📄 দিনের ব্যস্ততা ও রাতের স্বস্তি আল্লাহর অনুগ্রহ
আল্লাহ তা'আলা বলেন,
قُلْ أَرَعَيْتُمْ إِن جَعَلَ اللَّهُ عَلَيْكُمُ الَّيْلَ سَرْمَدًا إِلَى يَوْمِ الْقِيَامَةِ مَنْ إِلَهُ غَيْرُ اللَّهِ يَأْتِيكُم بِضِيَاءٍ أَفَلَا تَسْمَعُونَ قُلْ أَرَعَيْتُمْ إِن جَعَلَ اللَّهُ عَلَيْكُمُ النَّهَارَ سَرْمَدًا إِلَى يَوْمِ الْقِيَامَةِ مَنْ إِلَهُ غَيْرُ اللَّهِ يَأْتِيكُم بِلَيْلٍ تَسْكُنُونَ فِيهِ أَفَلَا تُبْصِرُونَ * وَمِن رَّحْمَتِهِ، جَعَلَ لَكُمُ الَّيْلَ وَالنَّهَارَ لِتَسْكُنُوا فِيهِ وَلِتَبْتَغُوا مِن فَضْلِهِ، وَلَعَلَّكُمْ تَشْكُرُونَ ﴾ [القصص: ۷۱ ۷۳]
“বল, 'তোমরা ভেবে দেখেছ কি, যদি আল্লাহ রাতকে তোমাদের উপর কিয়ামত পর্যন্ত স্থায়ী করে দেন, তবে তাঁর পরিবর্তে কোন ইলাহ আছে কি যে তোমাদের আলো এনে দেবে? তবুও কি তোমরা শুনবে না'? বল, 'তোমরা ভেবে দেখেছ কি, যদি আল্লাহ দিনকে তোমাদের উপর কিয়ামত পর্যন্ত স্থায়ী করে দেন, তবে তাঁর পরিবর্তে কোন ইলাহ আছে কি, যে তোমাদের রাত এনে দেবে যাতে তোমরা বিশ্রাম করবে? তবুও কি তোমরা ভেবে দেখবে না'? আর তাঁর অনুগ্রহে তিনি তোমাদের জন্য রাত ও দিন করেছেন যাতে তোমরা বিশ্রাম নিতে পার এবং তাঁর অনুগ্রহ সন্ধান করতে পার এবং যেন তোমরা শোকর আদায় করতে পার”। [সূরা আল-কাসাস, আয়াত: ৭১-৭৩]
আল্লাহ তা'আলা বান্দার ওপর রাত-দিনের অনুগ্রহ প্রকাশ করে তাদেরকে কৃতজ্ঞতা আদায় ও ইবাদাতের প্রতি আহ্বান করেছেন। কারণ, তিনি নিজ অনুগ্রহে দিন বানিয়েছেন, যেখানে তারা রিযক অন্বেষণ করে, তাদের প্রয়োজনে দিক্বিদিক ছুটে চলে। অনুরূপ তিনি রাত বানিয়েছেন যেন তারা স্বস্তি হাসিল করে, তাদের রুহ ও শরীর ক্লান্তি দূর হয়, যা বান্দার ওপর আল্লাহর দয়া ও অনুগ্রহ।
রাত-দিন একমাত্র আল্লাহ তা'আলার সৃষ্টি, এতে কোনো মখলুকের দখল নেই। আল্লাহ তা'আলা বলেন,
إِن جَعَلَ اللَّهُ عَلَيْكُمُ الَّيْلَ سَرْمَدًا إِلَى يَوْمِ الْقِيَامَةِ مَنْ إِلَهُ غَيْرُ اللَّهِ يَأْتِيكُم بِضِيَاءٍ أَفَلَا تَسْمَعُونَ ﴾ [القصص: ۷۱]
“যদি আল্লাহ রাতকে তোমাদের ওপর কিয়ামত পর্যন্ত স্থায়ী করে দেন, তবে তাঁর পরিবর্তে কোনো ইলাহ আছে কি যে তোমাদের আলো এনে দেবে?”। [সূরা আল-কাসাস, আয়াত: ৭১]
অন্যত্র তিনি বলেন,
إِن جَعَلَ اللَّهُ عَلَيْكُمُ النَّهَارَ سَرْمَدًا إِلَى يَوْمِ الْقِيَامَةِ مَنْ إِلَهُ غَيْرُ اللَّهِ يَأْتِيكُم بِلَيْلٍ تَسْكُنُونَ فِيهِ أَفَلَا تُبْصِرُونَ ﴾ [القصص: ٧٢]
“যদি আল্লাহ দিনকে তোমাদের ওপর কিয়ামত পর্যন্ত স্থায়ী করে দেন, তবে তাঁর পরিবর্তে কোনো ইলাহ আছে কি, যে তোমাদের রাত এনে দেবে যাতে তোমরা বিশ্রাম করবে?”। [সূরা আল-কاسাস, আয়াত: ৭২]
লক্ষ্য করুন আল্লাহ রাত সম্পর্কে বলেছেন: أَفَلَا تَسْمَعُونَ “তোমরা কি শোেন না”। আর দিন সম্পর্কে বলেছেন: أَفَلَا تُبْصِرُونَ “তোমরা কি দেখ না”। কারণ, রাতে দৃষ্টি শক্তির চেয়ে শ্রবণ শক্তি প্রখর থাকে, অনুরূপ দিনে শ্রবণ শক্তির চেয়ে দৃষ্টি শক্তি প্রখর থাকে। বান্দা যদি এসব নি'আমত নিঃশেষ ও বিলীন হওয়ার কথা চিন্তা করে, তাহলে তার বিবেক আল্লাহর অনুগ্রহের নিকট অবনত হবে। আর যে মনে করে এগুলো প্রকৃতির চিরাচরিত নিয়ম, আদিকাল থেকে চলছে, অনন্তকাল চলবে, তার অন্তর কখনো আল্লাহর কৃতজ্ঞতার জন্য উন্মুক্ত হবে না। তার চোখ অন্ধ, সে কখনো এ থেকে উপদেশ গ্রহণ করবে না, তার থেকে কখনো আল্লাহর শোকর প্রকাশ পাবে না।⁸
আল্লাহর সকল প্রশংসা, তিনি আমাদেরকে অগণন ও বেহিসাব নি'আমত দান করেছেন। তিনি আমাদেরকে ঘুমের জন্য দিয়েছেন অন্ধকার রাত, আর কাজের জন্য দিয়েছেন আলোকিত দিন। আমরা এতে নানা ইবাদত সম্পাদন করে আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করতে সক্ষম হই।
টিকাঃ
⁸ তাফসীর সাদী: (৬/৫৩-৫৪)।
📄 নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ঘুমের আদর্শ
রাতের শুরুতে ঘুমানো ও শেষে ঘুম থেকে উঠার উপকারিতা স্বাস্থ্য সচেতন প্রত্যেক ব্যক্তির নিকট স্পষ্ট। রাতের শেষার্ধে ঘুম থেকে উঠা, মিসওয়াক করা, অযু করা ও আল্লাহর তাওফিক মোতাবেক সালাত আদায় করার গুরুত্ব ইসলামে অনস্বীকার্য। এতে শরীর ও মন প্রফুল্ল থাকে, স্বস্তি হাসিল হয়। এতে আরো রয়েছে শারীরিক ব্যায়াম। ইবাদাতের সাওয়াব তো আছেই, এভাবে ঘুম ও রাত জাগার ফলে মুসলিমের অন্তর ও শরীর সতেজ থাকে এবং দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণ লাভ হয়। কারণ, এতে শরীর যেমন প্রয়োজনীয় ঘুম পূর্ণ করে, অনুরূপ অতিরিক্ত ঘুমের অনিষ্ট থেকে নিরাপদ থাকে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ঘুম ও রাত জাগা ছিল পরিমিত ও নিয়মতান্ত্রিক। যখন ঘুমের প্রয়োজন হত ডান কাত হয়ে ঘুমিয়ে নিতেন। ঘুমের আযকার আদায় করতেন। তিনি কখনো খাদ্য-পানীয় দ্বারা উদর পূর্ণ করতেন না। তিনি মাটির ওপর শয়ন করতেন না, অনুরূপ উঁচু বিছানাও গ্রহণ করতেন না। তার বিছানা ছিল চামড়ার। তিনি বালিশের ওপর শয়ন করতেন, কখনো গালের নিচে হাত রাখতেন।
📄 ঘুমের উপকারিতা
ঘুমের দু'টি প্রধান উপকার:
এক. ঘুমের ফলে দিনের ব্যস্ততা শেষে স্বস্তি হাসিল হয়, বিরক্তি ও আলস্য দূর হয়।
দুই. ঘুমের ফলে খাদ্য হজম হয় এবং পেটে বিদ্যমান বিভিন্ন খাদ্যে সুন্দরভাবে মিশ্রণ ঘটে। কারণ শরীরের উষ্ণতা ঘুমন্ত অবস্থায় পেটে জমা হয় ও হজম শক্তি বৃদ্ধি করে। তাই আমরা দেখি ঘুমন্ত ব্যক্তির দেহের বহিরাংশ ঠাণ্ডা থাকে, ফলে তার অতিরিক্ত পোশাকের প্রয়োজন হয়।⁹
টিকাঃ
⁹ যাদুল মায়াদ: (৪/২৩৯-২৪০)।
📄 দিনের ঘুম ক্ষতিকর
দিনের ঘুম ক্ষতিকর। এর ফলে রোগের বিভিন্ন উপসর্গ সৃষ্টি হয়, যেমন বংশগত রোগ, স্নায়ু তন্ত্রের দুর্বলতা ও অলসতা এবং যৌন শক্তি হ্রাস পায়, তবে গরমের মৌসুমে দ্বি-প্রহরের ঘুম উপকারী। প্রভাতের ঘুম বেশী ক্ষতিকর, আরো ক্ষতিকর আসর পরবর্তী ঘুম। আব্দুল্লাহ ইন্ন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু তার এক ছেলেকে সকালে ঘুমাতে দেখে বলেন: “উঠ, তুমি এমন সময় ঘুমচ্ছ যখন রিযক বণ্টন হচ্ছে?!”
কেউ বলেছেন: দিনের ঘুম তিন প্রকার: উত্তম অভ্যাস, দহন ও বোকামি। উত্তম অভ্যাস: দ্বিপ্রহরের ঘুম, যা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অভ্যাস ছিল। নির্বুদ্ধিতা: প্রথম প্রহরের ঘুম, যা দুনিয়া ও আখেরাতের কাজ থেকে বিরত রাখে। বোকামি: আসর পরবর্তী ঘুম।
জনৈক বুজুর্গ বলেছেন: আসরের পর ঘুমানোর কারণে যার বিবেকের বিলুপ্তি ঘটে, সে যেন নিজেকে ব্যতীত কাউকে দোষারোপ না করে।
কোনো এক কবি বলেছেন:
أَلَا إِنَّ نَوْمَاتِ الضُّحَى تُورِثُ الفَتَى - خَبَالاً وَنَوْمَاتُ العُصَيْرِ جُنُونُ
“জেনে রেখ! প্রথম প্রহরের ঘুম মানসিক বিকৃতি সৃষ্টি করে, আর আসর পরবর্তী ঘুম পাগলামি”।
দিনের শুরুতে সকল সৃষ্টিজীব রিযকের সন্ধানে বের হয়। এটা মূলত রিযক বণ্টনের বিশেষ মুহূর্ত। তাই এ সময়ের ঘুম মূলত বঞ্চিত হওয়ার ঘুম, তবে প্রয়োজনের সময় ব্যতীত। এ ঘুম শরীরের জন্য ক্ষতিকর, অলসতা সৃষ্টি করে ও হজম ক্রিয়া বাধা গ্রস্ত করে, ফলে দুর্বলতা, অস্বস্তি ও আলস্য দেখা দেয়। আর এ ঘুম যদি হয় প্রভাতের মল ত্যাগ, হাঁটাচলা ও সামান্য খাদ্য গ্রহণের পূর্বে, তাহলে আরো ক্ষতিকর, যার ফলে কঠিন ও জটিল রোগ সৃষ্টি হতে পারে।¹⁰
টিকাঃ
¹⁰ যাদুল মায়াদ: (৪/২৪১-২৪২)।