📄 রোমান সাম্রাজ্য
পূর্ব-রোমান সাম্রাজ্য 'বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য' নামেই সমধিক পরিচিত ছিল। গ্রিক, বলকান, এশিয়া, সিরিয়া, ফিলিস্তিন, মিশর ও উত্তর-আফ্রিকা জুড়ে ছিল এ সাম্রাজ্যের কর্তৃত্ব। এর রাজধানী ছিল কনস্টান্টিনোপল, যা বর্তমানের ইস্তাম্বুল। এদের শাসকগোষ্ঠী ছিল চরম স্বৈরাচারী; প্রজা-সাধারণের ওপর তারা সীমাহীন জুলুম-নির্যাতন চালাত এবং তাদের ওপর চাপিয়ে দিত পাহাড়সম করের বোঝা। সংগত কারণেই অরাজকতা, নৈরাজ্য ও এক ধরনের চাপা ক্ষোভ ছেয়ে যায় সাম্রাজ্যময়। অন্যদিকে জীবনের কোনো উদ্দেশ্য না থাকায় জনগণ মজে থাকত নানা ধরনের রং-তামাশা আর খেলাধুলায়।
মিশরের কথা ধরা যাক। ধর্মীয় বাড়াবাড়ি এবং রাজনৈতিক স্বেচ্ছাচারিতা ছিল তাদের মজ্জাগত। বাইজেন্টাইন শাসকরা দেশ এবং দেশের জনগণকে ভাবত তাদের গৃহপালিত দুগ্ধবতী বকরির মতো; দুধ দিলে ভালো, অন্যথায় তাড়িয়ে দাও। চুষে নিংড়ে নিত তাদের সবকিছু, বিনিময়ে তাদের জুটত না কিছুই।
সিরিয়ায় মানুষদের ধরে ধরে ক্রীতদাস বানানোসহ চলছিল সব রকম জুলুম নির্যাতনের মহোৎসব। শাসকরা জনগণের আস্থা অর্জনে মোটেই বিশ্বাসী ছিল না। তাই পেশীশক্তি এবং জোর-জবরদস্তির ওপরই ছিল তাদের আস্থা। এ যেন জোর যার মুল্লুক তার। নিজ জাতিকে এমনভাবে শাসন করত যেন তারা ভিন দেশের কেউ; মায়া-দয়ার লেশমাত্র ছিল না প্রজা-সাধারণের জন্য। ফলে সিরীয়দের ওপর ঋণের বোঝা এক জগদ্দল পাথরের মতো চেপে বসে। শোধ দিতে পারত না অনেকেই; ঋণ পরিশোধে শাসকদের অনবরত চাপে চ্যাপ্টা হয়ে আদরের সন্তানকেও বিক্রি করতে বাধ্য হতো কেউ কেউ। [১]
এক কথায়, রোমান-সমাজ ছিল প্রচণ্ড অসংগতি ও চরম নৈরাজ্যভরা। এর সামগ্রিক একটা ছবি ফুটে ওঠে 'সভ্যতা: অতীত ও বর্তমান' বইটিতে এভাবে-
“বাইজেন্টাইনদের সামাজিক-জীবনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে বাসা বেঁধেছিল ভয়ংকর সব অসংগতি। তাদের মন-মগজে আসন গেড়ে বসে ধর্মীয় বাড়াবাড়ি, ফকির-সন্ন্যাসবাদে ছেয়ে যায় গোটা দেশ। অজ্ঞ মানুষরাও গভীর থেকে গভীরতম ধর্মীয় বিষয়ের আলোচনায় মেতে উঠত। অল্প বিদ্যা নিয়েই তর্ক-বিতর্কে লিপ্ত হয়ে পড়ত। পীর, ফকিরি ও মরমিবাদের প্রতিও ঝোঁক ছিল মানুষের মধ্যে।”
“এ তো গেল মুদ্রার এপিঠের ছবি। ওপিঠের ছবিটা পুরো বিপরীত। এরা অর্থহীন ক্রীড়া-কৌতুক, প্রমোদ-বিনোদনে ডুবে থাকত আকণ্ঠ। এমনকি সেই যুগে তারা এমন এক স্টেডিয়াম নির্মাণ করেছিল, যেখানে ৮০ হাজার দর্শকের সংকুলান হতো। সেখানে বসে বসে উপভোগ করত মানুষে মানুষে জীবনহরণের নির্মম খেলা, যাদের তারা নাম দিয়েছিল গ্ল্যাডিয়েটর। এমনকি কখনো হিংস্র জানোয়ারের খাঁচায় মানুষকে ছেড়ে দিয়ে বাঁচা-মরার লড়াই উপভোগ করত। তারা ছিল চরম বর্ণবাদী। নীল এবং সবুজ এই দুই রঙে তারা জনগণকে বিভাজন করত। একদিকে তারা ছিল কথিত সুন্দরের পূজারি, অন্যদিকে সহিংস এবং বর্বর আচরণে তারা ছিল উন্মত্ত। খেলাধুলার নামে তারা যা করত, তার কোনোটা নির্মল আনন্দ উপভোগের জন্য ছিল না। বরং অধিকাংশ সময়েই তা শেষ হতো রক্তাক্ত পরিণতিতে। প্রজা-সাধারণের জন্য তাদের শাস্তির বিধানগুলোও ছিল বিভৎস। রং-তামাশা, ভোগ-বিলাসিতা, কূটচালবাজি, চাটুকারিতা, নির্লজ্জতাসহ যাবতীয় বদ অভ্যাসের মূর্ত প্রতীক ছিল শাসকদের জীবন।” [২]
টিকাঃ
১. দেখুন: আবুল হাসান আন-নাদাওয়ি, আস-সীরাহ আন-নাবাওয়িয়া, পৃ. ৩১
২. দেখুন: আস-সীরাহ আন-নাবাওয়িয়া, পৃ. ৩১
📄 পারস্য সাম্রাজ্য
পারস্য বা কিসরা নামেই সাম্রাজ্যটি সর্বাধিক পরিচিতি পায়। এটি বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য থেকে ভৌগোলিক আয়তনে যেমন বহুগুণে বড় ছিল, তেমনি সামরিক দিক থেকেও ছিল অনেক বেশি শক্তিশালী। তৃতীয় শতকের শুরুতে সেখানে মনুর গড়া জুরথুস্ত্রবাদ ও মনুবাদের মতো ধর্মীয় বিভ্রান্তি বৃদ্ধি পায়। তারপর পঞ্চম শতকের শুরুতে প্রকাশ ঘটে মাযদাকি মতবাদের। রাজ্যজুড়ে নৈরাজ্য ও বিপর্যয় সৃষ্টি করে বেড়ানোই যেন ছিল এদের নেশা, যা শেষ পর্যন্ত উসকে দেয় কৃষক-বিপ্লবকে। এরা নারীদের ধরে নিয়ে বন্দি করে রাখত। বিভিন্ন এলাকায় চোরা-গোপ্তা হামলা চালিয়ে একে একে অনেক মানুষের স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি দখল করে নেয়। খেত-খামার, ঘরবাড়ি কোনো কিছুই রেহাই পায়নি তাদের তাণ্ডবলীলা থেকে। তাদের আক্রমণে অনেক এলাকা এমন বিরান ভূমিতে পরিণত হয়, যেন কোনো কালেই কেউ বুঝি বাস করেনি সেখানে।
শাসনধারা ছিল বংশ পরম্পরা; বাবার মৃত্যুর পর ছেলে গদিতে বসবে—এটা একরকম অলিখিত সংবিধানে পরিণত হয়। তারা নিজেদেরকে মনে করত সাধারণ মানুষের চেয়ে উন্নত কোনো সৃষ্টি—অবতার; বা দেবতার ঔরসজাত সন্তান। দেশটাকে মনে করত পৈতৃক সম্পত্তি। রাজ্যের সমুদয় রাজস্ব নিয়ে খেয়াল-খুশিমতো স্বেচ্ছাচারী ও আড়ম্বরপূর্ণ জীবনযাপন করত। চলাফেরা ছিল চতুষ্পদ জন্তু-জানোয়ারের মতো লাগামহীন। শাসকদের এমন আচরণ দেখে অনেক কৃষক চাষাবাদই ছেড়ে দেয়। শাসকদের সেবাদাস কিংবা লাঠিয়াল বাহিনী হওয়া থেকে পালিয়ে গিয়ে কেউ বা আশ্রয় নেয় ঘরের কোণে কিংবা উপাসনালয়ে। রোম-পারস্যের মধ্যে সংঘটিত ইতিহাসের দীর্ঘস্থায়ী রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের শিকার ছিল এসব জনগণ; অথচ এতে তাদের আদৌ কোনো কল্যাণ ছিল না। স্রেফ নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্যই শাসকরা এ যুদ্ধ বাধিয়ে রাখত বছরের পর বছর ধরে। [৩]
টিকাঃ
৩. প্রাগুক্ত, পৃ. ৩২, ৩৩।
📄 ভারত
ঐতিহাসিকরা এ বিষয়ে প্রায় সকলেই একমত যে, ষষ্ঠ শতকের শুরুতে ধর্মীয়, চারিত্রিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক দিক থেকে ভারতীয় সাম্রাজ্যেও চরম অবনতি হয়েছিল। নৈরাজ্য করে বেড়াত এখানকার মানুষেরা। তাদের হাত থেকে রেহাই পেত না উপাসনালয়ও। কারণ, ধর্ম নিজেই নৈরাজ্যের গায়ে পবিত্রতা ও কথিত ধার্মিকতার একটা খোলস চড়িয়ে দিয়েছিল। সমাজে নারীরা ছিল চরম অবহেলিত। তাদের না ছিল কোনো মর্যাদা, না নিরাপত্তা। সতীদাহ প্রথার নামে মৃত স্বামীর সঙ্গে জীবন্ত স্ত্রীকে আগুনে পুড়িয়ে মারত তারা। কেউ কোনোভাবে প্রাণে বেঁচে গেলেও এ বিধবাদের জন্য পুনরায় বিয়ে করা ছিল অবৈধ। শ্রেণি-বৈষম্যের জন্য ভারত ছিল পৃথিবীর অন্য সকল সমাজ থেকে আলাদা; আইনগতভাবেই তারা এই কালোকানুন সমাজে চালু করে। হিন্দু পুরোহিতরা সেগুলোকে মুড়িয়ে দেয় ধর্মীয় আবরণে। একসময় আইনটা সমাজে নৈতিক ভিত্তি লাভ করে। হয়ে ওঠে তাদের জীবনের অলঙ্ঘনীয় সংবিধান।
হিন্দুরা ছিল শতধা বিভক্ত ও বিশৃঙ্খল একটি জাতি। এ কারণে তাদের সমাজে সব সময়ই অস্থিরতা বিরাজ করত। এক সময় এই অস্থিরতা স্থানীয় বিভিন্ন শাসকদের মধ্যে বিধ্বংসী যুদ্ধের ইন্ধন জোগাত।
পৃথিবীর অন্যান্য সভ্যতা ও জাতিগোষ্ঠী থেকে একপ্রকার বিচ্ছিন্নই ছিল তারা; কোথায় কী হচ্ছে না হচ্ছে এ সম্পর্কে ছিল সম্পূর্ণ বেখবর। স্বভাব-চরিত্রে তারা ছিল কঠোর ও স্বৈরাচারী প্রকৃতির। শ্রেণিবৈষম্যের জের ধরে রক্তক্ষয়ী সাম্প্রদায়িক সহিংসতা ছিল তাদের নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। একজন হিন্দু ঐতিহাসিক ভারতের ইসলামপূর্ব যুগ প্রসঙ্গে বলেন,
“হিন্দুরা বাকি দুনিয়া থেকে ছিল বিচ্ছিন্ন, শামুকের মতো নিজ খোলসের ভেতরে আবদ্ধ। পৃথিবীর অন্যান্য সমাজ-সভ্যতা ও সমসাময়িক ঘটনাপ্রবাহের ব্যাপারে তারা ছিল একেবারেই অজ্ঞ। এ অজ্ঞতা তাদেরকে দুর্বল থেকে দুর্বলতর করে তোলে। জন্ম নেয় নানা জড়তা ও স্থবিরতা; যা তাদেরকে দিনে দিনে আরও অধঃপতন ও অবক্ষয়ের দিকে ঠেলে দেয়। সাহিত্য প্রাণহীন ও বিবর্ণ রং ধারণ করে। স্থাপত্যশিল্প, চিত্রকলা, চারু ও কারুকলা শিল্পেরও ছিল একই রকম দৈন্যদশা।” [৪]
“হিন্দুসমাজ ছিল জড়বাদী; সবকিছুতে স্থবির ও অচল। শ্রেণিবৈষম্য ছিল প্রকট, পরিবারে পরিবারে চলত জাতে ওঠার লড়াই। বিধবা বিয়েকে তারা দেখত অন্যায় হিসেবে। খাদ্য-খাবার নিয়েও তাদের মধ্যে ছিল নানা রকম কুসংস্কার; এটা খেত তো ওটা খেত না। অকারণে কষ্ট দিত নিজেদের। আর অস্পৃশ্যরা তো ছিল সমাজচ্যুত; সমাজছাড়া হয়ে একরকম অসহায় জীবনযাপন করতে বাধ্য হতো তারা।” [৫]
ভারতের অধিবাসীরা চারটি শ্রেণিতে বিভক্ত ছিল—
* ব্রাহ্মণ: মন্দির ও হিন্দু ধর্মের পুরোহিত শ্রেণি।
* ক্ষত্রিয়: যুদ্ধ-বিগ্রহের দায়িত্বে নিয়োজিত দল।
* বৈশ্য : কৃষি এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের দায়িত্বে নিয়োজিত সম্প্রদায়।
* শূদ্র: গোলামি, দাসবৃত্তি ইত্যাদিই ছিল এ শ্রেণির মূল কাজ। সবচেয়ে নিম্ন শ্রেণির এরা। তাদের ধারণামতে, বাকি তিন শ্রেণির সেবা করার জন্য পৃথিবীর সৃষ্টিকর্তা নিজের পা থেকে এদেরকে সৃষ্টি করেছেন। এই শ্রেণিবিভাজন ব্রাহ্মণদেরকে সমাজের সবচেয়ে সম্মানজনক আসনে আসীন করে। আক্ষরিক অর্থেই তাদের জন্য ছিল সাত খুন মাপ। তাদের ওপর কোনো কর ধার্য করা হতো না। অন্যদিকে, শূদ্রদের জন্য ধন-সম্পদ উপার্জন কিংবা সঞ্চয় করার অধিকারও ছিল না। এমনকি ব্রাহ্মণদের পাশে তাদের বসাও ছিল মহাপাপ। আর হাত দিয়ে ছোঁয়াটা তো কল্পনাই করা যেত না। ধর্মগ্রন্থ অধ্যয়ন ছিল তাদের জন্য নিষিদ্ধ। [৬]
টিকাঃ
৪. দেখুন: আবুল হাসান আন-নাদাওয়ি, আস-সীরাহ আন-নাবাওয়িয়া, পৃ. ৩৮।
৫. প্রাগুক্ত: পৃ. ৩৯।
৬. দেখুন: মনু শানিয নামক সামাজিক-নাগরিক বিধিবিধান, অধ্যায়: ১, ২, ৮, ৯, ১০। আবুল-হাসান আন-নাদাওয়ির আস-সীরাহ আন-নাবাওয়িয়া, পৃ. ৩৮ থেকে উদ্ধৃত।
📄 তৎকালীন ধর্মীয় অবস্থা
অন্ধকার এ যুগ ছিল ইতিহাসের সবচেয়ে নিকৃষ্ট যুগ। মানবতা নেমে গিয়েছিল সর্বনিম্ন স্তরে। ধর্মীয়, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক তথা সর্ববিষয়ে। জীবনের এমন কোনো দিক ছিল না যেখানে নৈরাজ্য তার থাবা বসায়নি। চিন্তা-ভাবনা, আকীদা-বিশ্বাস, আবেগ-অনুভূতি সবকিছুতেই জেঁকে বসে জাহিলিয়্যাত। মূর্খতা, প্রবৃত্তি-চরিতার্থ, লাম্পট্য, নিকৃষ্টতা, স্বৈরাচার ইত্যাদি ছিল সমাজের সাধারণ চিত্র।
আল্লাহর দীনের মধ্যে ইচ্ছাকৃত পরিবর্তন-পরিবর্ধন, বিকৃতি-সাধন, মনগড়া কথার প্রসার ইত্যাদির কারণে তাদের জীবনে আল্লাহর বিধানের প্রভাব প্রায় শূন্যে নেমে আসে। ফলে আল্লাহর বাণীর আবেদন হারিয়ে যায় পুরোপুরি। আকীদার নানা জটিল তত্ত্বীয় বিষয়ের আলোচনা নিয়ে লোকেরা মগ্ন থাকত, যা এক সময় আল্লাহর দীনের মধ্যে মানুষের নানা বিকৃত মতবাদ অনুপ্রবেশের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। সমাজ বিভক্ত হয়ে পড়ে নানা দল-উপদলে এবং তা শেষ পর্যন্ত গিয়ে গড়ায় ভয়াবহ যুদ্ধবিগ্রহে। অন্যদিকে যারা এ বিকৃতি থেকে নিজেদেরকে দূরে রেখেছিলেন সংখ্যায় তারা ছিলেন খুবই নগণ্য। সমাজ সংস্কারের ব্যাপারে নিরাশ হয়ে, অন্তত নিজেকে বাঁচানোর চেষ্টায় লোকালয় ছেড়ে তারা আশ্রয় নেয় নির্জন কোনো স্থানে। একারণে অনৈতিকতা মানব সমাজকে আরও আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলার সুযোগ পেয়ে যায়। ফলে আসন গেড়ে বসে সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে।
লোকেরা হয় দীন-ধর্ম থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে, নয় ধর্মের গণ্ডি থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে। কেউ হয়তো কোনো ধর্মে সত্যিকার অর্থে প্রবেশই করেনি কখনো। কেউ-বা আবার ধর্মের বিকৃত রূপটাকে পরম সত্য মেনে আরাধনা করছে। অন্যদিকে, শারী'আতের ছিল করুণ দশা। তারা আল্লাহর শারী'আহকে সম্পূর্ণ বর্জন করে চলত। উপরন্তু শারী'আতের নামে তারা মনগড়া এমন অনেক নিয়ম-কানুন বানিয়ে নেয়, যার অনুমতি আল্লাহ দেননি। সংগত কারণেই তাদের এসব বানোয়াট নিয়ম-কানুন ছিল মানুষের স্বভাবধর্ম ও বিবেকের সঙ্গে সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক।
রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, ধর্মীয় পাদরি-পুরোহিত, রাজা-বাদশারা ছিল এই অনৈতিকার একান্ত পৃষ্ঠপোষক। পৃথিবী তলিয়ে যায় অজ্ঞতার নিকষ কালো অন্ধকারের অতল গহ্বরে, জাহিলিয়্যাতের অশুভ ছায়া সবকিছুকে ঢেকে ফেলে। মহান আল্লাহ তা'আলার দেওয়া বিধানগুলো বিকৃত হয়ে যায় সম্পূর্ণরূপে。
ইহুদিধর্ম
এ ধর্মটি আসমানি বিধানের বাহক হলেও, কালের পরিক্রমায় বিকৃত হয়ে কেবল নানা রকম আচার-সর্বস্বতা এবং অন্ধ-অনুকরণের সমষ্টিতে পরিণত হয়; এতে না ছিল কোনো প্রাণের ছোঁয়া, না ছিল কোনো সজীবতা। ইহুদিরা তাদের ভিন্নধর্মী প্রতিবেশী ও তাদের ওপর কর্তৃত্বশীল জাতির ধর্ম-বিশ্বাস দ্বারা ব্যাপকভাবে প্রভাবিত হয়ে পড়ে; তাদের অনেক আচার-আচরণ, কৃষ্টি-কালচার নানা রকম জাহিলিয়্যাত ও মূর্তিপূজার মতো পৌত্তলিক কর্মকাণ্ডের নাগপাশে আটকে পড়ে। স্বয়ং ইহুদি ঐতিহাসিকদের কথায়ও এ বক্তব্যের স্বীকৃতি মেলে। ইহুদি বিশ্বকোষে এসেছে,
“মূর্তিপূজারি ও মুশরিকদের ওপর নবি-রাসূলদের মনঃকষ্ট, ক্ষোভ ও অসন্তুষ্টি এ কথাই প্রমাণ করে যে, এগুলোর প্রতি আকর্ষণ বানু ইসরাঈলের মন-মননে একেবারে জেঁকে বসেছিল। ব্যাবিলনে তাদের নির্বাসন থেকে ফিরে আসার আগপর্যন্ত ওই বিশ্বাসের মূলোৎপাটন করা সম্ভব হয়নি। কুসংস্কার ও পৌত্তলিকতার প্রতি আকর্ষণই ছিল তাদের বিশ্বাসের কেন্দ্রবিন্দু। তাদের এ বৈশিষ্ট্যের জলজ্যান্ত সাক্ষী তাদের নিজেদের ধর্মগ্রন্থ তালমুদ।” [৯]
নবিজির আবির্ভাবের পূর্বে ইহুদি-সমাজ পৌঁছে যায় তাদের বুদ্ধিবৃত্তিক বিকলাঙ্গতার চূড়ান্ত পর্যায়ে। পাঠক, আপনি যদি ব্যাবিলনের তালমুদ (যার পবিত্রতা নিয়ে ইহুদিরা বড়াই করে এবং খ্রিষ্টীয় ৬ষ্ঠ শতকে ইহুদিদের মাঝে যার চর্চা ছিল ব্যাপক) অধ্যয়ন করেন, তবে এর এমন কিছু নমুনা পাওয়া যাবে যার যৌক্তিকতার প্রশ্নে কোনো সুস্থ বিবেক সায় দেবে না। তাদের কথার অসারতা, আল্লাহর বিরুদ্ধে তাদের বেয়াদবির স্পর্ধা দেখে আপনি স্তম্ভিত হবেন। দেখবেন কী অনায়াসেই না তারা সত্যের অপলাপ করছে, দীন-ধর্মের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের সঙ্গে ঠাট্টা-বিদ্রুপ করছে। [১০]
খ্রিষ্টধর্ম
নিজ ধর্মের মধ্যে ধর্মযাজকদের বিকৃতি, পরিবর্তন-পরিবর্ধন এবং মূর্খদের মনগড়া ব্যাখ্যায় খ্রিষ্টধর্ম তখন যায় যায় অবস্থা। তাদের হাতে পড়ে খ্রিষ্টধর্ম তার প্রাচীন শিক্ষা হারিয়ে ফেলে। 'ঈসার আগমন হয়েছিল মানুষকে এক আল্লাহর 'ইবাদাতের দিকে আহ্বান করার জন্য। অথচ তার অনুসারীরা তার এই মহান শিক্ষা ভুলে যায় বেমালুম। তাওহীদের আলো, আল্লাহর একনিষ্ঠ 'ইবাদাত ঢাকা পড়ে যায় নানা রকম পৌত্তলিকতাপূর্ণ আঁধারের চাদরে। [১১] যিশুর আসল প্রকৃতি এবং তার নানা বৈশিষ্ট্যের চুলচেরা বিশ্লেষণ নিয়ে ইরাকি ও সিরিয়ার খ্রিষ্টানদের সাথে মিশরের খ্রিষ্টানদের যুদ্ধ বেধে যায়। যুদ্ধ এমন ব্যাপক আকার ধারণ করে যে, তাদের ঘরবাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, উপাসনালয়সহ সবকিছু পরিণত হয় সামরিক ক্যাম্পে। নানান রূপে, নানান রঙে খ্রিষ্টসমাজে পৌত্তলিকতা ছড়িয়ে পড়ে। ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে খ্রিষ্টধর্মের তৎকালীন অবস্থা সম্পর্কে যা এসেছে তা এরকম:
“মনে করা হতো মূর্তিপূজার অবসান ঘটেছে। কিন্তু তা সমূলে উৎপাটিত হয়নি; বরং মন-মগজে তা আরও গেড়ে বসেছে। আগের মতোই সবকিছু চলছে খ্রিষ্টবাদের দোহাই পেড়ে এবং ধর্মের নামের আড়ালে। খ্রিষ্টধর্মের কেউ যদি শহিদ হতো, তবে অন্যরা তাকে মর্যাদা দেওয়ার নামে নানা রকম বাড়াবাড়ি করত; তার প্রতি বিভিন্ন রকম অতিপ্রাকৃতিক ক্ষমতা ও গুণাবলি আরোপ করত। এমনকি তাদের প্রতিমূর্তিও বানাত। এরপর এভাবেই আস্তে আস্তে শুরু হয় শহিদ ও ধর্মগুরুদের পূজা। চতুর্থ শতাব্দী তখনও শেষ হয়নি; চারদিক ভরে ওঠে শহিদ-ভক্তি, পীর- ফকির পূজায়। সৃষ্টি হয় নতুন এক আকীদা-বিশ্বাসের। এই বিশ্বাসের মূল কথা ছিল: পীর-মুর্শিদরা আসলে পৃথিবীতে সৃষ্টিকর্তার কায়া; রবের সকল সিফাত-বৈশিষ্ট্য তাদের মধ্যে সতত বিরাজমান। এই পুণ্যাত্মারা, এই সেইন্টরা আল্লাহ ও মানুষের মধ্যে সেতুবন্ধনের কাজ করে—এমনই বিশ্বাস ছিল তাদের। মধ্যযুগে পবিত্রতা, শুদ্ধতা এবং নিষ্কলুষতার মূর্ত প্রতীক হয়ে ওঠে তারা। মূর্তি-উৎসবের পুরাতন নাম পরিবর্তিত হয়ে নতুন নাম ধারণ করল। এমনকি ৪০০ খ্রিষ্টাব্দে 'সূর্যপূজার পুরাতন উৎসব'-এর নাম হয় 'বড়দিন' বা 'ক্রিসমাস ডে'।” [১২]
নতুন ক্যাথলিক বিশ্বকোষে এসেছে:
“তাদের মনে এই বিশ্বাস বদ্ধমূল হয়ে যায় যে, যিশুর জীবন, চিন্তা ইত্যাদির সমন্বয়ে গঠিত ৩টি বস্তুর এক সমন্বিত রূপে গঠিত হন এক ইলাহ। চতুর্থ শতকের শেষ সময় থেকে চলে আসছে এ বিশ্বাসের ধারা; সবার নিকট চরম পূজনীয় এমন এক জাতীয় বিশ্বাসে পরিণত হয় বিশ্বাসটি। পুরো খ্রিষ্টানজগৎ এই বিশ্বাসে অটল। উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে এসে ত্রিত্ববাদ-আকীদার ক্রমবিকাশের ধারা বাধাগ্রস্ত হয় এবং এ রহস্যের সকল পর্দা উন্মোচিত হয়ে যায়।” [১৩]
খ্রিষ্টানদের নিজেদের মধ্যে যুদ্ধের আগুন দাউ দাউ করে জ্বলে উঠল। একজন আরেকজনকে গাল পাড়ত 'কাফির' বলে। খুনোখুনি শুরু হলো নির্বিচারে। অনৈতিকতার বিরুদ্ধে লড়াই, সমাজ সংস্কার এবং মানবতার কল্যাণ রয়েছে এমন বিষয়ের প্রতি জাতিকে দা'ওয়াত দেওয়া থেকে তারা উদাসীন থাকল, নিবৃত রইল। [১৪]
অগ্নিপূজক
প্রাচীনকাল থেকেই অগ্নিপূজকরা প্রকৃতিপূজারি হিসেবে পরিচিত। তাদের প্রকৃতিপূজার সবচেয়ে বড় উপাদান আগুন। দেশের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত পর্যন্ত শিখা-অনির্বাণের দেখা পাওয়া যেত। তারা পূর্ণ মনোনিবেশ করে এর পূজায়; তৈরি করে মন্দির এবং প্রতিমা। মন্দিরের ভেতরে মেনে চলা হতো বেশকিছু বিধিবিধান এবং আদব-শিষ্টাচার। অন্যদিকে মন্দিরের চার দেয়ালের বাইরে ছিল সম্পূর্ণ ভিন্নচিত্র - পূজকরা চলাফেরা করত স্বাধীনভাবে, মন যা চাইত তা-ই করে বেড়াত তারা। তখন তাদের মধ্যে আর যারা দীন মানত না তাদের মধ্যে বিশেষ কোনো প্রভেদ ছিল না।
একজন প্রখ্যাত ডাচ ঐতিহাসিক অগ্নিপূজকদের ধর্মগুরু এবং তাদের কাজকর্মকে তার 'সাসানিদের যুগে ইরান' বইতে এভাবে তুলে ধরেন- “অগ্নিপূজকদের দিনে চারবার সূর্যের উপাসনা করতেই হতো। সেই সঙ্গে চাঁদ, আগুন এবং পানিরও পূজা করত তারা সমান তালে। তাদেরকে প্রত্যহ বিশেষ কিছু মন্ত্র জপ করতে হতো। ঘুমের সময়, ঘুম থেকে জেগে, গা-গোসলের সময়, পোশাক পরিধান করতে, খাওয়া-দাওয়া, হাঁচি-কাশি, চুল কাটানো, নখ কাটা, প্রকৃতির ডাকে সাড়া দেওয়া, চেরাগ-কুপি জ্বালানোসহ যাপিত জীবনের প্রতিটি পর্যায়ে তারা মুগ্ধ হয়ে জপ করত এই মন্ত্রগুলো। আগুন নিভে যাক—এমন প্রার্থনা করা ছিল তাদের জন্য বারণ, বাঘে-ছাগে এক ঘাটে পানি খাওয়া দুরস্ত হলেও আগুন-পানির মিশেল তাদের জন্য ছিল হারাম। এই কামনাও করা যাবে না যে, খনিগুলোতে মরচে ধরে যাক! কারণ, খনি তাদের কাছে পবিত্র।” [১৫]
ইরানিরা আগুন সামনে রেখে 'ইবাদাতে দাঁড়াত। ইয়াজদাগিদ সাসানিদের সর্বশেষ রাজা, একবার সূর্যের নামে কসম কেটে বলে, “ওই সূর্যের নামে আমি কসম করছি, যিনি সবচেয়ে বড় ইলাহ।” প্রতি যুগেই অগ্নিপূজকরা পৌত্তলিকতায় বিশ্বাস করত মনে-প্রাণে। ধীরে ধীরে পৌত্তলিকতাই হয়ে ওঠে তাদের লোগো, তাদের ধর্মীয় প্রতীক। তারা বিশ্বাস রাখত দুই খোদাতে। একজন আলো তথা কল্যাণের ইলাহ, অন্যজন অন্ধকার তথা অমঙ্গলের। [১৬]
বৌদ্ধধর্ম
এই ধর্ম ভারত এবং মধ্য-এশিয়ায় পালিত হতো সবচেয়ে বেশি। অনুসারীরা জায়গায়-বেজায়গায় গড়ে তুলে গৌতম বুদ্ধের প্রতিমা। বাড়ি থাকুক কিংবা সফরে, যেখানেই যেত তারা, সঙ্গে বুদ্ধের মূর্তি বয়ে বেড়াত; [১৭] এবং সে মূর্তিতে মাথা ঠেকানো তাদের চাই-ই চাই। তৈরি করত নিত্যনতুন প্যাগোডা।
ব্রাহ্মধর্ম
ভারতের আদি ধর্মের নাম ব্রাহ্মধর্ম। এটি হিন্দু ধর্মেরই আদিরূপ। কোনো সন্দেহ ছাড়াই বলা চলে, হিন্দু ও বৌদ্ধ উভয় ধর্মের মধ্যে অদ্ভুত একটা মিল ছিল—দুটি ধর্মই বহুদেবতায় বিশ্বাসী। এ বিশ্বাসের নড়চড় হয়নি এতটুকু; আগে যেমন ছিল, এখনো তেমনই। অনেক মা'বুদ, অনেক উপাস্যের প্রাদুর্ভাব ছিল এই ধর্মের প্রধানতম বৈশিষ্ট্য। খ্রিষ্ট ষষ্ঠ শতকে এসে এ ধর্ম তার চূড়ান্তে গিয়ে পৌঁছে। আটলান্টিক মহাসাগর থেকে শুরু করে প্রশান্ত মহাসাগর পর্যন্ত পৃথিবীটা ডুবে ছিল পৌত্তলিকতায়। খ্রিষ্ট, ইহুদি, বৌদ্ধ এবং ব্রাহ্মধর্মের অনুসারীরা সবাই কেমন যেন পৌত্তলিকতার মাহাত্ম্য, তার পবিত্রতা বর্ণনা কে কার চেয়ে বেশি করতে পারে এ প্রতিযোগিতায় নেমেছে; কেমন যেন একই ময়দানে ঘোড়দৌড়ের প্রতিযোগিতায় নেমেছে ঘোড়ারা।
প্রতিটি জাতির মধ্যে, প্রতিটি পর্যায়ে এই অরাজকতা ছড়িয়ে পড়ার কথা রাসূল তাঁর এক অভিভাষণে এভাবে বলে গেছেন—
“জেনে রাখো! আমার রব আমাকে আদেশ করেছেন যে, আজকের এই দিনে তিনি যা কিছু আমাকে শিখিয়েছেন, তার মাধ্যমে আমি যেন তোমাদের অজানা বিষয়গুলো জানিয়ে দিই: 'একজন বান্দাকে আমি যা কিছু দিয়েছি তার সবই হালাল। আমার বান্দাদের সবাইকে হানিফ [১৮] তথা নিষ্ঠাবান করেই আমি সৃষ্টি করেছি। শয়তানরা তাদের কাছে এসে দীনের পথ থেকে তাদেরকে বিচ্যুত করে এবং তাদের জন্য আমি যা হালাল করেছি, তা হারাম ঘোষণা করে। তাদেরকে আদেশ করে আমার সঙ্গে শির্ক করতে; অথচ শির্কের পক্ষে আমি কোনো প্রকার দলিল-প্রমাণ উপস্থাপন করিনি।' আর নিঃসন্দেহে, আল্লাহ তা'আলা তখন আহলে-কিতাবদের অল্পকিছু লোক ছাড়া, দুনিয়াবাসীর প্রতি, কি আরব কি অনারব নজর করেন অবজ্ঞাভরে।” [১৯]
বিভিন্নভাবে মানবজাতির ভিন্নপথে গমনের ইঙ্গিতই পাওয়া যায় হাদীসটিতে: আল্লাহর সঙ্গে শির্ক, তাঁর শারী'আহকে প্রত্যাখ্যান, ওয়াহি-নির্ভর দীনের কোনো কোনো সংস্কারকের বিপথে গমন এবং জাতির ভ্রষ্টতার ব্যাপারে তাদের একপেশে পক্ষপাতিত্ব ইত্যাদি-সহ নানাভাবেই তারা পথভ্রষ্ট হয়েছে। [২০]
টিকাঃ
৯. প্রাগুক্ত, পৃ. ২০।
১০. প্রাগুক্ত, পৃ. ২১।
১১. প্রাগুক্ত, পৃ. ২১।
১২. প্রাগুক্ত, পৃ. ২৩।
১৩. নতুন ক্যাথলিক বিশ্বকোষ, ত্রিত্ববাদ-প্রবন্ধ, ১৪/৩৯৫।
১৪. মুহাম্মাদ আবু হাদিদ, আরবদের মিশর বিজয়, পৃ. ৩৭, ৩৮, ৪৮।
১৫. সাসানি যুগে ইরান, পৃ. ১৫৫, আবুল হাসান আন-নাদাওয়ির আস-সীরাহ আন-নাবাওয়ার ২৭ নং পৃষ্ঠা থেকে উদ্ধৃত।
১৬. প্রাগুক্ত, পৃ. ২৭।
১৭. দেখুন: আবুল হাসান আন-নাদাওয়ি, আস-সীরাহ আন-নাবাওয়িয়া, পৃ. ২৮।
১৮. শির্ক থেকে দূরে থেকে তাওহীদ অভিমুখী যারা; আল্লাহর 'ইবাদাতে একনিষ্ঠ।
১৯. সহীহ মুসলিম, কিতাবুল জান্নাহ, বাব আস-সিফাত; ৪/২১৯৭, হাদীস নং: ২৮৬৫।
২০. দেখুন: আল-গুরাবা আল-আওওয়ালুন, পৃ. ৫৯।