📄 প্রাচীন আরবের সভ্যতা
প্রাচীনকালে আরবে বেশ কিছু সভ্যতা গড়ে ওঠে এবং তাদের দ্বারা সুদৃঢ় নগরায়ণও হয় বিভিন্ন অঞ্চলে। উল্লেখযোগ্য কিছু সভ্যতার পরিচয় নিচে বিধৃত হলো :
ইয়েমেনের সাবা-সভ্যতা
এই সভ্যতার কথা কুরআনে উল্লেখ আছে। সূরা সাবায় আল্লাহ এই সভ্যতার কথা সবিস্তারে আলোচনা করেছেন। বৃষ্টির নির্মল পানি ও পাহাড়-বেয়ে-নামা ঝরনার সুমিষ্ট পানি থেকে নানাভাবে উপকৃত হতো এই অঞ্চলের ইয়েমেনবাসী। ঝরনার পানি গিয়ে মিশত সাগরে। সেখান থেকে উন্নত প্রযুক্তিবলে তারা নির্মাণ করেছিল বেশকিছু জলাধার এবং টেকসই বাঁধ। এমনই একটি বিখ্যাত, টেকসই ও মজবুত বাঁধের নাম সাদ্দু মা'রিব তথা মা'রিব বাঁধ। এই বাঁধের পানি তারা লাগাত চাষবাসের কাজে। হাজার জাতের গাছপালার বাগান করত সেই বাঁধের পানির সাহায্য নিয়ে। পত্রপল্লবে সুশোভিত তরুলতা গাছগাছালিতে ছেয়ে যেত চারদিক, সুস্বাদু সব ফলমূল এবং সুজলা-সুফলা শস্য-শ্যামলা এক অনিন্দ্যসুন্দর দৃশ্যের অবতারণা হতো সেখানে। আল্লাহ তা'আলা তাদের ব্যাপারেই বলেছেন:
“সাবাবাসীদের জন্য তাদের আবাসভূমিতে ছিল এক নিদর্শন। যাতে ছিল দুটি বাগান-একটি ডান দিকে, অপরটি বাঁ দিকে। তোমরা তোমাদের রবের দেওয়া রিক থেকে খাও এবং তাঁরই কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করো। (কতই না!) সুন্দরতম নগরী এবং ক্ষমাশীল রব। কিন্তু তারা আদেশ অমান্য করল। ফলে আমি তাদের ওপর প্রবাহিত করলাম বাঁধভাঙা বন্যা এবং তাদের বাগান দুটিকে এমন দুটি বাগানে পর্যবসিত করে দিলাম, যেখানে উৎপন্ন হয় বিস্বাদ ফলমূল, ঝাউগাছ এবং কিছু (অখাদ্য) বরই গাছ। তাদের কুফরির কারণেই তাদেরকে আমি এমন শাস্তি দিয়েছিলাম। অকৃতজ্ঞ ছাড়া আমি আর কাউকেই কি এমন শাস্তি দিতে পারি?" [সূরা সাবা, ৩৪: ১৫-১৭]
কুরআনুল-কারীম আমাদেরকে জানান দিচ্ছে যে, প্রাচীনকালে অনেক সংযুক্ত বা গুচ্ছগ্রামের অস্তিত্ব ছিল। ইয়েমেন থেকে শুরু করে হিজায (মাক্কা, মাদীনা ও তায়িফ ইত্যাদি অঞ্চল), এবং উত্তর দিকে শামদেশ পর্যন্ত বিশাল এলাকাজুড়ে ছিল এ গুচ্ছগ্রামের বিস্তৃতি। বণিক ও পর্যটকরা বাণিজ্য ও পর্যটন উপলক্ষ্যে কাফেলা নিয়ে বেরিয়ে পড়ত ইয়েমেন থেকে শামদেশ অভিমুখে। কিন্তু এ দীর্ঘপথে তারা ছায়া, পানি কিংবা খাবারের কোনো ধরনের অভাব অনুভব করত না। মহান আল্লাহ বলেন:
"তাদের এবং যেসব জনপদের প্রতি আমি অনুগ্রহ করেছিলাম, সেগুলোর মধ্যে আমি স্থাপন করেছিলাম দৃশ্যমান বহু জনপদ। এবং ওইসব জনপদে ভ্রমণের যথাযথ ব্যবস্থা করেছিলাম। (বলেছিলাম) রাতে কিংবা দিনে, তোমরা এই দুই জনপদে ভ্রমণ করো নিরাপদে। কিন্তু তারা বলল, হে আমাদের রব! আমাদের সফরের মাঝে ব্যবধানকে বর্ধিত করুন! বস্তুত নিজেদের প্রতি তারা জুলুম করেছিল। ফলে তাদেরকে আমি উপাখ্যানে (এমন কাহিনি যাতে অন্যদের জন্য শিক্ষা কিংবা দৃষ্টান্ত রয়েছে) পরিণত করলাম এবং তাদেরকে ছিন্নভিন্ন করে দিলাম সম্পূর্ণরূপে। নিশ্চয় প্রত্যেক কৃতজ্ঞ ধৈর্যশীল ব্যক্তির জন্য এতে অনেক নিদর্শন রয়েছে।” [সূরা সাবা, ৩৪: ১৮, ১৯]
আহকাফ (৩৪) 'আদ সভ্যতা
'আদ সম্প্রদায়ের বসবাস ছিল হাদরামাউত অঞ্চলের উত্তরে। আল্লাহ তাদের নিকট হুদকে নবি করে পাঠান। সুউচ্চ ও জাঁকজমকপূর্ণ প্রাসাদ, সুদৃঢ় ও চোখধাঁধানো অট্টালিকা, সুনির্মিত গোলাকৃতির খিলানের অধিকারী ছিল তারা। তাদের ছিল পত্রপল্লবে সুশোভিত বাগান, সুজলা-সুফলা, শস্য-শ্যামলা, নয়নাভিরাম খেত-খামার এবং কলকল রবে প্রবহমান ঝরনাধারা।।৩৫। আল্লাহ বলেন:
“আদ জাতি রাসূলদেরকে অস্বীকার করেছিল। যখন তাদের ভাই হুদ তাদেরকে বলেছিল, 'তোমরা কি আল্লাহকে ভয় করবে না? নিশ্চয় আমি তোমাদের জন্য এক বিশ্বস্ত রাসূল। তাই তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং আমার আনুগত্য করো। বিনিময়ে তোমাদের কাছে আমি কোনো প্রতিদান চাই না। আমার প্রতিদান কেবল জগৎসমূহের রবের নিকটই রয়েছে। তোমরা কি প্রতিটি উঁচু জায়গায় স্মারক নির্মাণ (এটা তাদের ধন-সম্পদ এবং শক্তিমত্তার একটা নিদর্শন) করছ নিরর্থক? আর তোমরা এমনভাবে প্রাসাদ-অট্টালিকা নির্মাণ করছ যেন তোমরা চিরস্থায়ী হবে? এবং তোমরা যখন আঘাত হানো, তখন উৎপীড়কের মতোই আঘাত করো। অতএব, আল্লাহকে ভয় করো এবং আমার আনুগত্য করো। এবং তাঁকেই ভয় করো, যিনি তোমাদেরকে সেই সমুদয় বস্তু দিয়েছেন, যা তোমরা জানো। তিনি তোমাদেরকে দিয়েছেন চতুষ্পদ জন্তু এবং সন্তান-সন্ততি; উদ্যান এবং ঝরনাধারা'।” [সূরা আশ-শু'আরা, ২৬: ১২৩-১৩৪]
হিজাযে সামূদ সভ্যতা
সামূদ নামের একটি জাতির কথাও কুরআনে উল্লেখ পাওয়া যায়। হিজর অঞ্চলে ছিল তাদের বসবাস। তাদের সভ্যতার গোড়াপত্তন এখানেই। পাহাড় কেটে দালান-কোঠা তৈরি, ঝরনাধারা, বাগবাগিচা এবং খেত-খামারে শোভিত তাদের এক সুন্দর দেশের ৩৬/১৬ বর্ণনা কুরআন দিয়েছে সবিস্তারে। আল্লাহ বলেন:
“সামুদ জাতি রাসূলদেরকে অস্বীকার করেছিল। যখন তাদের ভাই সালিহ তাদেরকে বলেছিল, তোমরা কি ভয় করবে না আল্লাহকে? নিশ্চয় আমি তোমাদের জন্য এক বিশ্বস্ত রাসূল। তাই তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং আমার আনুগত্য করো। বিনিময়ে আমি তোমাদের কাছে কোনো প্রতিদান চাই না, আমার প্রতিদান কেবল জগৎসমূহের রবের নিকটই রয়েছে। যা এখানে (পৃথিবীতে) আছে তাতে কি তোমাদের ছেড়ে দেওয়া হবে নিরাপদে (মৃত্যু থেকে), ঝরনাধারা এবং বাগবাগিচার মাঝে, শস্যক্ষেত্রে এবং সুকোমল গুচ্ছবিশিষ্ট খেজুরের উদ্যানে? এবং তোমরা সুনিপুণভাবে পাহাড় কেটে ঘর-বাড়ি নির্মাণ করছ। অতএব, আল্লাহকে ভয় করো এবং আমার আনুগত্য করো'।” [সূরা আশ-শু'আরা, ২৬: ১৪১-১৫০]
তাদের প্রসঙ্গে আল্লাহ অন্যত্র বলেন, “এবং স্মরণ করো যখন 'আদ জাতির পর তিনি (আল্লাহ) তোমাদেরকে তাদের স্থলাভিষিক্ত করেছিলেন এবং তোমাদেরকে পৃথিবীতে করেছিলেন প্রতিষ্ঠিত। তোমরা সমতল ভূমিতে প্রাসাদ এবং পাহাড় কেটে কেটে বানিয়ে নিয়েছ আবাসগৃহ। অতএব, তোমরা আল্লাহর অনুগ্রহের কথা স্মরণ করো। আর পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করো না।” [সূরা আ'রাফ, ৭: ৭৪]
অনেক দিন হলো তাদের সবকিছুই হারিয়ে গেছে, বিলীন হয়েছে কালের গর্ভে; তাদের বাস্তুভিটাগুলো খাঁখাঁ বিরান পড়ে আছে, পাহাড়ের গায়ে অঙ্কিত কিছু নকশা প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন হয়ে দাঁড়িয়ে আছে কালের সাক্ষী হয়ে। যে গ্রাম ও শহর নিয়ে তাদের গর্বের অন্ত ছিল না, তা আজ আর নেই। ঘর-বাড়ি, দালান-কোঠা, প্রাসাদ-অট্টালিকা পড়ে আছে মুখ থুবড়ে। এখন আর ঝরনাধারার সেই কলকল রব মুখরিত করে না চারপাশ। গাছে গাছে ছেয়ে যায় না পত্রপল্লব। দুচোখের প্রশান্তির কারণ হয় না বন-বনানী। শস্য-শ্যামল ছোঁয়া সমীরণ আছড়ে পড়ে না ভালো লাগা হয়ে। সবকিছু আজ ধু-ধু মরুভূমি। (৩৭)
টিকাঃ
৩৪. আহকাফ শব্দটির অর্থ-বালির স্তম্ভসমূহ; কুরআন 'আদ জাতির অবস্থান বোঝানোর জন্য আহকাফ শব্দটি ব্যবহার করেছে। এতে প্রমাণিত, 'আদ জাতি বালুর টিলাময় এলাকায় বসবাস করত।
৩৫. দেখুন: আবু শাহবা, আস-সীরাহ আন-নাবাওয়িয়া, ১/৫০।
৩৬. আবু শাহবা, আস-সীরাহ আন-নাবাওয়িয়া, ১/৫১।
৩৭. প্রাগুক্ত।