📄 বিচারকের পদ গ্রহণে আলিমগণের সতর্কতা
অতীতের আলিমগণ (রাহিমাহুমুল্লাহ) বিচারকের পদ গ্রহণ করতে চাইতেননা। এ पद গ্রহণ করতে তাঁরা অস্বীকার করতেন। কারণ এ এক দায়িত্বপূর্ণ पद। এ पद গ্রহণের ব্যাপারে হাদীসে সতর্ক করা হয়েছে। আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের দরবারে বিচারকদেরকে কঠিন জবাবদিহী করতে হবে। এ সংক্রান্ত কয়েকটি হাদীস এখানে উল্লেখ করা হলো,
১. আবু বুরাইদা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
القَضَاةُ ثَلاثَةٌ - وَاحِدُ فِي الْجَنَّةِ وَاثْنَانِ فِي النَّارِ ، وَأَمَّا الَّذِي في الْجَنَّةِ فَرَجُلٌ عَرَفَ الْحَقِّ فَقَضى به وَرَجُلٌ عَرَفَ الْحَقِّ فَجَارَ فِي الْحُكْمِ فَهُوَ فِي النَّارِ وَرَجُلٌ فَضَى لِلنَّاسِ عَلَى جَهْلٍ فَهُوَ فِي النَّارِ) (رواه ابوداؤد ، ترمذی، ابن ماجه)
বিচারক তিন প্রকার হয়ে থাকে। তন্মধ্যে একপ্রকারের বিচারকরা জান্নাতে যাবে আর দুই প্রকারের বিচারকরা যাবে জাহান্নামে। জান্নাতে যাবে ঐ বিচারক যে সত্যকে জেনে নিয়ে সে অনুযায়ী সুবিচার করবে। পক্ষান্তরে যে সত্যকে জেনেও অবিচার করবে, সে জাহান্নামে যাবে। আর যে ব্যক্তি অজ্ঞতা নিয়ে বিচার করবে সেও জাহান্নামে যাবে।'
২. আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
ليَأْتِيَنَّ عَلَى الْقَاضِي الْعَدْلِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ سَاعَةٌ يَتَمَنَّى أَنَّهُ لَمْ يَقْضِ بَيْنَ الاثْنَيْنِ فِي تَمَرَّةٍ قَطُّ . (مسند احمد ، ابن حبان)
কিয়ামতের দিন সুবিচারকের সম্মুখেও এমন একটি মুহূর্ত আসবে যখন সে মনে মনে বলবে হায়! একটি খেঁজুরের বিষয়েও যদি আমি দুই ব্যক্তির মাঝে ফায়সালা না দিতাম।'
৩. আবদুল্লাহ ইবনে উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, হামযা ইবনে আবদুল মুত্তালিব রাদিয়াল্লাহু আনহু রসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে এসে বললেন: হে আল্লাহর রসূল! আমাকে এমন কোনো জায়গায় নিয়োগ করুন, যাতে আমি কোনোভাবে দিনাতিবাহিত করে যেতে পারি।' রসূলূল্লাহ বললেন:
يَا حَمْزَةُ نَفْسٌ تُحْيِيهَا أَحَبُّ إِلَيْكَ أَمْ نَفْسٌ تَمِيتَهَا (ابوداؤد ، ترمذی، ابن ماجه)
হে হামযা! একজন ব্যক্তিকে জীবিত রাখা আপনি বেশি পছন্দ করেন, নাকি মেরে ফেলা? হামযা বললেন: 'জীবিত রাখা।' রসূলুল্লাহ বললেনঃ "তবে আপনি নিজেকে রক্ষা করুন' (অথাৎ কোনো পদে অধিষ্ঠিত হবার লোভ করবেননা)।
৪. আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ
مَنْ وَلِيَ الْقَضَاءَ أَرْجُعِلَ قَاضِبًا بَيْنَ النَّاسِ فَقَدَ ذَبَحَ بِغَيْرِ سِكِيْنَ
(ابوداؤد ، ترمذی، ابن ماجه ، حاکم)
যাকে বিচারকের পদে নিয়োগ করা হলো কিংবা লোকেরা যাকে বিচারক মানলো, তাকে ছুরি ছাড়াই হত্যা করা হলো।
ইমাম শা'বি বলেছেন:
বিচারকের পদ এক কঠিন পরিক্ষার পদ। এক কঠিন পরিশ্রমের পদ। যে এ পদ গ্রহণ করলো সে নিজেকে হত্যা করার জন্যে পেশ করলো। কারণ এ থেকে অব্যাহতি পাওয়া দুস্কর। সুতরাং একালে এপদ থেকে দুরে থাকা কর্তব্য। সওয়াবের আশা থাকলেও এ পদের প্রার্থী হওয়া বোকামি ছাড়া আর কিছু নয়।
আন নাবাহি বলেছেনঃ
অতীতে, বহু বড় বড় আলিমকে বিচারকের পদ গ্রহণের প্রস্তাব দেয়া হলে তাঁরা তা গ্রহণ করতে অস্বীকার করেন। এদের মধ্যে রয়েছেন: ইব্রাহীম ইবনে মুহাম্মদ ইবনে আবার, মুস'আব ইবনে ইমরান, আবান ইবনে ঈসা ইবনে দীনার, কাসিম ইবনে সাবিত ইবনে আবদুল আযীয আল ফেহরি, আবু ঈসা আহমদ ইবনে আবদুল মালিক আশবিলি এবং মুহাম্মদ ইবনে আবদুস সালাম আল খাশানি প্রমুখ।
আবু কিলাবাকে বিচারপতির পদ গ্রহণ করতে ডাকা হলে তিনি ইরাক থেকে পালিয়ে সিরিয়া চলে যান। সিরিয়া এসে শুনতে পান এখানকার বিচারপতির মৃত্যু হয়েছে। এখবর জানার সাথে সাথে তিনি সেখান থেকে অবিলম্বে ইয়ামামা চলে যান।
বর্ণিত আছে, সুফিয়ান সওরিকে বিচারপতির পদ গ্রহণ করতে বলা হলে তিনি বসরা অভিমুখে পলায়ন করেন এবং সেখানে আত্মগোপন করে থাকেন। এ অবস্থাতেই সেখানে তিনি মৃত্যু বরণ করেন।
ইমাম আবু হানীফা সম্পর্কে বর্ণিত হয়েছে যে, তাঁকে বেদম প্রহার করা হয়, কয়েদ করে রাখা হয় এবং তাঁর উপর নানা রকম নির্যাতন চালানো হয়, কিন্তু জীবন থাকতে তিনি (রাজতন্ত্রের অধীনে) বিচারপতির পদ গ্রহণ করতে রাজি হননি।
এছাড়াও আরো অসংখ্য উলামায়ে কিরাম বিচারকের পদ গ্রহণ করতে অস্বীকার করেন। সীরাত ও জীবনী গ্রন্থাবলীতে এরূপ বহু আলিমে দীনের জীবন চরিত আলোচিত হয়েছে। এদের মধ্যে ছিলেন অনেক বড় বড় আলিমে দীন, ফকীহ, মুহাদ্দিস এবং যাহিদ ও আবিদ। তাঁদেরকে নির্মমভাবে প্রহার করা হয়, গালাগাল করা হয়, কারাগারে নিক্ষেপ করা হয়। তাঁরা সবর অবলম্বন করেন। কিন্তু বিচারকের পদ গ্রহণ করতে রাজি হননি।
অপরদিকে বাস্তব ব্যাপার হলো, খিলাফতের পর অর্থাৎ খলীফার পদমর্যাদার পরই বিচারপতির পদমর্যাদা। নবীগণও নিজ নিজ সময়ের বিচারক ছিলেন।
বহু সহীহ হাদীসে সত্যাশ্রয়ী ন্যায়পরায়ণ সুবিচারকদের শ্রেষ্ঠ মর্যাদা ও পুরস্কারের কথা ঘোষণা করা হয়েছে, যেসব বিচারক সুবিচারের ক্ষেত্রে আল্লাহ ছাড়া আর কারো তিরস্কারের ভয় পায়না। এ প্রসংগে নিম্নে কয়েকটি হাদীস উল্লেখ করা গেলোঃ
১. আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ
لا حَسَدَ إِلا فِي اثْنَيْنِ رَجُلٌ آتَاهُ اللهُ مَالاً فَسَلْطَة عَلَى هَلَكَتِهِ فِي الْحَقِّ وَرَجُلٌ آتَاهُ اللهُ الحِكْمَةَ فَهُوَ يَقْضِ بِهَا وَيَعْمَلُ بِهَا (بخاری مسلم)
দুই ব্যক্তির ব্যাপারে ঈর্ষা করা বৈধ। একজন সেই ব্যক্তি যাকে আল্লাহ তা'আলা ধনমাল দিয়েছেন এবং তা হকপথে বিলিয়ে দেবারও তৌফিক দিয়েছেন। দ্বিতীয় হলো সেই ব্যক্তি যাকে আল্লাহ তা'আলা দীন সম্পর্কে জ্ঞান ও প্রজ্ঞা দান করেছেন এবং সে ব্যক্তি আল্লাহ প্রদত্ত এই জ্ঞান ও প্রজ্ঞার ভিত্তিতে বিচার ফায়সালা করে এবং আমল করে।
২. আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ
هَلْ تَدْرُونَ مَا السَّابِقُونَ إِلَى ظِلِّ اللَّهِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ ؟ قَالُوا اللَّهُ وَرَسُولُهُ أَعْلَمُ . قَالَ الَّذِينَ إِذَا عَلِمُوا الْحَقِّ قَبَلُوهُ وَإِذَا سُئِلُوا عَنَهُ بذلُّوهُ وَإِذَا حَكَمُوا الْمُسْلِمِينَ حَكَمُوا كَحُكْمِهِمْ لَا نُفُسِهِمْ (مسند احمد
তোমরা কি জানো কিয়ামতের দিন সবার আগে কারা আল্লাহর ছায়া তলে এসে পৌঁছাবে? সাহাবিরা বললেন, আল্লাহ এবং তাঁর রসূলই অধিক জানেন। তিনি বললেন, এরা তারা যারা সত্যকে উপলব্ধি করার সাথে সাথে গ্রহণ করে। সত্য সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হলে তা যথাযথভাবে প্রকাশ করে এবং মুসলমানদের ফায়সালা করতে বলা হলে ঠিক সেরকম বিচার করে যেমনটি করে তারা নিজের জন্যে।
৩. হারিস ইবনে উসামা তাঁর মুসনাদে আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহুর সূত্রে হাদীস বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ
لَعَدلُ الْعَامِلِ فِي رِعْيَّتِهِ يَوْمًا وَاحِداً أَفَضْلٌ مِّنْ عِبَادَةِ الْعَابِدِ فِي أَهْلِهِ مَائَةَ عَامٍ وَخَمْسِيْنَ عَامًا . (المطالب العالية )
কোনো কর্মকর্তার তার অধীনস্থ জনগণের মধ্যে একদিন সুবিচার করা আবিদ কর্তৃক নিজ ঘরে একশ বছর ইবাদত করার সমতুল্য। বর্ণনাকারী সন্দেহ করেছেন তিনি একশ বছর শুনেছেন নাকি পঞ্চাশ বছর।
৪. অপর একটি সহীহ হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ
سَبْعَةٌ يُظِلُّهُمُ اللَّهُ تَحْتَ ظِلَّ عَرْشِهِ يَوْمٌ لَا ظِلُّ إِلا ظِلُّهُ إِمَامٌ عَادِلٌ.....
যেদিন আল্লাহর ছায়া ছাড়া আর কারো ছায়া থাকবেনা সেদিন আল্লাহ সাত ব্যক্তিকে তাঁর ছায়াতলে স্থান দেবেন। তারা হলেন (এক) সুবিচারক ন্যায়পরায়ণ নেতা ......।
এখানে প্রথমেই সুবিচারক নেতা বা শাসকের কথা বলা হয়েছে।
এছাড়াও আরো কিছু হাদীস আছে যেগুলোতে বিচারকের पद গ্রহণ করতে এবং ন্যায় ও সুবিচার প্রতিষ্ঠা করতে উৎসাহ প্রদান করা হয়েছে।
উলামায়ে কিরাম উভয় প্রকার হাদীসের মাঝে সামঞ্জস্য বিধান করেছেন। তাঁরা বলেছেন যারা বিচারকের पद গ্রহণের জন্যে প্রার্থী হবে অথচ সুবিচার করতে তারা অক্ষম হাদীসে তাদের সতর্ক করা হয়েছে। পক্ষান্তরে যাদেরকে প্রার্থী হওয়া ছাড়াই এ পদে নিয়োগ করা হবে, তারা যদি আল্লাহর ভয় ও আল্লাহ্র পুরস্কারের আশা নিয়ে সুবিচারের দায়িত্ব পালন করে, হাদীসে তাদের উৎসাহিত করা হয়েছে।
টিকাঃ
১. আবু দাউদ, তিরমিযি, ইবনে মাজাহ।
২. মুসনাদে আহমদ ও ইবনে হিব্বান।
৩. আবু দাউদ, তিরমিযি, ইবনে মাজাহ, হাকিম
৪. তারিখু কাযাতুল উব্দুলুস পৃষ্ঠা ১০।
৫. তারিখু কাযাতুল উন্দুলুস পৃষ্ঠা ১২।
৬. আল মুতালিবুল আলিয়া, ২য় খন্ড, ২৩২ পৃষ্ঠা।
📄 ইসলামে মৌলিক অধিকার ও সামাজিক সুবিচার
মহান আল্লাহ বলেনঃ
'আমানত তার যথার্থ প্রাপকের কাছে পৌঁছে দিতে আল্লাহ তোমাদের নির্দেশ দিচ্ছেন। আর তোমরা যখন মানুষের মাঝে বিচারকার্য পরিচালনা করবে, তখন সুবিচার করবে।' [সূরা নিসাঃ ৫৮]
'কোনো সম্প্রদায়ের প্রতি বিদ্বেষ যেনো তোমাদেরকে কখনো সুবিচার বর্জনে প্ররোচিত না করে। তোমরা সুবিচার করো, এটা তাকওয়ার নিকটতর।' [সূরা মায়েদাঃ ৮]
এই দুটি আয়াত যদিও ব্যাপক অর্থে মুসলমানদেরকে ব্যক্তিগত ও সমষ্টিগতভাবে সুবিচার করার জন্য বাধ্য করে, কিন্তু ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার দাবি থেকে ইসলামী রাষ্ট্রও মুক্ত থাকতে পারেনা। ইসলামী রাষ্ট্রকেও অবশ্যি ন্যায়বিচার ও সুবিচারের অনুসারী হওয়া উচিৎ, বরং তাকেই সুবিচারের সর্বোত্তম অনুসারী হতে হবে। কারণ, মানুষের মধ্যেতো সর্বাধিক শক্তিশালী বিচারক সংস্থা হচ্ছে রাষ্ট্র। তাই তার আইনে বা ফায়সালায় যদি সুবিচার বিদ্যমান না থাকে, তবে সমাজের অন্য কোথাও সুবিচার পাওয়ার আশা করা যায়না।
এখন দেখা যাক, রাষ্ট্রের জন্যে মহানবী সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লামের ও খোলাফায়ে রাশেদীনের সুন্নাহ থেকে মানুষের মাঝে সুবিচার ও ন্যায় ইনসাফ প্রতিষ্ঠার কি পন্থা ও মূলনীতি পাওয়া যায়?
১. বিদায় হজ্জের সুপ্রসিদ্ধ ভাষণে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইসলামী রাষ্ট্রের যেসব মৌলিক নীতিমালা ঘোষণা করেছিলেন তার মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ মূলনীতি ছিলো এই যেঃ
'নিশ্চয়ই তোমাদের জীবন, তোমাদের ধনসম্পদ এবং তোমাদের মান ইজ্জত সেরূপ সম্মানিত, যেরূপ সম্মানিত তোমাদের আজকের এই হজ্জের দিনটি।'
এই ঘোষণায় ইসলামী রাষ্ট্রর সকল নাগরিকের জান মাল ও ইজ্জত আব্রুর নিরাপত্তা ও মর্যাদার মৌলিক অধিকার প্রদান করা হয়েছে। যে রাষ্ট্রই নিজেকে ইসলামী রাষ্ট্র বলে দাবি করবে তাকেই এসব দিকের প্রতি লক্ষ্য রাখতে হবে।
২. এ মর্যাদা কোন্ অবস্থায় এবং কিভাবে ক্ষুণ্ণ হতে পারে? তাও মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিন্মোক্ত বাক্য বলে দিয়েছেন।
' অতএব লোকেরা যখন একাজ [ তাওহীদের সাক্ষ্য, রিসালাতের সাক্ষ্য, নামায কায়েম, যাকাত প্রদান] করবে, তখন তারা আমার থেকে তাদের জীবন রক্ষা করে নিলো। কিন্তু ইসলামের কোনো অধিকারের ভিত্তিতে অপরাধী সাব্যস্ত হলে স্বতন্ত্র কথা এবং তাদের নিয়্যত তথা উদ্দেশ্যের হিসাব গ্রহণ আল্লাহর যিম্মায়।' [বুখারী ও মুসলিম]
'অতএব তাদের জানমাল [তাতে হস্তক্ষেপ] আমার জন্য হারাম। কিন্তু জান ও মালের কোনো অধিকার তাদের উপর বর্তাইলে স্বতন্ত্র কথা। তাদের গোপন বিষয়ের হিসেব আল্লাহ্র যিম্মায়।' [বুখারী ও মুসলিম]
'অতএব যে ব্যক্তি এর [ কলেমা তাওহীদের] প্রবক্তা হলো সে আমার থেকে তার মাল ও জান বাঁচিয়ে নিলো। তবে আল্লাহ্র কোনো অধিকার [ কোনো অপরাধের কারণে] তার উপর বর্তাইলে স্বতন্ত্র কথা। তার গোপন বিষয়ের হিসেবে আল্লাহ্র যিম্মায়।' [বুখারী]
৩. কোনো নাগরিকের উপর [অর্থাৎ তার বিরুদ্ধে] কিভাবে অধিকার প্রমাণিত হয়? মহনবী সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লাম তা নিম্নোক্ত বাক্যে বর্ণনা করেছেন:
'বাদী ও বিবাদী যখন তোমার সামনে উপস্থিত হবে তখন তুমি যেভাবে এক পক্ষের বক্তব্য শুনেছো সেভাবে অপর পক্ষের বক্তব্য শ্রবণ না করা পর্যন্ত তাদের মধ্যে ফায়সালা প্রদান করবেনা।' [আবু দাউদ, তিরমিযী, মুসনাদে আহমদ]
হযরত ওমর ফারুক [ রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু] একটি মোকদ্দমার ফায়সালা করতে গিয়ে বলেনঃ
'ইসলামে ন্যায়সংগত পন্থা ব্যতিত কোনো ব্যক্তিকে আটক করা যায়না।' [মুয়াত্তা ইমাম মালিক]
আলোচ্য মোকদ্দমার যে বিবরণ উক্ত মুয়াত্তা গ্রন্থে সন্নিবেশিত হয়েছে তা থেকে জানা যায় যে, ইরাকের নব বিজিত এলাকায় মিথ্যা অভিযোগে লোকদের আটক করা হতে থাকলে এবং তার বিরুদ্ধে হযরত ওমর রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুর দরবারে অভিযোগ উত্থাপিত হলে তিনি তদপ্রেক্ষিতে উপরোক্ত কথা বলেন। এ বর্ণনা থেকে প্রতিভাত হচ্ছে যে, এখানে 'ন্যায়সংগত পন্থা' অর্থ যথাযথ বিচার বিভাগীয় কার্যক্রম [ Due process of Law] অর্থাৎ কোনো ব্যক্তির অপরাধ প্রকাশ্য আদালতে প্রমাণ করতে হবে এবং অপরাধীকে নিজের নির্দোষিতার পক্ষে বক্তব্য রাখার পূর্ণ সুযোগ দিতে হবে। এছাড়া ইসলামে কোনো ব্যক্তিকে আটক করা যায়না।
৪. হযরত আলী রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুর খিলাফতকালে খারিজী সম্প্রদায়ের অভ্যুদয় হলে, যারা রাষ্ট্রের অস্তিত্ব স্বীকার করতেই প্রস্তুত ছিলোনা। তিনি তাদের লিখে পাঠনঃ
'তোমরা যথায় ইচ্ছা বসবাস করো। আমাদের ও তোমাদের মাঝে শর্ত এইযে, তোমরা খুনখারাবি করবেনা, রাহাজানি করবেনা এবং কারো উপর যুলুম করবেনা। তোমরা উপরোক্ত কোনো কাজে লিপ্ত হলে আমি তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবো।' [নায়লুল আওতার]
অর্থাৎ তোমরা যে মত ইচ্ছা পোষণ করতে পারো। তোমাদের মতামত ও উদ্দেশ্যের জন্যে তোমাদের আটক করা হবেনা। অবশ্য তোমরা যদি তোমাদের মতামতের প্রেক্ষিতে প্রশাসন যন্ত্র জোরপূর্বক দখল করার চেষ্টা করো তবে অবশ্যই তোমাদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেয়া হবে।
উপরোক্ত আলোচনার পর এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ থাকেনা যে, ন্যায় ইনসাফের ইসলামী নীতি কোনো অবস্থায়ই প্রশাসন বিভাগকে প্রচলিত বিচার বিভাগীয় কার্যক্রম ব্যতীত যথেচ্ছভাবে যাকে ইচ্ছা গ্রেপ্তার করার, যাকে ইচ্ছা কয়েদ করার, যাকে ইচ্ছা নির্বাসন দেয়ার, ইচ্ছামতো কারো বাকশক্তি রুদ্ধ করার এবং যাকে ইচ্ছা মতামত প্রকাশের মাধ্যম থেকে বঞ্চিত করার এখতিয়ার প্রদান করেনা। রাষ্ট্র সমুহ সাধারণভাবে এ ধরনের যেসব এখতিয়ার তার প্রশাসন বিভাগকে দান করে তা ইসলামী রাষ্ট্র কখনো দান করতে পারেনা।
উপরন্তু মানুষের মাঝে মীমাংসা প্রদানের ক্ষেত্রে ন্যায় ইনসাফের অনুসরণের আরেক অর্থ যা আমরা ইসলামের বিশ্বস্ত ও নির্ভরযোগ্য ঐতিহ্য থেকে জানতে পারি, তা এইযে, ইসলামে রাষ্ট্র প্রধান, গভর্ণর, পদস্থ কর্মকর্তা ও সর্বসাধারণ সকলের জন্য একই আইন এবং একই বিচার ব্যবস্থা। কারো জন্য কোনো আইনগত স্বাতন্ত্র্য নাই, কারো জন্য বিশেষ আদালত নাই এবং কেউই আইনের হস্তক্ষেপ থেকে ব্যতিক্রম নয়। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শেষ সময়ে নিজেকে এভাবে পেশ করেন, আমার বিরুদ্ধে কারো কোনো দাবি থাকলে সে যেনো তা আদায় করে নেয়। হযরত ওমর ফারুক রাদিয়াল্লাহু তায়লা আনহু জাবালা ইবনে আইহাম সাসানী নামক গভর্ণরের উপর এক বেদুইনের কিসাসের দাবি পূরণ করেন। হযরত আমর ইবনুল আস রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু গভর্ণরের জন্য আইনগত নিরাপত্তা প্রার্থনা করলে হযরত ওমর রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তাঁর প্রার্থনা প্রত্যাখ্যান করেন এবং জনসাধারণকে গভর্ণরদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ থাকলে তা প্রকাশ্য আদালতে উত্থাপনের অধিকার প্রদান করেন।
টিকাঃ
* এই অংশটি মাওলানা সাইয়েদ আবুল আ'লা মওদূদী (র)- এর বিখ্যাত তাফসীর 'তাফহীমুল কুরআন' থেকে নেয়া হয়েছে।
* উপরোক্ত হাদীসে যদিও মুসলমানদের অধিকারের কথা উল্লেখিত হয়েছে, কিন্তু ইসলামী শরীয়াতের একটি সর্বস্বীকৃত মূলনীতি এইযে, যে অমুসলিম ব্যক্তি ইসলামী রাষ্ট্রের সীমার মধ্যে অর্থাৎ ইসলামী রাষ্ট্রের নিরাপত্তাধীনে বসবাস গ্রহণ করে সে ইসলামের ফৌজদারী ও দেওয়ানী আইন অনুসারে মুসলমানদের অনুরূপ অধিকার লাভ করে।
📄 ইসলামে পারিবারিক সালিশী
মহান আল্লাহ বলেনঃ
'আর যদি কোথাও তোমাদের স্বামী- স্ত্রীর সম্পর্ক বিগড়ে যাবার আশংকা দেখা দেয়, তাহলে পুরুষের আত্মীয়দের মধ্য থেকে একজন সালিশ এবং স্ত্রীর আত্মীয়দের মধ্য থেকে একজন সালিশ নির্ধারিত করে দাও। তারা দু'জন সংশোধন করে নিতে চাইলে আল্লাহ তাদের মধ্যে মীমাংসা ও মিলমিশের পরিবেশ সৃষ্টি করে দেবেন। আল্লাহ সবকিছু জানেন, তিনি সর্বজ্ঞ।' [সূরা আন নিসাঃ ৩৫]
এ আয়াতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে, স্বামী- স্ত্রীর মধ্যে সম্পর্কের অবনতি দেখা দিলে বিরোধ থেকে সম্পর্ক ছিন্ন হবার পর্যায়ে পৌঁছাবার বা ব্যাপারটি আদালত পর্যন্ত গড়াবার আগে ঘরেই তার সংশোধন ও মীমাংসার চেষ্টা করা উচিত। এ জন্যে এ পদ্ধতি বাতলানো হয়েছে যে, স্বামী ও স্ত্রীর উভয়ের পরিবার থেকে একজন করে লোক নিয়ে দু'জনের একটি সালিশ কমিটি বানাতে হবে। তারা উভয়ে মিলে বিরোধের ব্যাপারে অনুসন্ধান চালাবেন। তারপর এক সাথে বসে এর সামাধান ও মীমাংসার পথ বের করবেন। এই সালিশ কে নিযুক্ত করবে? এ প্রশ্নটি আল্লাহ অস্পষ্ট রেখেছেন। এর কারণ হচ্ছে, স্বামী- স্ত্রী চাইলে নিজেদের আত্মীয়দের মধ্য থেকে নিজেরাই একজন করে লোক বাছাই করে আনতে পারে। তারাই তাদের বিরোধ নিস্পত্তি করবে। আবার উভয়ের পবিবারের বয়স্ক লোকেরা এগিয়ে এসে এ ধরণের সালিশ নিযুক্ত করতে পারে। আর ব্যাপারটি যদি আদালতে চলে যায়, তাহলে আদালত নিজেই কোনো সিদ্ধান্ত দেবার আগে পারিবারিক সালিশ নিযুক্ত করে এর মীমাংসা করে দিতে পারে।
সালিশদের ক্ষমতার ব্যাপারে মতবিরোধ আছে। ফকীহদের একটি দল বলেন, এই সালিশে চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের ও মীমাংসা চাপিয়ে দেবার ক্ষমতা নেই। তবে তাদের মতে ঝগড়া মিটমাট করার যে সংগত ও সম্ভাব্য পদ্ধতি হতে পারে সেজন্য তারা সুপারিশ করতে পারে। এই সুপারিশ মেনে নেয়া না নেয়ার ইখতিয়ার স্বামী-স্ত্রীর আছে। তবে স্বামী-স্ত্রী যদি তাদেরকে তালাক বা খুলা তালাক অথবা অন্য কোণ ব্যাপারে মীমাংসা করে দেবার জন্য দায়িত্বশীল হিসেবে নিযুক্ত করে থাকে তাহলে সে ক্ষেত্রে অবশ্যি তাদের ফায়সালা মেনে নেয়া স্বামী- স্ত্রীর জন্য ওয়াজিব হয়ে পড়বে। হানাফী ও শাফেয়ী আলেমগণ এই মত পোষণ করেন। অন্য কিছু লোকের মতে, উভয় সালিশের ইতিবাচক সিদ্ধান্ত দেবার এবং ঝগড়া মিটমাট করে আবার একসাথে মিলেমিশে চলার ফায়সালা করার ইখতিয়ার আছে। কিন্তু স্বামী-স্ত্রীকে আলাদা করে দেবার অধিকার তাদের নেই। হাসান বসরী, কাতাদাহ এবং অন্যান্য বেশ কিছু সংখ্যক ফকীহ এই মত পোষণ করেন। তৃতীয় একটি দলের মতে এই সালিশদ্বয় স্বামী-স্ত্রীকে মিলিয়ে দেবার বা আলাদা করার পূর্ণ ইখতিয়ার রাখে। ইবনে আব্বাস, সাঈদ ইবনে জুবইর, ইবরাহীম নাখঈ, শা'বী মুহাম্মদ ইবনে সীরীন এবং অন্যান্য ফকীহগণ এই মতের প্রবক্তা।
হযরত উসমান (রা) ও হযরত আলীর (রা) ফায়সালার যেসব নজীর আমাদের কাছে পৌঁছেছে, তা থেকে জানা যায়, তারা উভয়েই সালিশ নিযুক্ত করার সাথে সাথেই আদালতের পক্ষ থেকে তাদেরকে নিজেদের ফয়সালা কার্যকর করার প্রশাসনিক ক্ষমতা দান করতেন। তাই হযরত আকীল ইবনে আবু তালেব এবং তাঁর স্ত্রী হযরত ফাতেমা বিনতে উতবাহ ইবনে রাবীআর মামলা যখন হযরত উসমানের আদালতে দায়ের করা হলো, তখন তিনি স্বামীর পরিবার থেকে হযরত ইবনে আব্বাসকে এবং স্ত্রীর পরিবার থেকে হযরত মুআবীয়া ইবনে আবু সুফিয়ানকে সালিশ নিযুক্ত করলেন এবং তাদেরকে বললেন, আপনারা দু'জন যদি এই সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে, তাদের স্বামী- স্ত্রীকে বিচ্ছিন্ন করে দিতে হবে তাহলে তা করে দেবেন। অনুরূপভাবে একটি মামলায় হযরত আলী সালিশ নিযুক্ত করেন। তাদেরকে মিলিয়ে দেবার বা আলাদা করে দেবার ইখতিয়ার দান করেন। এ থেকে জানা যায়, সালিশের নিজস্ব কোন আদালতী ক্ষমতা বা ইখতিয়ার নেই। তবে তাদের নিযুক্তির সময় আদালত যদি তাদেরকে ক্ষমতা দিয়ে দেয়, তাহলে তাদের ফায়সালা আদালতের ফায়সালার ন্যায় প্রবর্তিত হবে।
টিকাঃ
* এ অংশটিও মাওলানা মওদূদী (র)-এর বিখ্যাত তাফসীর 'তাফহীমুল কুরআন' থেকে নেয়া হয়েছে।