📘 রউফুর রহীম 📄 আভাষ

📄 আভাষ


সকল গুণগান আল্লাহ তা'আলার জন্য। আমরা তাঁর প্রশংসা করছি; প্রার্থনা করছি তাঁর সাহায্য ও ক্ষমার। যার পথকে আল্লাহ দীনের আভায় উদ্ভাসিত করেছেন, তাকে পথভ্রষ্ট করতে পারে এমন কেউ নেই। আর যে পথভ্রষ্ট হয়েছে, আল্লাহ ছাড়া তাকে পথ দেখায় এমন কে আছে? আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া ইবাদাতের যোগ্য আর কোনো ইলাহ নেই। তিনি একক, তাঁর কোনো শরিক নেই। আমি এ-ও সাক্ষ্য দিচ্ছি, মুহাম্মাদ সা. তাঁর বান্দা ও রাসূল।

“ঈমানদারগণ, আল্লাহকে যথার্থভাবে ভয় করো। মুসলিম না হয়ে (অথবা পুরোপুরি আল্লাহর অনুগত না হয়ে) মৃত্যুবরণ করবে না।” [সূরা আলু 'ইমরান, ৩:১০২]

“মানুষ! তোমাদের সেই রবকে ভয় করো, যিনি তোমাদের সৃষ্টি করেছেন একজনমাত্র ব্যক্তি (আদম) থেকে। এরপর তার থেকে সৃষ্টি করেছেন তার সঙ্গিনীকে; আর বিস্তার করেছেন ঐ দুজন থেকেই অগুনতি নর-নারী। যাঁর নামের দোহাই দিয়ে তোমরা একে অপরের কাছে (যার যার পাওনা) চেয়ে থাকো, সে-ই আল্লাহকে ভয় করো। রক্ত-সম্পর্কের ব্যাপারেও সাবধান থেকো। অবশ্যই আল্লাহ তোমাদেরকে পর্যবেক্ষণে রেখেছেন। [সূরা আন-নিসা, ৪:১]

“মু'মিনগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় করো। সঠিক কথা বলো। তা হলে তিনি তোমাদের কাজকর্ম সংশোধন করে দেবেন। মোচন করবেন তোমাদের পাপরাশি। আর যেকেউ আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করবে, মহাসফলতা অর্জন সে করবেই।” [সূরা আল-আহযাব, ৩৩:৭০-৭১]

প্রভু গো, সব প্রশংসা আপনারই; আপনার মাহাত্ম্য এবং মহান আধিপত্যের কারণে সব গুণগান আপনারই প্রাপ্য। আপনি খুশি হওয়া পর্যন্ত প্রশংসা আপনার, খুশি হলে প্রশংসা আপনার, খুশি হওয়ার পরও প্রশংসা কেবল আপনারই।

রাসূলের সীরাত অধ্যয়ন প্রত্যেক মুসলিমের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। শাস্ত্রটি তাঁর জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অনেকগুলো দিক আমাদের সামনে তুলে ধরে।

রাসূলের ব্যক্তিত্ব, তাঁর জীবনাচার, বাণী এবং কোনো বিষয়ে তাঁর সমর্থন সম্পর্কে সম্যক অবগত হয়ে তাঁকে অনুসরণ করা সহজ হয় এই সীরাত পাঠেই। মনের মুকুরে জন্ম হয় তাঁর প্রতি ভালোবাসা। ক্রমাগত পাঠে সে ভালোবাসা খুঁজে পায় গন্তব্যে পৌঁছানোর পথ। নবিজির সঙ্গে থেকে যারা ইসলামের জন্য কষ্ট করেছেন, জিহাদ করেছেন, এমন মহান সাহাবিদের সম্পর্কেও অবহিত হওয়া যাবে সীরাত অধ্যয়নে। এই অধ্যয়নই সাহাবিদের ভালোবাসতে, তাদের পথ ও মত অনুসরণে উদ্বুদ্ধ করবে অধ্যয়নকারীকে।

সীরাতগ্রন্থ নবিজির জীবনের ছোটবড় সকল দিক স্পষ্টভাবে তুলে ধরে আমাদের সামনে; জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত—তাঁর শৈশব, কৈশোর, যৌবন, আল্লাহর পথে মানুষদের আহ্বান, শত বাধা-বিপত্তির মুখে তাঁর পাহাড়সম দৃঢ়তা এবং শত্রুদের বিরুদ্ধে তাঁর বিজয়লাভ, সবকিছুই ঠাঁই পেয়েছে এই শাস্ত্রে। একাধারে তিনি যে একজন স্বামী, বাবা, সেনানায়ক, যোদ্ধা, প্রশাসক, রাজনীতিবিদ, অভিভাবক, আল্লাহর পথে আহ্বানকারী, কৃচ্ছতা অবলম্বনকারী এবং সর্বোপরি একজন বিচারক—এই দিকগুলোও বাদ যায়নি এখানে।

একজন মুসলিম সীরাত অধ্যয়নে খুঁজে পাবে তার উদ্দিষ্ট লক্ষ্য। দা'ঈ পাবেন তার দাওয়াতের কৌশল, বুঝতে পারবেন উত্তরণের বিভিন্ন ধাপগুলো। প্রতিটি পর্যায়ের যথার্থ উপায় সম্পর্কে পাবেন যথোচিত ধারণা। মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপনে, তাদেরকে ইসলামের দা'ওয়াত দিতে গিয়ে তিনি সেখান থেকে উপকৃত হবেন। পদে পদে অনুধাবন করবেন, আল্লাহর কালিমার পতাকাকে উড্ডীন করতে গিয়ে কী কষ্টটাই না স্বীকার করেছেন রাসূল সা.! কত সুনিপুণভাবে বাধা-বিপত্তি সামলেছেন! তখন তার সামনে একটি প্রশ্নই বড় হয়ে দেখা দেবে-তিনি যে সমস্যার সম্মুখীন এক্ষেত্রে সঠিক পদক্ষেপটি কী? উত্তর খুঁজতে তিনি তখন দ্বারস্থ হবেন সীরাতের।

নবিজির সীরাত অধ্যয়নে একজন অভিভাবক বা একজন সমাজ সংস্কারক পাবেন প্রতিপালন ও মানুষের ওপর তার ভালো কাজের প্রভাব বিস্তারে নবিজির আদর্শ শিক্ষা। [১] বিশেষ করে, যাদেরকে তিনি নিজ হাতে গড়ে তুলেছেন এবং বিপদে-আপদে পাশে গিয়ে দাঁড়িয়েছেন তাদের ক্ষেত্রে নবিজির এই শিক্ষা কার্যকরভাবেই তিনি কাজে লাগাতে পারবেন। পরিচর্যার ধারাবাহিকতায় এদের মধ্য থেকেই তিনি বের করে আনবেন এমন একটা প্রজন্ম, যারা পরিচিত হবে 'কুরআনের প্রজন্ম' হিসেবে। গড়ে তুলবেন এমন একটি জাতি যারা শুধু মানবসেবার জন্য বেরিয়ে পড়বে দশ দিগন্তে; সৎকাজের আদেশ করবে। আর অসৎ কাজে বাধা দিবে। আল্লাহর ওপর পরিপূর্ণভাবে ঈমান আনবে। এ জাতিকে নিয়েই এমন একটা রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখতে পারেন তিনি, যে রাষ্ট্রের সুশাসনের সুবাতাস ছড়িয়ে পড়বে প্রাচ্য থেকে প্রতীচ্যে।

সীরাত পাঠে একজন নেতা কিংবা সেনাপতির জন্যও রয়েছে খোরাক। তারা জানতে পারবেন বিভিন্ন রণকৌশল, অর্জন করবেন বিভিন্ন জাতি, গোত্র এবং সেনাবাহিনী পরিচালনার দক্ষতা। পরিকল্পনা প্রণয়নে পাবেন সুস্পষ্ট নির্দেশনা, বাস্তবায়নের কলাকৌশল। আর উদ্বুদ্ধ হবেন ইনসাফের মূলনীতি বাস্তবায়নে, যেখানে সিদ্ধান্ত গৃহীত হবে সৈনিক ও সেনাপতি এবং নেতা ও কর্মীর পারস্পরিক পরামর্শের ভিত্তিতে। রাজনীতিবিদ শিখবেন বিপথগামী ও চরম রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের সঙ্গে রাসূল সা. কীরূপ আচরণ করতেন। মুনাফিক সর্দার 'আবদুল্লাহ ইবনু উবাই, যে লোক ওপরে ওপরে ইসলাম গ্রহণের ভান করেছিল আর তলে তলে করেছিল বিরুদ্ধাচরণ; সারাজীবন নবিজির সঙ্গে করেছে শত্রুতা, এমন লোকের সাথেও রাসূল সা. কখনও অসদাচরণ করেননি। অথচ এই মুনাফিক লোকটাই কিনা রাসূলের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের জাল বুনত; রাসূলকে দুর্বল করতে, লোকদেরকে তাঁর কাছ থেকে ভাগিয়ে নিতে এমন কোনো অপপ্রচার নেই যা সে করেনি। প্রতিবাদে রাসূল সা. তাকে ফুলের টোকাটি পর্যন্ত দেননি। প্রতিটি খারাপ আচরণে ধৈর্য ধরেছেন, সবুর করেছেন। এতে করে মুনাফিক-সর্দারের মুখোশ উন্মোচিত হয়ে যায় একসময়; তাকে ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করে তার আপনজনেরা সমবেত হয় নবিজির নেতৃত্বের পতাকাতলে।

আলিমদের জন্য এই সীরাতের পরতে পরতে রয়েছে অনুপম সব শিক্ষা। তারা এমন কিছু উপকরণ পাবেন এতে যা তাকে কুরআন বুঝতে সহায়তা করবে; কারণ প্রায়োগিক দিক থেকে সীরাত কুরআনেরই এক ধরনের তাফসির। এতে বিধৃত হয়েছে কুরআন অবতীর্ণের প্রেক্ষাপট এবং বহু আয়াতের তাফসির। এগুলো পাঠ করে আলিমরা আয়াতগুলোর প্রায়োগিক অর্থ বুঝে নেন সহজে। শারী'আতের হুকুম-আহকাম, তার মূলনীতি বের করে আনেন। এই পদ্ধতি অবলম্বনে ইসলামের বিভিন্ন বিষয়ের সঠিক জ্ঞান অর্জন করেন তারা। 'নাসিখ-মানসুখ'সহ কুরআন সংশ্লিষ্ট বহুবিধ জ্ঞান আলিমরা সীরাত পাঠেই পাবেন। প্রাণবন্ত ইসলামের মজা এবং এর সমুন্নত লক্ষ্য তারা খুঁজে পাবেন এখানেই।

কৃচ্ছতা অবলম্বনকারী পাবেন তার 'কৃচ্ছতাসাধনের' অর্থ, গতি-প্রকৃতি ও এর লক্ষ্য-উদ্দেশ্য। ব্যবসায়ী জানবেন ব্যবসার উদ্দেশ্য, লাভ-লোকসানের হিসাব এবং এর পদ্ধতি। বিপন্ন মানুষ সীরাত পাঠে শিখবে দৃঢ়তা এবং ধৈর্যের উচ্চতর স্তর। এতে করে ইসলামের পথে চলতে গিয়ে তার মনোবল উত্তরোত্তর চাঙা হবে। আল্লাহর প্রতি ঈমান আরও বৃদ্ধি পাবে। তারা সুনিশ্চিতরূপে জানবে, শুভ ফলাফল তো আল্লাহভীরুদের জন্যই।

জাতি সীরাত থেকে শিখবে উন্নত শিষ্টাচার, প্রশংসিত চরিত্র-মাধুরী, বিশুদ্ধ 'আকীদা, 'ইবাদাত, হৃদয়ের নিষ্কলুষতা, আল্লাহর পথে জিহাদকে ভালোবাসা এবং শহিদ হবার বাসনা। আলি ইবনুল-হাসান এজন্যই বলেন, “যেভাবে কুরআনের সূরাগুলো আমরা শিখতাম, তেমন করে নবিজির সামরিক অভিযান, তাঁর সমর নীতিগুলোও আমরা আত্মস্থ করতাম।” [২]

যুহরি বলতেন, “সমরবিদ্যায় রয়েছে দুনিয়া ও আখিরাতের জ্ঞান।” [৩]

সা'দ ইবনু আবু ওয়াক্কাস বলেন, “আমার বাবা আমাদের নবিজির সমরনীতি সবিস্তারে শিক্ষা দিতেন। বলতেন, এগুলো তোমাদের পূর্বপুরুষদের কীর্তিগাথা; এগুলো থেকে বিমুখ হয়ো না।” [৪]

জাতি গঠনে, রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় আলিম-'উলামা, নেতৃবৃন্দ, ফাকীহগণ এবং প্রশাসকদেরকে ইসলামের গৌরব, মুসলিমদের প্রভাব-প্রতিপত্তির পথ চেনাতে রাসূল- জীবনী আলোক বর্তিকার কাজ করে। এর পাতায় পাতায় রয়েছে মুসলিমদের উত্থান- পতনের ইতিহাস। ব্যক্তির পরিচর্যায়, মুসলিম সমাজ বিনির্মাণে, সমাজ জাগরণে, রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় নবিজির যথোচিত প্রতিটি পদক্ষেপের খুঁটিনাটি বিষয়ের সব রসদ মজুদ রয়েছে সীরাতে।

সীরাত পড়তে পড়তে একজন মুসলিমের চোখের সামনে ভেসে উঠবে কাফিরদের দোরে দোরে আল্লাহর বাণী পৌঁছাতে নবিজির আপ্রাণ চেষ্টা, প্রতিটি বাধার মুখে তাঁর পর্বতসম ধৈর্য, নির্যাতন থেকে বাঁচাতে সাহাবিদেরকে ইথিওপিয়ায় হিজরাতের আদেশ প্রদানে তাঁর দূরদর্শিতা, দা'ওয়াতের মাধ্যমে তায়েফবাসীর মনজয় করার আপ্রাণ প্রয়াস, হাজ্জের মৌসুমে সেই দা'ওয়াতের বাণী বিভিন্ন গোত্রের সামনে উপস্থাপন, ক্রমান্বয়ে সানন্দে আনসারদের সেই দা'ওয়াত গ্রহণ এবং অবশেষে নবিজির মদীনায় হিজরাত-এই সব কিছুই।

হিজরাতের শুরু থেকে শেষ, এর প্রেক্ষাপট এবং এর পরে যা কিছু হয়েছে, তা খেয়াল করলে দেখবেন: নবিজির জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপ হতো ঐশী নির্দেশনা অনুসারে। যেকোনো কাজে পরিকল্পনা প্রণয়ন এবং পরামর্শ করে এগোনো সুন্নাতেরই অংশ। মুসলিমরা তাদের জীবনের প্রতিটি বিষয়ে পরিকল্পনা করে এগুবে, এমনটাই আল্লাহর আদেশ।

নবীয় পদ্ধতি থেকে একজন মুসলিম শিখতে পারবে, জীবনের উত্থান-পতন, ঘাত-প্রতিঘাত, চড়াই-উতরাই থেকে উতরানোর কিছু কলাকৌশল; জানবে কীভাবে রাসূল সা. মুখোমুখি হয়েছেন ইহুদি-খ্রিষ্টান, মুনাফিক-কাফিরদের মতো বিরুদ্ধশক্তির। আর কীভাবেই-বা রাসূল সা. বিজয়-লাভের পূর্বশর্ত মেনে, সেটা অর্জনে কুরআনের বাতলানো পথ অনুসরণ করে এবং সর্বোপরি আল্লাহ তা'আলার অপার কৃপায় সকল বিরুদ্ধশক্তির বিরুদ্ধে বিজয়লাভ করেছেন-তার সুস্পষ্ট বিবরণ।

এই উম্মতকে তার হারানো মান-মর্যাদা উদ্ধার এবং শার'ঈ বিধান মেনে চলার মধ্য দিয়ে বিশ্বের দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে হলে, আমার দৃঢ়প্রত্যয়, তাকে অবশ্যই নবীয় নির্দেশনা মেনে চলতে হবে। আল্লাহ বলেন:

"বলো, তোমরা আল্লাহর আনুগত্য করো এবং রাসূলের আনুগত্য করো। কিন্তু যদি তোমরা মুখ ফিরিয়ে নাও, তাহলে রাসূলের ওপর অর্পিত দায়িত্বের জন্য সে দায়ী এবং তোমাদের ওপর অর্পিত দায়িত্বের জন্য তোমরা দায়ী। তোমরা যদি তার আনুগত্য করো তবে সঠিক পথ পাবে। রাসূলের দায়িত্ব কেবল স্পষ্টভাবে (বাণী) পৌঁছে দেওয়া।” [সূরা আন-নূর, ২৪:৫৪]

আয়াতটি দ্বারা প্রতীয়মান যে, জাতির প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পথ নিহিত নবিজির অনুসরণের মধ্যেই; এর পরের আয়াতগুলোতেই রয়েছে এর সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা এবং মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর পূর্বশর্ত। আল্লাহ বলেন :

“তোমাদের মধ্যে যারা ঈমান আনবে ও সৎকাজ করবে, আল্লাহ তাদেরকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যে, তিনি অবশ্যই তাদেরকে পৃথিবীতে (শাসকদের) স্থলাভিষিক্ত করবেন, যেমন তাদের পূর্ববর্তীদেরকে (তাদের পূর্ববর্তী শাসকদের) স্থলাভিষিক্ত করেছিলেন; তিনি তাদের জন্য যে (ইসলাম) ধর্মকে পছন্দ করেছেন তা তাদের জন্য অবশ্যই সুপ্রতিষ্ঠিত করবেন এবং তাদের ভয়ের পর তার পরিবর্তে অবশ্যই তাদেরকে নিরাপত্তা দান করবেন। তারা আমারই ইবাদাত করবে, আমার সাথে কোনো কিছুকে শরীক করবে না। এরপর যারা কুফরি করবে তারাই (আল্লাহর) অবাধ্য। তোমরা সালাত কায়েম করো, যাকাত প্রদান করো এবং রাসূলের আনুগত্য করো, যাতে তোমরা (আল্লাহর) অনুগ্রহ লাভ করতে পারো।” [সূরা আন-নূর, ২৪: ৫৫-৫৬]

রাসূল সা. এবং সাহাবিরা বিজয়ের পূর্বশর্তগুলো বাস্তবায়নে সচেষ্ট ছিলেন; তারা ঈমানের প্রতিটি দিক, প্রতিটি রুকন পালন করেছেন অক্ষরে অক্ষরে। শাখা- প্রশাখাসমেত প্রতিটি সৎকর্ম করেছেন। কল্যাণকর কাজের প্রতি তারা উন্মুখ থাকতেন। জীবনের সব বিষয়ে হাত পাততেন আল্লাহর কাছে। পরিপূর্ণভাবে তাঁরই 'ইবাদাত করতেন। সংগ্রাম করতেন সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে থাকা ছোটবড় সব ধরনের শির্কের বিরুদ্ধে। ব্যক্তিগত বা সমষ্টিগতভাবে সবাই নিজ নিজ অবস্থান থেকে বিজয়ের বস্তুগত ও অবস্তুগত সব ধরনের উপকরণ গ্রহণ করতেন। অবশেষে তাঁরা মাদীনায় প্রতিষ্ঠা করেছেন ইসলামি রাষ্ট্র; এখান থেকেই তাঁরা আল্লাহর দীনের দাওয়াত পৌঁছে দিয়েছেন বিভিন্ন জাতি-গোষ্ঠীর মাঝে।

বর্তমান বিশ্বে মুসলিমদের বিশ্ব-নেতৃত্ব থেকে পিছিয়ে থাকার যৌক্তিক কারণ, তারা তাদের দায়িত্বের কথা বেমালুম ভুলে গেছে। তাদের চরিত্রের ঘটেছে চরম অবনতি। জ্ঞান ও আমল উভয় ক্ষেত্রে তারা তাদের মহান দায়িত্বের মূল উৎস কুরআন-সুন্নাহকে নিজেদের মনগড়া ভয়ংকর সব কল্পনা দ্বারা দূষিত করেছে। উপেক্ষা করেছে সুমহান আল্লাহ রীতি-নীতিকে। তারা ধারণা করে বসে আছে, পৃথিবীর নেতৃত্ব পাওয়াটা একদম তাদের হাতের নাগালে; আশায় বুক বাঁধলে এবং ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে স্বপ্ন দেখলে তা ধরা দিবেই।

নিশ্চয়ই ঈমানের এই দুর্বলতা, প্রাণের শুষ্কতা, চিন্তার বিকলঙ্গতা, চিত্তের অস্থিরতা, বুদ্ধির বিক্ষিপ্ততা এবং চারিত্রিক অবনতিসহ যা কিছু আজ মুসলিমদের চরিত্রকে কলুষিত করেছে তার মূলে রয়েছে, কুরআন-সুন্নাহকে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার প্রবণতা। সঠিক দিকনির্দেশপ্রাপ্ত খলীফাগণের অনুসরণে অনীহা এবং ইসলামের সোনালি ইতিহাস থেকে শিক্ষা না নেওয়াটাও এর জন্য দায়ী।

আজকাল অনেকেই ইসলামের নামে ভাষণ বা লেকচার দিয়ে থাকেন। কিন্তু বাস্তব জীবনে তাদের অবস্থান কুরআন-সুন্নাহ এবং ন্যায়পর চার খলীফার জীবনাচারের মৌলিক শিক্ষা থেকে যোজন যোজন দূরে। তারা পশ্চিমা সভ্যতার সামনে আত্মপরিচয় ভুলে গিয়ে, তাদেরই থেকে ধার করা কিছু শব্দ দিয়ে নিজেদের বক্তব্য সাজান। বস্তুত, তাদের ঝোঁকটা বেশি থাকে শব্দশৈলী, বাক্যবিন্যাস এবং কথার মারপ্যাঁচের প্রতি।

তারা ঘণ্টার পর ঘণ্টা বক্তব্য দেন, প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। সৃষ্টিজগত, প্রাণ রহস্য এবং মানবসৃষ্টির দর্শনের ওপর তারা ভলিউম ভলিউম বইও লেখেন।

কিন্তু আমাদের দুর্ভাগ্য, তাদের লেখনী কিংবা বক্তব্যে বিশ্বনেতৃত্ব ফিরে পাওয়া, বিভিন্ন জাতি-গোষ্ঠীকে পরিবর্তনে আল্লাহর রীতি-নীতি, কুরআন-সুন্নাহর নির্দেশিত পথে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা, নিজ নিজ জাতিকে আল্লাহর পথে আহ্বানে নবি-রাসূলদের দা'ওয়াতের পদ্ধতি ইত্যাদি সম্পর্কে গভীর কোনো দিকনির্দেশ পাই না। এমনকি, আমাদের গৌরবান্বিত ইতিহাসের মহানায়ক- যেমন: নূরুদ্দীন মাহমুদ, সালাহ উদ্দীন আইয়ুবি, ইউসুফ বিন তাশফিন, মাহমুদ গজনবি, মুহাম্মাদ ফাতিহ প্রমুখের নবয়ী পদ্ধতি মেনে জাতিকে দীক্ষাদান এবং রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় তাদের প্রচেষ্টার চুলচেরা বিশ্লেষণও সেখানে অনুপস্থিত; বরং তারা প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের কতিপয় এমন রাজনীতিবিদ, চিন্তাবিদ এবং সুশীলদের মাহাত্ম্য প্রমাণে সচেষ্ট, যারা মানুষদের মধ্যে সবচে' বেশি আল্লাহর বাণী এবং তাঁর পথ ও পদ্ধতি থেকে দূরে দূরে থাকে।

তবে আমি বিভিন্ন জাতি-গোষ্ঠী থেকে অভিজ্ঞতা অর্জনের বিপক্ষে নই। কারণ, জ্ঞান মু'মিনের হারানো সম্পদ। সে যেখানেই পাবে সেখান থেকেই তা কুড়িয়ে নেবে। তবে যারা আল্লাহর পথ-পদ্ধতি বিষয়ে অজ্ঞ কিংবা অজ্ঞতার ভান করে, উপদেশ-নসিহতে পরিপূর্ণ উম্মাতের ঐতিহাসিক শিক্ষা যারা ভুলে যায় এবং এই নিঃস্ব সম্বল নিয়েই যারা কুরআন-সুন্নাহর তোয়াক্কা না করে নিজেদের খেয়াল খুশি মতো মুসলিম উম্মাহকে নেতৃত্ব দেওয়ার স্বপ্ন দেখে, তাদের বিপক্ষে আমার অবস্থান। ইবনুল-কাইয়্যিম আল-জাওযি কতই না সুন্দর বলেছেন:

“কসম আল্লাহর! পাপ নিয়ে আমার নেই কোনো ভয় (আশা করি) ক্ষমা এবং মার্জনার পথ যাবে খুলে। আমার যত ভয়, যদি কুরআন-সুন্নাহর হুকুম ভুলে মেনে নেই মানব-রায়-আমার হবে লয়।”

নবীয় পদ্ধতি জানা আমাদের জন্য অত্যন্ত জরুরি একটি বিষয়। জাতি গঠনে, রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় নবির কার্যপ্রণালী এবং প্রতি যুগের মানব সমাজের কাছে আল্লাহ প্রদত্ত হুকুম-আহকাম সম্পর্কে সম্যক ধারণা আমরা এখানেই পাব। নবিজির দা'ওয়াতি পদ্ধতি জেনে-বুঝে নিয়ে আমরাও দীন প্রতিষ্ঠাকল্পে মানুষকে সহিহ পদ্ধতিতে আল্লাহর পথে আহ্বান করতে পারব। কেবল তখনই আমাদের দা'ওয়াতি-পদ্ধতিকে এমন একটি ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠা করতে পারব, যার প্রতিটি শাখা-প্রশাখা উৎসারিত কুরআন-সুন্নাহ থেকে। আল্লাহ বলেন:

“তোমাদের জন্য আল্লাহর নবিজির মধ্যে সুন্দর আদর্শ রয়েছে; যে আল্লাহ ও শেষদিনের (সাক্ষাতের) আশা রাখে এবং আল্লাহকে বেশি স্মরণ করে তার জন্য।" [সূরা আল-আহযাব, ৩৩:২১]

জাতি গঠন এবং রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় নবিজির কৌশল ছিল পূর্ণাঙ্গ, ভারসাম্যপূর্ণ এবং যুগোপযোগী। একই সঙ্গে তা ছিল সমাজে আল্লাহর বিধান বাস্তবায়ন এবং দেশ ও জাতি জাগরণে একনিষ্ঠ। চূড়ান্ত কৌশলী হয়ে এবং অত্যন্ত বিচক্ষণতার সঙ্গে তিনি এই বিধানগুলো বাস্তবায়ন করতেন। এক্ষেত্রে তিনি বেশকিছু পদ্ধতি সামনে রাখতেন। যেমন: পর্যায়ক্রমিকতা, যাচাই-বাছাই, নানাবিধ উপকরণ গ্রহণ ইত্যাদি। রাসূলুল্লাহ সা. তাঁর সাহাবিদের অন্তরে খোদায়ী-বিধান বদ্ধমূল করে দেন। সাথে সাথে সুমহান আল্লাহ, মানুষ, বিশ্বজগত, জান্নাত-জাহান্নাম, তাকদির ইত্যাদি বিষয় সম্পর্কিত সঠিক বিশ্বাস ও মূল্যবোধগুলো তিনি তাদেরকে হাতে কলমে শিক্ষা দেন।

সাহাবিরা নবিজির মানহাজ দ্বারা অনুপ্রাণিত হন, উদ্বেলিত হন। জীবনের সব বিষয়ে তাঁর নির্দেশনাকে মেনে নেন শিরোধার্যরূপে। তাই তো আমরা দেখি, যে সাহাবি অনুপস্থিতির কারণে নবিজির সামনে থাকতে পারেননি, পরবর্তী সময়ে তিনি অন্য সাহাবির কাছে জিজ্ঞেস করে করে নবিজির কুশলাদি, তাঁর শিক্ষা, দিক- নির্দেশনামূলক উপদেশ, তাঁর মুখ নিঃসৃত অমীয় বাণী এবং অবতীর্ণ হওয়া কুরআনের নতুন আয়াতগুলো জেনে নিতেন। তারা নবিজির ছোটবড় প্রতিটি পদাঙ্ক অনুসরণ করতেন। এই অনুসরণ তারা কেবল নিজেদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখতেন না, বরং সন্তানসন্ততি এবং পরিচিতজনদের জন্যও তা বয়ে নিতেন।

এই বইতে সীরাতের ঘটনা প্রবাহগুলোর সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম পর্যালোচনা রয়েছে। একে একে এতে নবিজির আগমন-পূর্ব পৃথিবীর অবস্থা এবং আগমন-প্রাক্কালে তৎকালীন পৃথিবীর বিদ্যমান সভ্যতাগুলোর পরিচয়, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং চারিত্রিক অবস্থার বর্ণনা থেকে শুরু করে তাঁর জন্মলগ্নে ঘটে যাওয়া গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাবলি, ওয়াহির সূচনা, দা'ওয়াত দেওয়ার বিভিন্ন ধাপ, মাক্কি যুগে মানসিক, চারিত্রিক এবং 'ইবাদাতগত ভিত্তি নির্মাণ, দা'ওয়াত মোকাবেলায় কাফেরদের চক্রান্ত, ইথিওপিয়ায় হিজরাত, তায়িফবাসীর অত্যাচার, ইসরা এবং মি'রাজের ঘটনা, আরবের গোত্রগুলোর কাছে নিরলসভাবে আল্লাহর বাণী প্রচার, আকাবার বাইয়াত, মাদীনায় হিজরাত-সব কিছুই বিধৃত হয়েছে।

বইটি পাঠককে নিয়ে যাবে ঘটনাগুলোর দোরগোড়ায়; সেখান থেকে বের করে আনবে হীরকসম এমন কিছু শিক্ষা, নসিহত এবং উপদেশ যা থেকে উপকৃত হবে মুসলিম সমাজ।

এমনিভাবে নবিজির মদীনায় প্রবেশ থেকে শুরু করে মৃত্যু পর্যন্ত জীবনের আলোচনা করেছে বইটি। বর্ণনা করেছে সমাজের ভিত্তি দৃঢ়করণ, সমাজ সংস্কার, রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় বিভিন্ন উপায় অবলম্বন এবং মাদীনা রাষ্ট্রের ঘরের শত্রু, বাইরের শত্রু ইত্যাদির মোকাবেলায় তাঁর গৃহীত পদক্ষেপগুলোর বিশদ পর্যালোচনা। নবিজির সামাজিক রাজনীতি, ইহুদি-খ্রিষ্টানদের সঙ্গে সম্পাদিত বিভিন্ন চুক্তি, তাঁর সামরিক অভিযান, অর্থনৈতিক সংস্কার ইত্যাদিতে একজন গবেষক পাবেন তার গবেষণার খোরাক। তিনি দেখবেন রাসূল সা. কীভাবে মুসলিমদেরকে এই দীন বোঝার জন্য প্রস্তুত করেছেন; যে দীনের আগমন মানবতাকে আঁধার থেকে আলোয় এবং মূর্তিপূজার নাগপাশ থেকে মুক্ত করে মহান আল্লাহর 'ইবাদাতে মগ্ন করার মহান ব্রত নিয়ে।

উম্মাহর মাঝে সীরাতচর্চা আজ 'সাধারণ জ্ঞান'চর্চার পর্যায়ে নেমে এসেছে; নবিজির জন্মতারিখ, মৃত্যুসন, সংখ্যাতত্ত্বে সামরিক অভিযান, শহিদ-গাজির হিসেবের খেরোখাতা খুলে বসাতেই সীরাতচর্চা সীমাবদ্ধ। সীরাতচর্চার ক্ষেত্রে সংক্ষেপণ এবং হ্রাসকরণের যে প্রবতণতা, আমি এ বইতে তা থেকে উত্তরণের পথ খোঁজার প্রয়াস পেয়েছি। বিগত দশকগুলোতে সীরাতের ওপর উল্লেখ করার মতো কিছু অনুপম সাহিত্যকর্ম সাধিত হয়েছ। আল্লাহ তা'আলা এ কর্মগুলো কবুল করেছেন; মুসলিমদের পড়ার টেবিলে টেবিলে বইগুলো শোভা পাচ্ছে। এমন কিছু বইয়ের নাম: শাফি উদ্দীন মুবারকপুরির আর-রাহীকুল-মাখতুম, মুহাম্মাদ গাজালির ফিকহুস-সীরাহ, ড. মুহাম্মাদ সাইদ রামাদান আল-বুতীর ফিকহুস-সীরাতুন-নাবাওয়িয়াহ, আবুল-হাসান নাদওয়ি আস-সীরাতুন-নাবাওয়িয়াহ প্রভৃতি।

তবে এই গবেষণা কর্মগুলোও সংক্ষিপ্ত। সীরাতের সার্বিক ঘটনাগুলো এতে উঠে আসেনি। বিশ্বের নামিদামি বেশকিছু সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠে বইগুলো পাঠ্য। কোনো কোনো ছাত্রের ধারণা, সীরাতের আগাগোড়া সবকিছুই বইগুলোতে ঠাঁই পেয়েছে। কিন্তু এটা, আমার মতে, পীড়াদায়ক একটি ভুল এবং নবিজির সীরাতের সঙ্গে বেমানান একটি দাবি। পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তের মসজিদের কতিপয় সম্মানিত ইমাম এবং ইসলামি আন্দোলনের কোনো কোনো নেতা এমন ধারণাই পোষণ করেন এবং বক্তৃতা-বিবৃতিতে অনুসারীদেরকে এমন ধারণা পোষণে প্রভাবিত করে থাকেন। ফলে আধিকাংশ মানুষ সীরাতের যে ছবিটা মনে মনে এঁকে থাকেন তাকে সম্পূর্ণ বলা চলে না।

শাইখ মুহাম্মাদ গাজালি এরূপ অপূর্ণাঙ্গ ধারণার ব্যাপারে সতর্ক করে তার ফিকহুস-সীরাহ বইয়ের শেষের দিকে বলেন, “(পাঠক) আপনি হয়তো ভেবে বসে আছেন, জন্ম-মৃত্যুর সনসহ নবিজির পুরো জীবনী আপনার অধ্যয়ন করা সারা। কিন্তু এমন ধারণা চূড়ান্ত রকমের একটি ভুল। আপনি ততক্ষণ পর্যন্ত সীরাত অনুধাবনে ব্যর্থ, যতক্ষণ না আপনি কুরআন-সুন্নাহ অধ্যয়ন করছেন। অধ্যয়নের মাত্রানুযায়ী ইসলামের নবির সঙ্গে আপনার সম্পর্কের মাত্রা নিরূপিত হবে।” (৫)

এ বইটি অধ্যয়নে একজন পাঠক নবিজির সীরাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয় যেমন: বাদ্র, উহুদ, খন্দকের যুদ্ধ, বানু নজির গোত্রে অভিযান, হুদায়বিয়ার সন্ধি, তাবুক যুদ্ধ ইত্যাদি বিষয়ে কুরআন-হাদীসের ভাষ্য আত্মস্থ করবেন। গবেষক বর্ণনা করবেন শিক্ষা, উপদেশ, নসিহত, জয়-পরাজয় প্রদানে আল্লাহর নীতি এবং ঘটনা ও কাহিনির মধ্য দিয়ে কুরআন কীভাবে মনোরোগগুলো সারিয়ে তুলেছে তার প্রেসক্রিপশান।

নিশ্চয়ই সীরাত প্রত্যেক প্রজন্মকে তাদের জীবন চলার পথের পাথেয় জোগান দেয়। প্রতিটি যুগ এবং প্রতিটি কালের জন্য সীরাত অবশ্যই কল্যাণকর একটি শাস্ত্র।

আমি জীবনের বড় একটা সময় কুরআন এবং সীরাত গবেষণায় ব্যয় করেছি। সেই দিনগুলো ছিল আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়। গবেষণার সময় আমি প্রবাসজীবনের একাকীত্বের শোক-দুঃখ-গ্লানি ভুলে ছিলাম। তথ্যসূত্রে, গ্রন্থপঞ্জিতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা মণিমুক্তোতুল্য জ্ঞানভাণ্ডার ছিল আমার নিত্যসঙ্গী। এগুলো সংকলন, বিন্যস্তকরণ এবং সাজিয়ে গুছিয়ে মুসলিম উম্মাহর সামনে উপস্থাপন করতে আমি রাতদিন অবিরাম কাজ করেছি। সে সময়ে একটি বিষয় আমার চোখ এড়ায়নি। আর তা হলো: সীরাতের শিক্ষাদীক্ষা, উপদেশ-নসিহত এবং ঘটনা প্রবাহ ইত্যাদি উপস্থাপনে প্রবীণ ও নবীন সীরাত-লেখকদের মাঝে বৈপরীত্য; ইবনু হিশাম হয়তো একটা কাহিনি উল্লেখ করেছেন যা ইমাম যাহাবি উল্লেখ করেননি। কিংবা দেখা গেল ইবনু কাসীর যে কাহিনি তার বইতে এনেছেন হাদীস সংকলকগণ তা এড়িয়ে গেছেন। এ তো গেল অগ্রজদের অবস্থা। নবীনদের অবস্থাও একই। সিবা'ঈ যা উল্লেখ করেছেন মুহাম্মাদ গাজালি তা করেননি। আবার আল-বুতি যা প্রাধান্য দিয়েছেন সেটা হয়তো আল-গাদবান দেননি।

তবে আমি তাফসীর ও হাদীসের ব্যাখ্যা বিশেষ করে, ফাতহুল-বারি এবং ইমাম নাওয়াওয়ির শারহু মুসলিমসহ ফাকীহদের বইগুলোতে এমন কিছু বিষয় পেয়েছি যা অগ্রজ কিংবা নবীন সীরাত-লেখকদের কেউই তাদের গ্রন্থে উল্লেখ করেননি। আল্লাহর অশেষ দয়ায় আমি সেগুলো সংগ্রহে সক্ষম হয়েছি। সেই মণিমুক্তাগুলো দিয়ে আমি একটি অনিন্দ্য সুন্দর মালা গেঁথেছি। পাঠক অনায়াসেই এর ফল ভোগ করতে পারবেন।

এই বই লিখতে গিয়ে কয়েক শ গ্রন্থপঞ্জি ও তথ্যসূত্রের দ্বারস্থ হতে হয়েছে আমাকে; জ্ঞানীগুণীদের সঙ্গে বিভিন্ন সময়ের যোগাযোগ, আলাপচারিতা, শিক্ষা-বিষয়ক বিতর্ক, আলোচনা-পর্যালোচনা আমাকে নানাভাবে উপকৃত করেছে। তাদের কেউ কেউ দুর্লভ কিছু তথ্যসূত্রের সন্ধান দিয়েছেন; খুঁজে পেতে সাহায্য করেছেন। রাসূল সা. তাঁর বিভিন্ন অভিযানে প্রয়োগ করেছেন এমন কিছু রীতিনীতির প্রতি গুরুত্বারোপের ইঙ্গিতও করেছেন কেউ কেউ। আবার কেউ কেউ সীরাতের ঐতিহাসিক ও চারিত্রিক দিক এবং এ দুটি বিষয়ের মাঝে সমন্বয় সাধন করা এবং হাদিস দ্বারা প্রমাণিত সীরাতের কোনো ভাষ্যের সঙ্গে কুরআনের ভাষ্যের মিল-অমিল খোঁজার ওপর জোর দিয়েছেন। এ বিশাল কর্মযজ্ঞ, নিঃসন্দেহে, বর্তমান প্রজন্মসহ অনাগত প্রজন্মের সামনে নতুন নতুন জ্ঞানের দ্বার অবারিত করবে। উদ্দীপিত করবে গভীর ভাবাবেগে সীরাতকে অনুধাবনে। ঠিক তখনই সীরাত হয়ে উঠবে তাদের আত্মার খোরাক, বিবেক-জাগরণী শক্তি, হৃদয়ের প্রাণ সঞ্চারক।

ইসলামি দাওয়াতের যাত্রাপথের প্রয়োজনীয় সকল দিকই আলোচিত হয়েছে বক্ষ্যমাণ সীরাতের এই বইটিতে। একজন দা'ঈর জন্য রাসূল সা. তাঁর জীবদ্দশাতেই দা'ওয়াত, শিক্ষাদীক্ষা, জিহাদসহ জীবনের খুঁটিনাটি প্রতিটি বিষয়ের নজির স্থাপন করে গেছেন। যে অনন্য চারিত্রিক সুষমা আর নিরুপম গুণাবলি ধারণ করে পৃথিবী নামক এ গ্রহে জীবন-নদী পার হয়েছেন, তা জানতে সাহায্য করবে এটা। সীরাত পড়তে পড়তে পাঠক 'রাসূলের কবি' হাসান বিন সাবিতের নিচের পঙক্তিগুলোর সত্যতা খুঁজে পাবেন :

“তোমার চেয়ে সুন্দর কাউকে দুচোখ দেখেনি; না শ্রেষ্ঠ সন্তান জন্ম দিয়েছেন কোনো জননী। ফুলের মতন পবিত্র তব জন্ম ঠিক যেমনটি চেয়েছে তব মরম।” (৬)

তবে, প্রিয় পাঠক, অগ্রজেরা যা পারেননি, আমি তা সাধন করেছি—এমন অলীক দাবি আমি করছি না। মানবকুলে নবিজির মর্যাদা বর্ণনাতীত। তাঁর জীবনের কিছু দিক রয়েছে যা বোঝার জন্য চাই সূক্ষ্মবুদ্ধি, গভীর অনুধাবনে সক্ষম প্রচণ্ড ধীশক্তিসম্পন্ন এবং ঈমানে অবিচল ব্যক্তিত্বের। আমি এমন দাবিও করছি না যে, আমার এ কাজ নিখাদ; ভুলের ঊর্ধ্বে এবং পূর্ণাঙ্গ। এ দুটি গুণ নবি-রাসূলদের মাহাত্ম্যেই কেবল প্রযোজ্য। নিজেকে সবজান্তা শমসের দাবিকারীর চেয়ে অজমূর্খ আর কে আছে! সুমহান আল্লাহ সত্যই বলেছেন :

“(এ বিষয়ে) তোমাদেরকে সামান্যই জ্ঞান দেওয়া হয়েছে।” [সূরা আল-ইসরা', ১৭:৮৫]

জ্ঞানভাণ্ডার এমন এক সমুদ্রের নাম যার কোনো কূলকিনারা নেই; কোনো সৈকত নেই। জনৈক কবি বলেন, "জ্ঞানে যে নিজেকে 'পণ্ডিত' করে দাবি (তাকে বলুন) যৎসামান্যই আত্মস্থ করেছ, অধরাই রয়েছে সবই।”

সা'আলাবি বলেন, “এক রাতের প্রচেষ্টায় লেখক যে বইটি লিখবেন সেটির তুলনায় কয়েক রাতের প্রচেষ্টায় লিখিত বইটিতে চিন্তা-ভাবনার তারতম্য ঘটবে বিস্তর। এই যদি হয় দু-এক রাতের ঘটনা, তাহলে বছরের পর বছর লেগেছে যে বইটির পেছনে তার অবস্থা কেমন হবে?”

ইমাদ ইস্পাহানি বলেন, "আমি নিজের অভিজ্ঞতা থেকে দেখেছি, মানুষরা রাতারাতি কোনো বই লিখতে পারে না; যদি বইটির পেছনে একাধিক দিন ব্যয় হয়, তবে সেটার মান হবে মোটামুটি, তার চেয়ে বেশি হলে ভালো, আরও বেশি হলে উত্তম। এবং আরও যত্ন নিয়ে, আরও সময় নিয়ে বইটি লিখলে সেটার মান হবে উৎকৃষ্ট থেকে উৎকৃষ্টতর। এটা বড় একটা শিক্ষা। বিষয়টি এ কথাও প্রমাণ করে যে, মানুষের কথায়, চিন্তায় সাময়িকতার ছাপ সুস্পষ্ট।”

পরিশেষে, সুমহান আল্লাহর কাছে আশা করছি, তিনি যেন এ কাজটুকুকে একান্তভাবে তাঁর জন্য কবুল করে নেন এবং তাঁর বান্দাদের উপকারে কাজে লাগান, প্রতিটি হরফের বিনিময়ে সওয়াব দেন। আমার বন্ধু, মুসলিম ভাই ও শুভাকাঙ্ক্ষীসহ যারাই তাদের সর্বোচ্চ দিয়ে এই বইয়ের পূর্ণতা প্রাপ্তিতে সহযোগিতার হাত বাড়িয়েছেন, আল্লাহ তাদের উত্তম জাযা দিন।

আপনি মহামহিম হে আল্লাহ। আপনার তরেই সব তারিফ। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, আপনি ছাড়া আর কোনো উপাস্য নেই। আপনার কাছে আমি ক্ষমা চাই। আপনারই দ্বারে অনুশোচনা করি।

আল্লাহর ক্ষমা, রহমত ও সন্তুষ্টি প্রত্যাশী
'আলি মুহাম্মাদ সাল্লাবি
১৮ রাজাব, ১৪২১ হিজরি; ১৬ অক্টোবর, ২০০০ ইং

টিকাঃ
১. দেখুন: আস-সীরাহ আন-নাবাবিয়্যাহ: অধ্যয়ন ও বিশ্লেষণ, ড. মুহাম্মাদ ফারিস, পৃষ্ঠা, ৫০।
২. দেখুন: মাদখাল লিদিরাসাতিস-সীরাহ, ড. ইয়াহইয়া আল-ইয়াহইয়া, পৃষ্ঠা, ১৪।
৩. আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ইবনে কাসীর, (৩/২৫৬, ২৫৭), মুদ্রণ: দারুল-মা'রিফা, (৩/২৪২) দ্বিতীয় মুদ্রণ, ১৯৭৮, মাকতাবাতুল-মাআ'রিফ, লেবানন, মাকতাবাতুন নাসর-রিয়াদ।
৪. দেখুন: আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া (২/২৪২)।
৫. দেখুন: ফিকহুস-সীরাহ, মুহাম্মাদ গাজালী, পৃষ্ঠা, ৪৭৬।
৬. শারহু দিওয়ান হাসসান বিন সাবিত:

ফন্ট সাইজ
15px
17px