📘 রউফুর রহীম 📄 প্রাচীন আরব

📄 প্রাচীন আরব


ঐতিহাসিকরা নৃতাত্ত্বিক পরিচয়ে আরবদেরকে তাদের পরবর্তী বংশধরদের ধারা অনুযায়ী তিন ভাগে ভাগ করেছেন।।২১৷ যথা:

বা'ইদা আরব
'আদ, সামূদ, আমালিকা, তস্য, জাদিস, উমাইম, জুরহুম, হাদরামাউত এবং তাদের সঙ্গে সম্পৃক্ত আরও কিছু গোত্র নিয়েই গঠিত বা'ইদাহ আরব। ইসলাম আসার আগেই এদের অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যায়। শাম (সিরিয়া ও তার আশপাশের এলাকা নিয়ে গঠিত) ও মিশর অঞ্চল নিয়ে বিস্তৃত ছিল এদের রাজত্ব।।২২।

'আরিবা আরব
এ ধারার লোকেরা ইয়া'রুব ইবনু ইয়াশজুব ইবনু কুহতানের বংশধর। এদেরকে কাহতানিয়া।২৩। আরব নামে ডাকা হতো। এরা দক্ষিণ আরব নামেও সবার কাছে পরিচিত ছিল।২৪। ইয়েমেনের রাজন্যবর্গ এবং মা'ঈন, সাবা এবং হিময়ার গোত্রের লোকজন ছিল এই ধারার অন্তর্গত।।২৫]

আদনানি আরব
এ ধারার আরবদেরকে বলা হতো আদনানি আরব। কারণ, এরা আদনানের বংশধর। এ আদনানের বংশধারা গিয়ে মিলিত হয়েছে নবি 'ইসমাঈল ইবনু ইবরাহীমের সঙ্গে। এরা মুসতা'রিবাহ আরব নামে পরিচিতি পেয়েছিল। অর্থাৎ এরা বহিরাগত আরব—আরবে এসে বসতি স্থাপন করে এবং আরবি ভাষা গ্রহণ করে। এদের শরীরে অনারব রক্তধারা প্রবাহিত। তারপর অনারব ও আরব এই দু-ধারার রক্ত বৈবাহিক বন্ধনে আবদ্ধ হয়। একটা সময় এসে নতুন ধারার এই আদনানি আরবদের মাতৃভাষা হয়ে ওঠে আরবি。

এ আদনানি ধারার আরবরা ছিল উত্তরের আরব। তাদের সত্যিকারের মাতৃভূমি মাক্কা। এরা সবাই জুরহুম গোত্র এবং নবি 'ইসমাঈলের বংশধর। ইবরাহীম (আঃ) তাঁর স্ত্রী ও সন্তান 'ইসমাঈলকে আল্লাহর আদেশে মক্কায় রেখে গিয়েছিলেন। 'ইসমাঈল বড় হন জুরহুম গোত্রে। শেখেন আরবি ভাষা। বড় হয়ে এ বংশেরই একজন মেয়েকে বিয়ে করেন তিনি। তার সন্তানরা বেড়ে ওঠে জুরহুমদের মতো আরব হিসেবেই। নবি ইসমাইলের বংশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব আদনান ছিলেন রাসূলুল্লাহর ঊর্ধ্বতন পুরুষ। আদনান থেকেই আরব গোত্র-উপগোত্রগুলোর পথচলা শুরু। আদনানের পর আসে তার ছেলে মা'দ। এরপর আসে নিযার। নিযারের পর আসে তাঁর দুই সন্তান মুদার ও রাবি'আ।

রাবি'আ ইবনু নিযারের বংশধরের লোকেরা আবাস গড়ে তোলে পূর্বে; 'আবদুল- কাইস গোত্র বাহরাইনে, হানিফা গোত্র ইয়ামামাতে, বাহরাইন ও ইয়ামামার মাঝামাঝি কোনো এক জায়গায় বাক্স ইবনু ওয়াইলের বংশধররা বসবাস শুরু করে। তাগলাব গোত্র ফোরাত অববাহিকা অতিক্রম করে আরও সামনে এগিয়ে গিয়ে দজলা ও ফোরাত নদীর উপদ্বীপ অঞ্চলে আবাস গাড়ে। আর তামিমের লোকেরা গিয়ে ওঠে বাসার মরুপল্লিতে।[২৬]

অন্যদিকে, মুদারের শাখা সালীম গোত্রটি মাদীনার কাছাকাছি একটি জায়গায় তাদের নিবাস গড়ে তোলে। সাকীফ গোত্র তায়িফে, হাওযান গোত্রের বাকি অংশ মক্কার পূর্বে এবং পূর্ব-তাইমা থেকে শুরু করে পশ্চিম কূফা পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল আসাদ বংশধরদের বাসস্থান। যুবইয়ান এবং 'আক্স বংশধরদের বসবাস ছিল তাইমা থেকে হাওয়ারান পর্যন্ত বিস্তৃত এলাকায়।।২৭]

অধিকাংশ কুলজিশাস্ত্র বিশেষজ্ঞ ও অন্য জ্ঞানীগণ আরবদেরকে দুইভাগে ভাগ করেন: আদনানি আরব ও কহতানি আরব। তবে কোনো কোনো বিশেষজ্ঞ মনে করেন যে, আরবরা সবাই আদনানি ধারার। আর কাহতানি আরবদের বংশধারা গিয়ে মিশেছে, তাদের মতে, নবি 'ইসমাঈল পর্যন্ত।[২৮]

ইমাম বুখারি তার সহীহ বুখারিতে এই বিষয়ে 'ইসমাঈলের সঙ্গে ইয়েমেনবাসীদের (কাহতানি আরব) সম্পৃক্ততা' নামে একটি অধ্যায় প্রণয়ন করেন। অধ্যায়টিতে তিনি সালামা থেকে একটি হাদীস বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেন, “একদিন রাসূল (সাঃ) তিরন্দাজি চর্চা করছিলেন। তখন তিনি আসলাম গোত্রের এমন কিছু লোকের কাছে গিয়ে বললেন, 'হে 'ইসমাঈলের বংশধর। নিক্ষেপ করো। কারণ, তোমাদের পিতা তো একজন তিরন্দাজ ছিলেন। আর আমার সমর্থন অমুক বংশধরদের (তিরন্দাজি চর্চারত একটি দলের) সঙ্গেই আছে।'

“কিন্তু একটি দল হাত গুটিয়ে নিবৃত্ত রইল। তিনি বললেন, 'তোমাদের কী হলো?'

“তারা বলল, 'আপনার সমর্থন অমুক দলের সঙ্গে থাকলে আমরা কীভাবে তির ছুড়ব?'

"তিনি বললেন, 'নিক্ষেপ করো, আমি তোমাদের সবার সঙ্গেই আছি।” (২৯)

ইমাম বুখারি বলেন,
“আসলাম ইবনু 'আফসা ইবনু হারিসা ইবনু 'আমর ইবনু আমির ছিলেন খুযা'আ গোত্রের। অর্থাৎ আল্লাহ তা'আলা যখন সাবা জাতির ওপর 'আরিম তথা বাঁধভাঙা বন্যা পাঠান, তখন তারা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। তাদেরই বিচ্ছিন্ন একটি দল এই খুযা'আ গোত্র।” (৩০)

মুদার থেকে চলে আসা একটি ধারাতেই শ্রেষ্ঠ নবি মুহাম্মাদের জন্ম। ইমাম বুখারি কুলাইব ইবনু ওয়াইল থেকে বর্ণনা করেন: তিনি বলেন যে, “রাসূলুল্লাহর পালিত কন্যা যাইনাব বিনতে আবু সালামার কাছে জানতে চাই, 'আচ্ছা আপনি কি মনে করেন রাসূল মুদারের কোনো ধারার লোক ছিলেন?'

“উত্তরে তিনি আমাকে বলেন, 'তিনি মুদার গোত্রের লোক না হলে আর কে হবেন? হ্যাঁ, তিনি নাদর ইবনু কিনানার বংশধর।' (৩১)

কুরাইশরা কিনানাদেরই অধস্তন একটি ধারা। তারা সবাই ফিহির ইবনু মালিক ইবনু নাদর ইবনু কিনানার বংশধর। আবার কুরাইশ গোত্রটি ছিল নানান উপগোত্রে বিভক্ত। উল্লেখযোগ্য উপগোত্রগুলো হলো: জুমাহ, সাহম 'আদ, মাখযূম, তাইম, যুহরাহ এবং বিশেষ করে কুসাই ইবনু কিলাবের শাখাগোত্রগুলো; যেমন: 'আবদুদ- দার ইবনু কুসাই, আসাদ ইবনু 'আবদুল-উয্যা ইবনু কুসাই, 'আব্দ-মানাফ ইবনু কুসাই। 'আব্দ-মানাফ আবার চারটি প্রশাখায় বিভক্ত ছিল: 'আব্দ-শাম্স, নাওফিল, মুত্তালিব এবং হাশিম। ইনিই সেই হাশিম যার ঘরে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা আমাদের প্রিয় রাসূল, সাইয়্যিদুনা মুহাম্মাদ ইবনু 'আবদুল্লাহ ইবনু 'আবদুল-মুত্তালিব ইবনু হাশিমকে প্রেরণ করেন।।৩২। রাসূল বলেন,

“আল্লাহ 'ইসমাঈলের বংশ থেকে কিনানাকে বাছাই করেন। কিনানা থেকে বাছাই করেন কুরাইশকে। কুরাইশ থেকে বাছাই করেন বানু হাশিমকে। আর আল্লাহ আমাকে মনোনীত করেন বানু হাশিম থেকে।” [৩৩]

টিকাঃ
২১. দেখুন: আল-গাদবান, ফিকহুস-সীরাহ আন-নাবাওয়িয়া, পৃ. ৪৫।
২২. আবু শু'বাহ, আস-সীরাহ আন-নাবাওয়িয়া, ১/৪৬।
২৩. আল-গাদবান, ফিকহুস-সীরাহ আম-নাবাওয়িয়া, পৃ. ৪৫।
২৪. মাদখাল লিফাহমিস-সীরাহ, পৃ. ৯৮।
২৫. আবু শু'বাহ, আস-সীরাহ আন-নাবাওয়িয়া, ১/৪৭।
২৬. মাদখাল লিফাহমিস-সীরাহ, পৃ. ৯৮, ৯৯।
২৭. দেখুন: 'আদিল কামাল, নগরায়নের পথে, পৃ. ৪০।
২৮. দেখুন: আবু শাহবা, আস-সীরাহ আন-নাবাওয়িয়া, ১/৪৮।
২৯. সহীহ বুখারি, কিতাব আল-মানাকিব, ৩৫০৯।
৩০. দেখুন: আবু শুহাদাহ, আস-সীরাহ আন-নাবাওয়িয়া, ১/৪৮।
৩১. সহীহ বুখারি, কিতাব আল-মানাকিব, ৩৪৯১।
৩২. দেখুন: আল-গাদবান, ফিকহুস-সীরাহ আন-নাবাওয়িয়া, পৃ. ৪৭১।
৩৩. সহীহ মুসলিম, অধ্যায়: রাসূলুল্লাহর বংশমর্যাদা, ৪/১৭৮২, হাদীস নং ২২৭৬。

📘 রউফুর রহীম 📄 প্রাচীন আরবের সভ্যতা

📄 প্রাচীন আরবের সভ্যতা


প্রাচীনকালে আরবে বেশ কিছু সভ্যতা গড়ে ওঠে এবং তাদের দ্বারা সুদৃঢ় নগরায়ণও হয় বিভিন্ন অঞ্চলে। উল্লেখযোগ্য কিছু সভ্যতার পরিচয় নিচে বিধৃত হলো :

ইয়েমেনের সাবা-সভ্যতা
এই সভ্যতার কথা কুরআনে উল্লেখ আছে। সূরা সাবায় আল্লাহ এই সভ্যতার কথা সবিস্তারে আলোচনা করেছেন। বৃষ্টির নির্মল পানি ও পাহাড়-বেয়ে-নামা ঝরনার সুমিষ্ট পানি থেকে নানাভাবে উপকৃত হতো এই অঞ্চলের ইয়েমেনবাসী। ঝরনার পানি গিয়ে মিশত সাগরে। সেখান থেকে উন্নত প্রযুক্তিবলে তারা নির্মাণ করেছিল বেশকিছু জলাধার এবং টেকসই বাঁধ। এমনই একটি বিখ্যাত, টেকসই ও মজবুত বাঁধের নাম সাদ্দু মা'রিব তথা মা'রিব বাঁধ। এই বাঁধের পানি তারা লাগাত চাষবাসের কাজে। হাজার জাতের গাছপালার বাগান করত সেই বাঁধের পানির সাহায্য নিয়ে। পত্রপল্লবে সুশোভিত তরুলতা গাছগাছালিতে ছেয়ে যেত চারদিক, সুস্বাদু সব ফলমূল এবং সুজলা-সুফলা শস্য-শ্যামলা এক অনিন্দ্যসুন্দর দৃশ্যের অবতারণা হতো সেখানে। আল্লাহ তা'আলা তাদের ব্যাপারেই বলেছেন:

“সাবাবাসীদের জন্য তাদের আবাসভূমিতে ছিল এক নিদর্শন। যাতে ছিল দুটি বাগান-একটি ডান দিকে, অপরটি বাঁ দিকে। তোমরা তোমাদের রবের দেওয়া রিক থেকে খাও এবং তাঁরই কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করো। (কতই না!) সুন্দরতম নগরী এবং ক্ষমাশীল রব। কিন্তু তারা আদেশ অমান্য করল। ফলে আমি তাদের ওপর প্রবাহিত করলাম বাঁধভাঙা বন্যা এবং তাদের বাগান দুটিকে এমন দুটি বাগানে পর্যবসিত করে দিলাম, যেখানে উৎপন্ন হয় বিস্বাদ ফলমূল, ঝাউগাছ এবং কিছু (অখাদ্য) বরই গাছ। তাদের কুফরির কারণেই তাদেরকে আমি এমন শাস্তি দিয়েছিলাম। অকৃতজ্ঞ ছাড়া আমি আর কাউকেই কি এমন শাস্তি দিতে পারি?" [সূরা সাবা, ৩৪: ১৫-১৭]

কুরআনুল-কারীম আমাদেরকে জানান দিচ্ছে যে, প্রাচীনকালে অনেক সংযুক্ত বা গুচ্ছগ্রামের অস্তিত্ব ছিল। ইয়েমেন থেকে শুরু করে হিজায (মাক্কা, মাদীনা ও তায়িফ ইত্যাদি অঞ্চল), এবং উত্তর দিকে শামদেশ পর্যন্ত বিশাল এলাকাজুড়ে ছিল এ গুচ্ছগ্রামের বিস্তৃতি। বণিক ও পর্যটকরা বাণিজ্য ও পর্যটন উপলক্ষ্যে কাফেলা নিয়ে বেরিয়ে পড়ত ইয়েমেন থেকে শামদেশ অভিমুখে। কিন্তু এ দীর্ঘপথে তারা ছায়া, পানি কিংবা খাবারের কোনো ধরনের অভাব অনুভব করত না। মহান আল্লাহ বলেন:

"তাদের এবং যেসব জনপদের প্রতি আমি অনুগ্রহ করেছিলাম, সেগুলোর মধ্যে আমি স্থাপন করেছিলাম দৃশ্যমান বহু জনপদ। এবং ওইসব জনপদে ভ্রমণের যথাযথ ব্যবস্থা করেছিলাম। (বলেছিলাম) রাতে কিংবা দিনে, তোমরা এই দুই জনপদে ভ্রমণ করো নিরাপদে। কিন্তু তারা বলল, হে আমাদের রব! আমাদের সফরের মাঝে ব্যবধানকে বর্ধিত করুন! বস্তুত নিজেদের প্রতি তারা জুলুম করেছিল। ফলে তাদেরকে আমি উপাখ্যানে (এমন কাহিনি যাতে অন্যদের জন্য শিক্ষা কিংবা দৃষ্টান্ত রয়েছে) পরিণত করলাম এবং তাদেরকে ছিন্নভিন্ন করে দিলাম সম্পূর্ণরূপে। নিশ্চয় প্রত্যেক কৃতজ্ঞ ধৈর্যশীল ব্যক্তির জন্য এতে অনেক নিদর্শন রয়েছে।” [সূরা সাবা, ৩৪: ১৮, ১৯]

আহকাফ (৩৪) 'আদ সভ্যতা
'আদ সম্প্রদায়ের বসবাস ছিল হাদরামাউত অঞ্চলের উত্তরে। আল্লাহ তাদের নিকট হুদকে নবি করে পাঠান। সুউচ্চ ও জাঁকজমকপূর্ণ প্রাসাদ, সুদৃঢ় ও চোখধাঁধানো অট্টালিকা, সুনির্মিত গোলাকৃতির খিলানের অধিকারী ছিল তারা। তাদের ছিল পত্রপল্লবে সুশোভিত বাগান, সুজলা-সুফলা, শস্য-শ্যামলা, নয়নাভিরাম খেত-খামার এবং কলকল রবে প্রবহমান ঝরনাধারা।।৩৫। আল্লাহ বলেন:

“আদ জাতি রাসূলদেরকে অস্বীকার করেছিল। যখন তাদের ভাই হুদ তাদেরকে বলেছিল, 'তোমরা কি আল্লাহকে ভয় করবে না? নিশ্চয় আমি তোমাদের জন্য এক বিশ্বস্ত রাসূল। তাই তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং আমার আনুগত্য করো। বিনিময়ে তোমাদের কাছে আমি কোনো প্রতিদান চাই না। আমার প্রতিদান কেবল জগৎসমূহের রবের নিকটই রয়েছে। তোমরা কি প্রতিটি উঁচু জায়গায় স্মারক নির্মাণ (এটা তাদের ধন-সম্পদ এবং শক্তিমত্তার একটা নিদর্শন) করছ নিরর্থক? আর তোমরা এমনভাবে প্রাসাদ-অট্টালিকা নির্মাণ করছ যেন তোমরা চিরস্থায়ী হবে? এবং তোমরা যখন আঘাত হানো, তখন উৎপীড়কের মতোই আঘাত করো। অতএব, আল্লাহকে ভয় করো এবং আমার আনুগত্য করো। এবং তাঁকেই ভয় করো, যিনি তোমাদেরকে সেই সমুদয় বস্তু দিয়েছেন, যা তোমরা জানো। তিনি তোমাদেরকে দিয়েছেন চতুষ্পদ জন্তু এবং সন্তান-সন্ততি; উদ্যান এবং ঝরনাধারা'।” [সূরা আশ-শু'আরা, ২৬: ১২৩-১৩৪]

হিজাযে সামূদ সভ্যতা
সামূদ নামের একটি জাতির কথাও কুরআনে উল্লেখ পাওয়া যায়। হিজর অঞ্চলে ছিল তাদের বসবাস। তাদের সভ্যতার গোড়াপত্তন এখানেই। পাহাড় কেটে দালান-কোঠা তৈরি, ঝরনাধারা, বাগবাগিচা এবং খেত-খামারে শোভিত তাদের এক সুন্দর দেশের ৩৬/১৬ বর্ণনা কুরআন দিয়েছে সবিস্তারে। আল্লাহ বলেন:

“সামুদ জাতি রাসূলদেরকে অস্বীকার করেছিল। যখন তাদের ভাই সালিহ তাদেরকে বলেছিল, তোমরা কি ভয় করবে না আল্লাহকে? নিশ্চয় আমি তোমাদের জন্য এক বিশ্বস্ত রাসূল। তাই তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং আমার আনুগত্য করো। বিনিময়ে আমি তোমাদের কাছে কোনো প্রতিদান চাই না, আমার প্রতিদান কেবল জগৎসমূহের রবের নিকটই রয়েছে। যা এখানে (পৃথিবীতে) আছে তাতে কি তোমাদের ছেড়ে দেওয়া হবে নিরাপদে (মৃত্যু থেকে), ঝরনাধারা এবং বাগবাগিচার মাঝে, শস্যক্ষেত্রে এবং সুকোমল গুচ্ছবিশিষ্ট খেজুরের উদ্যানে? এবং তোমরা সুনিপুণভাবে পাহাড় কেটে ঘর-বাড়ি নির্মাণ করছ। অতএব, আল্লাহকে ভয় করো এবং আমার আনুগত্য করো'।” [সূরা আশ-শু'আরা, ২৬: ১৪১-১৫০]

তাদের প্রসঙ্গে আল্লাহ অন্যত্র বলেন, “এবং স্মরণ করো যখন 'আদ জাতির পর তিনি (আল্লাহ) তোমাদেরকে তাদের স্থলাভিষিক্ত করেছিলেন এবং তোমাদেরকে পৃথিবীতে করেছিলেন প্রতিষ্ঠিত। তোমরা সমতল ভূমিতে প্রাসাদ এবং পাহাড় কেটে কেটে বানিয়ে নিয়েছ আবাসগৃহ। অতএব, তোমরা আল্লাহর অনুগ্রহের কথা স্মরণ করো। আর পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করো না।” [সূরা আ'রাফ, ৭: ৭৪]

অনেক দিন হলো তাদের সবকিছুই হারিয়ে গেছে, বিলীন হয়েছে কালের গর্ভে; তাদের বাস্তুভিটাগুলো খাঁখাঁ বিরান পড়ে আছে, পাহাড়ের গায়ে অঙ্কিত কিছু নকশা প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন হয়ে দাঁড়িয়ে আছে কালের সাক্ষী হয়ে। যে গ্রাম ও শহর নিয়ে তাদের গর্বের অন্ত ছিল না, তা আজ আর নেই। ঘর-বাড়ি, দালান-কোঠা, প্রাসাদ-অট্টালিকা পড়ে আছে মুখ থুবড়ে। এখন আর ঝরনাধারার সেই কলকল রব মুখরিত করে না চারপাশ। গাছে গাছে ছেয়ে যায় না পত্রপল্লব। দুচোখের প্রশান্তির কারণ হয় না বন-বনানী। শস্য-শ্যামল ছোঁয়া সমীরণ আছড়ে পড়ে না ভালো লাগা হয়ে। সবকিছু আজ ধু-ধু মরুভূমি। (৩৭)

টিকাঃ
৩৪. আহকাফ শব্দটির অর্থ-বালির স্তম্ভসমূহ; কুরআন 'আদ জাতির অবস্থান বোঝানোর জন্য আহকাফ শব্দটি ব্যবহার করেছে। এতে প্রমাণিত, 'আদ জাতি বালুর টিলাময় এলাকায় বসবাস করত।
৩৫. দেখুন: আবু শাহবা, আস-সীরাহ আন-নাবাওয়িয়া, ১/৫০।
৩৬. আবু শাহবা, আস-সীরাহ আন-নাবাওয়িয়া, ১/৫১।
৩৭. প্রাগুক্ত।

ফন্ট সাইজ
15px
17px