোত্র-শাসনের প্রধান বৈশিষ্ট্য স্বাধীনতা; একজন আরবের বেড়ে ওঠা নির্মল আবহাওয়া ও কারও কর্তৃত্বহীন পরিবেশে। সাবলীলতা, স্বাধীনতা, বন্ধনহীনতাই আরব-জীবনের প্রধানতম বৈশিষ্ট্য। কারও কাছে জবাবদিহি করার তোয়াক্কা করত না তারা। তারা স্বাধীনতাকে ভালোবাসত মনে-প্রাণে। অপরদিকে জুলুম-নির্যাতন করা ও দাসমনোভাবকে ঘৃণা করত প্রচণ্ডভাবে। প্রশ্রয় দেওয়ার তো প্রশ্নই আসে না। গোত্রের প্রতিটি সদস্যই পরস্পরকে সাহায্য করত। গোত্রের গৌরবগাথা নিয়ে গর্ব করত। অতীতের সোনালি দিনগুলোর কথা আলাপ-আলোচনা করত। গোত্রের অন্য একজন সদস্যকে, তার কাজ ভুল হোক কিংবা শুদ্ধ, সাহায্য করত সর্বতোভাবে। এমনকি তাদের একটা মূলনীতিই ছিল এমন- 'তোমার ভাইকে সাহায্য করো, চাই সে জালিম হোক কিংবা মজলুম।'
গোত্রে একজন ব্যক্তির অবস্থান সামষ্টিকের অধীনস্থতা মেনে নিয়েই। অর্থাৎ গোত্রই সবকিছু, ব্যক্তির আলাদা চাওয়া বলে কিছু থাকতে পারবে না; দলের চাওয়াই ব্যক্তির চাওয়া।
আরব গোত্রগুলোর সবারই কমবেশ রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ছিল। তারা অন্য গোত্রের সঙ্গে বিভিন্ন চুক্তি সম্পাদন করত। দরকার পড়লে যুদ্ধ বাধাতেও পিছপা হতো না। গোত্রগুলোর মধ্যে সম্পাদিত সবচেয়ে বড় চুক্তিটির নাম সম্ভবত 'হিলফুল-ফুযূল'।।৪৪।
পদে পদে, ক্ষণে ক্ষণে যুদ্ধ লেগেই থাকত গোত্রগুলোর মধ্যে। এমনই একটা প্রসিদ্ধ যুদ্ধের নাম 'ফিজার যুদ্ধ'।।৪৫) বড় বড় যুদ্ধ-বিগ্রহ তো ছিলই; পাশাপাশি ব্যক্তিগত ছোটখাটো রেষারেষিও লেগে থাকত সর্বদা। কোনো কোনো হামলা এতটাই নৃশংস ছিল যে, ঘরবাড়িগুলো মিশিয়ে দেওয়া হতো মাটির সঙ্গে। দেখে মনে হতো, কোনো কালে তো দূরের কথা, গতকালও সেখানে কেউ বসবাস করেনি।[৪৬]
টিকাঃ
৪২. আবু শাহবা, আস-সীরাহ আন-নাবাওয়িয়া, ১/৬০।
৪৩. দেখুন : জাহিলি যুগে ও রাসূলুল্লাহর আমলে মাক্কা ও মাদীনা, পৃ. ১৩।
৪৪. দেখুন: ড. মুহাম্মাদ কল'আজি, রাসূল মুহাম্মাদ -এর ব্যক্তিত্ব: একটি বিশ্লেষণ, পৃ. ৩১।
৪৫. প্রাগুক্ত, পৃ. ৩৩-৩৫।
৪৬. প্রাগুক্ত, পৃ. ৩৫।
📄 অর্থনৈতিক অবস্থা
আরব উপদ্বীপের বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে, চোখ যত দূর যায়, বালু আর বালু, ধু-ধু মরুভূমি। একারণে সেখানে চাষবাস হতো না বললেই চলে। প্রান্তিক কিছু এলাকা, বিশেষ করে দক্ষিণের ইয়েমেন এবং উত্তরের শামে অল্পবিস্তর চাষবাস হতো। উপদ্বীপের এখানে ওখানে কিছু মরূদ্যান চোখে পড়ত; উট ও ছাগল-ভেড়ার চারণভূমি ছিল সেগুলো। গোত্রগুলো তাদের পালিত পশুর জন্য ঘাস, তৃণ ইত্যাদির খোঁজে চষে বেড়াত সর্বত্র। তাঁবু ছাড়া আর কোথাও যে বসবাস করা যায়, তা তাদের জানা ছিল না।
শিল্প কিংবা উৎপাদনের ক্ষেত্রে আরবরা অন্য যেকোনো জাতির চেয়ে ছিল অনেক অনেক পিছিয়ে। আক্ষরিক অর্থেই তারা এসব কাজে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করত না। এধরনের কাজ আঞ্জাম দেওয়ার জন্য তাদের প্রধান ভরসা অনারব ও দাস-দাসী। এমনকি কা'বার পুনর্নির্মাণের সময়ও তাদেরকে একজন অনারব কিবতি লোকের সাহায্য নিতে হয়; জেদ্দা বন্দরে তার জাহাজডুবি হলে সে মাক্কাতে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেছিল।[৪৭]
হ্যাঁ, একথা সত্য যে, চাষবাস ও পণ্য উৎপাদনে তারা পৃথিবীর আর দশটা জাতির তুলনায় ছিল এক অনগ্রসরমান জাতি। তবে কৌশলগত কারণে আরবের অবস্থান ভৌগোলিক দিক থেকে আফ্রিকা ও পশ্চিম এশিয়ার মাঝামাঝি হওয়াতে বেশ কিছু সুবিধা ছিল তাদের, যা আর কারও ছিল না। ব্যবসা-বাণিজ্যের বেলায় তৎকালীন বিশ্বের সবচেয়ে সুবিধাজনক অবস্থানটা ছিল আরবদের। সেই যুগের ব্যবসা- বাণিজ্যের এক উন্নত প্রাণকেন্দ্র হয়ে উঠতে আরবকে কোনো বেগই পেতে হয়নি।
শহর ও নগরের লোকেরাই প্রধানত ব্যবসা-বাণিজ্য করত। বিশেষ করে মাক্কার কুরাইশরা অল্পদিনেই বণিক হিসেবে বেশ সুনাম অর্জন করে। তাদের জন্য মাক্কা হয়ে ওঠে ব্যবসা-বাণিজ্যের অনন্য এক নগরী। তাদের নগরে কা'বা থাকাতে আরবের অন্য গোত্রের লোকেরা তাদেরকে সমঝে চলত, সমীহ করত। তাদের প্রতি আল্লাহর এই অনুগ্রহ ও কৃপার কথা কুরআনে এভাবে বিধৃত হয়েছে:
“তারা কি দেখে না, আমি 'হারাম'কে নিরাপদ স্থান করেছি; অথচ এর আশপাশ থেকে মানুষকে (আক্রমণ করে) ছিনিয়ে নেওয়া হচ্ছে? তবে কি ওরা অসত্যে বিশ্বাস করবে এবং আল্লাহর অনুগ্রহ অস্বীকার করবে?" [সূরা 'আনকাবুত, ২৯:৬৭]
কুরাইশরা বছরে দুটি বড় বড় বাণিজ্যিক সফর করত-শীতকালীন সফর ইয়েমেনে আর গ্রীষ্মকালীন সফরটা ছিল শামে। তারা নিশ্চিন্তে, নিরাপদে এবং নির্বিঘ্নেই যাওয়া-আসা করত। লুটেরা, ডাকাত কিংবা দস্যু কেউই তাদের ঘাটাত না। কিন্তু একই সময়ে তাদের আশপাশের অন্য বাণিজ্যিক কাফেলায় ডাকাতরা হামলে পড়ত, ছিনিয়ে নিত তাদের সর্বস্ব। কুরাইশদের বড় দুটি সফর ছাড়াও সারা বছরই থাকত ছোট-বড় আরও অনেক বাণিজ্যিক সফর। আল্লাহ বলেন :
“(আবরাহা বাহিনীকে ধ্বংস করে মাক্কার কুরাইশদের জন্য শীতকালীন ইয়েমেন-সফর নিরাপদ করা হয়েছে) কুরাইশদেরকে অভ্যস্ত করার জন্য; তাদেরকে অভ্যস্ত করার জন্য শীত ও গ্রীষ্মের সফরে। অতএব, তারা যেন এই ঘরের (কা'বা) রবের 'ইবাদাত করে; যিনি তাদেরকে ক্ষুধায় দিয়েছেন খাবার এবং নিরাপত্তা দান করেছেন ভয়ভীতি থেকে।" [সূরা কুরাইশ, ১০৬:১-৪]
তৎকালীন আরব উপদ্বীপে এমন সব পণ্যে বোঝাই থাকত তাদের বাণিজ্যিক কাফেলা-পারফিউম বা সুগন্ধি, ধূপ, লোবান, আঠা, রন্ধন-মসলা, ধনিয়া, খেজুর, গজদন্ত, মাল্য-গুটিকা, চামড়া, রেশমি পোশাক, চন্দন কাঠ, এবনি বা আবলুশ, দানা- পুঁতি, ডোরা-কাটা ইয়েমেনি গাউন এবং অস্ত্রশস্ত্র। এছাড়া কিছু কিছু পণ্য আমদানি করা হতো বাইরে থেকে। এরপর তারা সেগুলো নিয়ে যাত্রা শুরু করত শাম কিংবা অন্যকোনো দেশে। ফিরতি পথে সঙ্গে করে নিয়ে আসত গম, শস্যদানা, কিশমিশ, তেল এবং শামের বোনা কাপড় ইত্যাদি।
আরবদের পাশাপাশি ইয়েমেনের লোকেরাও ব্যবসা-বাণিজ্যে বেশ নাম কুড়িয়েছিল। জলে-স্থলে সর্বত্রই তারা ছুটত বাণিজ্যবহর নিয়ে। ছুটে যেত আফ্রিকার বেলাভূমি, ইন্ডিয়া, ইন্দোনেশিয়া, সুমাত্রা, এশিয়ার নানা দেশসহ ভারত মহাসাগর এবং আরব সাগরের বিভিন্ন দ্বীপে। পরবর্তী সময়ে, ইসলাম আগমনের পর ইয়েমেনের অধিবাসীরা ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে আশ্রয় নেয়। তখন তারা তাদের এই বাণিজ্যিক অভিজ্ঞতা পুরোদমে কাজে লাগিয়ে ইসলামের দা'ওয়াত নিয়ে ছুটে যায় ওসব দেশে।
ইসলাম-পূর্ব আরবের জাহিলি সমাজে সুদি-কারবার ছিল একটি অতি সাধারণ ব্যাপার। এটি আরবদের মধ্যে মহামারির আকারে ছড়িয়ে পড়ে, সম্ভবত ইহুদিদের কাছ থেকে। সমাজের উঁচু-নীচু, ভদ্র-ইতর, ধনী-গরিবসহ সবাই কম-বেশি জড়িত থাকত সুদের সঙ্গে। সুদ সে সমাজে এমনভাবেই জেঁকে বসেছিল যে, কখনো কখনো সুদের হার শতভাগ ছাড়িয়ে যেত।
আরবদের বিখ্যাত অনেকগুলো হাট-বাজার ও মেলা ছিল। 'উকাজ, মাজিন্না, যুল-মাজায ইত্যাদি তাদের প্রসিদ্ধ সব মেলার নাম। আরবদের ইতিহাস বর্ণনা করতে গিয়ে কোনো কোনো ঐতিহাসিক এমন মত ব্যক্ত করেন যে, আরবরা যুল-কা'দাহ মাসে 'উকাজে মেলা বসাত। এখানে ২০ দিন অবস্থান করে ছুটত মাজিন্নার দিকে। আকাশে যুল-হিজ্জা মাসের নতুন চাঁদ দেখার পর তারা যাত্রা করত যুল-মাজাযে। এখানে কাটাত ৮ দিন। এর পর লটবহর নিয়ে ছুটে যেত 'আরাফাতের ময়দানে। তবে 'আরাফাত কিংবা মিনায় অবস্থানের দিনগুলোতে তারা কোনো ধরনের বেচাকেনা করত না। তবে ইসলাম এসে এই কুপ্রথার বিলুপ্তি ঘটায়; আরাফাত ও মিনায় বেচাকেনার দ্বার সবার সামনে অবারিত করে দেয়। আল্লাহ বলেন:
“তোমাদের পক্ষে তোমাদের রবের অনুগ্রহ কামনায় কোনো দোষ নেই (অর্থাৎ হাজ্জের সময় ব্যবসা-বাণিজ্য নিষিদ্ধ নয়)। তারপর তোমরা যখন 'আরাফাত ত্যাগ করবে তখন আল-মাশ'আর আল-হারাম (মুযদালিফা)-এর কাছে পৌঁছে আল্লাহকে স্মরণ করবে। আর তিনি তোমাদেরকে যেভাবে দিক-নির্দেশনা দিয়েছেন, ঠিক সেভাবে তাঁকে স্মরণ করো। এর আগে তো তোমরা আসলেই বিভ্রান্তদের অন্তর্ভুক্ত ছিলে।” [সূরা বাকারা, ২:১৯৮]
ইসলাম আসার পরও একটা সময় পর্যন্ত এই হাট-বাজার ও মেলাগুলো ধারাবাহিকভাবে চলে। ধীরে ধীরে বিনাশ ঘটে সেসবের। হ্যাঁ, এই মেলাগুলো কেবল ব্যবসা-বাণিজ্য কিংবা তেজারতির কেন্দ্রই ছিল না, বরং একই সঙ্গে ছিল শিল্প-সাহিত্য, কবিতার আসর, পথসভা, বক্তৃতা-ভাষণ ইত্যাদির এক মিলন মেলা। যুগের সেরা সেরা কবি, অসাধারণ সব বাগ্মীবক্তারা এই মেলার অলংকার বর্ধন করতেন। বংশ-স্তুতি, গৌরব-ঐতিহ্য, প্রভাব-প্রতিপত্তি ইত্যাদি নিয়ে সেখানে তারা কথার খই ফোটাতেন, রচনা করতেন কবিতার পর কবিতা। এভাবেই মেলার পাশাপাশি ভাষা-সাহিত্য-সংস্কৃতি হাত ধরাধরি করে হাঁটত সমৃদ্ধির পথে, অন্যপাশে চলত তাদের তেজারতি।[৪৮]
টিকাঃ
৪৭. দেখুন: মুনীর আল-গাদবান, ফিকহুস-সীরাহ আন-নাবাওয়িয়া, পৃ. ৬০।
৪৮. দেখুন: আবু শাহবা, আস-সীরাহ আন-নাবাওয়িয়া, ১/১০২।
📄 সামাজিক অবস্থা
আরবদের সামাজিক অবস্থা খুব ভালো ছিল বলা চলে না। পূর্ববর্তীদের অন্ধ অনুকরণ-অনুসরণ, বিভিন্ন প্রথা ও কুসংস্কার মেনে চলাই ছিল তাদের সামাজিক জীবনের প্রধান উপজীব্য। এমন কিছু সামাজিক প্রথা ছিল যা তাদের জাত-পাত, কুল-বংশের সঙ্গে ছিল ওতপ্রোতভাবে জড়িত। গোত্রগুলোর পারস্পরিক সম্পর্ক, গোত্রের সঙ্গে ব্যক্তির সম্পর্ক নিরূপণেও ছিল প্রথাগুলোর অগ্রণী ভূমিকা। সামাজিক অবস্থার সংক্ষিপ্ত কিছু দিক নিচে দেওয়া হলো:
বংশ কৌলিন্যের অহমিকা
আরবরা পৃথিবীর এমন এক জাতি, যারা নিজ গোত্রের বংশধারা রক্ষা, রক্ত বিশুদ্ধ রাখার ব্যাপারে ছিল অত্যন্ত সচেতন; অন্য গোত্রের লোকদের সঙ্গে নিজেদের বিয়ে-শাদির রেওয়াজ তাদের সামাজিক প্রথায় ছিল প্রায় হারাম। বিয়ে-শাদি হতো কেবল নিজ নিজ গোত্রের ছেলেমেয়েদের মধ্যে। এরপর ইসলাম এল। অন্য গোত্রের সঙ্গে বিয়ে-শাদির সম্পর্ক স্থাপন করা যাবে না-অবসান ঘটাল এই কুপ্রথার। ঘোষণা দিল, শ্রেষ্ঠত্ব নিরূপিত হবে কেবল তাকওয়া ও সৎকাজের ভিত্তিতে।
ভাষার বিশুদ্ধতা নিয়ে গর্ব
ভাষার বিশুদ্ধতা, শব্দের শ্রুতিমধুরতা ও উচ্চাঙ্গশৈলীতে আরবরা থাকত বিমোহিত হয়ে। তাদের বাক্যচয়নে থাকত মুনশিয়ানার ছাপ। অসাধারণ সব শব্দশৈলীতে তারা অনায়াসেই দিব্যি কথা বলে যেতে পারত ঘণ্টার পর ঘণ্টা। তাদের রচিত কবিতার পরতে পরতে খুঁজে পাওয়া যেত নিজেদের গৌরবগাথা, বংশের নামডাক, আবেগ-অনুভূতি, সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না, তাদের জ্ঞান-গরিমা ইত্যাদির অত্যুজ্জ্বল বিভিন্ন দিকের আলোকপাত। এটা খুব অস্বাভাবিক নয় যে, এদের মধ্য থেকেই জন্ম নেবে কোনো স্বভাব-কবি কিংবা জাদুকরী কোনো বক্তা। হয়তো কবিতার একটি পঙ্ক্তিই পারে নিজ গোত্রের উত্থানের সোপান হতে। আবার কবিতার একটি পঙ্ক্তিই যথেষ্ট ছিল উন্নতির পরম সোপান থেকে অবনতির চরম ঠিকানায় পৌঁছে দিতে। আজকের দুনিয়ায় একটি দেশ কোনো খেলার বিশ্ব আসরে স্রেফ সুযোগ পাওয়াতেই যে আনন্দ মিছিল করে, তৎকালীন আরব গোত্রে একজন কবি জন্ম নিলে তাদের আনন্দ এর চেয়ে কোনো অংশেই কম ছিল না।
আরব সমাজে নারী
নারীকে পণ্য-সামগ্রীর চেয়ে বেশি কিছু ভাবতে পারত না আরবের অনেক গোত্রই। সাধারণ সম্পদের মতো নারীদেরকেও মীরাসি-পণ্য হিসেবে বণ্টন করা হতো। বাবার মৃত্যুর পর ছেলের অধিকার ছিল তার সৎমাকে বিয়ে করার। কিংবা অন্য কোথাও বিয়ে দেওয়ার ব্যাপারে বাধা দেওয়ার অধিকারও সংরক্ষণ করত সে। ইসলাম এসে এ জঘন্য প্রথাকে হারাম ঘোষণা করে। আল্লাহ বলেন: “তোমাদের পিতৃপুরুষ (বাবা, দাদা, নানা) যেসব নারীকে বিয়ে করেছে, তোমরা তাদেরকে বিয়ে করো না। তবে পূর্বে যা হয়ে গিয়েছে (তা ভিন্ন কথা)। অবশ্যই এ তো ছিল অশ্লীল, বড়ই ঘৃণার ব্যাপার ও জঘন্য প্রথা।” [সূরা আন-নিসা, ৪:২২]
আরবরা যৌনাচারের বেলায় যদিও অস্বাভাবিক জীবনযাপন করত, তা সত্ত্বেও উৎসমূলে বিয়ে করাকে তারা হারাম বলে ঘোষণা করে। উৎসমূলের মধ্যে পড়ে নিজের মা, নানি এবং তার থেকে উপরের দিকে। এমনিভাবে শাখা-প্রশাখার মধ্যেও এই নিষেধাজ্ঞা বলবৎ ছিল, যেমন: মেয়ে। বাবার ধারার মধ্যে যাদেরকে বিয়ে করা যেত না, যেমন: বোন। দাদা ও নানার ধারার খালা, বাবার ধারার ফুফুদেরকেও বিয়ে করা যেত না।।[৪৯]
আরবরা কন্যা, স্ত্রী ও শিশুদেরকে কোনো ধরনের উত্তরাধিকার সম্পদ দিত না। যেসব নারী পুরুষের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে যুদ্ধ করতে পারত, শত্রুর আক্রমণ থেকে নিজ জাতিকে রক্ষা করতে জানত, কেবল তারাই কিছুটা গানীমাতের ভাগ পেত। যুদ্ধ করতে অক্ষম মহিলা ও শিশু উত্তরাধিকার-সম্পত্তি প্রাপ্তি থেকে ছিল পুরোপুরি বঞ্চিত। নারীদের উত্তরাধিকার-সম্পত্তি দেওয়া যাবে না-এটা একরকম অঘোষিত নিয়ম ছিল আরবদের মধ্যে। দীর্ঘদিন থেকে চলে আসছিল এটা প্রথা হিসেবে; আর এটা কার না জানা যে, প্রথা অনেক সময় বিধিবদ্ধ আইন থেকেও অধিক শক্তিশালী হয়। কিন্তু রাসূলুল্লাহর যুগে এসে এ কুপ্রথার বিলুপ্তি ঘটে। আউস ইবনু সাবিত নামের এক সাহাবি মারা যান সেসময়। তার ছিল দুই মেয়ে ও এক ছেলে। মেয়ে দুটো ছিল খুবই অসুন্দর। এই সুযোগে আউসের দুই চাচাতো ভাই তার রেখে যাওয়া সমুদয় সম্পত্তি নিয়ে নেয়। তখন তার স্ত্রী তাদেরকে বললেন, তোমরা দুজনই মেয়ে দুটিকে বিয়ে করো। অসুন্দর হওয়াতে মেয়ে দুটোকে বিয়ে করতে অস্বীকৃতি জানায় তারা। উপায়ান্তর না দেখে রাসূলুল্লাহর নিকট এসে অভিযোগ করলেন সেই মহিলা। বললেন, “হে আল্লাহর রাসূল, আউস মারা যাওয়ার সময় ছোট একটা ছেলে ও দুটি মেয়ে রেখে যায়। পরে একদিন তাঁর দুই চাচাতো ভাই, সুওয়াইদ ও 'আরফাতা, এসে তার রেখে যাওয়া সমুদয় সম্পদ সঙ্গে করে নিয়ে যায়। আমি তাদেরকে বলেছিলাম, 'ভালো হয়, তোমরা তার দুই মেয়েকে বিয়ে করো।' কিন্তু তারা তাতে রাজি হয়নি।” সব শুনে রাসূল ﷺ সে দুজনকে বললেন, "তোমরা এই উত্তরাধিকার-সম্পত্তির কোনো কিছুরই নড়চড় করো না।”।৫০) এরই পরিপ্রেক্ষিতে নাযিল হয় কুরআনের আয়াত যাতে আল্লাহ বলেন:
“পিতামাতা ও আত্মীয়স্বজনদের রেখে যাওয়া সম্পত্তিতে পুরুষদের অংশ আছে। আর পিতামাতা ও আত্মীয়স্বজনদের রেখে যাওয়া সম্পত্তিতে নারীদেরও অংশ আছে; হোক অল্প কিংবা বেশি, কিন্তু তা নির্ধারিত অংশ।” [সূরা আন-নিসা, ৪:৭]
আরবরা মেয়েদেরকে ঠাট্টা-বিদ্রুপ, উপহাস ও তামাশার পাত্রের চেয়ে বেশি কিছু ভাবত না। তারা মনে করত, মেয়েরা যুদ্ধ করতে পারে না, যত নির্ভরতা তাদের পুরুষের ওপর। পুরুষদের মতো তারা রুজি-কামাই করতে পারে না। যুদ্ধের সময় নারীরা যদি শত্রুর হাতে বন্দি হয়, তবে গ্রেফতারকারী তাদের সঙ্গে দাসীর মতো আচরণ করে, চরিতার্থ করে তার যৌন-অভিলাষ। এমনকি কোনো কোনো মহিলাকে তো তারা বেশ্যাবৃত্তিতে বাধ্য করাত; দিনশেষে মনিব তার সারাদিনের বেশ্যাবৃত্তির কামাই নিয়ে যেত। এমন সব ঘৃণ্য কাজে আরবদের বিরক্তভাব আসা তো দূরে থাক, বরং তা একপ্রকার অনুমোদিত কাজে পরিণত হয় তাদের সমাজে। ভয়, লজ্জা ও এসব সামাজিক রীতি ওঠার কারণে কারও ঘরে কন্যাসন্তান জন্ম নিলে তাকে পেয়ে বসত রাজ্যের সব দুশ্চিন্তা, মলিন হয়ে যেত তার মুখখানি। এই অবস্থার কথা কুরআন আমাদের সামনে এভাবে তুলে ধরেছে। আল্লাহ বলেন:
“তাদের কাউকেও যখন কন্যাসন্তান জন্মের সুসংবাদ দেওয়া হয়, তখন তার মুখ কালো (মলিন) হয়ে যায় ও সে বিষণ্ণ হয়ে পড়ে। তাকে যে সংবাদ দেওয়া হয় তার লজ্জায় সে নিজের সম্প্রদায় থেকে নিজেকে লুকিয়ে রাখে। সে ভাবে অপমান সহ্য করেও কি সে তাকে রেখে দেবে, না মাটিতে পুঁতে ফেলবে! জেনে রাখো, তারা যেভাবে বিচার করে তা অত্যন্ত জঘন্য।” [সূরা আন-নাহল, ১৬: ৫৮, ৫৯]
অনেক বাবাই কন্যাসন্তানের জনক হওয়ার লজ্জাকে চাপা দিত নিজের ঔরসজাত মেয়েটিকে জীবন্ত মাটিচাপা দিয়ে! কন্যার অপরাধ? কিছুই না। কন্যা হয়ে জন্মানোটাই যেন তার আজন্ম পাপ। ৫১। তাদের এই জঘন্যতাকে কুরআন চরম অবজ্ঞা করেছে। আল্লাহ বলেন:
“যখন জীবন্ত-কবর-দেওয়া কন্যাকে জিজ্ঞেস করা হবে, কী দোষে তাকে হত্যা করা হয়েছিল?” [সূরা আত-তাকভীর, ৮১: ৮, ৯]
কোনো কোনো বাবা স্রেফ দারিদ্র্যের কারণে কিংবা মেয়ের পেছনে ব্যয় করে দরিদ্র হয়ে যাবে এই ভয়ে আপন কন্যাকে খুন করত। ভাবত, মেয়ে সন্তানকে লালন- পালন করতে গেলে তাদেরকে পথে বসতে হবে, মরতে হবে না খেয়ে। তারপর ইসলাম এল। এগুলোকে হারাম বলে ঘোষণা দিল। আল্লাহ বলেন :
"বলো, 'এসো, তোমাদের রব তোমাদের জন্য যা হারাম করেছেন তা আমি তোমাদের পড়ে শোনাই। তা এই যে—তোমরা তাঁর সঙ্গে কোনো কিছু শরিক করবে না, পিতামাতার সাথে সদ্ব্যবহার করবে, দারিদ্র্যের ভয়ে তোমরা তোমাদের সন্তানদেরকে হত্যা করবে না; আমিই তোমাদের ও তাদেরকে আহার দিয়ে থাকি। প্রকাশ্যে হোক বা গোপনে হোক, অশ্লীল আচরণের কাছে যেয়ো না। আল্লাহ যার হত্যা নিষিদ্ধ করেছেন, যথার্থ কারণ ছাড়া তাকে হত্যা কোরো না। তোমাদেরকে তিনি এ নির্দেশ দিয়েছেন যাতে তোমরা বুঝতে পারো।” [সূরা আন'আম, ৬:১৫১]
আল্লাহ আরও বলেন:
“তোমরা তোমাদের সন্তানদেরকে দারিদ্র্যের ভয়ে হত্যা করো না। ওদেরকে ও তোমাদেরকে আমিই জীবিকা দিয়ে থাকি। নিশ্চয়ই ওদেরকে হত্যা করা মহাপাপ।” [সূরা ইসরা', ১৭:৩১]
এত অনাচারের মাঝেও কিছু গোত্র ছিল যারা কন্যাদের হত্যা করা থেকে বিরত থাকত। এমন লোকও ছিলেন, যারা জঘন্য এই পাপকে ঘৃণা করতেন মনে-প্রাণে। এদেরই একজন হলেন যাইদ ইবনু 'আম্র ইবনু নুফাইল।।৫২।
আবার এমন গোত্রও ছিল যারা নারীদের সম্মান করত, চলত সমীহ করে; বিয়ে-শাদির বেলায় নারীদের মতামত গুরুত্বের সঙ্গেই নিত। একজন আরব স্বাধীন নারী খুবই সাহসী হতো; চাইলেই যুদ্ধের ময়দান পর্যন্ত ছুটে যেত স্বামী-যোদ্ধাদের সঙ্গে, পাশে থেকে উৎসাহ দিয়ে যেত অবিরত। প্রয়োজন হলে শত্রুর মোকাবিলায় দাঁড়িয়ে যেত অস্ত্র হাতে নিয়ে। অন্যদিকে, একজন আরব বেদুইন নারী তার স্বামীর সঙ্গে মাঠে গবাদি পশু চরাত। পাশাপাশি পশম ধুনত, পোশাক বুনত।।৫৩)
বিয়ে-শাদি
বিচিত্র সব বিয়ের প্রচলন ছিল আরবদের মাঝে। এই নিয়ে তাদের কেউ কাউকে দোষারোপ করত না। সায়্যিদা 'আয়িশা আমাদেরকে জানান, জাহিলি যুগে চার ধরনের বিয়ের প্রচলন ছিল; এর একটি হলো: বর্তমান যুগের সাধারণ বিয়ের মতো। এ ব্যবস্থায়, বিয়ে-ইচ্ছুক ব্যক্তি অন্য একজন লোকের কাছে গিয়ে তার পোষ্য কিংবা মেয়েকে বিয়ের করার প্রস্তাব ব্যক্ত করত। তিনি রাজি হলে বিয়ে-ইচ্ছুক ব্যক্তি কনেকে দেনমোহর প্রদান করে বিয়ে করে নিয়ে আসত। ইসলাম আসার পর এ ধারার বিয়েকে সঠিক বলে স্বীকৃতি দেয়; বর্তমান মুসলিম সমাজের বিবাহচর্চা এমন ধারারই।
দ্বিতীয় ধারার বিয়ের ধরন ছিল এ রকম: স্ত্রী যখন মাসিক থেকে পবিত্র হতো তখন স্বামী তাকে বলত, তুমি অমুক ব্যক্তির নিকট যাও। এরপর তার সঙ্গে তাকে মিলিত হতে বলত। তার দ্বারা গর্ভবতী হওয়ার ব্যাপারটি স্পষ্ট হওয়া পর্যন্ত স্বামী নিজ স্ত্রীর সঙ্গে সব ধরনের যৌনসম্পর্ক স্থাপন থেকে দূরে থাকত। এমনকি এ সময়ে তাকে স্পর্শ পর্যন্ত করত না। গর্ভধারণের বিষয় নিয়ে যখন আর কোনো সন্দেহ থাকত না, স্বামী মন চাইলে তার কাছে আসত; তার আগপর্যন্ত না। এমন রুচিহীন অশ্লীল কাজের পেছনে জাহিলি আরবদের উদ্দেশ্য—মেধাবী ও বীর সন্তানের জনক হওয়ার খায়েশ। এ ধারার বিয়ে 'নিকাহুল-ইসতিবদা' নামেই পরিচিত。
তৃতীয় ধারার বিয়ে ছিল এ রকম: ১০ জনের চেয়ে কমসংখ্যক লোকের একটি দল একত্র হয়ে কোনো একজন নারীর নিকট গমন করত। পালাক্রমে সবাই তার সঙ্গে মিলিত হতো। এরপর এক সময় মহিলা যথারীতি গর্ভধারণ করে। অতঃপর সে জন্ম দেয় কোনো সন্তানের। কদিন যাওয়ার পর মহিলা দলটির সবাইকে ডেকে পাঠাত। একে একে সবাই তার কাছে গিয়ে জমায়েত হতো; একজনও না এসে পারত না। মহিলা তখন তাদেরকে বলত, আমার সাথে তোমাদের কি হয়েছে না- হয়েছে তা তোমরা ভালো করেই জানো। যে সন্তান জন্ম নিয়েছে, হে অমুক, তা তোমারই। সন্তানটির জনক হিসেবে সে যাকে পছন্দ করত তার নাম উল্লেখ করত সেখানে। সন্তানটি তখন থেকেই সে লোকটির পরিচয়ে বড় হতো। চাইলেই লোকটি দায়িত্ব এড়াতে পারত না।
চতুর্থ ধারার বিয়ে ছিল এ রকম: অনেক লোক একসাথে হয়ে কোনো একজন নারীর দরজায় কড়া নাড়ত। সে কাউকেই বাধা দিত না। একে একে সবাই তার সঙ্গে যৌনাচারে লিপ্ত হতো। এমন নারীরা ছিল সমাজের স্বীকৃত বেশ্যাশ্রেণির। খদ্দেরদের আহ্বান করে দরজায় সেঁটে দিত সাইনবোর্ড। যে কারোরই সুযোগ ছিল তাদের সাথে যৌনাচার করার। একসময় এদের কেউ একজন গর্ভবতী হয়ে জন্মদান করত কোনো সন্তানের। অতঃপর একে একে লোকগুলো মহিলার পাশে ভিড় জমাত। তাদের মধ্যে যে চায় তাকে সন্তানটি দিয়ে দেওয়া হতো। তখন থেকে সন্তানটির লালন-পালনের ভার বর্তাত লোকটির ওপর। আর তার সন্তান বলেই লোকজন তাকে সম্বোধন করত। সন্তানটির বাবা হওয়ার দায়িত্বটি কেউই এড়াতে পারত না।
এরপর আল্লাহ মুহাম্মাদ -কে পৃথিবীতে নবি করে পাঠালেন। প্রথম প্রকারের বিয়ে ছাড়া, নবিজি জাহিলি যুগের সব ধরনের বিবাহ-প্রথার মূলোৎপাটন করেন। [৫৪] সায়্যিদা 'আয়িশা উল্লেখ করেননি এমন আরও কিছু বিবাহ-প্রথার কথা অনেক বিজ্ঞ 'আলিমের বর্ণনায় পাওয়া যায়। যেমন: 'নিকাহুল-খাদান'-এতে ইচ্ছে করলে যেকেউ একজন ছেলেবন্ধু কিংবা মেয়েবন্ধু গ্রহণ করতে পারত। এটাকে কোনোভাবেই বিয়ে বলা চলে না, বরং বলা চলে এক ধরনের যিনা-ব্যভিচার ও লাম্পট্য। এর আলোচনা কুরআনে আল্লাহ এভাবে করেছেন:
“সুতরাং তোমরা তাদের মালিকদের অনুমতি নিয়ে তাদেরকে বিয়ে করবে। আর তারা যদি ব্যভিচার না করে বা উপপতি না নিয়ে সচ্চরিত্রের হয়, তবে তাদেরকে ন্যায়সংগতভাবে মোহর দেবে।” [সূরা আন-নিসা, ৪:২৫]
আরবরা বলাবলি করত, এ বিয়ে যদি গোপনীয়তা রক্ষা করে হয়, তা হলে এতে কোনো আপত্তি নেই। তবে প্রকাশ পেয়ে গেলে সেটা নিন্দনীয়। আরও যে সমস্ত বিয়ের চল ছিল তা হলো:
নিকাহুল-মুত'আ: এ বিয়ে হতো কেবল নির্দিষ্ট কিছুদিনের জন্য-এক মাস, দুই মাস, এমনকি এক বছরও হতে পারে এ বিয়ের মেয়াদ। অর্থাৎ বিয়ের উভয় পক্ষ যে কদিনের জন্য চুক্তিবদ্ধ হতো, সে কদিনের জন্য। ইসলামের প্রথম দিকে এ ধারার বিয়ে বৈধ ছিল। পরে সেটা হারাম ঘোষিত হয়। এ ঘোষণা কিয়ামাত পর্যন্ত বলবৎ।
নিকহুল-বাল: জাহিলি যুগে এক ব্যক্তি আরেক ব্যক্তিকে বলত, “তোমার বউকে আমার কাছে পাঠাও, আমি তোমার কাছে আমার বউকে পাঠাচ্ছি। সঙ্গে পাবে উপরি পাওনা।”(৫৫)
নিকাহুশ-শিগার: অবৈধ এ ধারার বিয়েটি ছিল এ রকম—এক ব্যক্তি তার কন্যাকে বিয়ে দিত আরেক ব্যক্তির সঙ্গে; শর্ত একটাই— সেই লোকের মেয়েকেও তার সঙ্গে বিয়ে দিতে হবে। কোনো ধরনের দেনমোহর দেওয়া-নেওয়ার ব্যাপার ছিল না এখানে।[৫৬]
একই সঙ্গে দুই বোন বিয়ে করাকে বৈধ মনে করত ইসলাম-পূর্ব আরব সমাজ। লোকদের সুযোগ ছিল একই সঙ্গে বহুসংখ্যক বিয়ে করার। এমন অনেক লোকই ছিল যারা চারের অধিক বিয়ে করেছিল। [৫৭] ইসলাম আসার পরও দেখা গেল, তাদের কারও কারও দশ কিংবা তারও অধিক স্ত্রী রয়েছে। কারও আবার দশের কম। ইসলাম নিয়ম করে দিল— চারের অধিক নয়। সঙ্গে জুড়ে দিল শর্ত: যদি কেউ তাদের ভরণ-পোষণ না দিতে পারে কিংবা সবার মধ্যে সমতা-বিধান করে চলতে না পারে, তবে তাকে একটা নিয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হবে। স্ত্রীদের মধ্যে সমতা-বিধান করার রীতি জাহিলি যুগে ছিল না। জঘন্য আচরণ করত তারা স্ত্রীদের সাথে, দিত না তাদের প্রাপ্য অধিকার। ইসলামই প্রথম নারীকে দেখাল আশার আলো; ইনসাফপূর্ণ আচরণ করল তার সঙ্গে। পুরুষদেরকে জোর উপদেশ দিল নিজ স্ত্রীর সাথে ভালো আচরণের। আরও আদেশ দিল পুরুষদের প্রতি নারীর অধিকার প্রতিপালনের, সম্পূর্ণরূপে বুঝিয়ে দিতে তার প্রাপ্যটুকু।[৫৮]
তালাক
জাহিলি আরবে ব্যাপকহারে চর্চা হতো তালাকের। একজন স্ত্রীকে ঠিক কয়টা তালাক দেওয়া যাবে এর কোনো সীমারেখা ছিল না তাদের কাছে; স্বামীর মন চাইল তো বউকে তালাক দিল, আবার মন-মরজি ঠিক আছে তো তাকে নিয়ে এল। একটু পর খেয়াল চাপল তো আবার তালাক দিল। মনঃপূত হলো না? ঠিক আছে আবার নিয়ে এল। এভাবেই চলত তাদের তালাক দেওয়া-নেওয়ার খেলা। ইসলাম আসার পরও কিছুদিন এই চর্চা বহাল ছিল।।[৫৯] এরপর কুরআনে এই বিষয়ের সুনির্দিষ্ট বিধান দেওয়া হলো। তখন তারা এমন আচরণ করা থেকে নিবৃত্ত হলো। আল্লাহ বলেন: “তালাক দুবার; এরপর (স্ত্রীকে) হয় যথোচিতভাবে রাখবে, না হয় সদয়ভাবে বিদায় দেবে।” [সূরা বাকারা, ২:২২৯]
ইসলাম এসে তালাক দেওয়ার এই বেপরোয়া গতি থামিয়ে দেয়, নির্ধারণ করে দেয় তালাক দেওয়ার নিয়মনীতি ও সংখ্যা। স্বামীদের সুযোগ দেয় বিষয়টির প্রতিকার করার। বলে দেয়, তালাক দেওয়ার পর দুবার সুযোগ আছে স্ত্রীকে ফিরিয়ে নেওয়ার। যদি স্বামী স্ত্রীকে তিন তালাক দিয়ে দেয়, তবে বৈবাহিক বন্ধন ছিন্ন হবে, যৌন- মেলামেশার বৈধতা তখন থেকেই রহিত হয়ে যাবে; এই মহিলাকে অন্য একজন বিয়ে করে যদি (স্বেচ্ছাপ্রণোদিত হয়ে, কারও চোখ রাঙানির ভয়ে কিংবা কারও দ্বারা প্ররোচিত না হয়ে) তালাক দেয়, তবে আগের স্বামী দ্বিতীয়বার নতুন করে মহিলাকে বিয়ে করে ঘর-সংসার করতে চাইলে সে সুযোগ তার জন্য আছে। আল্লাহ বলেন :
“তারপর স্বামী যদি ওই স্ত্রীকে (তৃতীয়বারের মতো) তালাক দেয়, তবে যে পর্যন্ত না ওই স্ত্রী অন্য স্বামীকে বিবাহ করছে, তার পক্ষে সে বৈধ হবে না। তারপর যদি সে (দ্বিতীয় স্বামী) তাকে তালাক দেয়, তবে তারা পরস্পরের কাছে ফিরে গেলে তাদের কোনো পাপ হবে না; যদি দুজনে ভাবে যে, তারা আল্লাহর বিধান বজায় রেখে চলতে পারবে।” [সূরা বাকারা, ২:২৩০]
তালাকের মতো আরেকটা বিষয় চালু ছিল তদানীন্তন আরব সমাজে। সেটা ছিল যিহার। যিহার বলা হয়: স্বামী তার স্ত্রীকে বলবে, “তুমি আমার কাছে আমার মায়ের পিঠের মতো।”
এমন কথা বলার পর স্ত্রী তার কাছে আর হালাল বলে বিবেচিত হতো না। মনে করত, আজীবনের জন্য স্ত্রীকে ধরা-ছোঁয়া যাবে না। ইসলাম এসে একে আখ্যায়িত করল ঘৃণ্য কথা এবং মিথ্যা বলে। কোনো স্বামী এ ঘৃণ্য কাজ করলে তার ওপর আরোপ করা হবে কাফফারা। (৬০) আল্লাহ বলেন:
“যারা তাদের স্ত্রীদের সঙ্গে যিহার করে ও পরে তাদের উক্তি প্রত্যাহার করে, (অর্থাৎ স্ত্রীর সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করার সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসে) তাদের প্রায়শ্চিত্ত: পরস্পরের সংস্পর্শে আসার আগে (কাফ্ফারাস্বরূপ) একটি দাসের মুক্তি দেওয়া; তোমাদেরকে এ উপদেশই দেওয়া হচ্ছে। তোমরা যা করো, আল্লাহ তার খবর রাখেন। কিন্তু যার এ সামর্থ্য থাকবে না তার প্রায়শ্চিত্ত: যৌন- কামনায় একে অপরকে স্পর্শ করার পূর্বে একটানা দুমাস রোজা রাখা; যে তা করতেও অসমর্থ সে ৬০ জন মিসকিনকে খাওয়াবে। এটা এজন্য যে, তোমরা যেন আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে বিশ্বাস করো। এগুলো আল্লাহর নির্ধারিত শাস্তি। আর কাফিরদের জন্য রয়েছে মর্মন্তুদ শাস্তি।” [সূরা মুজাদালাহ, ৫৮:৩-৪]
যুদ্ধ-বিগ্রহ, চুরি-ডাকাতি, রাহাজানি-হানাহানি ও জবর-দখল
জাহিলি আরবদের যুদ্ধ বাধাতে কিংবা রক্ত ঝরানোর জন্য বড় ধরনের কোনো কারণ লাগত না; তুচ্ছ কোনো কারণে তারা বাধিয়ে দিত যুদ্ধ। সামাজিক ভাবাদর্শ রক্ষার নামে যুদ্ধ বাধাতে, গোত্রের আদর্শ সমুন্নত রাখার নামে মানুষের প্রাণ সংহরণ করতে তাদের মনে কোনো কুণ্ঠাবোধ কাজ করত না। ভেবে দেখত না, যে জন্য তারা যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ছে, সেটা আদৌ যৌক্তিক কি না। জাহিলি আরবদের জীবনপ্রণালি বলতে গিয়ে ইতিহাস আমাদেরকে যা জানাচ্ছে তা এ কথাই প্রমাণ করে যে, তারা বিবেক-বুদ্ধির ধার না ধেরে, নিছক আপন খেয়ালবশে, আবেগতাড়িত হয়ে যুদ্ধে মেতে উঠত। ইসলাম-পূর্ব যুগে এক যুদ্ধবাজ জাতি ছিল আরবরা। সম্ভবত, এমন যুদ্ধংদেহি জাতি হওয়ার জন্য দায়ী তাদের পরিবেশ ও ছেলেবেলার শিক্ষাদীক্ষা。
দুটো উদাহরণ থেকে বোঝা যাবে, আরবরা কতটা যুদ্ধবাজ জাতি ছিল: সে সময়কার এমনই একটি বিখ্যাত যুদ্ধের নাম 'ইয়াওমুল বাসুস'। সংঘটিত হয় বাক্র ও তাগলিব নামের দুটি গোত্রের মধ্যে। আহামরি কোনো কারণ ছিল না যুদ্ধ লাগার পেছনে। যুদ্ধের শুরুটা কীভাবে তা হলে? বাক্স গোত্রে জারমা নামের একজন লোকের একটা উটনী ছিল। জাসসাস ইবনু মুররার খালা বাসূস বিনত মানকায নামের একজন ভদ্রমহিলা ছিল তার প্রতিবেশী। মূলত জারমার উটনীকে নিয়েই এই যুদ্ধ। একদিনের ঘটনা। তাগলিব গোত্রের সর্দার, কুলাইব, তার উট নিয়ে যায় নিজের একটি বিশেষ জায়গায় বেঁধে রাখতে। গিয়ে দেখে, পথ হারিয়ে কোত্থেকে যেন একটা উটনী (জারমার উটনী) তার উটের পালের মধ্যে এসে হাজির। সঙ্গে সঙ্গে সে আঘাত করে বসে অপরিচিত উটনীটিকে। আঘাতে উটনীটি মারা যায়। এ খবর শুনে জারমা ও তার প্রতিবেশী বাসূস ক্রোধে ফেটে পড়ে। বাসূসের ভাগ্নে জাসসাসও ততক্ষণে জেনে যায় খবরটি। হিতাহিত জ্ঞানহারা হয়ে পড়ে সে। জাসসাস একটি বারও ভাবল না যে, বড় আকার ধারণ করার আগেই কুলাইবের কাছে গিয়ে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করা উচিত। কিংবা এ কথা তো অন্ততপক্ষে বলতে পারে যে, উটনীর মূল্য তোমাকে পরিশোধ করতেই হবে। কিন্তু এসব না করে সে যা করল-সোজা গিয়ে কুলাইবকে হত্যা করে বসল। সেই শুরু। যুদ্ধের দামামা বেজে ওঠে। উভয় গোত্র মুখোমুখি হয় রণক্ষেত্রে। টানা দীর্ঘ চল্লিশ বছর চলে যুদ্ধটি।।৬১!
স্রেফ তুচ্ছ ঘটনা নিয়ে যুদ্ধ বাধানোর আরেকটি ঘটনা 'ইয়াওমু দাহিস ওয়া আল-গাবরা'। একটি ঘোড়দৌড়কে কেন্দ্র করে যুদ্ধটি সংঘটিত হয়। দাহিস ও গাবরা দুটি ঘোড়ার নাম; দাহিসের মালিক কইস ইবনু যুহাইর। গাবরার মালিক হুযাইফা ইবনু বাদ্র। একদিন, ঘোড়া দুটির মধ্যে, শুরু হয় দৌড় প্রতিযোগিতা। হুযাইফা ইবনু বাদ্র এক লোককে ইঙ্গিত করে—সে যাতে উপত্যকার এক বাঁকে গিয়ে ওত পেতে থাকে। যদি দেখে, প্রতিযোগিতায় দাহিস এগিয়ে গেছে, তবে সে যেন তাৎক্ষণিকভাবে তার ঘোড়াটির গতিরোধ করে দেয়। হুযাইফার তলপিদার হুকুমটি তামিল করল অক্ষরে অক্ষরে; দাহিসকে আঘাত করে ফেলে দেয়। ফাঁকতালে গাবরার ঘোড়াটি প্রতিযোগিতায় জিতে যায়। হুযাইফার জোচ্চুরির বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর বেজে ওঠে যুদ্ধের দামামা। বদলা নেওয়ার প্রচণ্ড জিদ চেপে বসে কইস ইবনু যুহাইরের মাথায়। 'আবাস ও যুবইয়ান গোত্র দুটি ঝাঁপিয়ে পড়ে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে। ৬৯।
বড় বড় এ দুটি যুদ্ধ ছাড়াও জাহিলি যুগে আরও অনেক যুদ্ধ সংঘটিত হয়। মাদীনার আউস ও খাযরাজ গোত্রের মধ্যে সে সময় সংঘটিত হয় এরকম অনেকগুলো যুদ্ধ। অথচ গোত্র দুটি একে অপরের সঙ্গে রক্তের সম্পর্কে সম্পর্কিত; সবাই হারিসা ইবনু সা'লাবা আল-আযদির বংশধর। সে হিসেবে চাচাতো-জ্যাঠাতো ভাই সবাই। বিখ্যাত 'আরিম বন্যার পর গোত্র দুটি ইয়াসরিবে (যা পরবর্তীকালে 'মাদীনা' নাম ধারণ করে) এসে বসবাস করা শুরু করে। তাদের পরে ইহুদিরাও রোমানদের নির্যাতনের শিকার হয়ে মাদীনায় আবাস গাড়ে।
প্রথম দিকে গোত্রগুলো মিলেমিশে শান্তিপূর্ণভাবেই বসবাস করতে থাকে; সংঘাত-সংহার, যুদ্ধ-বিগ্রহ কিছুই ছিল না। আস্তে আস্তে যুদ্ধ শান্তির জায়গা দখলে নিয়ে নেয়। ইসলাম আসার আগপর্যন্ত এভাবে নিজেদের মধ্যে যুদ্ধ লেগেই থাকত তাদের। ইহুদিরা নিজেদের ফায়দা লোটার জন্য একবার এ গোত্রের সঙ্গে তো আরেকবার ওই গোত্রের সঙ্গে মিত্রচুক্তিতে আবদ্ধ হতো। এক গোত্রের ভালো চায় বলে তাদেরকে টাকা-পয়সা দিয়ে, রণ-সরঞ্জাম দিয়ে অপর গোত্রের বিরুদ্ধে লাগিয়ে দিত যুদ্ধ। অন্যদিকে, অপর গোত্রের কাছে গিয়ে প্রমাণ করে, আমরা তোমাদের কল্যাণকামী। যুদ্ধ করতে তোমাদের যা যা প্রয়োজন, যত টাকা-পয়সা দরকার, সব আমরা দেবো; ওদেরকে ছেড়ে কথা বলা যাবে না। এগুলো করার পেছনে ইহুদিদের উদ্দেশ্য স্বীয় স্বার্থ চরিতার্থ করা বই কিছু নয়। আউস ও খাযরাজের শক্তি খর্ব করে, মাদীনার আধিপত্য একচ্ছত্রভাবে নিজেদের হাতে নেওয়াই ছিল তাদের লক্ষ্য।
আউস ও খাযরাজ গোত্রের মধ্যে সংঘটিত শেষ যুদ্ধ 'বু'আস যুদ্ধের' আগপর্যন্ত অনেক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ হয় তাদের মধ্যে। এভাবেই আউস ও খাযরাজদের মধ্যে সংঘটিত বহু যুদ্ধে ইন্ধন জোগাচ্ছিল ইহুদিরা। বছরের পর বছর যুদ্ধ বাধিয়ে রেখে গোত্রদুটিকে তারা নিঃশেষ করে ছাড়ে। প্রত্যেক গোত্র অপর গোত্রের বিরুদ্ধে নিজেদের মিত্র গোত্রগুলোর সাহায্য-সহযোগিতা নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ত হিংস্রভাবে। শেষ পর্যন্ত যুদ্ধের পরিসমাপ্তি ঘটে আউস গোত্র শান্তির পক্ষে, কল্যাণের পক্ষে অবস্থান নেওয়ার কারণে।।৬৩।
সে সময় কিছু গোত্র ছিল যারা যুদ্ধ-বিগ্রহ করত না; তবে চুরি-ডাকাতি, রাহাজানি-হানাহানি, লুণ্ঠন-ছিনতাই, স্বাধীন মানুষদের ধরে নিয়ে বন্দি করে দাস হিসেবে বিক্রি করাসহ নানা অপকর্ম করে বেড়াত। প্রসিদ্ধ কিছু সাহাবিকে, তখনও তারা ইসলাম গ্রহণ করেননি, এই গোত্রগুলো তাদেরকে ধরে বন্দি করে নিয়ে দাস বানিয়ে রাখে। উল্লেখযোগ্য এমন দুজনের একজন হলেন যাইদ ইবনু হারিসা; তিনি আরবের একজন মানুষ ছিলেন। অন্যজন সালমান ফারসি; তিনি পারস্যের একজন স্বাধীন মানুষ ছিলেন। এমন আরও অনেক স্বাধীন লোককে ধরে ধরে নিয়ে গিয়ে তারা হাটে-বাজারে বিক্রি করে দিত।
ইসলাম এসে এই নৈরাজ্যের অবসান ঘটায়। নিশ্চিত করে সবার অবাধ নিরাপত্তার; এমন নিরাপত্তা, যার ছায়াতলে একজন নারীও সান'আ থেকে হাদরামাওত পর্যন্ত সফর করতে পারত নির্বিঘ্নে। এ দীর্ঘ সফরে কোনো মানুষ তাদের ক্ষতি করবে-এমন কোনো ভয় তাদের মনে কাজ করত না। আল্লাহকে ছাড়া এই সময়ে আর কিছুরই ভয় করেনি তারা।।৬৪।
আরবদের সাক্ষরতা
সমকালীন আহলুল-কিতাব, ইহুদি ও খিষ্টানদের মতো আরবরা পড়ালেখা জানত না। মূর্খতা, নিরক্ষরতা তাদের মাঝে ছেয়ে গিয়েছিল ব্যাপক হারে। বাপ-দাদাদের অন্ধ অনুকরণ এবং প্রাচীন ধ্যান-ধারণা পোষণে- সেগুলো যতই অযৌক্তিক হোক—তাতে তারা ছিল অনড়। এক কথায়, তারা ছিল অজ্ঞ এক জাতি; লিখতে, পড়তে হিসাব- নিকাশ করতে জানত না। মোটামুটি সবাই এমন ছিল। হাতেগোনা দু-একজন ছিলেন যারা লিখতে পড়তে পারতেন। তবে, নিরক্ষরতা ও জ্ঞানের স্বল্পতা থাকা সত্ত্বেও তাদের প্রচণ্ড মেধাশক্তি, বুদ্ধিমত্তা, প্রত্যুৎপন্নমতিত্ব, কোমল অনুভূতি, সুতীক্ষ্ণ দৃষ্টি, মননশীলতা, অজানাকে জানার উদ্গ্রীব বাসনা, উপলব্ধি করতে পারলে সত্যকে মেনে নেওয়ার সৎসাহস-এমন বহু ব্যক্তিত্বপূর্ণ মহৎ গুণের জন্য তারা ছিলেন জগদ্বিখ্যাত。
যখন আরব উপদ্বীপে আগমন ঘটল ইসলামের, তারা একেকজন হয়ে উঠলেন বিদ্বান, প্রাজ্ঞ, ফকীহ। নিরক্ষরতা আর রইল পণ্ডিত। জ্ঞান-বিজ্ঞান হয়ে উঠল তাদের পরিচয়ের প্রতিশব্দ; কেউ কেউ মুনশিয়ানা দেখালেন ছন্দশাস্ত্রে। কেউ-বা নাম কুড়ালেন চিকিৎসক হিসেবে। তৎকালীন আরবের এমন একজন বিখ্যাত চিকিৎসকের নাম হারিস ইবনু কালাদা। কোনো কুসংস্কারের বিশ্বাসে নয়, জীবন ও পরিবেশ- প্রতিবেশ থেকে অর্জিত অভিজ্ঞতা-নির্ভর ছিল তার চিকিৎসা সেবা।[৬৫]
টিকাঃ
৪৯. রাসূল মুহাম্মাদ -এর ব্যক্তিত্ব: একটি বিশ্লেষণ, পৃ. ২২-২৪।
৫০. তাফসীর আল-কুরতুবি, ৫/৪৫।
৫১. দেখুন: রাসূল মুহাম্মাদ -এর ব্যক্তিত্ব: একটি বিশ্লেষণ, পৃ. ২৫, ২৬।
৫২. দেখুন: আবু শাহবা, আস-সীরাহ আন-নাবাওয়িয়া, পৃ. ১/৯২।
৫৩. দেখুন: আবু শাহবা, আস-সীরাহ আন-নাবাওয়িয়া, পৃ. ১/৮৮।
৫৪. সহীহ বুখারি, কিতাবুন-নিকাহ, পরিচ্ছেদ: যারা বলে, কোনো অভিভাবকের অনুমতি ছাড়া কোনো বিবাহ নেই, হাদীস নং ৫১২৭।
৫৫. ফাতহুল-বারি, ৯/১৫০, ইবনু হাজার আদ-দার কুতনি থেকে, তিনি আবার আবু হুরাইরা থেকে বর্ণনা করেন। বিস্তারিত জানার জন্য দেখা যেতে পারে।
৫৬. দেখুন: আবু শাহবা, আস-সীরাহ আন-নাবাওয়িয়া, ১/৯০।
৫৭. দেখুন: রাসূল মুহাম্মাদ -এর ব্যক্তিত্ব: একটি বিশ্লেষণ, পৃ. ২৫।
৫৮. দেখুন: আবু শাহবা, আস-সীরাহ আন-নাবাওয়িয়া, ১/৮৮।
৫৯. রাসূল মুহাম্মাদ -এর ব্যক্তিত্ব: একটি বিশ্লেষণ, পৃ. ২৫।
৬০. দেখুন: আবু শাহমাহ, আস-সীরাহ আন-নাবাওয়িয়া, ১/১/৯১।
৬১. ইবনুল-আসীর, আল-কামিল ফী আত-তারীখ, ১/৩১২।
৬২. প্রাগুক্ত, ১/৩৪৩।
৬৩. ড. 'আবদুল-আযীয আল-হামীদি, আত-তারীখ আল-ইসলামি, ১/৫৫।
৬৪. দেখুন: আবু শাহবা, আস-সীরাহ আন-নাবাওয়িয়া, ১/৯৩।
৬৫. প্রাগুক্ত, ১/৯৩।