📘 রাসুলের চোখে দুনিয়া > 📄 আদম (আলাইহিস সালাম) ও দুনিয়া

📄 আদম (আলাইহিস সালাম) ও দুনিয়া


মানুষের কাজ ও আল্লাহর কাজ
[২৪৫] সালমান ফারিসি (রদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'আল্লাহ তাআলা আদম (আলাইহিস সালাম)-কে সৃষ্টি করে বললেন,
وَاحِدَةٌ لِي وَوَاحِدَةً لَكَ وَوَاحِدَةٌ بَيْنِي وَبَيْنَكَ فَأَمَّا الَّتِي لِي تَعْبُدُنِي وَلَا تُشْرِكُ بِي شَيْئًا وَأَمَّا الَّتِي لَكَ فَمَا عَمِلْتَ مِنْ شَيْءٍ جَزَيْتُكَ بِهِ وَأَنَا أَغْفِرُ وَأَنَا غَفُورٌ رَحِيمٌ وَأَمَّا الَّتِي بَيْنِي وَبَيْنَكَ الْمَسْأَلَةُ وَالدُّعَاءُ وَعَلَى الْإِجَابَةُ وَالْعَطَاءُ
"একটি বিষয় আমার জন্য, একটি বিষয় তোমার জন্য, আর একটি বিষয় তোমার ও আমার মধ্যকার। যে বিষয়টি আমার জন্য [নির্ধারিত], তা হলো—তুমি আমার দাসত্ব করবে এবং [এ দাসত্বে] আমার সাথে অন্য কাউকে শরীক করবে না। তোমার জন্য নির্ধারিত বিষয়টি হলো, তোমার কৃত প্রত্যেকটি কাজের বিনিময় আমি তোমাকে দিবো এবং [তোমার অপরাধ] ক্ষমা করবো; আমি ক্ষমাশীল ও দয়ালু। আর যে বিষয়টি তোমার ও আমার মধ্যকার, তা হলো—তোমার কাজ [আমার নিকট] চাওয়া ও প্রার্থনা করা, আর আমার দায়িত্ব হলো সাড়া দেওয়া ও দান করা।"
অসাম্যের কারণ
[২৪৬] বাকর (রদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, 'আদম আলাইহিস সালাম-এর সামনে তাঁর সন্তানদের হাজির করা হলে তিনি দেখতে পান—তাদের কেউ কেউ অপরের তুলনায় শ্রেষ্ঠ। তিনি জিজ্ঞাসা করেন,
“يَا رَبِّ فَهَلَّا سَوَّيْتَ بَيْنَهُمْ؟ হে আমার রব! তুমি তাদের মধ্যে সমতা প্রতিষ্ঠা
করলে না কেন?" আল্লাহ বলেন, "إِنِّي أَعْلَمُ أَنْ لَّمْ تَعْلَمُوْا চেয়েছি-আমার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা হোক।"
সকল মানুষের কান্না জড়ো করা হলে তা আদম (আলাইহিস সালাম) এর অশ্রুর সমান হবে না
[২৪৭] আলকামা (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'ভুল করার পর দাউদ (আলাইহিস সালাম) যে-পরিমাণ অশ্রু ঝরিয়েছেন-পৃথিবীর সকল অধিবাসীর কান্না একত্রিত করা হলেও তার সমান হবে না; আবার জান্নাত থেকে নামিয়ে দেওয়ার ফলে আদম (আলাইহিস সালাম) যে-পরিমাণ চোখের পানি ফেলেছেন-দাউদ (আলাইহিস সালাম)-সহ পৃথিবীর সকল অধিবাসীর কান্না জড়ো করা হলেও তা তার সমান সমান হবে না।'
জান্নাতের থাকার সময়কাল
[২৪৮] হাসান (রহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'আদম আলাইহিস সালাম জান্নাতে অবস্থান করেছিলেন একদিনের কিছু সময়; আর সেটুকুন সময় ছিল দুনিয়ার হিসেবে এক শ ত্রিশ বছরের সমান।'
গোনাহের ফলে মৃত্যুচিন্তা গৌণ হয়ে যায়
[২৪৯] হাসান (রহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'ভুল করার আগে আদম আলাইহিস সালাম-এর সম্মুখে ছিল তাঁর মৃত্যুর সময়ক্ষণ, আর পশ্চাতে ছিল [পার্থিব] সুদূর প্রত্যাশা। ভুল করার পর বিষয়টি উল্টো হয়ে গেলো-সুদূর প্রত্যাশার বিষয়াবলি সম্মুখে চলে আসলো, আর পশ্চাতে চলে গেলো মৃত্যুর সময়ক্ষণ।'
ইবলিসের মন্তব্য
[২৫০] আনাস ইবনু মালিক (রদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, 'রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,
لَمَّا صَوَّرَ اللهُ تَبَارَكَ وَتَعَالَى آدَمَ عَلَيْهِ السَّلَامُ تَرَكَهُ فَجَعَلَ إِبْلِيسُ يَطُوْفُ بِهِ يَنْظُرُ إِلَيْهِ فَلَمَّا رَآهُ أَجْوَفَ قَالَ ظَفَرْتُ بِهِ خَلْقُ لَا يَتَمَالَكُ
"আল্লাহ তাআলা আদম (আলাইহিস সালাম)-কে আকৃতি দেয়ার পর [কিছু সময়ের জন্য] রেখে দেন। তখন ইবলিস তাঁকে প্রদক্ষিণ করতে শুরু করে। সে তাঁর দিকে [গভীর দৃষ্টিতে] তাকিয়ে থাকতো। তাঁকে শূন্য-গহ্বর দেখে ইবলিস বললো, 'আমি ওর তুলনায় শ্রেষ্ঠ; ও এমন এক সৃষ্টি যে তার নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারবে না।"'
ক্ষমা প্রার্থনা করা ও আল্লাহ তাআলার দিকে ফিরে আসাই হলো পাপ থেকে উত্তরণের উপায়
[২৫১] উবাই ইবনু কাব (রদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, 'নবি (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,
إِنَّ آدَمَ عَلَيْهِ السَّلَامُ كَانَ رَجُلًا طِوَالًا كَأَنَّهُ نَخْلَةٌ سَحُوْقُ كَثِيرَ شَعْرِ الرَّأْسِ فَلَمَّا وَقَعَ بِمَا وَقَعَ بِهِ بَدَتْ لَهُ عَوْرَتُهُ وَكَانَ لَا يَرَاهَا قَبْلَ ذَلِكَ فَانْطَلَقَ هَارِبًا فَأَخَذَتْ بِرَأْسِهِ شَجَرَةٌ مِنْ شَجَرِ الْجَنَّةِ فَقَالَ لَهَا أَرْسِلِينِي قَالَتْ لَسْتُ مُرْسِلَتَكَ فَنَادَاهُ رَبُّهُ عَزَّ وَجَلَّ أَمِنّى تَفِرُّ قَالَ أَيْ رَبِّ لَا أَسْتَحْيِيْكَ فَنَادَاهُ وَ أَنَّ الْمُؤْمِنَ يَسْتَحْيِي رَبَّهُ عَزَّ وَجَلَّ مِنَ الذَّنْبِ إِذَا وَقَعَ بِهِ ثُمَّ يَعْلَمُ بِحَمْدِ اللَّهِ أَيْنَ الْمَخْرَجُ يَعْلَمُ أَنَّ الْمَخْرَجَ فِي الْإِسْتِغْفَارِ وَالتَّوْبَةِ إِلَى اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ
"আদম (আলাইহিস সালাম) ছিলেন ঘনকেশী ও দীর্ঘদেহী এক পুরুষ- অনেকটা সুউচ্চ খেজুর গাছের ন্যায়। তাঁর জীবনে যা ঘটার তা যখন ঘটে গেলো (অর্থাৎ আল্লাহ তাআলা'র নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘিত হলো), তখন তাঁর গোপনীয় অংশ তাঁর সামনে প্রকাশিত হয়ে গেলো-এর আগে যা তাঁর নজরে পড়েনি। ফলে তিনি পালাতে শুরু করলেন; আর অমনি বাগানের একটি বৃক্ষ তাঁর মাথা ধরে ফেলে। তিনি বৃক্ষটিকে বললেন, 'আমাকে ছেড়ে দাও।' বৃক্ষ বললো, 'আমি তোমাকে ছাড়বো না।' এ সময় তাঁর মহান রব তাঁকে ডেকে বললেন, 'তুমি কি আমার কাছ থেকে পালাচ্ছো?' আদম (আলাইহিস সালাম) বললেন, 'হে আমার রব! না (আমি পালাচ্ছি না); বরং তোমাকে লজ্জা পাচ্ছি।' আল্লাহ তাঁকে ডেকে বললেন, 'কোনো পাপ সংঘটিত হওয়ার পর মুমিন তাঁর রবকে লজ্জা পেলে, সে পাপ থেকে উত্তরণের উপায় জেনে যাবে। সকল প্রশংসা কেবল আল্লাহর! সে জানবে ক্ষমা প্রার্থনা করা ও আল্লাহ তাআলার দিকে ফিরে আসা-ই
(পাপ থেকে) উত্তরণের উপায়।"'
আদম ও দাউদ (আলাইহিমাস সালাম)
[২৫২] ইবনু আব্বাস (রদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'ঋণচুক্তির [বিধানাবলি সম্বলিত] আয়াত [সূরা আল-বাকারা ২:২৮২] নাযিল হওয়ার পর রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, “إِنَّ أَوَّلَ مَنْ جَحَدَ آدَمُ عَلَيْهِ السَّلَامُ সর্বপ্রথম অস্বীকারকারী ব্যক্তি হলেন আদম আলাইহিস সালাম।" কথাটি তিন বার বললেন। [তারপর তিনি বললেন]
لَمَّا خَلَقَ اللهُ آدَمَ وَمَسَحَ ظَهْرَهُ فَأَخْرَجَ مِنْهُ مَا هُوَ مِنْ ذَرَارِي إِلَى يَوْمِ الْقِيَامَةِ فَجَعَلَ يَعْرِضُ ذُرِّيَّتَهُ عَلَيْهِ فَرَأَى فِيْهِمْ رَجُلًا يَزْهَرُ فَقَالَ أَيْ رَبِّ مَنْ هَذَا قَالَ هَذَا إِبْنُكَ دَاوُدُ قَالَ أَيْ رَبِّ كَمْ عُمْرُهُ قَالَ سِتَّوْنَ عَامًا قَالَ رَبِّ زِدْ فِي عُمْرِهِ قَالَ لَا إِلَّا أَنْ أَزِيدَهُ مِنْ عُمْرِكَ وَكَانَ عُمْرُ آدَمَ أَلْفَ عَامٍ فَزَادَهُ أَرْبَعِينَ عَامًا فَكَتَبَ اللهُ عَلَيْهِ بِذَلِكَ كِتَابًا وَأَشْهَدَ عَلَيْهِ الْمَلَائِكَةَ فَلَمَّا احْتَضَرَ آدَمُ أَتَتْهُ الْمَلَائِكَةُ لِقَبْضِهِ قَالَ إِنَّهُ بَقِيَ مِنْ عُمْرِي أَرْبُوْعَنَ عَامًا فَقِيلَ لَهُ إِنَّكَ قَدْ وَهَبْتَهَا لِإِبْنِكَ دَاوُدَ قَالَ مَا فَعَلْتُ وَ أَبْرَزَ اللهُ عَزَّ وَجَلَّ عَلَيْهِ الْكِتَابَ وَشَهِدَتْ عَلَيْهِ الْمَلَائِكَةُ فَأَتَمَّهَا لِدَاوُدَ مِائَةَ سَنَةٍ وَأَتَمَّهَا لِآدَمَ عُمْرَهُ أَلْفَ سَنَةٍ
"আল্লাহ আদম (আলাইহিস সালাম)-কে সৃষ্টি করার পর তাঁর পৃষ্ঠদেশ স্পর্শ করে তাঁর সন্তানদেরকে বের করে আনেন-যারা কিয়ামত পর্যন্ত দুনিয়ায় আসবে। আল্লাহ আদম (আলাইহিস সালাম)-এর সামনে তাঁর সন্তানদেরকে তুলে ধরলে তিনি তাদের মধ্যে একজন উজ্জ্বল ব্যক্তিকে দেখতে পান। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, 'হে আমার রব! এটি কে?' আল্লাহ বললেন, 'এটি তোমার ছেলে দাউদ।' তিনি জানতে চাইলেন, 'হে আমার রব! তাঁর আয়ুষ্কাল কতো?' আল্লাহ বললেন, 'ষাট বছর।' তিনি বললেন, 'হে আমার রব! তাঁর আয়ুষ্কাল বাড়িয়ে দিন।' আল্লাহ বললেন, 'না। তবে তোমার আয়ুষ্কাল থেকে নিয়ে তাঁকে বাড়িয়ে দিতে পারি।' আদম (আলাইহিস সালাম)-এর আয়ুষ্কাল ছিল এক হাজার বছর। আল্লাহ দাউদ (আলাইহিস সালাম)-এর আয়ুষ্কাল চল্লিশ বছর বাড়িয়ে দিয়ে বিষয়টি লিপিবদ্ধ করেন এবং এর উপর ফেরেশতাদের সাক্ষী রাখেন।
আদম (আলাইহিস সালাম) মৃত্যুর উপকণ্ঠে উপনীত হলে ফেরেশতারা তাঁর প্রাণ নিতে আসেন। তিনি বললেন, 'আমার আয়ুষ্কাল এখনো চল্লিশ বছর অবশিষ্ট আছে।' তাঁকে বলা হলো, 'আপনি তো আপনার ছেলে [দাউদ]-কে তা দিয়ে দিয়েছেন।' তখন আল্লাহ তাঁর সামনে লিখিত প্রমাণ তুলে ধরেন, আর ফেরেশতারা এ বিষয়ে সাক্ষ্যদান করে। পরিশেষে দাউদ (আলাইহিস সালাম)-এর আয়ুষ্কাল এক শ বছর পূর্ণ করা হয় এবং আদম (আলাইহিস সালাম)-এর আয়ুষ্কাল [দাউদ (আলাইহিস সালাম)-কে প্রদত্ত চল্লিশ বছর সহ] এক হাজার বছর পূর্ণ করা হয়।"

📘 রাসুলের চোখে দুনিয়া > 📄 নূহ (আলাইহিস সালাম) ও দুনিয়া

📄 নূহ (আলাইহিস সালাম) ও দুনিয়া


তিন শ বছরের কান্না
[২৫৩] ওহাইব ইবনুল ওয়ারাদ খাদরামি (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'আল্লাহ তাআলা নূহ (আলাইহিস সালাম)-কে তাঁর পুত্রের ব্যাপারে তিরস্কার করে ওহি নাযিল করে বললেন- إِنِّي أَعِظُكَ أَنْ تَكُوْنَ مِنَ الْجَجَاهِلِينَ 10 উপদেশ দিচ্ছি, তুমি যেন মূর্খদের অন্তর্ভুক্ত না হও।"-(সূরা হূদ ১১:৪৬) [এই অনুশোচনায়] নূহ (আলাইহিস সালাম) তিন শ বছর কেঁদেছিলেন। আর এ কান্নার ফলে তাঁর দু চোখের নিচে পানির নালার ন্যায় দাগ পড়ে যায়।'
অত্যাচারের শিকার হয়েও জাতির জন্য ক্ষমা প্রার্থনা
[২৫৪] উবাইদ ইবনু উমাইর (রহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'নূহ (আলাইহিস সালাম)-এর জাতির লোকেরা তাঁকে মেরে অজ্ঞান করে ফেলতো। জ্ঞান ফিরে আসলে তিনি বলতেন, اللَّهُمَّ اغْفِرْ لِقَوْمِي لِأَنَّهُمْ لَا يَعْلَمُوْنَ হে আল্লাহ! আমার জাতিকে ক্ষমা করে দাও, কারণ তারা অজ্ঞ।"'
সর্বাবস্থায় আল্লাহ তাআলার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ
[২৫৫] মুহাম্মদ ইবনু কাব কুরাযি (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'নূহ (আলাইহিস সালাম) খাওয়া শেষে বলতেন, আল-হামদু লিল্লাহ (সকল প্রশংসা আল্লাহর), পান শেষে বলতেন-আল-হামদু লিল্লাহ, পোশাক পরিধান করে বলতেন-আল-হামদু লিল্লাহ, এবং বাহনে আরোহণ করে বলতেন-আল-হামদু লিল্লাহ। তাই আল্লাহ তাআলা তাঁকে ‘عَبْدًا شَكُورًا কৃতজ্ঞ বান্দা' নামে অভিহিত করেছেন।' [দ্রষ্টব্য:
সূরা বানী ইসরাঈল ১৭:১ ছেলের প্রতি উপদেশ
[২৫৬] আতা ইবনু ইয়াসার (রহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,
قَالَ نُوْحُ عَلَيْهِ السَّلَامُ لِأَبْنِهِ يَا بُنَيَّ إِنِّي مُوْصِيكَ وَصِيَّةً وَقَاصِرٌ بِهَا عَلَيْكَ حَتَّى لَا تَنْسَاهَا أُوْصِيكَ بِاثْنَتَيْنِ وَأَنْهَاكَ عَنْ اثْنَتَيْنِ فَأَمَّا اللَّتَانِ أُوْصِيْكَ بِهِمَا فَإِنِّي رَأَيْتُهُمَا يُكْثِرَانِ الْوُلُوْجَ عَلَى اللهِ عَزَّ وَجَلَّ وَرَأَيْتُ اللَّهَ عَزَّ وَجَلَّ يَسْتَبْشِرُ بِهِمَا وَصَالِحَ خَلْقِهِ قَوْلُ لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيكَ لَهُ فَإِنَّ السَّمَوَاتِ وَالْأَرْضَ لَوْ كُنَّ حَلَقَةً لَفَصَمَتْهَا وَلَوْ كُنَّ فِي كِفَّةٍ لَرَجَحَتْ بِهِنَّ وَأَمَّا اللَّتَانِ أَنْهَاكَ عَنْهُمَا فَالشَّرْكُ وَالْكِبْرُ فَإِنِ اسْتَطَعْتَ أَنْ تَلْقَى اللهَ عَزَّ وَجَلَّ وَلَيْسَ فِي قَلْبِكَ شَيْءٌ مِّنْ شِرْكٍ وَلَا كِبْرٍ فَافْعَلْ
"নূহ (আলাইহিস সালাম) তাঁর ছেলেকে বললেন, 'ছেলে আমার! আমি তোমাকে একটি উপদেশ দিচ্ছি। এটি তোমার প্রতি আমার বিশেষ উপদেশ; ভুলে যেও না যেন! উপদেশটি হলো দুটি কাজ করার, আর দুটি কাজ না করার। যে দুটি কাজ তোমাকে করতে বলছি তা হলো, তুমি বলবে-'সুবহানাল্লাহি ওয়া বিহামদিহি [আল্লাহ পবিত্র, আর প্রশংসা কেবল তারই]' ও 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা শারীকা লাহু [আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ বা সার্বভৌম নেই; তিনি একক; তাঁর (সার্বভৌম ক্ষমতায়) কারো কোনো অংশ নেই]।' আমি দেখেছি, এ-দুটি বাক্য [তার পাঠকারীকে] আল্লাহ তাআলা'র অধিক কাছাকাছি নিয়ে যায়। আমি [আরো] দেখেছি যে, এ বাক্য দুটিতে আল্লাহ তাআলা ও তাঁর নেক বান্দারা খুশি হন। 'সুবহানাল্লাহি ওয়া বিহামদিহি' হলো সৃষ্টিকুলের পঠিত বাক্য; এরই বদৌলতে সমগ্র সৃষ্টিজগৎ জীবনোপকরণ লাভ করে। যদি আকাশসমূহ ও পৃথিবীকে একত্রিত করে একটি গোলক বানানো হয়, আর তার উপর বাক্য দুটিকে রাখা হয়, তাহলে [বাক্যদুটির ভারে] গোলকটিতে ফাটল সৃষ্টি হবে। আকাশ-পৃথিবীর গোলককে নিক্তির এক পাল্লায়, আর এ [বাক্য] গুলোকে অপর পাল্লায় রাখা হলে, বাক্যগুলোর পাল্লা অধিক
ভারী হবে। আর যে দুটি কাজ করতে আমি তোমাকে নিষেধ করছি তা হলো— শির্ক ও অহঙ্কার। আল্লাহ তাআলা'র সাথে এমনভাবে সাক্ষাৎ করার জন্য চেষ্টা করো, যেন তোমার অন্তরে বিন্দুমাত্র শির্ক ও অহঙ্কার না থাকে।"
অহঙ্কার কী?
[২৬৭] আতা ইবনু ইয়াসার (রহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, “أَوْضَى نُوْحُ عَلَيْهِ السَّلَامُ إِبْنَهُ (আলাইহিস সালাম) তাঁর ছেলেকে উপদেশ দিয়েছিলেন।” অতঃপর তিনি পূর্বোক্ত হাদীসে বর্ণিত কথাগুলো উল্লেখ করে বলেন,
وَأَمَّا اللَّتَانِ أَنْهَاكَ عَنْهُمَا فَالْكِبْرُ وَالشَّرْكُ
"আর যে দুটি কাজ করতে আমি তোমাকে নিষেধ করছি তা হলো— অহঙ্কার ও শির্ক।” আবদুল্লাহ ইবনু উমার (রদিয়াল্লাহু আনহুমা) জিজ্ঞাসা করলেন, 'হে আল্লাহ'র রাসূল! আমি যদি সুন্দর জামা গায়ে দিই, তাহলে কি তা অহঙ্কারের অন্তর্ভুক্ত হবে?' নবি (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, “لَا إِنَّ اللهَ جَمِيلٌ يُحِبُّ الْجَمَالَ না। আল্লাহ সুন্দর, তিনি সৌন্দর্য পছন্দ করেন।” তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, 'তাহলে অহঙ্কারের মানে কি উৎকৃষ্ট বাহনে আরোহণ করা?' তিনি বললেন, "¹ না।” তিনি আবার জিজ্ঞাসা করলেন, 'তাহলে আমার কিছু সহচর থাকবে যারা আমার অনুসরণ করবে আর আমি তাদের খাবারের সংস্থান করে দিবো—এটি কি এটি অহঙ্কারের অন্তর্ভুক্ত?' নবি (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, "¹ না।” পরিশেষে তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, 'হে আল্লাহ'র রাসূল! তাহলে অহঙ্কার কিসে?' নবি (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, “أَنْ تُسَفَهَ الْحَقَّ وَتَغْمَصَ ]অহঙ্কার হলো] ইসলামকে অবজ্ঞা ও অবমূল্যায়ন করা।"'
আরো দুটি উপদেশ
[২৫৮] মূসা ইবনু আলি ইবনি রবাহ (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'আমি আমার পিতাকে বলতে শুনেছি, নূহ (আলাইহিস সালাম) তাঁর পুত্র সাম-কে বলেছেন,
يَا بُنَيَّ لَا تَدْخُلَنَّ الْقَبْرَ وَفِي قَلْبِكَ مِثْقَالُ ذَرَّةٍ مِنَ الْكِبْرِ فَإِنَّ الْكِبْرِيَاءَ رِدَاءُ
اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ فَمَنْ يُنَازِعُ اللهَ رِدَاءَهُ يَغْضَبُ عَلَيْهِ وَيَا بُنَيَّ لَا تَدْخُلِ الْقَبْرَ وَفِي قَلْبِكَ مِثْقَالُ ذَرَّةٍ مِنَ الْقَنَطِ فَإِنَّهُ لَا يَقْنَطُ مِنْ رَحْمَةِ اللَّهِ إِلَّا ضَالُّ
"ছেলে আমার! অন্তরে বিন্দুমাত্র অহঙ্কার নিয়ে কবরে যেও না; কারণ অহঙ্কার হলো আল্লাহ'র চাদর। যে আল্লাহ'র চাদর নিয়ে টানাটানি করে, আল্লাহ তার উপর অভিসম্পাত বর্ষণ করেন। আমার প্রিয় ছেলে! অন্তরে বিন্দুমাত্র হতাশা নিয়েও কবরে যেও না; কারণ কেবল পথহারা লোকেরাই আল্লাহ'র করুণা থেকে হতাশ হয়।"'
জাতির জন্য বদ দুআ
[২৫৯] হাসান (রহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, 'নূহ (আলাইহিস সালাম) তাঁর জাতির জন্য বদ-দুআ করেননি, যতোক্ষণ না এ আয়াত নাযিল হয়েছিল-
وَأُوحِيَ إِلَى نُوحٍ أَنَّهُ لَنْ يُؤْمِنَ مِنْ قَوْمِكَ إِلَّا مَنْ قَدْ آمَنَ فَلَا تَبْتَئِسْ بِمَا كَانُوا يَفْعَلُوْنَ
"আর নূহ-এর নিকট এ মর্মে ওহি নাযিল করা হলো-তোমার জাতির মধ্যে যারা ইতোমধ্যে ঈমান এনেছে তাঁদের ব্যতীত আর কেউ ঈমান আনবে না। সুতরাং তাদের কর্মকাণ্ডের জন্য দুঃখ কোরো না।” (সূরা হৃদ ১১:৩৬)। তখন তাঁর জাতির (হিদায়াতের) ব্যাপারে তাঁর আশা কেটে যায় এবং তিনি তাদের জন্য বদ-দুআ করেন।"

📘 রাসুলের চোখে দুনিয়া > 📄 ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম) ও দুনিয়া

📄 ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম) ও দুনিয়া


ফেরেশতাদের আগমন
[২৬০] কাব (রদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, 'ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম) বলেছিলেন,
يَا رَبِّ إِنَّهُ لَيَحْزُنُنِي أَنْ لَا أَرَى أَحَدًا فِي الْأَرْضِ يَعْبُدُكَ غَيْرِي
"হে আমার রব! আমি এ জন্য চিন্তিত যে, আমি আমাকে ছাড়া দুনিয়াতে অন্য কাউকে তোমার দাসত্ব করতে দেখছি না!" ফলে আল্লাহ তাআলা কয়েক জন ফেরেশতা পাঠালেন-যারা তাঁর সাথে সালাত আদায় করতো।'
জাহান্নামের কথা স্মরণ হলেই তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেলতেন
[২৬১] আবদুল্লাহ ইবনু রবাহ (রহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, 'আল্লাহ তাআলা'র ব্যাখ্যা “إِنَّ إِبْرَاهِيمَ لَحَلِيمٌ أَوَّاهُ مُنِيبٌ অনুশোচনাকারী ও [রবের দিকে] প্রত্যাবর্তনকারী এক ব্যক্তি।” (সূরা আত-তাওবা ৯:১১৪)-এর ব্যাখ্যায় কাব (রদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, 'জাহান্নামের কথা স্মরণ হলেই ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম) বলতেন, “أَوَّاءٌ أَوَّاءٌ مِنَ النَّارِ হায় জাহান্নাম! হায় জাহান্নাম।"'
মৃত্যুযন্ত্রণার তীব্রতা
[২৬২] ইবnu আবী মুলাইকা (রহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'ইন্তেকালের পর ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম) আল্লাহ তাআলা'র সাথে সাক্ষাৎ করেন। তখন তাঁকে বলা হলো—“يَا إِبْرَاهِيمُ كَيْفَ وَجَدْتَ الْمَوْتَ؟ ইবরাহীম! মৃত্যুর ব্যাপারে তোমার অভিজ্ঞতা কী?” তিনি বললেন, “يَا رَبِّ وَجَدْتُ نَفْسِي تُنْزَعُ بِالْبَلَاءِ
আমার বব! আমার তো মনে হলো, আমার আত্মাকে অনেক কষ্ট দিয়ে টেনে এব করা হচ্ছে।" এঁকে বলা হলো "عَلَيْكَ هَوَ فَقَدْ هُوَ نُوْا আমি তো তোমার মৃত্যু যন্ত্রণা অনেক সহজ করে দিয়েছিলাম!"
ক্ষুধার্ত সিংহের সালাম
[২৬৩] আবু উসমান (রহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম)-এর নিকট দুটি ক্ষুধার্ত সিংহ পাঠানো হয়েছিল। সিংহ দুটি এসে তাঁকে লেহন করে ও তাঁর সামনে মাথা ঝুঁকিয়ে দেয়।'
তাঁর জন্য আগুনকে শীতল ও শান্তিদায়ক বানিয়ে দেওয়া হয়েছিল
[২৬৪] আবদুল্লাহ ইবনু ফুলফুল (রহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, 'আল্লাহ তাআলা'র বক্তব্য
يَا نَارُ كُوْنِي بَرْدًا وَسَلَامًا عَلَى إِبْرَاهِيمَ
"হে আগুন! ইবরাহীমের জন্য ঠান্ডা ও শান্তিদায়ক হয়ে যাও।” (সূরা আল-আম্বিয়া ২১:৬৯)-এর ব্যাখ্যায় আলি (আলাইহিস সালাম) বলেন, 'শান্তিদায়ক' না বললে, ঠান্ডার প্রভাবে ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম) মারা যেতেন।'
কিয়ামতের দিন সর্বপ্রথম তাঁকে সুতি বস্ত্র পরানো হবে
[২৬৫] 'আলি (আলাইহিস সালাম) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'কিয়ামতের দিন সর্বপ্রথম ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম)-কে একখণ্ড সুতি বস্ত্র পরানো হবে; তারপর নবি (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে একটি রেশমী হুল্লা পরানো হবে। আর [সেদিন] তিনি থাকবেন আরশের ডানপাশে।'
আগুনে নিক্ষিপ্ত হয়েও তিনি কোনো সৃষ্টজীবের কাছে সাহায্য চাননি
[২৬৬] বাকর (রদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম)-কে আগুনে নিক্ষেপ করা হলে সৃষ্টিকুল তাদের রবকে বললো, 'হে আমার রব! তোমার একান্ত বন্ধুকে আগুনে নিক্ষেপ করা হচ্ছে; আমাদেরকে অনুমতি দাও-আমরা তার আগুন নিভিয়ে দিবো।' আল্লাহ
তাআলা বললেন,
هُوَ خَلِيلٌ لَيْسَ فِي الْأَرْضِ خَلِيلٌ غَيْرُهُ وَأَنَا رَبُّهُ لَيْسَ لَهُ رَبُّ غَيْرِي فَإِنِ اسْتَغَاثَ بِكُمْ فَأَغِيثُوهُ وَإِلَّا فَدَعُوهُ "সে আমার একান্ত বন্ধু; পৃথিবীতে সে ব্যতীত [আমার] অন্য কোনো একান্ত বন্ধু নেই। আমি তাঁর রব; আমি ব্যতীত তাঁর কোনো রব নেই। সে তোমাদের নিকট সাহায্য চাইলে, তাঁকে সাহায্য করো; অন্যথায় তাঁকে তাঁর অবস্থায় ছেড়ে দাও।" তারপর বৃষ্টির দায়িত্বে নিয়োজিত ফেরেশতা এসে বললো, 'হে আমার রব! তোমার একান্ত বন্ধুকে আগুনে নিক্ষেপ করা হচ্ছে; আমাকে অনুমতি দাও-আমি বৃষ্টি দিয়ে তার আগুন নিভিয়ে দিবো।' আল্লাহ তাআলা বললেন,
هُوَ خَلِيْلِي لَيْسَ فِي الْأَرْضِ خَلِيْلٌ غَيْرُهُ وَأَنَا رَبُّهُ لَيْسَ لَهُ رَبُّ غَيْرِي فَإِنِ اسْتَغَاثَكَ فَأَعِنُهُ وَإِلَّا فَدَعْهُ "সে আমার একান্ত বন্ধু; পৃথিবীতে সে ব্যতীত [আমার] অন্য কোনো একান্ত বন্ধু নেই। আমি তাঁর রব; আমি ব্যতীত তাঁর কোনো রব নেই। সে তোমার নিকট সাহায্য চাইলে, তাঁকে সাহায্য করো; অন্যথায় তাঁকে তাঁর অবস্থায় ছেড়ে দাও।" অতঃপর আগুনে নিক্ষিপ্ত হয়ে ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম) তাঁর রবের নিকট একটি দুআ করেন-যা বর্ণনাকারী আবূ হিলাল ভুলে গিয়েছিলেন।⁴ দুআর জবাবে আল্লাহ তাআলা বললেন, “يَا نَارُ كُوْنِي بَرْدًا وَسَلَامًا عَلَى إِبْرَاهِيمَ হে আগুন! ইবরাহীমের জন্য ঠান্ডা ও শান্তিদায়ক হয়ে যাও।” (সূরা আল-আম্বিয়া ২১:৬৯)। ফলে সেদিন প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের আগুন এতোটা ঠান্ডা হয়ে গিয়েছিলো যে তা দিয়ে ভেড়ার পায়ের নলিও সিদ্ধ করা যায়নি।'
সহজে রাস্তা অতিক্রমণ
[২৬৭] সাঈদ ইবনু জুবাইর (রহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,
[৪] তবে ইবনু কাসীর তাঁর আল-বিদায়াহ ওয়ান-নিহায়াহ গ্রন্থে আবু হুরায়রা (রদিয়াল্লাহু আনহু)-এর উদ্ধৃতি দিয়ে সেই দুআটি উল্লেখ করেছেন। দুআর ভাষা ছিল এ রকম: اللَّهُمَّ إِنَّكَ فِي السَّمَاءِ وَاحِدٌ وَأَنَا فِي الْأَرْضِ وَاحِدٌ أَعْبُدُكَ হে আল্লাহ! আসমানে তুমি একক সত্তা; আর যমীনে আমি একক ব্যক্তি, আমি কেবল তোমারই গোলামি করি!" [অনুবাদক]
জবাই করার দৃশ্য দেখানো হলে তিনি তাঁকে নিয়ে বাড়ি থেকে জবাইস্থলে যান; দূরত্ব ছিল একমাসের পথ, তবে তাঁরা তা এক সকালের মধ্যেই অতিক্রম করেন। পরে পুত্রকে জবাই হতে দেওয়া হয়নি, বরং তাঁকে ভেড়া জবাই করার নির্দেশ দেওয়া হলো; তিনি তা-ই করলেন। অবশেষে তিনি তাঁর পুত্রকে নিয়ে একসন্ধ্যার মধ্যে বাড়ি ফিরে আসেন; অথচ দূরত্ব ছিল একমাসের পথ। পাহাড়-পর্বত ও উপত্যকা [অতিক্রমণ] তাঁর জন্য সহজ করে দেওয়া হয়েছিলো।'
কাকলাস ছাড়া অন্য সকল প্রাণী তাঁর আগুন নেভাতে চেয়েছিল
[২৬৮] সুমামা (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'আমি আয়িশা (রদিয়াল্লাহু আনহা)- এর গৃহে প্রবেশ করে দেখলাম একটি লাঠি বানিয়ে রাখা হয়েছে। আমি জিজ্ঞাসা করলাম, 'হে উম্মুল মুমিনীন! এ লাঠি দিয়ে আপনি কী করেন?' জবাবে তিনি বললেন, 'কাকলাস মারার জন্য এ লাঠি; কারণ রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমাদেরকে জানিয়েছেন, ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম)-কে যখন আগুনে নিক্ষেপ করা হলো, তখন দুনিয়ার সকল প্রাণী চেয়েছিল আগুন নেভাতে; পক্ষান্তরে কাকলাস গিয়েছিল ফুঁ দিয়ে আগুনের তীব্রতা বাড়াতে। তাই একে মারার জন্য রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমাদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন।'
সৃষ্টিকুলের সর্বোত্তম ব্যক্তি
[২৬৯] আনাস ইবনু মালিক (রদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'এক ব্যক্তি নবি (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে এ বলে সম্বোধন করলো, 'হে সৃষ্টিকুলের সর্বোত্তম ব্যক্তি!' এ কথা শুনে রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মন্তব্য করলেন, “إِبْرَاهِيمُ أَبِي ذَاكَ” এ গুণে গুণান্বিত ব্যক্তি তো আমার পিতা ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম)।"'
টিকাঃ
৫. এ বর্ণনায় একটি তথ্য-বিভ্রাট ঘটেছে। যাকে জবাই করতে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল তিনি ছিলেন ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম) এর বড় ছেলে ইসমাঈল; দ্বিতীয় ছেলে ইসহাক নন। কাকে জবাই করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল-তা অনুধাবন করার জন্য আল্লাহ তাআলার বক্তব্য শুনুন:
رَبِّ هَبْ لِي مِنَ الصَّلِحِينَ ﴿۱۰۰) فَبَشِّرْتُهُ بِغُلَامٍ حَلِيْمٍ (۱۰۱) فَلَمَّا بَلَغَ مَعَهُ السَّعْيَ قَالَ يَبْنَى إِنِّي أَرَى فِي الْمَنَامِ أَنِّي أَذْبَحُكَ فَانْظُرْ مَا ذَا تَرَى قَالَ يَا أَبَتِ افْعَلْ مَا تُؤْمَرُ سَتَجِدُنِي إِنْ شَاءَ اللَّهُ مِنَ الصَّبِرِينَ ﴿٢٠١) فَلَمَّا أَسْلَمَا وَتَلَّهُ لِلْجَبِيْنِ ﴿۳۰۱﴾ وَنَدَيْنُهُ أَنْ يَإِبْرَهِيمُ (٤٠١﴾ قَدْ صَدَّقْتَ الرُّؤْيَا إِنَّا كَذَلِكَ نَجْزِي الْمُحْسِنِينَ ﴿٥٠١) إِنَّ هَذَا لَهُوَ الْبَلَاءُ الْمُبِينُ ﴿٦٠١﴾ وَفَدَيْنَهُ بِذِبْحٍ عَظِيمٍ (۷۰۱) وَتَرَكْنَا عَلَيْهِ فِي الآخِرِينَ ﴿۸۰۱﴾ سَلْمٌ عَلَى إِبْرَاهِيمَ ﴿۱۰۱) كَذَلِكَ نَجْزِي الْمُحْسِنِينَ إِنَّهُ مِنْ عِبَادِنَا الْمُؤْمِنِينَ ﴿۱۱۱﴾ وَبَشَّرْتُهُ بِإِسْحَقَ نَبِيًّا مِّنَ الصَّالِحِينَ (۲۱۱) وَبَرَكْنَا عَلَيْهِ وَعَلَى إِسْحَقَ وَمِنْ ذُرِّيَّتِهِمَا مُحْسِنٌ وَظَالِمُ لَنَفْسِهِ مُبِينٌ ﴿۳۱۱)
[ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম) দুআ করলেন] হে আমার রব! আমাকে সু-সন্তান দান করো! ফলে আমি তাঁকে এক ধৈর্যশীল ছেলের সুসংবাদ দিলাম। ছেলেটি যখন তাঁর সাথে চলাফেরা করার বয়সে উপনীত হলো, সে বললো- 'ছেলে আমার! আমি তো স্বপ্নে দেখছি-আমি তোমাকে জবাই করছি; এখন ভেবে দেখো, তোমার কী মত!' সে বললো, 'বাবা! তোমাকে যে কাজের নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে-তুমি তা-ই করো; আল্লাহ চাইলে তুমি আমাকে ধৈর্যশীল পাবে। অতঃপর উভয়ে যখন [আমার নির্দেশের সামনে] আত্মসমর্পণ করলো এবং সে তাঁকে উপুড় করে শোয়ালো, আমি তাঁকে ডাকলাম- 'ইবরাহীম! তুমি তো স্বপ্নকে বাস্তবরূপ দিয়েছো।' এভাবেই আমি সৎকর্মশীল লোকদেরকে প্রতিদান দিয়ে থাকি। সন্দেহ নেই, এটি ছিল একটি স্পষ্ট ও কঠিন পরীক্ষা। আমি তাঁর প্রতিদান দিলাম এক মহান কুরবানির মাধ্যমে; আর তাঁকে পরবর্তী লোকদের মধ্যে স্মরণীয় করে রাখলাম। ইবরাহীমের প্রতি সালাম! এভাবেই আমি সৎকর্মশীল লোকদেরকে প্রতিদান দিয়ে থাকি; সে ছিল আমার এক বিশ্বাসী গোলাম। আমি তাঁকে ইসহাকের সুসংবাদ দিলাম; [সে হবে] নবি-সৎ লোকদের একজন। আমি তাঁকে ও ইসহাককে অনুগ্রহ দিয়েছি; অবশ্য উভয়ের বংশধরের মধ্যে কিছু লোক আছে উন্নত ব্যক্তিত্বের অধিকারী, আর কিছু লোক নিজেদের উপর স্পষ্ট জুলুম করে চলছে।" (সূরা আস-সাফফাত ৩৭:১০০-১১৩)
উপরোক্ত আয়াতসমূহ থেকে প্রতীয়মান হয়, ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম) ছিলেন নিঃসন্তান; তিনি নেক-সন্তানের জন্য আল্লাহ'র নিকট দুআ করেন; এর প্রেক্ষিতে তাঁকে একটি ধৈর্যশীল ছেলে দেওয়া হয়। কিছুদিন পর সেই ছেলেটিকে জবাই করার নির্দেশ দেওয়া হয়। আন্তরিকতার সাথে নির্দেশ পালনের জন্য যা যা করা দরকার-ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম) যখন সবটুকু করে দেখালেন, তখন আল্লাহ খুশি হয়ে ছেলেটিকে জবাই থেকে অব্যাহতি দেন; কারণ তিনি তো স্রেফ এটুকু পরীক্ষা করতে চাচ্ছিলেন, ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম) আল্লাহ'র নির্দেশ পালনে সর্বস্ব ত্যাগ করতে প্রস্তুত কিনা। পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার প্রেক্ষিতে ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম)-কে এসব পুরস্কারে ভূষিত করা হয়: (১) মহান কুরবানির প্রতিদান-যা প্রতিবছর কুরবানির ঈদে কোটি কোটি মানুষ আদায় করে থাকে; (২) পরবর্তী লোকদের মধ্যে স্মরণীয় করে রাখা; এবং (৩) ইসহাক নামক এক পুত্রের সুসংবাদ-যিনি হবেন নবি।
এখানে কয়েকটি বিষয় উল্লেখ্য: প্রথমত, যে ছেলেকে জবাই করার চেষ্টা করা হয়েছিল পুরো বর্ণনায় তাঁর নাম উল্লেখ করা হয়নি। তবে এটুকু সুস্পষ্ট, ছেলেটি ছিল ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম)-এর প্রথম সন্তান। আর ইতিহাসবিদগণ এ বিষয়ে একমত যে ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম)-এর প্রথম সন্তানের নাম ইসমাঈল। দ্বিতীয়ত, জবাইয়ের নির্দেশ পালনের পুরস্কার
হিসেবে আবেক সন্তান ইসহাক এব সুসংবাদ দেওয়া হয়। অতএব, যাকে জবাই করার চেষ্টা করা হয়েছিল সে ছেলে কিছুতেই ইসহাক (আলাইহিস সালাম) হতে পারেন না।
তাছাড়া বাস্তব কর্মপন্থাও প্রমাণ করে, ঘটনাটি ঘটেছে ইসমাঈল (আলাইহিস সালাম) এব ক্ষেত্রে: কারণ কুরআন নাযিলের হাজার বছর আগে থেকেই স্রেফ ইসমাঈল (আলাইহিস সালাম) এর বংশধর আরবরাই তাঁর স্মৃতিচারণের অংশ হিসেবে প্রতিবছর হাজ্জের সময় কৃপবর্ণন করে আসছিলো। পক্ষান্তরে, ঘটনাটি ইসহাক (আলাইহিস সালাম)-এর ক্ষেত্রে ঘটে থাকলে তাঁর বংশধর বনী ইসরাঈলের মধ্যে এরূপ কুরবানির আনুষ্ঠানিকতা থাকতো।
তাহলে হাদীসের কিছু কিছু বর্ণনায় ইসহাক (আলাইহিস সালাম)-এর নাম কেমন করে চলে আসলো? তার উত্তর হলো, ঐতিহাসিক অনেক ঘটনার তথ্য-বিবরণী সংগ্রহ করতে গিয়ে মুসলিম মনীষীদের একটি অংশ ইসরাঈলি/ইয়াহুদি বর্ণনার উপর নির্ভর করেছেন। বলা বাহুলা, ইয়াহুদি পণ্ডিতবর্গ তাওরাত সংরক্ষণের ক্ষেত্রে সততার পরিচয় দিতে ব্যর্থ হয়েছেন। স্বয়ং কুরআন এ বিষয়ে সাক্ষী, তাওরাত ও অন্যান্য আসমানি সহীফা সঙ্কলনের ক্ষেত্রে তারা নানা জালিয়াতির আশ্রয় নিয়েছেন। শত অপরাধ সত্ত্বেও জাহান্নামের আগুন তাদেরকে স্পর্শ করবে না, আর করলেও তা হবে অল্প কয়েক দিনের জন্য; কারণ তারা আল্লাহ'র নেক বান্দাদের সন্তান-এই হলো তাদের আকীদা-বিশ্বাস। তাদের নিকট মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব খোদা-ভীতির উপর নির্ভরশীল নয়, বরং তা নির্ভরশীল পিতৃ-পুরুষদের বংশীয় আভিজাত্যের উপর। ফলে, নিজেদের পূর্ব-পুরুষদের আভিজাত্য প্রমাণ করতে গিয়ে নানা রকমের তথ্য-বিকৃতিতে তারা কোনো কার্পণ্য করেননি। বংশলতিকার দিক দিয়ে আরবরা হলো ইসমাঈল (আলাইহিস সালাম)-এর বংশধর; আর বনী ইসরাঈল হলো ইসহাক (আলাইহিস সালাম)-এর বংশধর। 'আল্লাহ'র নির্দেশে নিজের গলাকে স্বেচ্ছায় ছুরির নিচে পেতে দেয়া'-র এই গৌরবগাথা নিজেদের পিতৃপুরুষের সাথে যুক্ত করা গেলে তাদের বংশীয় আভিজাত্য আরেক দফা বেড়ে যাবে-এই মিথ্যা অহংবোধে আক্রান্ত হয়ে তারা বাইবেলে বর্ণিত উক্ত ঘটনায় ইসমাইল-এর নাম কেটে ইসহাক-এর নাম যুক্ত করে দিয়েছেন।
কুরআনের উক্ত বর্ণনা ছাড়াও খোদ বাইবেলের অপরাপর বাক্য থেকেও তাদের এই জালিয়াতির প্রমাণ পাওয়া যায়। যেমন: ওল্ড টেস্টামেন্টের প্রথম গ্রন্থ 'Genesis / পয়দায়েশ'-এর ২২:১- ১৮ অংশে কুরবানির উক্ত ঘটনা সবিস্তারে আলোচনা করা হয়েছে। সেখানে স্পষ্ট করে ইসহাক (আলাইহিস সালাম)-এর নাম উল্লেখ করা হয়েছে। পয়দায়েশ ২২:২-এ বলা হচ্ছে, 'এখন তোমার পুত্র-একমাত্র পুত্র ইসহাক-কে... কুরবানির জন্য নিয়ে যাও।' এখানে ইসহাক (আলাইহিস সালাম)-কে একমাত্র পুত্র বলা হচ্ছে। অথচ ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম)-এর বয়স যখন ৮৬, তখন তাঁর প্রথম পুত্র ইসমাঈল (আলাইহিস সালাম)-এর জন্ম হয় (দ্রষ্টব্য: পয়দায়েশ ১৬:১৬)। আর ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম)-এর বয়স যখন ১০০, তখন ইসহাক (আলাইহিস সালাম) জন্মগ্রহণ করেন (দ্রষ্টব্য: পয়দায়েশ ২১:৫)। অর্থাৎ, খোদ বাইবেল অনুযায়ী ইসহাক (আলাইহিস সালাম) যখন জন্মগ্রহণ করেন, ততোদিনে ইসমাঈল (আলাইহিস সালাম) বয়স যথারীতি চৌদ্দ। সুতরাং কুরবানির সময় ইসহাক (আলাইহিস সালাম) কিছুতেই ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম)-এর একমাত্র পুত্র হতে পারেন না। বাইবেলে উল্লেখিত 'একমাত্র পুত্র' শব্দগুচ্ছ থেকেও বোঝা যাচ্ছে, এ ঘটনাটি ঘটেছে ইসমাঈল (আলাইহিস সালাম)-এর ক্ষেত্রে; কারণ ইসহাক (আলাইহিস সালাম) এর জন্মের পূর্বে ইসমাঈল (আলাইহিস সালাম) ছিলেন ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম)-এর একমাত্র পুত্র।
পরিশেষে আমাদের আলোচ্য হাদীসের ক্ষেত্রে মনে রাখতে হবে, এ হাদীসের পূর্ণাঙ্গ সনদ (বর্ণনা- পরম্পরা) হলো: আবদুল্লাহ লাইছ ইবনু খালিদ আবু বকর বালখি মুহাম্মদ ইবনু ছাবিত আব্দি মূসা ইবনু আবী বাকর সাঈদ ইবনু জুবাইর। প্রথমত এটি একটি মাকতু' হাদীস-যার
বর্ণনা পরম্পরা তাবিয়ি পর্যন্ত গিয়ে শেষ হয়ে গিয়েছে। উসূলুল হাদীসের নিয়মানুযায়ী, বিশুদ্ধ বর্ণনার পরিপন্থী হলে মাকতু' হাদীস কোনো আইনগত প্রমাণের মর্যাদা লাভ করে না। ইতোমধ্যে উল্লেখ করা হয়েছে যে এর তথ্য কুরআনের বক্তব্যের পরিপন্থী। দ্বিতীয়ত, গ্রন্থটি ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বলের হলেও এর মূল বর্ণনাকারী হলেন তাঁর পুত্র আবদুল্লাহ ইবনু আহমাদ ইবনি হাম্বাল। অথচ তিনি এ হাদীসটি তাঁর পিতার সূত্রে বর্ণনা না করে লাইছ ইবনু খালিদ-এর সূত্রে বর্ণনা করেছেন। সুতরাং এটি আহমাদ ইবনু হাম্বলের বর্ণনা নয়। ইবনু কাসীর তাঁর আল-বিদায়াহ ওয়ান-নিহায়াহ গ্রন্থে (বাইতুল আফকার সংস্করণ, পৃ. ১০৫) আহমাদ ইবনু হাম্বলের মতটি উল্লেখ করেছেন-তাতে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, জবাইয়ের জন্য যাকে নেওয়া হয়েছিল তিনি ছিলেন ইসমাঈল (আলাইহিস সালাম)। অনুবাদক।

📘 রাসুলের চোখে দুনিয়া > 📄 ইউসুফ (আলাইহিস সালাম) ও দুনিয়া

📄 ইউসুফ (আলাইহিস সালাম) ও দুনিয়া


তাঁর শোকে মুহ্যমান পিতা
[২৭০] ইয়াহইয়া ইবনু সুলাইম (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'মৃত্যুর ফেরেশতার নিকট ইয়াকূব (আলাইহিস সালাম) ছিলেন দুনিয়াবাসীদের মধ্যে সবচেয়ে সম্মানিত ব্যক্তি। ইয়াকূব (আলাইহিস সালাম)-এর নিকট আসার জন্য মৃত্যুর ফেরেশতা (আলাইহিস সালাম) তাঁর মহামহিম রবের নিকট অনুমতি চাইলে তাঁকে অনুমতি দেওয়া হলো। তিনি ইয়াকূব (আলাইহিস সালাম)-এর নিকট আসলেন। ইয়াকূব (আলাইহিস সালাম) তাঁকে জিজ্ঞাসা করলেন,
يَا مَلَكَ الْمَوْتِ أَسْأَلُكَ بِالَّذِي خَلَقَكَ هَلْ قَبَضْتَ نَفْسَ يُوْسُفَ فِيْمَنْ قَبَضْتَ مِنَ النُّفُوسِ
"ওহে মৃত্যুর ফেরেশতা! আমি তোমাকে সেই সত্তার নামে জিজ্ঞাসা করছি—যিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন। তুমি যাদের মৃত্যু কার্যকর করেছো—তাদের মধ্যে কি ইউসুফ আছে?” তিনি বললেন, 'না।' মৃত্যুর ফেরেশতা [স্বপ্রণোদিত হয়ে] বললেন, 'ইয়াকূব! আমি কি আপনাকে কিছু বাক্য শেখাবো না?' ইয়াকূব (আলাইহিস সালাম) বললেন, “হাঁ অবশ্যই! কেন নয়!” তিনি বললেন, 'তাহলে বলুন,
يَا ذَا الْمَعْرُوْفِ الَّذِي لَا يَنْقَطِعُ أَبَدًا وَلَا يُحْصِيْهِ غَيْرُهُ
“ওহে কল্যাণের অধিপতি, অনন্ত, অসীম!” ইয়াকূব (আলাইহিস সালাম) সেই রাতে এ দুআ পড়তে থাকেন। প্রভাতের আগেই [ইউসুফ (আলাইহিস সালাম)-এর] জামা তাঁর চেহারার উপর নিক্ষেপ করা হয়; আর অমনিই তিনি দৃষ্টিশক্তি ফিরে পান।'
কারাগার থেকে মুক্তি লাভের দু'আ
[২৭১] আবু আবদিল্লাহ (রহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'জিবরাঈল (আলাইহিস সালাম) ইউসুফ (আলাইহিস সালাম) এর নিকট এসে জিজ্ঞাসা করলেন, 'কারাবাস কি আপনার জন্য কষ্টকর হয়ে উঠেছে?' তিনি বললেন, "হ্যাঁ!" জিবরাঈল (আলাইহিস সালাম) বললেন, তাহলে আল্লাহকে। বলুন,
اللهم اجْعَل لِي مِنْ كُلِّ مَا أَهَمَّنِي وَكَرَبَنِي مِنْ أَمْرِ دُنْيَايَ وَأَمْرِ آخِرَتِي فَرِجًا وَمَخْرَجًا وَارْزُقْنِي مِنْ حَيْثُ لَا أَحْتَسِبُ وَاغْفِرْ لِي ذَنْبِي وَثَبِّتْ رَجَائِي وَاقْطَعْهُ عَمَّنْ سِوَاكَ حَتَّى لَا أَرْجُو أَحَدًا غَيْرَكَ
"হে আল্লাহ! আমার পার্থিব ও পরকালীন যেসব বিষয় আমাকে দুঃখ-দুর্দশার মধ্যে নিক্ষেপ করেছে—তার প্রত্যেকটি থেকে মুক্তি ও উত্তরণের রাস্তা বের করে দাও! আমার কল্পনার বাইরের উৎস থেকে আমাকে জীবনোপকরণ দাও! আমার গুনাহ ক্ষমা করো; আমার প্রত্যাশায় দৃঢ়তা দাও; তুমি ছাড়া প্রত্যাশার অন্যান্য উৎসগুলোকে ছিন্ন করে দাও—আমি যেন তোমাকে ছাড়া অন্য কাউকে প্রত্যাশা না করি।"
মানুষের কাছে সাহায্য কামনা করায় তাঁকে আরো দীর্ঘসময় জেলে থাকতে হলো
[২৭২] হাসান (রহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'আল্লাহ'র নবি (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,
رَحِمَ اللهُ يُوْسُفَ لَوْلَا كَلِمَتُهُ مَا لَبِثَ فِي السِّجْنِ طُوْلَ مَا لَبِثَ
"আল্লাহ ইউসুফের প্রতি সদয় হোন! তিনি একটি কথা না বললে এতো দীর্ঘ সময় তাঁকে জেলখানায় থাকতে হতো না।" কথাটি ছিল, [জেল থেকে মুক্তি লাভকারী এক কয়েদিকে তিনি বলেছিলেন,]
“اُذْكُرْنِي عِنْدَ رَبِّكَ তোমার মনিবের নিকট আমার বিষয়টি তুলে ধরো। (সূরা ইউসুফ ১২:৪২)"
অতঃপর হাসান (রহিমাহুল্লাহ) কাঁদতে কাঁদতে বলতে থাকেন, 'আর আমাদের দশা হলো—একটু বিপদ আসতেই আমরা তাড়াহুড়ো করে মানুষের শরণাপন্ন হই!'
ধৈর্যের পরাকাষ্ঠা
[২৭৩] হাসান (রহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'আল্লাহ'র নবি (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,
رَحِمَ اللَّهُ يُوسُفَ لَوْ أَنِّي جَاءَنِي الرَّسُولُ بَعْدَ طُولِ السِّجْنِ لأَسْرَعْتُ لِلإِجَابَةِ "আল্লাহ ইউসুফের প্রতি সদয় হোন! দীর্ঘ কারাভোগের পর [জেল থেকে মুক্তির বার্তা নিয়ে] বার্তাবাহক যদি স্বয়ং আমার নিকটও আসতো, তাহলে আমিও দ্রুত সাড়া দিতাম।"⁶
আয়ুষ্কাল
[২৭৪] হাসান (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'ইউসুফ (আলাইহিস সালাম)-কে যখন কুয়োয় নিক্ষেপ করা হয়, তখন তাঁর বয়স ছিল সতেরো। তারপর গোলামি, কারাবাস ও রাষ্ট্রশাসনে কেটেছে আশি বছর। সবকিছু গোছানোর পর তিনি বেঁচে ছিলেন তিপ্পান্ন বছর।'
মানুষের কাছে সাহায্য কামনা করায় আল্লাহ তাআলার তিরস্কার
[২৭৫] আনাস (রদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'আল্লাহ তাআলা ইউসুফ (আলাইহিস সালাম)-এর নিকট ওহির মাধ্যমে বললেন,
مَنْ اسْتَنْقَذَكَ مِنَ الْقَتْلِ إِذْ هَمَّ إِخْوَتُكَ أَنْ يَقْتُلُوكَ "তোমার ভাইয়েরা যখন তোমাকে হত্যা করতে চেয়েছিলো, তখন তোমাকে কে বাঁচিয়েছে?” ইউসুফ (আলাইহিস সালাম) বললেন, “أَنْتَ يَا رَبِّ হে আমার রব! তুমিই।” আল্লাহ বললেন, “فَمَنْ اسْتَنْقَذَكَ مِنَ الْجُبِّ إِذْ أَلْقَوْكَ فِيْهِ আচ্ছা! তারা যখন তোমাকে কুয়োয় নিক্ষেপ করেছিলো, তখন সেখান থেকে তোমাকে কে বাঁচিয়েছে?" ইউসুফ (আলাইহিস সালাম) বললেন, “أَنْتَ يَا رَبِّ হে আমার রব! তুমি।" আল্লাহ বললেন, “فَمَا لَكَ ذَكَرْتَ آدَمِيًّا وَنَسِيْتَنِي তাহলে তোমার কী হলো! [জেল থেকে মুক্তি
পাওয়ার জন্য] তুমি একজন মানুষকে স্মরণ করলে, আর আমাকে ভুলে গেলে?" [দ্রষ্টব্য: সূরা ইউসুফ ১২:৪২] ইউসুফ (আলাইহিস সালাম) বললেন, “كَلِمَةً تَكَلَّمَ بِهَا لِسَانِي এটি ছিল আমার মুখ থেকে উচ্চারিত একটি কথা।" আল্লাহ বললেন, “فَوَعِزَّتِي لَأُخْلِدَنَّكَ السِّجْنَ بِضْعَ سِنِينَ আমার সম্মানের শপথ! আমি তোমাকে [আরো] কয়েক বছর জেলখানায় রাখবো।"'
পুত্রশোকে পিতার কান্না
[২৭৬] হাসান (রহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ইউসুফ (আলাইহিস সালাম)-এর শোকে ইয়াকূব (আলাইহিস সালাম) আশি বছর কেঁদেছিলেন। অথচ তখন তিনি ছিলেন দুনিয়াবাসীদের মধ্যে আল্লাহ তাআলা'র নিকট সবচেয়ে সম্মানিত ব্যক্তি!'
স্বপ্ন ও স্বপ্নের প্রতিফলন
[২৭৭] হাসান (রহيمাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'ইউসুফ (আলাইহিস সালাম)-এর স্বপ্ন ও তার বাস্তব প্রতিফলনের মাঝখানে ব্যবধান ছিল আশি বছর।'
দুশ্চিন্তা ও গ্লানি মানুষের সামনে হতাশার সুরে ব্যক্ত করা অনুচিত
[২৭৮] হাবীব (রহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'এক ব্যক্তি আল্লাহ'র নবি ইয়া'কূব (আলাইহিস সালাম)-এর পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। তখন তাঁর ভ্রুসমূহ চক্ষুযুগলকে আচ্ছন্ন করে রেখেছিল; এক টুকরো ছিন্ন বস্ত্র দিয়ে তিনি ভ্রুগুলো তুলে ধরলেন। লোকটি জিজ্ঞাসা করলো, 'হে আল্লাহ'র নবি! আপনার কী হয়েছে? আমি কী দেখতে পাচ্ছি?' তিনি বললেন,
“طُوْلُ الزَّمَانِ وَكَثْرَةُ الْأَحْزَانِ [এর নেপথ্যে রয়েছে] সুদীর্ঘ সময় ও দুশ্চিন্তার আধিক্য!” এ কথার প্রেক্ষিতে আল্লাহ তাআলা তাঁর নিকট ওহি পাঠালেন, "یا يَعْقُوبُ تَشْكُوْنِي ইয়াকূব! তুমি কি আমার ব্যাপারে অভিযোগ করছো?” ইয়াকুব (আলাইহিস সালাম) বললেন, “رَبِّ خَطِيئَةٌ فَاغْفِرْهَا হে আমার রব! আমার ভুল হয়ে গেছে; ক্ষমা করে দাও।"
টিকাঃ
৬. এর মাধ্যমে নবি (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ইউসুফ (আলাইহিস সালাম)-এর ধৈর্যের প্রশংসা করেছেন। দীর্ঘ কারাভোগের পর জেল কর্তৃপক্ষ ইউসুফ (আলাইহিস সালাম)-এর মুক্তির বার্তা নিয়ে আসে। তিনি জেল থেকে না বেরিয়ে উলটো কর্তৃপক্ষের নিকট তাঁর নির্দোষ কারাবাসের কৈফিয়ত তলব করে বসেন! ফলে রাজা এ বিষয়ে একটি তদন্ত কমিশন গঠন করেন। কমিশনের তদন্তে ইউসুফ (আলাইহিস সালাম)-এর নির্দোষত্ব প্রমাণিত হওয়ার পর তিনি জেল থেকে বেরিয়ে আসেন। বিস্তারিত জানার জন্য দেখুন: সূরা ইউসুফ ১২:৫০-৫৪। [অনুবাদক]

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00