📄 ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম) ও দুনিয়া
ফেরেশতাদের আগমন
[২৬০] কাব (রদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, 'ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম) বলেছিলেন,
يَا رَبِّ إِنَّهُ لَيَحْزُنُنِي أَنْ لَا أَرَى أَحَدًا فِي الْأَرْضِ يَعْبُدُكَ غَيْرِي
"হে আমার রব! আমি এ জন্য চিন্তিত যে, আমি আমাকে ছাড়া দুনিয়াতে অন্য কাউকে তোমার দাসত্ব করতে দেখছি না!" ফলে আল্লাহ তাআলা কয়েক জন ফেরেশতা পাঠালেন-যারা তাঁর সাথে সালাত আদায় করতো।'
জাহান্নামের কথা স্মরণ হলেই তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেলতেন
[২৬১] আবদুল্লাহ ইবনু রবাহ (রহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, 'আল্লাহ তাআলা'র ব্যাখ্যা “إِنَّ إِبْرَاهِيمَ لَحَلِيمٌ أَوَّاهُ مُنِيبٌ অনুশোচনাকারী ও [রবের দিকে] প্রত্যাবর্তনকারী এক ব্যক্তি।” (সূরা আত-তাওবা ৯:১১৪)-এর ব্যাখ্যায় কাব (রদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, 'জাহান্নামের কথা স্মরণ হলেই ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম) বলতেন, “أَوَّاءٌ أَوَّاءٌ مِنَ النَّارِ হায় জাহান্নাম! হায় জাহান্নাম।"'
মৃত্যুযন্ত্রণার তীব্রতা
[২৬২] ইবnu আবী মুলাইকা (রহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'ইন্তেকালের পর ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম) আল্লাহ তাআলা'র সাথে সাক্ষাৎ করেন। তখন তাঁকে বলা হলো—“يَا إِبْرَاهِيمُ كَيْفَ وَجَدْتَ الْمَوْتَ؟ ইবরাহীম! মৃত্যুর ব্যাপারে তোমার অভিজ্ঞতা কী?” তিনি বললেন, “يَا رَبِّ وَجَدْتُ نَفْسِي تُنْزَعُ بِالْبَلَاءِ
আমার বব! আমার তো মনে হলো, আমার আত্মাকে অনেক কষ্ট দিয়ে টেনে এব করা হচ্ছে।" এঁকে বলা হলো "عَلَيْكَ هَوَ فَقَدْ هُوَ نُوْا আমি তো তোমার মৃত্যু যন্ত্রণা অনেক সহজ করে দিয়েছিলাম!"
ক্ষুধার্ত সিংহের সালাম
[২৬৩] আবু উসমান (রহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম)-এর নিকট দুটি ক্ষুধার্ত সিংহ পাঠানো হয়েছিল। সিংহ দুটি এসে তাঁকে লেহন করে ও তাঁর সামনে মাথা ঝুঁকিয়ে দেয়।'
তাঁর জন্য আগুনকে শীতল ও শান্তিদায়ক বানিয়ে দেওয়া হয়েছিল
[২৬৪] আবদুল্লাহ ইবনু ফুলফুল (রহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, 'আল্লাহ তাআলা'র বক্তব্য
يَا نَارُ كُوْنِي بَرْدًا وَسَلَامًا عَلَى إِبْرَاهِيمَ
"হে আগুন! ইবরাহীমের জন্য ঠান্ডা ও শান্তিদায়ক হয়ে যাও।” (সূরা আল-আম্বিয়া ২১:৬৯)-এর ব্যাখ্যায় আলি (আলাইহিস সালাম) বলেন, 'শান্তিদায়ক' না বললে, ঠান্ডার প্রভাবে ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম) মারা যেতেন।'
কিয়ামতের দিন সর্বপ্রথম তাঁকে সুতি বস্ত্র পরানো হবে
[২৬৫] 'আলি (আলাইহিস সালাম) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'কিয়ামতের দিন সর্বপ্রথম ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম)-কে একখণ্ড সুতি বস্ত্র পরানো হবে; তারপর নবি (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে একটি রেশমী হুল্লা পরানো হবে। আর [সেদিন] তিনি থাকবেন আরশের ডানপাশে।'
আগুনে নিক্ষিপ্ত হয়েও তিনি কোনো সৃষ্টজীবের কাছে সাহায্য চাননি
[২৬৬] বাকর (রদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম)-কে আগুনে নিক্ষেপ করা হলে সৃষ্টিকুল তাদের রবকে বললো, 'হে আমার রব! তোমার একান্ত বন্ধুকে আগুনে নিক্ষেপ করা হচ্ছে; আমাদেরকে অনুমতি দাও-আমরা তার আগুন নিভিয়ে দিবো।' আল্লাহ
তাআলা বললেন,
هُوَ خَلِيلٌ لَيْسَ فِي الْأَرْضِ خَلِيلٌ غَيْرُهُ وَأَنَا رَبُّهُ لَيْسَ لَهُ رَبُّ غَيْرِي فَإِنِ اسْتَغَاثَ بِكُمْ فَأَغِيثُوهُ وَإِلَّا فَدَعُوهُ "সে আমার একান্ত বন্ধু; পৃথিবীতে সে ব্যতীত [আমার] অন্য কোনো একান্ত বন্ধু নেই। আমি তাঁর রব; আমি ব্যতীত তাঁর কোনো রব নেই। সে তোমাদের নিকট সাহায্য চাইলে, তাঁকে সাহায্য করো; অন্যথায় তাঁকে তাঁর অবস্থায় ছেড়ে দাও।" তারপর বৃষ্টির দায়িত্বে নিয়োজিত ফেরেশতা এসে বললো, 'হে আমার রব! তোমার একান্ত বন্ধুকে আগুনে নিক্ষেপ করা হচ্ছে; আমাকে অনুমতি দাও-আমি বৃষ্টি দিয়ে তার আগুন নিভিয়ে দিবো।' আল্লাহ তাআলা বললেন,
هُوَ خَلِيْلِي لَيْسَ فِي الْأَرْضِ خَلِيْلٌ غَيْرُهُ وَأَنَا رَبُّهُ لَيْسَ لَهُ رَبُّ غَيْرِي فَإِنِ اسْتَغَاثَكَ فَأَعِنُهُ وَإِلَّا فَدَعْهُ "সে আমার একান্ত বন্ধু; পৃথিবীতে সে ব্যতীত [আমার] অন্য কোনো একান্ত বন্ধু নেই। আমি তাঁর রব; আমি ব্যতীত তাঁর কোনো রব নেই। সে তোমার নিকট সাহায্য চাইলে, তাঁকে সাহায্য করো; অন্যথায় তাঁকে তাঁর অবস্থায় ছেড়ে দাও।" অতঃপর আগুনে নিক্ষিপ্ত হয়ে ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম) তাঁর রবের নিকট একটি দুআ করেন-যা বর্ণনাকারী আবূ হিলাল ভুলে গিয়েছিলেন।⁴ দুআর জবাবে আল্লাহ তাআলা বললেন, “يَا نَارُ كُوْنِي بَرْدًا وَسَلَامًا عَلَى إِبْرَاهِيمَ হে আগুন! ইবরাহীমের জন্য ঠান্ডা ও শান্তিদায়ক হয়ে যাও।” (সূরা আল-আম্বিয়া ২১:৬৯)। ফলে সেদিন প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের আগুন এতোটা ঠান্ডা হয়ে গিয়েছিলো যে তা দিয়ে ভেড়ার পায়ের নলিও সিদ্ধ করা যায়নি।'
সহজে রাস্তা অতিক্রমণ
[২৬৭] সাঈদ ইবনু জুবাইর (রহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,
[৪] তবে ইবনু কাসীর তাঁর আল-বিদায়াহ ওয়ান-নিহায়াহ গ্রন্থে আবু হুরায়রা (রদিয়াল্লাহু আনহু)-এর উদ্ধৃতি দিয়ে সেই দুআটি উল্লেখ করেছেন। দুআর ভাষা ছিল এ রকম: اللَّهُمَّ إِنَّكَ فِي السَّمَاءِ وَاحِدٌ وَأَنَا فِي الْأَرْضِ وَاحِدٌ أَعْبُدُكَ হে আল্লাহ! আসমানে তুমি একক সত্তা; আর যমীনে আমি একক ব্যক্তি, আমি কেবল তোমারই গোলামি করি!" [অনুবাদক]
জবাই করার দৃশ্য দেখানো হলে তিনি তাঁকে নিয়ে বাড়ি থেকে জবাইস্থলে যান; দূরত্ব ছিল একমাসের পথ, তবে তাঁরা তা এক সকালের মধ্যেই অতিক্রম করেন। পরে পুত্রকে জবাই হতে দেওয়া হয়নি, বরং তাঁকে ভেড়া জবাই করার নির্দেশ দেওয়া হলো; তিনি তা-ই করলেন। অবশেষে তিনি তাঁর পুত্রকে নিয়ে একসন্ধ্যার মধ্যে বাড়ি ফিরে আসেন; অথচ দূরত্ব ছিল একমাসের পথ। পাহাড়-পর্বত ও উপত্যকা [অতিক্রমণ] তাঁর জন্য সহজ করে দেওয়া হয়েছিলো।'
কাকলাস ছাড়া অন্য সকল প্রাণী তাঁর আগুন নেভাতে চেয়েছিল
[২৬৮] সুমামা (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'আমি আয়িশা (রদিয়াল্লাহু আনহা)- এর গৃহে প্রবেশ করে দেখলাম একটি লাঠি বানিয়ে রাখা হয়েছে। আমি জিজ্ঞাসা করলাম, 'হে উম্মুল মুমিনীন! এ লাঠি দিয়ে আপনি কী করেন?' জবাবে তিনি বললেন, 'কাকলাস মারার জন্য এ লাঠি; কারণ রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমাদেরকে জানিয়েছেন, ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম)-কে যখন আগুনে নিক্ষেপ করা হলো, তখন দুনিয়ার সকল প্রাণী চেয়েছিল আগুন নেভাতে; পক্ষান্তরে কাকলাস গিয়েছিল ফুঁ দিয়ে আগুনের তীব্রতা বাড়াতে। তাই একে মারার জন্য রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমাদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন।'
সৃষ্টিকুলের সর্বোত্তম ব্যক্তি
[২৬৯] আনাস ইবনু মালিক (রদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'এক ব্যক্তি নবি (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে এ বলে সম্বোধন করলো, 'হে সৃষ্টিকুলের সর্বোত্তম ব্যক্তি!' এ কথা শুনে রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মন্তব্য করলেন, “إِبْرَاهِيمُ أَبِي ذَاكَ” এ গুণে গুণান্বিত ব্যক্তি তো আমার পিতা ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম)।"'
টিকাঃ
৫. এ বর্ণনায় একটি তথ্য-বিভ্রাট ঘটেছে। যাকে জবাই করতে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল তিনি ছিলেন ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম) এর বড় ছেলে ইসমাঈল; দ্বিতীয় ছেলে ইসহাক নন। কাকে জবাই করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল-তা অনুধাবন করার জন্য আল্লাহ তাআলার বক্তব্য শুনুন:
رَبِّ هَبْ لِي مِنَ الصَّلِحِينَ ﴿۱۰۰) فَبَشِّرْتُهُ بِغُلَامٍ حَلِيْمٍ (۱۰۱) فَلَمَّا بَلَغَ مَعَهُ السَّعْيَ قَالَ يَبْنَى إِنِّي أَرَى فِي الْمَنَامِ أَنِّي أَذْبَحُكَ فَانْظُرْ مَا ذَا تَرَى قَالَ يَا أَبَتِ افْعَلْ مَا تُؤْمَرُ سَتَجِدُنِي إِنْ شَاءَ اللَّهُ مِنَ الصَّبِرِينَ ﴿٢٠١) فَلَمَّا أَسْلَمَا وَتَلَّهُ لِلْجَبِيْنِ ﴿۳۰۱﴾ وَنَدَيْنُهُ أَنْ يَإِبْرَهِيمُ (٤٠١﴾ قَدْ صَدَّقْتَ الرُّؤْيَا إِنَّا كَذَلِكَ نَجْزِي الْمُحْسِنِينَ ﴿٥٠١) إِنَّ هَذَا لَهُوَ الْبَلَاءُ الْمُبِينُ ﴿٦٠١﴾ وَفَدَيْنَهُ بِذِبْحٍ عَظِيمٍ (۷۰۱) وَتَرَكْنَا عَلَيْهِ فِي الآخِرِينَ ﴿۸۰۱﴾ سَلْمٌ عَلَى إِبْرَاهِيمَ ﴿۱۰۱) كَذَلِكَ نَجْزِي الْمُحْسِنِينَ إِنَّهُ مِنْ عِبَادِنَا الْمُؤْمِنِينَ ﴿۱۱۱﴾ وَبَشَّرْتُهُ بِإِسْحَقَ نَبِيًّا مِّنَ الصَّالِحِينَ (۲۱۱) وَبَرَكْنَا عَلَيْهِ وَعَلَى إِسْحَقَ وَمِنْ ذُرِّيَّتِهِمَا مُحْسِنٌ وَظَالِمُ لَنَفْسِهِ مُبِينٌ ﴿۳۱۱)
[ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম) দুআ করলেন] হে আমার রব! আমাকে সু-সন্তান দান করো! ফলে আমি তাঁকে এক ধৈর্যশীল ছেলের সুসংবাদ দিলাম। ছেলেটি যখন তাঁর সাথে চলাফেরা করার বয়সে উপনীত হলো, সে বললো- 'ছেলে আমার! আমি তো স্বপ্নে দেখছি-আমি তোমাকে জবাই করছি; এখন ভেবে দেখো, তোমার কী মত!' সে বললো, 'বাবা! তোমাকে যে কাজের নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে-তুমি তা-ই করো; আল্লাহ চাইলে তুমি আমাকে ধৈর্যশীল পাবে। অতঃপর উভয়ে যখন [আমার নির্দেশের সামনে] আত্মসমর্পণ করলো এবং সে তাঁকে উপুড় করে শোয়ালো, আমি তাঁকে ডাকলাম- 'ইবরাহীম! তুমি তো স্বপ্নকে বাস্তবরূপ দিয়েছো।' এভাবেই আমি সৎকর্মশীল লোকদেরকে প্রতিদান দিয়ে থাকি। সন্দেহ নেই, এটি ছিল একটি স্পষ্ট ও কঠিন পরীক্ষা। আমি তাঁর প্রতিদান দিলাম এক মহান কুরবানির মাধ্যমে; আর তাঁকে পরবর্তী লোকদের মধ্যে স্মরণীয় করে রাখলাম। ইবরাহীমের প্রতি সালাম! এভাবেই আমি সৎকর্মশীল লোকদেরকে প্রতিদান দিয়ে থাকি; সে ছিল আমার এক বিশ্বাসী গোলাম। আমি তাঁকে ইসহাকের সুসংবাদ দিলাম; [সে হবে] নবি-সৎ লোকদের একজন। আমি তাঁকে ও ইসহাককে অনুগ্রহ দিয়েছি; অবশ্য উভয়ের বংশধরের মধ্যে কিছু লোক আছে উন্নত ব্যক্তিত্বের অধিকারী, আর কিছু লোক নিজেদের উপর স্পষ্ট জুলুম করে চলছে।" (সূরা আস-সাফফাত ৩৭:১০০-১১৩)
উপরোক্ত আয়াতসমূহ থেকে প্রতীয়মান হয়, ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম) ছিলেন নিঃসন্তান; তিনি নেক-সন্তানের জন্য আল্লাহ'র নিকট দুআ করেন; এর প্রেক্ষিতে তাঁকে একটি ধৈর্যশীল ছেলে দেওয়া হয়। কিছুদিন পর সেই ছেলেটিকে জবাই করার নির্দেশ দেওয়া হয়। আন্তরিকতার সাথে নির্দেশ পালনের জন্য যা যা করা দরকার-ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম) যখন সবটুকু করে দেখালেন, তখন আল্লাহ খুশি হয়ে ছেলেটিকে জবাই থেকে অব্যাহতি দেন; কারণ তিনি তো স্রেফ এটুকু পরীক্ষা করতে চাচ্ছিলেন, ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম) আল্লাহ'র নির্দেশ পালনে সর্বস্ব ত্যাগ করতে প্রস্তুত কিনা। পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার প্রেক্ষিতে ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম)-কে এসব পুরস্কারে ভূষিত করা হয়: (১) মহান কুরবানির প্রতিদান-যা প্রতিবছর কুরবানির ঈদে কোটি কোটি মানুষ আদায় করে থাকে; (২) পরবর্তী লোকদের মধ্যে স্মরণীয় করে রাখা; এবং (৩) ইসহাক নামক এক পুত্রের সুসংবাদ-যিনি হবেন নবি।
এখানে কয়েকটি বিষয় উল্লেখ্য: প্রথমত, যে ছেলেকে জবাই করার চেষ্টা করা হয়েছিল পুরো বর্ণনায় তাঁর নাম উল্লেখ করা হয়নি। তবে এটুকু সুস্পষ্ট, ছেলেটি ছিল ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম)-এর প্রথম সন্তান। আর ইতিহাসবিদগণ এ বিষয়ে একমত যে ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম)-এর প্রথম সন্তানের নাম ইসমাঈল। দ্বিতীয়ত, জবাইয়ের নির্দেশ পালনের পুরস্কার
হিসেবে আবেক সন্তান ইসহাক এব সুসংবাদ দেওয়া হয়। অতএব, যাকে জবাই করার চেষ্টা করা হয়েছিল সে ছেলে কিছুতেই ইসহাক (আলাইহিস সালাম) হতে পারেন না।
তাছাড়া বাস্তব কর্মপন্থাও প্রমাণ করে, ঘটনাটি ঘটেছে ইসমাঈল (আলাইহিস সালাম) এব ক্ষেত্রে: কারণ কুরআন নাযিলের হাজার বছর আগে থেকেই স্রেফ ইসমাঈল (আলাইহিস সালাম) এর বংশধর আরবরাই তাঁর স্মৃতিচারণের অংশ হিসেবে প্রতিবছর হাজ্জের সময় কৃপবর্ণন করে আসছিলো। পক্ষান্তরে, ঘটনাটি ইসহাক (আলাইহিস সালাম)-এর ক্ষেত্রে ঘটে থাকলে তাঁর বংশধর বনী ইসরাঈলের মধ্যে এরূপ কুরবানির আনুষ্ঠানিকতা থাকতো।
তাহলে হাদীসের কিছু কিছু বর্ণনায় ইসহাক (আলাইহিস সালাম)-এর নাম কেমন করে চলে আসলো? তার উত্তর হলো, ঐতিহাসিক অনেক ঘটনার তথ্য-বিবরণী সংগ্রহ করতে গিয়ে মুসলিম মনীষীদের একটি অংশ ইসরাঈলি/ইয়াহুদি বর্ণনার উপর নির্ভর করেছেন। বলা বাহুলা, ইয়াহুদি পণ্ডিতবর্গ তাওরাত সংরক্ষণের ক্ষেত্রে সততার পরিচয় দিতে ব্যর্থ হয়েছেন। স্বয়ং কুরআন এ বিষয়ে সাক্ষী, তাওরাত ও অন্যান্য আসমানি সহীফা সঙ্কলনের ক্ষেত্রে তারা নানা জালিয়াতির আশ্রয় নিয়েছেন। শত অপরাধ সত্ত্বেও জাহান্নামের আগুন তাদেরকে স্পর্শ করবে না, আর করলেও তা হবে অল্প কয়েক দিনের জন্য; কারণ তারা আল্লাহ'র নেক বান্দাদের সন্তান-এই হলো তাদের আকীদা-বিশ্বাস। তাদের নিকট মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব খোদা-ভীতির উপর নির্ভরশীল নয়, বরং তা নির্ভরশীল পিতৃ-পুরুষদের বংশীয় আভিজাত্যের উপর। ফলে, নিজেদের পূর্ব-পুরুষদের আভিজাত্য প্রমাণ করতে গিয়ে নানা রকমের তথ্য-বিকৃতিতে তারা কোনো কার্পণ্য করেননি। বংশলতিকার দিক দিয়ে আরবরা হলো ইসমাঈল (আলাইহিস সালাম)-এর বংশধর; আর বনী ইসরাঈল হলো ইসহাক (আলাইহিস সালাম)-এর বংশধর। 'আল্লাহ'র নির্দেশে নিজের গলাকে স্বেচ্ছায় ছুরির নিচে পেতে দেয়া'-র এই গৌরবগাথা নিজেদের পিতৃপুরুষের সাথে যুক্ত করা গেলে তাদের বংশীয় আভিজাত্য আরেক দফা বেড়ে যাবে-এই মিথ্যা অহংবোধে আক্রান্ত হয়ে তারা বাইবেলে বর্ণিত উক্ত ঘটনায় ইসমাইল-এর নাম কেটে ইসহাক-এর নাম যুক্ত করে দিয়েছেন।
কুরআনের উক্ত বর্ণনা ছাড়াও খোদ বাইবেলের অপরাপর বাক্য থেকেও তাদের এই জালিয়াতির প্রমাণ পাওয়া যায়। যেমন: ওল্ড টেস্টামেন্টের প্রথম গ্রন্থ 'Genesis / পয়দায়েশ'-এর ২২:১- ১৮ অংশে কুরবানির উক্ত ঘটনা সবিস্তারে আলোচনা করা হয়েছে। সেখানে স্পষ্ট করে ইসহাক (আলাইহিস সালাম)-এর নাম উল্লেখ করা হয়েছে। পয়দায়েশ ২২:২-এ বলা হচ্ছে, 'এখন তোমার পুত্র-একমাত্র পুত্র ইসহাক-কে... কুরবানির জন্য নিয়ে যাও।' এখানে ইসহাক (আলাইহিস সালাম)-কে একমাত্র পুত্র বলা হচ্ছে। অথচ ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম)-এর বয়স যখন ৮৬, তখন তাঁর প্রথম পুত্র ইসমাঈল (আলাইহিস সালাম)-এর জন্ম হয় (দ্রষ্টব্য: পয়দায়েশ ১৬:১৬)। আর ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম)-এর বয়স যখন ১০০, তখন ইসহাক (আলাইহিস সালাম) জন্মগ্রহণ করেন (দ্রষ্টব্য: পয়দায়েশ ২১:৫)। অর্থাৎ, খোদ বাইবেল অনুযায়ী ইসহাক (আলাইহিস সালাম) যখন জন্মগ্রহণ করেন, ততোদিনে ইসমাঈল (আলাইহিস সালাম) বয়স যথারীতি চৌদ্দ। সুতরাং কুরবানির সময় ইসহাক (আলাইহিস সালাম) কিছুতেই ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম)-এর একমাত্র পুত্র হতে পারেন না। বাইবেলে উল্লেখিত 'একমাত্র পুত্র' শব্দগুচ্ছ থেকেও বোঝা যাচ্ছে, এ ঘটনাটি ঘটেছে ইসমাঈল (আলাইহিস সালাম)-এর ক্ষেত্রে; কারণ ইসহাক (আলাইহিস সালাম) এর জন্মের পূর্বে ইসমাঈল (আলাইহিস সালাম) ছিলেন ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম)-এর একমাত্র পুত্র।
পরিশেষে আমাদের আলোচ্য হাদীসের ক্ষেত্রে মনে রাখতে হবে, এ হাদীসের পূর্ণাঙ্গ সনদ (বর্ণনা- পরম্পরা) হলো: আবদুল্লাহ লাইছ ইবনু খালিদ আবু বকর বালখি মুহাম্মদ ইবনু ছাবিত আব্দি মূসা ইবনু আবী বাকর সাঈদ ইবনু জুবাইর। প্রথমত এটি একটি মাকতু' হাদীস-যার
বর্ণনা পরম্পরা তাবিয়ি পর্যন্ত গিয়ে শেষ হয়ে গিয়েছে। উসূলুল হাদীসের নিয়মানুযায়ী, বিশুদ্ধ বর্ণনার পরিপন্থী হলে মাকতু' হাদীস কোনো আইনগত প্রমাণের মর্যাদা লাভ করে না। ইতোমধ্যে উল্লেখ করা হয়েছে যে এর তথ্য কুরআনের বক্তব্যের পরিপন্থী। দ্বিতীয়ত, গ্রন্থটি ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বলের হলেও এর মূল বর্ণনাকারী হলেন তাঁর পুত্র আবদুল্লাহ ইবনু আহমাদ ইবনি হাম্বাল। অথচ তিনি এ হাদীসটি তাঁর পিতার সূত্রে বর্ণনা না করে লাইছ ইবনু খালিদ-এর সূত্রে বর্ণনা করেছেন। সুতরাং এটি আহমাদ ইবনু হাম্বলের বর্ণনা নয়। ইবনু কাসীর তাঁর আল-বিদায়াহ ওয়ান-নিহায়াহ গ্রন্থে (বাইতুল আফকার সংস্করণ, পৃ. ১০৫) আহমাদ ইবনু হাম্বলের মতটি উল্লেখ করেছেন-তাতে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, জবাইয়ের জন্য যাকে নেওয়া হয়েছিল তিনি ছিলেন ইসমাঈল (আলাইহিস সালাম)। অনুবাদক।
📄 ইউসুফ (আলাইহিস সালাম) ও দুনিয়া
তাঁর শোকে মুহ্যমান পিতা
[২৭০] ইয়াহইয়া ইবনু সুলাইম (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'মৃত্যুর ফেরেশতার নিকট ইয়াকূব (আলাইহিস সালাম) ছিলেন দুনিয়াবাসীদের মধ্যে সবচেয়ে সম্মানিত ব্যক্তি। ইয়াকূব (আলাইহিস সালাম)-এর নিকট আসার জন্য মৃত্যুর ফেরেশতা (আলাইহিস সালাম) তাঁর মহামহিম রবের নিকট অনুমতি চাইলে তাঁকে অনুমতি দেওয়া হলো। তিনি ইয়াকূব (আলাইহিস সালাম)-এর নিকট আসলেন। ইয়াকূব (আলাইহিস সালাম) তাঁকে জিজ্ঞাসা করলেন,
يَا مَلَكَ الْمَوْتِ أَسْأَلُكَ بِالَّذِي خَلَقَكَ هَلْ قَبَضْتَ نَفْسَ يُوْسُفَ فِيْمَنْ قَبَضْتَ مِنَ النُّفُوسِ
"ওহে মৃত্যুর ফেরেশতা! আমি তোমাকে সেই সত্তার নামে জিজ্ঞাসা করছি—যিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন। তুমি যাদের মৃত্যু কার্যকর করেছো—তাদের মধ্যে কি ইউসুফ আছে?” তিনি বললেন, 'না।' মৃত্যুর ফেরেশতা [স্বপ্রণোদিত হয়ে] বললেন, 'ইয়াকূব! আমি কি আপনাকে কিছু বাক্য শেখাবো না?' ইয়াকূব (আলাইহিস সালাম) বললেন, “হাঁ অবশ্যই! কেন নয়!” তিনি বললেন, 'তাহলে বলুন,
يَا ذَا الْمَعْرُوْفِ الَّذِي لَا يَنْقَطِعُ أَبَدًا وَلَا يُحْصِيْهِ غَيْرُهُ
“ওহে কল্যাণের অধিপতি, অনন্ত, অসীম!” ইয়াকূব (আলাইহিস সালাম) সেই রাতে এ দুআ পড়তে থাকেন। প্রভাতের আগেই [ইউসুফ (আলাইহিস সালাম)-এর] জামা তাঁর চেহারার উপর নিক্ষেপ করা হয়; আর অমনিই তিনি দৃষ্টিশক্তি ফিরে পান।'
কারাগার থেকে মুক্তি লাভের দু'আ
[২৭১] আবু আবদিল্লাহ (রহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'জিবরাঈল (আলাইহিস সালাম) ইউসুফ (আলাইহিস সালাম) এর নিকট এসে জিজ্ঞাসা করলেন, 'কারাবাস কি আপনার জন্য কষ্টকর হয়ে উঠেছে?' তিনি বললেন, "হ্যাঁ!" জিবরাঈল (আলাইহিস সালাম) বললেন, তাহলে আল্লাহকে। বলুন,
اللهم اجْعَل لِي مِنْ كُلِّ مَا أَهَمَّنِي وَكَرَبَنِي مِنْ أَمْرِ دُنْيَايَ وَأَمْرِ آخِرَتِي فَرِجًا وَمَخْرَجًا وَارْزُقْنِي مِنْ حَيْثُ لَا أَحْتَسِبُ وَاغْفِرْ لِي ذَنْبِي وَثَبِّتْ رَجَائِي وَاقْطَعْهُ عَمَّنْ سِوَاكَ حَتَّى لَا أَرْجُو أَحَدًا غَيْرَكَ
"হে আল্লাহ! আমার পার্থিব ও পরকালীন যেসব বিষয় আমাকে দুঃখ-দুর্দশার মধ্যে নিক্ষেপ করেছে—তার প্রত্যেকটি থেকে মুক্তি ও উত্তরণের রাস্তা বের করে দাও! আমার কল্পনার বাইরের উৎস থেকে আমাকে জীবনোপকরণ দাও! আমার গুনাহ ক্ষমা করো; আমার প্রত্যাশায় দৃঢ়তা দাও; তুমি ছাড়া প্রত্যাশার অন্যান্য উৎসগুলোকে ছিন্ন করে দাও—আমি যেন তোমাকে ছাড়া অন্য কাউকে প্রত্যাশা না করি।"
মানুষের কাছে সাহায্য কামনা করায় তাঁকে আরো দীর্ঘসময় জেলে থাকতে হলো
[২৭২] হাসান (রহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'আল্লাহ'র নবি (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,
رَحِمَ اللهُ يُوْسُفَ لَوْلَا كَلِمَتُهُ مَا لَبِثَ فِي السِّجْنِ طُوْلَ مَا لَبِثَ
"আল্লাহ ইউসুফের প্রতি সদয় হোন! তিনি একটি কথা না বললে এতো দীর্ঘ সময় তাঁকে জেলখানায় থাকতে হতো না।" কথাটি ছিল, [জেল থেকে মুক্তি লাভকারী এক কয়েদিকে তিনি বলেছিলেন,]
“اُذْكُرْنِي عِنْدَ رَبِّكَ তোমার মনিবের নিকট আমার বিষয়টি তুলে ধরো। (সূরা ইউসুফ ১২:৪২)"
অতঃপর হাসান (রহিমাহুল্লাহ) কাঁদতে কাঁদতে বলতে থাকেন, 'আর আমাদের দশা হলো—একটু বিপদ আসতেই আমরা তাড়াহুড়ো করে মানুষের শরণাপন্ন হই!'
ধৈর্যের পরাকাষ্ঠা
[২৭৩] হাসান (রহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'আল্লাহ'র নবি (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,
رَحِمَ اللَّهُ يُوسُفَ لَوْ أَنِّي جَاءَنِي الرَّسُولُ بَعْدَ طُولِ السِّجْنِ لأَسْرَعْتُ لِلإِجَابَةِ "আল্লাহ ইউসুফের প্রতি সদয় হোন! দীর্ঘ কারাভোগের পর [জেল থেকে মুক্তির বার্তা নিয়ে] বার্তাবাহক যদি স্বয়ং আমার নিকটও আসতো, তাহলে আমিও দ্রুত সাড়া দিতাম।"⁶
আয়ুষ্কাল
[২৭৪] হাসান (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'ইউসুফ (আলাইহিস সালাম)-কে যখন কুয়োয় নিক্ষেপ করা হয়, তখন তাঁর বয়স ছিল সতেরো। তারপর গোলামি, কারাবাস ও রাষ্ট্রশাসনে কেটেছে আশি বছর। সবকিছু গোছানোর পর তিনি বেঁচে ছিলেন তিপ্পান্ন বছর।'
মানুষের কাছে সাহায্য কামনা করায় আল্লাহ তাআলার তিরস্কার
[২৭৫] আনাস (রদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'আল্লাহ তাআলা ইউসুফ (আলাইহিস সালাম)-এর নিকট ওহির মাধ্যমে বললেন,
مَنْ اسْتَنْقَذَكَ مِنَ الْقَتْلِ إِذْ هَمَّ إِخْوَتُكَ أَنْ يَقْتُلُوكَ "তোমার ভাইয়েরা যখন তোমাকে হত্যা করতে চেয়েছিলো, তখন তোমাকে কে বাঁচিয়েছে?” ইউসুফ (আলাইহিস সালাম) বললেন, “أَنْتَ يَا رَبِّ হে আমার রব! তুমিই।” আল্লাহ বললেন, “فَمَنْ اسْتَنْقَذَكَ مِنَ الْجُبِّ إِذْ أَلْقَوْكَ فِيْهِ আচ্ছা! তারা যখন তোমাকে কুয়োয় নিক্ষেপ করেছিলো, তখন সেখান থেকে তোমাকে কে বাঁচিয়েছে?" ইউসুফ (আলাইহিস সালাম) বললেন, “أَنْتَ يَا رَبِّ হে আমার রব! তুমি।" আল্লাহ বললেন, “فَمَا لَكَ ذَكَرْتَ آدَمِيًّا وَنَسِيْتَنِي তাহলে তোমার কী হলো! [জেল থেকে মুক্তি
পাওয়ার জন্য] তুমি একজন মানুষকে স্মরণ করলে, আর আমাকে ভুলে গেলে?" [দ্রষ্টব্য: সূরা ইউসুফ ১২:৪২] ইউসুফ (আলাইহিস সালাম) বললেন, “كَلِمَةً تَكَلَّمَ بِهَا لِسَانِي এটি ছিল আমার মুখ থেকে উচ্চারিত একটি কথা।" আল্লাহ বললেন, “فَوَعِزَّتِي لَأُخْلِدَنَّكَ السِّجْنَ بِضْعَ سِنِينَ আমার সম্মানের শপথ! আমি তোমাকে [আরো] কয়েক বছর জেলখানায় রাখবো।"'
পুত্রশোকে পিতার কান্না
[২৭৬] হাসান (রহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ইউসুফ (আলাইহিস সালাম)-এর শোকে ইয়াকূব (আলাইহিস সালাম) আশি বছর কেঁদেছিলেন। অথচ তখন তিনি ছিলেন দুনিয়াবাসীদের মধ্যে আল্লাহ তাআলা'র নিকট সবচেয়ে সম্মানিত ব্যক্তি!'
স্বপ্ন ও স্বপ্নের প্রতিফলন
[২৭৭] হাসান (রহيمাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'ইউসুফ (আলাইহিস সালাম)-এর স্বপ্ন ও তার বাস্তব প্রতিফলনের মাঝখানে ব্যবধান ছিল আশি বছর।'
দুশ্চিন্তা ও গ্লানি মানুষের সামনে হতাশার সুরে ব্যক্ত করা অনুচিত
[২৭৮] হাবীব (রহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'এক ব্যক্তি আল্লাহ'র নবি ইয়া'কূব (আলাইহিস সালাম)-এর পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। তখন তাঁর ভ্রুসমূহ চক্ষুযুগলকে আচ্ছন্ন করে রেখেছিল; এক টুকরো ছিন্ন বস্ত্র দিয়ে তিনি ভ্রুগুলো তুলে ধরলেন। লোকটি জিজ্ঞাসা করলো, 'হে আল্লাহ'র নবি! আপনার কী হয়েছে? আমি কী দেখতে পাচ্ছি?' তিনি বললেন,
“طُوْلُ الزَّمَانِ وَكَثْرَةُ الْأَحْزَانِ [এর নেপথ্যে রয়েছে] সুদীর্ঘ সময় ও দুশ্চিন্তার আধিক্য!” এ কথার প্রেক্ষিতে আল্লাহ তাআলা তাঁর নিকট ওহি পাঠালেন, "یا يَعْقُوبُ تَشْكُوْنِي ইয়াকূব! তুমি কি আমার ব্যাপারে অভিযোগ করছো?” ইয়াকুব (আলাইহিস সালাম) বললেন, “رَبِّ خَطِيئَةٌ فَاغْفِرْهَا হে আমার রব! আমার ভুল হয়ে গেছে; ক্ষমা করে দাও।"
টিকাঃ
৬. এর মাধ্যমে নবি (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ইউসুফ (আলাইহিস সালাম)-এর ধৈর্যের প্রশংসা করেছেন। দীর্ঘ কারাভোগের পর জেল কর্তৃপক্ষ ইউসুফ (আলাইহিস সালাম)-এর মুক্তির বার্তা নিয়ে আসে। তিনি জেল থেকে না বেরিয়ে উলটো কর্তৃপক্ষের নিকট তাঁর নির্দোষ কারাবাসের কৈফিয়ত তলব করে বসেন! ফলে রাজা এ বিষয়ে একটি তদন্ত কমিশন গঠন করেন। কমিশনের তদন্তে ইউসুফ (আলাইহিস সালাম)-এর নির্দোষত্ব প্রমাণিত হওয়ার পর তিনি জেল থেকে বেরিয়ে আসেন। বিস্তারিত জানার জন্য দেখুন: সূরা ইউসুফ ১২:৫০-৫৪। [অনুবাদক]
📄 আইয়ূব (আলাইহিস সালাম) ও দুনিয়া
রোগের ব্যাপ্তি
[২৭৯] হাসান (রহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'আইয়ূব (আলাইহিস সালাম)-এর কেবল দু-চক্ষু, অন্তঃকরণ ও জিহ্বা সুস্থ ছিল; তাঁর দেহের বিভিন্ন জায়গায় পোকার উপদ্রব শুরু হয়েছিল। সাত বছরেরও বেশি সময় তিনি ভাগাড়ে ছিলেন।'' [তুলনীয়: হাদীস নং ২৮২; ২৮৩]
গায়ের গন্ধ পেয়ে কিছু লোকের বাজে মন্তব্য
[২৮০] আবদুল্লাহ ইবনু উবাইদ ইবনি উমাইর (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'আইয়ূব (আলাইহিস সালাম)-এর দু ভাই ছিলেন। একদিন তারা তাঁর নিকট এসে গন্ধ পেলেন। ফলে তারা মন্তব্য করে বসেন, 'আল্লাহ তাআলা যদি আইয়ূব-কে ভালো জানতেন, তাহলে তার এ দশা হতো না।' এ কথা শুনে আইয়ূব (আলাইহিস সালাম) অত্যন্ত কষ্ট পান। [আল্লাহ-কে উদ্দেশ্য করে] তিনি বলেন,
اللَّهُمَّ إِنْ كُنْتَ تَعْلَمُ أَنِّي لَمْ أَبِتْ لَيْلَةً شَبْعَانًا وَأَنَا أَعْلَمُ مَكَانَ جَائِعٍ فَصَدِّقْنِي
"হে আল্লাহ! তুমি যদি জানো, আমি পরিতৃপ্ত পেট নিয়ে কখনো রাত যাপন করিনি-আর ক্ষুধার্ত মানুষের অবস্থা আমি ভালো করেই জানি-তাহলে তুমি আমাকে সত্যায়ন করো।" দু ভাইকে শুনিয়ে আল্লাহ তাআলা তাঁর কথার সত্যায়ন করেন। তারপর আইয়ূব (আলাইহিস সালাম) বলেন,
اللَّهُمَّ إِنْ كُنْتَ تَعْلَمُ أَنِّي لَمْ أَلْبِسْ قَمِيصًا قَطُّ وَأَنَا أَعْلَمُ مَكَانَ عَارٍ فَصَدِّقْنِي
"হে আল্লাহ! তুমি যদি জানো, আমি শরীরের ঊর্ধ্বাঙ্গে কখনো জামা গাত্রের অন্যতম বর্ণনাকারী ইয়াযীদ এ বক্তব্যের বিশুদ্ধতার ব্যাপারে সন্দিহান। [অনুবাদক]
পরিনি—আর আমি ভালো করেই জানি খালি গায়ে থাকা মানুষের যাতনা কী—তাহলে তুমি আমাকে সত্যায়ন করো।" দু ভাইকে শুনিয়ে আল্লাহ তাআলা তাঁর কথার সত্যায়ন করেন।" এরপর তিনি সাজদায় লুটিয়ে পড়ে বলেন,
اللَّهُمَّ لَا أَرْفَعُ رَأْسِيْ حَتَّى يُكْشَفَ مَا بِيْ
"হে আল্লাহ! আমার দুর্দশা দূরীভূত না হওয়া পর্যন্ত আমি মাথা উত্তোলন করবো না।” পরিশেষে আল্লাহ তাআলা তাঁর দুর্দশা দূরীভূত করে দেন।'' [তুলনীয়: হাদীস নং ২৮৪]
সম্পদের ফিরিস্তি
[২৮১] ওয়াহাব ইবনু মুনাব্বিহ (রহিমাহুল্লাহ)-কে জিজ্ঞাসা করা হলো, 'আইয়ূব (আলাইহিস সালাম)-এর শরীয়ত কী ছিল?' তিনি বললেন, 'তাওহীদ [আল্লাহ তাআলা'র একত্ববাদ] ও নিজেদের মতপার্থক্যের সংশোধন। আল্লাহ'র নিকট তাঁদের কারো কোনো প্রয়োজন দেখা দিলে সে সাজদায় লুটিয়ে পড়ে [আল্লাহ'র নিকট] তা চাইতো। তাঁকে জিজ্ঞাসা করা হলো, 'তাঁর ধন-সম্পদ কী ছিল?' তিনি বললেন, 'তিন হাজার জোয়াল; প্রত্যেক জোয়ালের সাথে একজন দাস; প্রত্যেক দাসের সাথে একজন কর্মঠ দাসী; প্রত্যেক দাসীর সাথে একটি গাধী। আর ছিল চৌদ্দ হাজার ভেড়া। দরজার বাইরে মেহমান রেখে তিনি কখনো রাত্রিযাপন করেননি; এবং কোনো মিসকীন না নিয়ে কখনো খাবার খাননি।'
মুসিবতের সময়কাল
[২৮২] ওয়াহাব ইবনু মুনাব্বিহ (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'আইয়ূব (আলাইহিস সালাম) সাত বছর বিপদ-মুসিবতে নিপতিত ছিলেন।' [তুলনীয়: হাদীস নং ২৭৯; ২৮৩]
[২৮৩] সুলাইমান তাইমি (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'আইয়ূব (আলাইহিস সালাম) জনপদের ভাগাড়ে সাত বছর পড়ে ছিলেন।' [তুলনীয়: হাদীস নং ২৭৯; ২৮২]
ব্যাধি দেখে কিছু লোক তাঁকে পাপী সাব্যস্ত করে
[২৮৪] নাওফ বাক্কালি (রহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'আইয়ূব
(আলাইহিস সালাম) এর পাশ দিয়ে বনী ইসরাঈলের একদল লোক যাওয়ার সময় মন্তব্য করলো, 'নিশ্চয়ই বড় কোনো পাপের ফলে তার এই দশা হয়েছে!' তাদের এই মন্তব্য আইয়ূব (আলাইহিস সালাম) শুনে ফেলেন। তখনই তিনি [আল্লাহ তাআলা-কে উদ্দেশ্য করে] বলেন,
مَسَّنِيَ الضُّرُّ وَأَنْتَ أَرْحَمُ الرَّحِمِينَ "আমাকে বিপদ-মুসিবত স্পর্শ করেছে; আর তুমি তো সবচেয়ে বেশি দয়াবান!" [সূরা আল-আম্বিয়া ২১:৮৩] এ ঘটনার আগে তিনি [রোগমুক্তির] দুআ করেননি।' [তুলনীয়: হাদীস নং ২৮০]
ব্যাধির নেপথ্যকারণ
[২৮৫] ইবনু উয়াইনা (রহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'বিপদে আপতিত হওয়ার পর আইয়ূব (আলাইহিস সালাম) তাঁর সাহাবিদেরকে ডেকে এনে জিজ্ঞাসা করেন, “تَدْرُوْنَ لِأَيِّ شَيْءٍ أَصَابَنِي هذا؟ তোমরা কি জানো, আমার এ অবস্থা কেন হয়েছে?" তারা বললেন, 'আমাদের সামনে তো আপনার এমন কোনো বিষয় প্রকাশিত হয়নি [যদ্দরুন এরূপ হতে পারে], তবে হতে পারে আপনি কোনো কিছু গোপন রেখেছেন-যা আমাদের জানা নেই।' এ কথা বলে তারা তাঁর কাছ থেকে উঠে চলে যান। তারপর তাদের বাইরের এক জ্ঞানী ব্যক্তির সাথে সাক্ষাৎ হয়। তিনি জিজ্ঞাসা করেন, 'আল্লাহ'র নবি (আলাইহিস সালাম) তোমাদেরকে কেন ডেকেছিলেন?' তারা তাকে কারণ অবহিত করেন। তিনি বললেন, 'আমি তাকে বলবো, কেন তাঁর এ অবস্থা হয়েছে।' অতঃপর তিনি আইয়ূব (আলাইহিস সালাম)-এর নিকট আসেন। আইয়ূব (আলাইহিস সালাম) [কারণ] জানতে চাইলে তিনি বললেন, 'আপনি একবার পানীয় পান করে 'আল-হামদু লিল্লাহ' বলেননি, অনুগ্রহের জন্য কৃতজ্ঞতাও প্রকাশ করেননি; আর সম্ভবত আপনি কোনো ছায়ায় আশ্রয় নিয়েছিলেন, কিন্তু ওই অনুগ্রহের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেননি।'
রোগমুক্তির পর প্রাচুর্য
[২৮৬] বাকর (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'আল্লাহ তাআলা আইয়ূব (আলাইহিস সালাম)-কে সুস্থতা দেওয়ার পর তাঁর উপর বৃষ্টির মতো করে স্বর্ণের পঙ্গপাল বর্ষণ
কবেন। আইয়ূব (আলাইহিস সালাম) ৩। কা۹۴۴۹۰۱۱
হখন তাঁকে থেকে বলা হলো, "الان با ألوان ألم ألمان ألم شع ম কি তোমাকে প্রাচুর্য দিষ্টান তুমি কি পবিং গু হর্ননি।"
তখন আইয়ূব (আলাইহিস সালাম) বললেন, "با رت و من بشع من فضلك হে আমার বব! তোমার অনুগ্রহ লাভ কবে কে পরিতৃপ্ত হতে পারে!"
কঠিন দিনগুলোতে তাঁর স্ত্রীর অবদান ও ঈর্ষান্বিত শয়তানের কূটকৌশল
[২৮৭] আবদুর রহমান ইবনু জুবাইর (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'নবি আইয়ূব (আলাইহিস সালাম)-কে যখন তাঁর সম্পদ, সন্তান-সন্ততি ও দেহের ক্ষতির মাধ্যমে পরীক্ষা করা হলো, তখন তাঁকে ভাগাড়ে রেখে দেওয়া হলো। তাঁর স্ত্রী বাইরে উপার্জন করে তাঁকে খাওয়াতেন। এ দৃশ্য দেখে শয়তানের মনে হিংসা জেগে ওঠে। যেসব রুটি ও গোশত বিক্রেতা আইয়ূব (আলাইহিস সালাম)-এর স্ত্রীকে দান করতেন, শয়তান সেসব লোকের নিকট এসে বলে, 'ওই যে মহিলাটি তোমাদের কাছে আসে, তাকে তাড়িয়ে দাও। সে তার স্বামীর সেবা-শুশ্রূষা করে ও নিজের হাতে তাকে স্পর্শ করে; ওর কারণে লোকেরা তোমাদের খাবারকে নোংরা মনে করে। ও তো দেখছি প্রায়ই তোমাদের এখানে আসে।' ফলে তারা আইয়ূব (আলাইহিস সালাম)-এর স্ত্রীকে নিকটে ঘেঁষতে না দিয়ে বলতো, 'দূরে থাকো। আমরা তোমাকে খাবার দিবো, তবে কাছে আসবে না।' আইয়ূব (আলাইহিস সালাম)-কে এ বিষয়ে অবহিত করলে, তিনি এর জন্য বলেন, 'আল-হামদু লিল্লাহ / সকল প্রশংসা কেবল আল্লাহর।' ঘর থেকে বের হলে আইয়ূব (আলাইহিস সালাম)-এর স্ত্রীর সাথে শয়তানের সাক্ষাৎ হতো; শয়তান এমন এক ব্যক্তির সুরত ধরে আসতো-যিনি আইয়ূব (আলাইহিস সালাম)-এর দুর্দশার জন্য অত্যন্ত পেরেশান বোধ করতেন। সে বললো, 'তোমার স্বামী কতো মহান! যা নাকচ করার তিনি তা নাকচ করে দিলেন। আল্লাহ'র শপথ! সে যদি মুখ দিয়ে কেবল একটি কথা উচ্চারণ করতো, তাহলে তার সকল দুর্দশা দূরীভূত করে দেওয়া হতো, আর ফিরিয়ে দেওয়া হতো তার সন্তান-সন্ততি ও ধন-সম্পদ।' স্ত্রী এসে আইয়ূব (আলাইহিস সালাম)-কে এ কথা জানালে তিনি বলেন,
لَقِيَكَ عَدُوٌّ اللهِ فَلَقَّنَكَ هَذَا الْكَلَامَ لَمَّا أَعْطَانَا اللَّهُ عَزَّ وَجَلَّ الْمَالَ وَالْوَلَدَ
مان به ورد، فنصر الذي له نكفر به لين أقامني الله عز وجل من .. من هذا لأحمدتك مائة جلدة
"তোমার সাথে আল্লাহ'র দুশমনের দেখা হয়েছে। সে তোমাকে এ কথা শিখিয়েছে। আল্লাহ তাআলা যখন আমাদেরকে ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি দিলেন, আমরা তখন তাঁর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করেছি; আব যখন তিনি তাঁর জিনিস নিয়ে নিলেন, আমরা এখন তাঁর অবাধ্য হবো? আল্লাহ তাআলা যদি আমাকে এই অসুস্থতা থেকে মুক্তি দেন, আমি তোমাকে এক শ'টি বেত্রাঘাত করবো।" এ কারণে আল্লাহ তাআলা বললেন,
وَخُذْ بِيَدِكَ ضِعْثًا فَاضْرِبْ بِهِ وَلَا تَحْنَتْ "একগুচ্ছ কাঠি হাতে নাও; তা দিয়ে তাকে [মৃদু] প্রহার করো, শপথ ভঙ্গ করো না।"' (সূরা সোয়াদ ৩৮:৪৪)'
শয়তানের উল্লাস
[২৮৮] তালহা (রদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'ইবলিস বললো,
مَا أَصَبْتُ مِنْ أَيُّوبَ شَيْئًا قَطُّ أَفْرَحُ بِهِ إِلَّا أَنِّي كُنْتُ إِذَا سَمِعْتُ أَنِيْنَهُ عَرَفْتُ أَنِّي قَدْ أَوْجَعْتُهُ
"আইয়ূব-এর কোনো ক্ষতি করে আমি কখনো খুশি হতে পারিনি; তবে আমি যখন তার যন্ত্রণার গোঙানি শুনলাম, তখন এই ভেবে খুশি হয়েছি-যাক, আমি তাকে কষ্ট দিতে পেরেছি!"'
যে-কোনো বিপদে তিনি যে দুআ করতেন
[২৮৯] হাসান (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'কোনো মুসিবতের মুখোমুখি হলেই আইয়ূব (আলাইহিস সালাম) বলতেন,
اللَّهُمَّ أَنْتَ أَخَذْتَ وَأَنْتَ أَعْطَيْتَ مَهُمَا تَبْقَى نَفْسِي أَحْمَدُكَ عَلَى حَسْبٍ بَلَائِكَ "হে আল্লাহ! তুমিই নাও, তুমিই দাও। আমার [দেহে] যতোদিন প্রাণ থাকে, ততোদিন আমি তোমার দেওয়া মুসিবত অনুযায়ী তোমার প্রশংসা
করে যাবো।"
ক্রোধ সংবরণ
[২৯০] আবদুর রহমান ইবনু ইয়্যি (রহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'আল্লাহ'র নবি দাউদ (আলাইহিস সালাম) বলেছেন,
كَانَ أَيُّوبُ أَصْبَرَ النَّاسِ وَأَحْلَمَ النَّاسِ وَأَكْظَمَ لِلْغَيْظِ
“আইয়ূব (আলাইহিস সালাম) ছিলেন সর্বাধিক ধৈর্যশীল ও সহনশীল মানুষ; আর ক্রোধ সংবরণ করার ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন সবচেয়ে পারঙ্গম।”
📄 ইউনুস (আলাইহিস সালাম) ও দুনিয়া
ভালো কাজ বিপদের সময় মানুষকে সুরক্ষা দেয়
[২৯১] ইবনু আবী আরুবা (রহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, 'আল্লাহ তাআলা'র বক্তব্য-
فَلَوْلَا أَنَّهُ كَانَ مِنَ الْمُسَبِّحِينَ لَلَبِثَ فِي بَطْنِهِ إِلَى يَوْمِ يَبْعَثُوْنَ "সে যদি আল্লাহ তাআলা'র প্রশংসা বর্ণনা না করতো, তাহলে তাঁকে পুনরুত্থান দিবস পর্যন্ত তিমি'র পেটে থাকতে হতো।” (সূরা আস-সাফ্ফাত ৩৭:১৪৩-১৪৪)-এর ব্যাখ্যায় কাতাদা (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'বিপদাপন্ন হওয়ার আগে তিনি দীর্ঘ সালাত আদায় করতেন [যার বদৌলতে তাঁকে মাছের পেট থেকে মুক্তি দেওয়া হয়েছে]।' তারপর তিনি একটি আরবি প্রবাদ উল্লেখ করেন-
إِنَّ الْعَمَلَ الصَّالِحَ يَرْفَعُ صَاحِبَهُ إِذَا عَثَرَ وَإِذَا صَرَعَ وُجِدَ مُتَّكِنًا "ভালো কাজ বিপদের সময় মানুষকে সুরক্ষা দেয়; তবে বিপদ কেটে গেলে মানুষ আবার অলস হয়ে যায়।"'
তিমির প্রতি আল্লাহ তাআলার নির্দেশ
[২৯২] মানসূর (রহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'আল্লাহ তাআলা'র বক্তব্য-
“فَنَادَى فِي الظُّلُمَاتِ বিপুল অন্ধকারের মধ্যে সে [আল্লাহকে] ডাকলো..." (সূরা আল-আম্বিয়া ২১:৮৭)
এব ব্যাখ্যায় সালিম ইবনু আবিল জা'দ (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'আল্লাহ তিমি কে নির্দেশনা দিয়েছিলেন 'তুমি তাঁর হাড় ও মাংসের কোনো ক্ষতিসাধন করবে না।' কিছুক্ষণ পর সেই তিমি কে আরেকটি তিমি গিলে ফেলে। ইউনুস (আলাইহিস সালাম) বিপুল অন্ধকারের মধ্যে আল্লাহ-কে ডাকতে থাকেন; বিপুল অন্ধকার হলো- [প্রথম] তিমি'র অন্ধকার, [তাব উপর]। আরেক তিমি'র অন্ধকার, ও [সর্বোপরি] সাগরের অন্ধকার।'
হাজ্জের সময় তিনি যেসব বাক্য উচ্চারণ করেছেন
[২৯৩] মুজাহিদ (রহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'সত্তরজন নবি বাইতুল্লাহ'র হাজ্জ করেছেন। তাঁদের মধ্যে একজন হলেন মূসা ইবনু ইমরান (আলাইহিস সালাম); তাঁর গায়ে ছিল দুটি কাতাওয়ানি' বস্ত্র। আরেকজন হলেন ইউনুস (আলাইহিস সালাম); [হাজ্জের সময়] তিনি বলেছিলেন, لَبَّيْكَ كَاشِفَ الْكَرْبِ لَبَّيْكَ "আমি হাজির, হে দুর্দশা দূরকারী! আমি হাজির।” [তুলনীয়: হাদীস নং ৩১৩]
শাস্তি অবধারিত দেখে তাঁর জাতির লোকেরা যেভাবে দুআ করেছিল
[২৯৪] আবুল জাল্দ (রহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'ইউনুস (আলাইহিস সালাম)-এর জাতির মাথার উপর শাস্তি এসে ঘন অন্ধকার রাত্রির টুকরোর ন্যায় বৃত্তাকারে ঘুরতে থাকে। এ অবস্থা দেখে তাদের বুদ্ধিমান লোকজন তাদের মধ্যে অবশিষ্ট এক বয়োবৃদ্ধ জ্ঞানী লোকের নিকট গিয়ে বললো, 'আমাদের [মাথার] উপর কী এসেছে—তা তো দেখতে পাচ্ছেন। এখন আমাদের পাঠ করার জন্য একটি দুআ শিখিয়ে দিন; হতে পারে [এ দুআর বদৌলতে] আল্লাহ তাআলা আমাদের উপর থেকে তাঁর শাস্তি প্রত্যাহার করে নেবেনা।' জ্ঞানী লোকটি বললেন, তাহলে তোমরা বলো, يَا حَيُّ حِيْنَ لَا حَيَّ وَيَا حَيُّ مُحْيِيَ الْمَوْتَى وَيَا حَيُّ لَا إِلَهَ إِلَّا أَنْتَ "হে চিরঞ্জীব! যখন কেউ ছিল না এবং যখন কেউ থাকবে না তখনো তুমিই চিরঞ্জীব। হে চিরঞ্জীব! তুমিই মৃতদেহে প্রাণ-সঞ্চার করো! হে চিরঞ্জীব! তুমি
ছায়ের কোনো ইলাহ নেই।' পরিশেষে আল্লাহ তাআলা তাদেরকে শাস্তি থেকে এহাই জানা
তিমির পেটে
[২৯৫] শাবি (রহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'এক ব্যক্তি তাঁর নিকট এসে বললেন-ইউনুস (আলাইহিস সালাম) তিমি'র পেটে চল্লিশ দিন ছিলেন। এ কথার প্রেক্ষিতে শা'বি বলেন, 'তিনি তো ছিলেন একদিনের চেয়েও কম সময়। দুপুরের আগে তিমি তাঁকে গলাধঃকরণ করে, আর সূর্যাস্তের আগে হাই তুলে; এ সময় ইউনুস (আলাইহিস সালাম) সূর্যের আলো দেখতে পেয়ে বলে ওঠেন,
لَا إِلَهَ إِلَّا أَنْتَ سُبْحَانَكَ إِنِّي كُنْتُ مِنَ الظَّالِمِينَ "তুমি ছাড়া কোনো ইলাহ নেই; তুমি পবিত্র; আমি তো জুলুমকারীদের অন্যতম।” (সূরা আল-আম্বিয়া ২১:৮৭) এরপর তিমি তাঁকে [তীরে] নিক্ষেপ করে। ততোক্ষণে তাঁর দেহ পাখির ছানার ন্যায় হয়ে গিয়েছে।' এক ব্যক্তি বলে উঠলো, 'আপনি কি আল্লাহ তাআলা'র অপার ক্ষমতাকে অস্বীকার করছেন?' শা'বি (রহিমাহুল্লাহ) বললেন, 'আল্লাহ তাআলা'র অপার ক্ষমতাকে অস্বীকার করছি না; আল্লাহ তাআলা তিমি'র পেটে একটি বাজার বানাতে চাইলে তাও করতে পারতেন।
তিমির পেটে অবস্থানের সময়সীমা
[২৯৬] আবূ মালিক (রহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'ইউনুস (আলাইহিস সালাম) তিমি'র পেটে চল্লিশ দিন ছিলেন।'