📄 ইউসুফ (আলাইহিস সালাম) ও দুনিয়া
তাঁর শোকে মুহ্যমান পিতা
[২৭০] ইয়াহইয়া ইবনু সুলাইম (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'মৃত্যুর ফেরেশতার নিকট ইয়াকূব (আলাইহিস সালাম) ছিলেন দুনিয়াবাসীদের মধ্যে সবচেয়ে সম্মানিত ব্যক্তি। ইয়াকূব (আলাইহিস সালাম)-এর নিকট আসার জন্য মৃত্যুর ফেরেশতা (আলাইহিস সালাম) তাঁর মহামহিম রবের নিকট অনুমতি চাইলে তাঁকে অনুমতি দেওয়া হলো। তিনি ইয়াকূব (আলাইহিস সালাম)-এর নিকট আসলেন। ইয়াকূব (আলাইহিস সালাম) তাঁকে জিজ্ঞাসা করলেন,
يَا مَلَكَ الْمَوْتِ أَسْأَلُكَ بِالَّذِي خَلَقَكَ هَلْ قَبَضْتَ نَفْسَ يُوْسُفَ فِيْمَنْ قَبَضْتَ مِنَ النُّفُوسِ
"ওহে মৃত্যুর ফেরেশতা! আমি তোমাকে সেই সত্তার নামে জিজ্ঞাসা করছি—যিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন। তুমি যাদের মৃত্যু কার্যকর করেছো—তাদের মধ্যে কি ইউসুফ আছে?” তিনি বললেন, 'না।' মৃত্যুর ফেরেশতা [স্বপ্রণোদিত হয়ে] বললেন, 'ইয়াকূব! আমি কি আপনাকে কিছু বাক্য শেখাবো না?' ইয়াকূব (আলাইহিস সালাম) বললেন, “হাঁ অবশ্যই! কেন নয়!” তিনি বললেন, 'তাহলে বলুন,
يَا ذَا الْمَعْرُوْفِ الَّذِي لَا يَنْقَطِعُ أَبَدًا وَلَا يُحْصِيْهِ غَيْرُهُ
“ওহে কল্যাণের অধিপতি, অনন্ত, অসীম!” ইয়াকূব (আলাইহিস সালাম) সেই রাতে এ দুআ পড়তে থাকেন। প্রভাতের আগেই [ইউসুফ (আলাইহিস সালাম)-এর] জামা তাঁর চেহারার উপর নিক্ষেপ করা হয়; আর অমনিই তিনি দৃষ্টিশক্তি ফিরে পান।'
কারাগার থেকে মুক্তি লাভের দু'আ
[২৭১] আবু আবদিল্লাহ (রহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'জিবরাঈল (আলাইহিস সালাম) ইউসুফ (আলাইহিস সালাম) এর নিকট এসে জিজ্ঞাসা করলেন, 'কারাবাস কি আপনার জন্য কষ্টকর হয়ে উঠেছে?' তিনি বললেন, "হ্যাঁ!" জিবরাঈল (আলাইহিস সালাম) বললেন, তাহলে আল্লাহকে। বলুন,
اللهم اجْعَل لِي مِنْ كُلِّ مَا أَهَمَّنِي وَكَرَبَنِي مِنْ أَمْرِ دُنْيَايَ وَأَمْرِ آخِرَتِي فَرِجًا وَمَخْرَجًا وَارْزُقْنِي مِنْ حَيْثُ لَا أَحْتَسِبُ وَاغْفِرْ لِي ذَنْبِي وَثَبِّتْ رَجَائِي وَاقْطَعْهُ عَمَّنْ سِوَاكَ حَتَّى لَا أَرْجُو أَحَدًا غَيْرَكَ
"হে আল্লাহ! আমার পার্থিব ও পরকালীন যেসব বিষয় আমাকে দুঃখ-দুর্দশার মধ্যে নিক্ষেপ করেছে—তার প্রত্যেকটি থেকে মুক্তি ও উত্তরণের রাস্তা বের করে দাও! আমার কল্পনার বাইরের উৎস থেকে আমাকে জীবনোপকরণ দাও! আমার গুনাহ ক্ষমা করো; আমার প্রত্যাশায় দৃঢ়তা দাও; তুমি ছাড়া প্রত্যাশার অন্যান্য উৎসগুলোকে ছিন্ন করে দাও—আমি যেন তোমাকে ছাড়া অন্য কাউকে প্রত্যাশা না করি।"
মানুষের কাছে সাহায্য কামনা করায় তাঁকে আরো দীর্ঘসময় জেলে থাকতে হলো
[২৭২] হাসান (রহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'আল্লাহ'র নবি (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,
رَحِمَ اللهُ يُوْسُفَ لَوْلَا كَلِمَتُهُ مَا لَبِثَ فِي السِّجْنِ طُوْلَ مَا لَبِثَ
"আল্লাহ ইউসুফের প্রতি সদয় হোন! তিনি একটি কথা না বললে এতো দীর্ঘ সময় তাঁকে জেলখানায় থাকতে হতো না।" কথাটি ছিল, [জেল থেকে মুক্তি লাভকারী এক কয়েদিকে তিনি বলেছিলেন,]
“اُذْكُرْنِي عِنْدَ رَبِّكَ তোমার মনিবের নিকট আমার বিষয়টি তুলে ধরো। (সূরা ইউসুফ ১২:৪২)"
অতঃপর হাসান (রহিমাহুল্লাহ) কাঁদতে কাঁদতে বলতে থাকেন, 'আর আমাদের দশা হলো—একটু বিপদ আসতেই আমরা তাড়াহুড়ো করে মানুষের শরণাপন্ন হই!'
ধৈর্যের পরাকাষ্ঠা
[২৭৩] হাসান (রহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'আল্লাহ'র নবি (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,
رَحِمَ اللَّهُ يُوسُفَ لَوْ أَنِّي جَاءَنِي الرَّسُولُ بَعْدَ طُولِ السِّجْنِ لأَسْرَعْتُ لِلإِجَابَةِ "আল্লাহ ইউসুফের প্রতি সদয় হোন! দীর্ঘ কারাভোগের পর [জেল থেকে মুক্তির বার্তা নিয়ে] বার্তাবাহক যদি স্বয়ং আমার নিকটও আসতো, তাহলে আমিও দ্রুত সাড়া দিতাম।"⁶
আয়ুষ্কাল
[২৭৪] হাসান (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'ইউসুফ (আলাইহিস সালাম)-কে যখন কুয়োয় নিক্ষেপ করা হয়, তখন তাঁর বয়স ছিল সতেরো। তারপর গোলামি, কারাবাস ও রাষ্ট্রশাসনে কেটেছে আশি বছর। সবকিছু গোছানোর পর তিনি বেঁচে ছিলেন তিপ্পান্ন বছর।'
মানুষের কাছে সাহায্য কামনা করায় আল্লাহ তাআলার তিরস্কার
[২৭৫] আনাস (রদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'আল্লাহ তাআলা ইউসুফ (আলাইহিস সালাম)-এর নিকট ওহির মাধ্যমে বললেন,
مَنْ اسْتَنْقَذَكَ مِنَ الْقَتْلِ إِذْ هَمَّ إِخْوَتُكَ أَنْ يَقْتُلُوكَ "তোমার ভাইয়েরা যখন তোমাকে হত্যা করতে চেয়েছিলো, তখন তোমাকে কে বাঁচিয়েছে?” ইউসুফ (আলাইহিস সালাম) বললেন, “أَنْتَ يَا رَبِّ হে আমার রব! তুমিই।” আল্লাহ বললেন, “فَمَنْ اسْتَنْقَذَكَ مِنَ الْجُبِّ إِذْ أَلْقَوْكَ فِيْهِ আচ্ছা! তারা যখন তোমাকে কুয়োয় নিক্ষেপ করেছিলো, তখন সেখান থেকে তোমাকে কে বাঁচিয়েছে?" ইউসুফ (আলাইহিস সালাম) বললেন, “أَنْتَ يَا رَبِّ হে আমার রব! তুমি।" আল্লাহ বললেন, “فَمَا لَكَ ذَكَرْتَ آدَمِيًّا وَنَسِيْتَنِي তাহলে তোমার কী হলো! [জেল থেকে মুক্তি
পাওয়ার জন্য] তুমি একজন মানুষকে স্মরণ করলে, আর আমাকে ভুলে গেলে?" [দ্রষ্টব্য: সূরা ইউসুফ ১২:৪২] ইউসুফ (আলাইহিস সালাম) বললেন, “كَلِمَةً تَكَلَّمَ بِهَا لِسَانِي এটি ছিল আমার মুখ থেকে উচ্চারিত একটি কথা।" আল্লাহ বললেন, “فَوَعِزَّتِي لَأُخْلِدَنَّكَ السِّجْنَ بِضْعَ سِنِينَ আমার সম্মানের শপথ! আমি তোমাকে [আরো] কয়েক বছর জেলখানায় রাখবো।"'
পুত্রশোকে পিতার কান্না
[২৭৬] হাসান (রহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ইউসুফ (আলাইহিস সালাম)-এর শোকে ইয়াকূব (আলাইহিস সালাম) আশি বছর কেঁদেছিলেন। অথচ তখন তিনি ছিলেন দুনিয়াবাসীদের মধ্যে আল্লাহ তাআলা'র নিকট সবচেয়ে সম্মানিত ব্যক্তি!'
স্বপ্ন ও স্বপ্নের প্রতিফলন
[২৭৭] হাসান (রহيمাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'ইউসুফ (আলাইহিস সালাম)-এর স্বপ্ন ও তার বাস্তব প্রতিফলনের মাঝখানে ব্যবধান ছিল আশি বছর।'
দুশ্চিন্তা ও গ্লানি মানুষের সামনে হতাশার সুরে ব্যক্ত করা অনুচিত
[২৭৮] হাবীব (রহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'এক ব্যক্তি আল্লাহ'র নবি ইয়া'কূব (আলাইহিস সালাম)-এর পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। তখন তাঁর ভ্রুসমূহ চক্ষুযুগলকে আচ্ছন্ন করে রেখেছিল; এক টুকরো ছিন্ন বস্ত্র দিয়ে তিনি ভ্রুগুলো তুলে ধরলেন। লোকটি জিজ্ঞাসা করলো, 'হে আল্লাহ'র নবি! আপনার কী হয়েছে? আমি কী দেখতে পাচ্ছি?' তিনি বললেন,
“طُوْلُ الزَّمَانِ وَكَثْرَةُ الْأَحْزَانِ [এর নেপথ্যে রয়েছে] সুদীর্ঘ সময় ও দুশ্চিন্তার আধিক্য!” এ কথার প্রেক্ষিতে আল্লাহ তাআলা তাঁর নিকট ওহি পাঠালেন, "یا يَعْقُوبُ تَشْكُوْنِي ইয়াকূব! তুমি কি আমার ব্যাপারে অভিযোগ করছো?” ইয়াকুব (আলাইহিস সালাম) বললেন, “رَبِّ خَطِيئَةٌ فَاغْفِرْهَا হে আমার রব! আমার ভুল হয়ে গেছে; ক্ষমা করে দাও।"
টিকাঃ
৬. এর মাধ্যমে নবি (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ইউসুফ (আলাইহিস সালাম)-এর ধৈর্যের প্রশংসা করেছেন। দীর্ঘ কারাভোগের পর জেল কর্তৃপক্ষ ইউসুফ (আলাইহিস সালাম)-এর মুক্তির বার্তা নিয়ে আসে। তিনি জেল থেকে না বেরিয়ে উলটো কর্তৃপক্ষের নিকট তাঁর নির্দোষ কারাবাসের কৈফিয়ত তলব করে বসেন! ফলে রাজা এ বিষয়ে একটি তদন্ত কমিশন গঠন করেন। কমিশনের তদন্তে ইউসুফ (আলাইহিস সালাম)-এর নির্দোষত্ব প্রমাণিত হওয়ার পর তিনি জেল থেকে বেরিয়ে আসেন। বিস্তারিত জানার জন্য দেখুন: সূরা ইউসুফ ১২:৫০-৫৪। [অনুবাদক]
📄 আইয়ূব (আলাইহিস সালাম) ও দুনিয়া
রোগের ব্যাপ্তি
[২৭৯] হাসান (রহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'আইয়ূব (আলাইহিস সালাম)-এর কেবল দু-চক্ষু, অন্তঃকরণ ও জিহ্বা সুস্থ ছিল; তাঁর দেহের বিভিন্ন জায়গায় পোকার উপদ্রব শুরু হয়েছিল। সাত বছরেরও বেশি সময় তিনি ভাগাড়ে ছিলেন।'' [তুলনীয়: হাদীস নং ২৮২; ২৮৩]
গায়ের গন্ধ পেয়ে কিছু লোকের বাজে মন্তব্য
[২৮০] আবদুল্লাহ ইবনু উবাইদ ইবনি উমাইর (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'আইয়ূব (আলাইহিস সালাম)-এর দু ভাই ছিলেন। একদিন তারা তাঁর নিকট এসে গন্ধ পেলেন। ফলে তারা মন্তব্য করে বসেন, 'আল্লাহ তাআলা যদি আইয়ূব-কে ভালো জানতেন, তাহলে তার এ দশা হতো না।' এ কথা শুনে আইয়ূব (আলাইহিস সালাম) অত্যন্ত কষ্ট পান। [আল্লাহ-কে উদ্দেশ্য করে] তিনি বলেন,
اللَّهُمَّ إِنْ كُنْتَ تَعْلَمُ أَنِّي لَمْ أَبِتْ لَيْلَةً شَبْعَانًا وَأَنَا أَعْلَمُ مَكَانَ جَائِعٍ فَصَدِّقْنِي
"হে আল্লাহ! তুমি যদি জানো, আমি পরিতৃপ্ত পেট নিয়ে কখনো রাত যাপন করিনি-আর ক্ষুধার্ত মানুষের অবস্থা আমি ভালো করেই জানি-তাহলে তুমি আমাকে সত্যায়ন করো।" দু ভাইকে শুনিয়ে আল্লাহ তাআলা তাঁর কথার সত্যায়ন করেন। তারপর আইয়ূব (আলাইহিস সালাম) বলেন,
اللَّهُمَّ إِنْ كُنْتَ تَعْلَمُ أَنِّي لَمْ أَلْبِسْ قَمِيصًا قَطُّ وَأَنَا أَعْلَمُ مَكَانَ عَارٍ فَصَدِّقْنِي
"হে আল্লাহ! তুমি যদি জানো, আমি শরীরের ঊর্ধ্বাঙ্গে কখনো জামা গাত্রের অন্যতম বর্ণনাকারী ইয়াযীদ এ বক্তব্যের বিশুদ্ধতার ব্যাপারে সন্দিহান। [অনুবাদক]
পরিনি—আর আমি ভালো করেই জানি খালি গায়ে থাকা মানুষের যাতনা কী—তাহলে তুমি আমাকে সত্যায়ন করো।" দু ভাইকে শুনিয়ে আল্লাহ তাআলা তাঁর কথার সত্যায়ন করেন।" এরপর তিনি সাজদায় লুটিয়ে পড়ে বলেন,
اللَّهُمَّ لَا أَرْفَعُ رَأْسِيْ حَتَّى يُكْشَفَ مَا بِيْ
"হে আল্লাহ! আমার দুর্দশা দূরীভূত না হওয়া পর্যন্ত আমি মাথা উত্তোলন করবো না।” পরিশেষে আল্লাহ তাআলা তাঁর দুর্দশা দূরীভূত করে দেন।'' [তুলনীয়: হাদীস নং ২৮৪]
সম্পদের ফিরিস্তি
[২৮১] ওয়াহাব ইবনু মুনাব্বিহ (রহিমাহুল্লাহ)-কে জিজ্ঞাসা করা হলো, 'আইয়ূব (আলাইহিস সালাম)-এর শরীয়ত কী ছিল?' তিনি বললেন, 'তাওহীদ [আল্লাহ তাআলা'র একত্ববাদ] ও নিজেদের মতপার্থক্যের সংশোধন। আল্লাহ'র নিকট তাঁদের কারো কোনো প্রয়োজন দেখা দিলে সে সাজদায় লুটিয়ে পড়ে [আল্লাহ'র নিকট] তা চাইতো। তাঁকে জিজ্ঞাসা করা হলো, 'তাঁর ধন-সম্পদ কী ছিল?' তিনি বললেন, 'তিন হাজার জোয়াল; প্রত্যেক জোয়ালের সাথে একজন দাস; প্রত্যেক দাসের সাথে একজন কর্মঠ দাসী; প্রত্যেক দাসীর সাথে একটি গাধী। আর ছিল চৌদ্দ হাজার ভেড়া। দরজার বাইরে মেহমান রেখে তিনি কখনো রাত্রিযাপন করেননি; এবং কোনো মিসকীন না নিয়ে কখনো খাবার খাননি।'
মুসিবতের সময়কাল
[২৮২] ওয়াহাব ইবনু মুনাব্বিহ (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'আইয়ূব (আলাইহিস সালাম) সাত বছর বিপদ-মুসিবতে নিপতিত ছিলেন।' [তুলনীয়: হাদীস নং ২৭৯; ২৮৩]
[২৮৩] সুলাইমান তাইমি (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'আইয়ূব (আলাইহিস সালাম) জনপদের ভাগাড়ে সাত বছর পড়ে ছিলেন।' [তুলনীয়: হাদীস নং ২৭৯; ২৮২]
ব্যাধি দেখে কিছু লোক তাঁকে পাপী সাব্যস্ত করে
[২৮৪] নাওফ বাক্কালি (রহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'আইয়ূব
(আলাইহিস সালাম) এর পাশ দিয়ে বনী ইসরাঈলের একদল লোক যাওয়ার সময় মন্তব্য করলো, 'নিশ্চয়ই বড় কোনো পাপের ফলে তার এই দশা হয়েছে!' তাদের এই মন্তব্য আইয়ূব (আলাইহিস সালাম) শুনে ফেলেন। তখনই তিনি [আল্লাহ তাআলা-কে উদ্দেশ্য করে] বলেন,
مَسَّنِيَ الضُّرُّ وَأَنْتَ أَرْحَمُ الرَّحِمِينَ "আমাকে বিপদ-মুসিবত স্পর্শ করেছে; আর তুমি তো সবচেয়ে বেশি দয়াবান!" [সূরা আল-আম্বিয়া ২১:৮৩] এ ঘটনার আগে তিনি [রোগমুক্তির] দুআ করেননি।' [তুলনীয়: হাদীস নং ২৮০]
ব্যাধির নেপথ্যকারণ
[২৮৫] ইবনু উয়াইনা (রহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'বিপদে আপতিত হওয়ার পর আইয়ূব (আলাইহিস সালাম) তাঁর সাহাবিদেরকে ডেকে এনে জিজ্ঞাসা করেন, “تَدْرُوْنَ لِأَيِّ شَيْءٍ أَصَابَنِي هذا؟ তোমরা কি জানো, আমার এ অবস্থা কেন হয়েছে?" তারা বললেন, 'আমাদের সামনে তো আপনার এমন কোনো বিষয় প্রকাশিত হয়নি [যদ্দরুন এরূপ হতে পারে], তবে হতে পারে আপনি কোনো কিছু গোপন রেখেছেন-যা আমাদের জানা নেই।' এ কথা বলে তারা তাঁর কাছ থেকে উঠে চলে যান। তারপর তাদের বাইরের এক জ্ঞানী ব্যক্তির সাথে সাক্ষাৎ হয়। তিনি জিজ্ঞাসা করেন, 'আল্লাহ'র নবি (আলাইহিস সালাম) তোমাদেরকে কেন ডেকেছিলেন?' তারা তাকে কারণ অবহিত করেন। তিনি বললেন, 'আমি তাকে বলবো, কেন তাঁর এ অবস্থা হয়েছে।' অতঃপর তিনি আইয়ূব (আলাইহিস সালাম)-এর নিকট আসেন। আইয়ূব (আলাইহিস সালাম) [কারণ] জানতে চাইলে তিনি বললেন, 'আপনি একবার পানীয় পান করে 'আল-হামদু লিল্লাহ' বলেননি, অনুগ্রহের জন্য কৃতজ্ঞতাও প্রকাশ করেননি; আর সম্ভবত আপনি কোনো ছায়ায় আশ্রয় নিয়েছিলেন, কিন্তু ওই অনুগ্রহের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেননি।'
রোগমুক্তির পর প্রাচুর্য
[২৮৬] বাকর (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'আল্লাহ তাআলা আইয়ূব (আলাইহিস সালাম)-কে সুস্থতা দেওয়ার পর তাঁর উপর বৃষ্টির মতো করে স্বর্ণের পঙ্গপাল বর্ষণ
কবেন। আইয়ূব (আলাইহিস সালাম) ৩। কা۹۴۴۹۰۱۱
হখন তাঁকে থেকে বলা হলো, "الان با ألوان ألم ألمان ألم شع ম কি তোমাকে প্রাচুর্য দিষ্টান তুমি কি পবিং গু হর্ননি।"
তখন আইয়ূব (আলাইহিস সালাম) বললেন, "با رت و من بشع من فضلك হে আমার বব! তোমার অনুগ্রহ লাভ কবে কে পরিতৃপ্ত হতে পারে!"
কঠিন দিনগুলোতে তাঁর স্ত্রীর অবদান ও ঈর্ষান্বিত শয়তানের কূটকৌশল
[২৮৭] আবদুর রহমান ইবনু জুবাইর (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'নবি আইয়ূব (আলাইহিস সালাম)-কে যখন তাঁর সম্পদ, সন্তান-সন্ততি ও দেহের ক্ষতির মাধ্যমে পরীক্ষা করা হলো, তখন তাঁকে ভাগাড়ে রেখে দেওয়া হলো। তাঁর স্ত্রী বাইরে উপার্জন করে তাঁকে খাওয়াতেন। এ দৃশ্য দেখে শয়তানের মনে হিংসা জেগে ওঠে। যেসব রুটি ও গোশত বিক্রেতা আইয়ূব (আলাইহিস সালাম)-এর স্ত্রীকে দান করতেন, শয়তান সেসব লোকের নিকট এসে বলে, 'ওই যে মহিলাটি তোমাদের কাছে আসে, তাকে তাড়িয়ে দাও। সে তার স্বামীর সেবা-শুশ্রূষা করে ও নিজের হাতে তাকে স্পর্শ করে; ওর কারণে লোকেরা তোমাদের খাবারকে নোংরা মনে করে। ও তো দেখছি প্রায়ই তোমাদের এখানে আসে।' ফলে তারা আইয়ূব (আলাইহিস সালাম)-এর স্ত্রীকে নিকটে ঘেঁষতে না দিয়ে বলতো, 'দূরে থাকো। আমরা তোমাকে খাবার দিবো, তবে কাছে আসবে না।' আইয়ূব (আলাইহিস সালাম)-কে এ বিষয়ে অবহিত করলে, তিনি এর জন্য বলেন, 'আল-হামদু লিল্লাহ / সকল প্রশংসা কেবল আল্লাহর।' ঘর থেকে বের হলে আইয়ূব (আলাইহিস সালাম)-এর স্ত্রীর সাথে শয়তানের সাক্ষাৎ হতো; শয়তান এমন এক ব্যক্তির সুরত ধরে আসতো-যিনি আইয়ূব (আলাইহিস সালাম)-এর দুর্দশার জন্য অত্যন্ত পেরেশান বোধ করতেন। সে বললো, 'তোমার স্বামী কতো মহান! যা নাকচ করার তিনি তা নাকচ করে দিলেন। আল্লাহ'র শপথ! সে যদি মুখ দিয়ে কেবল একটি কথা উচ্চারণ করতো, তাহলে তার সকল দুর্দশা দূরীভূত করে দেওয়া হতো, আর ফিরিয়ে দেওয়া হতো তার সন্তান-সন্ততি ও ধন-সম্পদ।' স্ত্রী এসে আইয়ূব (আলাইহিস সালাম)-কে এ কথা জানালে তিনি বলেন,
لَقِيَكَ عَدُوٌّ اللهِ فَلَقَّنَكَ هَذَا الْكَلَامَ لَمَّا أَعْطَانَا اللَّهُ عَزَّ وَجَلَّ الْمَالَ وَالْوَلَدَ
مان به ورد، فنصر الذي له نكفر به لين أقامني الله عز وجل من .. من هذا لأحمدتك مائة جلدة
"তোমার সাথে আল্লাহ'র দুশমনের দেখা হয়েছে। সে তোমাকে এ কথা শিখিয়েছে। আল্লাহ তাআলা যখন আমাদেরকে ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি দিলেন, আমরা তখন তাঁর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করেছি; আব যখন তিনি তাঁর জিনিস নিয়ে নিলেন, আমরা এখন তাঁর অবাধ্য হবো? আল্লাহ তাআলা যদি আমাকে এই অসুস্থতা থেকে মুক্তি দেন, আমি তোমাকে এক শ'টি বেত্রাঘাত করবো।" এ কারণে আল্লাহ তাআলা বললেন,
وَخُذْ بِيَدِكَ ضِعْثًا فَاضْرِبْ بِهِ وَلَا تَحْنَتْ "একগুচ্ছ কাঠি হাতে নাও; তা দিয়ে তাকে [মৃদু] প্রহার করো, শপথ ভঙ্গ করো না।"' (সূরা সোয়াদ ৩৮:৪৪)'
শয়তানের উল্লাস
[২৮৮] তালহা (রদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'ইবলিস বললো,
مَا أَصَبْتُ مِنْ أَيُّوبَ شَيْئًا قَطُّ أَفْرَحُ بِهِ إِلَّا أَنِّي كُنْتُ إِذَا سَمِعْتُ أَنِيْنَهُ عَرَفْتُ أَنِّي قَدْ أَوْجَعْتُهُ
"আইয়ূব-এর কোনো ক্ষতি করে আমি কখনো খুশি হতে পারিনি; তবে আমি যখন তার যন্ত্রণার গোঙানি শুনলাম, তখন এই ভেবে খুশি হয়েছি-যাক, আমি তাকে কষ্ট দিতে পেরেছি!"'
যে-কোনো বিপদে তিনি যে দুআ করতেন
[২৮৯] হাসান (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'কোনো মুসিবতের মুখোমুখি হলেই আইয়ূব (আলাইহিস সালাম) বলতেন,
اللَّهُمَّ أَنْتَ أَخَذْتَ وَأَنْتَ أَعْطَيْتَ مَهُمَا تَبْقَى نَفْسِي أَحْمَدُكَ عَلَى حَسْبٍ بَلَائِكَ "হে আল্লাহ! তুমিই নাও, তুমিই দাও। আমার [দেহে] যতোদিন প্রাণ থাকে, ততোদিন আমি তোমার দেওয়া মুসিবত অনুযায়ী তোমার প্রশংসা
করে যাবো।"
ক্রোধ সংবরণ
[২৯০] আবদুর রহমান ইবনু ইয়্যি (রহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'আল্লাহ'র নবি দাউদ (আলাইহিস সালাম) বলেছেন,
كَانَ أَيُّوبُ أَصْبَرَ النَّاسِ وَأَحْلَمَ النَّاسِ وَأَكْظَمَ لِلْغَيْظِ
“আইয়ূব (আলাইহিস সালাম) ছিলেন সর্বাধিক ধৈর্যশীল ও সহনশীল মানুষ; আর ক্রোধ সংবরণ করার ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন সবচেয়ে পারঙ্গম।”
📄 ইউনুস (আলাইহিস সালাম) ও দুনিয়া
ভালো কাজ বিপদের সময় মানুষকে সুরক্ষা দেয়
[২৯১] ইবনু আবী আরুবা (রহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, 'আল্লাহ তাআলা'র বক্তব্য-
فَلَوْلَا أَنَّهُ كَانَ مِنَ الْمُسَبِّحِينَ لَلَبِثَ فِي بَطْنِهِ إِلَى يَوْمِ يَبْعَثُوْنَ "সে যদি আল্লাহ তাআলা'র প্রশংসা বর্ণনা না করতো, তাহলে তাঁকে পুনরুত্থান দিবস পর্যন্ত তিমি'র পেটে থাকতে হতো।” (সূরা আস-সাফ্ফাত ৩৭:১৪৩-১৪৪)-এর ব্যাখ্যায় কাতাদা (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'বিপদাপন্ন হওয়ার আগে তিনি দীর্ঘ সালাত আদায় করতেন [যার বদৌলতে তাঁকে মাছের পেট থেকে মুক্তি দেওয়া হয়েছে]।' তারপর তিনি একটি আরবি প্রবাদ উল্লেখ করেন-
إِنَّ الْعَمَلَ الصَّالِحَ يَرْفَعُ صَاحِبَهُ إِذَا عَثَرَ وَإِذَا صَرَعَ وُجِدَ مُتَّكِنًا "ভালো কাজ বিপদের সময় মানুষকে সুরক্ষা দেয়; তবে বিপদ কেটে গেলে মানুষ আবার অলস হয়ে যায়।"'
তিমির প্রতি আল্লাহ তাআলার নির্দেশ
[২৯২] মানসূর (রহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'আল্লাহ তাআলা'র বক্তব্য-
“فَنَادَى فِي الظُّلُمَاتِ বিপুল অন্ধকারের মধ্যে সে [আল্লাহকে] ডাকলো..." (সূরা আল-আম্বিয়া ২১:৮৭)
এব ব্যাখ্যায় সালিম ইবনু আবিল জা'দ (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'আল্লাহ তিমি কে নির্দেশনা দিয়েছিলেন 'তুমি তাঁর হাড় ও মাংসের কোনো ক্ষতিসাধন করবে না।' কিছুক্ষণ পর সেই তিমি কে আরেকটি তিমি গিলে ফেলে। ইউনুস (আলাইহিস সালাম) বিপুল অন্ধকারের মধ্যে আল্লাহ-কে ডাকতে থাকেন; বিপুল অন্ধকার হলো- [প্রথম] তিমি'র অন্ধকার, [তাব উপর]। আরেক তিমি'র অন্ধকার, ও [সর্বোপরি] সাগরের অন্ধকার।'
হাজ্জের সময় তিনি যেসব বাক্য উচ্চারণ করেছেন
[২৯৩] মুজাহিদ (রহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'সত্তরজন নবি বাইতুল্লাহ'র হাজ্জ করেছেন। তাঁদের মধ্যে একজন হলেন মূসা ইবনু ইমরান (আলাইহিস সালাম); তাঁর গায়ে ছিল দুটি কাতাওয়ানি' বস্ত্র। আরেকজন হলেন ইউনুস (আলাইহিস সালাম); [হাজ্জের সময়] তিনি বলেছিলেন, لَبَّيْكَ كَاشِفَ الْكَرْبِ لَبَّيْكَ "আমি হাজির, হে দুর্দশা দূরকারী! আমি হাজির।” [তুলনীয়: হাদীস নং ৩১৩]
শাস্তি অবধারিত দেখে তাঁর জাতির লোকেরা যেভাবে দুআ করেছিল
[২৯৪] আবুল জাল্দ (রহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'ইউনুস (আলাইহিস সালাম)-এর জাতির মাথার উপর শাস্তি এসে ঘন অন্ধকার রাত্রির টুকরোর ন্যায় বৃত্তাকারে ঘুরতে থাকে। এ অবস্থা দেখে তাদের বুদ্ধিমান লোকজন তাদের মধ্যে অবশিষ্ট এক বয়োবৃদ্ধ জ্ঞানী লোকের নিকট গিয়ে বললো, 'আমাদের [মাথার] উপর কী এসেছে—তা তো দেখতে পাচ্ছেন। এখন আমাদের পাঠ করার জন্য একটি দুআ শিখিয়ে দিন; হতে পারে [এ দুআর বদৌলতে] আল্লাহ তাআলা আমাদের উপর থেকে তাঁর শাস্তি প্রত্যাহার করে নেবেনা।' জ্ঞানী লোকটি বললেন, তাহলে তোমরা বলো, يَا حَيُّ حِيْنَ لَا حَيَّ وَيَا حَيُّ مُحْيِيَ الْمَوْتَى وَيَا حَيُّ لَا إِلَهَ إِلَّا أَنْتَ "হে চিরঞ্জীব! যখন কেউ ছিল না এবং যখন কেউ থাকবে না তখনো তুমিই চিরঞ্জীব। হে চিরঞ্জীব! তুমিই মৃতদেহে প্রাণ-সঞ্চার করো! হে চিরঞ্জীব! তুমি
ছায়ের কোনো ইলাহ নেই।' পরিশেষে আল্লাহ তাআলা তাদেরকে শাস্তি থেকে এহাই জানা
তিমির পেটে
[২৯৫] শাবি (রহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'এক ব্যক্তি তাঁর নিকট এসে বললেন-ইউনুস (আলাইহিস সালাম) তিমি'র পেটে চল্লিশ দিন ছিলেন। এ কথার প্রেক্ষিতে শা'বি বলেন, 'তিনি তো ছিলেন একদিনের চেয়েও কম সময়। দুপুরের আগে তিমি তাঁকে গলাধঃকরণ করে, আর সূর্যাস্তের আগে হাই তুলে; এ সময় ইউনুস (আলাইহিস সালাম) সূর্যের আলো দেখতে পেয়ে বলে ওঠেন,
لَا إِلَهَ إِلَّا أَنْتَ سُبْحَانَكَ إِنِّي كُنْتُ مِنَ الظَّالِمِينَ "তুমি ছাড়া কোনো ইলাহ নেই; তুমি পবিত্র; আমি তো জুলুমকারীদের অন্যতম।” (সূরা আল-আম্বিয়া ২১:৮৭) এরপর তিমি তাঁকে [তীরে] নিক্ষেপ করে। ততোক্ষণে তাঁর দেহ পাখির ছানার ন্যায় হয়ে গিয়েছে।' এক ব্যক্তি বলে উঠলো, 'আপনি কি আল্লাহ তাআলা'র অপার ক্ষমতাকে অস্বীকার করছেন?' শা'বি (রহিমাহুল্লাহ) বললেন, 'আল্লাহ তাআলা'র অপার ক্ষমতাকে অস্বীকার করছি না; আল্লাহ তাআলা তিমি'র পেটে একটি বাজার বানাতে চাইলে তাও করতে পারতেন।
তিমির পেটে অবস্থানের সময়সীমা
[২৯৬] আবূ মালিক (রহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'ইউনুস (আলাইহিস সালাম) তিমি'র পেটে চল্লিশ দিন ছিলেন।'
📄 মূসা (আলাইহিস সালাম) ও দুনিয়া
কিছু উপদেশ
[২৯৭] ওয়াহাব ইবনু মুনাব্বিহ (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'পিদর (আলাইহিস সালাম) মুসা (আলাইহিস সালাম)-কে বলেছিলেন,
يَا مُوسَى بْنَ عِمْرَانَ إِنْزَعْ عَنِ النَّجَاجَةِ وَلَا تَمْشِ فِي غَيْرِ حَاجَةٍ وَلَا تَضْحَكْ مِنْ غَيْرِ عَجَبٍ وَأَلْزِمْ بَيْتَكَ وَابْكِ عَلَى خَطِيئَتِكَ "মূসা ইবনু ইমরান! জেদ থেকে বের হয়ে এসো; বিনা প্রয়োজনে হাঁটাহাঁটি কোরো না; আজব জিনিস ছাড়া অন্য কিছুতে হেসো না; গৃহে অবস্থান করো; আর নিজের ভুল-ভ্রান্তির জন্য কাঁদো।"'
পার্থিব চাকচিক্যের তাৎপর্য
[২৯৮] ইবনু আব্বাস (রদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'আল্লাহ তা'আলা মূসা ও হারুন (আলাইহিস সালাম)-কে ফিরআউনের নিকট প্রেরণ করার সময় বলেছিলেন,
لَا يَغُرَّكُمَا لِبَاسُهُ الَّذِي أَلْبَسْتُهُ فَإِنَّ نَاصِيَتَهُ بِيَدِي وَلَا يَنْطِقُ وَلَا يَعْرِفُ إِلَّا بِإِذْنِي وَلَا يَغُرَّكُمَا مَا مُتَّعَ بِهِ مِنْ زَهْرَةِ الدُّنْيَا وَزِينَةِ الْمُتْرَفَيْنَ وَلَوْ شِئْتُ أَنْ أُزَيْنَكُمَا مِنْ زِينَةِ الدُّنْيَا بِشَيْءٍ يَعْرِفُ فِرْعَوْنُ أَنَّ قُدْرَتَهُ تَعْجَزُ عَنْ ذَلِكَ لَفَعَلْتُ وَلَيْسَ ذَلِكَ لِهَوَانٍ بِكُمَا عَلَيَّ وَلَكِنْ أَلْبِسُكُمَا نَصِيبَكُمَا مِنَ الْكَرَامَةِ عَلَى أَنْ لَا تَنْقُصَكُمَا الدُّنْيَا شَيْئًا وَإِنِّي لَأَدُوْدُ أَوْلِيَائِي عَنِ الدُّنْيَا كَمَا يَدُودُ الرَّاعِي إِبْلَهُ عَنْ مَبَارِكِ الْعُرَّةِ وَإِنِّي لَأَجْنِبُهُمْ كَمَا يُجْنِبُ الرَّاعِي إِبِلَهُ عَنْ مَرَاتِعِ الْهَلَكَةِ
أُرِيدُ أَنْ أُنَوِّرَ بِذَلِكَ مَرَاتِبَهُمْ وَأُطَهِّرَ بِذلِكَ قُلُوبَهُمْ فِي سِيْمَاهُمُ الَّذِي يُعْرَفُوْنَ بِهِ وَأَمْرُهُمُ الَّذِي يَفْتَخِرُوْنَ بِهِ وَاعْلَمْ أَنَّ مَنْ أَخَافَ لِي وَلِيًّا فَقَدْ بَارَزَنِي بِالْعَدَاوَةِ وَأَنَا الثَّائِرُ لِأَوْلِيَائِي يَوْمَ الْقِيَامَةِ
"আমি তাকে যে পোশাক পরিয়ে রেখেছি-তা দেখে তোমরা যেন ধাঁধায় না পড়ো; কারণ তার কপাল আমার হাতে; আমার অনুমতি ছাড়া সে কোনো কথা বলতে পারে না, চোখের পাতাও ফেলতে পারে না। দুনিয়ার সৌন্দর্য ও বিলাসী লোকদের চাকচিক্যের যেসব উপকরণ তাকে দেওয়া হয়েছে-তা দেখে তোমরা যেন বিভ্রান্ত না হও। আমি চাইলে দুনিয়ার চাকচিক্য দিয়ে তোমাদের দুজনকে এমনভাবে সৌন্দর্যমণ্ডিত করতাম- যা দেখে ফিরআউন বুঝতো যে এমন চাকচিক্য লাভ করার সামর্থ্য তার নেই। তোমাদেরকে এসব চাকচিক্য না দেওয়ার অর্থ এ নয় যে তোমরা দুজন আমার নিকট তুচ্ছ; বরং আমি তোমাদেরকে প্রাপ্য সম্মান এমনভাবে দিয়েছি যাতে দুনিয়ার ভোগ-বিলাস তোমাদের [পরকালীন পাওনাকে] কমিয়ে দিতে না পারে। পশুর বিষ্ঠা ও আবর্জনায় ভরপুর জায়গায় কোনো উট বিশ্রাম নিতে চাইলে রাখাল যেভাবে তার উটকে তাড়িয়ে অন্যদিকে নিয়ে যায়, তেমনিভাবে আমি আমার বন্ধুদেরকে দুনিয়ার ভোগ-বিলাস থেকে তাড়িয়ে দিবো; রাখাল যেভাবে তার উটকে ধ্বংসাত্মক চারণভূমি থেকে দূরে রাখে, আমিও সেভাবে আমার বন্ধুদেরকে দুনিয়ার চাকচিক্য থেকে দূরে রাখবো। এর মাধ্যমে আমি তাঁদের অবস্থানকে উজ্জ্বল করতে চাই, তাঁদের অন্তঃকরণসমূহকে পবিত্র রাখতে চাই। এটি তাঁদের চিহ্ন- যা দিয়ে তাঁদেরকে শনাক্ত করা যাবে, আর এটিই তাঁদের জন্য গৌরবের ব্যাপার। জেনে রাখো, যে ব্যক্তি আমার বন্ধুকে ভীত-সন্ত্রস্ত করে সে যেন আমার সাথে প্রকাশ্য শত্রুতায় লিপ্ত হলো; কিয়ামতের দিন আমি আমার বন্ধুদের পক্ষ থেকে প্রতিশোধ নিবো।” [তুলনীয়: হাদীস নং ৫৭]
আল্লাহ তাআলার কতিপয় আদেশ
[২৯৯] ওয়াহাব ইবনু মুনাব্বিহ (রহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, 'মূসা (আলাইহিস সালাম) আল্লাহ তাআলা-কে জিজ্ঞাসা করলেন,
“يَا رَبِّ بِمَا تَأْمُرُنِي হে আমার রব! তুমি আমাকে কোন কাজের আদেশ
দিচ্ছো?” আল্লাহ বললেন, “بِأَنْ لَا تُشْرِكَ بِي شَيْئًا তুমি আমার [সার্বভৌম ক্ষমতার] সাথে অন্য কিছুকে অংশীদার সাব্যস্ত করবে না।”তিনি বললেন, “وَبِمَهُ আর কোন কাজের? আল্লাহ বললেন, “وَبِرُّ وَالِدَيْكَ আর তোমার মায়ের সাথে সদাচরণ করবে।” তিনি বললেন, “وَبِمَهُ আর কোন কাজের?” আল্লাহ বললেন, “وَبِرُّ وَالِدَيْكَ আর তোমার মায়ের সাথে সদাচরণ করবে।” তিনি বললেন, “وَبِمَهُ আর কোন্ কাজের?” আল্লাহ বললেন, “وَبِرُّ وَالِدَيْكَ আর তোমার মায়ের সাথে সদাচরণ করবে।” [ওয়াহাব ইবনু মুনাব্বিহ বলেন,] পিতার সাথে সদাচরণের ফলে আয়ু বৃদ্ধি পায়; আর মায়ের সাথে সদাচরণের ফলে জীবনে দৃঢ়তা আসে।'
আল্লাহ তাআলা অনাদি ও অনন্ত
[৩০০] ওয়াহাব ইবনু মুনাব্বিহ (রহيمাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'মূসা (আলাইহিস সালাম) [আল্লাহ তাআলা-কে] বললেন, “يَا رَبِّ إِنَّهُمْ يَسْأَلُوْنَنِي كَيْفَ كَانَ بَدْؤُكَ হে আমার রব! তারা জানতে চায়— তোমার সূচনা কেমন করে হলো?” আল্লাহ বললেন, فَأَخْبِرُهُمْ أَنِّي الْكَائِنُ قَبْلَ كُلِّ شَيْءٍ وَالْمُكَوِّنُ لِكُلِّ شَيْءٍ وَالْكَائِنُ بَعْدَ كُلَّ شَيْءٍ তাহলে তাদেরকে জানিয়ে দাও—সবকিছুর পূর্বে আমি ছিলাম, সবকিছুকে আমিই সৃষ্টি করেছি, আবার সবকিছুর পর আমিই থাকবো।"'
কয়েকটি আমলের ফলে এক ব্যক্তি আরশের পাশে স্থান পেয়েছেন
[৩০১] আমর ইবনু মাইমূন (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'মূসা (আলাইহিস সালাম) এক ব্যক্তিকে আরশের পাশে দেখতে পান। লোকটির অবস্থান দেখে ঈর্ষান্বিত হয়ে তিনি তাঁর সম্পর্কে জানতে চান। ফেরেশতারা বললেন, 'তাঁর আমল সম্পর্কে আমরা আপনাকে অবহিত করছি—মানুষকে আল্লাহ তাআলা যেসব অনুগ্রহ দিয়েছেন তা দেখে তাঁর মধ্যে ঈর্ষাবোধ জাগে না; তিনি মানুষের সম্মানহানি করে বেড়ান না এবং পিতা-মাতার অবাধ্য হন না।' মূসা (আলাইহিস সালাম) বললেন, “أي رَبِّ وَمَنْ يَعْقُ وَالِدَيْهِ হে আমার রব! পিতা-মাতার অবাধ্য হয় আবার কে?” আল্লাহ বললেন, “يَسْتَسِبُّ لَهُمَا حَتَّى يَسُبَّانِ ওই ব্যক্তি—যে তার পিতা-মাতার জন্য গালি কুড়িয়ে আনে, পরিশেষে পিতা-মাতা [তাকে] অভিশাপ দেয়।"'
যিকরের পদ্ধতি
[৩০২] আবুল জাল্ল্দ (রহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'আল্লাহ তাআলা মূসা (আলাইহিস সালাম)-এর প্রতি ওহি নাযিল করে বলেন,
إِذَا ذَكَرْتَنِي فَاذْكُرْنِي وَأَنْتَ تَنْتَفِضُ أَعْضَاؤُكَ وَكُنْ عِنْدَ ذِكْرِي خَاشِعًا مُطْمَئِنَّا فَإِذَا ذَكَرْتَنِي فَاجْعَلْ لِسَانَكَ مِنْ وَرَاءِ قَلْبِكَ وَإِذَا قُمْتَ بَيْنَ يَدَيَّ فَقُمْ مَقَامَ الْعَبْدِ الْحَقِيرِ الدَّلِيلِ وَذُمَّ نَفْسَكَ فَهِيَ أَوْلَى بِالذَّمِّ وَنَاجِنِي حِينَ تُنَاجِيْنِي بِقَلْبٍ وَجِلٍ وَلِسَانٍ صَادِقٍ
"আমাকে স্মরণ করার সময় তোমার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গসমূহকে জাগ্রত রেখে স্মরণ করবে; সুস্থির-চিত্ত ও বিনয়াবনত হয়ে আমাকে স্মরণ করবে; আমাকে স্মরণ করার সময় তোমার জিহ্বাকে অন্তঃকরণের পশ্চাতে রাখবে; [১] আমার সামনে দাঁড়ানোর সময় নগণ্য দাসের ন্যায় দাঁড়াবে; তোমার প্রবৃত্তিকে তিরস্কার করবে-প্রবৃত্তিই হলো তিরস্কারের যথার্থ পাত্র; আর আমার সাথে চুপিসারে কথা বলার সময় ত্রস্ত মন ও সত্য মুখ নিয়ে কথা বলবে।"
আল্লাহ তাআলার নিয়ামাতের শুকরিয়া আদায় করাও আরেক নিয়ামত
[৩০৩] আবুল জাল্ল্দ (রহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'মূসা (আলাইহিস সালাম) বললেন,
إِلهِي كَيْفَ أَشْكُرُكَ وَأَصْغَرُ نِعْمَةٍ وَضَعْتَهَا عِنْدِي مِنْ نِعَمِكَ لَا يُجَازِي بِهَا عَمَلِي كُلَّهُ
"ইলাহ আমার! আমি কীভাবে তোমার শুকরিয়া আদায় করবো? তোমার অনুগ্রহরাজির মধ্য থেকে সবচেয়ে ছোট যে অনুগ্রহ তুমি আমাকে দিয়েছো, আমার সকল আমল জড়ো করলেও তো তার সমান হবে!"
এর প্রেক্ষিতে আল্লাহ তাআলা তাঁর নিকট ওহি পাঠিয়ে বললেন, "يَا مُوسى اَلْآنَ شَكَرْتَنِي মূসা! এতোক্ষণে তুমি আমার [অনুগ্রহের] শুকরিয়া আদায় করেছো।"'
একটি দুআ
[৩০৪] কাব আহবার (রহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, 'মূসা (আলাইহিস সালাম) তাঁর দুআর মধ্যে বলতেন,
اللَّهُمَّ أَلَن قَلْبِي بِالتَّوْبَةِ وَلَا تَجْعَلْ قَلْبِي قَاسِيًا كَالْحَجَرِ "হে আল্লাহ! আমার অন্তরকে তাওবার মাধ্যমে কোমল করে দাও; আমার অন্তরকে পাষাণসম রুক্ষ করে দিও না।"'
তাওবা করলে আল্লাহ তাআলা ক্ষমা করে দেন
[৩০৫] ওয়াহাব ইবনু মুনাব্বিহ (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'আল্লাহ তাআলা মূসা (আলাইহিস সালাম)-কে বললেন,
مُرْ قَوْمَكَ أَنْ يُنِيبُوا إِلَيَّ وَيَدْعُوْنِي فِي الْعَشْرِ فَإِذَا كَانَ الْيَوْمُ الْعَاشِرُ فَلْيَخْرُجُوا إِلَيَّ أَغْفِرْ لَهُمْ "তোমার জাতিকে নির্দেশ দাও—তারা যেন আমার দিকে ফিরে আসে এবং [যিলহাজ্জ মাসের প্রথম] দশ দিন আমাকে ডাকে, আর দশম দিন তারা যেন [ঘর থেকে] বেরিয়ে আমার দিকে আসে, তাহলে আমি তাদেরকে ক্ষমা করে দিবো।"'
কল্যাণময় জ্ঞানের বদৌলতে আল্লাহ তাআলা কবরের নিঃসঙ্গতা দূর করে দেন
[৩০৬] কাব আহবার (রহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'আল্লাহ তাআলা মূসা (আলাইহিস সালাম)-এর প্রতি ওহি নাযিল করে বলেন,
عَلْمِ الْخَيْرَ وَتَعَلَّمُهُ فَإِنِّي مُنَوِّرُ لِمُعَلِّمِ الخَيْرِ وَمُتَعَلِّمِهِ فِي قُبُورِهِمْ حَتَّى لَا يَسْتَوْحِشُوا لِمَكَانِهِمْ "কল্যাণময় [জ্ঞান] শেখো ও [অপরকে] শেখাও; কল্যাণময় জ্ঞান যারা শেখে ও শেখায় তাদের কবরকে আমি আলোকিত করে দিবো, ফলে তারা সেখানে একাকিত্ব বোধ করবে না।"'
সর্বাবস্থায় আল্লাহকে স্মরণ করার নির্দেশ
[৩০৭] কাব আহবার (রহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'মূসা (আলাইহিস সালাম) [আল্লাহ তাআলা-কে] বললেন, يَا رَبِّ أَقَرِيبٌ أَنْتَ فَأُنَاجِيْكَ أَوْ بَعِيْدُ فَأُنَادِيْكَ "হে আমার রব! তুমি কি কাছে? তাহলে আমি তোমাকে চুপিসারে ডাকবো। নাকি দূরে? তাহলে তোমাকে উচ্চ আওয়াজে ডাকবো।"
আল্লাহ তাআলা বললেন, يَا مُوسَى أَنَا جَلِيْسُ مَنْ ذَكَرَنِي "হে মুসা! যে আমাকে স্মরণ করে, আমি তার পাশেই থাকি।" মূসা (আলাইহিস সালাম) বললেন, يَا رَبِّ فَإِنَّا نَكُوْنُ مِنَ الْحَالِ عَلَى حَالٍ نَجِلُّكَ وَنُعَظِمُكَ أَنْ نَذْكَرَكَ "হে আমার রব! আমরা তো একেক সময় একেক অবস্থায় থাকি; কিছু কিছু সময় তোমার শ্রেষ্ঠত্বের কথা বিবেচনা করে তোমাকে স্মরণ করতে ভয় পাই।"
আল্লাহ তাআলা জিজ্ঞাসা করলেন, "وَمَا هِي কোন অবস্থার কথা বলছো?
মূসা (আলাইহিস সালাম) বললেন, “الْجَنَابَةُ وَالْغَائِطُ গোসল ফরজ হওয়ার অবস্থা ও প্রকৃতির ডাকে সাড়া দেওয়ার সময়।"
আল্লাহ তাআলা বললেন, “يَا مُوسَى أَذْكُرْنِي عَلَى كُلِّ حَالٍ মুসা! সর্বাবস্থায় আমাকে স্মরণ করো।"'
দুনিয়াতে ইনসাফের ঘাটতি সবচেয়ে বেশি
[৩০৮] কাতাদা (রহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, 'আল্লাহ'র নবি মূসা (আলাইহিস সালাম) [আল্লাহ তাআলা-কে] জিজ্ঞাসা করলেন, أَيْ رَبِّ أَيُّ شَيْءٍ وَضَعْتَ فِي الْأَرْضِ أَقَلَّ "হে আমার রব! তুমি দুনিয়াতে কোন জিনিস সবচেয়ে কম প্রতিষ্ঠা করেছো?"
আল্লাহ তাআলা বলেন, “الْعَدْلُ أَقَلُّ مَا وَضَعْتُ فِي الْأَرْضِ আমি দুনিয়াতে সবচেয়ে কম প্রতিষ্ঠা করেছি যে জিনিস-তা হলো ইনসাফ।"
দুআ সফল করার কার্যকর উপায়
[৩০৯] ইয়াহইয়া ইবনু সুলাইম তাইফি (রহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, 'মুসা (আলাইহিস সালাম) একটি প্রয়োজন পূরণের জন্য তাঁর মহান রবের নিকট নিবেদন পেশ করেন। দীর্ঘ সময় অতিক্রান্ত হয়ে যাওয়ার পরেও তিনি তাঁর কাঙ্ক্ষিত বিষয় পাননি। অবশেষে মূসা (আলাইহিস সালাম) বললেন, "مَا شَاءَ اللهُ [মা শা আল্লাহ!] আল্লাহ যা চান (তা-ই হয়)!" আর অমনি তিনি দেখতে পান—কাঙ্ক্ষিত বস্তুটি তাঁর সামনে হাজির! মূসা (আলাইহিস সালাম) বলে ওঠেন,
يَا رَبِّ أَنَا أَطْلُبُ حَاجَتِي مُنْذُ كَذَا وَكَذَا وَأَعْطَيْتَنِيْهَا الْآنَ
"হে আমার রব! আমি অমুক দিন থেকে এটি চাচ্ছি, আর তুমি কিনা এটি আমাকে এতোক্ষণে দিলে!"
আল্লাহ তাআলা তাঁর নিকট ওহি প্রেরণ করে বলেন,
يَا مُوسَى أَمَا عَلِمْتَ أَنَّ قَوْلَكَ مَا شَاءَ اللَّهُ أَنْجَحُ مَا طَلَبْتَ بِهِ الْحَوَائِجَ
"মূসা! তুমি কি জানো না, প্রয়োজন পূরণের জন্য সফলতম দুআ হলো مَا شَاءَ اللهُ [মা শা আল্লাহ,] আল্লাহ যা চান (তা-ই হয়!)?"
মা শা আল্লাহ এর মাহাত্ম্য
[৩১০] ইয়াহইয়া ইবনু সুলাইম তাইফি (রহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, 'শয়তানরা যখন চুরি করে [আকাশের ফেরেশতাদের আলোচনা] শোনার চেষ্টা করে, [১০]তখন ফেরেশতারা যে বাক্য বলে তাদেরকে তাড়িয়ে দেয় তা হলো— "مَا شَاءَ اللهُ [মাশা আল্লাহ!] আল্লাহ যা চান (তা-ই হয়)!"
কিছু উপদেশ
[৩১১] কাব ইবনু আলকামা (রহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'আল্লাহ'র নবি মূসা (আলাইহিস সালাম) ফিরআউনের কবল থেকে পালিয়ে গিয়ে বললেন, “يَا رَبِّ أَوْصِنِي হে আমার রব! আমাকে কিছু উপদেশ দাও।” আল্লাহ বললেন,
أُوْصِيْكَ أَنْ لَا تَعْدِلَ بِي شَيْئًا أَبَدًا إِلَّا اخْتَرْتُنِي عَلَيْهِ فَإِنِّي لَا أَرْحَمُ وَلَا أُزَكِّي مَنْ
[১০] দ্রষ্টব্য: সূরা আস-সাফফাত ৩৭:৬-১০। [অনুবাদক]
لَمْ يَكُنْ كَذٰلِكَ
"আমি তোমাকে উপদেশ দিচ্ছি—কোনো কিছুকে কখনো আমার সমকক্ষ বানাবে না: এটি যে মেনে চলবে না, আমি তার প্রতি কোনো দয়া দেখাবো না, তাকে পরিচ্ছন্নও করবো না।"
মূসা (আলাইহিস সালাম) বললেন, "وَبِمَا يَا رَبِّ হে আমার রব! আর কী?"
আল্লাহ বলেন, “بِأُمِّكَ فَإِنَّهَا حَمَلَتْكَ وَهُنًا عَلَىٰ وَهُنٍ তোমার মায়ের সাথে সদাচরণ করবে; কারণ সে বহু কষ্ট করে তোমাকে [গর্ভে] বহন করেছে।"
মূসা (আলাইহিস সালাম) বললেন, “ثُمَّ بِمَاذَا يَا رَبِّ হে আমার রব! তারপর কী?"
আল্লাহ বলেন, “ثُمَّ بِأَبِيكَ তারপর তোমার পিতার সাথে ভালো ব্যবহার করবে।"
মূসা (আলাইহিস সালাম) বললেন, "ثُمَّ بِمَاذَا তারপর কী?"
ثُمَّ أَنْ تُحِبَّ لِلنَّاسِ مَا تُحِبُّ لِنَفْسِكَ وَتَكْرَهَ لَهُمْ مَا تَكْرَهُ
“তারপর তুমি নিজের জন্য যা পছন্দ করো, মানুষের জন্য তা-ই পছন্দ করবে এবং নিজের জন্য যা অপছন্দ করো অপরের জন্য তা অপছন্দ করবে।"
মূসা (আলাইহিস সালাম) বললেন, "ثُمَّ بِمَاذَا يَا رَبِّ হে আমার রব! তারপর কী?” আল্লাহ বলেন,
إِنْ أَوْلَيْتُكَ شَيْئًا مِنْ أَمْرِ عِبَادِي فَلَا تُعَنِّهِمْ إِلَيْكَ فِي حَوَائِجِهِمْ فَإِنَّكَ إِنَّمَا تُعَنِّيْ رُوْحِيْ فَإِنِّي مُبْصِرُ وَمُسْتَمِعُ وَمُشْهِدُ وَمُسْتَشْهِدُ
"আমি যদি তোমাকে আমার বান্দাদের কোনো বিষয় দেখভাল করার দায়িত্ব দিই, তাহলে তাদের প্রয়োজন মেটাতে গিয়ে তাদেরকে নাজেহাল করবে না; কারণ এর মাধ্যমে মূলত আমার আত্মাকে কষ্ট দেওয়া হয়। আমি সবকিছু দেখি, মনোযোগ সহকারে শুনি; আমি [সবকিছুর] সাক্ষী রাখছি এবং [কিয়ামতের দিন] সাক্ষীদের তলব করবো।"'
আল্লাহ যেটুকু দিয়েছেন সেটুকুতে সন্তুষ্ট ব্যক্তিই সবচেয়ে ধনী
[৩১২] ইবনু আব্বাস (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘মুসা (আলাইহিস সালাম) বললেন,
يا رب أي عبادك أحب إليك “হে আমার রব! তোমার বান্দাদের মধ্যে তোমার নিকট সবচেয়ে প্রিয় কে?”
আল্লাহ বললেন, "أكثرهم لي ذكرا তাদের মধ্যে যে আমাকে বেশি স্মরণ করে।"
মূসা (আলাইহিস সালাম) জিজ্ঞাসা করলেন, "فَأَيُّ عِبَادِكَ أَغْنَى رَبِّ হে রব! তাহলে তোমার বান্দাদের মধ্যে সবচেয়ে ধনী কে?"
আল্লাহ বলেন, “الراضي بما أعطيته আমি যেটুকু দিয়েছি, সেটুকুতে যে সন্তুষ্ট থাকে।"
মূসা (আলাইহিস সালাম) জানতে চাইলেন, "رَبِّ أَيُّ عِبَادِكَ أَحْكَمُ হে আমার রব! তোমার বান্দাদের মধ্যে সবচেয়ে ভালো বিচারক কে?"
আল্লাহ বলেন, "الَّذِي يَحْكُمُ عَلَى نَفْسِهِ بِمَا يَحْكُمُ عَلَى النَّاسِ যে ব্যক্তি নিজের জন্য সেই ফায়সালা দেয়-যা সে অন্যের জন্য দিয়ে থাকে।"
বাইতুল্লাহ এর হাজ্জ
[৩১৩] মুজাহিদ (রহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘সত্তরজন নবি বাইতুল্লাহ'র হাজ্জ আদায় করেছেন। মূসা ইবনু ইমরান (আলাইহিস সালাম) তাঁদের অন্যতম। [হাজ্জের সময়] তাঁর গায়ে ছিল দুটি কাতওয়ানি বস্ত্র। তিনি ‘লাব্বাইক’ [আমি হাজির!] বললে পাহাড়সমূহ থেকে তার প্রতিধ্বনি আসতো।' [তুলনীয়: হাদীস নং ২৯৩]
কৃত্রিমতার উপর নিষেধাজ্ঞা
[৩১৪] আবূ ইমরান জুওয়ানি (রহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘মুসা (আলাইহিস সালাম) তাঁর জাতিকে উপদেশ দিচ্ছিলেন। এমন সময় শ্রোতাদের একজন নিজের জামা ছিঁড়ে ফেলেন। এর প্রেক্ষিতে মূসা (আলাইহিস সালাম)-কে
বলা হলো,
قُلْ لِصَاحِبِ الْقَمِيصِ لَا يَشُقَّ قَمِيصَهُ لِيَشْرَحَ لِي عَنْ قَلْبِهِ "তুমি জামাওয়ালাকে বলে দাও-আমাকে তার অন্তঃকরণ দেখানোর জন্য সে যেন তার জামা না ছিঁড়ে।"
আল্লাহর নিকট সবচেয়ে প্রিয় ব্যক্তি কে?
[৩১৫] আম্মার ইবনু ইয়াসীর (রদিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণিত, 'তাঁর সহচরগণ তাঁর জন্য অপেক্ষা করছিলেন। তিনি বেরিয়ে এলে তাঁরা জিজ্ঞাসা করলেন, 'আপনার দেরি হওয়ার কারণ কী?' আম্মার বললেন, 'শোনো! আমি তোমাদেরকে তোমাদের এক পূর্ববর্তী ভাই [মূসা (আলাইহিস সালাম)]-এর ঘটনা বলছি।
মূসা (আলাইহিস সালাম) [আল্লাহ তাআলা-কে] বললেন, “يَا رَبِّ حَدِّثْنِي بِأَحَبَّ النَّاسِ إِلَيْكَ হে আমার রব! আমাকে বলো-তোমার নিকট সবচেয়ে প্রিয় ব্যক্তি কে?" আল্লাহ বললেন,
عَبْدُ فِي أَقْصَى الْأَرْضِ سَمِعَ بِهِ عَبْدُ آخَرُ فِي أَقْصَى الْأَرْضِ لَا يَعْرِفُهُ فَإِنْ أَصَابَهُ مُصِيبَةٌ فَكَأَنَّمَا أَصَابَتْهُ وَإِنْ شَاكَتْهُ شَوْكَةٌ فَكَأَنَّمَا شَاكَتْهُ لَا يُحِبُّهُ إِلَّا لِي فَذَلِكَ أَحَبُّ خَلْقِي إِلَيَّ "পৃথিবীর সর্বশেষ প্রান্তে [আমার] এক বান্দা বসবাস করে; পৃথিবীর অপর প্রান্তে থাকা আরেক বান্দা তার কথা শুনতে পেলো, অথচ সে তাকে চেনে না; কিন্তু প্রথম ব্যক্তি বিপদাপন্ন হলে দ্বিতীয় ব্যক্তি নিজেকে বিপন্ন মনে করে, প্রথম ব্যক্তির দেহে কাঁটা বিদ্ধ হলে দ্বিতীয় ব্যক্তি মনে করে তার দেহে কাঁটা বিদ্ধ হয়েছে। সে তাকে নিছক আমার জন্য ভালোবাসে। ওই লোকটিই হলো আমার সৃষ্টিকুলের মধ্যে আমার নিকট সবচেয়ে প্রিয়।"
মূসা (আলাইহিস সালাম) বললেন, “يَا رَبِّ خَلَقْتَ خَلْقًا تُدْخِلُهُمُ النَّارَ وَتُعَذِّبُهُمْ হে আমার রব! তুমি সৃষ্টিকূলকে সৃষ্টি করেছো। [আবার] তুমিই তাদেরকে জাহান্নামে প্রবেশ করাবে ও শাস্তি দিবে?"
আল্লাহ তাআলা তাঁর নিকট ওহি পাঠিয়ে বললেন, "كُلُّهُمْ خَلْقِي إِزْرَعُ زَرْعًا এরা সবাই তো আমার সৃষ্টি। [তুমি একটি কাজ করো] বীজ বপন করো।"
মূসা (আলাইহিস সালাম) বীজ বপন করলেন। আল্লাহ বললেন, “إِسْقِهِ তাতে পানি দাও।” মূসা (আলাইহিস সালাম) পানি দিলেন। পরিশেষে আল্লাহ বললেন, “قُمْ عَلَيْهِ ফসল কেটে ফেলো।” মূসা (আলাইহিস সালাম) ফসল কেটে তুলে নিলেন।
আল্লাহ তাআলা জিজ্ঞাসা করলেন, “مَا فَعَلْتَ زَرْعَكَ يَا مُوْسُى মূসা! তোমার ফসল কী করলে?”
তিনি বললেন, "فَرَعْتُ مِنْهُ وَرَفَعْتُهُ কেটে তুলে নিয়েছি।"
আল্লাহ জিজ্ঞাসা করলেন, “مَا تَرَكْتَ مِنْهُ شَيْئًا ফসলের কোন অংশটি ফেলে দিয়েছো?”
তিনি বললেন, “مَا لَا خَيْرَ فِيْهِ أَوْ مَا لَا حَاجَةَ لِي فِيْهِ যার মধ্যে কোনো কল্যাণ নেই, কিংবা যা আমার দরকার নেই।”
كَذَلِكَ أَنَا لَا أُعَذِّبُ إِلَّا مَنْ لَا خَيْرَ فِيْهِ أَوْ مَا لَا حَاجَةً لِي 16001 TER فِيْهِ তেমনিভাবে আমিও কেবল তাকেই শাস্তি দিবো—যার মধ্যে কোনো কল্যাণ নেই, কিংবা যাকে আমার দরকার নেই।" [তুলনীয়: হাদীস নং ৩১৯]
আল্লাহর অধিকার আদায় করার আগ পর্যন্ত দুআ কবুল হয় না
[৩১৬] ওয়াহাব ইবনু মুনাব্বিহ (রহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘একব্যক্তি খুব মিনতি সহকারে [আল্লাহকে] ডাকছিলো। আল্লাহ'র নবি মূসা (আলাইহিস সালাম) তার পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় বললেন, “يَا رَبِّ ارْحَمْهُ হে আমার রব! তার প্রতি দয়া করো!” আল্লাহ তাআলা তাঁর নিকট ওহি প্রেরণ করে বলেন,
لَوْ دَعَانِي حَتَّى تَنْقَطِعَ قُوَاهُ مَا اسْتَجَبْتُ لَهُ حَتَّى يَنْظُرَ فِي حَتَّيْ عَلَيْهِ
“সে যদি আমাকে ডাকতে ডাকতে তার সকল শক্তি নিঃশেষ করে ফেলে, তবুও আমি তার ডাকে সাড়া দিবো না; যতোক্ষণ না সে তার উপর আমার যে অধিকার রয়েছে—সেদিকে নজর দিবে।"'
গরীব মানুষকে অসন্তুষ্ট করা হলে আল্লাহ তাআলা অসন্তুষ্ট হন
[৩১৭] ওয়াহাব ইবনু মুনab্বিহ (রহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'আল্লাহ তাআলা মূসা (আলাইহিস সালাম)-এর নিকট ওহি প্রেরণ করে বলেন,
إِنَّ قَوْمَكَ يُبْنُونَ فِي الْبُيُوتَ وَيُقَرِّبُوْنَ الْقُرْبَانَ وَإِنِّي لَا أَسْكُنُ الْبُيُوتَ وَلَا آكُلُ اللَّحْمَ وَلَكِنْ آيَةٌ بَيْنِي وَبَيْنَهُمْ أَنْ يَعْدِلُوا بَيْنَ الْغَنِيَّ وَالْمِسْكِينِ وَالْآيَةُ بَيْنِي وَبَيْنَهُمْ إِذَا أَرْضَوْا الْمَسَاكِيْنَ فَقَدْ رَضِيْتُ وَإِذَا أَسْخَطُوْهُمْ سَخِطْتُ
"তোমার জাতির লোকেরা আমার জন্য অনেক গৃহ [অর্থাৎ মাসজিদ] নির্মাণ করছে এবং কুরবানি পেশ করছে। আমি তো গৃহে বসবাস করি না; গোশতও খাই না। তবে তাদের ও আমার মধ্যে একটি অঙ্গীকার আছে; সেটি হলো-তারা যেন ধনী ও গরীবের মধ্যে ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করে। তাদের ও আমার মধ্যে [আরেকটি] অঙ্গীকার হলো-তারা যখন নিঃস্ব লোকদেরকে সন্তুষ্ট রাখবে, আমিও তাদের প্রতি সন্তুষ্ট থাকবো; আর যখন তারা নিঃস্বদেরকে অসন্তুষ্ট করবে, আমিও তাদের উপর অসন্তুষ্ট হবো।"
সর্বোত্তম মানুষের বৈশিষ্ট্য
[৩১৮] ওয়াহাব ইবনু মুনাব্বিহ (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'মূসা (আলাইহিস সালাম) বানী ইসরাঈলের লোকদেরকে বললেন,
”إِيْتُوْنِي بِخَيْرِكُمْ رَجُلًا তোমাদের সবচেয়ে ভালো লোকটিকে আমার কাছে নিয়ে এসো।"
তারা একজনকে নিয়ে আসলে মূসা (আলাইহিস সালাম) তাকে জিজ্ঞাসা করলেন, " তুমি কি বানী ইসরাঈলের মধ্যে সবচেয়ে ভালো লোক?" সে বললো, 'তারা এমনটি মনে করে।'
মূসা (আলাইহিস সালাম) বললেন, “إِذْهَبْ فَأْتِنِي بِشَرِّهِمْ তুমি যাও; তাদের মধ্যে যে লোকটি সবচেয়ে খারাপ-তাকে আমার কাছে নিয়ে এসো।" লোকটি চলে গেলো। কিছুক্ষণ পর সে একাকী ফিরে এলো।
মূসা (আলাইহিস সালাম) বললেন, "جِئْتَنِي بِشَرِّهِمْ তাদের খারাপ লোকটিকে নিয়ে এসেছো?" লোকটি বললো, 'আমি আমার নিজের সম্পর্কে যা জানি,
তাদের কারো সম্পর্কে আমি তা জানি না।’ মূসা (আলাইহিস সালাম) বললেন, “أَنْتَ خَيْرُهُمْ তুমিই তাদের মধ্যে সর্বত্তম ব্যক্তি!”
আল্লাহ তাআলার প্রিয়তম বান্দার বৈশিষ্ট্য
[৩১৯] ওয়াহাব ইবনু মুনাব্বিহ (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘মূসা (আলাইহিস সালাম) বললেন,
“رَبِّ أَيُّ عِبَادِكَ أَحَبُّ إِلَيْكَ হে আমার রব! তোমার কোন বান্দা তোমার নিকট সবচেয়ে প্রিয়?”
আল্লাহ বলেন, “مَنْ أَذْكُرُهُ يَذْكُرْنِ যাকে দেখলে মানুষ আমাকে স্মরণ করে।" মূসা (আলাইহিস সালাম) আবারো জিজ্ঞাসা করলেন, “رَبِّ أَيُّ عِبَادِكَ أَحَبُّ إِلَيْكَ হে আমার রব! তোমার কোন বান্দা তোমার নিকট সবচেয়ে প্রিয়?”
আল্লাহ বলেন, “اَلَّذِيْنَ يَعُوْدُوْنَ الْمَرْضَى وَيُشَيِّعُوْنَ الْكُلَّ যারা অসুস্থদের সেবা করে, সন্তানহারা মাকে সান্ত্বনা দেয়, এবং মৃত মানুষের জানাযার অনুসরণ করে [কবর পর্যন্ত যায়]।" [তুলনীয়: হাদীস নং ৩১৫]
হাজ্জ
[৩২০] আতা (রহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘মূসা (আলাইহিস সালাম) বাইতুল্লাহ তাওয়াফ [প্রদক্ষিণ] এবং সাফা ও মারওয়ার মাঝখানে সাঈ [দ্রুতগমন] করার সময় বলছিলেন, “لَبَّيْكَ اَللَّهُمَّ لَبَّيْكَ হে আল্লাহ! আমি হাজির।" জবাবে আল্লাহ তাআলা বলেন,
“لَبَّيْكَ يَا مُوْسٰى لَبَّيْكَ! হে মূসা! আমি হাজির, আমি তোমার পাশেই আছি।" তখন মূসা (আলাইহিস সালাম)-এর গায়ে ছিল একটি কাতওয়ানি আলখাল্লা।'
কবরে সালাত আদায়
[৩২১] আনাস ইবনু মালিক (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, ‘নবি (সাল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,
مَرَرْتُ لَيْلَةً أُسْرِيَ بِي بِمُوسَى عَلَيْهِ السَّلَامُ عِنْدَ الْكَثِيْبِ الْأَحْمِرِ وَهُوَ قَائِمٌ يُصَلِّي فِي قَبْرِهِ
ইসরা/মিরাজ-এর রাতে আমি আল-কাসীবুল আহমার!¹¹ এলাকায় মূসা (আলাইহিস সালাম)-এর পাশ দিয়ে গিয়েছি। তিনি তখন তাঁর কবরে দাঁড়িয়ে সালাত আদায় করছিলেন।"'
কিয়ামতের দিন যাঁরা আরশের ছায়ায় স্থান পাবেন
[৩২২] আতা ইবনু ইয়াসার (রহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'মূসা (আলাইহিস সালাম) বললেন,
“يَا رَبِّ مَنْ أَهْلُكَ الَّذِينَ تُظِلُّهُمْ فِي ظِلَّ عَرْشِكَ হে আমার রব! তাঁরা কারা- যাদেরকে তুমি [কিয়ামতের দিন] তোমার আরশের ছায়ায় স্থান দিবে?” আল্লাহ বলেন,
هُمُ الْبَرِيئَةُ أَيْدِيهِمْ وَالطَّاهِرَةُ قُلُوْبُهُمْ الَّذِينَ يَتَحَابُّوْنَ بِجَلَالِي الَّذِينَ إِذَا ذُكِرْتُ ذَكَرُوا بِيْ وَإِذَا ذَكَرُوا ذَكَرْتُ بِذِكْرِهِمْ الَّذِينَ يَسْبَغُوْنَ الْوُضُوءَ فِي الْمَكَارِهِ وَيُنِيبُوْنَ إِلَى ذِكْرِي كَمَا تُنِيْبُ النُّسُورُ إِلى وُكُوْرِهَا وَيَكْلَفُوْنَ بِحُبِّي كَمَا يَكْلَفُ الصَّبِيُّ بِحُبِّ النَّاسِ وَيَغْضَبُوْنَ لِمَحَارِي إِذَا اسْتُحِلَّتْ كَمَا يَغْضَبُ النَّمِرُ إِذَا حُوْرِبَ
"যাঁদের হাত [অপরাধ] মুক্ত, অন্তঃকরণ পূত-পবিত্র; যাঁরা আমার মহত্ত্বের প্রভাবে একে অপরকে ভালোবাসে; [কোথাও] আমার কথা আলোচিত হলে যাঁরা আমাকে স্মরণ করে; যাঁরা আমাকে স্মরণ করলে আমিও যাঁদেরকে স্মরণ করি; যাঁরা কষ্টের মধ্যেও পূর্ণাঙ্গ ওযু করে; [যাঁরা] আমার স্মরণের দিকে সেভাবে ফিরে আসে, যেভাবে ঈগল [শিকার শেষে] নীড়ে ফিরে আসে; [যাঁরা] আমার ভালোবাসার মুখাপেক্ষী, ঠিক যেভাবে শিশুরা মানুষের ভালোবাসার মুখাপেক্ষী হয়ে থাকে; এবং [যাঁরা] আমার নিষিদ্ধ কর্ম সংঘটিত হতে দেখলে ক্ষিপ্ত হয়, ঠিক যেভাবে লড়াইয়ের সময় চিতা
[১১] বর্তমান নাম 'নিবু পাহাড় (Mount Nibo)'। জর্দানে অবস্থিত। [অনুবাদক]
ক্ষিপ্ত হয়ে উঠে।"
হত্যাকান্ডের দায়ভার
[৩২৩] ওয়াহাব ইবনু মুনাব্বিহ (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'আল্লাহ তা'আলা মূসা (আলাইহিস সালাম)-কে বললেন,
يَا مُوسَى وَعِزَّتِي وَجَلَالِي لَوْ أَنَّ النَّفْسَ الَّتِي قَتَلْتَ أَقَرَّتْ لِي طَرْفَةَ عَيْنٍ أَنِّي لَهَا خَالِقُ أَوْ رَازِقُ لَأَذَقْتُكَ فِيهَا طَعْمَ الْعَذَابِ وَإِنَّمَا عَفَوْتُ عَنْكَ أَمْرَهَا أَنَّهَا لَمْ تُقرَّ لِي طَرْفَةَ عَيْنٍ أَنِّي لَهَا خَالِقٌ أَوْ رَازِقُ "মূসা! আমার সম্মান ও মহত্ত্বের শপথ! তুমি যাকে হত্যা করেছিলে, সে যদি এক পলকের জন্যও স্বীকার করতো- 'আমি তার স্রষ্টা বা জীবনোপকরণ-দাতা', তাহলে তাকে হত্যার দায়ে আমি তোমাকে অবশ্যই শাস্তি আস্বাদন করাতাম। আমি তোমার এ সংক্রান্ত অপরাধ ক্ষমা করে দিয়েছি; [কারণ] সে এক পলকের জন্যও স্বীকার করেনি- 'আমি তার স্রষ্টা বা জীবনোপকরণ-দাতা।"'
ভগ্নহৃদয় লোকদের প্রতি আল্লাহর করুণা
[৩২৪] ইমরান (রহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'মূসা ইবনু ইমরান (আলাইহিস সালাম) বললেন,
“أَيْ رَبِّ أَيْنَ أَبْغِيْكَ হে আমার রব! আমি তোমাকে কোথায় খুঁজবো?"
إِبْغِنِي عِنْدَ الْمُنْكَسِرَةِ قُلُوْبُهُمْ إِنِّي أَدْنُو مِنْهُمْ كُلَّ يَوْمٍ بَاعًا وَلَوْلَا ذَلِكَ لَا نْهَدَمُوا ভগ্ন-হৃদয় লোকদের কাছে আমাকে খোঁজো। আমি প্রতিদিন একহাত করে তাঁদের নিকটবর্তী হই; তা না হলে, তারা নির্ঘাত ভেঙে পড়তো।"'
ফেরেশতাদের মূল্যায়ন
[৩২৫] সাবিত (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'মূসা (আলাইহিস সালাম)-এর মৃত্যুতে আকাশের ফেরেশতারা বলতে শুরু করলো,
"مَاتَ مُوْسَى فَأَيُّ نَفْسٍ لَا تَمُوْتُ মূসা ইন্তেকাল করেছেন। তাহলে আর কে ইন্তেকাল করবে না?"
কন্যাদের প্রতি উপদেশ
[৩২৬] আবূ ইমরান জুওয়ানি (রহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, 'মৃত্যুর সময় ঘনিয়েণ এলে মূসা (আলাইহিস সালাম) উদ্বিগ্ন হয়ে ওঠেন। অতঃপর তিনি বলেন,
إِنِّي لَسْتُ أَجْزَعُ لِلْمَوْتِ وَلَكِنِّي أَجْزَعُ أَنْ تُحْبَسَ لِسَانِي عِنْدَ ذِكْرِ اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ عِنْدَ الْمَوْتِ
"মৃত্যুর জন্য আমি উদ্বিগ্ন নই; আমার উদ্বেগের কারণ হলো—আল্লাহ তাআলা'র যিক্ চলাকালে মৃত্যুর সময় তো আমার জিহ্বা বন্ধ করে দেওয়া হবে!" মূসা (আলাইহিস সালাম)-এর তিনটি মেয়ে ছিল। তিনি তাদেরকে বলেন,
يَا بَنَاتِي إِنَّ بَنِي إِسْرَائِيلَ سَيَعْرِضُوْنَ عَلَيْكُنَّ الدُّنْيَا فَلَا تَقْبَلْنَ وَالْقُطْنَ هَذَا السَّنْبُلَ فَافْرُكْنَهُ وَكُلْنَهُ تَبْلُغْنَ بِهِ إِلَى الْجَنَّةِ
"মেয়েরা আমার! অচিরেই বানী ইসরাঈলের লোকজন তোমাদের সামনে দুনিয়া [র বিলাসী উপকরণ] পেশ করবে; তোমরা তা গ্রহণ কোরো না। এই খাদ্যশস্যগুলো নিয়ে ঘষে খাওয়ার উপযোগী করে খাও; এর মাধ্যমে তোমরা জান্নাতে পৌঁছে যাবে।"