📄 রাত-দিন আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ
আল্লাহ তা'আলার দয়া ও অনুগ্রহ যে, তিনি রাতকে বানিয়েছেন অন্ধকার, যা মানব জাতির স্বস্তি ও বিশ্রাম উপযোগী। দিনকে বানিয়েছেন উজ্জ্বল, যা তাদের দীন, দুনিয়া ও আখিরাতের কর্ম উপযুক্ত।
১. আল্লাহ তা'আলা বলেছেন:
هُوَ الَّذِي جَعَلَ لَكُمُ الَّيْلَ لِتَسْكُنُوا فِيهِ وَالنَّهَارَ مُبْصِرًا إِنَّ فِي ذَلِكَ لَآيَاتٍ لِقَوْمٍ يَسْمَعُونَ ﴾ [يونس : ٦٧]
“তিনিই সে সত্তা, যিনি তোমাদের জন্য রাতকে সৃষ্টি করেছেন, যেন তোমরা তাতে বিশ্রাম নাও এবং দিনকে করেছেন আলোকময়। নিশ্চয় এতে রয়েছে নিদর্শনাবলি এমন কওমের জন্য যারা শুনে”। [সূরা ইউনূস, আয়াত: ৬৭]
২. আল্লাহ তা'আলা বলেছেন:
وَمِنْ ءَايَاتِهِ مَنَامُكُم بِالَّيْلِ وَالنَّهَارِ وَابْتِغَاؤُكُم مِّن فَضْلِهِ إِنَّ فِي ذَلِكَ لَآيَاتٍ لِقَوْمٍ يَسْمَعُونَ ﴾ [الروم: ٢٣]
“আর তাঁর নিদর্শনাবলীর মধ্যে রয়েছে রাতে ও দিনে তোমাদের নিদ্রা এবং তাঁর অনুগ্রহ থেকে তোমাদের (জীবিকা) অন্বেষণ। নিশ্চয় এর মধ্যে নিদর্শনাবলী রয়েছে সে কাওমের জন্য যারা শোনে”। [সূরা আর-রূম, আয়াত: ২৩]
৩. আল্লাহ তা'আলা বলেছেন:
اللَّهُ الَّذِي جَعَلَ لَكُمُ الَّيْلَ لِتَسْكُنُوا فِيهِ وَالنَّهَارَ مُبْصِرًا إِنَّ اللَّهَ لَذُو فَضْلٍ عَلَى النَّاسِ وَلَكِنَّ أَكْثَرَ النَّاسِ لَا يَشْكُرُونَ ﴾ [غافر: ٦١]
“আল্লাহ, যিনি তোমাদের জন্য রাত বানিয়েছেন যাতে তোমরা তাতে বিশ্রাম করতে পার এবং দিনকে করেছেন আলোকোজ্জ্বল। নিশ্চয় আল্লাহ মানুষের প্রতি বড়ই অনুগ্রহশীল; কিন্তু অধিকাংশ মানুষ কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে না”। [সূরা গাফির, আয়াত: ৬১]
৪. আল্লাহ তা'আলা বলেছেন:
أَلَمْ يَرَوْا أَنَّا جَعَلْنَا الَّيْلَ لِيَسْكُنُوا فِيهِ وَالنَّهَارَ مُبْصِرًا إِنَّ فِي ذَلِكَ لَآيَاتٍ لِقَوْمٍ يُؤْمِنُونَ ﴾ [النمل: 86]
“তারা কি দেখে না যে, আমরা রাতকে সৃষ্টি করেছি, যেন তারা তাতে বিশ্রাম নিতে পারে এবং দিনকে করেছি আলোকিত? নিশ্চয় এতে নিদর্শনাবলী রয়েছে সেই কওমের জন্য যারা ঈমান এনেছে”। [সূরা আন-নামাল, আয়াত: ৮৬]
৫. আল্লাহ তা'আলা বলেছেন:
وَهُوَ الَّذِي جَعَلَ لَكُمُ الَّيْلَ لِبَاسًا وَالنَّوْمَ سُبَاتًا وَجَعَلَ النَّهَارَ نُشُورًا ﴾ [الفرقان: ٤٧]
"আর তিনিই তোমাদের জন্য রাতকে আবরণ ও নিদ্রাকে আরামপ্রদ করেছেন এবং দিনকে করেছেন জাগ্রত থাকার সময়”। [সূরা ফুরকান, আয়াত: ৪৭]
📄 শিক্ষণীয় বিষয়
১. রাত-দিন সৃষ্টিতে রয়েছে আল্লাহর বিশেষ হিকমত। তিনি দিন সৃষ্টি করেছেন কর্ম ও প্রয়োজন পূরণের জন্য, আর দিনের ক্লান্তি থেকে স্বস্তি হাসিল করার জন্য সৃষ্টি করেছেন রাত।
২. রাত-দিনের পরিক্রমায় রয়েছে আল্লাহর কুদরত, মহিমা ও তাওহীদের নিদর্শন।
৩. যাদের বুঝের ক্ষমতা, চিন্তার মেধা ও ইমানি শ্রবণ ইন্দ্রিয় রয়েছে, তারা আল্লাহর সৃষ্ট মখলুক থেকে উপদেশ হাসিল করে।
৪. রাতে ঘুম ও দিনে জীবিকা অর্জনের প্রতিযোগিতা আল্লাহর নিদর্শন, তাওহীদ ও কুদরতের দলীল।
৫. ইবাদাত বা প্রয়োজন ব্যতীত যে রাত জাগল, সে মানব প্রকৃতির বিরোধিতা করল, যে প্রকৃতির ওপর আল্লাহ তাকে সৃষ্টি করেছেন।
৬. রাতকে ঘুম, স্বস্তি ও আরামের অনুকূল করা মানুষের ওপর আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ ও বড় নি'আমত, যার শোকর আদায় করা ওয়াজিব, “কিন্তু অধিকাংশ মানুষ শোকর আদায় করে না”।
৭. মুমিন ব্যতীত কেউ রাত-দিনকে স্রষ্টার কুদরত বলে স্বীকার করে না এবং তার বিস্ময় নিয়ে চিন্তা করে না।
৮. বান্দার ওপর আল্লাহর অনুগ্রহ যে, তিনি অন্ধকারকে করেছেন রাতের আচ্ছাদন, ঘুমকে বানিয়েছেন স্বস্তি অর্জন ও ক্লান্তি থেকে মুক্তির উপকরণ। আর দিনকে করেছেন উজ্জ্বল, যেন তারা জীবিকা অর্জন ও প্রয়োজন পূরণে সক্ষম হয়। সকল প্রশংসার মালিক একমাত্র আল্লাহ তা'আলা।
📄 রাত জাগার অপকারিতা
রাত জাগার অপকারিতা অনেক। যেমন,
১. রাত জাগার ফলে সুন্নাতের বিরোধিতা হয়। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এশার পূর্বে ঘুম ও এশার পর কথোপকথন অপছন্দ করতেন। আবু বারযাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত:
«أَنّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ كَانَ يَكْرَهُ النَّوْمَ قَبْلَ الْعِشَاءِ وَالْحَدِيثَ بَعْدَهَا».
“রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এশার পূর্বে ঘুম ও পরে কথাবার্তা অপছন্দ করতেন”।¹
২. রাত জাগার ফলে অনেক সময় ফজর সালাত জমা'আতের সাথে আদায় করা সম্ভব হয় না, যা পূর্ণ রাত কিয়াম করার সমতুল্য। সহীহ মুসলিমে বর্ণিত:
«من صلى العشاء في جماعة، فكأنما قام نصف الليل، ومن صلى العشاء والفجر مع الجماعة، فكأنما قام الليل كله».
“যে ব্যক্তি জমা'আতের সাথে এশার সালাত আদায় করল, সে যেন অর্ধেক রাত কিয়াম করল, আর যে এশা ও ফজর জমা'আতের সাথে আদায় করল, সে যেন পূর্ণ রাত কিয়াম করল"।²
৩. আল্লাহ তা'আলা নিজ হিকমতের দাবিতে মানব জাতির স্বস্তি, প্রশান্তি ও ক্লান্তি থেকে বিশ্রাম গ্রহণের জন্য সৃষ্টি করেছেন রাত, যে রাত জাগল সে আল্লাহর হিকমতের বিপরীত কাজ করল।
৪. রাত জাগার ফলে দিনে ঘুমের চাপ সৃষ্টি হয়, যে কারণে ব্যক্তির পেশা, অথবা ব্যবসা অথবা কৃষি অথবা শিক্ষাদান অথবা চাকুরী ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অতএব রাত জাগা মানুষের প্রকৃতি পরিপন্থী, যে প্রকৃতির ওপর আল্লাহ তাদেরকে সৃষ্টি করেছেন। রাত জাগার কারণে অনেক সময় পাঁচ ওয়াক্ত সালাত জমা'আতের সাথে আদায় করা সম্ভব হয় না, যা চরম বিপর্যয় ও মহা মুসিবত।
৫. রাত জাগার ফলে শারীরিক ও মানসিক বিভিন্ন রোগের সূত্রপাত ঘটে। হ্যাঁ যে সুন্নত মোতাবেক রাত জেগে তাহাজ্জুদ, ইবাদাত, যিকির, দো'আ ও কুরআন তিলাওয়াতে মশগুল থাকে, তার রাত জাগা ক্ষতিকর নয়, বরং উপকারী। আমাদের সকলের কর্তব্য পার্থিব জগতের সংক্ষিপ্ত জীবনে ইবাদাতের জন্য প্রতিযোগিতার ময়দানে অবতীর্ণ হওয়া, যা আমাদের ইহকালীন ও পরকালীন সফলতার চাবিকাঠি।
অতএব, আল্লাহর রহমত প্রত্যাশাকারী ও তার শাস্তিতে ভীত প্রত্যেকের উচিৎ প্রথম রাতে ঘুমানো ও শেষ রাতে উঠা। অতঃপর সালাত, ইবাদাত, দোয়া, ইস্তেগফার ও তওবা ইত্যাদিতে মশগুল থাকা। হাদীসে এসেছে, আল্লাহ তা'আলা প্রতি রাতে দুনিয়ার আসমানে অবতরণ করেন, যখন রাতের এক তৃতীয়াংশ বাকি থাকে। অতঃপর তিনি বলেন,
«من يدعوني فأستجيب له؟ من يسألني فأعطيه؟ من يستغفرني فأغفر له؟»
“কে আমাকে আহ্বান করবে, আমি তার ডাকে সাড়া দেব? কে আমার নিকট প্রার্থনা করবে, আমি তাকে প্রদান করব? কে আমার নিকট ইস্তেগফার করবে, আমি তাকে ক্ষমা করব?"।³
এ সব ক্ষতি ও অপকারিতা হচ্ছে বৈধ কাজে রাত জাগার পরিণতি। আর হারাম কাজে রাত জাগার পরিণতি আরো মারাত্মক, আরো ভয়ঙ্কর, যেমন খেল-তামাশা, অশ্লীল বিনোদন ও পর্ণো সিরিয়াল দর্শনে মত্ত থাকা। কারণ, মানুষের সময় ও হায়াত হচ্ছে ইবাদাতের জন্য, তাকে এ সম্পর্কে অবশ্যই জিজ্ঞাসা করা হবে, তাকে এর জবাবদিহি করতে হবে, অতঃপর সে তার ভালো-মন্দ কর্মের ফল ভোগ করবে। তাকে অবশ্যই জিজ্ঞাসা করা হবে: তার দেখা, তার শ্রবণ করা ও তার অন্তরে গোপন বিষয় সম্পর্কে। আল্লাহ তা'আলা বলেছেন:
إِنَّ السَّمْعَ وَالْبَصَرَ وَالْفُؤَادَ كُلُّ أُوْلَبِكَ كَانَ عَنْهُ مَسُولًا ﴾ [الاسراء: ٣٦]
“নিশ্চয় কান, চোখ ও অন্তঃকরণ- এদের প্রতিটির ব্যাপারে সে জিজ্ঞাসিত হবে”। [সূরা আল-ইসরা, আয়াত: ৩৬]
অন্যত্র তিনি বলেন,
فَوَرَبِّكَ لَنَسْلَنَّهُمْ أَجْمَعِينَ * عَمَّا كَانُوا يَعْمَلُونَ ﴾ [الحجر: ٩٢ ،٩٣]
“অতএব, তোমার রবের কসম, আমরা তাদের সকলকে অবশ্যই জেরা করব, তারা যা করত, সে সম্পর্কে”। [সূরা আল-হিজর, আয়াত: ৯২-৯৩]
অতএব, বুদ্ধিমানের কাজ হচ্ছে এর সঠিক উত্তর প্রস্তুত করা, নিজের হিসাব নিজে কষা, সর্বদা গভীর দৃষ্টি রাখা: কী বলছে, কী করছে, কী নিচ্ছে ও দিচ্ছে! রাতে তাহাজ্জুদ আদায়কারী মুমিনদের প্রশংসা করে আল্লাহ তা'আলা বলেন,
كَانُواْ قَلِيلًا مِّنَ الَّيْلِ مَا يَهْجَعُونَ ﴾ [الذاريات: ١٧]
“রাতের সামান্য অংশই এরা ঘুমিয়ে কাটাতো”। [সূরা আয-যারিয়াত, আয়াত: ১৭]
অন্যত্র বলেন,
تَتَجَافَى جُنُوبُهُمْ عَنِ الْمَضَاجِعِ يَدْعُونَ رَبَّهُمْ خَوْفًا وَطَمَعًا وَمِمَّا رَزَقْنَاهُمْ يُنفِقُونَ فَلَا تَعْلَمُ نَفْسٌ مَّا أُخْفِيَ لَهُم مِّن قُرَّةِ أَعْيُنِ جَزَاءً بِمَا كَانُوا يَعْمَلُونَ ﴾ [السجدة : ١٦، ١٧]
“তাদের পার্শ্বদেশ বিছানা থেকে আলাদা হয়। তারা ভয় ও আশা নিয়ে তাদের রবকে ডাকে। আর আমি তাদেরকে যে রিযক দান করেছি, তা থেকে তারা ব্যয় করে। অতঃপর কোনো ব্যক্তি জানে না তাদের জন্য চোখ জুড়ানো কী জিনিস লুকিয়ে রাখা হয়েছে, তারা যা করত, তার বিনিময়স্বরূপ”। [সূরা আস-সাজদাহ, আয়াত: ১৬-১৭]
চিন্তা করুন কিয়ামুল লাইল আদায়কারীর জন্য আল্লাহ কত নি'আমত গোপন রেখেছেন!!! অন্তরের সব চাহিদা পূরণ করা হবে: যা কোনো চোখ দেখে নি, যা কোনো কান শ্রবণ করে নি, মানুষের অন্তরে যার কল্পনা পর্যন্ত হয়নি। আল্লাহ তা'আলা বলেছেন:
أَمَّنْ هُوَ قَانِتُ ءَانَاءَ الَّيْلِ سَاجِدًا وَقَابِمَا يَحْذَرُ الْآخِرَةَ وَيَرْجُواْ رَحْمَةَ رَبِّهِ قُلْ هَلْ يَسْتَوِي الَّذِينَ يَعْلَمُونَ وَالَّذِينَ لَا يَعْلَمُونَ إِنَّمَا يَتَذَكَّرُ أُولُوا الْأَلْبَابِ ﴾ [الزمر: ٩]
“যে ব্যক্তি রাতের প্রহরে সাজদাবনত হয়ে ও দাঁড়িয়ে আনুগত্য প্রকাশ করে, আখিরাতকে ভয় করে এবং তার রব-এর রহমত প্রত্যাশা করে (সে কি তার সমান যে এরূপ করে না) বল, 'যারা জানে আর যারা জানে না তারা কি সমান?' বিবেকবান লোকেরাই কেবল উপদেশ গ্রহণ করে”। [সূরা আয-যুমার, আয়াত: ৯]
কিয়ামুল লাইল সম্পর্কে ইমাম তিরমিযী মুয়ায ইবন জাবাল রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত করেন, হাদিসের অংশ:
«أَلَا أَدُلُّكَ عَلَى أَبْوَابِ الْخَيْرِ: الصَّوْمُ جُنَّةً، وَالصَّدَقَةُ تُطْفِئُ الْخَطِيئَةَ كَمَا يُطْفِئُ الْمَاءُ النَّارَ، وَصَلَاةُ الرَّجُلِ مِنْ جَوْفِ اللَّيْلِ»
"... আমি কি তোমাকে কল্যাণের পথগুলো বলে দেব না: সওম ঢাল। সদাকা পাপ মোচন করে, যেমন পানি অগ্নি নির্বাপণ করে, অনুরূপ ব্যক্তির সালাত রাতের মধ্যভাগে ...।”⁴ আল্লাহ তা'আলা শেষ রাতে দুনিয়ার আসমানে অবতরণ করেন যখন এক তৃতীয়াংশ বাকি থাকে। তিনি বলেন:
«من يدعوني فأستجيب له؟ من يسألني فأعطيه؟ من يستغفرني فأغفر له؟ حتى يطلع الفجر»
“কে আমাকে আহ্বান করবে, আমি তার ডাকে সাড়া দেব? কে আমার নিকট প্রার্থনা করবে, আমি তাকে প্রদান করব? কে আমার নিকট ইস্তেগফার করবে, আমি তাকে ক্ষমা করব? যতক্ষণ না ফজর উদিত হয়”।⁵
আফসোস! বর্তমান যুগে অধিকাংশ লোক এ ফযিলত থেকে বঞ্চিত, বিশেষ করে যারা অর্ধেক রাত পর্যন্ত নাচ-গান ও অশ্লীল বিনোদনে মেতে থাকে, অতঃপর ফজর সালাত সূর্য উঠার পর অসময়ে কাযা করে। আহ্! কত বড় বিপর্যয়! কত বড় মুসিবত!
টিকাঃ
¹ সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৫৩৭; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১০৩২।
² সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৬৫৬।
³ সহীহ বুখারী, হাদীস নং ১০৮৩; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১২৬৭।
⁴ তিরমিযী হাদীস নং ২৫৫৮, ইমাম তিরমিযী হাদীসটি হাসান ও সহীহ বলেছেন।
⁵ সহীহ বুখারী ও মুসলিম।
📄 ঘুমের হিকমত ও উপকারিতা
আল্লাহ তা'আলা বলেছেন:
وَجَعَلْنَا نَوْمَكُمْ سُبَاتًا وَجَعَلْنَا الَّيْلَ لِبَاسًا وَجَعَلْنَا النَّهَارَ مَعَاشًا ﴾ [النبا: ۹، ۱۱]
“আর আমরা তোমাদের নিদ্রাকে করেছি বিশ্রাম। আর আমরা রাতকে করেছি আবরণ। আর আমরা দিনকে করেছি জীবিকার্জনের সময়”। [সূরা আন-নাবা, আয়াত: ৯-১১]
ঘুম আল্লাহর নিখুঁত পরিকল্পনার ফল। ঘুম মানুষের স্বস্তি আনয়ন করে, দিনের কঠোর পরিশ্রম ও কর্ম-ব্যস্ততা থেকে মুক্তি দেয়। ঘুম না মৃত্যু-না জীবন বরং উভয়ের মধ্যকার এক বিশেষ অবস্থা, শরীর ও অস্থির প্রশান্তি বিধায়ক। দিনের নানান কোলাহল ও কর্ম-ক্লান্তির বিপরীতে রয়েছে রাতের পিনপতন নীরবতা। সব কিছু এমন সূক্ষ্ম ও নিখুঁতভাবে সম্পন্ন হয়, যা মানুষের চিন্তার অতীত, যেখানে তাদের ইচ্ছার কোনো দখল নেই। জেগে আছে, অথচ জানে না কীভাবে জেগে আছে! ঘুমিয়ে আছে, অথচ জানে না কিভাবে ঘুমিয়ে আছে! এ সব পর্যবেক্ষণ করার ক্ষমতা তার নেই। এখানে বিদ্যমান জীব জগতের গুঢ় রহস্য, যা তার স্রষ্টা ব্যতীত কেউ জানে না। কোনো প্রাণী লাগাতার নির্ঘুম থাকতে পারে না, যে কৃত্রিম উপায়ে চেষ্টা করবে, তার মৃত্যু নিশ্চিত।
শরীর ও অস্থির প্রয়োজন ছাড়া আরো অনেক উপকারিতা রয়েছে ঘুমে। যেমন, ঘুম আত্মার প্রশান্তি, যার স্পর্শ পাওয়া মাত্র ব্যক্তির হাত ফসকে অস্ত্র-ঢাল সব মাটিতে পড়ে যায়, ইচ্ছা বা অনিচ্ছায়। মুহূর্তের জন্য তলীয়ে যায় সে প্রশান্তির অতল গহীনে, যার প্রয়োজন তার নিকট খাদ্য-পানির চেয়ে কম নয়। এর মধ্যে ঘটে যায় কতক সময় অলৌকিক ঘটনা। যেমন, চোখের ঝিমুনি, শরীরের মন্থরতা, অস্থির নিষ্ক্রিয়তা, অন্তরের বেচঈনি ও মনের ভীতিকর অবস্থা। এ হালত বেশি দীর্ঘায়ু হয় না, কিন্তু ব্যক্তির জীবনে এনে দেয় পরিপূর্ণ বিপ্লব। এর ফলে তার শুধু শক্তিই বৃদ্ধি পায় না, বরং সে নিজে শক্তিতে পরিণত হয়, যেন নতুন করে জাগ্রত হলো, সাহস পেল ও ভয় দূরীভূত হল। যেরূপ ঘটেছিল বদর ও উহুদ যুদ্ধে মুসলিম মুজাহিদ বাহিনীতে। তাই অনুগ্রহ প্রকাশ করে আল্লাহ তা'আলা বলেন:
إِذْ يُغَشِيكُمُ النُّعَاسَ أَمَنَةً مِّنْهُ ﴾ [ الانفال: ١١]
“স্মরণ কর, যখন তিনি তোমাদেরকে তন্দ্রায় আচ্ছন্ন করেন তাঁর পক্ষ থেকে নিরাপত্তাস্বরূপ”। [সূরা আল-আনফাল, আয়াত: ১১]
অন্যত্র বলেন,
ثُمَّ أَنزَلَ عَلَيْكُم مِّنْ بَعْدِ الْغَمِّ أَمَنَةً نُّعَاسًا يَغْشَى طَائِفَةً مِّنكُم ﴾ [ال عمران: ١٥٤]
“তারপর তিনি তোমাদের ওপর দুশ্চিন্তার পর নাযিল করলেন প্রশান্ত তন্দ্রা, যা তোমাদের মধ্য থেকে একদলকে ঢেকে ফেলেছিল”। [সূরা আল ইমরান, আয়াত: ১৫৪]
অতএব, দিনের ব্যস্ততা ও কর্ম ক্লান্তি থেকে মুক্তির জন্য ঘুম গুরুত্বপূর্ণ এক অধ্যায়, আল্লাহর বিশেষ কুদরত, যেখানে রয়েছে অফুরন্ত হিকমত ও রহস্য, যা তিনি ব্যতীত কেউ জানে না। এ কারণে ঘুমের আলোচনা কুরআনে এসেছে বারবার, তাতে চিন্তা, গবেষণা ও তা থেকে উপদেশ গ্রহণ করার জন্য বারবার তাগিদ প্রদান করা হয়েছে।
সুবহানাল্লাহ! আল্লাহ তা'আলা এ বিশ্ব চরাচরকে পুরোপুরি জীব জগতের অনুকূল ও অনুগামী করে দিয়েছেন। মানুষ যখন ঘুমায়, পুরো জগত তখন ঘুমায়। তিনি রাতকে অন্ধকার আচ্ছাদন দ্বারা ঢেকে দিয়েছেন, ফলে স্বস্তি ও প্রশান্তি লাভের জন্য সকলে রাতের আচ্ছাদনে অদৃশ্য হয়ে যায়। অতঃপর রাতের ওপর দিনের বিচ্ছুরণ ঘটান, ফলে পুনরায় সবাই জীবিকার অন্বেষণ ও কর্ম-ব্যস্ততায় মগ্ন হয়। এভাবে মহান আল্লাহ তার সৃষ্ট জগতের ভারসাম্য রক্ষা করেন, যে কারণে পৃথিবী বসবাস উপযোগী। প্রকৃতির এ সাধারণ নিয়মে জীব জগত যেরূপ অভ্যস্ত, অনুরূপ জীব জগতের সাধারণ স্বভাবের অনুগামী প্রকৃতি। একে অপরের পরিপূরক, একটি ব্যতীত অপরটি অসম্পূর্ণ, উভয়ের সমন্বয়ে এ সুন্দর পৃথিবী। এখানে আল্লাহর কুদরতের প্রমাণ, এ হচ্ছে তার নিখুঁত ও ত্রুটিহীন নির্মাণ। সুবহানাল্লাহ!⁶
টিকাঃ
⁶ তাফসীর 'ফী জিলালিল কুরআন' লি সাইয়্যেদ কুতুব: (৮/৪৩০)।