📄 ইসলামে বিচার ফায়সালার গুরুত্ব
গোটা বিশ্বের বুকে কেবলমাত্র ইসলামই এমন একটি দীন যা ধর্ম ও জাগতিকতার সমন্বয়ে গঠিত। ইসলাম মানুষের সম্পর্ক একদিকে স্রষ্টার সাথে স্থাপন করে, আরেক দিকে জুড়ে দেয় সৃষ্টির সাথে। দীনের বিশ্বাসগত দিক থেকে একজন মুসলিমকে তাওহীদ, রিসালাত, আখিরাত, ফেরেশতা, আল্লাহ্র অবতীর্ণ গ্রন্থাবলী এবং তকদীরের ভাল মন্দের প্রতি সুদৃঢ় ঈমান পোষণ করতে হয়। অপরদিকে বিধানগত দিক থেকে দীন তাকে নির্দেশ দেয় সালাত কায়েম করতে, যাকাত পরিশোধ করতে, রমযান মাসের রোযা রাখতে এবং যাবার সামর্থ থাকলে আল্লাহর সম্মানিত ঘরে গিয়ে হজ্জ পালন করতে।
আবার জাগতিক ও বৈষয়িক বিষয়াদিতে আল্লাহ্র বিধান অনুসরণ করাকে তার জন্যে অপরিহার্য করে দেয়া হয়েছে। বিশেষ করে বিয়ে, তালাক, ব্যবসা বাণিজ্য, উত্তরাধিকার, হেবা, ওয়াকফ, অসীয়ত এবং ব্যক্তিগত, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় অন্যসকল বিষয়ে।
এর অর্থ এই নয় যে, দীনি ও বৈষয়িক বিষয়াদির মর্যাদা এখানে পৃথক পৃথক। না, এমনটি মোটেও নয়। বরঞ্চ এগুলোর প্রত্যেকটিই একটি আরেকটির অংশ এবং অনুপূরক। বাহ্যত দীনি এবং বৈষয়িক বিষয়ে যে ব্যবধান পরিলক্ষিত হয়, তাতো কেবল উপস্থাপন এবং বিশ্লেষণের জন্যে। ফকীহগণ শরীয়ার বিধানসমূহকে যখন ইবাদত এবং মুয়ামিলাত [পারস্পারিক বিষয়াদি] বলে ভাগ করেন, তখন এতদোভয়ের মধ্যে তারা মূলত কোনো পার্থক্য করেননা। কেননা একজন মুসলিমের যেমন তার বিশ্বাসগত [ঈমানি] বিষয়সমূহের মধ্যে কোনোটিকে স্বীকার এবং কোনোটিকে অস্বীকার করার সুযোগ নেই, ঠিক তেমনি বৈষয়িক বিষয়াদির ক্ষেত্রেও ইসলাম যেসব আইন বিধান ও সীমারেখা নির্ধারণ করে দিয়েছে তার কোনোটি মানার আর কোনোটি না মানার অধিকার কোনো মুসলিমের নেই। এ ব্যাপারে আল কুরআনের অকাট্য ফায়সালা হলো:
وما كَانَ لِمُؤْمِنٍ وَلَا مُؤْمِنَةٍ إِذَا قَضَى اللَّهُ وَرَسُولُهُ أَمْرًا أَنْ يَكُونَ لَهُمُ الْخِيَرَةُ مِنْ أَمْرِهِمْ وَمَنْ يَعْصِ اللَّهَ وَرَسُولَهُ فَقَدْ ضَلَّ ضللاً مُّبِينًا . (الاحزاب : ٣٦)
কোনো মুমিন পুরুষ বা নারীর এ অধিকার নেই যে, আল্লাহ এবং তাঁর রসূল যখন কোনো বিষয়ে ফায়সালা প্রদান করবেন, তখন সে তার সে-বিষয়ে নিজেই কোনো ফায়সালা করার স্বাধীনতা রাখবে। আর যে ব্যক্তি আল্লাহ ও তাঁর রসূলের ফায়সালা অমান্য করবে, সে সুস্পষ্ট ভ্রান্তিতে নিমজ্জিত হবে। [আল আহযাব: ৩৬]
এভাবে ইসলাম বিশ্বাস ও পারস্পারিক বিষয়াদির মধ্যে এক সুদৃঢ় সম্পর্ক স্থাপণ করে দিয়েছে। কোনো অবস্থাতেই এ সম্পর্ক ছিন্ন করা যেতে পারেনা। এ কারণেই রসূলে করীম সাল্লাল্লাহু 'আলাইহিওয়া সাল্লামের উপর যেভাবে জনগণকে প্রশিক্ষিত ও পরিশুদ্ধ করবার দায়িত্ব অর্পিত হয়েছিল, ঠিক তেমনিভাবে অর্পিত হয়েছিল জনগণের পারস্পারিক সম্পর্ক পরিচ্ছন্ন করার এবং তাদের বিবাদ বিসম্বাদ মীমাংসা করার দাযিত্ব, যাতে করে কোনো শক্তিমান দুর্বলের উপর অবিচার করে তাকে তার অধিকার থেকে বঞ্চিত করতে না পারে। এটা এ জন্যে অপরিহার্য, যেহেতু মানুষের নফসের মধ্যে লোভ লালসা এবং অন্যদের উপর বিজয়ী হওয়া ও চেপে বসার আবেগ আকাংখা বর্তমান রয়েছে। তাই একজনের দুস্কৃতি থেকে আরেকজনকে রক্ষা করার জন্যে বিচার ব্যবস্থা অপরিহার্য প্রয়োজন।
তাওহীদকে প্রতিষ্ঠিত এবং শিরককে খন্ডন করার পর কুরআন মজীদ যে বিষয়ের প্রতি সর্বাধিক গুরুত্বারোপ করেছে, তাহলো মানুষের মধ্যে সুবিচার প্রতিষ্ঠা করা। অত্যাচারী এবং শোষকদের শাস্তি দিয়ে মানুষের অধিকারকে সংরক্ষণ করা এবং তাদেরকে সত্য ও সুবিচারপূর্ণ ক্ষমতার কাছে অবনত করা। আল্লাহ নির্দেশ দিচ্ছেনঃ
واذا حَكَمْتُمْ بَيْنَ النَّاسِ أَنْ تَحْكُمُوا بِالْعَدْلِ . (النساء : ٥٨)
আর তোমরা যখন মানুষের মাঝে বিচার ফায়সালা করবে, তখন অবশ্যি সুবিচার করবে। [ আননিসা: ৫৮]
আল্লাহ তা'আলা পূর্ববর্তী নবীগণকে পৃথিবীতে এজন্যে তাঁর খলীফা বানিয়ে পাঠিয়েছেন যেনো তারা তাঁর শরীয়া প্রতিষ্ঠিত ও কার্যকর করে:
وَإِذْ قَالَ رَبُّكَ لِلْمَلئِكَةِ إِنِّي جَاعِلٌ فِي الْأَرْضِ خَلِيفَةً (البقرة : ٣٠)
আর সেই সময়ের কথাও চিন্তা করে দেখো, যখন তোমার রব ফেরেশতাদের বলেছিলেন, আমি পৃথিবীতে আমার প্রতিনিধি নিযুক্ত করতে চাই। [আল বাকারাঃ ৩০]
📄 বিচার ফায়সালার ক্ষেত্রে মৌলিক শর্তাবলী
বিচার ফায়সালার ক্ষেত্রে কাযি বা বিচারকের দায়িত্ব কেবল এতোটুকুই নয় যে, তিনি শুধু শরীয়তের হুকুম-বিধান বলে দেবেন এবং সেটাকে তার দাবি অনুযায়ী কার্যকর করবেন। বরঞ্চ তাঁর দায়িত্ব এর চাইতে আরো অনেক উচ্চতর ও ব্যাপকতর। তাঁর গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হলো, যেসব সমস্যা তাঁর কাছে উপস্থাপিত হবে, সেগুলোর মধ্যে যেগুলোর সমাধান কুরআন সুন্নাহর অকাট্য বক্তব্য দ্বারা প্রমাণিত হবেনা সেগুলোর ক্ষেত্রে তিনি কুরআন সুন্নাহর মূলনীতির আলোকে প্রাসংগিক বিধান উদ্ভাবন করবেন। অর্থাৎ ইজতিহাদ করবেন। এই উদ্ভাবনের কাজটি তাকে করতে হবে দীনের সুস্পষ্ট বুঝ, পরিপূর্ণ আদর্শিক মানসিকতা এবং বিবেক বুদ্ধিকে কাজে লাগিয়ে। আর এই জিনিসটি তার প্রতি আল্লাহর বিশেষ দান। একজন বিচারকের মধ্যে আল কিতাব, সুন্নতে রসূল, ইজমায়ে উম্মত এবং ফিকহি মতভেদ সম্পর্কে যে সুস্পষ্ট জ্ঞান থাকতে হয়, ঐ দানটি হবে তার এর চাইতে অতিরিক্ত বৈশিষ্ট্য। একথার দলিল হলো, কুরআনে উল্লেখিত দুজন সন্মানিত নবী দাউদ ও সুলাইমান আলাইহিস সালামের ঘটনা। আল্লাহ জ্ঞানের ক্ষেত্রে দুজনকেই সমমর্যাদা দান করেছিলেন। কিন্তু বুঝের ক্ষেত্রে সুলাইমান আলাইহিস সালামকে দান করেছিলেন বিশেষত্বঃ
و داودَ وَسُلَيْمَانَ إِذْ يَحْكُمَانِ فِي الْحَرْثِ إِذَ نَقَشَتْ فِيْهِ غَنَمُ الْقَوْمِ وكُنَّا لِحُكْمِهِمْ شَاهِدِيْنَ . فَفَهُمُنهَا سُلَيْمَانَ وَكُلا آتَيْنَا حُكْمًا وعلما ، (الانبياء : ۷۸-۷۹)
আর দাউদ এবং সুলাইমানের কথা স্মরণ করে দেখো, যখন তারা দুজনই একটি খামারের মকদ্দমায় রায় দান করছিল। খামারটিতে রাত্রি বেলা অন্য লোকদের ছাগল এসে ছড়িয়ে পড়েছিল।' আমরা তাদের বিচারকে পর্যবেক্ষণ করছিলাম। এ সময় আমরা সুলাইমানের মধ্যে সঠিক রায় প্রদানের বুঝ সৃষ্টি করে দিলাম। অথচ উভয়কেই আমরা হিকমাহ এবং জ্ঞান দান করেছি।
[ আল আম্বিয়া: ৭৮-৭৯]
বুঝের কারণেই একব্যক্তি ইউসুফ আলাইহিস সালামের জামা পেছনের দিকে ছেঁড়া দেখে তাৎক্ষণিকভাবে সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম হয় যে ইউসুফ সত্যবাদী এবং অপবাদ থেকে সম্পর্কহীন:
قالَ هِيَ رَوَادَتْنِي عَنْ نَفْسِي وَشَهِدَ شَاهِدٌ مِّنْ أَهْلِهَا جِ إِنْ كَانَ قَمِيصُهُ قُدَّ مِنْ قُبُلٍ فَصَدَقَتْ وَهُوَ مِنَ الكَاذِبِينَ . وَإِنْ كَانَ قَمِيصَهُ قُدَّ مِنْ دُبُرٍ فَكَذَبَتْ وَهُوَ مِنَ الصَّادِقِينَ . فَلَمَّا رَا قَمِيصَهُ قُدَّ مِنْ دَيْرِ قَالَ إِنَّهُ مِنْ كَيْدِ كُنْ إِنْ كَيْدَ كُنْ عَظِيمٌ .
(يوسف : ٢٦-٢٨)
ইউসুফ বললোঃ 'সে-ই আমাকে ফাঁসাতে চেয়েছিল'। মহিলাটির নিজ পরিবারেরই একজন মীমাংসাকারী রায় দিলো: ইউসুফের জামা যদি সামনের দিকে ছেঁড়া হয়ে থাকে, তবে সে সত্যবাদিনী এবং ইউসুফ মিথ্যাবাদী। আর যদি জামা পেছনের দিক থেকে ছেঁড়া হয়ে থাকে, তবে সে মিথ্যাবাদিনী এবং ইউসুফ সত্যবাদী। মহিলাটির স্বামী যখন দেখলো ইউসুফের জামা পেছন দিক থেকে ছেড়া, তখন সে বললো: এটাতো তোমাদেরই মেয়েলোকদের ষড়যন্ত্র। আর তোমাদের ষড়যন্ত্র বড়ই সাংঘাতিক ধরনের হয়ে থাকে। [ ইউসুফ: ২৬-২৮]
আমীরুল মুমিনীন উমর (রা) তাঁর বিখ্যাত একটি চিঠিতে এ বিষয়টির প্রতিই আবু মূসা আশয়ারীর (রা) দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন। তাতে তিনি লিখেছিলেনঃ তোমার সম্মুখে যখনই এমন কোনো মকদ্দমা আসবে, যার ফায়সালা কুরআন ও সুন্নায় উল্লেখ নেই, সে বিষয়ে তুমি অবশ্যি গভীরভাবে চিন্তা গবেষণা করবে এবং সঠিক বুঝ-এ উপনীত হবে।
হাফিয ইবনে কাইয়্যেম বলেছেন: 'বান্দাহর প্রতি আল্লাহর যতো অনুগ্রহ ও দান আছে তম্মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ দান হলো, যথার্থ বুঝ এবং মহোত্তম জীবনোদ্দেশ্য। ইসলাম গ্রহণের পর এ দুটির চাইতে বড় কোনো দান কোনো মানুষ লাভ করতে পারেনা। এদুটি হলো ইসলামের সুদৃঢ় স্তম্ভ। এ স্তম্ভদ্বয়ের উপরই ইসলাম দাঁড়িয়ে আছে।'
সহীহ হাদীস থেকে জানা যায়, নবী করীম (স) বলেছেন:
مَنْ يُرِدِ اللهُ بِهِ خَيْرًا يُفَقِّهْهُ فِي الدِّينِ
আল্লাহ যার কল্যাণ চান, তাকে দীনের সঠিক বুঝ দান করেন। তিনি আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাসের (রা) জন্যে দোয়া করেছিলেন এভাবে
اللَّهُمَّ فَقِهْهُ فِي الدِّينِ وَعَلِّمْهُ التأويل . (صحيح البخاري)
হে আল্লাহ তুমি একে দীনের সঠিক বুঝ দান করো এবং কুরআনের ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ শিখাও।
মুসনাদে আহমদে বর্ণিত হয়েছে তিনি আবদুল্লাহ্ (রা) জ্ঞান ও সঠিক বুঝ বৃদ্ধির জন্যে ও দোয়া করেছিলেন।
উমর বিন খাত্তাবকে (রা) আল্লাহ তা'আলা সঠিক বুঝ ও অন্তর্দৃষ্টি দান করেছিলেন। তিনি আল্লাহ প্রদত্ত মেধা, বুঝ ও অন্তর্দৃষ্টির সাহায্যে সেসব বিষয়ে ইজতিহাদ করতেন, যেসব বিষয়ে কুরআন ও সুন্নতে রসূলে কোনো নির্দেশনা নেই। প্রায় সর্বক্ষেত্রেই তাঁর ইজতিহাদ সঠিক হতো। কদাচিৎই তাঁর ইজতিহাদ ভুল প্রমানিত হতো। এমনকি রসূলুল্লাহ (স) তাঁর সম্পর্কে মন্তব্য করেছিলেন:
إِنَّ اللَّهَ جَعَلَ الْحَقِّ عَلَى لِسَانِ عُمَرَ . (سنن ترمذی)
আল্লাহ তা'আলা উমরের যবানে সত্যকে বদ্ধমূল করে দিয়েছেন।
তাঁর পুত্র আবদুল্লাহ ইবনে উমর (র) বলেছেন:
আমি উমরের মুখ থেকে এমন একটি কথাও শুনিনি যে বিষয়ে তিনি বলেছেন: 'আমার মনে হয় বিষয়টি এরূপ', অতপর বিষয়টি সেরূপ প্রমাণিত হয়নি।'
সাহাবায়ে কিরামের মধ্যে আমীরুল মুমিনীন আলী (রা)ও বুঝ ও অন্তর্দৃষ্টি লাভের দিক থেকে অগ্রগণ্য ছিলেন। বিচার ফায়সালার ক্ষেত্রে তাঁর মেধা ও অন্তর্দৃষ্টি কতো প্রখর ছিলো একটি ঘটনা থেকেই তা সহজে বুঝা যাবে। যায়েদ ইবনে আরকাম (রা) বলেনঃ
একবার আমি নবী করীমের (স) কাছে বসাছিলাম। এসময় ইয়েমেন থেকে এক ব্যক্তি এসে বললেন: ইয়েমেনের অধিবাসী তিনজন লোক আলী ইবনে আবী তালিবের কাছে তাদের মধ্যকার একটি বিবাদের মকদ্দমা দায়ের করেছে। তাদের আরজি হলো: তারা তিনজনে একই তুহুরে এক মহিলার সাথে ব্যভিচারে লিপ্ত হয়। এতে মহিলা গর্ভবতী হয় এবং একটি ছেলে সন্তান প্রসব করে। এখন ছেলেটি কে পাবে? আলী রায় দিয়ে দু'জনকে সম্বোধন করে বললেন: ছেলেটি এই তৃতীয় ব্যক্তির। এতে সেই দু'জন রাগান্বিত হলো। অতপর তিনি অপর দু'জনকে সম্বোধন করে বললেন, ছেলেটি, এই (তৃতীয়) ব্যক্তির। এতে সেই দু'জনও উত্তেজিত হলো। ফলে তিনি অপর দু'জনকে উদ্দেশ্য করে বললেন, ছেলেটি এই-তৃতীয় ব্যক্তির। এতে সেই দুইজনও ক্রোধান্বিত হলো।
এবার আলী বললেন: তোমরা ঝগড়াটে অংশীদার। আমি. কোরা (লটারি) ফেলবো। যার নাম উঠবে সেই ছেলেটিকে পাবে। তবে সে অপর দুইজনকে দুই তৃতীয়াংশ দিয়্যত সমান মূল্য পরিশোধ করবে। অতপর তিনি তাদের তিনজনের নামে কোরা ফেলেন এবং যার নাম উঠে তাকে ছেলেটি দিয়ে দেন।
ঘটনাটি শুনে নবী করীম (স) হেসে দিলেন। হাঁসিতে তাঁর সম্মুখের দাঁতগুলো স্পষ্ট দেখা গিয়েছিল।
হাদীসটি আবু দাউদ তাঁর সুনানের 'তালাক' অধ্যায়ে এবং ইবনে মাজাহ তাঁর সুনানের 'কোরা' ফেলে ফায়সালা করা' অধ্যায়ে বর্ণনা করেছেন। কেউ কেউ হাদীসটিকে মুরসাল হবার কারণে জয়ীফ বলেছেন। অবশ্য ইবনে হাযম এটিকে বিশুদ্ধ বলেছেন।
সহীহ বুখারি ও মুসলিম বর্ণিত একটি হাদীস থেকে বিচার ফায়সালার ক্ষেত্রে সুলাইমান আলাইহিস সালামের সঠিক বুঝ ও অন্তর্দৃষ্টির প্রমান পাওয়া যায়। হাদীসটি বর্ণনা করেছেন আবু হুরাইরা (রা)। তিনি বলেন, রসূলে করীম (সা) বলেছেনঃ
كَانَتْ امْرَأَتَانِ مَعَهُمَا ابْنَاهُمَا جَاءَ الذِّئْبُ فَذَهَبَ بِابْنِ إِحْدَاهُمَا . فَقَالَتْ لصَاحِبَتِهَا إِنَّمَا ذَهَبَ بِابْنِكَ . وَقَالَتِ الْأُخْرَى إِنَّمَا ذَهَبَ بابنك . فَتَحَاكُمَا الى داودَ عَلَيْهِ السَّلامَ فَقَضى به للكبرى . فَخَرَجَنَا عَلَى سُلَيْمَانَ بْنِ دَاوُدَ فَقَالَ إِبْتُونِي بِالسكين اشقه بَيْنَهُمَا ، فَقَالَت الصغرى لا تَفْعَلْ يَرْحَمْكَ اللَّهُ هُوَ ابْنُهَا فقضى به للصغرى . (بخاری مسلم)
দুজন মহিলার দুটি শিশু ছেলে ছিলো। একবার বাঘ এসে একটি মহিলার ছেলেকে নিয়ে যায়। সে অপর মহিলাটিকে বললো, বাঘ তো তোমার ছেলেকে নিয়ে গেছে! সে বললো: তোমার ছেলেকে নিয়ে গেছে! এ বিষয়ে দুজনের মধ্যে বিবাদ হলো। তারা দাউদ আলাইহিস সালামের কাছে বিচার প্রার্থী হলো। তিনি তাঁর রায়ে বড়জনকে ছেলেটি দিয়ে দিলেন। অতপর তারা তাঁর দরবার থেকে বেরিয়ে সুলাইমান আলাইহিস সালামের দরবারে গেলো। তাঁকে তারা সব ঘটনা বললো। তিনি বললেন, আমার জন্যে একটি ছুরি আনো। আমি ছেলেটিকে দ্বিখন্ডিত করে দুইজনকে দুইভাগ দেবো। এতে ছোট মহিলাটি চিৎকার করে উঠলোঃ এমনটি করবেননা, আল্লাহ আপনার প্রতি রহম করুন। ছেলেটি ওর (ওকেই দিন)।' অতপর সুলাইমান ছোটজনকে ছেলেটি দিয়ে দিলেন।
এখন কেউ যদি আপত্তি তোলেন, সুলাইমান আলাইহিস সালামের পক্ষে তাঁর পিতার রায়ের বিপরীত রায় দেয়া বৈধ হয়েছি কি? তাহলে এর জবাবে বলবো, সুলাইমান আলাইহিস সালাম মূলত একটি বিচক্ষণ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে প্রকৃত সত্য উদঘাটন করেন। তিনি ছুরি আনতে বলে আসলেই ছেলেটিকে দ্বিখন্ডিত করতে চাননি। বরঞ্চ প্রকৃত সত্য উদঘাটন করার চেষ্টা করেছেন মাত্র। তাঁর কথা শুনে ছোট মহিলাটির হৃদয় ব্যাকুল হয়ে উঠে। বাস্তবিকপক্ষে সন্তানের অকল্যাণ দেখলে কেবল মায়ের হৃদয়ই এভাবে কেঁদে উঠতে পারে। মহিলাটি ছেলের জীবন রক্ষার জন্যেই বলে উঠলো, ছেলেটি বড়জনের ওকেই দিয়ে দিন। বাস্ এক্ষণে সুলাইমান আলাইহিস সালামের উদ্দেশ্য সফল হয়ে গেলো। তিনি ছেলেটির সত্যিকার মাকে চিনে ফেললেন। মূলত বাস্তব সত্যে উপনীত হবার জন্যে এটা ছিলো তাঁর আল্লাহ প্রদত্ত বুঝ ও অন্তরদৃষ্টি। হাফিয ইবনে হাজর আসকালানি তাঁর বুখারির ব্যাখ্যা গ্রন্থ 'ফাতহুল বারিতে' এটিকে সহীহ হাদীস বলেছেন।
এই ঘটনাটি থেকে একথা পরিষ্কার হলো যে, কোনো মকদ্দমায় কেবল একটি পক্ষই সত্যের উপর থাকে। বিচারক যদি সঠিক বুঝ, বিচক্ষণতা এবং দূরদৃষ্টি ও অন্তর্দৃষ্টির অধিকারী না হন, তবে প্রকৃত সত্যে উপনীত হওয়া এবং সুবিচার করা তার পক্ষে বড় কঠিন। কারণ অনেক সময় উভয় পক্ষই নিজ নিজ বক্তব্যের সপক্ষে এমনভাবে দলিল প্রমাণ উপস্থাপন করে, যার ফলে সত্য মিথ্যা নির্ণয় করা কঠিন হয়ে পড়ে। সহীহ বুখারি ও মুসলিমে উম্মুল মুমিনীন উম্মে সালামার (রা) বর্ণিত একটি হাদীসে রসূলে করীমের (স) এই বাণীটি উল্লেখ হয়েছে:
إِنَّمَا أَنَا بَشَرٌ مِثْلُكُمْ وَأَنَّكُمْ تَخْتَصِمُونَ إِلَى وَلَعَلَّ بَعْضُكُمْ أَنَّ يَكُونَ الْحَنُ مِنْ بَعْضٍ فَمَنْ قَضَيْتُ لَهُ بِشَيْيْ مِنْ حَقِّ أَخِيهِ فَلَا يَأْخُذْ مِنْه شَيْئًا فَإِنَّمَا أَقْطَعُ لَه قِطْعَةً مِّنَ النَّارِ . . (بخاری مسلم)
আমি তোমাদেরই মতো একজন মানুষ। তোমরা আমার কাছে মকদ্দমা দায়ের করো। হতে পারে তোমাদের এক পক্ষ অপর পক্ষের তুলনায় অধিকতর বাকপটু। এমতাবস্থায় আমি যদি তার পক্ষে রায় দিয়ে দিই আর প্রকৃত সত্য পক্ষ তার ভাই-ই [অথাৎ অপর পক্ষ] হয়ে থাকে, তবে সেযেনো এ রায়ের বলে বিন্দুমাত্র কিছু গ্রহণ না করে। কারণ, এটা তার জন্যে অগ্নি শিখাতুল্য।
এ হাদীস থেকে প্রমাণ হলো, বিচারক তার ফায়সালা [Decree] দ্বারা হালালকে হারাম এবং হারামকে হালাল করতে পারেননা। কিন্তু তার ফায়সালা সর্বাবস্থায়ই কার্যকর করতে হবে। তা প্রকৃত সত্যের পক্ষে হোক কিংবা বিপক্ষে, তাতে কিছু যায় আসেনা। কারণ তিনি তো সাক্ষ্য প্রমাণের ভিত্তিতেই ফায়সালা দিয়ে থাকেন।
সুতরাং বিচারক যদি সঠিক বুঝ বিচক্ষণতা এবং অন্তর্দৃষ্টি ও দূরদৃষ্টির অধিকারী না হন, তবে তার পক্ষে প্রকৃত সত্যে উপনীত হওয়া সম্ভব নয়। তার দ্বারা জনগণের অধিকার পদদলিত হতেই থাকবে। আইন শৃংখলার অবনতি ঘটবে এবং জনগণের দুর্ভোগ বাড়তে থাকবে। এমন সব দেশ ও জাতিই এরূপ অবস্থার সম্মুখীন হয়, যেখানে এমন সব লোকদেরকে নিজেদের বিচারাসনে বসানো হয়, যারা দীন চরিত্র ও নৈতিকতা, বুঝ জ্ঞান ও বিচক্ষণতা এবং অর্ন্তদৃষ্টি ও দূরদৃষ্টির দিক থেকে সম্পূর্ণ অযোগ্য।
টিকাঃ
৪. ইলামুল মুকিযীন ১ম খন্ড, ৮৭ পৃষ্ঠা।