📘 রাসুলের চোখে দুনিয়া > 📄 ইউনুস (আলাইহিস সালাম) ও দুনিয়া

📄 ইউনুস (আলাইহিস সালাম) ও দুনিয়া


ভালো কাজ বিপদের সময় মানুষকে সুরক্ষা দেয়
[২৯১] ইবনু আবী আরুবা (রহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, 'আল্লাহ তাআলা'র বক্তব্য-
فَلَوْلَا أَنَّهُ كَانَ مِنَ الْمُسَبِّحِينَ لَلَبِثَ فِي بَطْنِهِ إِلَى يَوْمِ يَبْعَثُوْنَ "সে যদি আল্লাহ তাআলা'র প্রশংসা বর্ণনা না করতো, তাহলে তাঁকে পুনরুত্থান দিবস পর্যন্ত তিমি'র পেটে থাকতে হতো।” (সূরা আস-সাফ্ফাত ৩৭:১৪৩-১৪৪)-এর ব্যাখ্যায় কাতাদা (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'বিপদাপন্ন হওয়ার আগে তিনি দীর্ঘ সালাত আদায় করতেন [যার বদৌলতে তাঁকে মাছের পেট থেকে মুক্তি দেওয়া হয়েছে]।' তারপর তিনি একটি আরবি প্রবাদ উল্লেখ করেন-
إِنَّ الْعَمَلَ الصَّالِحَ يَرْفَعُ صَاحِبَهُ إِذَا عَثَرَ وَإِذَا صَرَعَ وُجِدَ مُتَّكِنًا "ভালো কাজ বিপদের সময় মানুষকে সুরক্ষা দেয়; তবে বিপদ কেটে গেলে মানুষ আবার অলস হয়ে যায়।"'
তিমির প্রতি আল্লাহ তাআলার নির্দেশ
[২৯২] মানসূর (রহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'আল্লাহ তাআলা'র বক্তব্য-
“فَنَادَى فِي الظُّلُمَاتِ বিপুল অন্ধকারের মধ্যে সে [আল্লাহকে] ডাকলো..." (সূরা আল-আম্বিয়া ২১:৮৭)
এব ব্যাখ্যায় সালিম ইবনু আবিল জা'দ (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'আল্লাহ তিমি কে নির্দেশনা দিয়েছিলেন 'তুমি তাঁর হাড় ও মাংসের কোনো ক্ষতিসাধন করবে না।' কিছুক্ষণ পর সেই তিমি কে আরেকটি তিমি গিলে ফেলে। ইউনুস (আলাইহিস সালাম) বিপুল অন্ধকারের মধ্যে আল্লাহ-কে ডাকতে থাকেন; বিপুল অন্ধকার হলো- [প্রথম] তিমি'র অন্ধকার, [তাব উপর]। আরেক তিমি'র অন্ধকার, ও [সর্বোপরি] সাগরের অন্ধকার।'
হাজ্জের সময় তিনি যেসব বাক্য উচ্চারণ করেছেন
[২৯৩] মুজাহিদ (রহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'সত্তরজন নবি বাইতুল্লাহ'র হাজ্জ করেছেন। তাঁদের মধ্যে একজন হলেন মূসা ইবনু ইমরান (আলাইহিস সালাম); তাঁর গায়ে ছিল দুটি কাতাওয়ানি' বস্ত্র। আরেকজন হলেন ইউনুস (আলাইহিস সালাম); [হাজ্জের সময়] তিনি বলেছিলেন, لَبَّيْكَ كَاشِفَ الْكَرْبِ لَبَّيْكَ "আমি হাজির, হে দুর্দশা দূরকারী! আমি হাজির।” [তুলনীয়: হাদীস নং ৩১৩]
শাস্তি অবধারিত দেখে তাঁর জাতির লোকেরা যেভাবে দুআ করেছিল
[২৯৪] আবুল জাল্দ (রহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'ইউনুস (আলাইহিস সালাম)-এর জাতির মাথার উপর শাস্তি এসে ঘন অন্ধকার রাত্রির টুকরোর ন্যায় বৃত্তাকারে ঘুরতে থাকে। এ অবস্থা দেখে তাদের বুদ্ধিমান লোকজন তাদের মধ্যে অবশিষ্ট এক বয়োবৃদ্ধ জ্ঞানী লোকের নিকট গিয়ে বললো, 'আমাদের [মাথার] উপর কী এসেছে—তা তো দেখতে পাচ্ছেন। এখন আমাদের পাঠ করার জন্য একটি দুআ শিখিয়ে দিন; হতে পারে [এ দুআর বদৌলতে] আল্লাহ তাআলা আমাদের উপর থেকে তাঁর শাস্তি প্রত্যাহার করে নেবেনা।' জ্ঞানী লোকটি বললেন, তাহলে তোমরা বলো, يَا حَيُّ حِيْنَ لَا حَيَّ وَيَا حَيُّ مُحْيِيَ الْمَوْتَى وَيَا حَيُّ لَا إِلَهَ إِلَّا أَنْتَ "হে চিরঞ্জীব! যখন কেউ ছিল না এবং যখন কেউ থাকবে না তখনো তুমিই চিরঞ্জীব। হে চিরঞ্জীব! তুমিই মৃতদেহে প্রাণ-সঞ্চার করো! হে চিরঞ্জীব! তুমি
ছায়ের কোনো ইলাহ নেই।' পরিশেষে আল্লাহ তাআলা তাদেরকে শাস্তি থেকে এহাই জানা
তিমির পেটে
[২৯৫] শাবি (রহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'এক ব্যক্তি তাঁর নিকট এসে বললেন-ইউনুস (আলাইহিস সালাম) তিমি'র পেটে চল্লিশ দিন ছিলেন। এ কথার প্রেক্ষিতে শা'বি বলেন, 'তিনি তো ছিলেন একদিনের চেয়েও কম সময়। দুপুরের আগে তিমি তাঁকে গলাধঃকরণ করে, আর সূর্যাস্তের আগে হাই তুলে; এ সময় ইউনুস (আলাইহিস সালাম) সূর্যের আলো দেখতে পেয়ে বলে ওঠেন,
لَا إِلَهَ إِلَّا أَنْتَ سُبْحَانَكَ إِنِّي كُنْتُ مِنَ الظَّالِمِينَ "তুমি ছাড়া কোনো ইলাহ নেই; তুমি পবিত্র; আমি তো জুলুমকারীদের অন্যতম।” (সূরা আল-আম্বিয়া ২১:৮৭) এরপর তিমি তাঁকে [তীরে] নিক্ষেপ করে। ততোক্ষণে তাঁর দেহ পাখির ছানার ন্যায় হয়ে গিয়েছে।' এক ব্যক্তি বলে উঠলো, 'আপনি কি আল্লাহ তাআলা'র অপার ক্ষমতাকে অস্বীকার করছেন?' শা'বি (রহিমাহুল্লাহ) বললেন, 'আল্লাহ তাআলা'র অপার ক্ষমতাকে অস্বীকার করছি না; আল্লাহ তাআলা তিমি'র পেটে একটি বাজার বানাতে চাইলে তাও করতে পারতেন।
তিমির পেটে অবস্থানের সময়সীমা
[২৯৬] আবূ মালিক (রহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'ইউনুস (আলাইহিস সালাম) তিমি'র পেটে চল্লিশ দিন ছিলেন।'

📘 রাসুলের চোখে দুনিয়া > 📄 মূসা (আলাইহিস সালাম) ও দুনিয়া

📄 মূসা (আলাইহিস সালাম) ও দুনিয়া


কিছু উপদেশ
[২৯৭] ওয়াহাব ইবনু মুনাব্বিহ (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'পিদর (আলাইহিস সালাম) মুসা (আলাইহিস সালাম)-কে বলেছিলেন,
يَا مُوسَى بْنَ عِمْرَانَ إِنْزَعْ عَنِ النَّجَاجَةِ وَلَا تَمْشِ فِي غَيْرِ حَاجَةٍ وَلَا تَضْحَكْ مِنْ غَيْرِ عَجَبٍ وَأَلْزِمْ بَيْتَكَ وَابْكِ عَلَى خَطِيئَتِكَ "মূসা ইবনু ইমরান! জেদ থেকে বের হয়ে এসো; বিনা প্রয়োজনে হাঁটাহাঁটি কোরো না; আজব জিনিস ছাড়া অন্য কিছুতে হেসো না; গৃহে অবস্থান করো; আর নিজের ভুল-ভ্রান্তির জন্য কাঁদো।"'
পার্থিব চাকচিক্যের তাৎপর্য
[২৯৮] ইবনু আব্বাস (রদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'আল্লাহ তা'আলা মূসা ও হারুন (আলাইহিস সালাম)-কে ফিরআউনের নিকট প্রেরণ করার সময় বলেছিলেন,
لَا يَغُرَّكُمَا لِبَاسُهُ الَّذِي أَلْبَسْتُهُ فَإِنَّ نَاصِيَتَهُ بِيَدِي وَلَا يَنْطِقُ وَلَا يَعْرِفُ إِلَّا بِإِذْنِي وَلَا يَغُرَّكُمَا مَا مُتَّعَ بِهِ مِنْ زَهْرَةِ الدُّنْيَا وَزِينَةِ الْمُتْرَفَيْنَ وَلَوْ شِئْتُ أَنْ أُزَيْنَكُمَا مِنْ زِينَةِ الدُّنْيَا بِشَيْءٍ يَعْرِفُ فِرْعَوْنُ أَنَّ قُدْرَتَهُ تَعْجَزُ عَنْ ذَلِكَ لَفَعَلْتُ وَلَيْسَ ذَلِكَ لِهَوَانٍ بِكُمَا عَلَيَّ وَلَكِنْ أَلْبِسُكُمَا نَصِيبَكُمَا مِنَ الْكَرَامَةِ عَلَى أَنْ لَا تَنْقُصَكُمَا الدُّنْيَا شَيْئًا وَإِنِّي لَأَدُوْدُ أَوْلِيَائِي عَنِ الدُّنْيَا كَمَا يَدُودُ الرَّاعِي إِبْلَهُ عَنْ مَبَارِكِ الْعُرَّةِ وَإِنِّي لَأَجْنِبُهُمْ كَمَا يُجْنِبُ الرَّاعِي إِبِلَهُ عَنْ مَرَاتِعِ الْهَلَكَةِ
أُرِيدُ أَنْ أُنَوِّرَ بِذَلِكَ مَرَاتِبَهُمْ وَأُطَهِّرَ بِذلِكَ قُلُوبَهُمْ فِي سِيْمَاهُمُ الَّذِي يُعْرَفُوْنَ بِهِ وَأَمْرُهُمُ الَّذِي يَفْتَخِرُوْنَ بِهِ وَاعْلَمْ أَنَّ مَنْ أَخَافَ لِي وَلِيًّا فَقَدْ بَارَزَنِي بِالْعَدَاوَةِ وَأَنَا الثَّائِرُ لِأَوْلِيَائِي يَوْمَ الْقِيَامَةِ
"আমি তাকে যে পোশাক পরিয়ে রেখেছি-তা দেখে তোমরা যেন ধাঁধায় না পড়ো; কারণ তার কপাল আমার হাতে; আমার অনুমতি ছাড়া সে কোনো কথা বলতে পারে না, চোখের পাতাও ফেলতে পারে না। দুনিয়ার সৌন্দর্য ও বিলাসী লোকদের চাকচিক্যের যেসব উপকরণ তাকে দেওয়া হয়েছে-তা দেখে তোমরা যেন বিভ্রান্ত না হও। আমি চাইলে দুনিয়ার চাকচিক্য দিয়ে তোমাদের দুজনকে এমনভাবে সৌন্দর্যমণ্ডিত করতাম- যা দেখে ফিরআউন বুঝতো যে এমন চাকচিক্য লাভ করার সামর্থ্য তার নেই। তোমাদেরকে এসব চাকচিক্য না দেওয়ার অর্থ এ নয় যে তোমরা দুজন আমার নিকট তুচ্ছ; বরং আমি তোমাদেরকে প্রাপ্য সম্মান এমনভাবে দিয়েছি যাতে দুনিয়ার ভোগ-বিলাস তোমাদের [পরকালীন পাওনাকে] কমিয়ে দিতে না পারে। পশুর বিষ্ঠা ও আবর্জনায় ভরপুর জায়গায় কোনো উট বিশ্রাম নিতে চাইলে রাখাল যেভাবে তার উটকে তাড়িয়ে অন্যদিকে নিয়ে যায়, তেমনিভাবে আমি আমার বন্ধুদেরকে দুনিয়ার ভোগ-বিলাস থেকে তাড়িয়ে দিবো; রাখাল যেভাবে তার উটকে ধ্বংসাত্মক চারণভূমি থেকে দূরে রাখে, আমিও সেভাবে আমার বন্ধুদেরকে দুনিয়ার চাকচিক্য থেকে দূরে রাখবো। এর মাধ্যমে আমি তাঁদের অবস্থানকে উজ্জ্বল করতে চাই, তাঁদের অন্তঃকরণসমূহকে পবিত্র রাখতে চাই। এটি তাঁদের চিহ্ন- যা দিয়ে তাঁদেরকে শনাক্ত করা যাবে, আর এটিই তাঁদের জন্য গৌরবের ব্যাপার। জেনে রাখো, যে ব্যক্তি আমার বন্ধুকে ভীত-সন্ত্রস্ত করে সে যেন আমার সাথে প্রকাশ্য শত্রুতায় লিপ্ত হলো; কিয়ামতের দিন আমি আমার বন্ধুদের পক্ষ থেকে প্রতিশোধ নিবো।” [তুলনীয়: হাদীস নং ৫৭]
আল্লাহ তাআলার কতিপয় আদেশ
[২৯৯] ওয়াহাব ইবনু মুনাব্বিহ (রহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, 'মূসা (আলাইহিস সালাম) আল্লাহ তাআলা-কে জিজ্ঞাসা করলেন,
“يَا رَبِّ بِمَا تَأْمُرُنِي হে আমার রব! তুমি আমাকে কোন কাজের আদেশ
দিচ্ছো?” আল্লাহ বললেন, “بِأَنْ لَا تُشْرِكَ بِي شَيْئًا তুমি আমার [সার্বভৌম ক্ষমতার] সাথে অন্য কিছুকে অংশীদার সাব্যস্ত করবে না।”তিনি বললেন, “وَبِمَهُ আর কোন কাজের? আল্লাহ বললেন, “وَبِرُّ وَالِدَيْكَ আর তোমার মায়ের সাথে সদাচরণ করবে।” তিনি বললেন, “وَبِمَهُ আর কোন কাজের?” আল্লাহ বললেন, “وَبِرُّ وَالِدَيْكَ আর তোমার মায়ের সাথে সদাচরণ করবে।” তিনি বললেন, “وَبِمَهُ আর কোন্ কাজের?” আল্লাহ বললেন, “وَبِرُّ وَالِدَيْكَ আর তোমার মায়ের সাথে সদাচরণ করবে।” [ওয়াহাব ইবনু মুনাব্বিহ বলেন,] পিতার সাথে সদাচরণের ফলে আয়ু বৃদ্ধি পায়; আর মায়ের সাথে সদাচরণের ফলে জীবনে দৃঢ়তা আসে।'
আল্লাহ তাআলা অনাদি ও অনন্ত
[৩০০] ওয়াহাব ইবনু মুনাব্বিহ (রহيمাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'মূসা (আলাইহিস সালাম) [আল্লাহ তাআলা-কে] বললেন, “يَا رَبِّ إِنَّهُمْ يَسْأَلُوْنَنِي كَيْفَ كَانَ بَدْؤُكَ হে আমার রব! তারা জানতে চায়— তোমার সূচনা কেমন করে হলো?” আল্লাহ বললেন, فَأَخْبِرُهُمْ أَنِّي الْكَائِنُ قَبْلَ كُلِّ شَيْءٍ وَالْمُكَوِّنُ لِكُلِّ شَيْءٍ وَالْكَائِنُ بَعْدَ كُلَّ شَيْءٍ তাহলে তাদেরকে জানিয়ে দাও—সবকিছুর পূর্বে আমি ছিলাম, সবকিছুকে আমিই সৃষ্টি করেছি, আবার সবকিছুর পর আমিই থাকবো।"'
কয়েকটি আমলের ফলে এক ব্যক্তি আরশের পাশে স্থান পেয়েছেন
[৩০১] আমর ইবনু মাইমূন (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'মূসা (আলাইহিস সালাম) এক ব্যক্তিকে আরশের পাশে দেখতে পান। লোকটির অবস্থান দেখে ঈর্ষান্বিত হয়ে তিনি তাঁর সম্পর্কে জানতে চান। ফেরেশতারা বললেন, 'তাঁর আমল সম্পর্কে আমরা আপনাকে অবহিত করছি—মানুষকে আল্লাহ তাআলা যেসব অনুগ্রহ দিয়েছেন তা দেখে তাঁর মধ্যে ঈর্ষাবোধ জাগে না; তিনি মানুষের সম্মানহানি করে বেড়ান না এবং পিতা-মাতার অবাধ্য হন না।' মূসা (আলাইহিস সালাম) বললেন, “أي رَبِّ وَمَنْ يَعْقُ وَالِدَيْهِ হে আমার রব! পিতা-মাতার অবাধ্য হয় আবার কে?” আল্লাহ বললেন, “يَسْتَسِبُّ لَهُمَا حَتَّى يَسُبَّانِ ওই ব্যক্তি—যে তার পিতা-মাতার জন্য গালি কুড়িয়ে আনে, পরিশেষে পিতা-মাতা [তাকে] অভিশাপ দেয়।"'
যিকরের পদ্ধতি
[৩০২] আবুল জাল্ল্দ (রহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'আল্লাহ তাআলা মূসা (আলাইহিস সালাম)-এর প্রতি ওহি নাযিল করে বলেন,
إِذَا ذَكَرْتَنِي فَاذْكُرْنِي وَأَنْتَ تَنْتَفِضُ أَعْضَاؤُكَ وَكُنْ عِنْدَ ذِكْرِي خَاشِعًا مُطْمَئِنَّا فَإِذَا ذَكَرْتَنِي فَاجْعَلْ لِسَانَكَ مِنْ وَرَاءِ قَلْبِكَ وَإِذَا قُمْتَ بَيْنَ يَدَيَّ فَقُمْ مَقَامَ الْعَبْدِ الْحَقِيرِ الدَّلِيلِ وَذُمَّ نَفْسَكَ فَهِيَ أَوْلَى بِالذَّمِّ وَنَاجِنِي حِينَ تُنَاجِيْنِي بِقَلْبٍ وَجِلٍ وَلِسَانٍ صَادِقٍ
"আমাকে স্মরণ করার সময় তোমার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গসমূহকে জাগ্রত রেখে স্মরণ করবে; সুস্থির-চিত্ত ও বিনয়াবনত হয়ে আমাকে স্মরণ করবে; আমাকে স্মরণ করার সময় তোমার জিহ্বাকে অন্তঃকরণের পশ্চাতে রাখবে; [১] আমার সামনে দাঁড়ানোর সময় নগণ্য দাসের ন্যায় দাঁড়াবে; তোমার প্রবৃত্তিকে তিরস্কার করবে-প্রবৃত্তিই হলো তিরস্কারের যথার্থ পাত্র; আর আমার সাথে চুপিসারে কথা বলার সময় ত্রস্ত মন ও সত্য মুখ নিয়ে কথা বলবে।"
আল্লাহ তাআলার নিয়ামাতের শুকরিয়া আদায় করাও আরেক নিয়ামত
[৩০৩] আবুল জাল্ল্দ (রহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'মূসা (আলাইহিস সালাম) বললেন,
إِلهِي كَيْفَ أَشْكُرُكَ وَأَصْغَرُ نِعْمَةٍ وَضَعْتَهَا عِنْدِي مِنْ نِعَمِكَ لَا يُجَازِي بِهَا عَمَلِي كُلَّهُ
"ইলাহ আমার! আমি কীভাবে তোমার শুকরিয়া আদায় করবো? তোমার অনুগ্রহরাজির মধ্য থেকে সবচেয়ে ছোট যে অনুগ্রহ তুমি আমাকে দিয়েছো, আমার সকল আমল জড়ো করলেও তো তার সমান হবে!"
এর প্রেক্ষিতে আল্লাহ তাআলা তাঁর নিকট ওহি পাঠিয়ে বললেন, "يَا مُوسى اَلْآنَ شَكَرْتَنِي মূসা! এতোক্ষণে তুমি আমার [অনুগ্রহের] শুকরিয়া আদায় করেছো।"'
একটি দুআ
[৩০৪] কাব আহবার (রহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, 'মূসা (আলাইহিস সালাম) তাঁর দুআর মধ্যে বলতেন,
اللَّهُمَّ أَلَن قَلْبِي بِالتَّوْبَةِ وَلَا تَجْعَلْ قَلْبِي قَاسِيًا كَالْحَجَرِ "হে আল্লাহ! আমার অন্তরকে তাওবার মাধ্যমে কোমল করে দাও; আমার অন্তরকে পাষাণসম রুক্ষ করে দিও না।"'
তাওবা করলে আল্লাহ তাআলা ক্ষমা করে দেন
[৩০৫] ওয়াহাব ইবনু মুনাব্বিহ (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'আল্লাহ তাআলা মূসা (আলাইহিস সালাম)-কে বললেন,
مُرْ قَوْمَكَ أَنْ يُنِيبُوا إِلَيَّ وَيَدْعُوْنِي فِي الْعَشْرِ فَإِذَا كَانَ الْيَوْمُ الْعَاشِرُ فَلْيَخْرُجُوا إِلَيَّ أَغْفِرْ لَهُمْ "তোমার জাতিকে নির্দেশ দাও—তারা যেন আমার দিকে ফিরে আসে এবং [যিলহাজ্জ মাসের প্রথম] দশ দিন আমাকে ডাকে, আর দশম দিন তারা যেন [ঘর থেকে] বেরিয়ে আমার দিকে আসে, তাহলে আমি তাদেরকে ক্ষমা করে দিবো।"'
কল্যাণময় জ্ঞানের বদৌলতে আল্লাহ তাআলা কবরের নিঃসঙ্গতা দূর করে দেন
[৩০৬] কাব আহবার (রহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'আল্লাহ তাআলা মূসা (আলাইহিস সালাম)-এর প্রতি ওহি নাযিল করে বলেন,
عَلْمِ الْخَيْرَ وَتَعَلَّمُهُ فَإِنِّي مُنَوِّرُ لِمُعَلِّمِ الخَيْرِ وَمُتَعَلِّمِهِ فِي قُبُورِهِمْ حَتَّى لَا يَسْتَوْحِشُوا لِمَكَانِهِمْ "কল্যাণময় [জ্ঞান] শেখো ও [অপরকে] শেখাও; কল্যাণময় জ্ঞান যারা শেখে ও শেখায় তাদের কবরকে আমি আলোকিত করে দিবো, ফলে তারা সেখানে একাকিত্ব বোধ করবে না।"'
সর্বাবস্থায় আল্লাহকে স্মরণ করার নির্দেশ
[৩০৭] কাব আহবার (রহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'মূসা (আলাইহিস সালাম) [আল্লাহ তাআলা-কে] বললেন, يَا رَبِّ أَقَرِيبٌ أَنْتَ فَأُنَاجِيْكَ أَوْ بَعِيْدُ فَأُنَادِيْكَ "হে আমার রব! তুমি কি কাছে? তাহলে আমি তোমাকে চুপিসারে ডাকবো। নাকি দূরে? তাহলে তোমাকে উচ্চ আওয়াজে ডাকবো।"
আল্লাহ তাআলা বললেন, يَا مُوسَى أَنَا جَلِيْسُ مَنْ ذَكَرَنِي "হে মুসা! যে আমাকে স্মরণ করে, আমি তার পাশেই থাকি।" মূসা (আলাইহিস সালাম) বললেন, يَا رَبِّ فَإِنَّا نَكُوْنُ مِنَ الْحَالِ عَلَى حَالٍ نَجِلُّكَ وَنُعَظِمُكَ أَنْ نَذْكَرَكَ "হে আমার রব! আমরা তো একেক সময় একেক অবস্থায় থাকি; কিছু কিছু সময় তোমার শ্রেষ্ঠত্বের কথা বিবেচনা করে তোমাকে স্মরণ করতে ভয় পাই।"
আল্লাহ তাআলা জিজ্ঞাসা করলেন, "وَمَا هِي কোন অবস্থার কথা বলছো?
মূসা (আলাইহিস সালাম) বললেন, “الْجَنَابَةُ وَالْغَائِطُ গোসল ফরজ হওয়ার অবস্থা ও প্রকৃতির ডাকে সাড়া দেওয়ার সময়।"
আল্লাহ তাআলা বললেন, “يَا مُوسَى أَذْكُرْنِي عَلَى كُلِّ حَالٍ মুসা! সর্বাবস্থায় আমাকে স্মরণ করো।"'
দুনিয়াতে ইনসাফের ঘাটতি সবচেয়ে বেশি
[৩০৮] কাতাদা (রহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, 'আল্লাহ'র নবি মূসা (আলাইহিস সালাম) [আল্লাহ তাআলা-কে] জিজ্ঞাসা করলেন, أَيْ رَبِّ أَيُّ شَيْءٍ وَضَعْتَ فِي الْأَرْضِ أَقَلَّ "হে আমার রব! তুমি দুনিয়াতে কোন জিনিস সবচেয়ে কম প্রতিষ্ঠা করেছো?"
আল্লাহ তাআলা বলেন, “الْعَدْلُ أَقَلُّ مَا وَضَعْتُ فِي الْأَرْضِ আমি দুনিয়াতে সবচেয়ে কম প্রতিষ্ঠা করেছি যে জিনিস-তা হলো ইনসাফ।"
দুআ সফল করার কার্যকর উপায়
[৩০৯] ইয়াহইয়া ইবনু সুলাইম তাইফি (রহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, 'মুসা (আলাইহিস সালাম) একটি প্রয়োজন পূরণের জন্য তাঁর মহান রবের নিকট নিবেদন পেশ করেন। দীর্ঘ সময় অতিক্রান্ত হয়ে যাওয়ার পরেও তিনি তাঁর কাঙ্ক্ষিত বিষয় পাননি। অবশেষে মূসা (আলাইহিস সালাম) বললেন, "مَا شَاءَ اللهُ [মা শা আল্লাহ!] আল্লাহ যা চান (তা-ই হয়)!" আর অমনি তিনি দেখতে পান—কাঙ্ক্ষিত বস্তুটি তাঁর সামনে হাজির! মূসা (আলাইহিস সালাম) বলে ওঠেন,
يَا رَبِّ أَنَا أَطْلُبُ حَاجَتِي مُنْذُ كَذَا وَكَذَا وَأَعْطَيْتَنِيْهَا الْآنَ
"হে আমার রব! আমি অমুক দিন থেকে এটি চাচ্ছি, আর তুমি কিনা এটি আমাকে এতোক্ষণে দিলে!"
আল্লাহ তাআলা তাঁর নিকট ওহি প্রেরণ করে বলেন,
يَا مُوسَى أَمَا عَلِمْتَ أَنَّ قَوْلَكَ مَا شَاءَ اللَّهُ أَنْجَحُ مَا طَلَبْتَ بِهِ الْحَوَائِجَ
"মূসা! তুমি কি জানো না, প্রয়োজন পূরণের জন্য সফলতম দুআ হলো مَا شَاءَ اللهُ [মা শা আল্লাহ,] আল্লাহ যা চান (তা-ই হয়!)?"
মা শা আল্লাহ এর মাহাত্ম্য
[৩১০] ইয়াহইয়া ইবনু সুলাইম তাইফি (রহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, 'শয়তানরা যখন চুরি করে [আকাশের ফেরেশতাদের আলোচনা] শোনার চেষ্টা করে, [১০]তখন ফেরেশতারা যে বাক্য বলে তাদেরকে তাড়িয়ে দেয় তা হলো— "مَا شَاءَ اللهُ [মাশা আল্লাহ!] আল্লাহ যা চান (তা-ই হয়)!"
কিছু উপদেশ
[৩১১] কাব ইবনু আলকামা (রহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'আল্লাহ'র নবি মূসা (আলাইহিস সালাম) ফিরআউনের কবল থেকে পালিয়ে গিয়ে বললেন, “يَا رَبِّ أَوْصِنِي হে আমার রব! আমাকে কিছু উপদেশ দাও।” আল্লাহ বললেন,
أُوْصِيْكَ أَنْ لَا تَعْدِلَ بِي شَيْئًا أَبَدًا إِلَّا اخْتَرْتُنِي عَلَيْهِ فَإِنِّي لَا أَرْحَمُ وَلَا أُزَكِّي مَنْ
[১০] দ্রষ্টব্য: সূরা আস-সাফফাত ৩৭:৬-১০। [অনুবাদক]
لَمْ يَكُنْ كَذٰلِكَ
"আমি তোমাকে উপদেশ দিচ্ছি—কোনো কিছুকে কখনো আমার সমকক্ষ বানাবে না: এটি যে মেনে চলবে না, আমি তার প্রতি কোনো দয়া দেখাবো না, তাকে পরিচ্ছন্নও করবো না।"
মূসা (আলাইহিস সালাম) বললেন, "وَبِمَا يَا رَبِّ হে আমার রব! আর কী?"
আল্লাহ বলেন, “بِأُمِّكَ فَإِنَّهَا حَمَلَتْكَ وَهُنًا عَلَىٰ وَهُنٍ তোমার মায়ের সাথে সদাচরণ করবে; কারণ সে বহু কষ্ট করে তোমাকে [গর্ভে] বহন করেছে।"
মূসা (আলাইহিস সালাম) বললেন, “ثُمَّ بِمَاذَا يَا رَبِّ হে আমার রব! তারপর কী?"
আল্লাহ বলেন, “ثُمَّ بِأَبِيكَ তারপর তোমার পিতার সাথে ভালো ব্যবহার করবে।"
মূসা (আলাইহিস সালাম) বললেন, "ثُمَّ بِمَاذَا তারপর কী?"
ثُمَّ أَنْ تُحِبَّ لِلنَّاسِ مَا تُحِبُّ لِنَفْسِكَ وَتَكْرَهَ لَهُمْ مَا تَكْرَهُ
“তারপর তুমি নিজের জন্য যা পছন্দ করো, মানুষের জন্য তা-ই পছন্দ করবে এবং নিজের জন্য যা অপছন্দ করো অপরের জন্য তা অপছন্দ করবে।"
মূসা (আলাইহিস সালাম) বললেন, "ثُمَّ بِمَاذَا يَا رَبِّ হে আমার রব! তারপর কী?” আল্লাহ বলেন,
إِنْ أَوْلَيْتُكَ شَيْئًا مِنْ أَمْرِ عِبَادِي فَلَا تُعَنِّهِمْ إِلَيْكَ فِي حَوَائِجِهِمْ فَإِنَّكَ إِنَّمَا تُعَنِّيْ رُوْحِيْ فَإِنِّي مُبْصِرُ وَمُسْتَمِعُ وَمُشْهِدُ وَمُسْتَشْهِدُ
"আমি যদি তোমাকে আমার বান্দাদের কোনো বিষয় দেখভাল করার দায়িত্ব দিই, তাহলে তাদের প্রয়োজন মেটাতে গিয়ে তাদেরকে নাজেহাল করবে না; কারণ এর মাধ্যমে মূলত আমার আত্মাকে কষ্ট দেওয়া হয়। আমি সবকিছু দেখি, মনোযোগ সহকারে শুনি; আমি [সবকিছুর] সাক্ষী রাখছি এবং [কিয়ামতের দিন] সাক্ষীদের তলব করবো।"'
আল্লাহ যেটুকু দিয়েছেন সেটুকুতে সন্তুষ্ট ব্যক্তিই সবচেয়ে ধনী
[৩১২] ইবনু আব্বাস (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘মুসা (আলাইহিস সালাম) বললেন,
يا رب أي عبادك أحب إليك “হে আমার রব! তোমার বান্দাদের মধ্যে তোমার নিকট সবচেয়ে প্রিয় কে?”
আল্লাহ বললেন, "أكثرهم لي ذكرا তাদের মধ্যে যে আমাকে বেশি স্মরণ করে।"
মূসা (আলাইহিস সালাম) জিজ্ঞাসা করলেন, "فَأَيُّ عِبَادِكَ أَغْنَى رَبِّ হে রব! তাহলে তোমার বান্দাদের মধ্যে সবচেয়ে ধনী কে?"
আল্লাহ বলেন, “الراضي بما أعطيته আমি যেটুকু দিয়েছি, সেটুকুতে যে সন্তুষ্ট থাকে।"
মূসা (আলাইহিস সালাম) জানতে চাইলেন, "رَبِّ أَيُّ عِبَادِكَ أَحْكَمُ হে আমার রব! তোমার বান্দাদের মধ্যে সবচেয়ে ভালো বিচারক কে?"
আল্লাহ বলেন, "الَّذِي يَحْكُمُ عَلَى نَفْسِهِ بِمَا يَحْكُمُ عَلَى النَّاسِ যে ব্যক্তি নিজের জন্য সেই ফায়সালা দেয়-যা সে অন্যের জন্য দিয়ে থাকে।"
বাইতুল্লাহ এর হাজ্জ
[৩১৩] মুজাহিদ (রহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘সত্তরজন নবি বাইতুল্লাহ'র হাজ্জ আদায় করেছেন। মূসা ইবনু ইমরান (আলাইহিস সালাম) তাঁদের অন্যতম। [হাজ্জের সময়] তাঁর গায়ে ছিল দুটি কাতওয়ানি বস্ত্র। তিনি ‘লাব্বাইক’ [আমি হাজির!] বললে পাহাড়সমূহ থেকে তার প্রতিধ্বনি আসতো।' [তুলনীয়: হাদীস নং ২৯৩]
কৃত্রিমতার উপর নিষেধাজ্ঞা
[৩১৪] আবূ ইমরান জুওয়ানি (রহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘মুসা (আলাইহিস সালাম) তাঁর জাতিকে উপদেশ দিচ্ছিলেন। এমন সময় শ্রোতাদের একজন নিজের জামা ছিঁড়ে ফেলেন। এর প্রেক্ষিতে মূসা (আলাইহিস সালাম)-কে
বলা হলো,
قُلْ لِصَاحِبِ الْقَمِيصِ لَا يَشُقَّ قَمِيصَهُ لِيَشْرَحَ لِي عَنْ قَلْبِهِ "তুমি জামাওয়ালাকে বলে দাও-আমাকে তার অন্তঃকরণ দেখানোর জন্য সে যেন তার জামা না ছিঁড়ে।"
আল্লাহর নিকট সবচেয়ে প্রিয় ব্যক্তি কে?
[৩১৫] আম্মার ইবনু ইয়াসীর (রদিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণিত, 'তাঁর সহচরগণ তাঁর জন্য অপেক্ষা করছিলেন। তিনি বেরিয়ে এলে তাঁরা জিজ্ঞাসা করলেন, 'আপনার দেরি হওয়ার কারণ কী?' আম্মার বললেন, 'শোনো! আমি তোমাদেরকে তোমাদের এক পূর্ববর্তী ভাই [মূসা (আলাইহিস সালাম)]-এর ঘটনা বলছি।
মূসা (আলাইহিস সালাম) [আল্লাহ তাআলা-কে] বললেন, “يَا رَبِّ حَدِّثْنِي بِأَحَبَّ النَّاسِ إِلَيْكَ হে আমার রব! আমাকে বলো-তোমার নিকট সবচেয়ে প্রিয় ব্যক্তি কে?" আল্লাহ বললেন,
عَبْدُ فِي أَقْصَى الْأَرْضِ سَمِعَ بِهِ عَبْدُ آخَرُ فِي أَقْصَى الْأَرْضِ لَا يَعْرِفُهُ فَإِنْ أَصَابَهُ مُصِيبَةٌ فَكَأَنَّمَا أَصَابَتْهُ وَإِنْ شَاكَتْهُ شَوْكَةٌ فَكَأَنَّمَا شَاكَتْهُ لَا يُحِبُّهُ إِلَّا لِي فَذَلِكَ أَحَبُّ خَلْقِي إِلَيَّ "পৃথিবীর সর্বশেষ প্রান্তে [আমার] এক বান্দা বসবাস করে; পৃথিবীর অপর প্রান্তে থাকা আরেক বান্দা তার কথা শুনতে পেলো, অথচ সে তাকে চেনে না; কিন্তু প্রথম ব্যক্তি বিপদাপন্ন হলে দ্বিতীয় ব্যক্তি নিজেকে বিপন্ন মনে করে, প্রথম ব্যক্তির দেহে কাঁটা বিদ্ধ হলে দ্বিতীয় ব্যক্তি মনে করে তার দেহে কাঁটা বিদ্ধ হয়েছে। সে তাকে নিছক আমার জন্য ভালোবাসে। ওই লোকটিই হলো আমার সৃষ্টিকুলের মধ্যে আমার নিকট সবচেয়ে প্রিয়।"
মূসা (আলাইহিস সালাম) বললেন, “يَا رَبِّ خَلَقْتَ خَلْقًا تُدْخِلُهُمُ النَّارَ وَتُعَذِّبُهُمْ হে আমার রব! তুমি সৃষ্টিকূলকে সৃষ্টি করেছো। [আবার] তুমিই তাদেরকে জাহান্নামে প্রবেশ করাবে ও শাস্তি দিবে?"
আল্লাহ তাআলা তাঁর নিকট ওহি পাঠিয়ে বললেন, "كُلُّهُمْ خَلْقِي إِزْرَعُ زَرْعًا এরা সবাই তো আমার সৃষ্টি। [তুমি একটি কাজ করো] বীজ বপন করো।"
মূসা (আলাইহিস সালাম) বীজ বপন করলেন। আল্লাহ বললেন, “إِسْقِهِ তাতে পানি দাও।” মূসা (আলাইহিস সালাম) পানি দিলেন। পরিশেষে আল্লাহ বললেন, “قُمْ عَلَيْهِ ফসল কেটে ফেলো।” মূসা (আলাইহিস সালাম) ফসল কেটে তুলে নিলেন।
আল্লাহ তাআলা জিজ্ঞাসা করলেন, “مَا فَعَلْتَ زَرْعَكَ يَا مُوْسُى মূসা! তোমার ফসল কী করলে?”
তিনি বললেন, "فَرَعْتُ مِنْهُ وَرَفَعْتُهُ কেটে তুলে নিয়েছি।"
আল্লাহ জিজ্ঞাসা করলেন, “مَا تَرَكْتَ مِنْهُ شَيْئًا ফসলের কোন অংশটি ফেলে দিয়েছো?”
তিনি বললেন, “مَا لَا خَيْرَ فِيْهِ أَوْ مَا لَا حَاجَةَ لِي فِيْهِ যার মধ্যে কোনো কল্যাণ নেই, কিংবা যা আমার দরকার নেই।”
كَذَلِكَ أَنَا لَا أُعَذِّبُ إِلَّا مَنْ لَا خَيْرَ فِيْهِ أَوْ مَا لَا حَاجَةً لِي 16001 TER فِيْهِ তেমনিভাবে আমিও কেবল তাকেই শাস্তি দিবো—যার মধ্যে কোনো কল্যাণ নেই, কিংবা যাকে আমার দরকার নেই।" [তুলনীয়: হাদীস নং ৩১৯]
আল্লাহর অধিকার আদায় করার আগ পর্যন্ত দুআ কবুল হয় না
[৩১৬] ওয়াহাব ইবনু মুনাব্বিহ (রহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘একব্যক্তি খুব মিনতি সহকারে [আল্লাহকে] ডাকছিলো। আল্লাহ'র নবি মূসা (আলাইহিস সালাম) তার পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় বললেন, “يَا رَبِّ ارْحَمْهُ হে আমার রব! তার প্রতি দয়া করো!” আল্লাহ তাআলা তাঁর নিকট ওহি প্রেরণ করে বলেন,
لَوْ دَعَانِي حَتَّى تَنْقَطِعَ قُوَاهُ مَا اسْتَجَبْتُ لَهُ حَتَّى يَنْظُرَ فِي حَتَّيْ عَلَيْهِ
“সে যদি আমাকে ডাকতে ডাকতে তার সকল শক্তি নিঃশেষ করে ফেলে, তবুও আমি তার ডাকে সাড়া দিবো না; যতোক্ষণ না সে তার উপর আমার যে অধিকার রয়েছে—সেদিকে নজর দিবে।"'
গরীব মানুষকে অসন্তুষ্ট করা হলে আল্লাহ তাআলা অসন্তুষ্ট হন
[৩১৭] ওয়াহাব ইবনু মুনab্বিহ (রহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'আল্লাহ তাআলা মূসা (আলাইহিস সালাম)-এর নিকট ওহি প্রেরণ করে বলেন,
إِنَّ قَوْمَكَ يُبْنُونَ فِي الْبُيُوتَ وَيُقَرِّبُوْنَ الْقُرْبَانَ وَإِنِّي لَا أَسْكُنُ الْبُيُوتَ وَلَا آكُلُ اللَّحْمَ وَلَكِنْ آيَةٌ بَيْنِي وَبَيْنَهُمْ أَنْ يَعْدِلُوا بَيْنَ الْغَنِيَّ وَالْمِسْكِينِ وَالْآيَةُ بَيْنِي وَبَيْنَهُمْ إِذَا أَرْضَوْا الْمَسَاكِيْنَ فَقَدْ رَضِيْتُ وَإِذَا أَسْخَطُوْهُمْ سَخِطْتُ
"তোমার জাতির লোকেরা আমার জন্য অনেক গৃহ [অর্থাৎ মাসজিদ] নির্মাণ করছে এবং কুরবানি পেশ করছে। আমি তো গৃহে বসবাস করি না; গোশতও খাই না। তবে তাদের ও আমার মধ্যে একটি অঙ্গীকার আছে; সেটি হলো-তারা যেন ধনী ও গরীবের মধ্যে ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করে। তাদের ও আমার মধ্যে [আরেকটি] অঙ্গীকার হলো-তারা যখন নিঃস্ব লোকদেরকে সন্তুষ্ট রাখবে, আমিও তাদের প্রতি সন্তুষ্ট থাকবো; আর যখন তারা নিঃস্বদেরকে অসন্তুষ্ট করবে, আমিও তাদের উপর অসন্তুষ্ট হবো।"
সর্বোত্তম মানুষের বৈশিষ্ট্য
[৩১৮] ওয়াহাব ইবনু মুনাব্বিহ (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'মূসা (আলাইহিস সালাম) বানী ইসরাঈলের লোকদেরকে বললেন,
”إِيْتُوْنِي بِخَيْرِكُمْ رَجُلًا তোমাদের সবচেয়ে ভালো লোকটিকে আমার কাছে নিয়ে এসো।"
তারা একজনকে নিয়ে আসলে মূসা (আলাইহিস সালাম) তাকে জিজ্ঞাসা করলেন, " তুমি কি বানী ইসরাঈলের মধ্যে সবচেয়ে ভালো লোক?" সে বললো, 'তারা এমনটি মনে করে।'
মূসা (আলাইহিস সালাম) বললেন, “إِذْهَبْ فَأْتِنِي بِشَرِّهِمْ তুমি যাও; তাদের মধ্যে যে লোকটি সবচেয়ে খারাপ-তাকে আমার কাছে নিয়ে এসো।" লোকটি চলে গেলো। কিছুক্ষণ পর সে একাকী ফিরে এলো।
মূসা (আলাইহিস সালাম) বললেন, "جِئْتَنِي بِشَرِّهِمْ তাদের খারাপ লোকটিকে নিয়ে এসেছো?" লোকটি বললো, 'আমি আমার নিজের সম্পর্কে যা জানি,
তাদের কারো সম্পর্কে আমি তা জানি না।’ মূসা (আলাইহিস সালাম) বললেন, “أَنْتَ خَيْرُهُمْ তুমিই তাদের মধ্যে সর্বত্তম ব্যক্তি!”
আল্লাহ তাআলার প্রিয়তম বান্দার বৈশিষ্ট্য
[৩১৯] ওয়াহাব ইবনু মুনাব্বিহ (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘মূসা (আলাইহিস সালাম) বললেন,
“رَبِّ أَيُّ عِبَادِكَ أَحَبُّ إِلَيْكَ হে আমার রব! তোমার কোন বান্দা তোমার নিকট সবচেয়ে প্রিয়?”
আল্লাহ বলেন, “مَنْ أَذْكُرُهُ يَذْكُرْنِ যাকে দেখলে মানুষ আমাকে স্মরণ করে।" মূসা (আলাইহিস সালাম) আবারো জিজ্ঞাসা করলেন, “رَبِّ أَيُّ عِبَادِكَ أَحَبُّ إِلَيْكَ হে আমার রব! তোমার কোন বান্দা তোমার নিকট সবচেয়ে প্রিয়?”
আল্লাহ বলেন, “اَلَّذِيْنَ يَعُوْدُوْنَ الْمَرْضَى وَيُشَيِّعُوْنَ الْكُلَّ যারা অসুস্থদের সেবা করে, সন্তানহারা মাকে সান্ত্বনা দেয়, এবং মৃত মানুষের জানাযার অনুসরণ করে [কবর পর্যন্ত যায়]।" [তুলনীয়: হাদীস নং ৩১৫]
হাজ্জ
[৩২০] আতা (রহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘মূসা (আলাইহিস সালাম) বাইতুল্লাহ তাওয়াফ [প্রদক্ষিণ] এবং সাফা ও মারওয়ার মাঝখানে সাঈ [দ্রুতগমন] করার সময় বলছিলেন, “لَبَّيْكَ اَللَّهُمَّ لَبَّيْكَ হে আল্লাহ! আমি হাজির।" জবাবে আল্লাহ তাআলা বলেন,
“لَبَّيْكَ يَا مُوْسٰى لَبَّيْكَ! হে মূসা! আমি হাজির, আমি তোমার পাশেই আছি।" তখন মূসা (আলাইহিস সালাম)-এর গায়ে ছিল একটি কাতওয়ানি আলখাল্লা।'
কবরে সালাত আদায়
[৩২১] আনাস ইবনু মালিক (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, ‘নবি (সাল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,
مَرَرْتُ لَيْلَةً أُسْرِيَ بِي بِمُوسَى عَلَيْهِ السَّلَامُ عِنْدَ الْكَثِيْبِ الْأَحْمِرِ وَهُوَ قَائِمٌ يُصَلِّي فِي قَبْرِهِ
ইসরা/মিরাজ-এর রাতে আমি আল-কাসীবুল আহমার!¹¹ এলাকায় মূসা (আলাইহিস সালাম)-এর পাশ দিয়ে গিয়েছি। তিনি তখন তাঁর কবরে দাঁড়িয়ে সালাত আদায় করছিলেন।"'
কিয়ামতের দিন যাঁরা আরশের ছায়ায় স্থান পাবেন
[৩২২] আতা ইবনু ইয়াসার (রহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'মূসা (আলাইহিস সালাম) বললেন,
“يَا رَبِّ مَنْ أَهْلُكَ الَّذِينَ تُظِلُّهُمْ فِي ظِلَّ عَرْشِكَ হে আমার রব! তাঁরা কারা- যাদেরকে তুমি [কিয়ামতের দিন] তোমার আরশের ছায়ায় স্থান দিবে?” আল্লাহ বলেন,
هُمُ الْبَرِيئَةُ أَيْدِيهِمْ وَالطَّاهِرَةُ قُلُوْبُهُمْ الَّذِينَ يَتَحَابُّوْنَ بِجَلَالِي الَّذِينَ إِذَا ذُكِرْتُ ذَكَرُوا بِيْ وَإِذَا ذَكَرُوا ذَكَرْتُ بِذِكْرِهِمْ الَّذِينَ يَسْبَغُوْنَ الْوُضُوءَ فِي الْمَكَارِهِ وَيُنِيبُوْنَ إِلَى ذِكْرِي كَمَا تُنِيْبُ النُّسُورُ إِلى وُكُوْرِهَا وَيَكْلَفُوْنَ بِحُبِّي كَمَا يَكْلَفُ الصَّبِيُّ بِحُبِّ النَّاسِ وَيَغْضَبُوْنَ لِمَحَارِي إِذَا اسْتُحِلَّتْ كَمَا يَغْضَبُ النَّمِرُ إِذَا حُوْرِبَ
"যাঁদের হাত [অপরাধ] মুক্ত, অন্তঃকরণ পূত-পবিত্র; যাঁরা আমার মহত্ত্বের প্রভাবে একে অপরকে ভালোবাসে; [কোথাও] আমার কথা আলোচিত হলে যাঁরা আমাকে স্মরণ করে; যাঁরা আমাকে স্মরণ করলে আমিও যাঁদেরকে স্মরণ করি; যাঁরা কষ্টের মধ্যেও পূর্ণাঙ্গ ওযু করে; [যাঁরা] আমার স্মরণের দিকে সেভাবে ফিরে আসে, যেভাবে ঈগল [শিকার শেষে] নীড়ে ফিরে আসে; [যাঁরা] আমার ভালোবাসার মুখাপেক্ষী, ঠিক যেভাবে শিশুরা মানুষের ভালোবাসার মুখাপেক্ষী হয়ে থাকে; এবং [যাঁরা] আমার নিষিদ্ধ কর্ম সংঘটিত হতে দেখলে ক্ষিপ্ত হয়, ঠিক যেভাবে লড়াইয়ের সময় চিতা
[১১] বর্তমান নাম 'নিবু পাহাড় (Mount Nibo)'। জর্দানে অবস্থিত। [অনুবাদক]
ক্ষিপ্ত হয়ে উঠে।"
হত্যাকান্ডের দায়ভার
[৩২৩] ওয়াহাব ইবনু মুনাব্বিহ (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'আল্লাহ তা'আলা মূসা (আলাইহিস সালাম)-কে বললেন,
يَا مُوسَى وَعِزَّتِي وَجَلَالِي لَوْ أَنَّ النَّفْسَ الَّتِي قَتَلْتَ أَقَرَّتْ لِي طَرْفَةَ عَيْنٍ أَنِّي لَهَا خَالِقُ أَوْ رَازِقُ لَأَذَقْتُكَ فِيهَا طَعْمَ الْعَذَابِ وَإِنَّمَا عَفَوْتُ عَنْكَ أَمْرَهَا أَنَّهَا لَمْ تُقرَّ لِي طَرْفَةَ عَيْنٍ أَنِّي لَهَا خَالِقٌ أَوْ رَازِقُ "মূসা! আমার সম্মান ও মহত্ত্বের শপথ! তুমি যাকে হত্যা করেছিলে, সে যদি এক পলকের জন্যও স্বীকার করতো- 'আমি তার স্রষ্টা বা জীবনোপকরণ-দাতা', তাহলে তাকে হত্যার দায়ে আমি তোমাকে অবশ্যই শাস্তি আস্বাদন করাতাম। আমি তোমার এ সংক্রান্ত অপরাধ ক্ষমা করে দিয়েছি; [কারণ] সে এক পলকের জন্যও স্বীকার করেনি- 'আমি তার স্রষ্টা বা জীবনোপকরণ-দাতা।"'
ভগ্নহৃদয় লোকদের প্রতি আল্লাহর করুণা
[৩২৪] ইমরান (রহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'মূসা ইবনু ইমরান (আলাইহিস সালাম) বললেন,
“أَيْ رَبِّ أَيْنَ أَبْغِيْكَ হে আমার রব! আমি তোমাকে কোথায় খুঁজবো?"
إِبْغِنِي عِنْدَ الْمُنْكَسِرَةِ قُلُوْبُهُمْ إِنِّي أَدْنُو مِنْهُمْ كُلَّ يَوْمٍ بَاعًا وَلَوْلَا ذَلِكَ لَا نْهَدَمُوا ভগ্ন-হৃদয় লোকদের কাছে আমাকে খোঁজো। আমি প্রতিদিন একহাত করে তাঁদের নিকটবর্তী হই; তা না হলে, তারা নির্ঘাত ভেঙে পড়তো।"'
ফেরেশতাদের মূল্যায়ন
[৩২৫] সাবিত (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'মূসা (আলাইহিস সালাম)-এর মৃত্যুতে আকাশের ফেরেশতারা বলতে শুরু করলো,
"مَاتَ مُوْسَى فَأَيُّ نَفْسٍ لَا تَمُوْتُ মূসা ইন্তেকাল করেছেন। তাহলে আর কে ইন্তেকাল করবে না?"
কন্যাদের প্রতি উপদেশ
[৩২৬] আবূ ইমরান জুওয়ানি (রহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, 'মৃত্যুর সময় ঘনিয়েণ এলে মূসা (আলাইহিস সালাম) উদ্বিগ্ন হয়ে ওঠেন। অতঃপর তিনি বলেন,
إِنِّي لَسْتُ أَجْزَعُ لِلْمَوْتِ وَلَكِنِّي أَجْزَعُ أَنْ تُحْبَسَ لِسَانِي عِنْدَ ذِكْرِ اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ عِنْدَ الْمَوْتِ
"মৃত্যুর জন্য আমি উদ্বিগ্ন নই; আমার উদ্বেগের কারণ হলো—আল্লাহ তাআলা'র যিক্ চলাকালে মৃত্যুর সময় তো আমার জিহ্বা বন্ধ করে দেওয়া হবে!" মূসা (আলাইহিস সালাম)-এর তিনটি মেয়ে ছিল। তিনি তাদেরকে বলেন,
يَا بَنَاتِي إِنَّ بَنِي إِسْرَائِيلَ سَيَعْرِضُوْنَ عَلَيْكُنَّ الدُّنْيَا فَلَا تَقْبَلْنَ وَالْقُطْنَ هَذَا السَّنْبُلَ فَافْرُكْنَهُ وَكُلْنَهُ تَبْلُغْنَ بِهِ إِلَى الْجَنَّةِ
"মেয়েরা আমার! অচিরেই বানী ইসরাঈলের লোকজন তোমাদের সামনে দুনিয়া [র বিলাসী উপকরণ] পেশ করবে; তোমরা তা গ্রহণ কোরো না। এই খাদ্যশস্যগুলো নিয়ে ঘষে খাওয়ার উপযোগী করে খাও; এর মাধ্যমে তোমরা জান্নাতে পৌঁছে যাবে।"

📘 রাসুলের চোখে দুনিয়া > 📄 দাঊদ (আলাইহিস সালাম) ও দুনিয়া

📄 দাঊদ (আলাইহিস সালাম) ও দুনিয়া


আল্লাহর ভয়ে অধিক কান্নাকাটি
[৩২৭] ইসমাঈল ইবনু আব্দিল্লাহ (রহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, 'দাউদ (আলাইহিস সালাম)-কে অধিক কান্নাকাটির জন্য তিরস্কার করা হলে তিনি বলতেন,
ذَرُونِي أَبْكِي قَبْلَ يَوْمِ الْبُكَاءِ قَبْلَ تَحْرِيقِ الْعِظَامِ وَاشْتِعَالِ اللَّحَا قَبْلَ أَنْ يُؤْمَرَ بِي مَلَائِكَةٌ غِلَاظٌ شِدَادٌ لَّا يَعْصُوْنَ اللَّهَ مَا أَمَرَهُمْ وَيَفْعَلُوْنَ مَا يُؤْمَرُوْنَ
"আমাকে কাঁদতে দাও, সেদিন আসার পূর্বে- যেদিন মানুষ কাঁদবে, অস্থি-মজ্জা পোড়ানো হবে, দাড়িতে আগুন লেগে যাবে; সেদিন আসার পূর্বে- যেদিন আমার ব্যাপারে রুক্ষ ও কর্কশ ফেরেশতাদেরকে নির্দেশ দেওয়া হবে, যারা আল্লাহ'র আদেশের অবাধ্য হয় না, বরং তা-ই করে যা করার আদেশ তাঁদেরকে দেওয়া হয়।" [তুলনীয়: হাদীস নং ৩৩৩; ৩৩৪]
সারাজীবন শুকরিয়া জ্ঞাপন করে একটি নিয়ামাতেরও শুকরিয়া আদায় করা যায় না
[৩২৮] হাসান (রহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'আল্লাহ'র নবি দাউদ (আলাইহিস সালাম) বলেন,
الهِيَ لَوْ أَنَّ لِكُلِّ شَعْرَةٍ مِّنِّي لِسَانَيْنِ يُسَبِّحَانِ اللَّيْلَ وَالنَّهَارَ وَالدَّهْرَ كُلَّهُ مَا قَضَيْتُ حَقَّ نِعْمَةٍ
"হে আমার ইলাহ! আমার প্রত্যেকটি চুলের যদি দুটি জিহ্বা থাকতো, আর সেগুলো যদি দিন-রাত ও যুগ-যুগান্তর তোমার প্রশংসা করতে থাকতো,
তাতে একটি নিয়ামাতেরও শুকরিয়া আদায় করে শেষ করা যেতো না!"
মানুষের তুলনায় ব্যাঙ আল্লাহকে বেশি স্মরণ করে
[৩২৯] মুগীরা ইবনু উয়াইনা (রহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, 'তিনি বলেন, 'দাউদ (আলাইহিস সালাম) বলেছেন,
يَا رَبِّ هَلْ بَاتَ أَحَدٌ مِّنْ خَلْقِكَ اللَّيْلَةَ أَطْوَلَ ذِكْرًا لَكَ مِنِّي তোমার সৃষ্টির মধ্যে কেউ কি রাতের বেলা আমার চেয়ে বেশি সময় ধরে তোমাকে স্মরণ করেছে?"
আল্লাহ তাআলা তাঁকে ওহি'র মাধ্যমে জানালেন, "نَعَمْ الضَّفْدَعُ হ্যাঁ! ব্যাঙ [তোমার চেয়ে বেশি সময় ধরে আমাকে স্মরণ করেছে]!"
অতঃপর আল্লাহ তাঁর উপর নিম্নোক্ত ওহি নাযিল করেন, “إِعْمَلُوا آلَ دَاوُوْدَ شُكْرًا وَقَلِيْلٌ مِّنْ عِبَادِيَ الشَّكُوْرُ দাউদ পরিবার! কৃতজ্ঞ হও; আমার দাসদের অল্প অংশই কৃতজ্ঞ।" (সূরা সাবা ৩৪:১৩)
দাউদ (আলাইহিস সালাম) বললেন, يَا رَبِّ كَيْفَ أُطِيقُ شُكْرَكَ وَأَنْتَ الَّذِي تُنَعمُ عَلَيَّ تَرْزُقُنِي عَلَى النِّعْمَةِ الشَّكْرَ ثُمَّ تَزِيدُنِي نِعْمَةً نِعْمَةٌ فَالنَّعَمُ مِنْكَ يَا رَبِّ وَالشَّكْرُ مِنْكَ فَكَيْفَ أُطِيقُ شُكْرَكَ يَا رَبِّ
"রব আমার! আমি কীভাবে তোমার শুকরিয়া আদায় করে শেষ করবো? তুমিই আমাকে অজস্র অনুগ্রহ দিয়ে যাচ্ছো, তুমিই অনুগ্রহের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশের সামর্থ্য দিচ্ছো, আবার তুমিই আমাকে একের পর এক নতুন অনুগ্রহ দিয়ে চলেছো। হে আমার রব! অনুগ্রহরাজি [আসে] তোমার নিকট থেকে, আবার কৃতজ্ঞতা প্রকাশের সামর্থ্যও তোমার দেওয়া! তাহলে আমি কীভাবে তোমার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে শেষ করবো?"
আল্লাহ বললেন, “الْآنَ عَرَفْتَنِي يَا دَاوُوْدُ حَقَّ مَعْرِفَتِي দাঊদ! এতোক্ষণে তুমি আমাকে যথার্থভাবে চিনতে পেরেছো।"'
কিছু ভালো কাজের প্রতিদান
[৩৩০] জা'দ (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'দাউদ (আলাইহিস সালাম) বললেন, اللَّهُمَّ اجْعَلْ حُبَّكَ أَحَبَّ إِلَيَّ مِنْ نَّفْسِي وَسَمْعِي وَبَصَرِي وَأَهْلِي وَمِنَ الْمَاءِ الْبَارِدِ হে আমার ইলাহ! তাঁর জন্য কী প্রতিদান রয়েছে-যে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত লোককে সান্ত্বনা দেয়, আর এর দ্বারা সে কেবল তোমার সন্তুষ্টিই কামনা করে?"
আল্লাহ তাআলা বললেন, “جَزَاؤُهُ أَنْ تُشَيِّعَهُ مَلَائِكَتِي إِذَا مَاتَ وَأَنْ أُصَلَّى عَلَى رُوْحِهِ فِي الْأَرْوَاحِ তাঁর প্রতিদান হলো-সে মারা গেলে ফেরেশতারা তাঁর জানাযায় অংশগ্রহণ করবে, আর আমি তাঁর আত্মার উপর শান্তি বর্ষণ করবো।"
তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, إِلهِي مَا جَزَاءُ مَنْ أَسْنَدَ يَتِيْمًا أَوْ أَرْمَلَةٌ হে আমার ইলাহ! যে ব্যক্তি অনাথ কিংবা বিধবাকে একমাত্র আল্লাহ'র উদ্দেশ্যে সাহায্য করে, সে কী প্রতিদান পাবে?"
আল্লাহ বললেন, “جَزَاؤُهُ أَنْ أُظِلَّهُ فِي ظِلَّ عَرْشِي يَوْمَ لَا ظِلَّ إِلَّا ظِلّى তাঁর প্রতিদান হলো-যেদিন আমার [আরশের] ছায়া ব্যতীত অন্য কোনো ছায়া থাকবে না, সেদিন আমি তাঁকে আমার আরশের ছায়ায় স্থান দিবো।"
তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, إِلهِي مَا جَزَاءُ مَنْ فَاضَتْ عَيْنَاهُ مِنْ خَشْيَتِكَ হে আমার ইলাহ! তাঁর প্রতিদান কী হবে-যার চক্ষুযুগল থেকে তোমার ভয়ে অশ্রু ঝরে?"
আল্লাহ বললেন, “جَزَاؤُهُ أَنْ أُؤَمِّنَهُ يَوْمَ الْفَزَعِ الْأَكْبَرِ وَأَنْ أَقِيَ وَجْهَهُ فَيْحَ جَهَنَّمَ তাঁর প্রতিদান হলো-আমি তাঁকে মহা-আতঙ্কের দিন আতঙ্কমুক্ত রাখবো এবং তাঁর চেহারাকে জাহান্নাম থেকে সুরক্ষা দিবো।"
সবকিছুর চেয়ে আল্লাহকে অধিক ভালোবাসতে হবে
[৩৩১] মালিক (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'দাউদ (আলাইহিস সালাম) এভাবে দুআ করেছেন,
اللَّهُمَّ اجْعَلْ حُبَّكَ أَحَبَّ إِلَيَّ مِنْ نَّفْسِي وَسَمْعِي وَبَصَرِي وَأَهْلِي وَمِنَ الْمَاءِ الْبَارِدِ "হে আল্লাহ! আমার নিকট তোমার ভালোবাসাকে আমার নিজস্ব সত্তা,
শ্রবণশক্তি, দৃষ্টিশক্তি, পরিবার-পরিজন ও শীতল পানি'র চেয়ে অধিক প্রিয় করে তোলো।"'
রাতের সর্বোত্তম সময় কোনটি?
[৩৩২] জারীরি (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'দাউদ (আলাইহিস সালাম) জিবরাঈল (আলাইহিস সালাম)-কে জিজ্ঞাসা করলেন,
“يَا جِبْرِيلُ أَيُّ اللَّيْلِ أَفْضَلُহে জিবরাঈল! রাতের কোন অংশটি সর্বোত্তম?”
জিবরাঈল (আলাইহিস সালাম) বললেন, “يَا دَاوُوْدُ مَا أَدْرِي إِلَّا أَنَّ الْعَرْشَ يَهْتَزُ مِنَ السَّحَرِ দাউদ! আমি জানি না; তবে রাত্রির শেষলগ্নে আরশ প্রকম্পিত হয়ে ওঠে।""
অত্যধিক কান্নার নজির
[৩৩৩] উবাইদ ইবনু উমাইর (রহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, "দাউদ (আলাইহিস সালাম)-এর চোখের পানি পেয়ে তাঁর চারপাশে ছোট একটি বাগান বেড়ে উঠেছিল। এর প্রেক্ষিতে আল্লাহ তাআলা তাঁর নিকট ওহি প্রেরণ করেন,
يَا دَاوُودُ تُرِيدُ أَنْ أَزِيدَكَ فِي مُلْكِكَ وَوَلَدِكَ
"দাঊদ! তুমি কি চাচ্ছো-আমি তোমার শাসনক্ষমতা ও সন্তান-সন্ততি বাড়িয়ে দিই?” দাউদ (আলাইহিস সালাম) বললেন, “أَيْ رَبِّ أَنْ تَغْفِرَ হে আমার রব! [আমি বরং চাই] তুমি আমাকে ক্ষমা করে দাও।"' [তুলনীয়: হাদীস নং ৩২৭; ৩৩৪]
অধিক কান্নাকাটির ফলে চোখের পানি খাবারে মিশে যেতো
[৩৩৪] ওয়াহাব ইবনু মুনাব্বিহ (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'দাউদ (আলাইহিস সালাম)-এর দ্বারা একটি নিন্দনীয় কাজ সম্পাদিত হয়ে যাওয়ায় [তিনি এতো বেশি কেঁদেছিলেন যে] তারপর তিনি যে খাবার কিংবা পানীয় গ্রহণ করতেন- তাতে তাঁর অশ্রু মিশে যেতো।'
একটি হৃদয়গ্রাহী দুআ
[৩৩৫] ওয়াহাব ইবনু মুনাব্বিহ (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'দাউদ (আলাইহিস সালাম) বলেছেন,
لَا صَبْرَ لِي عَلَى حَرِّ شَمْسِكَ فَكَيْفَ صَبْرِي عَلَى حَرِّ نَارِكَ رَبِّ رَبِّ لَا صَبْرَ لِي عَلَى صَوْتِ رَحْمَتِكَ فَكَيْفَ صَبْرِي عَلَى صَوْتِ عَذَابِكَ
"[হে আল্লাহ!] তোমার সূর্যের উত্তাপ আমি সহ্য করতে পারি না; তাহলে তোমার জাহান্নামের উত্তাপ কীভাবে সহ্য করবো? রব আমার! রব আমার! তোমার অনুগ্রহবর্ষণকারী আওয়াজ [অর্থাৎ বজ্রপাত] আমি সহ্য করতে পারি না; তাহলে তোমার শাস্তির আওয়াজ কীভাবে সহ্য করবো?"'
অসৎ সঙ্গ না দেয়ার জন্য দুআ
[৩৩৬] আবদুল্লাহ ইবনু আবী মুলাইকা (রহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'নবি দাউদ (আলাইহিস সালাম) বলেছেন,
إِلهِي لَا تَجْعَلْ لِي أَهْلَ سُوْءٍ فَأَكُوْنَ رَجُلَ سُوْءٍ
"হে আমার ইলাহ! আমাকে খারাপ ব্যক্তির সঙ্গে রেখো না; অন্যথায় আমারও খারাপ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।"'
মধ্যম অবস্থা কামনা
[৩৩৭] উমার ইবনু আবদির রহমান ইবনি দারবা (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'দাউদ (আলাইহিস সালাম)-এর দুআসমূহের মধ্যে একটি ছিল-
اللَّهُمَّ لَا تُفْقِرْنِي فَأَنْسَى وَلَا تُغْنِنِي فَأَطْغَى
"হে আল্লাহ! আমাকে এতোটা দারিদ্র্যে নিপতিত করো না-যার ফলে আমি [তোমাকে] ভুলে যাবো; আবার এতোটা প্রাচুর্য দিও না-যার ফলে আমি সীমালঙ্ঘন করবো।"'
সুসংবাদ তাঁদের জন্য যাঁরা জালিমের আদেশ বাস্তবায়ন করে না
[৩৩৮] আবদুর রহমান ইবনু বযারিয়্যা (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'দাউদ
(আলাইহিস সালাম)-এর পরিবারের যাবৃরে তিনটি কথা রয়েছে—সুসংবাদ তাঁদের জন্য যাঁরা ভুল-সম্পাদনকারীদের পথে চলে না; সুসংবাদ তাঁদের জন্য যাঁরা জালিমের আদেশ বাস্তবায়ন করে না; সুসংবাদ তাঁদের জন্য যাঁরা অলস লোকদের সংশ্রবে থাকে না।'
হাতের উপার্জন পবিত্রতম রিষষ্ক
[৩৩৯] হাসান (রহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, 'দাউদ (আলাইহিস সালাম) [আল্লাহ তাআলা-কে] জিজ্ঞাসা করেন,
“أَيُّ رِزْقٍ أَطْيَبُ إِلَيَّ হে আমার ইলাহ! পবিত্রতম জীবনোপকরণ কোনটি?” জবাবে আল্লাহ বলেন, “ثَمَرَةُ يَدِكَ يَا دَاوُوْدُ দাউদ [পবিত্রতম জীবনোপকরণ হলো] তোমার হাতের উপার্জন।"'
আল্লাহর কথা মানুষের সামনে উল্লেখ করার সময় সর্বদা সুন্দরভাবে উপস্থাপন করা উচিত
[৩৪০] আবূ আব্দিল্লাহ জাদালি (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'আল্লাহ তাআলা দাউদ (আলাইহিস সালাম)-এর নিকট ওহি প্রেরণ করে বলেন,
!يَا دَاوُوُدُ أَحِبَّنِي وَأَحِبَّ مَنْ يُحِبُّنِي وَحَبَّبْ إِلَيَّ عِبَادِي আমাকে ভালোবাসো; যাঁরা আমাকে ভালোবাসে—তাঁদেরকে ভালোবাসো; আর আমার দাসদের নিকট আমাকে প্রিয় করে তোলো।"
দাউদ (আলাইহিস সালাম) বললেন, “يَا رَبِّ كَيْفَ هَذَا أُحِبُّكَ وَأُحِبُّ مَنْ يُحِبُّكَ فَكَيْفَ أُحَبِّبُكَ إِلَى عِبَادِكَ হে আমার রব! এটি কীভাবে? আমি তোমাকে ভালোবাসবো, যাঁরা তোমাকে ভালোবাসে—তাঁদেরকেও ভালোবাসবো, কিন্তু তোমার দাসদের নিকট তোমাকে কীভাবে প্রিয় করে তোলবো?"
আল্লাহ বললেন, “تَذْكُرُنِي فَلَا تَذْكُرُ إِلَّا حُسْنًا আমার কথা উল্লেখ করার সময় সর্বদা সুন্দরভাবে উল্লেখ করবে।"'
আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করতে পারাও আল্লাহর দেওয়া আরেকটি নিয়ামাত
[৩৪১] মাসলামা (রহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, 'দাউদ (আলাইহিস সালাম)
বলেন,
إِنِّي كَيْفَ لِي أَنْ أَشْكُرَكَ وَأَنَا لَا أُصِلُ إِلَى شُكْرِكَ إِلَّا بِنِعْمَتِكَ
“হে আমার ইলাহ! আমি কীভাবে তোমার [অনুগ্রহের জন্য] কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করবো? [কারণ] আমি যে তোমার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করবো—সেটিও তো তোমার অনুগ্রহ!”
এর প্রেক্ষিতে আল্লাহ তাঁর নিকট ওহি প্রেরণ করেন, “يَا دَاوُوْدُ أَلَسْتَ تَعْلَمُ أَنَّ الَّذِي بِكَ مِنَ النَّعَمِ مِنِّي দাউদ! তুমি কি জানো না—তোমার জীবনের সকল অনুগ্রহ আমার দেওয়া?”
তিনি বললেন, "بَلَى أَيْ رَبِّ অবশ্যই, হে আমার রব!”
আল্লাহ বলেন, “فَإِنِّي أَرْضَى بِذَلِكَ مِنْكَ شُكْرًا তাহলে তোমার এটুকু কৃতজ্ঞতা প্রকাশেই আমি সন্তুষ্ট।"'
কোনো পাপই আল্লাহর নিকট এতো বিশাল নয় যে তিনি তা ক্ষমা কিংবা উপেক্ষা করতে পারবেন না
[৩৪২] আবুল জাল্ল্দ (রহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, 'আল্লাহ তাআলা দাউদ (আলাইহিস সালাম)-এর নিকট ওহি প্রেরণ করেন,
يَا دَاوُوُدُ أَنْذِرْ عِبَادِيَ الصِّدِّيقِينَ فَلَا يُعْجَبْنَ بِأَنْفُسِهِنَّ وَلَا يَتَّكِلْنَ عَلَى أَعْمَالِهِمْ لَيْسَ أَحَدٌ مِنْ عِبَادِي أَنْصُبُهُ لِلْحِسَابِ وَأُقِيمُ عَلَيْهِ عَدْلِيْ إِلَّا عَذَّبْتُهُ مِنْ غَيْرِ أَنْ أَظْلِمَهُ وَبَشِّرِ الْخَاطِئِينَ أَنَّهُ لَا يَتَعَاظَمُنِي ذَنْبٌ أَنْ أَغْفِرَهُ وَأَتَجَاوَزَ عَنْهُ
"দাউদ! আমার সিদ্দীক [সত্যপন্থী ও স্বভাবজাত ন্যায়নিষ্ঠ] দাসদেরকে সতর্ক করে দাও—তাঁরা যেন নিজেদের ব্যাপারে গৌরববোধ না করে এবং নিজেদের আমলের উপর নির্ভর না করে; [কারণ] আমার দাসদের মধ্যে এমন কেউ নেই—যাকে হিসেবের কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে ন্যায়বিচার করা হলে আমি শাস্তি দিতে পারবো না; তাকে শাস্তি দিলে আমার পক্ষ থেকে কোনো জুলুম হবে না। আর সুসংবাদ দাও ভুল-সম্পাদনকারী লোকদেরকে! কোনো পাপই আমার নিকট এতো বিশাল নয় যে আমি তা ক্ষমা কিংবা উপেক্ষা করতে পারবো না।"'
মানুষের সবচেয়ে বড় পাওয়া
[৩৪৩] আবুল জাল্ল্দ (রহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, 'দাউদ (আলাইহিস সালাম) এক আহ্বানকারীকে নির্দেশ দিলেন তিনি যেন লোকদেরকে জড়ো হওয়ার জন্য আহ্বান করেন। তিনি তাই করলেন। লোকজন বেরিয়ে এসে দেখতে পেল-উপদেশ, শিষ্টাচার ও দুআর জন্য একটি সমাবেশের আয়োজন চলছে। দাউদ (আলাইহিস সালাম) সভাস্থলে গিয়ে বললেন, “اَللَّهُمَّ اغْفِرْ لَنَا হে আল্লাহ! আমাদেরকে ক্ষমা করে দাও।" একথা বলে তিনি সেখান থেকে চলে আসেন। পেছনের সারির লোকেরা প্রথম সারির লোকদের নিকট এসে জিজ্ঞাসা করলো, 'এটি কী হলো?' তারা বললো-'আল্লাহ'র নবি (আলাইহিস সালাম) একটিমাত্র দুআ করে চলে গিয়েছেন! সুবহানাল্লাহ [আল্লাহ পবিত্র]! আমরা তো আশা করেছিলাম, আজকের দিনটি হবে ইবাদত, দুআ, উপদেশ ও শিষ্টাচার শিক্ষার দিন; অথচ তিনি মাত্র একটি দুআ করেছেন!' অতঃপর আল্লাহ তাঁর নিকট ওহি প্রেরণ করেন-
أَبْلِغْ عَنِّي قَوْمَكَ فَإِنَّهُمْ قَدْ اسْتَقَلُّوْا دُعَاءَكَ إِنِّي مَنْ أَغْفِرُ لَهُ أُصْلِحُ لَهُ أَمْرَ آخِرَتِهِ وَدُنْيَاهُ
"তোমার দুআটি তোমার জাতির লোকদের নিকট অল্প মনে হয়েছে। তাদেরকে আমার পক্ষ থেকে জানিয়ে দাও-আমি যাকে ক্ষমা করি, তার ইহকাল ও পরকালের বিষয়াদি ঠিক করে দিই।"'
সর্বশ্রেষ্ঠ প্রজ্ঞা হলো আল্লাহ তাআলার ভয়
[৩৪৪] খালিদ ইবনু সাবিত রুব্‌ঈ (রহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'দাউদ (আলাইহিস সালাম)-এর যাবূরের শুরুতে এ কথাটি রয়েছে-সর্বশ্রেষ্ঠ প্রজ্ঞা হলো আল্লাহ তাআলা'র ভয়।'
জুলুম করার সময় আল্লাহকে স্মরণ করতে নিষেধ করা হয়েছে
[৩৪৫] ইবনু আব্বাস (রদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, 'আল্লাহ তাআলা দাউদ (আলাইহিস সালাম)-এর নিকট ওহি পাঠিয়ে বলেন,
قُلْ لِلظُّلَمَةِ لَا يَذْكُرُونِي فَإِنَّ حَقًّا عَلَيَّ أَنْ أَذْكُرَ مَنْ ذَكَرَنِي وَإِنَّ ذِكْرِي إِيَّاهُمْ أَنْ أَلْعَنَهُمْ
“জালিমদেরকে বলে দাও—তারা যেন [জুলুম করার সময়] আমাকে স্মরণ না করে; কারণ যে আমাকে স্মরণ করে তাকে স্মরণ করা আমার দায়িত্ব; আর আমার পক্ষ থেকে তাদেরকে স্মরণ করার মানেই হলো তাদেরকে অভিসম্পাত দেওয়া।" [তুলনীয়: হাদীস নং ৩৬২]
মাসজিদে অবস্থান
[৩৪৬] আবুস সালিক (রহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'দাউদ (আলাইহিস সালাম) মাসজিদে ঢুকে দেখতেন—বানী ইসরাঈলের সবচেয়ে সাধারণ লোকেরা কোথায় বসেছে। তাদের সাথে বসে তিনি বলতেন, مسكين بَيْنَ ظِهْرَانِي مَسَاكِينَ [বসেছে]।"
আল্লাহর ভয়ে প্রকম্পিত লোকদেরকে আল্লাহ ক্ষমা করে দেন
[৩৪৭] আইয়ূব ফিলিস্তানি (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, দাউদ (আলাইহিস সালাম)-এর সুরের যন্ত্রসমূহে লিখা ছিল- "تَدْرِي لِمَنْ أَغْفِرُ مِنْ عِبَادِي তুমি কি জানো-আমার কোন কোন দাসকে আমি ক্ষমা করে দিবো?"
তিনি জিজ্ঞাসা করেন, "لِمَنْ يَا رَبُّ হে আমার রব! কাকে?"আল্লাহ বলেন, لِلَّذِي إِذَا أَذْنَبَ ذَنْبًا اِرْتَعَدَتْ لِذلِكَ مَفَاصِلُهُ ذَاكَ الَّذِي أَمْرُ مَلَائِكَتِي أَنْ لَا تَكْتُبَ عَلَيْهِ ذَلِكَ الذَّنْبَ
"ওই ব্যক্তিকে [আমি ক্ষমা করে দিবো]—পাপকাজ করার পর যার হাড়ের গ্রন্থিসমূহ [আমার ভয়ে] প্রকম্পিত হয়; ওই ব্যক্তির জন্য আমি ফেরেশতাদেরকে নির্দেশ দিই—তার আমলনামায় ওই পাপটি লিখবে না।"
জীবিকা
[৩৪৮] হিশাম ইবনু উরওয়া তাঁর পিতার সূত্রে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন, 'দাউদ (আলাইহিস সালাম) মিম্বরে বসে তালপাতা দিয়ে বড় বড় ঝুড়ি বানাতেন এবং সেগুলো বাজারে বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করতেন।' [তুলনীয়: হাদীস নং ৩৭৪]
হালাল উপার্জনকারী এক ব্যক্তি
[৩৪৯] তা'মা জাফারি (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'দাউদ (আলাইহিস সালাম) আল্লাহ তাআলা'র নিকট নিবেদন পেশ করেন যে তিনি দেখতে চান, দুনিয়াতে তাঁর মত আর কে আছে। ফলে আল্লাহ তাআলা তাঁর নিকট ওহি প্রেরণ করেন,
اِنْتِ قَرْيَةَ كَذَا فَانْظُرِ الَّذِي يَعْمَلُ بِكَذَا وَكَذَا فَإِنَّهُ قَرِيْنُكَ
"অমুক গ্রামে এসে ওই ব্যক্তিকে দেখো-যে এই এই কাজ করে; সে-ই তোমার সহচর।” তিনি ওই গ্রামে এসে উক্ত লোকের ব্যাপারে খোঁজ-খবর নেন। তাঁকে এমন একজন লোক দেখিয়ে দেওয়া হলো-যিনি বনে-জঙ্গলে গিয়ে কাঠ কেটে আঁটি বাঁধেন, তারপর বাজারে গিয়ে বলেন, 'পবিত্র জিনিস দিয়ে কে পবিত্র জিনিস কিনবে? আমি নিজের হাতে এগুলো কেটেছি এবং নিজের পিঠে বহন করে নিয়ে এসেছি।"'
তিনি ছিলেন অত্যন্ত ধৈর্যশীল ও সহিষ্ণু
[৩৫০] আবদুর রহমান ইবনু ইব্যি (রহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'দাউদ (আলাইহিস সালাম) ছিলেন সবচেয়ে ধৈর্যশীল ও সহিষ্ণু মানুষ; আর রাগ নিয়ন্ত্রণে তিনি ছিলেন সবচেয়ে পারঙ্গম।'
আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের জন্য কয়েকটি ভালো কাজ
[৩৫১] সাঈদ ইবনু আবদিল আযীয (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'নবি দাউদ (আলাইহিস সালাম) বলেন,
“رَبِّ كَيْفَ أَسْعَى لَكَ فِي الْأَرْضِ بِالنَّصِيْحَةِ হে আমার রব! পৃথিবীতে তোমার উদ্দেশ্যে আমি কীভাবে ভালো কাজ করতে পারি?"
تُكْثِرُ ذِكْرِي وَتُحِبُّ مَنْ أَحَبَّنِي مِنْ أَبْيَضَ وَأَسْوَدَ وَتَحْكُمُ لِلنَّاسِ كَمَا تَحْكُمُ لِنَفْسِكَ وَتَجْتَنِبُ فِرَاشَ الْغَيْبَةِ করবে; যে আমাকে ভালোবাসে তুমি তাকে ভালোবাসবে-হোক সে সাদা কিংবা কালো; মানুষের জন্য সেভাবে ফায়সালা করবে, যেভাবে তুমি নিজের জন্য করে থাকো; আর পরকীয়া এড়িয়ে চলবে।"'
সাহাবিদের সেবা
[৩৫২] সাঈদ ইবন আবী হিলাল (রহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, 'নবি দাউদ (আলাইহিস সালাম) [এমন ছদ্মবেশে] তাঁর সাহাবিদের সেবা-শুশ্রূষা করতেন যে তাদের মনে হতো ইনিও একজন রোগী। আল্লাহ তাআলা তাঁকে [নুবুওয়াতের মাধ্যমে] যেটুকু স্বাতন্ত্র্য দিয়েছেন সেটুকু ছাড়া তাঁর মধ্যে আর কোনো পার্থক্য পরিলক্ষিত হতো না।'
যেসব লোকের সাহচর্য কাম্য
[৩৫৩] কাইস ইবনু আব্বাদ (রহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, 'দাউদ (আলাইহিস সালাম) এভাবে দুআ করতেন, يَا مَارَّاهُ يَا رَبَّاهُ أَسْأَلُكَ جَلِيْسًا إِذَا ذَكَرْتُكَ أَعَانَنِي وَإِذَا نَسِيْتُكَ ذَكَرَنِي يَا مَارَّاهُ أَعُوذُ بِكَ مِنْ جَلِيْسٍ إِذَا ذَكَرْتُكَ لَمْ يُعِنِّي وَإِذَا نَسِيْتُكَ لَمْ يَذْكُرْنِي يَا مَارَّاهُ إِذَا مَرَرْتُ بِقَوْمٍ يَذْكُرُوْنَكَ فَأَرَدْتُ أَنْ أُجَاوِزَهُمْ فَاكْسِرُ رِجْلِيَ الَّتِي تَلِيْهِمْ حَتَّى أَجْلِسَ فَأَذْكُرَكَ مَعَهُمْ "হে আমার রব! আমি তোমার নিকট এমন সঙ্গী চাই-আমি তোমাকে স্মরণ করলে যে আমাকে সাহায্য করবে, আর তোমাকে ভুলে গেলে যে আমাকে স্মরণ করিয়ে দিবে। হে আমার রব! আমি তোমার নিকট এমন সঙ্গীর ব্যাপারে আশ্রয় চাই-আমি তোমাকে স্মরণ করলে যে আমাকে সাহায্য করবে না, আর তোমাকে ভুলে গেলে যে আমাকে স্মরণ করিয়ে দিবে না। হে আমার রব! তোমাকে স্মরণ করছে-এমন জনগোষ্ঠীর পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় আমার মনে যদি তাঁদেরকে উপেক্ষা করে এগিয়ে যাওয়ার বাসনা জাগে, তাহলে আমার পা ভেঙে দিও, যাতে তাঁদের সাথে বসে আমি তোমাকে স্মরণ করতে পারি।"
রোগমুক্ত দেহ ও নজরকাড়া সৌন্দর্য বিপজ্জনক
[৩৫৪] আবু সাঈদ মুআদ্দাব (রহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, 'নবি দাউদ (আলাইহিস সালাম) দুআ করেছেন,
"হে আল্লাহ! আমাকে সম্পূর্ণ রোগমুক্ত রেখো না, নজর-কাড়া সৌন্দর্য দিও না; অন্যথায় [আমার আশঙ্কা] আমি আমার জীবনকে বেপরোয়া করে তোলবো এবং তোমার অনুগ্রহের প্রতি অকৃতজ্ঞ হবো।"' [তুলনীয়: হাদীস নং ৩৫৬]
তাসবীহ
[৩৫৫] আবূ ইয়াযীদ (রহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'দাউদ (আলাইহিস সালাম) সালাত দীর্ঘায়িত করতেন এবং রুকূ শেষে মাথা তুলে বলতেন,
إِلَيْكَ رَفَعْتُ رَأْسِي يَا عَامِرَ السَّمَاءِ تَنْظُرُ الْعَبِيدُ إِلَى أَرْبَابِهَا يَا سَاكِنَ السَّمَاءِ
"হে আকাশের অধিপতি! তোমার দিকে মাথা উত্তোলন করলাম। হে আকাশে অবস্থানকারী! দাসেরা তাদের রবের দিকে তাকিয়ে আছে।"'
মধ্যম অবস্থা
[৩৫৬] হাসান (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'দাউদ (আলাইহিস সালাম) বলতেন,
اللَّهُمَّ لَا مَرَضًا يُضْنِينِي وَلَا صِحَّةٌ تُنْسِينِي وَلَكِنْ بَيْنَ ذَلِكَ
"হে আল্লাহ! এমন রোগ দিও না যা আমার শক্তি নিঃশেষ করে দিবে; আবার এমন সুস্থতা দিও না যার ফলে আমি তোমাকে ভুলে যাবো। এ দুয়ের মাঝামাঝি অবস্থা আমাকে দাও।” [তুলনীয়: হাদীস নং ৩৫৪]
প্রত্যেক জালিমের গৃহে আল্লাহর অভিসম্পাত
[৩৫৭] আবদুর রহমান ইবনু ইয়াযীদ ইবনি রবী (রহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'দাঊদ (আলাইহিস সালাম) দেখতে পেলেন-আকাশ থেকে একটি আগুনের কাঁচি পৃথিবীর দিকে আসছে।
তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, "يَا رَبِّ مَا هَذَا হে আমার রব! এটি কী?"
আল্লাহ বললেন, "هَذَا لَعْنَتِي أُدْخِلُهَا بَيْتَ كُلِّ ظَلَّامٍ এটি আমার অভিসম্পাত; প্রত্যেক জালিমের গৃহে আমি তা প্রবেশ করাবো।"'
দুনিয়াপ্রীতি দুর্বল লোকের কাজ
[৩৫৮] আবূ বাকর ইবনু আউন মাদীনি (রহিমাহুল্লাহ) বলেন-আমি আমার কতিপয় সঙ্গীকে বলতে শুনেছি, 'আল্লাহ তাআলা দাউদ (আলাইহিস সালাম)-এর নিকট এ মর্মে ওহি প্রেরণ করেছেন,
إِنَّمَا أَنْزَلْتُ الشَّهَوَاتِ فِي الْأَرْضِ عَلَى الضُّعَفَاءِ مِنْ عِبَادِي مَا لِلْأَبْطَالِ وَلَهَا
আমি তো আমার দুর্বল বান্দাদের জন্য দুনিয়াপ্রীতি নাযিল করেছি; বীরদের সাথে দুনিয়াপ্রীতির কী সম্পর্ক?"'
ইবাদাতের সময়সীমা
[৩৫৯] সাবিত (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'দিবা-রাত্রির সময়কে দাউদ (আলাইহিস সালাম) তাঁর পরিবারের লোকদের মধ্যে বণ্টন করে দিয়েছিলেন; ফলে রাতের বেলা কখনো এমন সময় অতিক্রান্ত হয়নি-যখন তাঁর পরিবারের কেউ না কেউ সালাতে দণ্ডায়মান থাকেনি। আল্লাহ তাআলা তাঁদের এ বিষয়টি নিম্নোক্ত আয়াতে অন্তর্ভুক্ত করেছেন-
"إِعْمَلُوا آلَ دَاوُوْدَ شُكْرًا وَقَلِيْلُ مِّنْ عِبَادِيَ الشَّكُوْرُ দাউদ পরিবার! কৃতজ্ঞ হও; আমার দাসদের অল্প অংশই কৃতজ্ঞ।" (সূরা সাবা ৩৪:১৩)।'
মুসিবতের নেপথ্যকারণ
[৩৬০] আবদুল আযীয ইবনু সুহাইব (রহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'দাউদ (আলাইহিস সালাম)-এর একটি দুআ ছিল এ রকম-
سُبْحَانَ اللَّهِ مُسْتَخْرِجَ الشُّكْرِ بِالْعَطَاءِ وَمُسْتَخْرِجَ الدُّعَاءِ بِالْبَلَاءِ
"আমি আল্লাহ'র পবিত্রতা ঘোষণা করছি-যিনি দান করে [বান্দার নিকট থেকে] কৃতজ্ঞতা আদায় করান এবং বিপদ-মুসিবত দিয়ে প্রার্থনা আদায় করান।"'
আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উপায়
[৩৬১] আওযায়ি (রহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'আল্লাহ তাআলা দাউদ (আলাইহিস সালাম)-এর নিকট ওহি প্রেরণ করে বলেন,
يَا دَاوُوْدُ أَلَا أُعَلِّمُكَ عَمَلَيْنِ إِذَا عَمِلْتَ بِهِمَا أَلَّفْتُ بِهِمَا وُجُوهَ النَّاسِ إِلَيْكَ وَبَلَغْتَ بِهِمَا رِضَايَ "দাউদ! আমি কি তোমাকে এমন দুটি কাজ শেখাবো না-যা করার বিনিময়ে আমি লোকদের চেহারা তোমার দিকে ঝুঁকিয়ে দিবো, আর তুমি আমার সন্তুষ্টি লাভ করবে?"
তিনি বললেন, “بلی يَا رَبِّ অবশ্যই, হে আমার রব!"আল্লাহ তাআলা বলেন, أَحْتَجِرْ فِيْمَا بَيْنِي وَبَيْنَكَ بِالْوَرَعِ وَخَالِطِ النَّاسَ بِأَخْلَاقِهِمْ ভীতির মাধ্যমে তোমার ও আমার মধ্যকার বিষয়াবলিকে মজবুত করে তোলো, আর মানুষের স্বভাব-চরিত্র ও ব্যক্তিত্ব অনুযায়ী তাদের সাথে মেলামেশা করো।" জালিমরা যেন মাসজিদে না বসে
[৩৬২] মুহাম্মদ ইবনু জাহহাদা (রহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'আল্লাহ তাআলা দাউদ (আলাইহিস সালাম)-এর নিকট ওহি প্রেরণ করে বলেন, إِنَّهَ الظَّالِمِينَ عَنْ ذِكْرِي وَعَنْ قُعُودٍ فِي مَسَاجِدِي فَإِنِّي جَعَلْتُ نَفْسِي أَنَّ مَنْ ذَكَرَنِي ذَكَرْتُهُ وَأَنَّ الظَّالِمَ إِذَا ذَكَرَنِي لَعَنْتُهُ "জালিমদেরকে আমার স্মরণ ও আমার মাসজিদসমূহে বসা থেকে বারণ করো; কারণ আমি আমার নিজের জন্য নীতি ঠিক করেছি-যে আমাকে স্মরণ করবে, আমি তাকে স্মরণ করবো; আর জালিম যখন [জুলুম থেকে বিরত না হয়ে] আমাকে স্মরণ করবে, আমি তাকে অভিসম্পাত দিবো।" ' [তুলনীয়: হাদীস নং ৩৪৫]

📘 রাসুলের চোখে দুনিয়া > 📄 সুলাইমান (আলাইহিস সালাম) ও দুনিয়া

📄 সুলাইমান (আলাইহিস সালাম) ও দুনিয়া


তিনটি বিষয়ের চেয়ে অধিক উত্তম আর কিছুই নেই
[৩৬৩] ইবনু আবী নাজীহ (রহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'সুলাইমান ইবনু দাউদ (আলাইহিস সালাম) বলেছেন,
أُوتِيْنَا مَا أُوتِيَ النَّاسُ وَمَا لَمْ يُؤْتَوْا وَعُلَّمْنَا مَا عُلِّمَ النَّاسُ وَمَا لَمْ يُعَلِّمُوا فَلَمْ نَجِدُ شَيْئًا أَفْضَلَ مِنْ ثَلَاثِ كَلِمَاتٍ الْحِلْمُ فِي الْغَضَبِ وَالرِّضَا وَالْقَصْدُ فِي الْفَقْرِ وَالْغِنَى وَخَشْيَةُ اللَّهِ فِي السِّرِّ وَالْعَلَانِيَةِ
"মানুষকে যা দেওয়া হয়েছে, আর যা দেওয়া হয়নি—তা সবই আমাদেরকে দেওয়া হয়েছে। মানুষকে যা শেখানো হয়েছে, আর যা শেখানো হয়নি—তা সবই আমাদেরকে শেখানো হয়েছে। অতঃপর আমরা এ তিনটি বিষয়ের চেয়ে অধিক উত্তম আর কিছুই পাইনি—ক্রোধ ও সন্তোষ উভয়াবস্থায় ধৈর্যধারণ; দারিদ্র্য ও প্রাচুর্য উভয় ক্ষেত্রে মিতব্যয়; এবং গোপন ও প্রকাশ্য সর্বাবস্থায় আল্লাহ'র ভয়।"'
বেঁচে থাকার জন্য স্বল্পতম জীবনোপকরণই যথেষ্ট
[৩৬৪] খাইসামা (রহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'সুলাইমান ইবনু দাউদ (আলাইহিস সালাম) বলেছেন,
جَرَّبْنَا الْعَيْشَ لَيْنَهُ وَشَدِيْدَهُ فَوَجَدْنَاهُ يَكْفِيْ مِنْهُ أَدْنَاهُ
"জীবনের কোমলতা ও রুক্ষতা—উভয়ের অভিজ্ঞতা রয়েছে আমাদের। অভিজ্ঞতার সারকথা হলো—বেঁচে থাকার জন্য স্বল্পতম জীবনোপকরণই যথেষ্ট।"'
তাসবীহের গুরুত্ব
[৩৬৫] ওয়াহাব ইবনু মুনাব্বিহ (রহিমাহুল্লাহ) তাঁর পিতার সূত্রে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন, 'সুলাইমান ইবনু দাউদ (আলাইহিস সালাম)-এর এক হাজার গৃহ ছিল; সর্বোৎকৃষ্ট গৃহটি ছিল কাচের তৈরি, আর একেবারে সাদামাটা ঘরটি ছিল লোহার তৈরি। [একদিন] তিনি বাতাসে চড়ে এক চাষির পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। চাষি তাঁকে দেখে [ঈর্ষার সুরে] বললো, 'দাউদ পরিবারকে বিশাল রাজত্ব দেওয়া হয়েছে!' বাতাস তার কথা সুলাইমান (আলাইহিস সালাম)-এর কানে পৌঁছে দেয়। তিনি সেখান থেকে নেমে চাষির কাছে এসে বললেন,
إِنِّي سَمِعْتُ قَوْلَكَ وَإِنَّمَا مَشَيْتُ إِلَيْكَ لِئَلَّا تَتَمَنَّى مَا لَا تَقْدِرُ عَلَيْهِ لَتَسْبِيحَةٌ وَاحِدَةً يَقْبَلُهَا اللهُ عَزَّ وَجَلَّ خَيْرٌ مِمَّا أُوتِيَ آلُ دَاوُوْدَ
"আমি তোমার কথা শুনে পায়ে হেঁটে তোমার কাছে আসলাম, যাতে তুমি এমন কিছু কামনা না করো-যা নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা তোমার নেই। আল্লাহ তাআলা গ্রহণ করেন এমন একটি তাসবীহ [প্রশংসা-বাণী] সেসবের চেয়ে অধিক উত্তম-যা দাউদ পরিবারকে দেওয়া হয়েছে!" চাষি বললো, 'আল্লাহ আপনার উদ্বেগ দূর করে দিন, যেভাবে আপনি আমার উদ্বেগ দূর করে দিয়েছেন!'"
কয়েকটি উপদেশ
[৩৬৬] ইয়াহইয়া ইবনু আবী কাসীর (রহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'সুলাইমান ইবনু দাউদ (আলাইহিস সালাম) তাঁর ছেলেকে [উপদেশ দিতে গিয়ে] বলেছেন,
يَا بُنَيَّ لَا تُكْثِرِ الْغَيْرَةَ عَلَى أَهْلِكَ فَتُرْى بِالسُّوْءِ مِنْ أَجْلِكَ وَإِنْ كَانَتْ بِرِينَةً يَا بُنَيَّ إِنَّ مِنَ الْحَيَاءِ ضِعْفًا وَمِنْهُ وَقَارُ اللهِ عَزَّ وَجَلَّ يَا بُنَيَّ إِنْ أَحْبَبْتَ أَنْ تُغِيظَ عَدُوَّكَ فَلَا تَرْفَعِ الْعَصَا عَنْ إِبْنِكَ يَا بُنَيَّ كَمَا يَدْخُلُ الْوَتَدُ بَيْنَ الْحَجَرَيْنِ وَكَمَا تَدْخُلُ الْحَيَّةُ بَيْنَ الْحَجَرَيْنِ فَكَذَلِكَ تَدْخُلُ الْخَطِيئَةُ بَيْنَ الْبَيِّعَيْنِ
"ছেলে আমার! তোমার পরিবারের লোকদের উপর মাত্রাতিরিক্ত নজরদারি করবে না, অন্যথায় নির্দোষ হওয়া সত্ত্বেও তোমার [মাত্রাতিরিক্ত নজরদারির] কারণে তারা অপবাদের শিকার হতে পারে। ছেলে আমার!
লজ্জাশীলতার মধ্যে বহু উপকার রয়েছে; তন্মধ্যে একটি হলো—আল্লাহ তাআলা'র নিকট সম্মান লাভ। ছেলে আমার! তোমার শত্রুকে ক্রোধান্বিত রাখতে চাইলে, তোমার ছেলের উপর থেকে [শাসনের] লাঠি সরাবে না। ছেলে আমার! দুটি পাথরের মাঝে যেভাবে পেরেক ঢুকে যায়, এবং দুটি পাথরের মাঝে যেভাবে সাপ ঢুকে পড়ে, ঠিক তেমনিভাবে ক্রেতা-বিক্রেতার মাঝখানে পাপ ঢুকে পড়ে।"
ব্যবসায়ীদের নাজাত
[৩৬৭] কাতাদা (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'নবি সুলাইমান (আলাইহিস সালাম) বলেছেন,
عَجَبًا لِتَاجِرٍ كَيْفَ يَخْلُصُ يَحْلِفُ بِالنَّهَارِ وَيَنَامُ بِاللَّيْلِ
"ব্যবসায়ী কী আজব ব্যক্তি! [কিয়ামতের দিন] সে মুক্তি পাবে কীভাবে? সে তো দিনের বেলা [গ্রাহকের সামনে] কসম খায়, আর রাতটুকু ঘুমে কাটায়!"'
নারীর ফিতনা
[৩৬৮] মালিক (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'সুলাইমান ইবনু দাউদ (আলাইহিস সালাম) তাঁর ছেলেকে [উপদেশ দিতে গিয়ে] বলেছেন,
إِمْشِ وَرَاءَ الْأَسَدِ وَالأَسْوَدِ وَلَا تَمْشِ وَرَاءَ إِمْرَأَةٍ
"সিংহ ও কালো সাপের পিছু নিও; কিন্তু নারীর পিছু নিও না।"'
দুনিয়া থেকে সবচেয়ে নিকটে হলো আখিরাত
[৩৬৯] বাকর ইবনু আবদিল্লাহ (রহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, 'দাউদ (আলাইহিস সালাম) সুলাইমান (আলাইহিস সালাম)-কে জিজ্ঞাসা করেন,
أَيُّ شَيْءٍ أَبْرَدُ وَأَيُّ شَيْءٍ أَحْلَى وَأَيُّ شَيْءٍ أَقْرَبُ وَأَيُّ شَيْءٍ أَبْعَدُ وَأَيُّ شَيْءٍ أَقَلُّ وَأَيُّ شَيْءٍ أَكْثَرُ وَأَيُّ شَيْءٍ آنَسُ وَأَيُّ شَيْءٍ أَوْحَشُ
"কোন্ বস্তু সবচেয়ে শীতল? কোন বস্তু সবচেয়ে মিষ্টি? কোন বস্তু সবচেয়ে নিকটে? কোন বস্তু সবচেয়ে দূরে? কোন বস্তু পরিমাণে সবচেয়ে কম?
কোন বস্তু পরিমাণে সবচেয়ে বেশি? কোন বস্তু সবচেয়ে বেশি প্রিয়? আর কোন বস্তু সবচেয়ে রুক্ষ?" জবাবে তিনি বলেন,
أَحْلَى شَيْءٍ رُوْحُ اللهِ بَيْنَ عِبَادِهِ وَأَبْرَدُ شَيْءٍ عَفْوُ اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ عَنْ عِبَادِهِ وَعَفْوُ الْعِبَادِ بَعْضِهِمْ عَنْ بَعْضٍ وَآنَسُ شَيْءٍ الرُّوْحُ تَكُوْنُ فِي الْجَسَدِ وَأَوْحَشُ شَيْءٍ الْجَسَدُ تُنْزَعُ مِنْهُ الرُّوْحُ وَأَقَلُّ شَيْءٍ الْيَقِينُ وَأَكْثَرُ شَيْءٍ الشَّكُ وَأَقْرَبُ شَيْءٍ الْآخِرَةُ مِنَ الدُّنْيَا وَأَبْعَدُ شَيْءٍ الدُّنْيَا مِنَ الْآخِرَةِ
"সবচেয়ে মিষ্টি হলো বান্দাদের মধ্যে আল্লাহ'র রূহ। সবচেয়ে শীতল হলো আল্লাহ তাআলা কর্তৃক মানুষকে ক্ষমা করা ও মানুষের একে অপরকে ক্ষমা করে দেওয়া। সবচেয়ে প্রিয় হলো দেহের মধ্যে রূহ; আর সবচেয়ে রুক্ষ হলো দেহ থেকে রূহ টেনে-হিঁচড়ে বের করে নেওয়া। পরিমাণে সবচেয়ে কম হলো দৃঢ় বিশ্বাস, আর পরিমাণে সবচেয়ে বেশি হলো সংশয়। দুনিয়া থেকে সবচেয়ে নিকটে হলো আখিরাত, আর সবচেয়ে দূরে হলো আখিরাত থেকে দুনিয়া।"'
আল্লাহর ভয় সবকিছুকে পরাজিত করে
[৩৭০] ইয়াহইয়া (রহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'সুলাইমান ইবনু দাউদ (আলাইহিস সালাম) তাঁর ছেলেকে [উপদেশ দিতে গিয়ে] বলেছেন,
“يَا بُيِّ إِنَّ مِنْ سَيِّءِ الْعَيْشِ النُّقْلَةُ ছেলে আমার! জীবনের একটি খারাপ দিক হলো-এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় স্থানান্তরিত হওয়া।"
তারপর তিনি বলেন, “عَلَيْكَ بِخَشْيَةِ اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ فَإِنَّهَا غَلَبَتْ كُلَّ شَيْءٍ আল্লাহ তাআলা-কে ভয় করে চলো; কারণ আল্লাহ'র ভয় সবকিছুকে পরাজিত করে।"'
যার মৃত্যু যেখানে নির্ধারিত তাকে সেখানে যেতেই হবে
[৩৭১] সাহর ইবনু হাওশাব (রহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'মৃত্যুর ফেরেশতা সুলাইমান (আলাইহিস সালাম)-এর কক্ষে ঢুকে বৈঠকে উপবিষ্ট এক ব্যক্তির দিকে দীর্ঘক্ষণ তাকিয়ে থাকেন। মৃত্যুর ফেরেশতা বেরিয়ে যাওয়ার পর লোকটি [সুলাইমান (আলাইহিস সালাম)-কে] জিজ্ঞাসা করে, 'ইনি কে?'
তিনি বললেন, “هَذَا مَلَكُ الْمَوْتِ عَلَيْهِ السَّلَامُ ইনি মৃত্যুর ফেরেশতা (আলাইহিস সালাম)।” সে বললো, 'আমি দেখলাম তিনি আমার দিকে তাকিয়ে আছেন, যেন আমাকেই চাচ্ছেন।'
সুলাইমান (আলাইহিস সালাম) জিজ্ঞাসা করলেন, “فَمَا تُرِيدُ তাহলে তুমি কী [করতে] চাচ্ছো?” সে বললো, 'আমি চাই—বাতাস আমাকে নিয়ে ভারতবর্ষে দিয়ে আসুক।' তিনি বাতাসকে ডাকলেন। অতঃপর বাতাস তাকে ভারতবর্ষে দিয়ে আসে।
তারপর মৃত্যুর ফেরেশতা সুলাইমান (আলাইহিস সালাম)-এর নিকট এলে তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, “إِنَّكَ كُنْتَ تُدِيمُ النَّظْرَ إِلى إِلَى رَجُلٍ مِنْ جُلَسَائي আমার বৈঠকে উপবিষ্ট এক ব্যক্তির দিকে আপনি দীর্ঘক্ষণ তাকিয়ে ছিলেন?”
ফেরেশতা বললেন, “كُنْتُ أَعْجَبُ مِنْهُ إِنِّي أُمِرْتُ أَنْ أَقْبِضَ رُوْحَهُ بِالْهِنْدِ তাকে দেখে আমি বিস্ময়ের ঘোরে ছিলাম; আমাকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে ভারতবর্ষে তার মৃত্যু ঘটানোর জন্য, অথচ সে আপনার এখানে বসে আছে!”'
যে তথ্যের ভিত্তিতে মৃত্যুর ফেরেশতা মানুষের মৃত্যু ঘটাতে আসেন।
[৩৭২] খাইসামা (রহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'মৃত্যুর ফেরেশতা সুলাইমান (আলাইহিস সালাম)-এর নিকট আসলেন। তিনি ছিলেন তাঁর বন্ধু। সুলাইমান (আলাইহিস সালাম) তাঁকে বললেন,
مَا لَكَ تَأْتِي أَهْلَ الْبَيْتِ فَتَقْبِضُهُمْ جَمِيعًا وَتَدَعُ أَهْلَ الْبَيْتِ إِلَى جَنْبِهِمْ لَا تَقْبِضُ مِنْهُمْ أَحَدًا
“আপনার অবস্থা এমন কেন? কখনো কখনো এসে এক ঘরের সবাইকে নিয়ে যান; অন্য ঘরের লোকদেরকে রেখে যান—তাদের একজনকেও নেন না!” তিনি বললেন,
مَا أَنَا بِأَعْلَمَ بِمَا أَقْبِضُ مِنْكَ إِنَّمَا أَكُوْنُ تَحْتَ الْعَرْشِ فَيُلْقَى إِلَيَّ صِكَاكَ فِيهَا أَسْمَاءُ
"আমি যাদের মৃত্যু ঘটাই তাদের সম্পর্কে আপনি যেটুকু জানেন, আমি
তার থেকে বেশি কিছু জানি না। আমি থাকি আরশের নিচে; আমার নিকট কিছু পাতা ফেলা হয়-যেখানে কিছু নাম লেখা থাকে।"'
আল্লাহর দাসত্ব ছেড়ে দেওয়া
[৩৭৩] ইয়াহইয়া ইবনু আবী কাসীর (রহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'সুলাইমান ইবনু দাঊদ (আলাইহিস সালাম) তাঁর ছেলেকে [উপদেশ দিতে গিয়ে] বলেছেন, أَيْ بُنَيَّ مَا أَقْبَحَ الْخَطِيئَةَ مَعَ الْمَسْكَنَةِ وَأَقْبَحَ الضَّلَالَةَ مَعَ الْهُدًى وَأَقْبَحَ كَذَا وَكَذَا وَأَقْبَحُ مِنْ ذَلِكَ رَجُلٌ كَانَ عَابِدًا فَتَرَكَ عِبَادَةَ رَبِّهِ "ছেলে আমার! দারিদ্র্যের মধ্যে থেকে পাপে লিপ্ত হওয়া কতো নিকৃষ্ট কাজ! কতো নিকৃষ্ট-হিদায়াত পাওয়া সত্ত্বেও গোমরাহিতে লিপ্ত হওয়া! অমুক অমুক কাজ কতো নিকৃষ্ট! কিন্তু তার চেয়েও অধিক নিকৃষ্ট সেই ব্যক্তি-যে একসময় তার রবের দাসত্ব করতো, কিন্তু এখন ছেড়ে দিয়েছে!"'
জীবিকা
[৩৭৪] ইবনু আতা (রহিমাহুল্লাহ) তাঁর পিতার সূত্রে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন, 'সুলাইমান (আলাইহিস সালাম) নিজ হাতে তালপাতার কাজ করতেন; খেজুর গুঁড়া করে যবের রুটির সাথে খেতেন এবং বানী ইসরাঈলের লোকদেরকে খাওয়াতেন।' [তুলনীয়: হাদীস নং ৩৪৮]
মানুষের বিরুদ্ধে কুৎসা রটানো তরবারির ধারের ন্যায় বিপজ্জনক
[৩৭৫] ইয়াহইয়া (রহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, সুলাইমান (আলাইহিস সালাম) তাঁর ছেলেকে [উপদেশ দিতে গিয়ে] বলেছেন, “يَا بُنَيَّ إِيَّاكَ وَالنَّمِيمَةَ فَإِنَّهَا كَحِدٌ السَّيْفِ ছেলে আমার! মানুষের বিরুদ্ধে কুৎসা রটানোর ব্যাপারে সাবধান! কারণ তা তরবারির ধারের ন্যায় [বিপজ্জনক]"
পিঁপড়ার দুআর বদৌলতে মানুষ বৃষ্টি পেলো
[৩৭৬] আবুস সিদ্দীক নাজি (রহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,
'[আল্লাহ'র নিকট] বৃষ্টি চাওয়ার উদ্দেশ্যে সুলাইমান ইবনু দাঊদ (আলাইহিস সালাম) লোকদেরকে নিয়ে বের হন। পথ চলতে গিয়ে দেখলেন—একটি পিঁপড়া চিত হয়ে শুয়ে পাগুলো আকাশের দিকে তুলে ধরে বলছে,
اَللَّهُمَّ إِنَّا خَلْقٌ مِّنْ خَلْقِكَ لَيْسَ بِنَا غِنِّى عَنْ رِزْقِكَ فَإِمَّا أَنْ تُسْقِيَنَا وَإِمَّا أَنْ تُهْلِكْنَا
“হে আল্লাহ! আমরা তোমার সৃষ্টির অংশ। আমরা সবসময় তোমার দেওয়া জীবনোপকরণের উপর নির্ভরশীল। হয় তুমি আমাদেরকে পানি দাও, নতুবা ধ্বংস করে দাও।”
পিঁপড়ার কথা শুনে সুলাইমান (আলাইহিস সালাম) লোকদেরকে বললেন, فِقْدَ سُقِيْتُمْ بِدَعْوَةِ غَيْرِكُمْ "ফিরো আও! অন্যের দুআর বদৌলতে তোমাদের পানির বন্দোবস্ত হয়ে গিয়েছে!”
আল্লাহর নিকট তিনটি বিষয় কামনা
[৩৭৭] আবদুল্লাহ ইবনু আমর ইবনিল আস (রদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘আমি রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে বলতে শুনেছি,
إِنَّ سُلَيْمَانَ بْنَ دَاوُودَ عَلَيْهِ السَّلَامُ سَأَلَ اللهَ ثَلَاثًا فَأَعْطَاهُ إِثْنَتَيْنِ وَنَحْنُ نَرْجُو أَنْ تَكُوْنَ لَهُ الصَّالِقَةُ فَسَأَلَهُ حُكْمًا يُصَادِفُ حُكْمَهُ فَأَعْطَاهُ إِيَّاهُ وَسَأَلَهُ مُلْكًا لَّا يَنْبَغِي لِأَحَدٍ مِنْ بَعْدِهِ فَأَعْطَاهُ إِيَّاهُ وَسَأَلَهُ أَيُّمَا رَجُلٍ خَرَجَ مِنْ بَيْتِهِ لَا يُرِيدُ إِلَّا الصَّلَاةَ فِي هَذَا الْمَسْجِدِ خَرَجَ مِنْ خَطِيئَتِهِ مِثْلَ يَوْمٍ وَلَدَتْهُ أُمُّهُ فَنَحْنُ نَرْجُوْ أَنْ يَكُونَ اللَّهُ عَزَّ وَجَلَّ قَدْ أَعْطَاهُ إِيَّاهُ
"সুলাইমান ইবনু দাউদ (আলাইহিস সালাম) আল্লাহ'র নিকট তিনটি বিষয় চেয়েছিলেন; আল্লাহ তাঁকে দুটি দিয়েছেন, আমাদের মনে হয় তাঁকে তৃতীয়টিও দেওয়া হয়েছে। তিনি চেয়েছিলেন—এমন শাসন যা [ন্যায়পরায়ণতার দিক দিয়ে] আল্লাহ'র শাসনের অনুরূপ, আল্লাহ তাঁকে এটি দিয়েছেন; এমন রাজত্ব যা তাঁর পর আর কেউ লাভ করবে না, আল্লাহ তাঁকে এটিও দিয়েছেন; তিনি আল্লাহ'র নিকট চেয়েছিলেন—যে
ব্যক্তি নিছক এই মাসজিদে [অর্থাৎ বাইতুল মুকাদ্দাসে]। সালাত আদায়ের উদ্দেশ্যে ঘর থেকে বের হবে, সে যেন ওই দিনের ন্যায় পাপমুক্ত হয়ে যায়, যেদিন তার মা তাকে জন্ম দিয়েছিল; আমাদের মনে হয়, আল্লাহ তাঁকে এটিও দিয়েছেন।" ' [তুলনীয়: ইবনু মাজাহ, হাদীস নং ১৪০৮]

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00