📘 রাসুলের চোখে দুনিয়া > 📄 মুহাম্মাদ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ও দুনিয়া

📄 মুহাম্মাদ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ও দুনিয়া


মাসজিদে যাওয়ার গুরুত্ব
[১] আবূ হুরায়রা (রদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, নবি (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,
مَنْ غَدًا إِلَى الْمَسْجِدِ أَوْ رَاحَ أَعَدَّ اللهُ عَزَّ وَجَلَّ لَهُ فِي الْجَنَّةِ نُزُلًا كُلَّمَا غَدَا أَوْ راح
"যে ব্যক্তি সকাল-সন্ধ্যায় মাসজিদে আসা-যাওয়া করে, তার প্রত্যেকবার আসা-যাওয়ার সময় আল্লাহ তাআলা তার জন্য জান্নাতে একটি করে আবাস প্রস্তুত করে দেন।"
সারা রাত ঘুমে কাটিয়ে দেওয়ার নিন্দা
[২] আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ (রদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নিকট এমন এক ব্যক্তির কথা উল্লেখ করা হলো-যে সারা রাত ঘুমিয়ে সকালবেলা ঘুম থেকে জেগে উঠেছে। নবি (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন,
ذَاكَ رَجُلٌ بَالَ الشَّيْطَانُ فِي أُذُنِهِ أَوْ أُذْنَيْهِ
"সে তো এমন লোক যার এক কানে অথবা দুই কানে শয়তান পেশাব করে দিয়েছে।"
সালাতের ধরন
[৩] আলকামা (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, আমি আয়িশা (রদিয়াল্লাহু আনহা)-কে জিজ্ঞাসা করলাম, 'রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সালাতের ধরন কেমন ছিল?' জবাবে তিনি বললেন, 'তোমাদের মধ্যে এমন কে আছে, যে রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর ন্যায় সালাত আদায় করতে সক্ষম? তাঁর আমল ছিল মুষলধারে বৃষ্টির ন্যায় অবিরাম।'
রুকু ও সাজদায় পঠিত তাসবীহ
[৪] আয়িশা (রদিয়াল্লাহু আনহা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) রুকু ও সাজদায় এসব তাসবীহ অধিক পরিমাণে পাঠ করতেন-
سُبْحَانَكَ اللَّهُمَّ رَبَّنَا وَبِحَمْدِكَ اللَّهُمَّ اغْفِرْ لِي
"হে আল্লাহ! আমাদের রব! আমি তোমার পবিত্রতার ঘোষণা দিচ্ছি, হে আল্লাহ! আমি তোমার প্রশংসা বর্ণনা করছি, আমাকে ক্ষমা করে দাও।" এটি ছিল কুরআনে [সূরা আন-নাছর-এ] বর্ণিত নির্দেশের অনুসরণ।' [তুলনীয়: বুখারি, সহীহ, অধ্যায় ৬৫, সূরা ১১০, পরিচ্ছেদ ২, হাদীস নং ৪৯৬৮ (বাইতুল আফকার সংস্করণ)]
বর্ম বন্ধক রেখে ইয়াহূদির নিকট থেকে খাবার ক্রয়
[৫] আয়িশা (রদিয়াল্লাহু আনহা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এক ইয়াহুদির নিকট থেকে বাকিতে খাবার কিনেছিলেন, আর জামানত হিসেবে ইয়াহুদিকে দিয়েছিলেন নিজের বর্ম।' [তুলনীয়: হাদীস নং ৯; ১০; ১৯৫]
উত্তম আচরণ
[৬] আবূ আব্দিল্লাহ জাদালি (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, আমি আয়িশা (রদিয়াল্লাহু আনহা)-কে জিজ্ঞাসা করলাম, 'পরিবারের লোকদের সাথে রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর আচরণ কেমন ছিল?' জবাবে তিনি বললেন, 'আচরণের দিক দিয়ে তিনি ছিলেন সর্বোত্তম মানুষ। তিনি কখনো
কাউকে অশিষ্ট কথা বলতেন না, গালমন্দ করতেন না, বাজারে গিয়ে খেয়ে, করতেন না, মন্দ আচরণের বিপরীতে মন্দ আচরণ করতেন না, বরং ক্ষমার নীতি অবলম্বন করতেন।'
ঘরোয়া কাজ
[৭] একব্যক্তি আয়িশা (রাদিয়াল্লাহু আনহা)-এর নিকট জানতে চাইলেন, 'রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নিজের ঘরে কী কাজ করতেন?' জবাবে তিনি বলেন, 'তিনি ছেঁড়া জামা তালি দেওয়া, জুতা মেরামত করা ও এ ধরনের অন্যান্য কাজ করতেন।' [তুলনীয়: হাদীস নং ৮; ২১০]
[৮] আসওয়াদ (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, আমি আয়িশা (রাদিয়াল্লাহু আনহা)-কে জিজ্ঞাসা করলাম, 'রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ঘরে ঢুকে কী কাজ করতেন?' তিনি জবাব দিলেন, 'ঘরের লোকদের কাজে সহযোগিতা করতেন, আর সালাতের সময় হলে ঘর থেকে বেরিয়ে সালাত আদায় করতেন।' [তুলনীয়: হাদীস নং ৭; ২১০]
ইন্তেকালের সময় রেখে যাওয়া সম্পদ
[৯] আয়িশা (রাদিয়াল্লাহু আনহা) বলেন, 'রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) [ইন্তেকালের সময়] দীনার, দিরহাম, ভেড়া, উট-এসবের কোনো কিছুই রেখে যাননি; এবং তিনি কোনো কিছুর ওসিয়তও করে যাননি।' [তুলনীয়: হাদীস নং ৫; ১০; ১৯৫]
[১০] ইবনু আব্বাস (রাদিয়াল্লাহু আনহুমা) বলেন, 'ইন্তেকালের সময় রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) দীনার-দিরহাম কিংবা দাস-দাসী-কোনো কিছুই রেখে যাননি; তিনি রেখে গিয়েছিলেন একটি বর্ম-যা ত্রিশ সা' খাদ্যদ্রব্যের জামানত হিসেবে এক ইয়াহুদির নিকট সংরক্ষিত ছিল।' [তুলনীয়: হাদীস নং ৫; ৯; ১৯৫]
কখনও খাবারের দোষ অন্বেষণ করতেন না
[১১] আবূ হুরায়রা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, 'রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কখনো কোনো খাবারের দোষ অন্বেষণ করতেন না; পছন্দ হলে
খেতেন, নতুবা খেতেন না।' [তুলনীয়: হাদীস নং ১৪]
দানশীলতা
[১২] জাবির ইবনু আব্দিল্লাহ (রdiয়াল্লাহু আনহু) বলেন, 'রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নিকট কিছু চাওয়া হলে তিনি কখনো 'না' বলেননি।'
দারিদ্র্য
[১৩] আনাস (রদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, 'একদিন রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছিলেন,
وَالَّذِي نَفْسُ مُحَمَّدٍ بِيَدِهِ مَا أَمْسَى فِي آلِ مُحَمَّدٍ صَاعٌ مِّنْ حَبُّ وَلَا صَاعٌ مِّنْ تَمْرٍ
"তাঁর শপথ-যার হাতে মুহাম্মদের প্রাণ! মুহাম্মদের পরিবারবর্গের উপর এমন কোনো সন্ধ্যা অতিক্রান্ত হয়নি, যখন তাঁদের নিকট এক সা' পরিমাণ শস্য কিংবা খেজুর ছিল।" অথচ তখন তাঁর ছিল নয়জন স্ত্রী ও নয়টি ঘর।'
[১৪] আবূ হুরায়রা (রদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, 'রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কখনো কোনো খাবারের দোষ অন্বেষণ করতেন না; পছন্দ হলে খেতেন, নতুবা চুপ থাকতেন।' [তুলনীয়: হাদীস নং ১১]
ইয়াহূদির নিমন্ত্রণে সাড়া
[১৫] আনাস (রদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, 'এক ইয়াহুদি রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে যবের রুটি ও বাসি গন্ধযুক্ত চর্বি খাওয়ার জন্য ডাকলে তিনি তার ডাকে সাড়া দিয়েছিলেন।'
দীর্ঘ সময় পর্যন্ত তাঁর নিকট কোনো খাবার ছিল না
[১৬] কুররা ইবনু ইয়াস মুযানি (রদিয়াল্লাহু আনহু) তাঁর ছেলেকে বলেন, 'আমরা এক দীর্ঘসময় আমাদের নবি (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সাথে অতিক্রম করেছি, যখন আমাদের নিকট দুই কালো খাবারের কোনোটিই
ছিল না। তুমি কি জানো, দুই কালো খাবার কী? ছেলে জবাব দিলেন, 'না।' তিনি বললেন, 'খেজুর ও পানি।'
কখনো পেটভরে গমের রুটি খাননি
[১৭] আয়িশা (রাদিয়াল্লাহু আনহা) বলেন, 'হায় আফসোস! নবি (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়েছেন; তিনি তো পেটভরে গমের রুটি খাননি!'
ঘরে একমাস পর্যন্ত রুটি বানানো হয়নি
[১৮] আয়িশা (রাদিয়াল্লাহু আনহা) বলেন, 'মুহাম্মদ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর পরিবারবর্গের উপর কখনো কখনো একমাস অতিক্রান্ত হয়ে যেতো, অথচ কোনো রুটি বানানো হতো না। বর্ণনাকারী বলেন, আমি বললাম, 'হে উম্মুল মুমিনীন! তাহলে রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কী খেয়ে থাকতেন?' তিনি জবাব দিলেন, 'আমাদের প্রতিবেশী ছিল কতিপয় আনসার—আল্লাহ তাঁদের উত্তম প্রতিদান দিন—তাঁরা রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে কিছু দুধ উপহার দিতেন।' [তুলনীয়: হাদীস নং ১৫৩]
খাবার গ্রহণে বিনয়
[১৯] আতা ইবনু আবী রবাহ (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'একব্যক্তি নবি (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর গৃহে প্রবেশ করলো; তখন তিনি একটি বালিশে হেলান দেওয়া, আর সামনে একটি ট্রে'র উপর কিছু রুটি রাখা। তিনি রুটিগুলো নিচে নামিয়ে রেখে বালিশটি সরিয়ে দিলেন। অতঃপর বললেন,
إِنَّمَا أَنَا عَبْدُ آكُلُ كَمَا يَأْكُلُ الْعَبْدُ وَأَجْلِسُ كَمَا يَجْلِسُ الْعَبْدُ
"আমি তো নিছক একজন দাস। দাস যেভাবে খায় আমিও সেভাবে খাই; দাস যেভাবে বসে আমিও সেভাবে বসি।" [তুলনীয়: হাদীস নং ২১]
দীর্ঘদিন পেটভরে উষ্ণ খাবার খাননি
[২০] আবূ সালিহ (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, 'নবি (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে একবার খানা খাওয়ার জন্য ডাকা হলো। খানা শেষে তিনি আল্লাহ
তাআলা'র প্রশংসা করে বললেন,
مَا مَلَأَتْ بَطْنِي بِطَعَامٍ سَخْنٍ مُنْذُ كَذَا وَكَذَا
"অমুক দিন থেকে আমি পেটভরে উষ্ণ খাবার খাইনি।"
[২১] হাসান (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নিকট কোনো খাবার আনা হলে তিনি তা মাটিতে নামিয়ে রাখার নির্দেশ দিয়ে বলতেন,
إِنَّمَا أَنَا عَبْدُ أَكُلُ كَمَا يَأْكُلُ الْعَبْدُ وَأَجْلِسُ كَمَا يَجْلِسُ الْعَبْدُ
"আমি তো নিছক একজন দাস। দাস যেভাবে খায় আমিও সেভাবে খাই; দাস যেভাবে বসে আমিও সেভাবে বসি।"' [তুলনীয়: হাদীস নং ১৯]
বিলাসী পানীয় পরিহার
[২২] ইয়াযীদ ইবনু আব্দিল্লাহ ইবনি কাসীত (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'যব, চিনি, খেজুর ও কাঠবাদামের মিশ্রণে তৈরি এক বিশেষ তরল খাবার রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সামনে আনা হলো। পানি মেশানোর সময় তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, "مَا هَذَا؟ এটি কী?” তাঁরা বললেন, 'যব, চিনি, খেজুর ও কাঠবাদাম মিশ্রিত খাবার।' তিনি বললেন,
أَخْرُوْهُ عَنِّى هَذَا شَرَابُ الْمُتْرَفِينَ
"এটি আমার কাছ থেকে সরাও; এটি বিলাসী মানুষের পানীয়।"
বিলাসিতা থেকে দূরে থাকার নির্দেশ
[২৩] মুআয ইবনু জাবাল (রদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, 'রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁকে ইয়েমেনে (গভর্নর হিসেবে) পাঠানোর সময় বলেন,
إِيَّاكَ وَالتَّنَعُمَ فَإِنَّ عِبَادَ اللَّهِ لَيْسُوا بِالْمُتَنَعَمِينَ
"বিলাসিতা থেকে দূরে থেকো, কারণ আল্লাহ'র বান্দারা বিলাসী হয় না।"
জামার আস্তিনের দৈর্ঘ্য
[২৪] বাদিল উকবালি (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'নবি (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর জামার আস্তিন কব্জি পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল।'
এক সাহাবির জামার দীর্ঘ হাতা কেটে দেন
[২৫] আলি ইবনু ইয়াযীদ (রহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, 'রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আলা ইবনুল হাদরামি (রদিয়াল্লাহু আনহু)-এর গায়ে একটি কাতারি জামা দেখতে পান-যার দু হাতা ছিল অনেক দীর্ঘ। নবি (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) একটি কাঁচি আনার নির্দেশ দেন; তারপর আঙুলের প্রান্তভাগ থেকে আস্তিনদুটিকে কেটে দেন।'
তিনি যেসব পোশাক পরতেন না
[২৬] ইমরান ইবনু হুসাইন (রদিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণিত, 'রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,
لَا أَرْكَبُ الْأَرْجُوَانَ وَلَا أَلْبَسُ الْمُعَصْفَرَ وَلَا أَلْبَسُ الْقَمِيصَ الْمُكَفَّفَ بِالْحَرِيرِ
"আমি রক্তবর্ণ (purple) ও লাল (safflower) রঙের পোশাক পরিধান করি না; আর এমন জামাও গায়ে দিই না, যার মধ্যে রেশম (silk) লাগানো হয়েছে।" হাসান (রহিমাহুল্লাহ) তাঁর জামার বুকপকেটের দিকে ইশারা করে বলেন, 'মনে রাখবে! পুরুষের প্রসাধনী হল রঙবিহীন সুগন্ধি, আর নারীর প্রসাধনী হল ঘ্রাণবিহীন রঙ।''
ইন্তেকালের সময় রেখে যাওয়া সম্পদ
[২৭] আমর ইবনু মুহাজির (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'উমার ইবনু আব্দিল আযীয (রহিমাহুল্লাহ)-এর একটি ঘর ছিল-যেখানে তিনি প্রায়শ নির্জন সময় কাটাতেন। ঘরটিতে ছিল রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর কিছু জিনিসপত্র। সেখানে ছিল খেজুর পাতার বিছানাসহ একটি খাট, কাঠের একটি অমসৃণ পাত্র-যা থেকে তিনি পানি পান করতেন, একটি ভগ্ন-মাথা মাটির পাত্র-যেখানে তিনি বিভিন্ন জিনিস রাখতেন, আর একটি চামড়ার বালিশ- যার ভেতর ছিল খেজুর গাছের আঁশ কিংবা রাবারসদৃশ ধুলামলিন সস্তা মখমল; দীর্ঘদিন ব্যবহারের ফলে বালিশটিতে রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর চুলের ছাপ লেগে আছে। [কুরাইশদেরকে এগুলো দেখিয়ে] উমার ইবনু আব্দিল আযীয (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'ওহে কুরাইশ! এ উত্তরাধিকার তো সেই ব্যক্তির যার বদৌলতে আল্লাহ তাআলা তোমাদের সম্মান ও প্রভাব প্রতিপত্তির অধিকারী বানিয়েছেন! তোমরা যা দেখতে পাচ্ছো-তা রেখেই তিনি দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়েছেন!'
ছবি-সজ্জিত ঘরে তিনি প্রবেশ করেননি
[২৮] সাফীনা (রহিমাহাল্লাহ) থেকে বর্ণিত, 'একব্যক্তি আলি (রদিয়াল্লাহু আনহু)-কে দাওয়াত দিয়ে কিছু খাবারের আয়োজন করেন। ফাতিমা (রদিয়াল্লাহু আনহা) বললেন, রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে দাওয়াত দিলে তিনি আমাদের সাথে খেতে পারতেন! ফলে তাঁরা তাঁকে দাওয়াত দেন। নবি (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এসে দরজার কাঠে হাত রেখে দেখতে পান-ঘরের কোণে একটি পর্দার উপর ছবি রয়েছে। ফলে তিনি ফিরে যান। তখন ফাতিমা (রদিয়াল্লাহু আনহা) বললেন, তাঁর কাছে গিয়ে জিজ্ঞাসা করো [এরূপ করার কারণ কী?]। রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন,
إِنَّهُ لَيْسَ لِى أَوْ لِنَبِيَّ أَنْ يَدْخُلَ بَيْتًا مُزَوَّقًا "ছবি-সজ্জিত কোনো ঘরে প্রবেশ করা আমার জন্য অথবা কোনো নবির জন্য শোভনীয় নয়।"
পোশাকে বিনয় ঈমানের অংশ
[২৯] আবূ উমামা (রদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,
الْبَذَاذَةُ مِنَ الْإِيْمَانِ الْبَذَاذَةُ مِنَ الْإِيْمَانِ الْبَذَاذَةُ مِنَ الْإِيْمَانِ "জীর্ণতা ঈমানের অংশ, জীর্ণতা ঈমানের অংশ, জীর্ণতা ঈমানের অংশ।"
বর্ণনাকারী আবদুল্লাহ (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, আমি আমার পিতাকে জিজ্ঞাসা করলাম-'জীর্ণতা' কী? তিনি জবাব দিলেন-জীর্ণতা হলো التَّواضُعُ فِي اللُّبَاسِ পোশাকে বিনয়।'
আহলুস-সুফফার সাহাবিদের কাপড়ের টানাপড়েন
[৩০] আবূ হুরায়রা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, 'আমি আহলুস-সুফফা'র সত্তর ব্যক্তিকে দেখেছি-যারা একটিমাত্র কাপড় পরিধান করে সালাত আদায় করছেন। তাঁদের কারো কাপড় ছিল হাঁটু পর্যন্ত, আর কারো ছিল হাঁটুর একটু নিচ পর্যন্ত। যখন তাঁদের কেউ রুকূতে যেতো, তখন সতর প্রকাশিত হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় কাপড় টেনে ধরে রাখতেন।' [তুলনীয়: হাদীস নং ১৭৭; ১৭৮]
তাঁর স্ত্রীগণ উলের বস্ত্র পরিধান করতেন
[৩১] আয়িশা (রাদিয়াল্লাহু আনহা) থেকে বর্ণিত, 'নবি (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর স্ত্রীদের পরিধেয় বস্ত্রসমূহ ছিল উলের।' [তুলনীয়: হাদীস নং ৭৪]
সফরে কয়েকজন সিয়ামহীন সাহাবির প্রশংসা
[৩২] আনাস ইবনু মালিক (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, 'আমরা নবি (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সাথে এক সফরে বের হলাম। আমাদের মধ্যে একদল সিয়াম পালন করছিলেন; অপরদল ছিলেন সিয়ামহীন। প্রচণ্ড গরমের একদিন আমরা যাত্রাবিরতি দিলাম। আমাদের মধ্যে তাঁরাই ছিলেন সবচেয়ে বেশি ছায়া লাভকারী, যারা কাপড় দিয়ে নিজেদেরকে ঢাকতে পেরেছিলেন! আমাদের মধ্যে কেউ কেউ আবার নিজের হাত দিয়ে সূর্যের উত্তাপ থেকে বাঁচার চেষ্টা করছিলেন। সিয়াম পালনকারীরা নেতিয়ে পড়লেন; আর সিয়ামহীন ব্যক্তিরা তাঁবু টানানো, উটগুলোকে পানি পান করানোসহ নানা কাজ আঞ্জাম দিতে থাকলেন। [এ দৃশ্য দেখে] রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন,
ذَهَبَ الْمُفْطِرُوْنَ الْيَوْمَ بِالْأَجْرِ "আজ তো [সকল] সাওয়াব সিয়ামহীন লোকেরাই নিয়ে গেলো!"' প্রতিদিন একশত বার ক্ষমা প্রার্থনা ও অনুশোচনা
[৩৩] আবূ হুরায়রা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, 'রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,
إِنِّي لَأَسْتَغْفِرُ اللهَ عَزَّ وَجَلَّ وَ أَتُوْبُ إِلَيْهِ كُلَّ يَوْمٍ مِأَةَ مَرَّةٍ "আমি প্রত্যেক দিন আল্লাহ তাআলা'র নিকট একশত বার ক্ষমা প্রার্থনা ও অনুশোচনা করি।” [তুলনীয়: হাদীস নং ১৮৭]
দুনিয়ার জীবন গ্রীষ্মকালীন সফরের খানিক বিরতির চেয়ে বেশি কিছু নয়
[৩৪] আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ (রদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, নবি (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,
مَا لِي وَلِلدُّنْيَا إِنَّمَا مَثَلِي وَ مَثَلُ الدُّنْيَا كَمَثَلِ رَاكِبٍ قَالَ فِي ظِلَّ شَجَرَةٍ فِي يَوْمٍ صَائِفٍ ثُمَّ رَاحَ وَ تَرَكَهَا "এ দুনিয়ার সাথে আমার কী সম্পর্ক? এ দুনিয়ার সাথে আমার দৃষ্টান্ত হলো এমন এক অশ্বারোহীর ন্যায় যে প্রচণ্ড গরমের একদিন একটি গাছের ছায়ায় ঈষৎ নিদ্রা গেল, তারপর কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে সেখান থেকে চলে গেলো।” [তুলনীয়: হাদীস নং ৬৪ ও ৭২]
স্রেফ প্রয়োজনমাফিক খাবারের জন্য আল্লাহর নিকট দুআ
[৩৫] আবূ হুরায়রা (রদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, 'রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,
اللَّهُمَّ اجْعَلْ رِزْقَ آلِ مُحَمَّدٍ قُوْتًا "হে আল্লাহ! মুহাম্মাদের পরিবারবর্গের জন্য যেটুকু প্রয়োজন সেটুকু খাবারের ব্যবস্থা করে দাও!"
জীবনের নিগূঢ় রহস্য জানতে পারলে মানুষ অল্প হাসতো ও অধিক কাঁদতো
[৩৬] আবূ হুরায়রা (রদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, 'রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,
وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ لَوْ تَعْلَمُوْنَ مَا أَعْلَمُ لَضَحِكْتُمْ قَلِيْلًا وَلَبَكَيْتُمْ كَثِيرًا "যার হাতে আমার প্রাণ, তাঁর শপথ! আমি যা জানি তা যদি তোমরা জানতে, তাহলে অল্প হাসতে এবং অধিক পরিমাণ কাঁদতে।" ' [তুলনীয়:
হাদীস নং ১৪২।
আগামীকালের জন্য খাবার মজুদ করার উপর নিষেধাজ্ঞা
[৩৭] আনাস ইবনু মালিক (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, 'নবি (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে তিনটি পাখি উপহার দেওয়া হয়েছিল। তাঁর সেবিকা একটি পাখি [তাঁকে] খাওয়ালেন। পরদিন আবার পাখি [র গোশত] হাজির করা হলে, রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাকে বললেন, أَلَمْ أَنْهَكِ أَنْ تَرْفَعِي شَيْئًا لِغَدٍ فَإِنَّ اللَّهَ عَزَّ وَجَلَّ يَأْتِي بِرِزْقٍ كُلَّ غَدٍ "আমি কি তোমাকে আগামীকালের জন্য কোনো কিছু তুলে রাখতে নিষেধ করিনি? আল্লাহ তাআলাই তো প্রত্যেক আগামীকাল জীবিকার ব্যবস্থা করে দিবেন।"
কাঠ বা টিনের গোল পাত্রে খাবার খেতেন
[৩৮] আনাস ইবনু মালিক (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) টেবিল ও মসৃণ পাত্রে খাবার খাননি; তিনি বড় আকারের পাতলা রুটিও খাননি। জিজ্ঞাসা করা হলো, 'তাহলে তাঁরা কিসে খাবার খেতেন?' আনাস বললেন, 'কাঠ বা টিনের গোল পাত্রে।'
ন্যূনতম জীবনোপকরণে পরিতৃপ্তিই সফলতার পরিচায়ক
[৩৯] আবদুল্লাহ ইবনু আমর ইবনিল আস (রাদিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণিত, 'রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, قَدْ أَفْلَحَ مَنْ أَسْلَمَ وَ رُزِقَ كَفَافًا وَقَنَعَهُ اللَّهُ بِمَا أَتَاهُ "সে-ই তো সফল যে [আল্লাহ'র নিকট] আত্মসমর্পণ করেছে, যতোটুকু প্রয়োজন ঠিক ততোটুকু জীবনোপকরণ লাভ করেছে এবং আল্লাহ তাআলা তাকে যা কিছু দিয়েছেন—তাতেই সে পরিতৃপ্ত হয়েছে।"
[৪০] ফুদালা ইবনু উবাইদ (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে বলতে শুনেছেন, طُوبَى لِمَنْ هُدِى إِلَى الْإِسْلَامِ وَكَانَ عَيْشُهُ كَفَافًا وَقَنَع
"সুসংবাদ তার জন্য যে ইসলামের দিশা পেয়েছে, যতোটুকু প্রয়োজন ঠিক ততোটুকু জীবনোপকরণ লাভ করেছে এবং পরিতৃপ্ত হয়েছে।"
প্লেটে কখনো খাবার অবশিষ্ট থাকতো না
[৪১] হাসান (রহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, '[খাওয়া শেষে] রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর প্লেটে কখনো কোনো খাবার অবশিষ্ট থাকতো না।'
দুনিয়াতে মুসাফিরের ন্যায় জীবনযাপন
[৪২] ইবনু উমার (রাদিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমার কাপড় কিংবা শরীরের কোনো এক অংশ ধরে বললেন, يَا عَبْدَ اللهِ كُنْ فِي الدُّنْيَا كَأَنَّكَ غَرِيبٌ أَوْ عَابِرُ سَبِيلٍ وَعُدَّ نَفْسَكَ مِنْ أَهْلِ الْقُبُورِ "আবদুল্লাহ! দুনিয়াতে এমনভাবে থাকো যেন তুমি একজন অপরিচিত ব্যক্তি কিংবা মুসাফির, আর নিজেকে কবরের বাসিন্দাদের অন্যতম হিসেবে গণ্য করো।"'
আগামীকালের অপেক্ষায় না থেকে সময়কে কাজে লাগানো উচিত
[৪৩] মুজাহিদ (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'আমাকে আবদুল্লাহ ইবনু উমার (রাদিয়াল্লাহু আনহুমা) বলেছেন, 'মুজাহিদ! সকালে অবস্থান করে সন্ধ্যাবেলার উপর ভরসা রেখো না, সন্ধ্যায় অবস্থান করে সকালবেলার উপর আস্থাশীল হোয়ো না; আর মৃত্যুর পূর্বে তোমার জীবনকে এবং অসুস্থতার পূর্বে তোমার সুস্থতাকে কাজে লাগাও। কারণ, আবদুল্লাহ! আগামীকাল তোমার নাম কী হতে যাচ্ছে—তা তুমি জানো না।''
জান্নাতবাসীর মৃত্যু নেই
[৪৪] মুহাম্মদ ইবনুল মুনকাদির (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে জিজ্ঞাসা করা হলো, 'জান্নাতবাসীরা কি (কখনো)
ঘুমাবে?' তিনি জবাব দিলেন,
النَّوْمُ أَخُوَ الْمَوْتِ وَأَهْلُ الْجَنَّةِ لَا يَمُوْتُوْنَ "ঘুম হলো মৃত্যুর ভাই; আর জান্নাতবাসীরা [কখনো] মরবে না।"'
ভালো খাবার একলা খেয়ে তৃপ্ত হতেন না
[৪৫] হাসান (রহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, 'রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ‘ضف / বহু হাত’ ছাড়া রুটি ও গোশত খেয়ে তৃপ্ত হতেন না। মালিক (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, ضِغْفٌ মানে কী, তা আমার জানা ছিল না, তাই একজন বেদুইনকে জিজ্ঞাসা করলাম। সে বললো, এটি তো আরবি শব্দ! এর মানে হলো, অনেক লোকের একসাথে বসে খাবার গ্রহণ।'
কৃপণতা না করার উপদেশ
[৪৬] মাসরূক (রহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, 'রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,
أَنْفِقْ بِلَالُ وَلَا تَخْشَ مِنْ ذِي الْعَرْشِ إِقْلَالًا "বিলাল! খরচ করো। এ ভয় কোরো না যে আরশের অধিপতি কমিয়ে দেবেন।" ' [তুলনীয়: হাদীস নং ২৪৪]
কয়েকটি সূরার ভারী নির্দেশ তাঁকে বুড়ো বানিয়ে দিয়েছিল
[৪৭] আবূ বাকর (রদিয়াল্লাহু আনহু) রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে বললেন, 'হে আল্লাহ'র রাসূল, আপনি তো বুড়ো হয়ে গেছেন!' নবি (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) জবাব দিলেন,
شَيْبَتْنِي هُودٌ وَالْوَاقِعَةُ وَعَمَّ يَتَسَاءَلُوْنَ وَإِذَا الشَّمْسُ كُوَّرَتْ "সূরা হুদ, আল-ওয়াকিয়া, আন-নাবা ও আত-তাকভীর—এ চারটি সূরা আমাকে বুড়ো বানিয়ে দিয়েছে।"
আল্লাহর ভয়ে কান্নাকাটি করার চক্ষু লাভের জন্য দুআ
[৪৮] সালিম ইবনু আব্দিল্লাহ (রদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, 'রাসূলুল্লাহ
(সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যেসব দুআ করতেন তার মধ্যে একটি ছিল- اللَّهُمَّ ارْزُقْنِي عَيْنَيْنِ هَطَالَتَيْنِ يَبْكِيَانِ بِذَرْفِ الدُّمُوعِ وَيَشْفِيَانِ مِنْ خَشْيَتِكَ قَبْلَ أَنْ تَكُونَ الدُّمُوعُ دَمًا وَالْأَضْرَاسُ جَمْرًا "হে আল্লাহ! আমাকে অঝোরে কান্নাকাটি করার দুটি চক্ষু দান করো-যা তোমার ভয়ে অশ্রু ঝরিয়ে কাঁদবে এবং [অন্তরকে] রোগমুক্ত করবে, সেই সময় আসার পূর্বে যখন অশ্রু পরিণত হবে রক্তে আর মাড়ির দাঁত পরিণত হবে জ্বলন্ত কয়লায়।"'
অভাব অনটনের সময় বেশি বেশি সালাত আদায় করা উচিত
[৪৯] সাবিত (রদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, 'রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর পরিবারবর্গের সামনে অন্নাভাব দেখা দিলে তিনি তাঁর পরিবারের লোকদেরকে এভাবে ডাকতেন, “يَا أَهْلَاءٌ صَلُّوْا صَلُّوْا ওহে ঘরের বাসিন্দাগণ! সালাত আদায় করো, সালাত আদায় করো।"'
আল্লাহর নিকট সন্তানের ন্যায় সুরক্ষা পাওয়ার জন্য দুআ
[৫০] ইবনু উমার (রদিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণিত, 'রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) দুআর মধ্যে বলতেন, “اللَّهُمَّ وَاقِيَةً كَوَاقِيَةِ الْوَلِيْدِ হে আল্লাহ! আমাদেরকে সুরক্ষা দাও যেভাবে সন্তানকে সুরক্ষা দেওয়া হয়।"'
দুনিয়াপ্রীতি উদ্বেগ ও দুশ্চিন্তা বাড়িয়ে দেয়
[৫১] তাউস (রহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, إِنَّ الزُّهْدَ فِي الدُّنْيَا يُرِيحُ الْقَلْبَ وَالْبَدْنَ وَإِنَّ الرَّغْبَةَ فِي الدُّنْيَا تُطِيْلُ الْهَمَّ وَالْحُزْنَ "দুনিয়া-বিরাগ আত্মা ও দেহকে প্রশান্তি দেয়, আর দুনিয়াপ্রীতি উদ্বেগ ও দুশ্চিন্তাকে বাড়িয়ে দেয়।"'
দুনিয়া বিরাগে পরিশুদ্ধি
[৫২] আবদুল্লাহ ইবনু আমর (রদিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,
صَلَاحُ أَوَّلِ هَذِهِ الْأُمَّةِ بِالزُّهْدِ وَالْيَقِيْنِ وَ يُهْلَكُ آخِرُهَا بِالْبُخْلِ وَالْأَمَلِ
"এই উম্মতের প্রথম অংশটি পরিশুদ্ধি লাভ করেছে দুনিয়া-বিরাগ ও দৃঢ় ঈমানের মাধ্যমে, আর শেষ অংশটি ধ্বংস হবে কৃপণতা ও দীর্ঘ আশার ফলে।"'
বান্দার আমল কমে গেলে আল্লাহ তাকে দুশ্চিন্তার পরীক্ষায় ফেলে দেন
[৫৩] হাকাম (রদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,
إِذَا قَصُرَ الْعَبْدُ فِي الْعَمَلِ إِبْتَلَاهُ اللَّهُ بِالْهَمَّ
"বান্দার আমল কমে গেলে, আল্লাহ তাকে দুশ্চিন্তার পরীক্ষায় ফেলে দেন।"
ধৈর্য ও উদারতা হলো সর্বোত্তম ঈমান
[৫৪] হাসান (রহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, 'এক ব্যক্তি নবি (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নিকট এসে জিজ্ঞাসা করলো-সর্বোত্তম ঈমান কোনটি? নবি (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, “الصَّبْرُ وَالسَّمَاحَةُ ধৈর্য ও উদারতা।"'
যে রিষ্ক ও যিক্র সর্বোত্তম
[৫৫] সাদ ইবনু মালিক (রদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,
خَيْرُ الرِّزْقِ مَا يَكْفِي وَخَيْرُ الذِّكْرِ الْخَفِيُّ
"সর্বোত্তম জীবিকা হলো তা-যা প্রয়োজন পূরণের জন্য যথেষ্ট, আর সর্বোত্তম যিক্ (আল্লাহ'র স্মরণ) হলো তা-যা গোপনে করা হয়।"
আল্লাহর প্রিয় বন্ধুর পার্থিব অবস্থা
[৫৬] আবূ উমামা বাহিলি (রদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আল্লাহ তাআলা'র এ বক্তব্যটি পাঠ করে শুনিয়েছেন,
إِنَّ أَغْبَطَ أَوْلِيَائِي عِنْدِي مُؤْمِنٌ خَفِيْفُ الْحَالِ ذُو حَظٍّ مِنْ صَلَاةٍ أَحْسَنُ عِبَادَةٍ رَبِّهِ وَكَانَ غَامِضًا فِي النَّاسِ لَا يُشَارُ إِلَيْهِ بِالْأَصَابِعِ فَعَجِلَتْ مَنِيَّتُهُ وَقَلَّ تُرَاثُهُ وَقَلَّتْ بَوَاكِيْهِ
"আমার বন্ধুদের মধ্যে আমার নিকট সবচেয়ে সৌভাগ্যবান সেই মুমিন- যার পার্থিব অবস্থা নগণ্য, সালাতের পরিমাণ অধিক, যে উত্তমরূপে স্বীয় রবের দাসত্বকারী, মানুষের নিকট সুপ্ত-যার ফলে লোকেরা তাকে খুব একটা গুরুত্ব দেয় না, যার মৃত্যু হয় দ্রুত, উত্তরাধিকার সম্পদ থাকে অল্প ও [মৃত্যুর পর] কান্নাকাটি করার লোক থাকে কম।"'
মুমিন বান্দাকে সযত্নে দুনিয়া থেকে দূরে রাখা হয়
[৫৭] মাহমুদ ইবনু লাবীদ (রদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, 'রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,
إِنَّ اللَّهَ عَزَّ وَجَلَّ لَيَحْمِي عَبْدَهُ الْمُؤْمِنَ مِنَ الدُّنْيَا وَهُوَ يُحِبُّهُ كَمَا تَحْمُوْنَ مَرِيضَكُمْ الطَّعَامَ وَالشَّرَابَ تَخَافُوْنَ عَلَيْهِ
"আল্লাহ তাআলা তাঁর মুমিন বান্দাকে দুনিয়ার সেসব বস্তু থেকে অবশ্যই বঞ্চিত রাখবেন যা ঐ বান্দার নিকট প্রিয়, ঠিক যেভাবে তোমরা তোমাদের অসুস্থ ব্যক্তিকে সেসব খাবার ও পানীয় থেকে বঞ্চিত রাখো-যা তোমরা তার জন্য ক্ষতিকর মনে করো।" [তুলনীয়: হাদীস নং ২৯৮]
[৫৮] কাতাদা ইবনুন নুমান (রদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, 'রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,
إِنَّ اللَّهَ إِذَا أَحَبَّ عَبْدًا حَمَاهُ الدُّنْيَا كَمَا يَظِلُّ أَحَدُكُمْ يَحْمِي سَقِيمَهُ الْمَاءَ
"আল্লাহ তাআলা কোনো বান্দাকে পছন্দ করলে তাকে দুনিয়া থেকে এমনভাবে বঞ্চিত রাখেন, যেভাবে তোমাদের কেউ অসুস্থ ব্যক্তিকে পানি
থেকে বঞ্চিত রাখে।"
কোন সম্পদ মানুষের নিজস্ব?
[৫৯] মুতারিফ (রহিমাহুল্লাহ) তাঁর পিতার সূত্রে বর্ণনা করেছেন, 'আমি নবি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নিকট গেলাম, তখন তিনি "أَلْهَاكُمُ التَّكَاثُرُ অধিক ঐশ্বর্যশালী হওয়ার প্রতিযোগিতা তোমাদেরকে বিপথে পরিচালিত করেছে!” (সূরা আত-তাকাছুর) পাঠ করছিলেন। তিনি বললেন,
يَقُوْلُ ابْنُ آدَمَ: مَالِي وَمَا لَكَ مِنْ مَالِكَ إِلَّا مَا أَكَلْتَ فَأَفْنَيْتَ أَوْ لَبِسْتَ فَأَبْلَيْتَ أَوْ تَصَدَّقْتَ فَأَمْضَيْتَ
"আদমসন্তান (অর্থাৎ, মানুষ) বলে, 'আমার সম্পদ!' তোমার সম্পদের কোনটি তোমার? যা খেয়েছো, তা তো নিঃশেষ করে ফেলেছো; যা পরিধান করেছো, তা তো মলিন করে ফেলেছো; আর যা দান করেছো, তা তো করেই ফেলেছো!" [তুলনীয়: হাদীস নং ১৬০]
যার পরিবার ও ঘর আছে সে কিছুতেই নিঃস্ব নয়
[৬০] আবদুল্লাহ ইবনু আমর ইবনিল আস (রাদিয়াল্লাহু আনহুমা)-কে এক ব্যক্তি জিজ্ঞাসা করলো, 'আমরা কি নিঃস্ব মুহাজির নই?' প্রত্যুত্তরে আবদুল্লাহ (রাদিয়াল্লাহু আনহু) তাঁকে প্রশ্ন করলেন, 'তোমার কি স্ত্রী আছে?' সে বললো, 'হ্যাঁ।' তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, 'তোমার কি বসবাস করার মতো কোনো ঘর আছে?' সে বললো, 'হ্যাঁ।' তখন আবদুল্লাহ (রাদিয়াল্লাহু আনহু) মন্তব্য করলেন, 'তাহলে তুমি নিঃস্ব মুহাজির নও।'
দুনিয়ার সাথে উসমান ইবনু মাযউনের সম্পর্ক
[৬১] ইবনু সাঈদ মাদানি (রহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, 'উসমান ইবনু মাযঊন (রাদিয়াল্লাহু আনহু) যখন মৃত্যুশয্যায় শায়িত, তখন রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁর নিকট যান এবং তাঁর দিকে ঝুঁকে তাঁকে চুম্বন করে বলেন,
رَحِمَكَ اللهُ يَا عُثْمَانُ! مَا أَصَبْتَ مِنَ الدُّنْيَا وَلَا أَصَابَتْ مِنْكَ
"উসমান! আল্লাহ তোমার প্রতি সদয় হোন! তুমি দুনিয়ার নিকট থেকে কিছু পাওনি, আর দুনিয়াও তোমার নিকট থেকে কিছু পায়নি।"
দুনিয়া মনোহর সবুজ উদ্যানের ন্যায়
[৬২] মুসআব ইবনু সাদ (রদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,
إِحْذَرُوا الدُّنْيَا فَإِنَّهَا خُضْرَةٌ حُلْوَةٌ "দুনিয়ার ব্যাপারে সাবধান হও! কারণ, তা[র রূপ] হলো মনোহর সবুজ উদ্যানের ন্যায় [যা মানুষকে সহজে আকৃষ্ট করে।]" [তুলনীয়: হাদীস নং ১৮৩; ২৩৩]
পাপাচার সত্ত্বেও পার্থিব সমৃদ্ধি ধ্বংসের দিকে ধাবিত হওয়ার আলামত
[৬৩] উকবা ইবনু আমির (রদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, 'নবি (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,
إِذَا رَأَيْتَ اللهَ عَزَّ وَجَلَّ يُعْطِي الْعَبْدَ مِنَ الدُّنْيَا عَلَى مَعَاصِيْهِ مَا يُحِبُّ فَإِنَّهُ إِسْتِدْرَاج "যখন তুমি দেখবে আল্লাহ তাআলা কোনো ব্যক্তিকে তার পাপাচার সত্ত্বেও পার্থিব জীবনে তার প্রিয় বস্তুগুলো দিচ্ছেন, তখন বুঝবে-তা হলো তাকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেওয়ার জন্য একটি টোপমাত্র।" তারপর তিনি আল্লাহ তাআলার এ বক্তব্য পাঠ করেন,
فَلَمَّا نَسُوا مَا ذُكِّرُوا بِهِ فَتَحْنَا عَلَيْهِمْ أَبْوَابَ كُلِّ شَيْءٍ حَتَّى إِذَا فَرِحُوْا بِمَا أُوتُوا أَخَذْتُهُمْ بَغْتَةً فَإِذَا هُمْ مُّبْلِسُونَ "তাদেরকে যেসব বিষয় স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছিল-যখন তারা তা ভুলে গেলো, তখন আমি তাদের জন্য সবকিছুর দ্বার উন্মুক্ত করে দিলাম। পরিশেষে, তাদেরকে যা কিছু দেওয়া হয়েছে তা নিয়ে যখন তারা ফুর্তিতে মেতে উঠলো, তখন তাদেরকে আমি আচমকা পাকড়াও করলাম। আর অমনি তারা স্তব্ধ হয়ে গেলো।" (সূরা আল-আনআম ৬:৪৪)'
দুনিয়ার জীবন গ্রীষ্মকালীন সফরের খানিক বিরতির চেয়ে বেশি কিছু নয়
[৬৪] আবদুল্লাহ (রদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, 'রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) একটি মাদুরে ঘুমিয়েছিলেন-যার ফলে তাঁর পার্শ্বদেশে মাদুরের ছাপ লেগে গিয়েছিল। আমরা বললাম, 'হে আল্লাহ'র রাসূল, আপনি কি আমাদেরকে অনুমতি দিবেন না যে আমরা আপনার নিচে এর চেয়ে অধিক কোমল কিছু বিছিয়ে দিই?' জবাবে তিনি বললেন,
مَا لِي وَلِلدُّنْيَا إِنَّمَا مَثَلِي وَمَثَلُ الدُّنْيَا كَرَاكِبٍ سَارَ فِي يَوْمٍ صَائِفٍ فَقَالَ تَحْتَ شَجَرَةٍ ثُمَّ رَاحَ وَتَرَكَهَا
"এ দুনিয়ার সাথে আমার কী সম্পর্ক? এ দুনিয়ার সাথে আমার দৃষ্টান্ত হলো এমন এক অশ্বারোহীর ন্যায় যে প্রচণ্ড গরমের একদিন ভ্রমণে বের হয়ে একপর্যায়ে একটি গাছের নীচে ঈষৎ নিদ্রা গেল, তারপর কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে সেখান থেকে চলে গেলো।"' [তুলনীয়: হাদীস নং ৩৪ ও ৭২]
তিনটি বস্তুর ক্ষেত্রে মানুষকে জবাবদিহিতা থেকে রেহাই দেওয়া হবে
[৬৫] হাসান (রহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,
ثَلَاثُ لَا يُحَاسَبُ بِهِنَّ الْعَبْدُ ظِلُّ خُصَّ يَسْتَظِلُّ بِهِ وَكِسْرَةٌ يَشُدُّ بِهِ صُلْبَهُ وَثَوْبٌ يُوَارِي عَوْرَتَهُ
"তিনটি বস্তুর জন্য বান্দাকে জবাবদিহিতার মুখোমুখি করা হবে না— মাথা গোঁজার একটি চালা, মেরুদণ্ড সোজা রাখার একটি কোমরবন্ধ ও লজ্জাস্থান ঢাকার একখণ্ড বস্ত্র।” [তুলনীয়: হাদীস নং ১৫৮; ২১৯]
আল্লাহর প্রিয় বান্দার পার্থিব অবস্থা
[৬৬] সালিম ইবনু আবিল জা'দ (রদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,
إِنَّ مِنْ أُمَّتِي مَنْ لَوْ أَنَّى بَابَ أَحَدِكُمْ فَسَأَلَهُ دِينَارًا لَمْ يُعْطِهِ إِيَّاهُ وَلَوْ سَأَلَهُ دِرْهَمًا لَمْ يُعْطِهِ إِيَّاهُ وَلَوْ سَأَلَهُ فَلْسًا لَمْ يُعْطِهِ إِيَّاهُ وَلَوْ سَأَلَ اللَّهَ الْجَنَّةَ لَأَعْطَاهَا
إِيَّاهُ وَلَوْ سَأَلَهُ الدُّنْيَا لَمْ يُعْطِهَا إِيَّاهُ وَمَا يَمْنَعُهَا إياه لهوانه عليه أو القرآن لا يَؤُتُهُ لَهُ لَوْ يُقْسِمُ عَلَى اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ لَأَبَرَهُ
"আমার উম্মতের মধ্যে এমন ব্যক্তি আছে, যদি সে তোমাদের কারো দ্বারে এসে স্বর্ণমুদ্রা চায় সে। অর্থাৎ, গৃহকর্তা। তাঁকে তা দিবে না, রৌপ্যমুদ্রা চাইলেও দিবে না, এমনকি পয়সা চাইলেও দিবে না; অথচ সে যদি আল্লাহ'র নিকট জান্নাত চায় আল্লাহ তাঁকে অবশ্যই দিবেন, কিন্তু সে যদি আল্লাহ'র নিকট দুনিয়া চায় তাহলে আল্লাহ তাঁকে দিবেন না। তাঁকে দুনিয়া থেকে বঞ্চিত করার কারণ এ নয় যে তাঁর পদমর্যাদা আল্লাহ'র নিকট তুচ্ছ। [ঐ ব্যক্তি। দু-খণ্ড জীর্ণ বস্ত্রের অধিকারী; পোশাকের প্রতি তার কোনো বিশেষ আকর্ষণ নেই। সে যদি আল্লাহ'র নামে কোনো কিছুর শপথ করে, আল্লাহ অবশ্যই তাঁর শপথ বাস্তবায়ন করবেন।"' [তুলনীয়: হাদীস নং ৬৮; ১৩০]
উয়াইস কারনির পার্থিব অবস্থা
[৬৭] মুহারিব ইবনু দিসার (রদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,
إِنَّ مِنْ أُمَّتِي مَنْ لَا يَسْتَطِيعُ أَنْ يَأْتِيَ مَسْجِدَهُ أَوْ مُصَلَّاهُ مِنَ الْعُرْيِ يَحْجُزْهُ إِيْمَانُهُ أَنْ يَسْأَلَ النَّاسَ مِنْهُمْ أَوَيْسُ الْقَرْنِي وَفُرَاتُ بْنُ حَيَّانُ الْعَجَلِي
"আমার উম্মতের মধ্যে এমন ব্যক্তিও রয়েছে যে বস্ত্রের অভাবে মাসজিদ বা ঈদগাহে আসতে পারে না; তাঁর ঈমান তাঁকে মানুষের কাছে হাত পাততে বাধা দেয়। উয়াইস কারনি ও ফুরাত ইবনু হাইয়ান আজালি ঐ ধরনের মানুষের অন্তর্ভুক্ত।”'
জান্নাতি মানুষের পার্থিব অবস্থা
[৬৮] আনাস (রদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,
أَلَا أُنَبِّئُكُمْ بِأَهْلِ الْجَنَّةِ كُلُّ ضَعِيفٍ مُتَضَاعِفٍ ذِي طِمْرَيْنِ لَوْ يُقْسِمُ عَلَى اللَّهِ لأبره
"আমি কি তোমাদেরকে জান্নাতবাসীদের [পার্থিব অবস্থা] সম্পর্কে অবহিত করবো না? [তাঁরা হলো। প্রত্যেক দুর্বল ও চরম অবহেলিত ব্যক্তি, দু-খণ্ড জীর্ণ বস্ত্রের অধিকারী। সে যদি আল্লাহ'র নামে কোনো কিছুর শপথ করে, আল্লাহ অবশ্যই তাঁর শপথ বাস্তবায়ন করবেন।" ' [তুলনীয়: হাদীস নং ৬৬; ১৩০]
জান্নাতি লোকদেরকে দুনিয়ায় ব্যাপক সমালোচনার মুখোমুখি হতে হয়
[৬৯] আবুল জাওযা (রদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, أَلَا أُنَبِّئُكُمْ بِأَهْلِ الْجَنَّةِ وَأَهْلِ النَّارِ أَهْلُ الْجَنَّةِ مَنْ مُلِئَتْ مَسَامِعُهُ مِنَ الثَّنَاءِ السَّيِّءِ وَهُوَ يَسْمَعُ
"আমি কি তোমাদেরকে জান্নাতবাসী ও জাহান্নামবাসীদের [পার্থিব অবস্থা] সম্পর্কে অবহিত করবো না? জান্নাতবাসী তো সে, যার কর্ণকুহর নিজের সমালোচনায় ভরপুর থাকে এবং যাকে নিজের সমালোচনা নিজের কানে শুনতে হয়।"'¹
মেয়ের বিয়েতে উপহার
[৭০] আলি (রদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ফাতিমা (রদিয়াল্লাহু আনহা)-কে [বিয়ের পর] একখণ্ড মখমল, পানির একটি মশক ও আঁশভর্তি চামড়ার একটি বালিশ উপহার দিয়েছিলেন।' [তুলনীয়: হাদীস নং ১৪৪]
বিছানা যেমন ছিল
[৭১] হাসান (রহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, 'রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর বিছানা ছিল উলের তৈরি আলখাল্লা-সদৃশ একটি কম্বল ও আঁশভর্তি একটি বালিশ-যা ছিল তালি দেয়া।'
দুনিয়ার জীবন গ্রীষ্মকালীন সফরের খানিক বিরতির চেয়ে বেশি কিছু নয়
[৭২] ইবনু আব্বাস (রাদিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণিত, 'উমার ইবনুল খাত্তাব (রাদিয়াল্লাহু আনহু) রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর কক্ষে প্রবেশ করলেন; নবি (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তখন একটি মাদুরে শোয়া। তাঁর পার্শ্বদেশে মাদুরের ছাপ লেগে গিয়েছে। তা দেখে উমার (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বললেন, 'হে আল্লাহ'র নবি! আপনি যদি এর চেয়ে আরেকটু নরম বিছানা গ্রহণ করতেন!' এ কথা শুনে নবি (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন,
مَا لِي وَلِلدُّنْيَا مَا مَثَلِي وَمَثَلُ الدُّنْيَا إِلَّا كَرَاكِبٍ سَارَ فِي يَوْمٍ صَائِفٍ فَاسْتَظَلَّ تَحْتَ شَجَرَةٍ سَاعَةٌ مِنْ نَهَارٍ ثُمَّ رَاحَ وَتَرَكَهَا
"এ দুনিয়ার সাথে আমার কী সম্পর্ক? এ দুনিয়ার সাথে আমার দৃষ্টান্ত হলো নিছক এমন এক অশ্বারোহীর ন্যায় যে প্রচণ্ড গরমের একদিন ভ্রমণে বের হয়ে দিনের কিছুক্ষণ একটি গাছের নিচে ছায়া গ্রহণ করলো, তারপর বিশ্রাম নিয়ে সেখান থেকে চলে গেলো।” [তুলনীয়: হাদীস নং ৩৪, ও ৬৪]
অহঙ্কারমুক্ত থাকার উপায়
[৭৩] আবদুল্লাহ ইবনু শাদ্দাদ (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, 'রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,
مَنْ لَبِسَ الصُّوْفَ وَاعْتَقَلَ الشَّاةَ وَرَكِبَ الحِمَارَ وَأَجَابَ دَعْوَةَ الرَّجُلِ الدُّوْنِ أَوِ الْعَبْدِ لَمْ يُكْتَبْ عَلَيْهِ مِنَ الْكِبَرِ شَيْءٌ
"যে ব্যক্তি উলের বস্ত্র পরিধান করে, ভেড়া বাঁধে, গাধায় চড়ে ও দরিদ্র মানুষ কিংবা দাসের ডাকে সাড়া দেয়, তাঁর বিরুদ্ধে [আমলনামায়] অহঙ্কারসূচক কিছুই লিখা হয় না।"' [তুলনীয়: হাদীস নং ১৬৬]
উম্মুল মুমিনীনগণ ছয়-সাত দিরহাম মূল্যের চাদর গায়ে দিতেন
[৭৪] হাসান (রহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁর স্ত্রীদের চাদর গায়ে দিয়ে সালাত আদায় করতেন।
তাঁদের চাদর ছিল উলের। চাদরের মধ্যেই উল দিয়ে দাম লেখা থাকতো—ছয় বা সাত দিরহাম।' তুলনীয়: হাদীস নং ৩১।
শুধু একটি তোশকে শয়ন করতেন
[৭৫] ইসমাঈল ইবনু উমাইয়া (রহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, 'আয়িশা (রদিয়াল্লাহু আনহা) নবি (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর জন্য দুটি তোশক বানালেন। [অধিক আরামদায়ক হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায়] নবি (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কেবল একটি তোশকের উপর শয়ন করলেন।'
একটি আরামদায়ক বিছানা উপহার দেওয়া হলে তিনি তা ফেরত পাঠানোর নির্দেশ দেন
[৭৬] আয়িশা (রদিয়াল্লাহু আনহা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'এক আনসার মহিলা আমার কক্ষে প্রবেশ করে দেখতে পেলো, রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর তোশক হলো দ্বি-ভাজ করে রাখা আলখাল্লা-সদৃশ একটি উলের কম্বল। এ দৃশ্য দেখে সে তাঁর ঘরে গিয়ে উলে-ভর্তি একটি তোষক আমার নিকট পাঠিয়ে দিলো। রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমার কক্ষে এসে জিজ্ঞাসা করলেন, "ما هذا؟ এটি কী?” আমি বললাম, 'অমুক আনসার মহিলা আমার কক্ষে প্রবেশ করেছিলো। সে আপনার বিছানা দেখে এটি পাঠিয়েছে।' নবি (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, "رُدِّيْهِ এটি ফেরত পাঠিয়ে দাও।” তবে আমি ফেরত পাঠাইনি; তোশকটি আমাকে মুগ্ধ করেছিলো; আমি চাচ্ছিলাম, এটি আমার ঘরে থাকুক। শেষ পর্যন্ত এটি ফেরত পাঠাতে নবি (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমাকে তিনবার নির্দেশ দিয়ে বললেন,
يَا عَائِشَةُ رُدِّيْهِ فَوَاللَّهِ لَوْ شِئْتُ لَأَجْرَى اللَّهُ مَعِي جِبَالَ الذَّهَبِ وَالْفِضَّةِ
"আয়িশা! এটি ফেরত দিয়ে দাও। আল্লাহ'র শপথ! আমি চাইলে, আল্লাহ তাআলা স্বর্ণ ও রৌপ্যের পাহাড়কে আমার সাথে চলমান করে দিতেন।" পরিশেষে আমি তা ফেরত পাঠিয়ে দিই।'
তুচ্ছ পদের ব্যাপারেও সাবধান!
[৭৭] আয়িশা (রদিয়াল্লাহু আনহা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলতেন,
يَا عَائِشَةُ إِيَّاكِ وَمُحَقَّرَاتِ الذُّنُوْبِ فَإِنَّ لَهَا مِنَ اللَّهِ طَالِبًا "আয়িশা! সেসব পাপের ব্যাপারে সাবধান হও-লোকেরা যেগুলোকে তুচ্ছ মনে করে; কারণ সেগুলোর জন্যও আল্লাহ'র পক্ষ থেকে কৈফিয়ত তলব করা হবে।"
তুচ্ছ পাপের সামষ্টিক পরিণাম ধ্বংসাত্মক: একটি উপমা
[৭৮] আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ (রদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, 'রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,
إِيَّاكُمْ وَمُحَقَّرَاتِ الذُّنُوْبِ فَإِنَّهُنَّ يَجْتَمِعْنَ عَلَى الرَّجُلِ حَتَّى يُهْلِكْنَهُ "সেসব পাপের ব্যাপারে সাবধান হও-লোকেরা যেগুলোকে তুচ্ছ মনে করে। কারণ, সেগুলো একত্রিত হয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে ধ্বংস করে ছাড়বে।” রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সেসব পাপের জন্য একটি উদাহরণ পেশ করেছেন-একদল লোক একটি মরু অঞ্চলে প্রবেশ করলো। কাজের পালা আসলে কয়েকজন গিয়ে কিছু কাঠ নিয়ে আসলো; অপর কয়েকজন গিয়ে আরো কিছু কাঠ সংগ্রহ করলো। এভাবে [অর্থাৎ, সবাই একটু একটু করে সংগ্রহ করার মাধ্যমে। তারা বিপুল পরিমাণ কাঠ একত্রিত করে আগুন জ্বালালো এবং ভালোভাবে রান্না সম্পন্ন করে নিলো।'
কথা বলার ক্ষেত্রে সাবধান!
[৭৯] আবূ হুরায়রা (রদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, 'নবি (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,
إِنَّ أَحَدَكُمْ لَيَتَكَلَّمُ بِالْكَلِمَةِ وَمَا يَرَى أَنَّهَا تَبْلُغُ حَيْثُ بَلَغَتْ يُهْوَى بِهَا فِي النَّارِ سَبْعِينَ خَرِيفًا "তোমাদের মধ্যে কেউ কেউ এমন কথা বলে যার ব্যাপারে সে আন্দাজ করতে পারে না তা কোথায় কোথায় পৌঁছে যাচ্ছে। এ কথার পরিণতিতে তাকে জাহান্নামের ভেতর সত্তর বছর দূরত্বে নিক্ষেপ করা হবে।"' [তুলনীয়: হাদীস নং ৮০; ২০৯]
[৮০] বিলাল ইবনুল হারস মুযানি (রদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,
إِنَّ الرَّجُلَ لَيَتَكَلَّمُ بِالْكَلِمَةِ مِنْ رِضْوَانِ اللهِ عَزَّ وَجَلَّ مَا يَظُنُّ أَنَّهَا تَبْلُغُ مَا بَلَغَتْ يَكْتُبُ اللهُ عَزَّ وَجَلَّ لَهُ بِهَا رِضْوَانَهُ إِلَى يَوْمِ يَلْقَاهُ وَإِنَّ الرَّجُلَ لَيَتَكَلَّمُ بِالْكَلِمَةِ مِنْ سَخَطِ اللَّهِ مَا يَظُنُّ أَنَّهَا تَبْلُغُ مَا بَلَغَتْ يَكْتُبُ اللَّهُ بِهَا عَلَيْهِ سَخَطَهُ إِلَى يَوْمِ الْقِيَامَةِ
"কোনো ব্যক্তি এমন কথা বলে যার ফলে আল্লাহ তাআলা সন্তুষ্ট হন; সে ধারণা করতে পারবে না, তার কথা কোথায় কোথায় পৌঁছে যাবে। উক্ত কথার বদৌলতে আল্লাহ তাআলা তার জন্য সেদিন পর্যন্ত নিজের সন্তুষ্টির কথা লিখতে থাকবেন, যেদিন সে আল্লাহ তাআলার সাক্ষাৎ লাভ করবে। অপরদিকে, কোনো ব্যক্তি এমন কথা বলে যা আল্লাহ'র ক্রোধের উদ্রেক ঘটায়; সে ধারণা করতে পারবে না, তার কথা কোথায় কোথায় পৌঁছে যাবে। উক্ত কথার পরিণতিতে কিয়ামত দিবস পর্যন্ত আল্লাহ তাআলা তার বিরুদ্ধে নিজের ক্রোধের কথা লিখতে থাকবেন।"'
আলকামা (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'বহুবার বহু কথা বলতে চেয়েছিলাম। কিন্তু, বিলাল ইবনুল হারিস কর্তৃক বর্ণিত উপরোক্ত হাদীস আমাকে সেসব কথা বলা থেকে বিরত রেখেছে।' [তুলনীয়: হাদীস নং ৭৯; ২০৯]
নাজাত লাভের উপায়
[৮১] আবূ উমামা (রদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'উকবা ইবনু আমির জিজ্ঞাসা করলেন, 'হে আল্লাহ'র রাসূল! নাজাত [পরকালীন মুক্তি] কিসে?' নবি (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন,
أَمْسِكْ عَلَيْكَ لِسَانَكَ وَلِيَسَعْكَ بَيْتُكَ وَابْكِ مِنْ ذِكْرِ خَطِيئَتِكَ
"তোমার জিহ্বাকে আটকে রাখো, ঘরে যা কিছু আছে তাতেই সন্তুষ্ট থাকো, আর নিজের ভুল স্মরণ করে কাঁদো।"'
ফজরের সালাত শেষে সূর্যোদয় পর্যন্ত জায়নামাযে বসে থাকা
[৮২] জাবির ইবনু সামুরা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,
'রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ফজরের সালাত আদায় শেষে সূর্যোদয়ের আগ পর্যন্ত নিজের সালাতের জায়গায় বসে থাকতেন।'
এক রাকআত হলেও রাতের সালাত আদায় করা উচিত
[৮৩] ইবনু আব্বাস (রদিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণিত, 'নবি (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,
عَلَيْكُمْ بِصَلَاةِ اللَّيْلِ وَلَوْ رَكْعَةً وَاحِدَةً
"রাতের সালাত আদায় করো, স্রেফ এক রাকআত হলেও।"'
তাঁর মৃত্যুতে শোক
[৮৪] আনাস ইবনু মালিক (রদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'ফাতিমা (রদিয়াল্লাহু আনহা) বললেন, "আনাস! রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর উপর মাটি ছিটিয়ে দেওয়া কি তোমাদের ভালো লাগলো?' তারপর তিনি বলতে থাকেন, 'হায়! তাঁর রব তাঁকে অতি সন্নিকটে নিয়ে গেছেন! জান্নাতুল ফিরদাউস তাঁর ঠিকানা! জিবরাঈল! তিনি তো আর নেই! হায়! তিনি তো রবের ডাকে সাড়া দিয়ে চলে গেছেন!"'
বাকিতে কাপড় কিনতে চাওয়ায় বিক্রেতার বাজে মন্তব্য
[৮৫] আয়িশা (রদিয়াল্লাহু আনহা) থেকে বর্ণিত, 'নবি (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর দুটি মোটা ও খসখসে কাতারি চাদর ছিল। আয়িশা (রদিয়াল্লাহু আনহা) বললেন, 'হে আল্লাহ'র রাসূল, আপনার এ চাদর দুটি তো মোটা ও খসখসে; কারুকাজ থাকার দরুন এগুলো আপনার জন্য ভারী হয়ে গিয়েছে। অমুকের কাছে কাউকে পাঠান; তার কাছে শাম থেকে সুতি ও পাটের বস্ত্র এসেছে; তার কাছ থেকে দুটি কাপড় কিনে নিন; সচ্ছলতা আসলে মূল্য পরিশোধ করে দিবেন।' নবি (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) একজনকে তার নিকট প্রেরণ করলেন। সে এসে বললো, 'রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) [আমাকে] তোমার নিকট পাঠিয়েছেন; তুমি দুটি কাপড় তাঁর নিকট বিক্রি করো, স্বচ্ছলতা আসলে তিনি মূল্য পরিশোধ করে দিবেন।' সে বললো, 'আল্লাহ'র কসম! রাসূলুল্লাহ'র মতলব কী— তা আমি ভালো করে জানি। তিনি [বিনামূল্যে] আমার কাপড় নিয়ে যাওয়া কিংবা
মূল্য পরিশোধ নিয়ে তালবাহানা করার ফন্দি আঁটছেন!' দূত ফিরে এসে রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে এ সম্পর্কে অবহিত করলে [বস্ত্র ব্যবসায়ীর মন্তব্যের প্রেক্ষিতে] তিনি বললেন,
كَذَبَ قَدْ عَلِمُوا أَنِّي أَتْقَاهُمْ لِلَّهِ وَآدَاهُمْ لِلْأَمَانَةِ
"সে মিথ্যা বলেছে। তারা ভালো করেই জানে—তাদের মধ্যে আমিই আল্লাহকে সবচেয়ে বেশি ভয় করি, আর আমিই তাদের মধ্যে সর্বোত্তম আমানত পরিশোধকারী।"
একশত বছরেও মৃত্যুযন্ত্রণার উত্তাপ প্রশমিত হয়নি
[৮৬] জাবির ইবনু আব্দিল্লাহ (রদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,
حَدَّثُوا عَنْ بَنِي إِسْرَائِيلَ وَلَا حَرَجٌ فَإِنَّهُ كَانَتْ فِيهِمْ الأَعَاجِيْبُ
"বানী ইসরাঈলের লোকদের বক্তব্য প্রচার করতে পারো; তাতে কোনো সমস্যা নেই, কারণ তাদের জীবনে অনেক আশ্চর্যজনক ঘটনা ঘটে গিয়েছে।” তারপর তিনি বলতে থাকেন,
خَرَجَتْ طَائِفَةٌ مِنْ بَنِي إِسْرَائِيلَ حَتَّى أَتَوْا مَقْبَرَةً لَهُمْ مِنْ مَقَابِرِهِمْ فَقَالُوْا لَوْ صَلَّيْنَا رَكْعَتَيْنِ وَدَعَوْنَا اللَّهَ عَزَّ وَجَلَّ أَنْ يُخْرِجَ لَنَا رَجُلًا مِمَّنْ قَدْ مَاتَ نَسْأَلُهُ عَنِ الْمَوْتِ فَفَعَلُوا فَبَيْنَمَا هُمْ كَذَلِكَ إِذْ أَطْلَعَ رَجُلٌ رَأْسَهُ مِنْ قَبْرٍ مِنْ تِلْكَ الْمَقَابِرِ خِلَاسِيُّ بَيْنَ عَيْنَيْهِ أَثَرُ السُّجُودِ فَقَالَ يَا هَؤُلَاءِ مَا أَرَدْتُمْ إِلَيَّ فَقَدْ مِتُ مُنْذُ مِئَةِ سَنَةٍ فَمَا سَكَنَتْ عَنِّي حَرَارَةُ الْمَوْتِ حَتَّى الْآنَ فَادْعُوا اللَّهَ عَزَّ وَجَلَّ لِي يُعِيدُنِي كَمَا كُنْتُ
"বানী ইসরাঈলের একদল লোক বের হয়ে তাদের একটি কবরস্থানে এসে উপনীত হলো। তারপর তারা বললো, '(চলো) আমরা দু রাকআত সালাত আদায় করে আল্লাহ তাআলার নিকট প্রার্থনা করি, তিনি যেন আমাদের জন্য একজন মৃত ব্যক্তিকে বের করে দেন! আমরা তাকে মৃত্যু সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করবো।' তারা তা-ই করলো। এমন সময় একব্যক্তি সেখানকার একটি কবর থেকে নিজের মাথা জাগালো; লোকটি ছিল সঙ্করবর্ণের, দু
চোখের মাঝখানে সাজদা'র দাগ রয়েছে। সে বললো, 'ওহে লোকসকল! আমার নিকট তোমরা কী চাও? আমি তো বিগত একশত বছর থেকে মৃত; অদ্যাবধি আমার মৃত্যুর উত্তাপ প্রশমিত হয়নি। তোমরা আল্লাহ'র নিকট দুআ করো, তিনি যেন আমাকে পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে দেন।"'
মৃত্যুকে বেশি বেশি স্মরণ করার নির্দেশ
[৮৭] আবূ হুরায়রা (রদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,
أَكْثِرُوا مِنْ ذِكْرِ هَادِمِ اللَّذَاتِ
"সকল স্বাদ ধ্বংসকারী [মৃত্যু]-কে বেশি বেশি স্মরণ করো।"'
মৃত্যুর স্মরণই মানুষের প্রকৃত প্রশংসনীয় গুণ
[৮৮] সুফইয়ান (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'নবি (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)- এর সামনে এক ব্যক্তির প্রশংসা করা হলে তিনি জিজ্ঞাসা করলেন,
"مَاذِكْرُهُ لِلْمَوْتِ؟ মৃত্যুকে স্মরণ করার ক্ষেত্রে তার কী অবস্থা?" তারা বললেন, 'ততোটা নয়।' নবি (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মন্তব্য করলেন,
مَا هُوَ إِذًا كَمَا تَقُوْلُوْنَ তাহলে তোমরা যেমনটি বলছো, সে ততোটা [প্রশংসনীয়] নয়।"'
যে দুআয় তিনি রাত কাটিয়ে দিয়েছেন
[৮৯] আবূ যার (রদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, 'একটি আয়াতের পুনরাবৃত্তি করতে করতে নবি (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সারারাত কাটিয়ে দিয়েছেন। আয়াতটি হলো:
إِنْ تُعَذِّبْهُمْ فَإِنَّهُمْ عِبَادُكَ وَإِنْ تَغْفِرْ لَهُمْ فَإِنَّكَ أَنْتَ الْعَزِيزُ الْحَكِيمُ
"তুমি যদি তাদেরকে শাস্তি দাও, তাহলে তারা তো তোমারই দাস; আর যদি তাদেরকে ক্ষমা করে দাও, তাহলে তুমি তো প্রবল পরাক্রমশালী ও মহাবিজ্ঞ।-(সূরা আল-মায়িদাহ ৫:১১৬)"'
অধিক সালাত আদায়ের ফলে দু পা ফুলে গিয়েছিলো
[৯০] আবূ সালিহ (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, 'নবি (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) [এতো বেশি] সালাত আদায় করতেন যে তাঁর দু পা ফুলে যেতো। তাঁকে বলা হলো, 'হে আল্লাহ'র রাসূল, আল্লাহ তাআলা তো আপনার পূর্বাপর সকল পাপ ক্ষমা করে দিয়েছেন! [জবাবে] নবি (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন,
“أَفَلَا أَكُوْنُ عَبْدًا شَكُوْرًا আমি কি কৃতজ্ঞ বান্দা হবো না?"'
সেই আমল প্রিয় যা ধারাবাহিকতা বজায় রেখে করা হয়
[৯১] আবূ সালিহ (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'আমি আয়িশা ও উম্মু সালামা (রাদিয়াল্লাহু আনহুমা)-কে জিজ্ঞাসা করলাম, 'আল্লাহ'র রাসূল (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নিকট কোন্ আমল অধিক প্রিয় ছিল?' তিনি বললেন, 'যে আমল সবসময় করা হয়, যদিও তা পরিমাণে অল্প।' [তুলনীয়: হাদীস নং ৯০]
যে-কোনো মামুলি ব্যক্তি তাঁকে সঙ্গে নিয়ে যেতে পারতো
[৯২] আনাস ইবনু মালিক (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'কোনো দাসী এসে নবি (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর হাত ধরলে তিনি তাকে সাহায্য করার জন্য তার সাথে চলতে থাকতেন; তার প্রয়োজন পূরণ না হওয়া পর্যন্ত তিনি ফিরে আসতেন না।' [তুলনীয়: হাদীস নং ১৬৬]
নিয়মিত আমল অধিক পছন্দনীয়
[৯৩] আয়িশা (রাদিয়াল্লাহু আনহা) থেকে বর্ণিত, 'নবি (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আয়িশা (রাদিয়াল্লাহু আনহা)-এর গৃহে প্রবেশ করলেন। তখন তাঁর নিকট আরেক মহিলা নিজের অধিক সালাত আদায়ের কথা বলছিলেন। নবি (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন,
مَهُ عَلَيْكُمْ بِمَا تُطِيقُوْنَ فَوَاللَّهِ لَا يَمَلُّ اللَّهُ حَتَّى تَمَلُّوْا إِنَّ أَحَبَّ الدِّيْنِ إِلَيْهِ مَا دَامَ عَلَيْهِ صَاحِبُهُ
"থামো! তোমাদের উচিত সামর্থ্য অনুযায়ী আমল করা। কারণ, আল্লাহ [ অনুগ্রহ বর্ষণে] ক্ষান্ত হন না, যতোক্ষণ না তোমরা ক্লান্ত হয়ে [আমলে। ক্ষান্ত দাও। আল্লাহ'র নিকট সবচেয়ে প্রিয় আমল সেটি-যা আমলকারী ধারাবাহিকতা বজায় রেখে করতে থাকে।” [তুলনীয়: হাদীস নং ৯১]
যথার্থভাবে আল্লাহর উপর ভরসা করলে মানুষ অভুক্ত থাকবে না
[৯৪] উমার ইবনুল খাত্তাব (রদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, তিনি আল্লাহ'র নবি (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে বলতে শুনেছেন, لَوْ أَنَّكُمْ تَوَكَّلُوْنَ عَلَى اللهِ حَقَّ تَوَكَّلِهِ لَرَزَقَكُمْ كَمَا يُرْزَقُ الطَّيْرُ تَغْدُوْ خِمَاصًا وَ تَرُوْحُ بِطَانًا "তোমরা যদি আল্লাহ'র উপর যথার্থভাবে ভরসা করতে, তাহলে তিনি তোমাদেরকে সেভাবে জীবনোপকরণ দিতেন যেভাবে পাখিদেরকে দেওয়া হয়; পাখিরা ভোরবেলা ক্ষুধার্ত-পেটে বেরিয়ে যায়, আর সন্ধ্যায় ফিরে আসে নাদুসনুদুস হয়ে।"
আল্লাহর অনুগ্রহকে মূল্যায়ন করতে চাইলে প্রত্যেকের উচিত তার নিচের স্তরের লোকদের দিকে তাকানো
[৯৫] আবূ হুরায়রা (রদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, أُنْظُرُوا إِلَى مَنْ هُوَ أَسْفَلُ مِنْكُمْ وَلَا تَنْظُرُوا إِلَى مَنْ هُوَ فَوْقَكُمْ فَإِنَّهُ أَجْدَرُ أَنْ لَا تَزْدَرُوا نِعْمَةَ اللَّهِ عَلَيْكُمْ "তোমাদের নিচে যারা আছে তাদের দিকে তাকাও, তোমাদের উপরে যারা আছে তাদের দিকে তাকিয়ো না; আল্লাহ তোমাদেরকে যেসব অনুগ্রহ প্রদান করেছেন সেগুলোকে অবমূল্যায়ন না করার এটিই হলো অধিকতর জুতসই উপায়।"'
মনের প্রশস্ততাই প্রকৃত প্রাচুর্য
[৯৬] আবূ হুরায়রা (রদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'রাসূলুল্লাহ
(সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,
لَيْسَ الْغِنَى عَنْ كَثْرَةِ الْعِرْضِ إِنَّمَا الْعَنَى غِنَى النَّفْسِ "সম্মানের আধিক্যে প্রাচুর্য নেই, মনের প্রশস্ততাই প্রকৃত প্রাচুর্য।"' [ তুলনীয়: হাদীস নং ২২৯]
জান্নাতের কিছু সুবিধা যাদের জন্য
[৯৭] আলি (রদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,
إِنَّ فِي الْجَنَّةِ لَغُرَفًا يُرَى بَاطِنُهَا مِنْ ظَاهِرِهَا وَظَاهِرُهَا مِنْ بَاطِنِهَا "জান্নাতে কিছু কক্ষ রয়েছে যার বাহির থেকে ভিতর দেখা যাবে এবং ভিতর থেকে বাহির দেখা যাবে।” এ কথা শুনে একজন বেদুইন বলে উঠলো, 'হে আল্লাহ'র রাসূল, এসব কার জন্য?' নবি (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন,
لِمَنْ أَطَابَ الْكَلَامَ وَأَطْعَمَ الطَّعَامَ وَأَدَامَ الصِّيَامَ وَصَلَّى لِلَّهِ عَزَّ وَجَلَّ بِالَّيْلِ وَالنَّاسُ نِيَامُ "যে সুন্দরভাবে কথা বলে, [মানুষকে] খাবার খাওয়ায়, নিয়মিত সিয়াম পালন করে এবং মানুষ যখন ঘুমিয়ে থাকে তখন যে আল্লাহ তাআলা'র উদ্দেশ্যে সালাত আদায় করে।"'
মানুষের অধিকার নষ্টকারী ব্যক্তিই পরকালে প্রকৃত নিঃস্ব
[৯৮] আবূ হুরায়রা (রদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, 'নবি (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,
“هَلْ تَدْرُوْنَ مَنِ الْمُفْلِسُ؟ তোমরা কি জানো, 'নিঃস্ব কে?”
তাঁরা বললেন, 'হে আল্লাহ'র রাসূল, আমাদের মধ্যে সে-ই তো নিঃস্ব যার কাছে টাকা-পয়সা ও জীবনোপকরণ-কিছুই নেই।' নবি (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন,
إِنَّ الْمُفْلِسَ مِنْ أُمَّتِي مَنْ يَأْتِي يَوْمَ الْقِيَامَةِ بِصَلَاةٍ وَزَكَاةِ وَصِيَامٍ وَيَأْتَى قَدْ شَتَمَ عِرْضَ هَذَا وَقَذَفَ هُذَا وَأَكَلَ مَالَ هَذَا وَضَرَبَ هَذَا فَيَقْعُدُ فَيَقْتَصُ هَذَا مِنْ حَسَنَاتِهِ وَهُذَا مِنْ حَسَنَاتِهِ فَإِنْ فَنِيَتْ حَسَنَاتُهُ قَبْلَ أَنْ يَقْضِيَ مَا عَلَيْهِ مِنَ الْخَطَايَا أُخِذَ مِنْ خَطَايَاهُمْ فَطُرِحَتْ عَلَيْهِ ثُمَّ طُرِحَ فِي النَّارِ
"আমার উম্মতের মধ্যে সে-ই নিঃস্ব যে কিয়ামতের দিন [নিজের আমলনামায়] প্রচুর সালাত, যাকাত ও সিয়াম নিয়ে হাজির হবে। কিন্তু, [দুনিয়াতে] সে গালমন্দ করে কারো সম্মানহানি করে এসেছে, কাউকে মিথ্যা অপবাদ দিয়েছে, কারো সম্পদ আত্মসাৎ করেছে এবং কাউকে আঘাত করেছে। সে [বিচারের অপেক্ষায়] বসে থাকবে; এমন সময় [দুনিয়াতে তার কাজের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের] একজন এসে তার কিছু সাওয়াব নিয়ে যাবে; আরেকজন এসে আরো কিছু সাওয়াব নিয়ে যাবে। পাপের দেনা শোধ হওয়ার আগেই যদি তার সাওয়াব ফুরিয়ে যায়, তাহলে তাদের পাপ এনে তার উপর নিক্ষেপ করা হবে; পরিশেষে সে জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হবে।"
দানশীলের সম্পদ বৃদ্ধি ও কৃপণের সম্পদ ধ্বংসের জন্য দুজন ফেরেশতা প্রতিদিন আল্লাহর নিকট দুআ করতে থাকে
[৯৯] আবুদ দারদা (রদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,
مَا طَلَعَتْ شَمْسُ قَطُّ إِلَّا بِجَنْبَتَيْهَا مَلَكَانِ يُنَادِيَانِ يُسْمِعَانِ أَهْلَ الْأَرْضِ إِلَّا الثَّقَلَيْنِ يَا أَيُّهَا النَّاسُ هَلُمُوْا إِلَى رَبِّكُمْ فَإِنَّ مَا قَلَّ وَكَفَى خَيْرٌ مِّمَّا كَثُرَ وَأَلْهَى وَلَا آبَتْ شَمْسُ قَطُّ إِلَّا بُعِثَ بِجَنْبَتَيْهَا مَلَكَانِ يُنَادِيَانِ يُسْمِعَانِ أَهْلَ الْأَرْضِ إِلَّا الثَّقَلَيْنِ اللَّهُمَّ أَعْطِ مُنْفِقَا خَلَفًا وَأَعْطِ مُمْسِكًا تَلَفًا
"সূর্যোদয়ের সময় দুজন ফেরেশতা সূর্যের দুপাশ থেকে দুনিয়াবাসীকে শুনিয়ে ডাকতে থাকে, 'তোমাদের রবের দিকে এসো। যে আমলের পরিমাণ কম, কিন্তু পূর্ণ নিষ্ঠার সাথে করা হয়—তা ঐ আমলের তুলনায় উত্তম যার পরিমাণ বেশি, কিন্তু খামখেয়ালিভাবে করা হয়।' কেবল মানুষ ও জিন এ আওয়াজ শুনতে পায় না। আবার সূর্যাস্তের সময় দুজন ফেরেশতাকে
সূর্যের দু-পাশে পাঠানো হয় যারা দুনিয়াবাসীকে শুনিয়ে ডাকতে থাকে, 'হে আল্লাহ! যে ব্যক্তি | তোমার সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে। খরচ করে তুমি তাকে বিকল্প কিছু দান করো, আর যে [সম্পদ] আটকে রাখে [তার সম্পদ] তুমি বিনাশ করে দাও!' কেবল মানুষ ও জিন এ আওয়াজ শুনতে পায় না। শুরু থেকে আজ পর্যন্ত কখনো এ নিয়মের ব্যত্যয় ঘটেনি।"'
ঈমানের সারকথা হলো আল্লাহর উপর ভরসা করা
[১০০] সাঈদ ইবনু জুবাইর (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'ঈমানের সারকথা হলো আল্লাহ তাআলা'র উপর ভরসা (তাওয়াক্কুল) করা।'
গুরুত্ব লাভের অধিকারী কয়েকটি বিষয়
[১০১] আবদুল্লাহ ইবনু আবিল হুযাইল (রহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, 'নবি (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, "تَبًّا لِّلذَّهَبِ وَالْفِضَّةِ স্বর্ণ-রূপা ধ্বংস হোক!" উমার (রদিয়াল্লাহু আনহু) বললেন, 'হে আল্লাহ'র রাসূল, আপনি তো স্বর্ণ- রুপার ধ্বংস কামনা করছেন; তাহলে আমাদেরকে কিসের আদেশ করছেন কিংবা আমরা কী করবো?' নবি (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, لِسَانًا ذَاكِرًا وَقَلْبًا شَاكِرًا وَزَوْجَةً تُعِيْنُ عَلَى الْآخِرَةِ "এগুলোকে গুরুত্ব দাও-আল্লাহ'র যিকারী জিহ্বা, কৃতজ্ঞ মন ও পরকালের [নাজাত লাভে] সহায়তাকারী স্ত্রী।” [তুলনীয়: হাদীস নং ১৩৫]
জাহান্নামের গভীরতা
[১০২] আবদুল্লাহ ইবনু আমর ইবনিল আস (রদিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মাথার খুলি- সদৃশ একটি বস্তুর দিকে ইশারা করে বলেন, لَوْ أَنَّ رُصَاصَةٌ مِثْلَ هَذِهِ أُرْسِلَتْ مِنَ السَّمَاءِ إِلَى الْأَرْضِ وَهِيَ مَسِيْرَةُ خَمْسِمِأَةِ سَنَةٍ لَبَلَغَتِ الْأَرْضَ قَبْلَ اللَّيْلِ وَلَوْ أَنَّهَا أُرْسِلَتْ مِنْ رَأْسِ السَّلْسِلَةِ لَسَارَتْ
أَرْبَعِينَ خَرِيفًا اللَّيْلَ وَالنَّهَارَ قَبْلَ قَبْلَ أَنْ تَبْلُغَ أَصْلَهَا "যদি এমন একটি প্রস্তরখণ্ড পৃথিবীর উদ্দেশ্যে আকাশ থেকে নিক্ষেপ করা হয়, তাহলে তা রাত পোহাবার আগেই পৃথিবীতে পৌঁছে যাবে; অথচ আকাশ থেকে পৃথিবীর দূরত্ব পাঁচশত বছরের রাস্তা। পক্ষান্তরে এই প্রস্তরখণ্ডটিকে যদি [জাহান্নামের] শিকলের উপরিভাগ থেকে ছেড়ে দেওয়া হয় তাহলে তলদেশে পৌঁছার পূর্বেই দিবা-রাত্রির একটানা চল্লিশ বছর অতিক্রান্ত হয়ে যাবে।"'
জাহান্নামবাসীর ঠোঁট চিড়ে মাথা ও নাভি পর্যন্ত নেওয়া হবে
[১০৩] আবু সাঈদ খুদরী (রদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, ،وَهُمْ فِيْهَا كَالِحُوْنَ আর তারা সেখানে থাকবে দাঁতখোলা অবস্থায়' (সূরা আল-মুমিনূন ২৩:১০৪)
-এর ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, تَشْوِيْهِ النَّارُ فَتُقَلِّصُ شَفَتَهُ الْعُلْيَا حَتَّى تَبْلُغَ وَسَطَ رَأْسِهِ وَتَسْتَرْخِي شَفَتَهُ السُّفْلَى حَتَّى تَضْرِبَ سُرَّتَهُ "জাহান্নামের আগুন তার অধিবাসীর উপরের ঠোঁট চিড়ে মাথার মধ্যখান পর্যন্ত নিয়ে যাবে, আর নীচের ঠোঁট চিড়ে নাভিতে নিয়ে লাগাবে।"'
জাহান্নামবাসীদের মাথার উপর ঢালা গরম পানির প্রতিক্রিয়া
[১০৪] আবূ হুরায়রা (রদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, 'নবি (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, إِنَّ الْحَمِيمَ لَيُصَبُّ عَلَى رُؤُوسِهِمْ فَيَنْفُذُ الْجُمْجُمَةَ حَتَّى يَخْلُصَ إِلَى جَوْفِهِ فَيَسْلُتُ مَا فِي جَوْفِهِ حَتَّى يَمْرُقَ مِنْ قَدَمَيْهِ وَهُوَ الصَّهْرُ ثُمَّ يُعَادُ كَمَا كَانَ "জাহান্নামবাসীদের মাথার উপর গরম পানি ঢালা হবে, যা খুলি ভেদ করে পাকস্থলীতে যাবে এবং পেটস্থ সবকিছু ছিন্নভিন্ন করে দু-পা ফুটো করে বের হয়ে যাবে; ততোক্ষণে তার সারা দেহ সিদ্ধ হয়ে যাবে। তারপর তাকে আবার পূর্বের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা হবে।"'
জাহান্নামবাসীদেরকে পুঁজযুক্ত গরম পানি দেওয়া হবে
[১০৫] আবূ উমামা (রদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, 'আল্লাহ তাআলা'র বক্তব্য
وَيُسْقَى مِنْ مَاءٍ صَدِيدٍ يَتَجَرَّعُهُ “তাকে আর তাকে পান করানো হবে পুঁজযুক্ত পানি, যা সে অনিচ্ছা সত্ত্বেও গিলবে।” (সূরা ইবরাহীম ১৪:১৬) এর ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে নবি (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,
يُقَرَّبُ إِلَيْهِ فَيَتَكَرَّهُهُ فَإِذَا أُدْنِيَ مِنْهُ شَوَى وَجْهَهُ وَوَقَعَ فَرْوَةُ رَأْسِهِ فَإِذَا شَرِبَهُ قَطَّعَ أَمْعَاءَهُ حَتَّى يَخْرُجَ مِنْ دُبُرِهِ "সেই পানীয় তার কাছে নেওয়া হলে সে তা অপছন্দ করবে, আরো নিকটে নেওয়া হলে তা তার মুখ ঝলসে দিবে এবং (গরমের তীব্রতায়) তার মাথার ছাল উঠে যাবে। সে যখন তা পান করবে, তখন তা তার নাড়িভুঁড়িকে ছিন্নভিন্ন করে মলদ্বার দিয়ে বের করে দিবে।" আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَسُقُوْا مَاءً حَمِيمًا فَقَطَّعَ أَمْعَاءَهُمْ “তাদেরকে উত্তপ্ত পানি পান করানো হবে; অতঃপর তা তাদের নাড়িভুড়ি ছিন্নভিন্ন করে দিবে।”–(সূরা মুহাম্মদ, ৪৭: ১৫)।
وَإِنْ يَسْتَغِيثُوا يُغَاثُوا بِمَاءٍ كَالْمُهْلِ يَشْوِى الْوُجُوهَ بِئْسَ الشَّرَابُ “আর তারা পানি চাইলে তাদেরকে গলিত তামা-সদৃশ পানি দেওয়া হবে, যা তাদের চেহারা ঝলসে দিবে; কতো নিকৃষ্ট পানি সেটি!-(সূরা আল-কাহফ ১৮:২৯)"'
আল্লাহর রাস্তায় এক সকাল কিংবা এক বিকাল ব্যয় করার মর্যাদা
[১০৬] সাহল ইবনু সাদ (রদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, 'রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,
لَغَدْوَةٌ فِي سَبِيلِ اللَّهِ أَوْ رَوْحَةٌ خَيْرٌ مِّنَ الدُّنْيَا وَمَا فِيْهَا وَلَمَوْضِعُ سَوْطِ أَحَدِكُمْ مِّنَ الْجَنَّةِ خَيْرٌ مِّنَ الدُّنْيَا وَمَا فِيهَا "আল্লাহ'র রাস্তায় এক সকাল কিংবা এক বিকাল ব্যয় করা সমগ্র পৃথিবী
ও তদস্থিত সকল বস্তুর চেয়ে অধিক উত্তম; আর তোমাদের কারো চাবুক/ লাঠি রাখতে যেটুকু জায়গা দরকার, জান্নাতের সেটুকু জায়গা সমগ্র পৃথিবী ও তদস্থিত সকল বস্তুর চেয়ে অধিক উত্তম।" [তুলনীয়: হাদীস নং ১১৫]
অসুস্থকে দেখতে যাওয়া ও জানাযাকে অনুসরণ করার নির্দেশ
[১০৭] বারা ইবনু আযিব (রদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমাদেরকে অসুস্থ ব্যক্তিকে দেখতে যাওয়া ও জানাযার অনুসরণ করার (অর্থাৎ কবর পর্যন্ত যাওয়ার) নির্দেশ দিয়েছেন।'
দিনের শুরুতে চার রাকআত সালাত আদায়ের গুরুত্ব
[১০৮] ইবনু হাম্মাদ (রহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, 'রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, আল্লাহ তাআলা বলেন,
صَلِّ لِي ابْنَ آدَمَ أَرْبَعَ رَكْعَاتٍ فِي أَوَّلِ النَّهَارِ أَكْفِكَ آخِرَهُ
"হে আদমসন্তান! আমার উদ্দেশ্যে দিনের শুরুতে চার রাকআত সালাত আদায় করো; দিবসের শেষ অবধি আমিই তোমার জন্য যথেষ্ট।"'
ওজু অবস্থায় সালাতের স্থানে বসে থাকার মাহাত্ম্য
[১০৯] আবূ হুরায়রা (রদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, 'রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,
إِنَّ الْمَلَائِكَةَ تُصَلَّى عَلَى الْعَبْدِ مَا دَامَ فِي مُصَلَّاهُ مَا لَمْ يَحْدُثْ تَقُوْلُ اللَّهُمَّ اغْفِرْ لَهُ اللَّهُمَّ ارْحَمْهُ
"বান্দা যতোক্ষণ ওজু অবস্থায় সালাতের স্থানে বসে থাকে, ততোক্ষণ ফেরেশতারা বলতে থাকে, 'হে আল্লাহ! তাঁকে ক্ষমা করো। হে আল্লাহ! তাঁর প্রতি দয়া করো।"'
ইয়াতীমের সাথে উত্তম আচরণের প্রতিদান
[১১০] আবূ উমামা (রদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'রাসূলুল্লাহ
(সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,
مَنْ مَسَحَ عَلَى رَأْسِ يَتِيمِ لَا يُرِيدُ بِهِ إِلَّا اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ كَانَ لَهُ بِكُلِّ شَعْرَةٍ مِرْتُ عَلَيْهَا يَدُهُ حَسَنَاتٌ وَمَنْ أَحْسَنَ إِلى يَتِيمِ أَوْ يَتِيمَةٍ كُنْتُ أَنَا وَهُوَ كَهَاتَيْنِ
"যে ব্যক্তি নিছক আল্লাহ তাআলা'র সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে কোনো ইয়াতীমের মাথায় হাত বুলায়, তার হাতের পরশ-লাগা প্রত্যেকটি চুলের বিপরীতে তাকে অনেক নেকী দেওয়া হবে; আর যে ব্যক্তি ইয়াতীম ছেলে কিংবা মেয়ের সাথে উত্তম আচরণ করে, (পরকালে) সে ও আমি থাকবো এ দুটির ন্যায়।" 'এ কথা বলে তিনি মধ্যমা ও তর্জনীকে একত্রিত করেন।
হাতে গোনা কয়েকটি বস্তু ছাড়া অন্য কোনো কিছুর উপর মানুষের কোনো অধিকার নেই
[১১১] উসমান ইবনু আফফান (রদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, 'রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,
كُلُّ شَيْءٍ سِوى ظِلَّ بَيْتٍ وَجِلْفِ الْخُبْزِ وَثَوْبِ يُوَارِي عَوْرَتَهُ وَالْمَاءِ فَمَا فَضْلَ عَنْ هَذَا فَلَيْسَ لِابْنِ آدَمَ فِيْهِ حَقٌّ
"একটি গৃহের ছায়া, শুকনো রুটি, সতর ঢাকার একখণ্ড বস্ত্র ও পানি- এসবের বাড়তি যা কিছু আছে তার কোনোটিতে আদমসন্তানের কোনো অধিকার নেই।"'
পেট ভরে খাওয়ার জন্য তাঁর নিকট ভালো মানের খেজুর থাকতো না
[১১২] নুমান ইবনু বাশীর (রদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, 'তোমাদের কাছে কি এখন চাহিদামাফিক খাবার ও পানীয় নেই? অথচ আমি তোমাদের নবি (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে দেখেছি, পেট ভরে খাওয়ার জন্য তিনি ভালো মানের খেজুর পেতেন না।' [তুলনীয়: হাদীস নং ১৫৪]
জাহান্নামের আগুনের ব্যাপারে সতর্কীকরণ
[১১৩] নুমান ইবনু বাশীর (রদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, 'আমি রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে মিম্বরে এ কথা বলতে শুনেছি, "أُنْذِرُكُمْ
“আমি তোমাদেরকে (জাহান্নামের) আগুনের ব্যাপারে সতর্ক করছি।”
একপর্যায়ে তাঁর চাদরের একটি প্রান্ত কাঁধ থেকে পড়ে যায়; তখনো তিনি বলছিলেন, “أُنْذِرُكُمْ بِالنَّارِ আমি তোমাদেরকে (জাহান্নামের) আগুনের ব্যাপারে সতর্ক করছি।” নুমান ইবনু বাশীর কুফা'র মিম্বরে দাঁড়িয়ে বলছিলেন, '(নবি (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এতো উচ্চ আওয়াজে কথাগুলো বলেছেন যে তার অনুকরণ করতে গেলে) আমি এখানে থেকে বাজারের লোকদেরকে (সেই আওয়াজ) শোনাতে পারবো।'
তাওবা নসিব হয় এমন দীর্ঘ জীবন লাভের মধ্যে সৌভাগ্য নিহিত
[১১৪] জাবির (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, 'রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, لَا تَمَنَّوُا الْمَوْتَ فَإِنَّ هَوْلَ الْمُطَّلَعِ شَدِيدٌ وَإِنَّ مِنْ سَعَادَةِ الْعَبْدِ أَنْ يَطُوْلَ عُمْرُهُ وَيَرْزُقَهُ اللَّهُ الْإِنَابَةَ "তোমরা মৃত্যু কামনা কোরো না, কারণ কিয়ামতের বিভীষিকা অত্যন্ত কঠিন। তাছাড়া, মানুষের পরম সৌভাগ্য নিহিত রয়েছে এমন দীর্ঘ জীবন লাভ করার মধ্যে, যেখানে আল্লাহ তাআলা তাকে তাওবা করার তাওফীক দান করেন।"' [তুলনীয়: হাদীস নং ১৭৩]
জান্নাতের অল্প একটু জায়গা আকাশ ও পৃথিবীর মধ্যস্থিত সবকিছু থেকে উত্তম
[১১৫] আবূ হুরায়রা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, 'নবি (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, مَوْضِعُ سَوْطٍ أَوْ عَصا فِي الْجَنَّةِ خَيْرٌ مِّمَّا بَيْنَ السَّمَاءِ وَالْأَرْضِ "একটি চাবুক বা লাঠি রাখতে যেটুকু জায়গা দরকার, জান্নাতের সেটুকু জায়গা আকাশ ও পৃথিবীর মধ্যস্থিত সবকিছু থেকে উত্তম।"' [তুলনীয়: হাদীস নং ১০৬]
পরকালমুখী বান্দার ইহকালীন বিষয় দেখভালের দায়িত্ব আল্লাহ তাআলার
[১১৬] আবদুল্লাহ (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, 'ইলম বা জ্ঞানের ধারক-
বাহকগণ যদি নিজেদের জ্ঞানকে সুরক্ষিত রাখতেন এবং তা উপযুক্ত ব্যক্তিদের নিকট পেশ করতেন, তাহলে তারা এই জ্ঞানের মাধ্যমে সমকালীন লোকদের নেতৃত্ব দিতে পারতেন। তা না করে, তারা জ্ঞানকে নিয়ে গেছেন দুনিয়া-পূজারিদের সামনে; ফলে তারা তাচ্ছিল্যের শিকার হয়েছেন। আমি তোমাদের 'নবি (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে বলতে শুনেছি,
مَنْ جَعَلَ هُمُوْمَهُ هَمَّا وَاحِدًا كَفَاهُ اللهُ عَزَّ وَجَلَّ سَائِرَ هُمُوْمِهِ وَمَنْ تَشَعَبَتْ بِهِ الْهُمُوْمُ دُوْنَ أَحْوَالِ الدُّنْيَا لَمْ يُبَالِ اللَّهُ عَزَّ وَجَلَّ فِي أَيِّ أَوْدِيَتِهِ هَلَكَ
"যে তার সকল উদ্বেগকে একটিমাত্র (অর্থাৎ, পরকালমুখী) উদ্বেগে পরিণত করে, তার অন্যসকল উদ্বেগ নিরসনের জন্য আল্লাহ তাআলাই যথেষ্ট। আর যাকে পার্থিব বিষয়াদির নানামুখী উদ্বেগ ঘিরে রাখে, সে কোন গিরিখাতে গিয়ে মরে পড়ে থাকে—তাতে আল্লাহ তাআলা'র কিছু যায় আসে না।" [তুলনীয়: হাদীস নং ১৬৯]
আল্লাহ তাআলা জালিমকে প্রথমে ঢিল দিয়ে থাকেন
[১১৭] আবু মুসা আশআরি (রদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,
إِنَّ اللَّهَ عَزَّ وَجَلَّ يُمْلِي لِلظَّالِمِ فَإِذَا أَخَذَهُ لَمْ يُفْلِتُهُ
"আল্লাহ তাআলা জালিমকে ঢিল দিয়ে থাকেন; পরিশেষে যখন তাকে পাকড়াও করেন, তখন পালানোর কোনো সুযোগ দেন না।" অতঃপর তিনি (কুরআনের এ আয়াত) পাঠ করে শোনান,
وَكَذَلِكَ أَخْذُ رَبِّكَ إِذَا أَخَذَ الْقُرَى وَهِيَ ظَالِمَةُ
তোমার রব যখন জালিম জনপদগুলোকে পাকড়াও করেন, তখন তাঁর পাকড়াও এমনই হয়ে থাকে।" (সূরা হূদ ১১:১০২)।'
অত্যাচারী ও অহঙ্কারী লোকদেরকে কিয়ামতের দিন মানুষের পদতলে পি করানো হবে
[১১৮] আবূ হুরায়রা (রদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'নবি (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,
يُجَاءُ بِالْجَبَّارِينَ وَالْمُتَكَبِرِينَ رِجَالًا فِى صُورَةِ الذَّرِّ يَطَؤُهُمُ النَّاسُ مِنْ هوانهم عَلَى اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ حَتَّى يُقْضَى بَيْنَ النَّاسِ ثُمَّ يُذْهَبُ بِهِمْ إِلَى نَارِ الْأَنْيَارِ
"অত্যাচারী ও অহঙ্কারী লোকদেরকে (কিয়ামতের দিন) ধূলিকণার ন্যায় ছোট মানুষের আকৃতি দিয়ে আনা হবে। আল্লাহ তাআলা'র বিপরীতে তাদেরকে অতি তুচ্ছ মনে হওয়ায় মানুষ তাদেরকে পায়ের নীচে দলিত-মথিত করতে থাকবে; মানুষের বিচারকার্য সমাধা হওয়া পর্যন্ত এ দলনক্রিয়া চলতে থাকবে। পরিশেষে তাদেরকে نَارُ الْأَنْيَّارِ এ নিয়ে যাওয়া হবে।"
জিজ্ঞাসা করা হলো, 'হে আল্লাহ'র রাসূল, نَارُ الْأَنْيَار কী? তিনি বললেন, “عُصَارَةُ أَهْلِ النَّارِ জাহান্নামবাসীদের (দেহ-নির্গত) রস।"'
দুনিয়া ভাগাড়ে পড়ে থাকা মৃত ভেড়ার চেয়েও অধিক তুচ্ছ
[১১৯] আনাস (রদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, 'একটি মৃত ভেড়ার পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁর সাহাবিগণকে জিজ্ঞাসা করলেন,
“هَلْ تَرَوْنَ هَذِهِ هَانَتْ عَلَى أَهْلِهَا؟ তোমরা কি দেখতে পাচ্ছো, এটি তার মালিকের নিকট কতো তুচ্ছ?"
তাঁরা বললেন, 'হ্যাঁ, হে আল্লাহ'র রাসূল!' তারপর রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন,
وَالَّذِي نَفْسُ مُحَمَّدٍ بِيَدِهِ لَلدُّنْيَا أَهْوَنُ عَلَى اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ مِنْ هَذِهِ عَلَى أَهْلِهَا حِيْنَ أَلْقَوْهَا
"তাঁর শপথ, যার হাতে মুহাম্মদের প্রাণ! (ভাগাড়ে) ফেলে দেওয়ার সময় মালিকের নিকট এ ভেড়াটি যতো তুচ্ছ মনে হয়েছে, আল্লাহ তাআলা'র নিকট দুনিয়া তার চেয়েও অধিক তুচ্ছ।"'
কয়েক প্রকার কথা ছাড়া অন্য সকল কথাই মানুষের জন্য ক্ষতিকর
[১২০] নবি (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর স্ত্রী উম্মু হাবীবা (রদিয়াল্লাহু আনহা) থেকে বর্ণিত, 'নবি (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন,
كُلُّ كَلَامِ ابْنِ آدَمَ عَلَيْهِ لَا لَهُ إِلَّا أَمْرًا بِمَعْرُوفٍ أَوْ نَهْيًا عَنْ مُنْكَرٍ أَوْ ذِكْرَ اللَّهِ تَعَالَى
"মানুষের প্রত্যেকটি কথা তার ক্ষতি সাধন করবে, কোনো উপকারে আসবে না; তবে এ কয়েকটি বাদে-ভালো কাজের আদেশ, মন্দ কাজে নিষেধ ও আল্লাহ'র যিক্র।"
এ কথা শুনে একব্যক্তি সুফইয়ান সাওরি (রহিমাহুল্লাহ) কে বললেন, 'এ তো বড়ো কঠিন কথা!' সুফইয়ান (রহিমাহুল্লাহ) বললেন, 'এর মধ্যে আর কতোটুকু কাঠিন্য আছে?' (আরো কঠিন কথা শুনো!) আল্লাহ তাআলা বলেন,
لَا خَيْرَ فِي كَثِيرٍ مِّنْ نَّجْوَاهُمْ إِلَّا مَنْ أَمَرَ بِصَدَقَةٍ أَوْ مَعْرُوْفٍ أَوْ إِصْلَاحٍ بَيْنَ النَّاسِ
"তাদের অধিকাংশ গোপন আলাপের মধ্যে কোনো কল্যাণ নেই, তবে (কল্যাণের অধিকারী কেবল তারা) যারা আল্লাহ'র পথে খরচ, উত্তম কাজ কিংবা মানুষকে সংশোধনের আদেশ দেয়।"- (সূরা আন-নিসা ৪:১১৪)
“(وَتَوَاصَوْا بِالْحَقِّ وَتَوَاصَوْا بِالصَّبْرِ )শুধু তারা ক্ষতিগ্রস্ত নয়) যারা একে অপরকে সত্যের উপদেশ দেয় এবং পরস্পরকে ধৈর্য ধারণের পরামর্শ দেয়।"- (সূরা আল-আসর ১০৩:৩)
“( وَلَا يَشْفَعُونَ إِلَّا لِمَنِ ارْتَضَى )কিয়ামতের দিন) আল্লাহ'র সম্মানিত বান্দারা কেবল সেসব লোকের অনুকূলে সুপারিশ করতে পারবে-যাদের প্রতি আল্লাহ তাআলা সন্তুষ্ট।"-(সূরা আল-আম্বিয়া ২১:২৮) ও
“( إِلَّا مَنْ أَذِنَ لَهُ الرَّحْمَنُ وَقَالَ صَوَابًا )কিয়ামতের দিন আল্লাহ'র সামনে( কেবল সে-ই (কথা বলবে) যাকে দয়াময় আল্লাহ অনুমতি দিবেন এবং যে সত্য কথা বলবে।"-(সূরা আন-নাবা ৭৮:৩৮)। এসব তো আমার রবের কথা, যা জিবরাঈল (আলাইহিস সালাম) নিয়ে এসেছেন!'
শিশুর সাথে আচরণ
[১২১] আনাস ইবনু মালিক (রদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,
'রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ছিলেন শিশুদের সাথে অত্যন্ত দয়ালু। মদীনার এক প্রান্তে একটি দুধের শিশু ছিল, যার দুগ্ধমাতা ছিলেন এক কামার মহিলা। তিনি শিশুটির কাছে প্রায়ই যেতেন, তাঁর সানথে আমরাও থাকতাম। তিনি ইস্থির নামক ঘাস দিয়ে শিশুর ঘরটিকে সুগন্ধিযুক্ত করে দিতেন; শিশুটিকে সুগন্ধি শোঁকাতেন এবং চুমু দিয়ে চলে আসতেন।'
রমাদানের পর মুহাররম মাসের সিয়াম সর্বোত্তম
[১২২] আবূ হুরায়রা (রদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,
أَفْضَلُ الصِّيَامِ بَعْدَ رَمَضَانَ شَهْرُ اللهِ الْمُحَرَّمُ وَأَفْضَلُ الصَّلَاةِ بَعْدَ الْفَرِيضَةِ صَلَاةُ اللَّيْلِ
"রমাদান মাসের পর সর্বোত্তম সিয়াম হলো আল্লাহ'র মাস মুহাররম-এর সিয়াম, আর ফরজ সালাতের পর সর্বোত্তম সালাত হলো রাতের সালাত।”
কুরআন অধ্যয়ন ও ইলম [ওহির জ্ঞান] অন্বেষণের মর্যাদা
[১২৩] আবূ হুরায়রা (রদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,
مَا مِنْ قَوْمٍ يَجْتَمِعُوْنَ فِي بَيْتٍ مِّنْ بُيُوتِ اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ يَتَعَلَّمُوْنَ كِتَابًا وَيَتَدَا رَسُوْنَهُ بَيْنَهُمْ إِلَّا حَفَّتْ بِهِمُ الْمَلَائِكَةُ وَغَشِيَتْهُمُ الرَّحْمَةُ وَذَكَرَهُمُ اللَّهُ فِيمَنْ عِنْدَهُ وَمَا مِنْ رَجُلٍ يَسْلُكُ طَرِيقًا يَلْتَمِسُ فِيْهِ الْعِلْمَ إِلَّا سَهَّلَ اللَّهُ عَزَّ وَجَلَّ لَهُ بِهِ طَرِيقًا إِلَى الْجَنَّةِ
"যখন একদল লোক আল্লাহ তাআলা'র কোনো একটি গৃহে সমবেত হয়ে কুরআন শিখে ও তা নিয়ে পরস্পর আলোচনা করে, তখন ফেরেশতারা তাঁদেরকে ঘিরে রাখে, আল্লাহ'র রহমত তাঁদেরকে আচ্ছন্ন করে নেয় এবং তাঁর নিকট যারা আছে তাদের সাথে তিনি সেসব লোকের প্রশংসা করতে থাকেন। আর যে ব্যক্তিই [ওহির] জ্ঞানানুসন্ধানের লক্ষ্যে কোনো একটি পথে চলতে শুরু করে, এর বিনিময়ে জান্নাতে যাওয়ার জন্য আল্লাহ
তাআলা তাঁর রাস্তা সুগম করে দেন।"
রহমতের সুরতে গযব
[১২৪] নবি (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর স্ত্রী আয়িশা (রদিয়াল্লাহু আনহা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'আমি রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে কখনো আলজিহ্বা দেখা যায় এমনভাবে মুখ জুড়ে হাসি দিতে দেখিনি; তবে তিনি মুচকি হাসি দিতেন। মেঘমালা অথবা বায়ুপ্রবাহ দেখলে তাঁর চেহারায় অসন্তুষ্টির ছাপ স্পষ্ট হয়ে উঠতো। ফলে আমি তাঁকে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘হে আল্লাহ’র রাসূল, মানুষ তো মেঘমালা দেখে এই ভেবে খুশি হয় যে এখন বৃষ্টি হবে! অথচ আপনাকে দেখি, মেঘমালা দেখলে আপনার চেহারায় অসন্তুষ্টির ছাপ স্পষ্ট হয়ে ওঠে!’ জবাবে নবি (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন,
يَا عَائِشَةُ مَا يُؤْمِنُنِي أَنْ يَكُوْنَ فِيْهِ عَذَابٌ قَدْ عُذِّبَ قَوْمٌ بِالرَّيْحِ وَقَدْ رَأَى قَوْمُ الْعَذَابَ فَقَالُوا هَذَا عَارِضُ مُمْطِرُنَا
"আয়িশা! এর মধ্যে শাস্তি থাকবে না—এ নিশ্চয়তা আমাকে কে দিবে? অতীতে একটি জাতিকে বায়ুপ্রবাহের মাধ্যমে শাস্তি দেওয়া হয়েছিল। অথচ ওই জাতিটি [বায়ুপ্রবাহ-সদৃশ] শাস্তি দেখে বলেছিল, 'هُذَا عَارِضُ مُمْطِرُنَا এই তো মেঘমালা! যা আমাদের জন্য বৃষ্টি বর্ষণ করবে।' (সূরা আল-আহকাফ ৪৬:২৪)।" [তুলনীয়: হাদীস নং ২২০]
জাহান্নামে মাত্র একবার চুবানি দেওয়া হলে দুনিয়ার চরম বিলাসী মানুষও সারাজীবনের জৌলুসের কথা সম্পূর্ণরূপে ভুলে যাবে
[১২৫] আনাস ইবনু মালিক (রদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,
يُؤْتَى بِأَنْعَمِ النَّاسِ فِي الدُّنْيَا يَوْمَ الْقِيَامَةِ فَيَقُوْلُ اللَّهُ تَبَارَكَ وَتَعَالَى إِصْبَغُوْهُ فِي النَّارِ صِبْغَةً فَيَصْبَغُوْنَهُ فِي النَّارِ صِبْغَةً ثُمَّ يُؤْتَى بِهِ فَيَقُوْلُ يَا ابْنَ آدَمَ هَلْ أَصَبْتَ نَعِيْمًا قَطُّ هَلْ رَأَيْتَ قُرَّةَ عَيْنٍ قَطُّ هَلْ أَصَبْتَ سُرُوْرًا فَيَقُوْلُ لَا وَعِزَّتِكَ ثُمَّ يَقُوْلُ رُدُّوهُ إِلَى النَّارِ ثُمَّ يُؤْتَى بِأَشَدِّ النَّاسِ كَانَ بَلَاءٌ فِي الدُّنْيَا وَأَجْهَدِهِ جَهْدًا فَيَقُولُ اللَّهُ عَزَّ وَ جَلَّ أَصْبَغُوهُ فِي الْجَنَّةِ صِبْغًا فَيُصْبَعُ فِيْهَا ثُمَّ يُؤْتَى بِهِ ثُمَّ يُقَالُ
يَا ابْنَ آدَمَ هَلْ رَأَيْتَ مَا تَكْرَهُ قَطُّ فَيَقُولُ لَا وَعِزَّتِكَ مَا رَأَيْتُ شَيْئًا قَطْ أَكْرَهُهُ "দুনিয়াতে সবচেয়ে বিলাসী জীবন যাপন করেছে—এমন এক ব্যক্তিকে কিয়ামতের দিন হাজির করা হবে। [ফেরেশতাদেরকে উদ্দেশ্য করে] আল্লাহ তাআলা বলবেন, 'তাকে জাহান্নামের আগুনে একবার চুবিয়ে আনো।' তাঁরা তাকে জাহান্নামের আগুনে স্রেফ একবার চুবিয়ে নিয়ে আসলে আল্লাহ [তাকে] জিজ্ঞাসা করবেন, 'ওহে আদম সন্তান! তুমি কি জীবনে কখনো কোনো অনুগ্রহ পেয়েছিলে? চক্ষু শীতলকারী কোনো কিছু কি কখনো তোমার নজরে পড়েছিল? তুমি কি কখনো সুখ অনুভব করেছিলে?' সে বলবে, 'আপনার সম্মান ও প্রভাব-প্রতিপত্তির কসম! এসবের কোনো কিছুই আমি আমার জীবনে পাইনি।' অতঃপর আল্লাহ বলবেন, 'তাকে পুনরায় জাহান্নামে নিয়ে যাও।' তারপর এমন এক ব্যক্তিকে হাজির করা হবে—যে দুনিয়াতে সবচেয়ে বেশি দুঃখ-কষ্ট ভোগ করে এসেছে। [ফেরেশতাদেরকে উদ্দেশ্য করে] আল্লাহ তাআলা বলবেন, 'তাঁকে একবার জান্নাতে ঢুকিয়ে নিয়ে আসো।' একবার জান্নাতে ঢুকিয়ে নিয়ে আসা হলে তাঁকে জিজ্ঞাসা করা হবে, 'তুমি কি সারাজীবনে অপছন্দনীয় কোনো কিছু দেখেছো?' সে বলবে, 'না! আপনার সম্মান ও প্রভাব-প্রতিপত্তির কসম! সারাজীবনে অপছন্দনীয় কোনো কিছুই আমার নজরে পড়েনি।"'
কারো নিকট কিছু না চাওয়া সর্বোত্তম
[১২৬] উমার ইবনুল খাত্তাব (রদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, 'আমি জিজ্ঞাসা করলাম, 'হে আল্লাহ'র রাসূল, আপনি কি আমাকে ইতোপূর্বে বলেননি— إِنَّ خَيْرًا لَكَ أَنْ لَا تَسْأَلَ أَحَدًا شَيْئًا “তোমার জন্য সর্বোত্তম কাজ হলো তুমি কারো নিকট কোনো কিছু চাইবে না।"?
নবি (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, إِنَّمَا ذَاكَ أَنْ تَسْأَلَ النَّاسَ وَمَا آتَاكَ اللَّهُ مِنْ غَيْرِ مَسْأَلَةٍ فَإِنَّمَا هُوَ رِزْقٌ رَزَقَكَهُ اللهُ عَزَّ وَجَلَّ "সেটি ঐ সময় প্রযোজ্য, যখন তুমি নিজে থেকে মানুষের নিকট কোনো
কিছু চাইবে। পক্ষান্তরে, চাওয়া ব্যতিরেকেই আল্লাহ তাআলা যা কিছু তোমাকে দিবেন, তাকে মনে করবে মহান আল্লাহ কর্তৃক তোমাকে সরবরাহ করা জীবনোপকরণ।"
হতদরিদ্র লোকেরা যখন জান্নাতে চলে যাবে, তখন ধনী লোকেরা নিজেদের সম্পদের হিসেব দেওয়ার জন্য আটকে থাকবে
[১২৭] উসামা ইবনু যাইদ (রাদিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণিত, 'রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,
نَظَرْتُ إِلَى الْجَنَّةِ فَإِذَا أَكْثَرُ أَهْلِهَا الْمَسَاكِيْنُ وَنَظَرْتُ إِلَى النَّارِ فَإِذَا أَكْثَرُ أَهْلِهَا النِّسَاءُ وَإِذَا أَهْلُ الْجَدِّ مَحْبُسُوْنَ وَإِذَا الْكُفَّارُ قَدْ أُمِرَ بِهِمْ إِلَى النَّارِ
"আমি জান্নাতের দিকে তাকিয়ে দেখলাম, সেখানকার বেশিরভাগ অধিবাসী হলো [দুনিয়ার] নিঃস্ব ব্যক্তি; জাহান্নামের দিকে তাকিয়ে দেখি, সেখানকার বেশিরভাগ বাসিন্দা নারী; [দুনিয়ার] ধনাঢ্য ব্যক্তিরা [স্ব স্ব সম্পদের আয়-ব্যয়ের হিসেব দেয়ার জন্য] আটকে গেছে; আর কাফিরদেরকে [হিসেব-নিকেশ ছাড়াই] জাহান্নামে নিয়ে যাওয়ার জন্য [ফেরেশতাদেরকে] আদেশ দেওয়া হয়েছে।" [তুলনীয়: হাদীস নং ১৭৭]
আল্লাহর ক্ষমা লাভের প্রত্যাশা ও পাপের জন্য পাকড়াওয়ের আশঙ্কা-দুটিই মুমিন মানসে জাগরুক থাকা চাই
[১২৮] আনাস ইবনু মালিক (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'নবি (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এক মুমূর্ষু যুবকের নিকট গিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, "كَيْفَ تَجِدُكَ তোমার অনুভূতি কী?” সে বললো, 'আমি আল্লাহ তাআলা'র [ক্ষমা লাভের] প্রত্যাশী, কিন্তু পাপগুলো নিয়ে শঙ্কিত।' রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন,
لَا يَجْتَمِعَانِ فِي قَلْبٍ عَبْدٍ فِي مِثْلِ هَذَا الْمَوْطِنِ إِلَّا أَعْطَاهُ اللَّهُ عَزَّ وَجَلَّ مَا يَرْجُوْ
"এ রকম পরিস্থিতিতে কোনো বান্দার অন্তরে যদি এ দুটি অনুভূতি একসাথে উদিত হয়, তাহলে আল্লাহ তাআলা তাঁকে অবশ্যই সেটি দিবেন-যা সে প্রত্যাশা করে।" এ কথা বলে তিনি তাকে তার আশঙ্কার ব্যাপারে নিশ্চিন্ত করেন।'
সফরে মানুষের যেসব পাথেয় প্রয়োজন
[১২৯] আনাস ইবনু মালিক (রদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘এক ব্যক্তি নবি (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নিকট এসে বললো, ‘আমি সফরে বের হবো, আমাকে কিছু পাথেয় যোগান দিন।’ নবি (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন,
"زَوَّدَكَ اللهُ التَّقْوَى আল্লাহ তোমাকে আল্লাহভীতির রসদে ভরপুর করে দিন!" সে বললো, 'আরো বাড়তি কিছু দিন।' তিনি বললেন, “وَغَفَرَ ذَنْبَكَ আল্লাহ তোমার পাপ মোচন করে দিন!" সে বললো, 'আপনার জন্য আমার পিতা-মাতা উৎসর্গ হোক! আমাকে আরো বাড়তি কিছু দিন।' নবি (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন,
“وَيَسَّرَ لَكَ الْخَيْرَ حَيْثُ مَا كُنْتَ তুমি যেখানেই থাকো, আল্লাহ তোমাকে সহজে কল্যাণ দান করুন!"'
যাদের কসম আল্লাহ তাআলা অবশ্যই পুরা করেন
[১৩০] আনাস ইবনু মালিক (রদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,
كَمْ مِنْ أَشْعَثَ أَغْبَرَ ذِي طِمْرَيْنِ لَا يَؤُبُّهُ لَهُ لَوْ أَقْسَمَ عَلَى اللَّهِ عَزَّ وَ جَلَّ لَأَبَرَّهُ مِنْهُمُ الْبَرَاءُ بْنُ مَعْرُورٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ
"কিছু লোক আছে যাদের চুল উষ্কখুষ্ক, দেহ ধূলিমলিন ও গায়ে দু-খণ্ড জীর্ণ বস্ত্র জড়ানো; পোশাকের প্রতি যাদের কোনো আকর্ষণ নেই। তাদের কেউ যদি আল্লাহ'র নামে [কোনো কিছুর] শপথ করে বসে, আল্লাহ তাআলা অবশ্যই তা বাস্তবায়ন করেন। বারা ইবনু মা'রূর (আল্লাহ তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট হোন!) তাঁদের মধ্যে একজন।” [তুলনীয়: হাদীস নং ৬৬; ৬৮]
কিয়ামত অতি নিকটে
[১৩১] জাবির ইবনু সামুরা (রদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'আমি নবি (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর দুটি আঙুলের দিকে তাকিয়ে
ছিলাম। তিনি তর্জনী ও তৎসংলগ্ন মধ্যমা আঙুলদ্বয়ের দিকে ইশারা করে বলছিলেন,
بُعِثْتُ أَنَا وَالسَّاعَةُ كَهْذِهِ مِنْ هَذِهِ আমার আগমন ও কিয়ামত-এ দুটি আঙুলের [ব্যবধানের] ন্যায়।"'
ইন্তেকালের সময় পরিধেয় বস্ত্র
[১৩২] আবূ বুরদা (রদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'ইয়ামানে তৈরি মোটা কাপড়ের একটি 'ইযার' [নিম্নবসন] ও একই ধরনের কাপড় দিয়ে তৈরি একটি জামা-যাকে তোমরা 'মুলাব্বিদা' নামে চেনো-এ দুটি বস্ত্র আয়িশা (রদিয়াল্লাহু আনহা) আমাদের সামনে বের করে বললেন, "এ দুটি বস্ত্র পরিহিত অবস্থায় রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ইন্তেকাল করেছেন।"
ছিন্নবস্ত্রে কেটেছে আহলুস সুফফার সাহাবিদের দিনকাল
[১৩৩] [আহলুস-সুফফা'র অন্যতম সাহাবি তালহা ইবনু উমার নাসরি (রদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'আমি যখন মদীনায় আসলাম, তখন এখানে আমার পরিচিত কেউ ছিল না। আমরা যেখানে থাকতাম সেখানে প্রতি দু দিনে এক মুদ্দ পরিমাণ খেজুর আসতো। অতঃপর [একদিন] রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমাদেরকে নিয়ে সালাত আদায় করলেন। সালাত শেষে পেছন থেকে একজন চিৎকার করে বলে উঠলো, 'হে আল্লাহ'র রাসূল, শুকনো খেজুর খেয়ে খেয়ে আমাদের পেট জ্বলে গিয়েছে, আর আমাদের চটের জামাও ছিঁড়ে গিয়েছে!' এসব অনুযোগ শুনে নবি (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) একটি ভাষণ দেন। ভাষণে আল্লাহ তাআলা'র স্তুতি ও প্রশংসা করে তিনি বলেন,
وَاللَّهِ لَوْ أَجِدُ لَكُمُ اللَّحْمَ وَالْخُبْزَ لَأَطْعَمْتُكُمُوهُ وَلَيَأْتِيَنَّ عَلَيْكُمْ زَمَانٌ يُغْدَى عَلَى أَحَدِكُمُ الْجِفَانُ وَيُرَاحُ وَلَتَلْبِسُنَّ مِثْلَ أَسْتَارِ الْكَعْبَةِ
"আল্লাহ'র কসম! তোমাদের জন্য গোশত ও রুটির ব্যবস্থা করার সামর্থ্য থাকলে আমি তোমাদেরকে অবশ্যই তা খাওয়াতাম। তোমাদের উপর এমন একটি সময় আসবেই, যখন তোমাদের কারো কারো সামনে সকাল-
সন্ধ্যায় খাবারের বিশাল বিশাল ডিশ পরিবেশন করা হবে, আর তোমাদের গায়ে থাকবে কা'বার গিলাফ সদৃশ পোশাক।"
তাঁরা জিজ্ঞাসা করলেন, 'হে আল্লাহ'র রাসূল, আজকের সময় ও সেই সময়-এ দুয়ের মধ্যে আমাদের জন্য কোন্টি উত্তম?' জবাবে তিনি বললেন, أَنْتُمُ الْيَوْمَ خَيْرٌ مِّنْكُمْ يَوْمَئِذٍ أَنْتُمُ الْيَوْمَ خَيْرٌ مِّنْكُمْ يَوْمَئِذٍ يَضْرِبُ بَعْضُكُمْ رِقَابَ بَعْضٍ
"সে সময়ের তুলনায় বর্তমান সময় তোমাদের জন্য অধিক উত্তম। সে সময়ের তুলনায় বর্তমান সময় তোমাদের জন্য অধিক উত্তম; [কারণ] সে সময় তোমাদের একদল অপরদলের গর্দানে আঘাত করবে।"' [তুলনীয়: হাদীস নং ৩০; ১২৭; ১৭৭; ১৭৮]
যা শোধ করার সামর্থ্য নেই-তা নিজের আমানতের বলয়ে নেওয়ার চেয়ে অসংখ্য তালিযুক্ত একখন্ড বস্ত্র পরিধান করা অধিক উত্তম
[১৩৪] আনাস ইবনু মালিক (রদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'বাকিতে একটি জিনিস ক্রয় করার জন্য নবি (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) [তাঁকে] এক ইয়াহূদির নিকট প্রেরণ করেন; কিছুটা সচ্ছলতা আসলে তার পাওনা পরিশোধ করে দেওয়া হবে। ইয়াহুদি লোকটি মন্তব্য করলো, 'মুহাম্মদের জীবনে কি কখনো সচ্ছলতা আসবে?' আমি নবি (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নিকট এসে তাঁকে এ বিষয়ে অবহিত করলে তিনি বললেন, كَذَبَ الْيَهُودِيُّ أَنَا خَيْرُ مَنْ بَايَعَ لَأَنْ يَلْبَسَ الرَّجُلُ ثَوْبًا مِنْ رِقَاعٍ شَتَّى خَيْرٌ لَهُ مِنْ أَنْ يَأْخُذَ فِي أَمَانَتِهِ مَا لَيْسَ عِنْدَهُ
"ইয়াহুদি লোকটি মিথ্যা বলেছে।" এ কথাটি তিনবার বলেছেন। "ক্রয়-বিক্রয়কারীদের মধ্যে আমি সর্বোত্তম ব্যক্তি।" এটিও তিনি তিনবার পুনরাবৃত্তি করেছেন। "যা শোধ করার সামর্থ্য নেই-তা নিজের আমানতের বলয়ে নেওয়ার চেয়ে অসংখ্য তালিযুক্ত একখণ্ড বস্ত্র পরিধান করা একজন ব্যক্তির জন্য অধিক উত্তম।"'
সর্বোত্তম সম্পদ
[১৩৬] সাওবান (রদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'যখন وَالَّذِينَ يَكْنِزُوْنَ الذَّهَبَ وَالْفِضَّةَ وَلَا يُنْفِقُوْنَهَا فِي سَبِيلِ اللَّهِ فَبَشِّرْهُمْ بِعَذَابٍ أَلِيمٍ
"আর যারা সোনা-রুপা পুঞ্জীভূত করে রাখে, সেগুলো আল্লাহ'র রাস্তায় খরচ করে না, তাদেরকে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তির সুসংবাদ (!) দিয়ে দাও।"-(সূরা আত-তাওবা ৯:৩৪) নাযিল হলো, তখন আমরা রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সাথে এক সফরে ছিলাম। সাহাবিদের মধ্যে কেউ কেউ বললেন, 'স্বর্ণ-রুপার ব্যাপারে যা নাযিল হওয়ার, তা তো নাযিল হলোই। এখন আমরা যদি জানতে পারতাম সর্বোত্তম সম্পদ কোনটি, তাহলে আমরা তা-ই গ্রহণ করতাম।' [এ কথা শুনে] নবি (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, أَفْضَلُهُ لِسَانًا ذَاكِرًا وَقَلْبًا شَاكِرًا وَزَوْجَةً تُعِينُ عَلَى الْآخِرَةِ
"সর্বোত্তম সম্পদ হল আল্লাহ'র যিক্রকারী জিহ্বা, কৃতজ্ঞ মন ও পরকালের [নাজাত লাভে] সহায়তাকারী স্ত্রী।” [তুলনীয়: হাদীস নং ১০১]
সামর্থ্যের সবটুকু দিয়ে পাপ এড়িয়ে চলো
[১৩৭] আতা ইবনু ইয়াসার (রহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, 'নবি (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মুআয (রদিয়াল্লাহু আনহু) কে ইয়েমেনে (গভর্নর হিসেবে) প্রেরণ করার সময় মুআয বললেন, 'হে আল্লাহ'র রাসূল, আমাকে কিছু উপদেশ দিন।' নবি (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, عَلَيْكَ بِتَقْوى اللهِ مَا اسْتَطَعْتَ وَاذْكُرِ اللهَ عَزَّ وَجَلَّ عِنْدَ كُلِّ حَجَرٍ وَشَجَرٍ وَإِذَا عَمِلْتَ سَيِّئَةً فَأَحْدِثْ عِنْدَهَا تَوْبَةَ السِّرِّ بِالسِّرِّ وَالْعَلَانِيَةِ بِالْعَلَانِيَةِ
"সামর্থ্যের সবটুকু দিয়ে আল্লাহ'র অসন্তুষ্টি থেকে বেঁচে থাকো; প্রত্যেক বৃক্ষ ও পাথরের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় আল্লাহ'র যিক্র করো এবং কোনো মন্দ কাজ করে ফেললে সাথে সাথে তাওবা শুরু করো-গোপন পাপের তাওবা গোপনে, আর প্রকাশ্য পাপের তাওবা প্রকাশ্যে।"'
জান্নাতের ভেতর আফসোস
[১৩৭] আবূ হুরায়রা (রদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, 'নবি (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,
مَا قَعَدَ قَوْمٌ مَقْعَدًا لَا يَذْكُرُوْنَ اللهَ عَزَّ وَجَلَّ فِيْهِ وَيُصَلُّوْنَ عَلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللَّه عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِلَّا كَانَ عَلَيْهِمْ حَسْرَةً يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَإِنْ دَخَلُوا الْجَنَّةَ لِلثَّوَابِ "মানুষের কোনো একটি বৈঠকও যদি আল্লাহ'র যিক্র ও নবি (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর উপর সালাত (দরুদ) পাঠ থেকে বঞ্চিত থাকে, কিয়ামতের দিন সেই বৈঠকটি হবে বৈঠকে অংশগ্রহণকারী সকলের জন্য চরম আফসোসের বিষয়; সাওয়াবের বিনিময়ে জান্নাতে প্রবেশ করলেও [তাদের আফসোস থেকে যাবে]।"
লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ এর গুরুত্ব
[১৩৮] আবূ যার গিফারি (রদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'আমি বললাম, হে আল্লাহ'র রাসূল, আমাকে কিছু উপদেশ দিন। জবাবে তিনি বললেন,
إِذَا عَمِلْتَ سَيِّئَةً فَأَتْبِعُهَا حَسَنَةً تَمْحُهَا গেলে, সাথে সাথে একটি ভালো কাজ সম্পাদন করো; তাহলে তা মন্দকে মুছে দিবে।" আমি বললাম, হে আল্লাহ'র রাসূল, 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ / আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই'-উচ্চারণ করা কি ভালো কাজের অন্তর্ভুক্ত? তিনি বললেন, “هِيَ أَفْضَلُ الْحَسَنَاتِ ভালো কাজসমূহের মধ্যে এটি সর্বোত্তম।”
একফোঁটা অশ্রু দিয়ে আল্লাহ তাআলা জাহান্নামের আগুনের অনেক সমুদ্র নির্বাপিত করে দিবেন
[১৩৯] খাযিম (রদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, নবি (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নিকট জিবরাঈল (আলাইহিস সালাম) আগমন করলেন। তখন তাঁর পাশে একব্যক্তি কান্নাকাটি করছিলেন। জিজ্ঞাসা করা হলো, 'এ ব্যক্তি কে?' বলা হলো, 'অমুক।' অতঃপর জিবরাঈল (আলাইহিস সালাম) বললেন, "আমরা আদম সন্তানের সকল কাজের ওজন করে থাকি, তবে কান্না বাদে;
কারণ একফোঁটা অশ্রু দিয়ে আল্লাহ তাআলা জাহান্নামের আগুনের অনেক সমুদ্র নির্বাপিত করে দিবেন।"
জাহান্নাম সৃষ্টির পর থেকে জিবরাঈল (আলাইহিস সালাম)-এর ঠোঁটে কখনো হাসি ফুটেনি
[১৪০] রবাহ (রহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, 'নবি (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) জিবরাঈল (আলাইহিস সালাম)-কে বললেন,
لَمْ تَأْتِنِي إِلَّا وَأَنْتَ صَارُّ بَيْنَ عَيْنَيْكَ
"আপনি যতোবার আমার নিকট এসেছেন, ততোবারই আপনার কপালে শোক ও দুশ্চিন্তার ছাপ ছিল।” [এর কারণ দর্শাতে গিয়ে] জিবরাঈল (আলাইহিস সালাম) বললেন, 'জাহান্নাম সৃষ্টির পর থেকে আমার ঠোঁটে কখনো হাসি ফুটেনি।'' [তুলনীয়: হাদীস নং ২৪০]
কুরআনের দুটি আয়াতের প্রতিক্রিয়া
[১৪১] হিমরান ইবনু আইয়ুন (রহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত,
إِنَّ لَدَيْنَا أَنْكَالًا وَجَحِيمًا وَطَعَامًا ذَا غُصَّةٍ وَعَذَابًا أَلِيمًا
"আমার নিকট রয়েছে শক্ত বেড়ি, জ্বলন্ত আগুন, শ্বাস রোধ করা খাবার ও যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি।” (সূরা আল-মুয্যাম্মিল ৭৩:১২-১৩)-এ আয়াত পাঠ করে নবি (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বেহুঁশ হয়ে গিয়েছিলেন।'
বাস্তবতা জানলে মানুষ অল্প হাসতো ও অধিক কাঁদতো
[১৪২] আনাস ইবনু মালিক (রদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, 'রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,
لَوْ تَعْلَمُوْنَ مَا أَعْلَمُ لَضَحِكْتُمْ قَلِيْلًا وَلَبَكَيْتُمْ كَثِيرًا
"আমি যা জানি তা যদি তোমরা জানতে, তাহলে অল্প হাসতে এবং অধিক পরিমাণ কাঁদতে।" ' [তুলনীয়: হাদীস নং ৩৬]
অভিজাত পোশাকে কল্যাণ নেই
[১৪৩] আবু যার গিফারি (রদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমাকে বললেন, يَا أَبَا ذَرٍّ أُنْظُرْ أَرْفَعَ رَجُلٍ فِي الْمَسْجِدِ লোকটির দিকে তাকাও।" আমি তাকিয়ে দেখলাম, সবচেয়ে পরিপাটি লোকটি উৎকৃষ্ট মানের পোশাক পরিহিত। আমি [নবি (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কে] বললাম, এ কথার উদ্দেশ্য কী? তিনি বললেন, أُنْظُرْ أَوْضَعَ رَجُلٍ فِي المَسْجِدِ দৃষ্টি দাও।” আমি তাকিয়ে দেখলাম, সবচেয়ে নগণ্য ব্যক্তিটি বহু পুরাতন ও জরাজীর্ণ জামা গায়ে দিয়ে আছে। আমি জিজ্ঞাসা করলাম, এ সবের উদ্দেশ্য কী? রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, لَهَذَا خَيْرٌ عِنْدَ اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ يَوْمَ الْقِيَامَةِ مِنْ مِلْءِ الْأَرْضِ مِثْلِ هَذَا "দুনিয়া-ভর্তি এরূপ উৎকৃষ্ট মানের পোশাকধারীর তুলনায় এই পুরাতন জরাজীর্ণ পোশাকধারী কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলা'র দৃষ্টিতে অধিক উত্তম।"
মেয়ের বিয়েতে উপহার
[১৪৪] ইকরিমা (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'ফাতিমা (রদিয়াল্লাহু আনহা)-কে বিয়ে দেওয়ার সময় রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁকে খেজুর গাছের ছাল দিয়ে তৈরি একটি বিছানা, আঁশভর্তি চামড়ার একটি বালিশ ও কিছু পনির উপহার দিয়েছিলেন।' [তুলনীয়: হাদীস নং ৭০]
পরকালের আরাম আয়েশই প্রকৃত আরাম আয়েশ
[১৪৫] আবদুল্লাহ ইবনুল হারস (রদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, 'নবি (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) উটের পিঠে সওয়ার হয়ে হাজ্জ সম্পাদন করেছেন। উটটি এদিক সেদিক দুলতে থাকলে নবি (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, “لَبَّيْكَ إِنَّ الْعَيْشَ عَيْشُ الْآخِرَةِ [হে আল্লাহ!] আমি হাজির। পরকালের
আরাম আয়েশই প্রকৃত আরাম আয়েশ।"'
দুনিয়া মুমিনের জন্য জেলখানা আর কাফিরের জন্য জান্নাতস্বরূপ
[১৪৬] আবূ হুরায়রা (রদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, 'নবি (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, الدُّنْيَا سِجْنُ الْمُؤْمِنِ وَجَنَّةُ الْكَافِرِ "দুনিয়া মুমিনের জন্য জেলখানা আর কাফিরের জন্য জান্নাতস্বরূপ।"'
দুর্ভিক্ষের তুলনায় প্রাচুর্য বেশি ভয়ঙ্কর
[১৪৭] আবূ যার গিফারি (রdiয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'একব্যক্তি নবি (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নিকট এসে বললো, 'হে আল্লাহ'র রাসূল, দুর্ভিক্ষ তো আমাদেরকে খেয়ে ফেললো।' নবি (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, غَيْرُ ذَلِكَ أَخْوَفُ عَلَيْكُمْ أَنْ تَصُبَّ عَلَيْكُمُ الدُّنْيَا صَبًّا فَلَيْتَ أُمَّتِي لَا يَلْبَسُونَ الذَهَبَ "প্রাচুর্য তো তোমাদের জন্য আরো বেশি ভয়ঙ্কর। [তখন] দুনিয়া তোমাদেরকে নিমজ্জিত করে ফেলবে। হায়! আমার উম্মাহ'র লোকেরা যদি স্বর্ণ পরিধান না করতো!"'
আল্লাহ তাআলার জন্য নিবেদিত নয় এমন প্রত্যেক জিনিসই অভিশপ্ত
[১৪৮] মুহাম্মদ ইবনুল মুনকাদির (রহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, الدُّنْيَا مَلْعُوْنَةٌ مَلْعُوْنُ مَا فِيْهَا إِلَّا مَا كَانَ لِلَّهِ عَزَّ وَجَلَّ "দুনিয়া অভিশপ্ত; তার মধ্যে যা কিছু আছে সবই অভিশপ্ত, তবে যা কিছু আল্লাহ তাআলা'র জন্য নিবেদিত (তা বাদে)।"'
মুমিনের জীবনোপকরণ হবে মুসাফিরের সম্বলের ন্যায়
[১৪৯] হাসান (রহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'সালমান ফারিসি
(রদিয়াল্লাহু আনহু) ভাষণ দিতে গিয়ে কেঁদে ফেললেন। তাঁকে জিজ্ঞাসা করা হলো, 'আপনি কাঁদছেন কেন? আপনি তো রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর সাহাবি!' তিনি বললেন, 'দুনিয়ার প্রতি আমার কোনো অনুরাগ বা বিরাগের জন্য কাঁদছি না; তবে (আমার কান্নার কারণ হলো) রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমাদের নিকট থেকে একটি অঙ্গীকার নিয়েছিলেন, যা আমরা ছেড়ে দিয়েছি। তিনি আমাদের নিকট থেকে এ মর্মে অঙ্গীকার নিয়েছিলেন যে আমাদের প্রত্যেকের জীবনোপকরণ হবে মুসাফিরের সম্বলের ন্যায়। এ কথা বলে তিনি তাঁর পরিত্যক্ত সম্পদের দিকে নজর দিলেন। হিসেব কষে দেখা গেলো, তাঁর পরিত্যক্ত সম্পদসমূহের মূল্য পঁচিশ থেকে পঁয়ত্রিশ দিরহামের মত।'
অধিক জীবনোপকরণ মানুষকে দুনিয়ার প্রতি আসক্ত করে তোলে
[১৫০] আবদুল্লাহ (রদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, 'রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, لَا تَتَّخِذُوا الضَّيْعَةَ فَتَرْغَبُوا فِي الدُّنْيَا "তোমরা [অধিক] জীবনোপকরণ গ্রহণ কোরো না, অন্যথায় দুনিয়ার প্রতি আসক্ত হয়ে পড়বে।” [তুলনীয়: হাদীস নং ১৭০; ১৭১]
কাঠের ঘর মেরামত করার দৃশ্যও তাঁর নিকট অপছন্দনীয়
[১৫১] আবদুল্লাহ ইবনু আমর (রদিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) একবার আমাদের পাশ দিয়ে অতিক্রম করছিলেন; আমরা তখন একটি কাঠের ঘর মেরামত করছিলাম। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, "মَا هَذَا এটি কী?" আমরা বললাম, এটি একটি কাঠের ঘর-যা দুর্বল হয়ে গিয়েছে; আমরা এটি মেরামত করছি। তিনি বললেন, مَا أَرَى الْأَمْرَ إِلَّا أَعْجَلُ مِنْ ذَلِكَ মুখ ফিরিয়ে নিই।"'
পরপর কয়েক রাত অভুক্ত থাকতেন
[১৫২] ইবনু আব্বাস (রদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, 'রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়া সাল্লাম) পরপর অনেক রাত অভুক্ত থাকতেন। তাঁর পরিবারবর্গের নিকটও সকাল ও রাতে খাওয়ার মতো কিছু থাকতো না। তাঁরা সাধারণত যবের রুটি খেতেন।'
একমাস পর্যন্ত ঘরে রুটি বানানো হয়নি
[১৫৩] আয়িশা (রদিয়াল্লাহু আনহা) বলেন, '[একবার] আবূ বকর (রদিয়াল্লাহু আনহু) আমাদের নিকট ভেড়ার একটি পা পাঠালেন। আমি তা ধরে রাখলাম, আর রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এটি কেটে ভাগ করলেন।' [অতঃপর] আয়িশা (রদিয়াল্লাহু আনহা) বলেন, 'মুহাম্মদ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর পরিবারবর্গের উপর এক-দু মাস এমন অতিবাহিত হয়েছে, যখন তাঁরা রুটিও বানাননি এবং হাড়িও চড়াননি।' [তুলনীয়: হাদীস নং ১৮]
ক্ষুধার যন্ত্রণায় ন্যুব্জ হয়ে গিয়েছিলেন
[১৫৪] নুমান ইবনু বাশীর (রহিমাহুল্লাহ) এক বক্তৃতায় বলেন, 'মানুষকে দুনিয়া কীভাবে পেয়ে বসেছে-তা উল্লেখ করে উমার (রদিয়াল্লাহু আনহু) বলেছিলেন, 'আমি একদিন রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে ক্ষুধার যন্ত্রণায় ন্যুব্জ হয়ে যেতে দেখেছি। পেট ভরার মতো নিম্ন মানের খেজুরও [সেদিন] তাঁর নিকট ছিল না।' [তুলনীয়: হাদীস নং ১১২]
পরপর দুদিন পেট ভরে যবের রুটি খেতে পাননি
[১৫৫] আয়িশা (রদিয়াল্লাহু আনহা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর ইন্তেকালের আগ পর্যন্ত তাঁর পরিবারের লোকজন পরপর দুদিন পেট ভরে যবের রুটি খেতে পায়নি।'
রাতে দাঁড়িয়ে সালাত আদায় করা মুমিনের বৈশিষ্ট্য
[১৫৬] মুআয ইবনু জাবাল (রদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, “تَتَجَافَى جُنُوْبُهُمْ عَنِ الْمَضَاجِعِ ]মুমিন তো তাঁরা] যাদের পার্শ্বদেশ বিছানা এড়িয়ে চলে।” (সূরা আস-সাজদাহ ৩২:১৬)
এর ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে নবি (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, “قيام
العبد من الليل | তাঁরা হলো| সেসব বান্দা যারা রাতে দাঁড়িয়ে সালাত আদায় করো"
কখনো যবের রুটি উদ্বৃত্ত থাকতো না
[১৫৭] আবূ উমামা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'নবি (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর পরিবারবর্গের নিকট কখনো যবের রুটি উদ্বৃত্ত থাকতো না।'
দুনিয়াতে প্রাপ্ত নিয়ামতের ব্যাপারে কিয়ামতের দিন জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে
[১৫৮] আবূ কিলাবা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত,
ثُمَّ لَتُسْأَلُنَّ يَوْمَئِذٍ عَنِ النَّعِيمِ তারপর সেদিন তোমাদেরকে বিভিন্ন অনুগ্রহের ব্যাপারে প্রশ্নের মুখোমুখি করা হবে।" (সূরা আত-তাকাসুর ১০২:৮)
-এর ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে নবি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, “ناس من أُمَّتِي يَعْفِدُونَ السُّمْنَ وَالْعَسَلَ بِالتَّفِتِ فيأكلونه আমার উম্মতের কিছু লোক যবের মসৃণ গুড়ার সাথে ঘি ও মধু মিশিয়ে খায়!" [তুলনীয়: হাদীস নং ১৬৫]
সুস্থ দেহ আল্লাহর নিয়ামত-যার সম্পর্কে কিয়ামতের দিন জিজ্ঞাসা করা হবে
[১৫৯] আবূ হুরায়রা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, 'আমি রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে বলতে শুনেছি,
إِنَّ أَوَّلَ مَا يُسْأَلُ عَنْهُ الْعَبْدُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ مِنَ النَّعِيمِ أَنْ يُقَالَ لَهُ أَلَمْ أُصِحَ لَكَ الْجِسْمَ وَأَرْوِيْكَ مِنَ الْمَاءِ الْبَارِدِ
"নিয়ামত প্রসঙ্গে কিয়ামতের দিন বান্দাকে সর্বপ্রথম যে প্রশ্নটি করা হবে তা হলো, তাকে বলা হবে, 'আমি কি তোমার দেহকে সুস্থ রাখিনি এবং তোমাকে ঠান্ডা পানি পান করাইনি?"'
কোন সম্পদ মানুষের নিজস্ব?
[১৬০] মুতারিফ (রহিমাহুল্লাহ) তাঁর পিতার সূত্রে বর্ণনা করেছেন যে তিনি [একবার] রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নিকট গেলেন। তখন
"الْهَاكُمُ التَّكَاثُرُ ঐশ্বর্যশালী হওয়ার প্রতিযোগিতা তোমাদেরকে বিপথে পরিচালিত করেছে!" (সূরা আত তাকাছুর ১০২) এর ব্যাখ্যা করছিলেন। তিনি বললেন,
يَقُولُ ابْنُ آدَمَ مالي مالي وهل لك يا ابن آدم من مالك إلا ما أكلت فأفنيت أَوْ لَبِسْتَ فَأَبْلَيْتَ أَوْ تَصَدَّقْتَ فَأَمْضَيْتَ "আদমসন্তান (অর্থাৎ, মানুষ) বলে, 'আমার সম্পদ! আমার সম্পদ!' আদমসন্তান! তোমার কি কোনো সম্পদ আছে? যা খেয়েছো, তা তো নিঃশেষ করে ফেলেছো; যা পরিধান করেছো, তা তো মলিন করে ফেলেছো; আর যা দান করেছো, তা তো করেই ফেলেছো!" [তুলনীয়: হাদীস নং ৫৯]
আঙুরের লতা খেয়ে খেয়ে সাহাবিদের মুখের কোণে ঘা হয়ে গিয়েছিল
[১৬১] উতবা ইবনু গাযওয়ান (রদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, 'রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সাথে থাকা সাতজনের মধ্যে আমি ছিলাম সপ্তম। আঙুরের লতা ছাড়া আমাদের নিকট কোনো খাবার ছিল না। [এগুলো খেয়ে খেয়ে) আমাদের মুখের কোণে ঘা হয়ে গিয়েছিল।' [তুলনীয়: হাদীস নং ১৬২]
এক সময় সাহাবিদের নিকট সামুর ও আঙুরের লতা ছাড়া অন্য কোনো খাবার ছিল না
[১৬২] সাদ ইবনু আবী ওয়াক্কাস (রদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, 'আরবদের মধ্যে আমিই সর্বপ্রথম আল্লাহ'র রাস্তায় তির নিক্ষেপ করেছিলাম। আমরা রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সাথে ছিলাম। আমাদের নিকট সামুর ও আঙুরের লতা ছাড়া অন্য কোনো খাবার ছিল না। [এসব খাওয়ার দরুন] আমাদের লোকজন ছাগলের বিষ্ঠার ন্যায় মলত্যাগ করতো।' [তুলনীয়: হাদীস নং ১৬১]
একব্যক্তি বস্ত্রের অভাবে শীতকালে গর্তে লুকিয়ে থাকতেন
[১৬৩] কাতাদা (রদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'আমাদেরকে
বলা হলো, একব্যক্তি ক্ষুধার তাড়নায় পেটের সাথে পাথর বেঁধে রাখে, যেন এর মাধ্যমে মেরুদণ্ড সোজা রাখতে পারে। লোকটি শীতকালে একটি গর্ত খুঁড়ে সেখানে থাকে; এ ছাড়া তাঁর আর কোনো দেহাবরণ নেই।'
নিয়ামতের ব্যাপারে কিয়ামতের দিন জিজ্ঞাসাবাদ
[১৬৪] আমির (রদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, '[একবার] নবি (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম), আবূ বকর ও উমার গোশত, যবের রুটি, খেজুর ও ঠান্ডা পানি খেলেন। খাওয়া শেষে নবি (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, “هَذَا وَرَبَّكُمَا لَمِنَ النَّعِيمِ তোমাদের রবের শপথ! এ খাবার অবশ্যই নিয়ামতের অন্তর্ভুক্ত।"'
পানির ব্যাপারেও কিয়ামতের দিন মানুষকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে
[১৬৫] আবূ সালামা (রদিয়াল্লাহু আনহু)-এর ছেলে উমার (রদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি তাঁর পিতাকে বলতে শুনেছেন, 'রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) একদল সাহাবি নিয়ে আবুল হাইসাম মালিক ইবনুত তীহান-এর বাড়িতে গিয়ে তাঁর স্ত্রীকে জিজ্ঞাসা করলেন, "أَيْنَ أَبُو الْهَيْثَمِ؟ আবুল হাইসাম কোথায়?" তাঁর স্ত্রী বললেন, 'তিনি আমাদের জন্য মিঠা পানি সংগ্রহ করতে গিয়েছেন।' ইত্যবসরে আবুল হাইসাম এসে হাজির হন এবং তাঁর স্ত্রীকে বলেন, 'আশ্চর্য! রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর জন্য (কোনো খাবার) প্রস্তুত করোনি?' তাঁর স্ত্রী বললেন, 'না।' তিনি বললেন, 'কিছু একটা তৈরি করো।' এ কথা শুনে তাঁর স্ত্রী যব পিষতে গেলেন, আর তিনি গেলেন তাঁর গবাদি পশুর পালের দিকে। একটি ভেড়া জবাই করতে উদ্যত হলে রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁকে বললেন, “لَا تَذْبَحَنَّ ذَاتَ دُرِّ দুধ দেয় এমন কোনো (ভেড়া) জবাই কোরো না।" তিনি রান্না করে সাহাবিদের সামনে খাবার পরিবেশন করলে তাঁরা খাবার গ্রহণ করেন। তারপর তিনি মশক বা বালতিতে করে পানীয় নিয়ে আসেন যা থেকে নবি (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ও তাঁর সাহাবিরা পান করেন। পরিশেষে রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, “لَتُسْأَلُنَّ عَنْ هَذِهِ الشَّرْبَةِ [কয়ামতের দিন] তোমাদেরকে এ পানীয়ের ব্যাপারে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।"'
যেকোনো মামুলি ব্যক্তির ডাকেও সাড়া দিতেন।
[১৬৬] আনাস ইবনু মালিক (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কৃতদাসের ডাকে সাড়া দিতেন, অসুস্থকে দেখতে যেতেন এবং গাধায় চড়তেন।' [তুলনীয়: হাদীস নং ৭৩; ৯২]
পরকালের কাজ দুনিয়ার উদ্দেশ্যে করা হলে পরকালে তা কোনো উপকারে আসবে না।
[১৬৭] উবাই ইবনু কাব (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, 'নবি (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,
بُشِّرَ هَذِهِ الْأُمَّةُ بِالسَّنَاءِ وَالنَّصْرِ وَالتَمْكِينِ فَمَنْ عَمِلَ مِنْهُمْ عَمَلَ الْآخِرَةِ لِلدُّنْيَا لَمْ يَكُنْ لَهُ فِي الْآخِرَةِ نَصِيبٌ
"এ উম্মতকে সমুন্নত মর্যাদা, [আল্লাহ'র পক্ষ থেকে] সাহায্য ও [পৃথিবীতে] সুপ্রতিষ্ঠিত হওয়ার সুসংবাদ দেওয়া হয়েছে। অতএব তাদের মধ্যে যে ব্যক্তি পরকালের কাজ দুনিয়ার উদ্দেশ্যে করবে, পরকালে তার জন্য কোনো অংশ থাকবে না।"'
আল্লাহই পরম উদ্দেশ্য
[১৬৮] উবাই ইবনু কাব (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'যে ব্যক্তি ঘুম থেকে উঠে আল্লাহ ছাড়া অন্য কোনো কিছুকে পরম উদ্দেশ্যে পরিণত করে, আল্লাহ'র সাথে তার কোনো সম্পর্ক নেই।'
বহুমুখী উদ্বেগের কুফল
[১৬৯] সুলাইমান ইবনু হাবীব (রহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,
مَنْ كَانَ هَمُّهُ هَمَّا وَاحِدًا كَفَاهُ اللهُ هَمَّهُ وَمَنْ كَانَ هَمُّهُ بِكُلِّ وَادٍ لَمْ يُبَالِ اللَّهُ عَزَّ وَجَلَّ بَأَيُّهَا هَلَكَ
"যার উদ্বেগ কেবল একটি (অর্থাৎ পরকাল), তার (পার্থিব) উদ্বেগের জন্য আল্লাহই যথেষ্ট; পক্ষান্তরে যার উদ্বেগ বহুমুখী, সে কোন্ গিরিখাতে
মরে পড়ে থাকে তাতে আল্লাহ তাআলা'র কিছুই যায় আসে না।" [তুলনীয়: হাদীস নং ১১৬]
দুনিয়াদার ব্যক্তির অনবরত দারিদ্র্য
[১৭০] হাসান (রহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, 'আল্লাহ'র নবি (সল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, إِنَّ الْعَبْدَ إِنْ كَانَ هَمُّهُ الْآخِرَةُ كَفَّ اللهُ عَلَيْهِ ضَيْعَتَهُ وَجَعَلَ غِنَاهُ فِي قَلْبِهِ وَإِنْ كَانَ هَمُّهُ الدُّنْيَا أَفْشَى اللهُ عَلَيْهِ ضَيْعَتَهُ وَجَعَلَ فَقْرَهُ بَيْنَ عَيْنَيْهِ فَلَا يُمْسِي إِلَّا فَقِيرًا وَلَا يُصْبِحُ إِلَّا فَقِيرًا
"বান্দার পরম উদ্দেশ্য যদি পরকাল হয়, তাহলে আল্লাহ ঐ বান্দার পার্থিব জীবনোপকরণ কমিয়ে দিয়ে তার অন্তরে প্রাচুর্যের অনুভূতি সৃষ্টি করে দিবেন; পক্ষান্তরে তার পরম উদ্দেশ্য যদি হয় দুনিয়া, তাহলে আল্লাহ তার জীবনোপকরণ বিভিন্ন জায়গায় বিক্ষিপ্তভাবে ছড়িয়ে দিয়ে তার কপালে দারিদ্র্যের ছাপ লাগিয়ে দিবেন, ফলে সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে তার মনে হবে সে একজন ফকির, আবার সন্ধ্যাসময়ও মনে হবে সে একজন অতি অভাবী ব্যক্তি।" ' [তুলনীয়: হাদীস নং ১৫০; ১৭১]
পরকালমুখিতার সুফল
[১৭১] আবদুর রহমান ইবনু আবান তাঁর পিতার সূত্রে বর্ণনা করেছেন, 'দুপুর বেলা যাইদ ইবনু সাবিত (রদিয়াল্লাহু আনহু) মারওয়ানের দরবার থেকে বের হলেন। তখন আমরা বলাবলি করতে লাগলাম, 'এ সময় তিনি সেখানে গিয়েছেন; নিঃসন্দেহে মারওয়ান তাঁর কাছে কিছু জানতে চেয়েছেন।' আমি গিয়ে তাঁকে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বললেন, 'হ্যাঁ! তিনি আমাদের নিকট কিছু বিষয় জানতে চেয়েছেন যা আমি রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর মুখ থেকে শুনেছি। আমি রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে বলতে শুনেছি, نَضَّرَ اللهُ إِمْرَأَ سَمِعَ مِنَّا حَدِيثًا فَحَفِظَهُ حَتَّى يُبَلِّغَهُ غَيْرَهُ فَإِنَّهُ رُبَّ حَامِلٍ فِقْهِ لَيْسَ بِفَقِيْهِ وَرُبَّ حَامِلٍ فِقْهِ إِلَى مَنْ هُوَ أَفْقَهُ مِنْهُ ثَلَاثُ خِصَالٍ لَا يَغُلُّ عَلَيْهِنَّ
قَلْبُ مُسْلِمٍ أَبَدًا إِخْلَاصُ الْعَمَلِ لِلَّهِ عَزَّ وَجَلَّ وَ مُناصحة وَلَاءَ الْأَمْرِ وَلْزُوْمُ الْجَمَاعَةِ فَإِنَّ دَعْوَتَهُمْ تُحِيطُ مَنْ وَرَائِهِمْ
"আল্লাহ ঐ ব্যক্তির মুখকে উজ্জ্বল করুন-যে আমার কথা শুনে সংরক্ষণ করে এবং অপরের নিকট তা পৌঁছে দেয়! কারণ অনেক ব্যক্তি গভীর জ্ঞানের কথা বহন করে চলে, কিন্তু নিজেরা ধীশক্তির অধিকারী নয়; আবার অনেক লোক ধীশক্তির অধিকারী বটে, তবে [প্রচারের মাধ্যমে] তারা সেই জ্ঞানকে এমন লোকের কাছে পৌঁছে দেয় যারা অধিকতর ধীশক্তির অধিকারী। তিনটি বিষয়ে কোনো মুসলিমের অন্তরে কখনো বিতৃষ্ণা জাগে না-(১) একনিষ্ঠভাবে আল্লাহ তাআলা'র সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে কাজ করা; (২) শাসকদেরকে উপদেশ দেওয়া ও (৩) সংঘবদ্ধ জীবনকে আঁকড়ে ধরা। শাসকদেরকে উপদেশ দিলে তাদের পেছনে যারা আছে তারাও উপদেশের আওতায় চলে আসে।” তিনি (আরো) বলেছেন,
مَنْ كَانَ هَمُّهُ الْآخِرَةُ جَمَعَ اللهُ لَهُ شَمْلَهُ وَجَعَلَ غِنَاهُ فِي قَلْبِهِ وَأَتَتْهُ الدُّنْيَا وَهِيَ رَاغِمَةٌ وَمَنْ كَانَ هَمُّهُ نِيَّتُهُ لِلْدُّنْيَا فَرَّقَ اللهُ عَلَيْهِ ضَيْعَتَهُ وَجَعَلَ فَقْرَهُ بَيْنَ عَيْنَيْهِ وَلَمْ يَأْتِهِ مِنَ الدُّنْيَا إِلَّا مَا كَتَبَ لَهُ
"যার পরম উদ্দেশ্য পরকাল, আল্লাহ তার পার্থিব বিষয়াদি গুছিয়ে দিয়ে তার অন্তরে প্রাচুর্যের অনুভূতি সৃষ্টি করে দিবেন, আর অনিচ্ছা সত্ত্বেও দুনিয়া তার নিকট চলে আসবে; পক্ষান্তরে যার ধ্যান-জ্ঞান কেবল দুনিয়াকে নিয়ে, আল্লাহ তাআলা তার জীবনোপকরণ বিভিন্ন জায়গায় বিক্ষিপ্তভাবে ছড়িয়ে রাখবেন এবং তার কপালে দারিদ্র্যের ছাপ লাগিয়ে দিবেন, আর দুনিয়াও সে শুধু ততোটুকুই পাবে-যতোটুকু আল্লাহ তার জন্য লিখে রেখেছেন।” মারওয়ান আমার নিকট (আরো) জানতে চেয়েছেন, মধ্যবর্তী সালাত কোনটি; মধ্যবর্তী সালাত হলো যুহরের সালাত।' [তুলনীয়: হাদীস নং ১৫০; ১৭০]
দুটি অনুগ্রহের ব্যাপারে অনেক মানুষ ধোঁকায় পড়ে আছে
[১৭২] ইবনু আব্বাস (রদিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,
نِعْمَتَانِ مَغْبُونُ فِيهِمَا كَثِيرٌ مِنَ النَّاسِ الْفَرَاغُ وَالصَّحَةُ "দুটি অনুগ্রহের ব্যাপারে অনেক মানুষ ধোঁকায় পড়ে আছে; (অনুগ্রহ দুটি হলো) অবসর ও সুস্থতা।" [তুলনীয়: হাদীস নং ২০৩]
সর্বোত্তম ব্যক্তি সে-ই, যার আয়ু দীর্ঘ ও আচরণ সুন্দর
[১৭৩] আবদুল্লাহ ইবনু বাশার (রদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, 'দুজন বেদুইন রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নিকট আসার পর তাদের একজন জিজ্ঞাসা করলো, 'হে আল্লাহ'র রাসূল, সর্বোত্তম ব্যক্তি কে?' নবি (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, مَنْ طَالَ عُمْرُهُ وَحَسُنَ عَمَلُهُ “যে দীর্ঘ জীবন লাভ করে ও সুন্দর আচরণ করে।" অপরজন বললো, 'হে আল্লাহ'র রাসূল, ইসলামের বিধি-বিধান তো আমার নিকট অধিক মনে হচ্ছে! আমাকে এমন একটি কাজের নির্দেশ দিন যা আমি সর্বদা আঁকড়ে ধরে থাকবো।' নবি (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন,
لَا يَزَالُ لِسَانُكَ رَطْبًا مِنْ ذِكْرِ اللَّهِ “তোমার জিহ্বা যেন আল্লাহ'র যিকিরে সবসময় সিক্ত থাকে।" [তুলনীয়: হাদীস নং ১১৪]
পরকালের সর্বোত্তম পাথেয় আল-কুরআন
[১৭৪] জুবাইর ইবনু নুদাইর (রদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,
إِنَّكُمْ لَنْ تَرْجِعُوْا إِلَى اللهِ عَزَّ وَجَلَّ بِشَيْءٍ أَفْضَلَ مِمَّا خَرَجَ مِنْهُ يَعْنِي الْقُرْآنُ "তোমরা আল্লাহ তাআলা'র নিকট কখনো ঐ বস্তুর চেয়ে উত্তম কিছু নিয়ে যেতে পারবে না যা তাঁর নিকট থেকে এসেছে; অর্থাৎ, কুরআন।"
ইবাদতের জন্য সময় বের করলে আল্লাহ তাআলা অভাব ঘুচিয়ে দেন
[১৭৫] আবূ হুরায়রা (রদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, 'রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,
قَالَ اللَّهُ عَزَّ وَجَلَّ ابْنَ آدَمَا تَفَرَّغْ لِعِبَادَتِي أَمْلَأُ صَدْرَكَ غَنِّى وَأَسْدَ فَقْرِكَ وَإِنْ لَا تَفْعَلْ مَلَأْتُ صَدْرَكَ شُغْلًا وَلَمْ أَسُدَّ فَقْرَكَ
"আল্লাহ বলেন, 'হে আদম সন্তান! আমার ইবাদতের জন্য অবকাশ বের করো, আমি তোমার অন্তরকে প্রাচুর্যে ভরপুর করে দিবো, অভাব ঘুচিয়ে দিবো; অন্যথায় তোমার অন্তরকে নানা ব্যস্ততায় ভরপুর করে রাখবো এবং তোমার দারিদ্র্যকে অবারিত করে দিবো।"'
পরকালে কী পাওয়া যাবে-তা জানলে লোকেরা মন থেকে চাইতো তার অভাব ও দারিদ্র্য যেন আরো বেড়ে যায়
[১৭৬] ফুদালা ইবনু উবাইদ (রদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, 'রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যখন লোকদের সালাতে ইমামতি করতেন, তখন কিছু লোক ক্ষুধার তাড়নায় সালাতে দণ্ডায়মান থাকা অবস্থায় নিচে পড়ে যেতেন। তাঁরা ছিলেন আসহাবুস সুফফা'র সাহাবি। এ দৃশ্য দেখে বেদুইনরা বলতো, 'এ লোকগুলোকে জিনে ধরেছে।' সালাত শেষে রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এদের দিকে ফিরে বললেন,
لَوْ تَعْلَمُوْنَ مَا لَكُمْ عِنْدَ اللهِ عَزَّ وَجَلَّ لَأَحْبَبْتُمْ لَوْ أَنَّكُمْ تَزْدَادُوْنَ حَاجَةً وَ فَاقَةً
"তোমরা যদি জানতে, আল্লাহ তাআলা'র নিকট তোমাদের জন্য কী (বরাদ্দ) রয়েছে, তাহলে তোমরা মন থেকে চাইতে—তোমাদের অভাব ও দারিদ্র্য যেন আরো বেড়ে যায়!” সে সময় আমি রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সাথে ছিলাম।'
হতদরিদ্র লোকেরা ধনীদের পাঁচশত বছর পূর্বে জান্নাতে প্রবেশ করবে
[১৭৭] আবূ সাঈদ খুদরি (রদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'আমি আনসারদের একটি পাঠচক্রে উপস্থিত ছিলাম। [পর্যাপ্ত বস্ত্রের অভাবে] আমাদের কারো কারো দেহের বিভিন্ন অংশ অনাবৃত হয়ে পড়ছিল; ফলে তাঁরা নানাভাবে সেসব অংশ ঢেকে রাখার চেষ্টা করছিলেন। আমাদের একজন পাঠক আমাদের উদ্দেশ্যে আল্লাহ তাআলা'র কিতাব পড়ে শোনাচ্ছিলেন, আর আমরা তা মনোযোগ দিয়ে শুনছিলাম। এমন সময় রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এসে আমাদের সাথে বসে গেলেন, যেন তিনি আমাদেরই একজন! এ দৃশ্য দেখে পাঠক থেমে গেলেন। নবি (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) জিজ্ঞাসা করলেন, “মَا كُنْتُمْ تَقُوْلُوْنَ؟ তোমরা কী বিষয়ে কথা বলছিলে?" আমরা জবাব দিলাম, 'হে আল্লাহ'র রাসূল, আমাদের মধ্যে একজন পাঠক আমাদেরকে আল্লাহ'র কিতাব পাঠ করে শোনাচ্ছিলেন।' এ কথা শুনে রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) হাতের ইশারায় তাঁদেরকে গোল হয়ে বসার নির্দেশ দিলেন। সবাই তা করলো। আমি দেখতে পেলাম, রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ঐ পাঠচক্রের মধ্যে আমাকে ছাড়া অন্য কাউকে চেনেন না। অতঃপর তিনি বললেন,
أَبْشِرُوا يَا مَعْشَرَ الصَّعَالِيْكِ تَدْخُلُوْنَ الْجَنَّةَ قَبْلَ الْأَغْنِيَاءِ بِنِصْفِ يَوْمٍ وَذُلِكَ خَمْسُمِأَةِ عَامٍ
"নিঃস্বদের দল! সুসংবাদ তোমাদের জন্য। ধনীদের অর্ধদিবস পূর্বে তোমরা জান্নাতে প্রবেশ করবে; আর সেই অর্ধদিবসটি হল পাঁচশত বছরের সমান।" ' [তুলনীয়: হাদীস নং ৩০; ১২৭; ১৩৩; ১৭৮]
প্রাচুর্যের তুলনায় দারিদ্র্যের সময় মুমিনের জন্য অধিক উত্তম
[১৭৮] কাতাদা (রহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'নিঃস্ব মুসলিমগণ আহলুস সুফফা'র লোকদের সাথে জড়ো হতেন। তাঁদের কোনো নতুন জামা থাকতো না; বরং পরিধেয় বস্ত্রসমূহ চামড়া দিয়ে তালি দিয়ে রাখতেন। একবার নবি (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁদের নিকট উপস্থিত হয়ে বললেন,
أَنْتُمُ الْيَوْمَ خَيْرٌ أَوْ يَوْمٌ يَغْدُوْ أَحَدُكُمْ فِي حُلَّةٍ وَيَرُوْحُ فِي أُخْرَى وَتَغْدُوْ عَلَيْهِ جَفْنَةٌ وَيُرَاحُ عَلَيْهِ بِأُخْرَى وَيَسْتُرُ بَيْتَهُ كَمَا تُسْتَرُ الْكَعْبَةُ؟
"বর্তমান সময়টি তোমাদের জন্য ভালো, নাকি ঐ সময়টি-যখন তোমাদের কেউ কেউ সকালে একটি 'হুল্লা' (জৌলুসপূর্ণ জামা) গায়ে দিবে আর বিকালে গায়ে দিবে আরেকটি, তার সামনে সকালে পরিবেশন করা হবে খাদ্যভর্তি বিশাল আকৃতির একটি ডিশ আর সন্ধ্যায় আনা হবে আরেকটি ডিশ এবং সে তার গৃহকে এমনভাবে আচ্ছাদিত করে রাখবে যেভাবে কাবা-কে আচ্ছাদিত করে রাখা হয়?"
তাঁরা বললেন, 'না, বরং ঐ সময়টিই আমাদের জন্য অধিক উত্তম!' নবি (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, "لَا بَلْ أَنْتُمُ الْيَوْمَ خَيْرٌ না, বরং বর্তমান সময়টিই তোমাদের জন্য অধিক উত্তম!" [তুলনীয়: হাদীস নং ৩০; ১২৭; ১৩৩; ১৭৭]
আল্লাহর স্মরণে কিছু সময় ব্যয় করলে বান্দার প্রয়োজন পূরণের জন্য আল্লাহই যথেষ্ট
[১৭৯] আবূ হুরায়রা (রদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, নবি (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, 'আল্লাহ তাআলা বলেন,
إِبْنَ آدَمَ أُذْكُرْنِي بَعْدَ الْفَجْرِ وَبَعْدَ الْعَصْرِ سَاعَةٌ أَكْفِيكَ مَا بَيْنَهُمَا
"আদম সন্তান! সকাল ও বিকালে একটু সময় আমাকে স্মরণ করো; এতদুভয়ের মাঝখানের সময়টুকুতে আমিই তোমার জন্য যথেষ্ট।"'
আল্লাহ তাআলা কোনো কিছু নিয়ে নিলে আরেকটি দিয়ে তা প্রতিস্থাপিত করে দেন
[১৮০] আনাস (রদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নিকট গাদবা নামে একটি উট ছিল; কোনো উট তার আগে যেতে পারতো না। একদিন এক বেদুইন একটি উটের পিঠে চড়ে সেটিকে পেছনে ফেলে দেয়। বিষয়টি ছিল মুসলিমদের জন্য বেদনাদায়ক। তাঁরা বললেন, 'হে আল্লাহ'র রাসূল, গাদবা তো পেছনে পড়ে গেলো!' তাঁদের বেদনাক্লিষ্ট চেহারা দেখে নবি (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন,
إِنَّ حَقًّا عَلَى اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ أَنْ لَا يَرْفَعَ شَيْئًا مِنَ الدُّنْيَا إِلَّا وَضَعَهُ
"আল্লাহ তাআলা যদি দুনিয়া থেকে কোনো কিছু উঠিয়ে নেন, তাহলে অন্য একটি দিয়ে তা প্রতিস্থাপিত করে দেওয়া তাঁর দায়িত্ব।"'
বুদ্ধিমান তো সেই যে তার প্রবৃত্তিকে দমিয়ে রাখে
[১৮১] শিদাদ ইবনু আউস (রদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,
أَلْكَيْسُ مَنْ دَانَ نَفْسَهُ وَعَمِلَ لِمَا بَعْدَ الْمَوْتِ وَالْعَاجِزُ مَن اتَّبَعَ نَفْسُهُ هَوَاهَا وَتَمَتَّى عَلَى اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ "বুদ্ধিমান তো সেই-যে তার প্রবৃত্তিকে অবদমিত করে রাখে এবং মৃত্যু- পরবর্তী জীবনের জন্য কাজ করে, আর প্রকৃত অসহায় তো সেই-যে তার প্রবৃত্তিকে অনুসরণ করে আবার আল্লাহ তাআলা'র নিকট ভালো ভালো জিনিস প্রত্যাশা করে।"
প্রাচুর্য মানুষকে জাহান্নামের দিকে ডাকে
[১৮২] সাঈদ ইবনু আইমান (রদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁর সাহাবিদের সাথে কথা বলছিলেন। এমন সময় এক দরিদ্র ব্যক্তি এসে এক ধনী ব্যক্তির পাশে বসলো; (ধনী ব্যক্তিটি এমন আচরণ করলো) যেন তার গায়ের জামা কেউ টেনে ধরেছে। এ দৃশ্য দেখে রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর চেহারার রঙ বদলে গেলো। তিনি ধনী লোকটিকে উদ্দেশ্য করে বললেন, أَخَشِيْتَ يَا فُلَانُ أَنْ يَعْدُوَ غِنَاكَ عَلَيْهِ وَأَنْ يَعْدُوَ فَقْرُهُ عَلَيْكَ؟ "অমুক! তোমার কি ভয় হচ্ছে, তোমার প্রাচুর্য ঐ লোকটির মধ্যে সংক্রমিত হবে আর তার দারিদ্র্য তোমার মধ্যে চলে আসবে?" সে বললো, 'হে আল্লাহ'র রাসূল, প্রাচুর্যের মধ্যে এমন কী অনিষ্ট আছে (যা সংক্রমিত হতে পারে)?' নবি (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, نَعَمْ إِنَّ غِنَاكَ يَدْعُوكَ إِلَى النَّارِ وَإِنَّ فَقْرَهُ يَدْعُوهُ إِلَى الْجَنَّةِ "হ্যাঁ! তোমার প্রাচুর্য তোমাকে জাহান্নামের দিকে ডাকছে, আর তার দারিদ্র্য তাকে ডাকছে জান্নাতের দিকে।" ধনী ব্যক্তিটি জিজ্ঞাসা করলো, 'কী কাজ করলে আমি (জাহান্নাম থেকে) মুক্তি পেতে পারি?' নবি (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, "تُوَاسِيه তাকে সহায়-সম্পদ দিয়ে সহযোগিতা করো।” সে বললো, 'তাহলে আমি তা-ই করবো।' দরিদ্র লোকটি বললো, 'পার্থিব বিষয়াদির প্রতি আমার কোনো আগ্রহ নেই।' নবি (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, “فَاسْتَغْفِرْ وَادْعُ لِأَخِيْكَ তাহলে তোমার ভাইয়ের জন্য (আল্লাহ'র নিকট)
ক্ষমা প্রার্থনা ও দুআ করো।"
দুনিয়া ও নারীর পরীক্ষা
[১৮৩] আবু সাঈদ খুদরি (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, ‘রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) দুনিয়ার কথা আলোচনা করতে গিয়ে বলেছেন,
إِنَّ الدُّنْيَا خَضِرَةٌ حُلْوَةٌ فَاتَّقُوْهَا وَاتَّقُوا النِّسَاءَ
“দুনিয়া [র রূপ] হলো মনোহর সবুজ উদ্যানের ন্যায় [যা মানুষকে সহজে আকৃষ্ট করে]। অতএব দুনিয়া ও নারী[র পরীক্ষা]-কে ভয় করো।” [তুলনীয়: হাদীস নং ৬২; ২৩৩]
জৌলুসপূর্ণ পোশাক পরিহারের সুফল
[১৮৪] সাহল ইবনু মুআয ইবনি আনাস তাঁর পিতার সূত্রে বর্ণনা করেছেন, ‘রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,
مَنْ تَرَكَ اللَّبَاسَ وَهُوَ يَقْدِرُ عَلَيْهِ تَوَاضُعًا لِلَّهِ عَزَّ وَجَلَّ دَعَاهُ اللهُ عَزَّ وَجَلَّ يَوْمَ الْقِيَامَةِ عَلَى رُؤُوسِ الْخَلَائِقِ حَتَّى يُخَيَّرَهُ مِنْ حُلَلِ الْإِيْمَانِ يَلْبَسُ أَيَّهَا شَاءَ
“সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও যে ব্যক্তি আল্লাহ তাআলা’র প্রতি বিনয়ের দরুন [জৌলুসপূর্ণ] পোশাক পরিহার করে, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলা তাকে ডেকে সকল সৃষ্টির শীর্ষে তুলে ধরে সুযোগ দিবেন—সে যেন ঈমানের জৌলুসপূর্ণ পোশাকসমূহের মধ্যে যেটি ইচ্ছা পরিধান করে।”
তিনদিন অভুক্ত ছিলেন
[১৮৫] আনাস ইবনু মালিক (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘ফাতিমা (আলাইহাস সালাম) রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে এক ছিলকা যবের রুটি খাওয়ালেন। নবি (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন,
هَذَا أَوَّلُ طَعَامٍ أَكَلَهُ أَبُوكَ مُنْذُ ثَلَاثَةِ أَيَّامٍ
“এটি প্রথম খাবার যা তোমার পিতা গত তিনদিনের মধ্যে খেলেন।”
প্রিয় বান্দার বৈশিষ্ট্য
[১৮৬] আয়িশা (রদিয়াল্লাহু আনহা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলতেন,
اللَّهُمَّ اجْعَلْنِي مِنَ الَّذِينَ إِذَا أَحْسَنُوا إِسْتَبْشَرُوْا وَإِذَا أَسَاؤُوا إِسْتَغْفَرُوا
"হে আল্লাহ! তুমি আমাকে সেসব লোকের অন্তর্ভুক্ত করো-যারা ভালো কাজ করলে খুশি হয়, আর খারাপ কাজ করলে ক্ষমা প্রার্থনা করে।"'
প্রতিদিন একশত বার তাওবা
[১৮৭] ইবনু উমার (রদিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণিত, তিনি রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে বলতে শুনেছেন,
يَا أَيُّهَا النَّاسُ تُوْبُوا إِلَى رَبِّكُمْ فَإِنِّي أَتُوْبُ إِلَيْهِ فِي الْيَوْمِ مِأَةَ مَرَّةٍ
"ওহে মানুষ! তোমাদের রবের নিকট তাওবা করো / ফিরে এসো; আমিও প্রতিদিন তাঁর নিকট একশত বার তাওবা করি।” [তুলনীয়: হাদীস নং ৩৩]
মানুষের উদ্দেশ্যে করা কোনো কাজের প্রতিদান পরকালে নেই
[১৮৮] সালামা ইবনু কুহাইল (রহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'আমি জুনদুব (রদিয়াল্লাহু আনহু)-কে বলতে শুনেছি, রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,
مَنْ يُسَمِّعُ سَمَّعَ اللَّهُ بِهِ وَمَنْ يُرَائِيْ يُرَائِيُّ اللَّهُ بِهِ
"যে ব্যক্তি মানুষকে শোনানোর উদ্দেশ্যে কোনো কাজ করে, আল্লাহ তা শোনানোর ব্যবস্থা করে দিবেন; আর যে মানুষকে দেখানোর উদ্দেশ্যে কাজ করে, আল্লাহ তা দেখানোর ব্যবস্থা করে দিবেন।"²
কিছু কিছু রাত্রিজাগরণ শুধু শুধু ঘুম নষ্ট করার শামিল
[১৮৯] আবূ হুরায়রা (রদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,
[২] অর্থাৎ, যে উদ্দেশ্যে কাজ করা হয়েছে-তা যেহেতু দুনিয়াতেই হাসিল হয়ে যাবে, তাই পরকালে ঐ কাজের আর কোনো প্রতিদান পাওয়া যাবে না। [অনুবাদক]
'রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, كَمْ مِّنْ صَائِمٍ لَيْسَ لَهُ مِنْ صِيَامِهِ إِلَّا الْجُوْعُ وَكَمْ مِّنْ قَائِمٍ لَيْسَ لَهُ مِنْ قِيَامِهِ إِلَّا السَّهَرُ
"অনেকে সিয়াম পালন করে, অথচ তাদের সিয়াম নিছক অভুক্ত থাকার নামান্তর; আবার অনেকে রাত জেগে ইবাদত করে, অথচ তাদের রাত্রি- জাগরণ শুধু শুধু ঘুম নষ্ট করার শামিল।” [তুলনীয়: হাদীস নং ১৮৮; ১৯১]
মিথ্যার কুফল
[১৯০] আবূ হুরায়রা (রদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, مَنْ لَّمْ يَدَعِ الزُّوْرَ وَالْعَمَلَ بِهِ وَالْجَهْلَ فَلَيْسَ لِلَّهِ حَاجَةٌ بِأَنْ يَّدَعَ طَعَامَهُ وَشَرَابَهُ
"যে ব্যক্তি মিথ্যা কথা, মিথ্যার ভিত্তিতে কাজকর্ম ও অজ্ঞতা পরিহার করে না, সে তার খাদ্য-পানীয় পরিহার করুক—তাতে আল্লাহ'র কোনো প্রয়োজন নেই।"
কোনো কাজে আল্লাহর সাথে অন্য কাউকে শরীক করা হলে আল্লাহ তা গ্রহণ করেন না।
[১৯১] আবূ হুরায়রা (রদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, 'রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, আল্লাহ তাআলা বলেছেন, أَنَا خَيْرُ الشُّرَكَاءِ فَمَنْ عَمِلَ عَمَلًا فَأَشْرَكَ فِيْهِ غَيْرِي فَإِنِّي بَرِيءٌ مِّنْهُ وَهُوَ لِلَّذِي أَشْرَكَ
"আনুগত্য লাভের সর্বোত্তম সত্তা আমি; যে ব্যক্তি কোনো কাজে আমার সাথে অন্য কাউকে শরীক করে—আমি তা থেকে মুক্ত। তা ঐ ব্যক্তির জন্যই বরাদ্দ—যাকে সে শরীক সাব্যস্ত করেছে।” [তুলনীয়: হাদীস নং ১৮৮; ১৮৯]
যারা মানুষকে ভালো কাজের আদেশ দেয় কিন্তু নিজেদেরকে ভুলে যায়-তাদের ঠোঁট আগুনের কাঁচি দিয়ে কাটা হবে
[১৯২] আনাস ইবনু মালিক (রদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,
مَرَرْتُ لَيْلَةً أُسْرِيَ بِي عَلَى قَوْمٍ تُقْرَضُ شِفَاهُهُمْ بِمَقَارِيْضَ مِنْ نَّارٍ
"মিরাজের রাতে আমি একদল লোকের পাশ দিয়ে গিয়েছিলাম-যাদের ঠোঁট আগুনের কাঁচি দিয়ে কাটা হচ্ছে।” আমি জিজ্ঞাসা করলাম, 'এরা কারা?' নবি (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন,
هُؤُلَاءِ خُطَبَاءُ مِنْ أَهْلِ الدُّنْيَا الَّذِينَ كَانُوا يَأْمُرُوْنَ النَّاسَ بِالْبِرِّ وَيَنْسَوْنَ أَنْفُسَهُمْ وَهُمْ يَتْلُوْنَ الْكِتَابَ أَفَلَا يَعْقِلُوْنَ
"এরা হলো দুনিয়ার সেসব বক্তা যারা মানুষকে ভালো কাজের আদেশ দেয়, কিন্তু নিজেদেরকে ভুলে যায়, অথচ তারা কুরআন পাঠ করে; তারা কি বিবেক খাটায় না?"' [তুলনীয়: সূরা আল-বাকারা ২:৪৪]
আল্লাহ-ভীতিই সকল বিপদ থেকে উত্তরণের উপায়
[১৯৩] আবূ যার গিফারি (রদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এ আয়াতটি পাঠ করতে শুরু করলেন,
“وَمَنْ يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَلْ لَهُ مَخْرَجًا যে আল্লাহকে ভয় করে চলে, আল্লাহ তাকে (বিভিন্ন সমস্যা থেকে) উত্তরণের কৌশল দেখিয়ে দেন।"-(সূরা আত-তালাক ৬৫:২)'
তারপর বললেন, “يَا أَبَا ذَرِّ لَوْ أَنَّ النَّاسَ كُلَّهُمْ أَخَذُوا بِهَا لَكَفَتْهُمْ আবূ যার! সকল মানুষ যদি এ আয়াতটিকে মনের ভেতর স্থান দিতো, তাহলে এটিই তাদের জন্য যথেষ্ট হতো।"'
তিনি এ আয়াতটি আমার সামনে এতো বেশি পুনরাবৃত্তি করতে থাকলেন যে একপর্যায়ে আমি তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে গিয়েছিলাম।'
কিয়ামত দিবসের চিত্র
[১৯৪] ইবনু উমার (রদিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,
مَنْ أَحَبَّ أَنْ يَنْظُرَ إِلَى يَوْمِ الْقِيَامَةِ فَلْيَقْرَأُ إِذَا الشَّمْسُ كُوِّرَتْ وَإِذَا السَّمَاءُ انْفَطَرَتْ وَإِذَا السَّمَاءُ انْشَقَّتْ
"যে ব্যক্তি কিয়ামত দিবসের চিত্র দেখতে চায়, সে যেন আত-তাকভীর, আল-ইনফিতার ও আল-ইনশিকাক-এসব সূরা পাঠ করে।"'
বিপুল পরিমাণ সম্পদ পেয়ে আল্লাহর রাস্তায় দান করার চেয়ে অল্প সম্পদে জীবনযাপন করা অধিক উত্তম
[১৯৫] ইবনু আব্বাস (রদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'নবি (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এক ব্যক্তির দিকে তাকিয়ে বললেন,
وَالَّذِي نَفْسُ مُحَمَّدٍ بِيَدِهِ مَا يَسُرُّنِي أَنَّ أُحُدًا يُحَوَّلُ لِآلِ مُحَمَّدٍ ذَهَبًا أُنْفِقُهُ فِي سَبِيْلِ اللَّهِ أَمُوْتُ يَوْمَ أَمُوْتُ أَدَعُ مِنْهُ دِينَارَيْنِ إِلَّا دِيْنَارَيْنِ أُعِدُّهُمَا لِدَيْنِ إِنْ كان
"সেই সত্তার শপথ, যার হাতে মুহাম্মদের প্রাণ! মুহাম্মদের পরিবারবর্গের জন্য উহুদ পাহাড়টিকে সোনায় পরিণত করা হোক, আর আমি সেই সোনা আল্লাহ'র রাস্তায় ব্যয় করতে থাকি এবং মৃত্যুর দিন সেই সোনার পাহাড় থেকে দুটি স্বর্ণমুদ্রা রেখে যাই—এগুলোতে আমি কোনো পুলক বোধ করি না। তবে ঋণ—যদি আদৌ থাকে—পরিশোধের উদ্দেশ্যে দুটি স্বর্ণমুদ্রা রেখে মারা যাওয়ার বিষয়টি ব্যতিক্রম।” [ইবনু আব্বাস (রদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন] তিনি মৃত্যুর সময় স্বর্ণমুদ্রা বা রৌপ্যমুদ্রা কিংবা দাস অথবা দাসী— কোনো কিছুই রেখে যাননি; কেবল তাঁর বর্মটি রেখে গিয়েছিলেন—যা এক ইয়াহূদির নিকট বন্ধক রেখে তিনি ত্রিশ সা' যব কিনেছিলেন।' [তুলনীয়: হাদীস নং ৫; ৯; ১০]
আল্লাহর ব্যাপারে সেভাবে লজ্জাবোধ করা উচিত যেভাবে সৎ ব্যক্তির সামনে লজ্জাবোধ করা হয়
[১৯৬] সাঈদ ইবনু ইয়াযীদ (রদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'একব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে বললেন, 'আমাকে কিছু উপদেশ দিন।' নবি (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, أُوْصِيْكَ أَنْ تَسْتَحِيَّ اللَّهَ عَزَّ وَجَلَّ كَمَا تَسْتَحْيِي رَجُلًا صَالِحًا مِنْ قَوْمِكَ "তোমার প্রতি আমার উপদেশ হলো, তুমি আল্লাহ তাআলা'র ব্যাপারে সেভাবে লজ্জাবোধ করবে যেভাবে তুমি তোমার জাতির কোনো সৎ ব্যক্তির সামনে লজ্জাবোধ করো।"'
মিথ্যুক হওয়ার জন্য যা যথেষ্ট
[১৯৭] হাম্স ইবনু আসিম (রদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, كَفَى بِالْمَرْءِ كَذِبًا أَنْ يُحَدِّثَ بِكُلِّ مَا سَمِعَ "একজন ব্যক্তির মিথ্যুক হওয়ার জন্য এটুকুই যথেষ্ট যে সে যা কিছু শোনে-তা সবই বলে বেড়ায়।"'
জান্নাতে যাওয়ার অন্যতম উপায়-রাগ না করা
[১৯৮] আবূ সালিহ (রহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'এক সাহাবি নবি (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে বললেন, 'আমাকে এমন একটি আমলের কথা বলুন যা আমাকে জান্নাতে নিয়ে যাবে; অল্প আমলের কথা বলুন, যাতে আমি তা মস্তিষ্কে ধারণ করে রাখতে পারি।' নবি (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, "لَا تَغْضَبُ রাগ কোরো না।"
তাড়াহুড়ো না করা পর্যন্ত বান্দা কল্যাণ লাভ করতে থাকে
[১৯৯] আনাস ইবনু মালিক (রদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, لَا يَزَالُ الْعَبْدُ بِخَيْرِ مَا لَمْ يَسْتَعْجِلْ
"বান্দা কল্যাণ লাভ করতে থাকবে, যতোক্ষণ না সে তাড়াহুড়ো করবে।" তারা জিজ্ঞাসা করলেন, 'কোন্ কাজটি তাড়াহুড়োর অন্তর্ভুক্ত?' নbi (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন,
يَقُوْلُ قَدْ دَعَوْتُ رَبِّي عَزَّ وَجَلَّ فَلَمْ يَسْتَجِبْ لِي
"(যখন) সে বলবে, 'আমি তো আল্লাহ তাআলা-কে অনেক ডাকলাম; কই, তিনি তো আমার ডাকে সাড়া দিলেন না!"'
বিশৃঙ্খলা ও গোলযোগের সময় আল্লাহর বিধান মেনে চলার গুরুত্ব
[২০০] মা'কাল ইবনু ইয়াসার (রদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,
الْعِبَادَةُ فِي الْهَرْجِ كَهِجْرَةٍ إِلَيَّ "বিশৃঙ্খলা ও গোলযোগের সময় আল্লাহ্‌'র বিধান মেনে চলা আমার নিকট হিজরত করে চলে আসার ন্যায়।"'
আল্লাহ তাআলা চেহারা-সুরত ও ধন-সম্পদের দিকে তাকান না
[২০১] আবূ হুরায়রা (রদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, 'রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,
إِنَّ اللهَ عَزَّ وَجَلَّ لَا يَنْظُرُ إِلى صُوَرِكُمْ وَأَمْوَالِكُمْ وَلَكِنْ إِنَّمَا يَنْظُرُ إِلَى أَعْمَالِكُمْ وَقُلُوْبِكُمْ
"আল্লাহ তাআলা তোমাদের চেহারা-সুরত ও ধন-সম্পদের দিকে তাকান না, তিনি তাকান তোমাদের কর্মকাণ্ড ও অন্তঃকরণের দিকে।"'
যে ব্যক্তি লোকবলের ভিত্তিতে নিজেকে শক্তিশালী মনে করে, আল্লাহ তাকে অপদস্থ করেন
[২০২] উমার ইবনুল খাত্তাব (রদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'আমি রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে বলতে শুনেছি,
مَنِ اعْتَزَّ بِالْعَبْدِ أَذَلَّهُ اللَّهُ "যে ব্যক্তি মানুষের শক্তির ভিত্তিতে নিজেকে শক্তিশালী মনে করে, আল্লাহ তাকে অপদস্থ করবেন।"'
নিয়মতের বিসয়ে। আসাবাদ।
[২০৩] আবদুল্লাহ ইব্‌ন মাসউদ (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থাকবার يومئذ عن النعيم (التسألن ‘সেদিন অনুগ্রহের ব্যাপারে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।’ (সূরা আত্ তাকাছুর ১০২:৮)-এর ব্যাখ্যায় রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, "الأمن والصحة ( অনুগ্রহসমূহ হল) নিরাপত্তা ও সুস্থতা।” [তুলনায়ঃ তাফসীর ইবনু ১৭২]
আল্লাহ সম্পদ পুঞ্জীভূত করা ও ব্যবসায়ী হওয়ার নির্দেশ দেননি
[২০৪] আবূ মুসলিম খাওলানি (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,
مَا أَوْصَى اللَّهُ إِلَيَّ أَنْ أَجْمَعَ الْمَالَ وَأَكُونَ مِنَ التَّاجِرِينَ وَلَكِنْ أَوْصَى إِلَيَّ أَنْ سَبِّحْ بِحَمْدِ رَبِّكَ وَكُنْ مِّنَ السَّاجِدِينَ
“আল্লাহ আমাকে সম্পদ পুঞ্জীভূত করা ও ব্যবসায়ীদের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার জন্য নির্দেশ দেননি; তিনি বরং আমাকে নির্দেশ দিয়েছেন, ‘তোমার রবের প্রশংসাসহ পবিত্রতা বর্ণনা করো এবং সাজদাকারীদের অন্তর্ভুক্ত হও।"’ [তুলনীয়: সূরা আল-হিজর ১৫:৯৮]
সামর্থ্যের বাইরের বিধানসমূহের জন্য অনুশোচনা করা উচিত
[২০৫] আবদুল্লাহ ইবনু উবাইদ ইবনি উমাইর (রহিমাহুল্লাহ) তাঁর পিতার সূত্রে বর্ণনা করেছেন, ‘রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,
تَجِدُ الْمُؤْمِنَ يَجْتَهِدُ فِيمَا يُطِيقُ مُتَلَهَّفًا عَلَى مَا لَا يُطِيقُ
“তুমি দেখতে পাবে, মুমিন (আল্লাহ'র নির্দেশসমূহের মধ্যে) যা মেনে চলার সামর্থ্য রাখে তা মেনে চলার চেষ্টা করে, আর যা তার সামর্থ্যের বাইরে তার জন্য অনুশোচনা করে।"’
কোমল আচরণের সুফল
[২০৬] ইবনু সালিহ হানাফি (রহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,
'রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, إِنَّ اللَّهَ عَزَّ وَجَلَّ رَحِيمٌ لَا يَضَعُ رَحْمَتَهُ إِلَّا عَلَى رَحِيمٍ وَلَا يُدْخِلُ الْجَنَّةَ إِلَّا رَحِيمًا "আল্লাহ তাআলা কোমল; তিনি কেবল কোমল ব্যক্তির উপর তাঁর কোমলতার পরশ বুলান, আর স্রেফ কোমল ব্যক্তিকেই তিনি জান্নাতে প্রবেশ করাবেন।" সাহাবিরা বললেন, 'হে আল্লাহ'র রাসূল, আমাদের সহায়-সম্পদ ও পরিজনদের সাথে তো আমরা কোমল আচরণ করে থাকি!' নবি (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, لَيْسَ بِذلِكَ وَلَكِنْ مَا قَالَ اللهُ عَزَّ وَجَلَّ حَرِيصٌ عَلَيْكُمْ بِالْمُؤْمِنِينَ رَؤُوفٌ رَّحِيمٌ) "ঐ কোমলতা নয়; বরং (মুমিনদের প্রতি কোমলতা উদ্দেশ্য যার ব্যাপারে) আল্লাহ তাআলা বলেছেন, '(এমন এক রাসূল-যিনি) তোমাদের ব্যাপারে উদ্‌গ্রীব ও মুমিনদের প্রতি সহমর্মী-দয়ালু।' (সূরা আত-তাওবা ৯:১২৮)"'
নিকৃষ্ট লোকের বৈশিষ্ট্য
[২০৭] বাকর ইবনু সাওয়াদা (রহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, 'রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, سَيَكُونُ نَشْرٌ مِّنْ أُمَّتِي يُوْلَدُونَ فِي النَّعِيمِ وَيُغْذَوْنَ بِهِ هِمَّتُهُمْ أَلْوَانُ الطَّعَامِ وَأَلْوَانُ الثَّيَابِ يَتَشَدَّقُوْنَ بِالْقَوْلِ أُولَئِكَ شِرَارُ أُمَّتِي "অচিরে আমার উম্মতের মধ্যে একটি শ্রেণির বিকাশ ঘটবে যারা প্রাচুর্যের মধ্যে জন্ম নিবে ও তাতেই পরিপুষ্টি লাভ করবে; তাদের সকল কর্মপ্রচেষ্টার লক্ষ্য হবে রকমারি খাবার ও রঙ-বেরঙের পোশাক লাভ করা, আর ওরা কথা বলবে দম্ভভরে-ওরা হলো আমার উম্মতের নিকৃষ্ট অংশ।" [তুলনীয়: হাদীস নং ২৪৩]
প্রকৃত ত্যাগী সে, যে খারাপ কাজ ত্যাগ করে
[২০৮] হাসান (রহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,
الْمُؤْمِنُ مَنْ أَمِنَهُ النَّاسُ أَلَا إِنَّ الْمُهَاجِرَ مَنْ هَجَرَ السُّوْءَ أَلَا إِنَّ الْمُسْلِمَ مَنْ سَلِمَ مِنْهُ جَارُهُ وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ لَا يَدْخُلُ الْجَنَّةَ رَجُلٌ لَا يَأْمَنْ جَارُهُ بَوَائِقَهُ "মুমিন তো সে যার [অনিষ্ট] থেকে মানুষ নিরাপদ থাকে; মনে রাখবে, প্রকৃত ত্যাগী (মুহাজির) সে যে খারাপ কাজ ত্যাগ করে; সত্যিকারের মুসলিম সে যার [অনিষ্ট] থেকে তার প্রতিবেশী নিরাপদ থাকে। সেই সত্তার শপথ-যার হাতে আমার প্রাণ, সে ব্যক্তি জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না-যার অনাচার থেকে তার প্রতিবেশী নিরাপদ থাকে না।"'
মন্দ কথার পরিণতিতে মানুষকে জাহান্নামের ভেতর সত্তর বছরের দূরত্বে নিক্ষেপ করা হবে
[২০৯] আবূ হুরায়রা (রদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, 'নবি (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,
إِنَّ الرَّجُلَ لَيَتَكَلَّمُ بِالْكَلِمَةِ وَمَا يَدْرِى أَنَّهَا تَبْلُغُ حَيْثُ مَا بَلَغَتْ يُهْوَى بِهَا فِي النَّارِ سَبْعِينَ خَرِيفًا "মানুষ এমন কথা বলে যার ব্যাপারে সে আন্দাজ করতে পারে না-তা কোথায় কোথায় পৌঁছে যাচ্ছে। এ কথার পরিণতিতে তাকে জাহান্নামের ভেতর সত্তর বছরের দূরত্বে নিক্ষেপ করা হবে।"' [তুলনীয়: হাদীস নং ৭৯; ৮০]
ঘরোয়া কাজ
[২১০] আয়িশা (রদিয়াল্লাহু আনহা) বলেন, 'রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ঘরের কাজ করতেন; আর ঘরের কাজসমূহের মধ্যে তিনি সবচেয়ে বেশি করতেন সেলাইয়ের কাজ।' [তুলনীয়: হাদীস নং ৭; ৮]
উন্মুক্ত দ্বার
[২১১] হাসান (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'আল্লাহ'র শপথ! রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর দরজা [সাধারণ লোকদের জন্য] রুদ্ধ ছিল না; কোনো পর্দা তাঁর সম্মুখে অন্তরাল সৃষ্টি করতো না; আর তাঁর সামনে সকাল- সন্ধ্যায় খাবারের বিশাল বিশাল ডিশও পরিবেশন করা হতো না; বরং তিনি
ছিলেন খোলামেলা মানুষ। যে কেউ চাইলে আল্লাহ'র নবির সাথে সাক্ষাৎ করতে পারতো। তিনি মাটিতে বসতেন, মাটির উপরেই তাঁর খাবার পরিবেশন করা হতো, তিনি মোটা কাপড় গায়ে দিতেন, গাধায় চড়তেন, ভৃত্যের পাশে থাকতেন, আর [খাবার শেষে] হাত চেটে খেতেন।'
ভালো কাজ দ্রুত সম্পন্ন করা উচিত
[২১২] হাকীম ইবনু উমাইর (রদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,
مَنْ فُتِحَ لَهُ بَابُ الْخَيْرِ فَلْيَنْتَهِزْهُ فَإِنَّهُ لَا يَدْرِي مَتَى يُغْلَقُ
"কারো জন্য কল্যাণের দ্বার উন্মুক্ত করা হলে, তার উচিত উক্ত কল্যাণ লাভের জন্য পূর্ণ মনোযোগী হওয়া; কারণ সে জানে না, কখন [সে দ্বার] রুদ্ধ করে দেওয়া হবে।"
দুনিয়া ও জীবনের ছলনা থেকে আল্লাহর নিকট আশ্রয় কামনা
[২১৩] হাওশাব (রদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, 'নবি (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এভাবে দুআ করতেন,
أَللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوْذُ بِكَ مِنْ دُنْيَا تَمْنَعُ خَيْرَ الْعَمَلِ وَأَعُوْذُ بِكَ مِنْ حَيَاةٍ تَمْنَعُ خَيْرَ الْمَمَاتِ
"হে আল্লাহ! আমি তোমার নিকট এমন দুনিয়া[র ছলনা] থেকে আশ্রয় চাই-যা উত্তম কাজে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে; আর এমন জীবন থেকেও তোমার নিকট আশ্রয় চাই-যা উত্তম মৃত্যুর সামনে বাধা হয়ে দাঁড়ায়।"'
আল্লাহ তাআলার বাণী নিয়ে আলোচনার বৈঠকে উপবিষ্ট পাপিষ্ঠ ব্যক্তিও করুণা লাভ করে
[২১৪] হাসান (রহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, 'রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,
إِذَا جَلَسَ الْقَوْمُ يَذْكُرُوْنَ اللَّهَ عَزَّ وَجَلَّ قَالَ اللَّهُ لِمَلَائِكَتِهِ إِنِّي قَدْ غَفَرْتُ لَهُمْ فَجَلِّلُوهُمْ بِالرَّحْمَةِ قَالَتِ الْمَلَائِكَةُ يَا رَبَّنَا إِنَّ فِيْهِمْ فُلَانًا قَالَ هُمُ الْقَوْمُ
لَا يُشْقَى جَلِيْسُهُمْ "একদল মানুষ যখন আল্লাহ তাআলা'র [বাণী নিয়ে] আলোচনা করার উদ্দেশ্যে [কোথাও] বসে, আল্লাহ তাঁর ফেরেশতাদেরকে বলেন, 'আমি তাদেরকে ক্ষমা করে দিয়েছি; তাদেরকে করুণার চাদরে আচ্ছাদিত করে দাও।' ফেরেশতারা বলে, 'হে আমাদের রব! তাদের মধ্যে তো অমুক ব্যক্তিও রয়েছে [-যে ঐ মানের নয়]।' আল্লাহ বলেন, 'এরা এমন দল যাদের মধ্যে একজন উপবিষ্টকেও হতভাগা করা হবে না।"'
তাঁর গৃহে ক্ষুধার্ত হাসান ও হুসাইনকে দেওয়ার মতো খাবার ছিল না
[২১৫] হাজ্জাজ ইবনুল আসওয়াদ (রদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, 'হাসান ও হুসাইন (রদিয়াল্লাহু আনহুমা) অভুক্ত থাকায় [খাবারের সন্ধানে] রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নয়টি ঘরে লোক পাঠানো হয়; কিন্তু তারা সেখানে তরল কিংবা শুকনো-কোনো খাবারই খুঁজে পাননি।'
মসৃণ আটার রুটি খাননি
[২১৬] আয়িশা (রদিয়াল্লাহু আনহা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'সেই সত্তার শপথ-যিনি মুহাম্মদ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে সত্য দিয়ে পাঠিয়েছেন! তিনি [কখনো] ঝাঁঝর বা চালনি দেখেননি, এবং রিসালাতের শুরু থেকে ইন্তেকাল অবধি কখনো চালনি দিয়ে চালা আটার রুটি খাননি।' [উরওয়া (রদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন] আমি জিজ্ঞাসা করলাম, 'তাহলে আপনারা আটা কীভাবে খেতেন?' তিনি বললেন, 'ফুঁ ফুঁ বলে।' (অর্থাৎ মুখের ফুঁ দিয়ে যেটুকু চালা যায় তার মাধ্যমেই।)
তিনটি বস্তু ছাড়া অন্য সবকিছুর জন্য কিয়ামতের দিন প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হবে
[২১৭] হাসান (রহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, ثَلَاثُ لَيْسَ عَلَى ابْنِ آدَمَ فِيْهَا حِسَابٌ ثَوْبٌ يُوَارِي بِهِ عَوْرَتَهُ وَطَعَامُ يُقِيمُ صُلْبَهُ وَبَيْتُ يُسْكِنُهُ فَمَا كَانَ فَوْقَ ذَلِكَ فَعَلَيْهِ فِيْهِ حِسَابٌ "তিনটি বস্তুর জন্য আদম-সন্তানকে হিসেব দিতে হবে না-লজ্জাস্থান
ঢাকার একখণ্ড বস্ত্র, মেরুদণ্ড সোজা রাখার জন্য একটু খাবার ও বসবাসের জন্য একটি ঘর। এর চেয়ে বাড়তি সবকিছুর জন্য হিসেব দিতে হবে।" [তুলনীয়: হাদীস নং ৬৫; ১৫৮]
জান্নাতে প্রবেশ করার পূর্বে ধনী ব্যক্তির কঠোর জবাবদিহি
[২১৮] ইবনু আব্বাস (রদিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'নবি (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,
الْتَقَى مُؤْمِنَانِ عَلَى بَابِ الْجَنَّةِ مُؤْمِنٌ غَنِيٌّ وَمُؤْمِنٌ فَقِيْرٌ كَانَا فِي الدُّنْيَا فَأُدْخِلَ الْفَقِيْرُ الْجَنَّةَ وَحُبِسَ الْغَنِيُّ مَا شَاءَ اللَّهُ أَنْ يُحْبَسَ ثُمَّ أُدْخِلَ الْجَنَّةَ فَلَقِيَهُ الْفَقِيْرُ فَقَالَ يَا أَخِي مَا ذَا حِبِسَكَ وَاللهِ لَقَدْ أُحْتُسِبْتُ حَتَّى خِفْتُ عَلَيْكَ فَيَقُوْلُ أَيْ أَخِي إِنِّي حُبِسْتُ بَعْدَكَ مَحْبَسًا قَطِيعًا كَرِيْهَا مَا وَصَلْتُ إِلَيْكَ حَتَّى سَالَ مِنِّي الْعَرَقُ مَا لَوْ وَرَدَ أَلْفُ بَعِيْرٍ كُلُّهُ أَكَلَةُ الْحَمْضِ لَصَدَرَتْ عَنْهَا رِوَاءً
"জান্নাতের দরজায় দুজন মুমিনের সাক্ষাৎ হলো-দুনিয়াতে একজন ছিল ধনী, অপরজন নিঃস্ব। নিঃস্ব মুমিনকে জান্নাতে প্রবেশ করানো হলো, আর ধনী মুমিনকে একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য আটকে রাখা হলো; পরিশেষে তাকেও জান্নাতে প্রবেশ করানো হলো। তার সাথে নিঃস্ব ব্যক্তির সাক্ষাৎ হলে সে বললো, 'ভাই! তোমাকে কেন আটকে রাখা হয়েছিল? আল্লাহ'র শপথ! আমার কাছ থেকে যেভাবে হিসেব নেওয়া হয়েছিল, তাতে তো আমি তোমার ব্যাপারে শঙ্কিত হয়ে গিয়েছিলাম।' ধনী লোকটি বললো, 'ভাই! তোমার পর আমাকে নির্দয় ও নিন্দনীয়ভাবে আটকে রাখা হয়েছিল; তোমার এখানে আসতে আসতে আমার শরীর থেকে এতো বেশি ঘাম ঝরেছে-যা একহাজার তৃষ্ণার্ত উটের তৃষ্ণা নিবারণের জন্য যথেষ্ট!"'
পাপ মানুষকে জান্নাতে নিয়ে যায়, যদি ...
[২১৯] হাসান (রহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,
إِنَّ الْعَبْدَ لَيُذْنِبُ الذَّنْبَ فَيُدْخِلُهُ اللَّهُ بِهِ الْجَنَّةَ
"বান্দা পাপ করবে, আর আল্লাহ তাকে এর বদৌলতে জান্নাতে প্রবেশ
করাবেন।” সাহাবিগণ (রদিয়াল্লাহু আনহু) বললেন, 'হে আল্লাহ'র রাসূল! পাপ কেমন করে তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবে?' নবি (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন,
يَكُونُ نُصْبٍ عَيْنِهِ فَارًا تَائِبًا حَتَّى يُدْخِلَهُ ذَنْبُهُ الْجَنَّةَ "উক্ত পাপ (সারাক্ষণ) তার চোখের সামনে ভেসে বেড়াবে; ফলে সে [অনুরূপ পাপ থেকে] পালিয়ে বেড়াবে এবং তার জন্য তাওবা [অনুশোচনা] করতে থাকবে; শেষ পর্যন্ত ঐ পাপই তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবে।"
রহমতের সুরতে গযব
[২২০] সাঈদ ইবনুল মুসাইয়িব (রহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'বজ্রপাতের আওয়াজ শোনামাত্রই রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)- এর চেহারায় উদ্বেগের ছাপ স্পষ্ট হয়ে উঠতো, যতোক্ষণ না বৃষ্টিপাত হতো; বৃষ্টিপাত শুরু হলে তিনি স্বস্তি পেতেন। ফলে তাঁকে জিজ্ঞাসা করা হলো, 'হে আল্লাহ'র রাসূল! আপনার চেহারায় আমরা যে উদ্বেগ দেখতে পাই—তার কারণ কী?' নবি (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন,
إِنِّي لَا أَدْرِي أُمِرَتْ بِرَحْمَةٍ أَوْ بِعَذَابٍ "বজ্রপাতকে করুণা বর্ষণ, নাকি শাস্তি নাযিল—কোনটির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে তা আমি জানি না।” [তুলনীয়: হাদীস নং ১২৪]
সবচেয়ে বেশি মুসিবত যাঁদের
[২২১] উমার ইবনুল খাত্তাব (রদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'আমি আল্লাহ'র নবি (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর [কক্ষে] প্রবেশ করলাম। তখন তিনি ছিলেন অসুস্থ। আমি তাঁর কাপড়ের উপর হাত রাখলাম। কাপড়ের উপর থেকেই (শরীরের) উত্তাপ অনুভূত হচ্ছিল। আমি বললাম, 'হে আল্লাহ'র নবি! আমি তো কাউকে আপনার মতো এরকম জ্বরে আক্রান্ত হতে দেখিনি!' তিনি বললেন,
كَذَلِكَ يُضَاعَفُ لَنَا الْأَجْرُ إِنَّ أَشَدَّ النَّاسِ بَلَاءٌ أَلْأَنْبِيَاءُ ثُمَّ الصَّالِحُوْنَ وَإِنْ كَانَ
مِنَ الْأَنْبِيَاءِ لَمَنْ يُبْتَلَى بِالْفَقْرِ حَتَّى يَتَدَرَّعَ بِالْعَبَاءَةِ مِنَ الْفَقْرِ وَإِنْ كَانَ مِنْهُمْ مِّنْ يُسَلَّطُ عَلَيْهِ الْقُمْلُ حَتَّى يَقْتُلَهُ
“এভাবেই আমরা দ্বিগুণ প্রতিদান পেয়ে থাকি; সবচেয়ে বেশি বিপদ- মুসিবতের মুখোমুখি হয়েছেন নবিগণ, তারপর ন্যায়-নিষ্ঠ বান্দাগণ। নবিদের মধ্যে কাউকে তো এতো বেশি দারিদ্র্য দিয়ে পরীক্ষা করা হয়েছে যে শরীরকে সুরক্ষিত রাখার জন্য শেষপর্যন্ত তিনি আবা দিয়ে নিজেকে আচ্ছাদিত করতেন; আবার কারো উপর উকুনের এমন উপদ্রব চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল যে এতেই তাঁর মৃত্যু হয়েছে।” [তুলনীয়: হাদীস নং ২৩৯]³
জাহান্নামের ভয়ে এক আনসার সাহাবির মৃত্যু
[২২২] মুহাম্মদ ইবনু মুতারিফ (রহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘এক আনসার যুবকের অন্তরে [জাহান্নামের] আগুনের ভয় জেঁকে বসে। ফলে সে ঘরে বসে থাকে। নবি (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তার ঘরে এসে পাশে দাঁড়ালেন এবং তার সাথে আলিঙ্গন করেন। সে সজোরে একটি আর্তচিৎকার করে, আর অমনি তার প্রাণবায়ু বেড়িয়ে যায়। পরিশেষে নবি (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন,
جَهْزُوا صَاحِبَكُمْ فَلَذَ خَوْفُ النَّارِ كَبِدَهُ "তোমাদের সাথিকে [দাফন-কাফনের জন্য] প্রস্তুত করো। [জাহান্নামের] আগুনের ভয় তার কলিজাকে কেটে ফেলেছে।"'
দুটি গহ্বর মানুষকে জাহান্নামে নিয়ে যায়
[২২৩] আবূ হুরায়রা (রদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবি (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,
أَكْثَرُ مَا يَلِجُ بِهِ الْإِنْسَانُ النَّارَ الْأَجْوَفَانِ الْفَرْجُ وَالْفَمُ وَأَكْثَرُ مَا يَلِجُ بِهِ الْإِنْسَانُ الْجَنَّةَ تَقْوَى اللَّهِ وَحُسْنُ الْخُلُقِ "বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মানুষ জাহান্নামে যাবে দুটি গহ্বরের কারণে, আর তা
[৩] কমদামি উলের বস্ত্র। [অনুবাদক]
হলো লজ্জাস্থান ও মুখ, অপবাদকে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে মানুষ জান্নাতে যাবে দুটি আচরণের ফলে, আর তা হলো আল্লাহ ভীতি ও উত্তম আচরণ।"
সর্বোত্তম মুমিনের বৈশিষ্ট্য
[২২৪] আসাদ ইবনু দিরাআ (রদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, 'রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে জিজ্ঞাসা করা হলো, 'মুমিনদের মধ্যে কে সর্বোত্তম? তিনি বললেন,
مُؤْمِنُ مَغْمُومُ الْقَلْبِ لَيْسَ فِيْهِ غِلَّ وَلَا حَسَدٌ
"সেই মুমিন যার হৃদয় দুঃখভারাক্রান্ত, অথচ তাতে কোনো হিংসা-বিদ্বেষ নেই।" তাঁরা বললেন, 'হে আল্লাহ'র নবি! এ বৈশিষ্ট্য তো আমাদের মধ্যে পাই না। তারপর মুমিনদের মধ্যে সর্বোত্তম ব্যক্তি কে?''
নবি (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, "الْمُؤْمِنُ الزَّاهِدُ فِي الدُّنْيَا الرَّاغِبُ فِي الْآخِرَةِ সেই মুমিন যে দুনিয়া-বিরাগী ও পরকালের প্রতি উন্মুখ।"
তাঁরা বললেন, 'হে আল্লাহ'র নবি! আমরা তো রাফি ইবনু খাদীজ ছাড়া আমাদের অন্য কারো মধ্যে এ বৈশিষ্ট্য দেখতে পাই না। এরপর মুমিনদের মধ্যে সর্বোত্তম ব্যক্তি কে?'
নবি (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, “مُؤْمِنُ حَسَنُ الْخُلُقِ মুমিন যার আচরণ সুন্দর।"
আল্লাহর করুণা ছাড়া কেউ নাজাত পাবে না
[২২৫] আবূ হুরায়রা (রদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,
إِنَّ أَحَدًا مِنْكُمْ لَا يُنْجِيْهِ عَمَلُهُ
"[শুধু] আমলের ভিত্তিতে তোমাদের কেউ নাজাত লাভ করতে পারবে না।” সাহাবিগণ বললেন, 'হে আল্লাহ'র রাসূল! আপনিও না?' নবি (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন,
وَلَا أَنَا إِلَّا أَنْ يَتَغَمَّدَنِيَ اللَّهُ بِرَحْمَتِهِ وَلَكِنْ أُغْدُوا وَرُوْحُوا وَشَيْئًا مِّنَ الدُّلْجَةِ
الْقَصْدَ الْقَصْدَ تَبْلُغُوا
"আমিও না; যতোক্ষণ না আল্লাহ তাআলা আমাকে তার করুণা দিয়ে আচ্ছাদিত করে দিবেন। তবে তোমরা সকাল, বিকাল ও রাতে [অর্থাৎ সর্বাবস্থায়] মধ্যমপন্থা অবলম্বন করো, মধ্যমপন্থা অবলম্বন করো; তাহলে কাঙ্ক্ষিত মঞ্জিলে পৌঁছে যাবে।”
আল্লাহ যখন কোনো বান্দার কল্যাণ চান, তাকে মৃত্যুর পূর্বে ভালো কাজের তাওফীক দেন
[২২৬] হাসান (রহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,
إِذَا أَرَادَ اللَّهُ بِعَبْدِ خَيْرًا إِسْتَعْمَلَهُ “যখন আল্লাহ কোনো বান্দার কল্যাণ চান, তখন তাকে কাজে লাগান।" সাহাবিগণ জিজ্ঞাসা করলেন, 'হে আল্লাহ'র নবি! আল্লাহ তাকে কীভাবে কাজে লাগান?'
নবি (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, “يُوَفِّقُهُ لِعَمَلٍ صَالِحٍ قَبْلَ مَوْتِهِ ثُمَّ يَقْبِضُهُ عَلَيْهِ মৃত্যুর পূর্বে তাকে সৎ কাজ করার সামর্থ্য দেন, তারপর তার মৃত্যু ঘটান।"
শ্রেষ্ঠত্বের মানদণ্ড
[২২৭] হাসান (রহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'নবি (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর এক সম্ভ্রান্ত সাহাবি এক ব্যক্তিকে তার মায়ের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে কটু কথা বলে। তা শুনে রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন,
وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ مَا أَنْتَ بِأَفْضَلَ مِمَّنْ تَرَى مِنْ أَحْمَرَ وَلَا أَسْوَدَ إِلَّا أَنْ تَفْضُلَهُمْ بِالتَّقْوى
"সেই সত্তার শপথ-যার হাতে আমার প্রাণ! তুমি যাকে দেখতে পাচ্ছো— তার তুলনায় তোমার শ্রেষ্ঠত্বের ভিত্তি এটি নয় যে তোমাদের একজনের গায়ের রঙ লাল আর অপরজনের রঙ কালো; তাদের তুলনায় তোমার শ্রেষ্ঠত্বের একমাত্র মানদণ্ড হলো আল্লাহ-ভীতি।"'
দুনিয়ার মূল্য
[২২৮] হাসান (রহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,
وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ مَا تَعْدِلُ الدُّنْيَا عِنْدَ اللَّهِ تَبَارَكَ وَتَعَالَى جَدْيًا مِنَ الْغَنَمِ "সেই সত্তার শপথ-যার হাতে আমার প্রাণ! আল্লাহ তাআলা'র নিকট এ দুনিয়ার মূল্য একটি ছাগল-ছানার মূল্যের চেয়েও কম।"'
মনের প্রশস্ততাই প্রকৃত প্রাচুর্য
[২২৯] আবূ হুরায়রা (রদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,
لَيْسَ الْغِنَى عَنْ كَثْرَةِ الْعِرْضِ إِنَّمَا الْغِنَى عَلَى النَّفْسِ "সম্মানের আধিক্যে প্রাচুর্য নেই, মনের প্রশস্ততাই প্রকৃত প্রাচুর্য।" [তুলনীয়: হাদীস নং ৯৬]
কেউ কিছু দিলে দাতাকে তার উৎস জিজ্ঞাসা করা উচিত
[২৩০] শিদাদ ইবনু আউস (রদিয়াল্লাহু আনহু)-এর বোন উম্মু আব্দিল্লাহ (রদিয়াল্লাহু আনহা) থেকে বর্ণিত, 'দীর্ঘ ও প্রচণ্ড গরমের একদিন ইফতারের সময় তিনি এক পেয়ালা দুধ দিয়ে নবি (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নিকট একজন দূত প্রেরণ করেন। নবি (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তার দূতকে একথা বলে ফেরত পাঠান, [গিয়ে জিজ্ঞাসা করো]
“أَنَّى لَكِ هُذَا اللَّبَنُ؟ এই দুধ তুমি কোথায় পেয়েছো?" মহিলা সাহাবি জানান, 'এটি আমার নিজস্ব ভেড়ির দুধ।' [একথা জানানোর পর] নবি (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ঐ দূতকে একথা বলে আবার ফেরত পাঠান, ]গিয়ে জিজ্ঞাসা করো[ "أَنَّى لَكِ هَذِهِ الشَّاءُ এই ভেড়ি তুমি কোথায় পেয়েছো?" মহিলা সাহাবি বলেন, 'নিজের সম্পদ দিয়ে আমি এটি কিনেছি।' তার পর নবি (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ঐ দুধ পান করেন। পরদিন উম্মু আব্দিল্লাহ (রদিয়াল্লাহু আনহা) রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নিকট এসে
বলেন, 'হে আল্লাহ'র রাসূল! দীর্ঘ ও প্রচণ্ড গরমের দিন মনে করে আমি ঐ দুধ দিয়ে একজন দূতকে দুবার পাঠালাম; আর [দুবারই] আপনি তাকে ফেরত পাঠালেন!' জবাবে রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, أُمِرَتِ الرُّسُلُ قَبْلِ أَنْ لَا تَأْكُلَ إِلَّا طَيِّبًا وَلَا تَعْمَلَ إِلَّا صَالِحًا রাসূলদেরকে এ মর্মে আদেশ দেওয়া হয়েছে-তারা যেন কেবল সে খাবারই গ্রহণ করে যা পবিত্র এবং কেবল সে কাজই করে যা ন্যায়-নিষ্ঠ।"'
দুটি পার্থিব অনুগ্রহ
[২৩১] মাইমূন (রদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'পার্থিব অনুগ্রহসমূহের মধ্যে [পুণ্যবতী] নারী ও সুগন্ধি ছাড়া অন্য কোনো অনুগ্রহ নবি (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) পাননি।'
মৃত্যুর সময় সর্বোত্তম আমল
[২৩২] হাসান (রহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে জিজ্ঞাসা করা হলো, "সর্বোত্তম আমল কোনটি?” জবাবে তিনি বলেন, تَمُوْتُ يَوْمَ تَمُوْتُ وَلِسَانُكَ رَطْبًا مِنْ ذِكْرِ اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ "মৃত্যুর সময় তোমার জিহ্বা আল্লাহ তাআলা'র যিক্রে সিক্ত থাকা।"'
দুনিয়ার সাথে কথোপকথন
[২৩৩] আতা ইবনু ইয়াসার (রহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, 'নবি (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, أَتَتْنِي الدُّنْيَا خُضْرَةً حُلْوَةً وَرَفَعَتْ رَأْسَهَا وَتَزَيَّنَتْ لِي فَقُلْتُ إِنِّي لَا أُرِيدُكَ فَقَالَتْ إِنْ انْفَلَتْ مِنِّي لَمْ يَنْفَلِتْ مِنِّي غَيْرُكَ "দুনিয়া আমার সামনে মনোরম সবুজ উদ্যানের রূপ ধরে হাজির হলো। আমার সামনে সে তার মাথা সমুন্নত করে সকল সৌন্দর্য মেলে ধরলো। আমি বললাম, 'আমি তোমাকে চাই না।' দুনিয়া বললো, 'তুমি আমাকে এড়িয়ে গেলেও, অন্য কেউ আমাকে এড়িয়ে যাবে না।"' [তুলনীয়:
হাদীস নং ৬২, ১৮৩]
দুনিয়ার চাকচিক্য খোদাদ্রোহীদের জন্য
[২৩৪] আনাস ইবনু মালিক (রদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'আমি রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর কক্ষে প্রবেশ করলাম। তিনি খেজুর গাছের ছাল দিয়ে তৈরি একটি বিছানায় শায়িত; মাথার নিচে খেজুর গাছের আঁশভর্তি একটি চামড়ার বালিশ। কক্ষে একাধিক সাহাবি প্রবেশ করেন; তাঁদের একজন ছিলেন উমার (রdiয়াল্লাহু আনহু)। নবি (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) একপাশে ফিরলেন। উমার (রদিয়াল্লাহু আনহু) দেখতে পান, রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর পার্শ্বদেশ ও বিছানার মাঝখানে কাপড় না থাকায় তাঁর পার্শ্বদেশে বিছানার ছাপ লেগে আছে। এ দৃশ্য দেখে উমার (রদিয়াল্লাহু আনহু) কেঁদে ফেলেন। রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁকে জিজ্ঞাসা করলেন,
“مَا يُبْكِيْكَ يَا عُمَرُ؟ উমার! কাঁদছো কেন?"
উমার (রদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, 'আল্লাহ'র শপথ! আমি শুধু এ কারণেই কাঁদছি যে আমি জানি, আপনি [পারস্য সম্রাট] খসরু ও [রোমান সম্রাট] সিজারের তুলনায় আল্লাহ'র নিকট অধিক সম্মানিত। তারা দুনিয়ার প্রাচুর্যে ডুবে আছে, আর আপনি আল্লাহ'র রাসূল হয়েও যে অবস্থায় আছেন তা তো নিজের চোখেই দেখতে পাচ্ছি!' নবি (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন,
أَمَا تَرْضَى أَنْ تَكُوْنَ لَهُمُ الدُّنْيَا وَلَنَا الْآخِرَةُ؟ "তাদের জন্য দুনিয়া, আর আমাদের জন্য আখিরাত?" উমার (রদিয়াল্লাহু আনহু) বললেন, 'কেন নয়? অবশ্যই আমি তাতে সন্তুষ্ট।' নবি (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, “فَإِنَّهُ كَذَلِكَ তাহলে বিষয়টি এমনই।"'
জাহান্নামের সবচেয়ে লঘু শাস্তি হলো আগুনের জুতা ও ফিতা
[২৩৫] নুমান ইবনু বাশীর (রদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,
إِنَّ أَهْوَنَ أَهْلِ النَّارِ عَذَابًا مَنْ لَهُ نَعْلَانِ وَشِرَاكَانِ مِنْ نَارٍ يَغْلَى مِنْهُمَا كَمَا يَغْلِي الْمِرْجَلُ مَا يَرَى أَنَّ أَحَدًا أَشَدُّ عَذَابًا مِنْهُ وَإِنَّهُ لَأَهْوَنُهُمْ عَذَابًا
"জাহান্নামবাসীদের মধ্যে যাকে সবচেয়ে হাল্কা শাস্তি দেওয়া হবে তাকে একজোড়া আগুনের জুতা ও ফিতা পরানো হবে। এ দুটির উত্তাপে তার মাথার মগজ এমনভাবে টগবগ করতে থাকবে যেভাবে ফুটন্ত [পানির] পাত্র টগবগ করতে থাকে। তার মনে হবে, তার চেয়ে কঠিন শাস্তির মুখোমুখি আর কেউ হয়নি; অথচ তার শাস্তিই হলো সবচেয়ে হালকা।"'
আরশের ছায়ায় সবার আগে যারা স্থান পাবেন
[২৩৬] আয়িশা (রদিয়াল্লাহু আনহা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) জিজ্ঞাসা করলেন,
“أَتَدْرُوْنَ مَنِ السَّابِقُوْنَ إِلَى ظِلَّ اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ؟ তোমরা কি জানো, আল্লাহ তাআলা'র [আরশের ছায়ায় কারা সবার আগে স্থান পাবে?" সাহাবিগণ বললেন, 'আল্লাহ ও তাঁর রাসূলই ভালো জানেন।'
নবি (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, “الَّذِينَ إِذَا أُعْطُوا الْحَقَّ قَبِلُوهُ وَإِذَا سُئِلُوْا بَذَلُوهُ وَحَكَمُوا لِلنَّاسِ كَحُكْمِهِمْ لِأَنْفُسِهِمْ লোক] যাদের সামনে সত্য পেশ করা হলে, তাঁরা গ্রহণ করে; [আল্লাহ'র পথে] খরচ করতে বলা হলে, খরচ করে; এবং মানুষের জন্য সেই ফায়সালাই করে যা তাঁরা নিজেদের জন্য করে থাকে।"'
দুনিয়ায় যারা ভালো, আখিরাতেও তারা ভালো
[২৩৭] আবূ উসমান নাহদি (রদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,
أَهْلُ الْمَعْرُوْفِ فِي الدُّنْيَا هُمْ أَهْلُ الْمَعْرُوْفِ فِي الْآخِرَةِ وَإِنَّ أَهْلَ الْمُنْكَرِ فِي الدُّنْيَا هُمْ أَهْلُ الْمُنْكَرِ فِي الْآخِرَةِ
"দুনিয়ায় যারা ভালো, আখিরাতেও তাঁরা ভালো; আর দুনিয়ায় যারা খারাপ, আখিরাতেও তারা খারাপ।"'
আল্লাহ তাআলা কোনো জাতিকে পছন্দ করলে তাদেরকে পরীক্ষার মুখোমুখি করেন
[২৩৮] ওয়াহাব ইবনু মুনাব্বিহ (রহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, إِنَّ اللهَ عَزَّ وَجَلَّ إِذَا أَحَبَّ قَوْمًا ابْتَلَاهُمْ "আল্লাহ তাআলা কোনো জাতিকে পছন্দ করলে তাদেরকে পরীক্ষার মুখোমুখি করেন।"
মানুষকে তার দ্বীন মেনে চলার অনুপাতে পরীক্ষার মুখোমুখি করা হয়
[২৩৯] মুসআব ইবনু সাদ (রহিমাহুল্লাহ) তাঁর পিতার সূত্রে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন, 'আমি জিজ্ঞাসা করলাম, 'হে আল্লাহ'র রাসূল! মানুষের মধ্যে কে সবচেয়ে কঠিন বিপদ-মুসিবতের মুখোমুখি হয়?' জবাবে তিনি বললেন, الْأَنْبِيَاءُ ثُمَّ الصَّالِحُوْنَ ثُمَّ الْأَمْثَلُ فَالْأَمْثَلُ مِنَ النَّاسِ يُبْتَلَى الرَّجُلُ عَلَى حَسَبٍ دِيْنِهِ فَإِنْ كَانَ فِي دِينِهِ صَلَابَةٌ زِيدَ فِي بَلَاءِهِ وَإِنْ كَانَ فِي دِينِهِ رِقَةٌ خُفِّفَتْ عَنْهُ وَلَا يَزَالُ الْبَلَاءُ فِي الْعَبْدِ حَتَّى يَمْشِيَ فِي الْأَرْضِ لَيْسَ عَلَيْهِ خَطِيئَةٌ "নবিগণ, তারপর ন্যায়-নিষ্ঠ ব্যক্তিবর্গ, তারপর তাঁদের অনুরূপ লোকজন, অতঃপর তাদের অনুরূপ লোকজন। মানুষকে তার দ্বীন অনুপাতে পরীক্ষার মুখোমুখি করা হয়—তার দ্বীন পালনে দৃঢ়তা থাকলে তার বিপদ-মুসিবত বাড়িয়ে দেওয়া হয়, আর দ্বীন পালনে নমনীয়তা থাকলে তার বিপদ-মুসিবত হালকা করে দেওয়া হয়। বান্দা যতোদিন দুনিয়ায় বিচরণ করে, ততোদিন তার পরীক্ষা চলতে থাকে, যতোক্ষণ না সে পাপমুক্ত হচ্ছে।" [তুলনীয়: হাদীস নং ২২১]
জাহান্নামের বিভীষিকা
[২৪০] আনাস ইবনু মালিক (রদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, 'রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) জিবরাঈল (আলাইহিস সালাম)-কে জিজ্ঞাসা করলেন, مَا لِي لَمْ أَرَ مِيْكَاثِيْلَ عَلَيْهِ السَّلَامُ ضَاحِكًا قَطَّ?
"কী হলো? আমি তো মীকাঈল (আলাইহিস সালাম)-কে কখনো হাসতে দেখলাম না!” জিবরাঈল (আলাইহিস সালাম) বললেন, জাহান্নাম সৃষ্টির পর থেকে মীকাঈল কখনো হাসেননি।' [তুলনীয়: হাদীস নং ১৪০]
আল্লাহ তাআলা-কে বেশি বেশি স্মরণ করার নির্দেশ
[২৪১] আবুল জাওযা (রহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,
أَكْثِرُوا ذِكْرَ اللهِ عَزَّ وَجَلَّ حَتَّى يَقُوْلَ الْمُنَافِقُوْنَ إِنَّكُمْ مُرَاءُوْنَ
"আল্লাহ তাআলা-কে বেশি বেশি স্মরণ করো, যতোক্ষণ না মুনাফিকরা বলে, 'তোমরা তো মানুষকে দেখানোর জন্য এসব করছো।' "
পার্থিব পরীক্ষার স্বরূপ
[২৪২] হাসান (রহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, 'নবি (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,
وَاللهِ لَا يُعَذِّبُ اللهُ عَزَّ وَجَلَّ حَبِيبَهُ وَلَكِنْ قَدْ يَبْتَلِيْهِ فِي الدُّنْيَا
"আল্লাহ'র শপথ! আল্লাহ তাআলা তাঁর কোনো বন্ধুকে শাস্তি দেন না, তবে দুনিয়ায় পরীক্ষার মুখোমুখি করেন।"'
নিকৃষ্ট লোকেরাই সারাজীবন বিলাসী খাবার ও বিলাসী পোশাকের পেছনে ছুটে
[২৪৩] ফাতিমা বিনতু হুসাইন (রহিমাহাল্লাহ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,
إِنَّ مِنْ شِرَارِ أُمَّتِي الَّذِينَ غُذُوا بِالنَّعِيمِ الَّذِينَ يَطْلُبُوْنَ أَلْوَانَ الطَّعَامِ وَأَلْوَانَ الثَّيَابِ يَتَشَادَقُوْنَ بِالْكَلَامِ
"আমার উম্মতের মধ্যে নিকৃষ্ট লোক তারা—যারা ভোগ-বিলাসে ডুবে থাকে, রঙ-বেরঙের পোশাক ও খাবার খুঁজে বেড়ায় ও দম্ভভরে কথা বলে।"' [তুলনীয়: হাদীস নং ২০৭]
রিষ্কের বিষয়ে অমূলক আশঙ্কা
[২৪৪] মুহাম্মদ ইবনু সীরীন (রহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, 'নবি (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বিলাল (রদিয়াল্লাহু আনহু)-এর কক্ষে গিয়ে তাঁর কাছে খেজুরের একটি স্তূপ দেখতে পেলেন। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, “مَا هَذَا؟ এগুলো কী?” বিলাল (রদিয়াল্লাহু আনহু) বললেন, 'এগুলো খেজুর; আমি জমা করে রেখেছি।' নবি (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন,
أَفَمَا تَخَافُ أَنْ يَكُوْنَ لَهُ بُخَارٌ فِي نَارِ جَهَنَّمَ أَنْفِقْ بِلَالُ وَلَا تَخْشَ مِنْ ذِي الْعَرْشِ إِقْلَالًا
"তোমার কি ভয় হয় না যে এর জন্য জাহান্নামের আগুনের উত্তাপ বাড়তে পারে? বিলাল! খরচ করো; আরশের অধিপতি [তোমার রিযক] সঙ্কুচিত করে দিবেন—এ আশঙ্কা কোরো না।"' [তুলনীয়: হাদীস নং ৪৬]

📘 রাসুলের চোখে দুনিয়া > 📄 আদম (আলাইহিস সালাম) ও দুনিয়া

📄 আদম (আলাইহিস সালাম) ও দুনিয়া


মানুষের কাজ ও আল্লাহর কাজ
[২৪৫] সালমান ফারিসি (রদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'আল্লাহ তাআলা আদম (আলাইহিস সালাম)-কে সৃষ্টি করে বললেন,
وَاحِدَةٌ لِي وَوَاحِدَةً لَكَ وَوَاحِدَةٌ بَيْنِي وَبَيْنَكَ فَأَمَّا الَّتِي لِي تَعْبُدُنِي وَلَا تُشْرِكُ بِي شَيْئًا وَأَمَّا الَّتِي لَكَ فَمَا عَمِلْتَ مِنْ شَيْءٍ جَزَيْتُكَ بِهِ وَأَنَا أَغْفِرُ وَأَنَا غَفُورٌ رَحِيمٌ وَأَمَّا الَّتِي بَيْنِي وَبَيْنَكَ الْمَسْأَلَةُ وَالدُّعَاءُ وَعَلَى الْإِجَابَةُ وَالْعَطَاءُ
"একটি বিষয় আমার জন্য, একটি বিষয় তোমার জন্য, আর একটি বিষয় তোমার ও আমার মধ্যকার। যে বিষয়টি আমার জন্য [নির্ধারিত], তা হলো—তুমি আমার দাসত্ব করবে এবং [এ দাসত্বে] আমার সাথে অন্য কাউকে শরীক করবে না। তোমার জন্য নির্ধারিত বিষয়টি হলো, তোমার কৃত প্রত্যেকটি কাজের বিনিময় আমি তোমাকে দিবো এবং [তোমার অপরাধ] ক্ষমা করবো; আমি ক্ষমাশীল ও দয়ালু। আর যে বিষয়টি তোমার ও আমার মধ্যকার, তা হলো—তোমার কাজ [আমার নিকট] চাওয়া ও প্রার্থনা করা, আর আমার দায়িত্ব হলো সাড়া দেওয়া ও দান করা।"
অসাম্যের কারণ
[২৪৬] বাকর (রদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, 'আদম আলাইহিস সালাম-এর সামনে তাঁর সন্তানদের হাজির করা হলে তিনি দেখতে পান—তাদের কেউ কেউ অপরের তুলনায় শ্রেষ্ঠ। তিনি জিজ্ঞাসা করেন,
“يَا رَبِّ فَهَلَّا سَوَّيْتَ بَيْنَهُمْ؟ হে আমার রব! তুমি তাদের মধ্যে সমতা প্রতিষ্ঠা
করলে না কেন?" আল্লাহ বলেন, "إِنِّي أَعْلَمُ أَنْ لَّمْ تَعْلَمُوْا চেয়েছি-আমার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা হোক।"
সকল মানুষের কান্না জড়ো করা হলে তা আদম (আলাইহিস সালাম) এর অশ্রুর সমান হবে না
[২৪৭] আলকামা (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'ভুল করার পর দাউদ (আলাইহিস সালাম) যে-পরিমাণ অশ্রু ঝরিয়েছেন-পৃথিবীর সকল অধিবাসীর কান্না একত্রিত করা হলেও তার সমান হবে না; আবার জান্নাত থেকে নামিয়ে দেওয়ার ফলে আদম (আলাইহিস সালাম) যে-পরিমাণ চোখের পানি ফেলেছেন-দাউদ (আলাইহিস সালাম)-সহ পৃথিবীর সকল অধিবাসীর কান্না জড়ো করা হলেও তা তার সমান সমান হবে না।'
জান্নাতের থাকার সময়কাল
[২৪৮] হাসান (রহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'আদম আলাইহিস সালাম জান্নাতে অবস্থান করেছিলেন একদিনের কিছু সময়; আর সেটুকুন সময় ছিল দুনিয়ার হিসেবে এক শ ত্রিশ বছরের সমান।'
গোনাহের ফলে মৃত্যুচিন্তা গৌণ হয়ে যায়
[২৪৯] হাসান (রহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'ভুল করার আগে আদম আলাইহিস সালাম-এর সম্মুখে ছিল তাঁর মৃত্যুর সময়ক্ষণ, আর পশ্চাতে ছিল [পার্থিব] সুদূর প্রত্যাশা। ভুল করার পর বিষয়টি উল্টো হয়ে গেলো-সুদূর প্রত্যাশার বিষয়াবলি সম্মুখে চলে আসলো, আর পশ্চাতে চলে গেলো মৃত্যুর সময়ক্ষণ।'
ইবলিসের মন্তব্য
[২৫০] আনাস ইবনু মালিক (রদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, 'রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,
لَمَّا صَوَّرَ اللهُ تَبَارَكَ وَتَعَالَى آدَمَ عَلَيْهِ السَّلَامُ تَرَكَهُ فَجَعَلَ إِبْلِيسُ يَطُوْفُ بِهِ يَنْظُرُ إِلَيْهِ فَلَمَّا رَآهُ أَجْوَفَ قَالَ ظَفَرْتُ بِهِ خَلْقُ لَا يَتَمَالَكُ
"আল্লাহ তাআলা আদম (আলাইহিস সালাম)-কে আকৃতি দেয়ার পর [কিছু সময়ের জন্য] রেখে দেন। তখন ইবলিস তাঁকে প্রদক্ষিণ করতে শুরু করে। সে তাঁর দিকে [গভীর দৃষ্টিতে] তাকিয়ে থাকতো। তাঁকে শূন্য-গহ্বর দেখে ইবলিস বললো, 'আমি ওর তুলনায় শ্রেষ্ঠ; ও এমন এক সৃষ্টি যে তার নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারবে না।"'
ক্ষমা প্রার্থনা করা ও আল্লাহ তাআলার দিকে ফিরে আসাই হলো পাপ থেকে উত্তরণের উপায়
[২৫১] উবাই ইবনু কাব (রদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, 'নবি (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,
إِنَّ آدَمَ عَلَيْهِ السَّلَامُ كَانَ رَجُلًا طِوَالًا كَأَنَّهُ نَخْلَةٌ سَحُوْقُ كَثِيرَ شَعْرِ الرَّأْسِ فَلَمَّا وَقَعَ بِمَا وَقَعَ بِهِ بَدَتْ لَهُ عَوْرَتُهُ وَكَانَ لَا يَرَاهَا قَبْلَ ذَلِكَ فَانْطَلَقَ هَارِبًا فَأَخَذَتْ بِرَأْسِهِ شَجَرَةٌ مِنْ شَجَرِ الْجَنَّةِ فَقَالَ لَهَا أَرْسِلِينِي قَالَتْ لَسْتُ مُرْسِلَتَكَ فَنَادَاهُ رَبُّهُ عَزَّ وَجَلَّ أَمِنّى تَفِرُّ قَالَ أَيْ رَبِّ لَا أَسْتَحْيِيْكَ فَنَادَاهُ وَ أَنَّ الْمُؤْمِنَ يَسْتَحْيِي رَبَّهُ عَزَّ وَجَلَّ مِنَ الذَّنْبِ إِذَا وَقَعَ بِهِ ثُمَّ يَعْلَمُ بِحَمْدِ اللَّهِ أَيْنَ الْمَخْرَجُ يَعْلَمُ أَنَّ الْمَخْرَجَ فِي الْإِسْتِغْفَارِ وَالتَّوْبَةِ إِلَى اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ
"আদম (আলাইহিস সালাম) ছিলেন ঘনকেশী ও দীর্ঘদেহী এক পুরুষ- অনেকটা সুউচ্চ খেজুর গাছের ন্যায়। তাঁর জীবনে যা ঘটার তা যখন ঘটে গেলো (অর্থাৎ আল্লাহ তাআলা'র নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘিত হলো), তখন তাঁর গোপনীয় অংশ তাঁর সামনে প্রকাশিত হয়ে গেলো-এর আগে যা তাঁর নজরে পড়েনি। ফলে তিনি পালাতে শুরু করলেন; আর অমনি বাগানের একটি বৃক্ষ তাঁর মাথা ধরে ফেলে। তিনি বৃক্ষটিকে বললেন, 'আমাকে ছেড়ে দাও।' বৃক্ষ বললো, 'আমি তোমাকে ছাড়বো না।' এ সময় তাঁর মহান রব তাঁকে ডেকে বললেন, 'তুমি কি আমার কাছ থেকে পালাচ্ছো?' আদম (আলাইহিস সালাম) বললেন, 'হে আমার রব! না (আমি পালাচ্ছি না); বরং তোমাকে লজ্জা পাচ্ছি।' আল্লাহ তাঁকে ডেকে বললেন, 'কোনো পাপ সংঘটিত হওয়ার পর মুমিন তাঁর রবকে লজ্জা পেলে, সে পাপ থেকে উত্তরণের উপায় জেনে যাবে। সকল প্রশংসা কেবল আল্লাহর! সে জানবে ক্ষমা প্রার্থনা করা ও আল্লাহ তাআলার দিকে ফিরে আসা-ই
(পাপ থেকে) উত্তরণের উপায়।"'
আদম ও দাউদ (আলাইহিমাস সালাম)
[২৫২] ইবনু আব্বাস (রদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'ঋণচুক্তির [বিধানাবলি সম্বলিত] আয়াত [সূরা আল-বাকারা ২:২৮২] নাযিল হওয়ার পর রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, “إِنَّ أَوَّلَ مَنْ جَحَدَ آدَمُ عَلَيْهِ السَّلَامُ সর্বপ্রথম অস্বীকারকারী ব্যক্তি হলেন আদম আলাইহিস সালাম।" কথাটি তিন বার বললেন। [তারপর তিনি বললেন]
لَمَّا خَلَقَ اللهُ آدَمَ وَمَسَحَ ظَهْرَهُ فَأَخْرَجَ مِنْهُ مَا هُوَ مِنْ ذَرَارِي إِلَى يَوْمِ الْقِيَامَةِ فَجَعَلَ يَعْرِضُ ذُرِّيَّتَهُ عَلَيْهِ فَرَأَى فِيْهِمْ رَجُلًا يَزْهَرُ فَقَالَ أَيْ رَبِّ مَنْ هَذَا قَالَ هَذَا إِبْنُكَ دَاوُدُ قَالَ أَيْ رَبِّ كَمْ عُمْرُهُ قَالَ سِتَّوْنَ عَامًا قَالَ رَبِّ زِدْ فِي عُمْرِهِ قَالَ لَا إِلَّا أَنْ أَزِيدَهُ مِنْ عُمْرِكَ وَكَانَ عُمْرُ آدَمَ أَلْفَ عَامٍ فَزَادَهُ أَرْبَعِينَ عَامًا فَكَتَبَ اللهُ عَلَيْهِ بِذَلِكَ كِتَابًا وَأَشْهَدَ عَلَيْهِ الْمَلَائِكَةَ فَلَمَّا احْتَضَرَ آدَمُ أَتَتْهُ الْمَلَائِكَةُ لِقَبْضِهِ قَالَ إِنَّهُ بَقِيَ مِنْ عُمْرِي أَرْبُوْعَنَ عَامًا فَقِيلَ لَهُ إِنَّكَ قَدْ وَهَبْتَهَا لِإِبْنِكَ دَاوُدَ قَالَ مَا فَعَلْتُ وَ أَبْرَزَ اللهُ عَزَّ وَجَلَّ عَلَيْهِ الْكِتَابَ وَشَهِدَتْ عَلَيْهِ الْمَلَائِكَةُ فَأَتَمَّهَا لِدَاوُدَ مِائَةَ سَنَةٍ وَأَتَمَّهَا لِآدَمَ عُمْرَهُ أَلْفَ سَنَةٍ
"আল্লাহ আদম (আলাইহিস সালাম)-কে সৃষ্টি করার পর তাঁর পৃষ্ঠদেশ স্পর্শ করে তাঁর সন্তানদেরকে বের করে আনেন-যারা কিয়ামত পর্যন্ত দুনিয়ায় আসবে। আল্লাহ আদম (আলাইহিস সালাম)-এর সামনে তাঁর সন্তানদেরকে তুলে ধরলে তিনি তাদের মধ্যে একজন উজ্জ্বল ব্যক্তিকে দেখতে পান। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, 'হে আমার রব! এটি কে?' আল্লাহ বললেন, 'এটি তোমার ছেলে দাউদ।' তিনি জানতে চাইলেন, 'হে আমার রব! তাঁর আয়ুষ্কাল কতো?' আল্লাহ বললেন, 'ষাট বছর।' তিনি বললেন, 'হে আমার রব! তাঁর আয়ুষ্কাল বাড়িয়ে দিন।' আল্লাহ বললেন, 'না। তবে তোমার আয়ুষ্কাল থেকে নিয়ে তাঁকে বাড়িয়ে দিতে পারি।' আদম (আলাইহিস সালাম)-এর আয়ুষ্কাল ছিল এক হাজার বছর। আল্লাহ দাউদ (আলাইহিস সালাম)-এর আয়ুষ্কাল চল্লিশ বছর বাড়িয়ে দিয়ে বিষয়টি লিপিবদ্ধ করেন এবং এর উপর ফেরেশতাদের সাক্ষী রাখেন।
আদম (আলাইহিস সালাম) মৃত্যুর উপকণ্ঠে উপনীত হলে ফেরেশতারা তাঁর প্রাণ নিতে আসেন। তিনি বললেন, 'আমার আয়ুষ্কাল এখনো চল্লিশ বছর অবশিষ্ট আছে।' তাঁকে বলা হলো, 'আপনি তো আপনার ছেলে [দাউদ]-কে তা দিয়ে দিয়েছেন।' তখন আল্লাহ তাঁর সামনে লিখিত প্রমাণ তুলে ধরেন, আর ফেরেশতারা এ বিষয়ে সাক্ষ্যদান করে। পরিশেষে দাউদ (আলাইহিস সালাম)-এর আয়ুষ্কাল এক শ বছর পূর্ণ করা হয় এবং আদম (আলাইহিস সালাম)-এর আয়ুষ্কাল [দাউদ (আলাইহিস সালাম)-কে প্রদত্ত চল্লিশ বছর সহ] এক হাজার বছর পূর্ণ করা হয়।"

📘 রাসুলের চোখে দুনিয়া > 📄 নূহ (আলাইহিস সালাম) ও দুনিয়া

📄 নূহ (আলাইহিস সালাম) ও দুনিয়া


তিন শ বছরের কান্না
[২৫৩] ওহাইব ইবনুল ওয়ারাদ খাদরামি (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'আল্লাহ তাআলা নূহ (আলাইহিস সালাম)-কে তাঁর পুত্রের ব্যাপারে তিরস্কার করে ওহি নাযিল করে বললেন- إِنِّي أَعِظُكَ أَنْ تَكُوْنَ مِنَ الْجَجَاهِلِينَ 10 উপদেশ দিচ্ছি, তুমি যেন মূর্খদের অন্তর্ভুক্ত না হও।"-(সূরা হূদ ১১:৪৬) [এই অনুশোচনায়] নূহ (আলাইহিস সালাম) তিন শ বছর কেঁদেছিলেন। আর এ কান্নার ফলে তাঁর দু চোখের নিচে পানির নালার ন্যায় দাগ পড়ে যায়।'
অত্যাচারের শিকার হয়েও জাতির জন্য ক্ষমা প্রার্থনা
[২৫৪] উবাইদ ইবনু উমাইর (রহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'নূহ (আলাইহিস সালাম)-এর জাতির লোকেরা তাঁকে মেরে অজ্ঞান করে ফেলতো। জ্ঞান ফিরে আসলে তিনি বলতেন, اللَّهُمَّ اغْفِرْ لِقَوْمِي لِأَنَّهُمْ لَا يَعْلَمُوْنَ হে আল্লাহ! আমার জাতিকে ক্ষমা করে দাও, কারণ তারা অজ্ঞ।"'
সর্বাবস্থায় আল্লাহ তাআলার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ
[২৫৫] মুহাম্মদ ইবনু কাব কুরাযি (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'নূহ (আলাইহিস সালাম) খাওয়া শেষে বলতেন, আল-হামদু লিল্লাহ (সকল প্রশংসা আল্লাহর), পান শেষে বলতেন-আল-হামদু লিল্লাহ, পোশাক পরিধান করে বলতেন-আল-হামদু লিল্লাহ, এবং বাহনে আরোহণ করে বলতেন-আল-হামদু লিল্লাহ। তাই আল্লাহ তাআলা তাঁকে ‘عَبْدًا شَكُورًا কৃতজ্ঞ বান্দা' নামে অভিহিত করেছেন।' [দ্রষ্টব্য:
সূরা বানী ইসরাঈল ১৭:১ ছেলের প্রতি উপদেশ
[২৫৬] আতা ইবনু ইয়াসার (রহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,
قَالَ نُوْحُ عَلَيْهِ السَّلَامُ لِأَبْنِهِ يَا بُنَيَّ إِنِّي مُوْصِيكَ وَصِيَّةً وَقَاصِرٌ بِهَا عَلَيْكَ حَتَّى لَا تَنْسَاهَا أُوْصِيكَ بِاثْنَتَيْنِ وَأَنْهَاكَ عَنْ اثْنَتَيْنِ فَأَمَّا اللَّتَانِ أُوْصِيْكَ بِهِمَا فَإِنِّي رَأَيْتُهُمَا يُكْثِرَانِ الْوُلُوْجَ عَلَى اللهِ عَزَّ وَجَلَّ وَرَأَيْتُ اللَّهَ عَزَّ وَجَلَّ يَسْتَبْشِرُ بِهِمَا وَصَالِحَ خَلْقِهِ قَوْلُ لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيكَ لَهُ فَإِنَّ السَّمَوَاتِ وَالْأَرْضَ لَوْ كُنَّ حَلَقَةً لَفَصَمَتْهَا وَلَوْ كُنَّ فِي كِفَّةٍ لَرَجَحَتْ بِهِنَّ وَأَمَّا اللَّتَانِ أَنْهَاكَ عَنْهُمَا فَالشَّرْكُ وَالْكِبْرُ فَإِنِ اسْتَطَعْتَ أَنْ تَلْقَى اللهَ عَزَّ وَجَلَّ وَلَيْسَ فِي قَلْبِكَ شَيْءٌ مِّنْ شِرْكٍ وَلَا كِبْرٍ فَافْعَلْ
"নূহ (আলাইহিস সালাম) তাঁর ছেলেকে বললেন, 'ছেলে আমার! আমি তোমাকে একটি উপদেশ দিচ্ছি। এটি তোমার প্রতি আমার বিশেষ উপদেশ; ভুলে যেও না যেন! উপদেশটি হলো দুটি কাজ করার, আর দুটি কাজ না করার। যে দুটি কাজ তোমাকে করতে বলছি তা হলো, তুমি বলবে-'সুবহানাল্লাহি ওয়া বিহামদিহি [আল্লাহ পবিত্র, আর প্রশংসা কেবল তারই]' ও 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা শারীকা লাহু [আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ বা সার্বভৌম নেই; তিনি একক; তাঁর (সার্বভৌম ক্ষমতায়) কারো কোনো অংশ নেই]।' আমি দেখেছি, এ-দুটি বাক্য [তার পাঠকারীকে] আল্লাহ তাআলা'র অধিক কাছাকাছি নিয়ে যায়। আমি [আরো] দেখেছি যে, এ বাক্য দুটিতে আল্লাহ তাআলা ও তাঁর নেক বান্দারা খুশি হন। 'সুবহানাল্লাহি ওয়া বিহামদিহি' হলো সৃষ্টিকুলের পঠিত বাক্য; এরই বদৌলতে সমগ্র সৃষ্টিজগৎ জীবনোপকরণ লাভ করে। যদি আকাশসমূহ ও পৃথিবীকে একত্রিত করে একটি গোলক বানানো হয়, আর তার উপর বাক্য দুটিকে রাখা হয়, তাহলে [বাক্যদুটির ভারে] গোলকটিতে ফাটল সৃষ্টি হবে। আকাশ-পৃথিবীর গোলককে নিক্তির এক পাল্লায়, আর এ [বাক্য] গুলোকে অপর পাল্লায় রাখা হলে, বাক্যগুলোর পাল্লা অধিক
ভারী হবে। আর যে দুটি কাজ করতে আমি তোমাকে নিষেধ করছি তা হলো— শির্ক ও অহঙ্কার। আল্লাহ তাআলা'র সাথে এমনভাবে সাক্ষাৎ করার জন্য চেষ্টা করো, যেন তোমার অন্তরে বিন্দুমাত্র শির্ক ও অহঙ্কার না থাকে।"
অহঙ্কার কী?
[২৬৭] আতা ইবনু ইয়াসার (রহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, “أَوْضَى نُوْحُ عَلَيْهِ السَّلَامُ إِبْنَهُ (আলাইহিস সালাম) তাঁর ছেলেকে উপদেশ দিয়েছিলেন।” অতঃপর তিনি পূর্বোক্ত হাদীসে বর্ণিত কথাগুলো উল্লেখ করে বলেন,
وَأَمَّا اللَّتَانِ أَنْهَاكَ عَنْهُمَا فَالْكِبْرُ وَالشَّرْكُ
"আর যে দুটি কাজ করতে আমি তোমাকে নিষেধ করছি তা হলো— অহঙ্কার ও শির্ক।” আবদুল্লাহ ইবনু উমার (রদিয়াল্লাহু আনহুমা) জিজ্ঞাসা করলেন, 'হে আল্লাহ'র রাসূল! আমি যদি সুন্দর জামা গায়ে দিই, তাহলে কি তা অহঙ্কারের অন্তর্ভুক্ত হবে?' নবি (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, “لَا إِنَّ اللهَ جَمِيلٌ يُحِبُّ الْجَمَالَ না। আল্লাহ সুন্দর, তিনি সৌন্দর্য পছন্দ করেন।” তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, 'তাহলে অহঙ্কারের মানে কি উৎকৃষ্ট বাহনে আরোহণ করা?' তিনি বললেন, "¹ না।” তিনি আবার জিজ্ঞাসা করলেন, 'তাহলে আমার কিছু সহচর থাকবে যারা আমার অনুসরণ করবে আর আমি তাদের খাবারের সংস্থান করে দিবো—এটি কি এটি অহঙ্কারের অন্তর্ভুক্ত?' নবি (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, "¹ না।” পরিশেষে তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, 'হে আল্লাহ'র রাসূল! তাহলে অহঙ্কার কিসে?' নবি (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, “أَنْ تُسَفَهَ الْحَقَّ وَتَغْمَصَ ]অহঙ্কার হলো] ইসলামকে অবজ্ঞা ও অবমূল্যায়ন করা।"'
আরো দুটি উপদেশ
[২৫৮] মূসা ইবনু আলি ইবনি রবাহ (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'আমি আমার পিতাকে বলতে শুনেছি, নূহ (আলাইহিস সালাম) তাঁর পুত্র সাম-কে বলেছেন,
يَا بُنَيَّ لَا تَدْخُلَنَّ الْقَبْرَ وَفِي قَلْبِكَ مِثْقَالُ ذَرَّةٍ مِنَ الْكِبْرِ فَإِنَّ الْكِبْرِيَاءَ رِدَاءُ
اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ فَمَنْ يُنَازِعُ اللهَ رِدَاءَهُ يَغْضَبُ عَلَيْهِ وَيَا بُنَيَّ لَا تَدْخُلِ الْقَبْرَ وَفِي قَلْبِكَ مِثْقَالُ ذَرَّةٍ مِنَ الْقَنَطِ فَإِنَّهُ لَا يَقْنَطُ مِنْ رَحْمَةِ اللَّهِ إِلَّا ضَالُّ
"ছেলে আমার! অন্তরে বিন্দুমাত্র অহঙ্কার নিয়ে কবরে যেও না; কারণ অহঙ্কার হলো আল্লাহ'র চাদর। যে আল্লাহ'র চাদর নিয়ে টানাটানি করে, আল্লাহ তার উপর অভিসম্পাত বর্ষণ করেন। আমার প্রিয় ছেলে! অন্তরে বিন্দুমাত্র হতাশা নিয়েও কবরে যেও না; কারণ কেবল পথহারা লোকেরাই আল্লাহ'র করুণা থেকে হতাশ হয়।"'
জাতির জন্য বদ দুআ
[২৫৯] হাসান (রহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, 'নূহ (আলাইহিস সালাম) তাঁর জাতির জন্য বদ-দুআ করেননি, যতোক্ষণ না এ আয়াত নাযিল হয়েছিল-
وَأُوحِيَ إِلَى نُوحٍ أَنَّهُ لَنْ يُؤْمِنَ مِنْ قَوْمِكَ إِلَّا مَنْ قَدْ آمَنَ فَلَا تَبْتَئِسْ بِمَا كَانُوا يَفْعَلُوْنَ
"আর নূহ-এর নিকট এ মর্মে ওহি নাযিল করা হলো-তোমার জাতির মধ্যে যারা ইতোমধ্যে ঈমান এনেছে তাঁদের ব্যতীত আর কেউ ঈমান আনবে না। সুতরাং তাদের কর্মকাণ্ডের জন্য দুঃখ কোরো না।” (সূরা হৃদ ১১:৩৬)। তখন তাঁর জাতির (হিদায়াতের) ব্যাপারে তাঁর আশা কেটে যায় এবং তিনি তাদের জন্য বদ-দুআ করেন।"

📘 রাসুলের চোখে দুনিয়া > 📄 ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম) ও দুনিয়া

📄 ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম) ও দুনিয়া


ফেরেশতাদের আগমন
[২৬০] কাব (রদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, 'ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম) বলেছিলেন,
يَا رَبِّ إِنَّهُ لَيَحْزُنُنِي أَنْ لَا أَرَى أَحَدًا فِي الْأَرْضِ يَعْبُدُكَ غَيْرِي
"হে আমার রব! আমি এ জন্য চিন্তিত যে, আমি আমাকে ছাড়া দুনিয়াতে অন্য কাউকে তোমার দাসত্ব করতে দেখছি না!" ফলে আল্লাহ তাআলা কয়েক জন ফেরেশতা পাঠালেন-যারা তাঁর সাথে সালাত আদায় করতো।'
জাহান্নামের কথা স্মরণ হলেই তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেলতেন
[২৬১] আবদুল্লাহ ইবনু রবাহ (রহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, 'আল্লাহ তাআলা'র ব্যাখ্যা “إِنَّ إِبْرَاهِيمَ لَحَلِيمٌ أَوَّاهُ مُنِيبٌ অনুশোচনাকারী ও [রবের দিকে] প্রত্যাবর্তনকারী এক ব্যক্তি।” (সূরা আত-তাওবা ৯:১১৪)-এর ব্যাখ্যায় কাব (রদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, 'জাহান্নামের কথা স্মরণ হলেই ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম) বলতেন, “أَوَّاءٌ أَوَّاءٌ مِنَ النَّارِ হায় জাহান্নাম! হায় জাহান্নাম।"'
মৃত্যুযন্ত্রণার তীব্রতা
[২৬২] ইবnu আবী মুলাইকা (রহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'ইন্তেকালের পর ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম) আল্লাহ তাআলা'র সাথে সাক্ষাৎ করেন। তখন তাঁকে বলা হলো—“يَا إِبْرَاهِيمُ كَيْفَ وَجَدْتَ الْمَوْتَ؟ ইবরাহীম! মৃত্যুর ব্যাপারে তোমার অভিজ্ঞতা কী?” তিনি বললেন, “يَا رَبِّ وَجَدْتُ نَفْسِي تُنْزَعُ بِالْبَلَاءِ
আমার বব! আমার তো মনে হলো, আমার আত্মাকে অনেক কষ্ট দিয়ে টেনে এব করা হচ্ছে।" এঁকে বলা হলো "عَلَيْكَ هَوَ فَقَدْ هُوَ نُوْا আমি তো তোমার মৃত্যু যন্ত্রণা অনেক সহজ করে দিয়েছিলাম!"
ক্ষুধার্ত সিংহের সালাম
[২৬৩] আবু উসমান (রহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম)-এর নিকট দুটি ক্ষুধার্ত সিংহ পাঠানো হয়েছিল। সিংহ দুটি এসে তাঁকে লেহন করে ও তাঁর সামনে মাথা ঝুঁকিয়ে দেয়।'
তাঁর জন্য আগুনকে শীতল ও শান্তিদায়ক বানিয়ে দেওয়া হয়েছিল
[২৬৪] আবদুল্লাহ ইবনু ফুলফুল (রহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, 'আল্লাহ তাআলা'র বক্তব্য
يَا نَارُ كُوْنِي بَرْدًا وَسَلَامًا عَلَى إِبْرَاهِيمَ
"হে আগুন! ইবরাহীমের জন্য ঠান্ডা ও শান্তিদায়ক হয়ে যাও।” (সূরা আল-আম্বিয়া ২১:৬৯)-এর ব্যাখ্যায় আলি (আলাইহিস সালাম) বলেন, 'শান্তিদায়ক' না বললে, ঠান্ডার প্রভাবে ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম) মারা যেতেন।'
কিয়ামতের দিন সর্বপ্রথম তাঁকে সুতি বস্ত্র পরানো হবে
[২৬৫] 'আলি (আলাইহিস সালাম) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'কিয়ামতের দিন সর্বপ্রথম ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম)-কে একখণ্ড সুতি বস্ত্র পরানো হবে; তারপর নবি (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে একটি রেশমী হুল্লা পরানো হবে। আর [সেদিন] তিনি থাকবেন আরশের ডানপাশে।'
আগুনে নিক্ষিপ্ত হয়েও তিনি কোনো সৃষ্টজীবের কাছে সাহায্য চাননি
[২৬৬] বাকর (রদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম)-কে আগুনে নিক্ষেপ করা হলে সৃষ্টিকুল তাদের রবকে বললো, 'হে আমার রব! তোমার একান্ত বন্ধুকে আগুনে নিক্ষেপ করা হচ্ছে; আমাদেরকে অনুমতি দাও-আমরা তার আগুন নিভিয়ে দিবো।' আল্লাহ
তাআলা বললেন,
هُوَ خَلِيلٌ لَيْسَ فِي الْأَرْضِ خَلِيلٌ غَيْرُهُ وَأَنَا رَبُّهُ لَيْسَ لَهُ رَبُّ غَيْرِي فَإِنِ اسْتَغَاثَ بِكُمْ فَأَغِيثُوهُ وَإِلَّا فَدَعُوهُ "সে আমার একান্ত বন্ধু; পৃথিবীতে সে ব্যতীত [আমার] অন্য কোনো একান্ত বন্ধু নেই। আমি তাঁর রব; আমি ব্যতীত তাঁর কোনো রব নেই। সে তোমাদের নিকট সাহায্য চাইলে, তাঁকে সাহায্য করো; অন্যথায় তাঁকে তাঁর অবস্থায় ছেড়ে দাও।" তারপর বৃষ্টির দায়িত্বে নিয়োজিত ফেরেশতা এসে বললো, 'হে আমার রব! তোমার একান্ত বন্ধুকে আগুনে নিক্ষেপ করা হচ্ছে; আমাকে অনুমতি দাও-আমি বৃষ্টি দিয়ে তার আগুন নিভিয়ে দিবো।' আল্লাহ তাআলা বললেন,
هُوَ خَلِيْلِي لَيْسَ فِي الْأَرْضِ خَلِيْلٌ غَيْرُهُ وَأَنَا رَبُّهُ لَيْسَ لَهُ رَبُّ غَيْرِي فَإِنِ اسْتَغَاثَكَ فَأَعِنُهُ وَإِلَّا فَدَعْهُ "সে আমার একান্ত বন্ধু; পৃথিবীতে সে ব্যতীত [আমার] অন্য কোনো একান্ত বন্ধু নেই। আমি তাঁর রব; আমি ব্যতীত তাঁর কোনো রব নেই। সে তোমার নিকট সাহায্য চাইলে, তাঁকে সাহায্য করো; অন্যথায় তাঁকে তাঁর অবস্থায় ছেড়ে দাও।" অতঃপর আগুনে নিক্ষিপ্ত হয়ে ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম) তাঁর রবের নিকট একটি দুআ করেন-যা বর্ণনাকারী আবূ হিলাল ভুলে গিয়েছিলেন।⁴ দুআর জবাবে আল্লাহ তাআলা বললেন, “يَا نَارُ كُوْنِي بَرْدًا وَسَلَامًا عَلَى إِبْرَاهِيمَ হে আগুন! ইবরাহীমের জন্য ঠান্ডা ও শান্তিদায়ক হয়ে যাও।” (সূরা আল-আম্বিয়া ২১:৬৯)। ফলে সেদিন প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের আগুন এতোটা ঠান্ডা হয়ে গিয়েছিলো যে তা দিয়ে ভেড়ার পায়ের নলিও সিদ্ধ করা যায়নি।'
সহজে রাস্তা অতিক্রমণ
[২৬৭] সাঈদ ইবনু জুবাইর (রহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,
[৪] তবে ইবনু কাসীর তাঁর আল-বিদায়াহ ওয়ান-নিহায়াহ গ্রন্থে আবু হুরায়রা (রদিয়াল্লাহু আনহু)-এর উদ্ধৃতি দিয়ে সেই দুআটি উল্লেখ করেছেন। দুআর ভাষা ছিল এ রকম: اللَّهُمَّ إِنَّكَ فِي السَّمَاءِ وَاحِدٌ وَأَنَا فِي الْأَرْضِ وَاحِدٌ أَعْبُدُكَ হে আল্লাহ! আসমানে তুমি একক সত্তা; আর যমীনে আমি একক ব্যক্তি, আমি কেবল তোমারই গোলামি করি!" [অনুবাদক]
জবাই করার দৃশ্য দেখানো হলে তিনি তাঁকে নিয়ে বাড়ি থেকে জবাইস্থলে যান; দূরত্ব ছিল একমাসের পথ, তবে তাঁরা তা এক সকালের মধ্যেই অতিক্রম করেন। পরে পুত্রকে জবাই হতে দেওয়া হয়নি, বরং তাঁকে ভেড়া জবাই করার নির্দেশ দেওয়া হলো; তিনি তা-ই করলেন। অবশেষে তিনি তাঁর পুত্রকে নিয়ে একসন্ধ্যার মধ্যে বাড়ি ফিরে আসেন; অথচ দূরত্ব ছিল একমাসের পথ। পাহাড়-পর্বত ও উপত্যকা [অতিক্রমণ] তাঁর জন্য সহজ করে দেওয়া হয়েছিলো।'
কাকলাস ছাড়া অন্য সকল প্রাণী তাঁর আগুন নেভাতে চেয়েছিল
[২৬৮] সুমামা (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'আমি আয়িশা (রদিয়াল্লাহু আনহা)- এর গৃহে প্রবেশ করে দেখলাম একটি লাঠি বানিয়ে রাখা হয়েছে। আমি জিজ্ঞাসা করলাম, 'হে উম্মুল মুমিনীন! এ লাঠি দিয়ে আপনি কী করেন?' জবাবে তিনি বললেন, 'কাকলাস মারার জন্য এ লাঠি; কারণ রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমাদেরকে জানিয়েছেন, ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম)-কে যখন আগুনে নিক্ষেপ করা হলো, তখন দুনিয়ার সকল প্রাণী চেয়েছিল আগুন নেভাতে; পক্ষান্তরে কাকলাস গিয়েছিল ফুঁ দিয়ে আগুনের তীব্রতা বাড়াতে। তাই একে মারার জন্য রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমাদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন।'
সৃষ্টিকুলের সর্বোত্তম ব্যক্তি
[২৬৯] আনাস ইবনু মালিক (রদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'এক ব্যক্তি নবি (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে এ বলে সম্বোধন করলো, 'হে সৃষ্টিকুলের সর্বোত্তম ব্যক্তি!' এ কথা শুনে রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মন্তব্য করলেন, “إِبْرَاهِيمُ أَبِي ذَاكَ” এ গুণে গুণান্বিত ব্যক্তি তো আমার পিতা ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম)।"'
টিকাঃ
৫. এ বর্ণনায় একটি তথ্য-বিভ্রাট ঘটেছে। যাকে জবাই করতে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল তিনি ছিলেন ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম) এর বড় ছেলে ইসমাঈল; দ্বিতীয় ছেলে ইসহাক নন। কাকে জবাই করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল-তা অনুধাবন করার জন্য আল্লাহ তাআলার বক্তব্য শুনুন:
رَبِّ هَبْ لِي مِنَ الصَّلِحِينَ ﴿۱۰۰) فَبَشِّرْتُهُ بِغُلَامٍ حَلِيْمٍ (۱۰۱) فَلَمَّا بَلَغَ مَعَهُ السَّعْيَ قَالَ يَبْنَى إِنِّي أَرَى فِي الْمَنَامِ أَنِّي أَذْبَحُكَ فَانْظُرْ مَا ذَا تَرَى قَالَ يَا أَبَتِ افْعَلْ مَا تُؤْمَرُ سَتَجِدُنِي إِنْ شَاءَ اللَّهُ مِنَ الصَّبِرِينَ ﴿٢٠١) فَلَمَّا أَسْلَمَا وَتَلَّهُ لِلْجَبِيْنِ ﴿۳۰۱﴾ وَنَدَيْنُهُ أَنْ يَإِبْرَهِيمُ (٤٠١﴾ قَدْ صَدَّقْتَ الرُّؤْيَا إِنَّا كَذَلِكَ نَجْزِي الْمُحْسِنِينَ ﴿٥٠١) إِنَّ هَذَا لَهُوَ الْبَلَاءُ الْمُبِينُ ﴿٦٠١﴾ وَفَدَيْنَهُ بِذِبْحٍ عَظِيمٍ (۷۰۱) وَتَرَكْنَا عَلَيْهِ فِي الآخِرِينَ ﴿۸۰۱﴾ سَلْمٌ عَلَى إِبْرَاهِيمَ ﴿۱۰۱) كَذَلِكَ نَجْزِي الْمُحْسِنِينَ إِنَّهُ مِنْ عِبَادِنَا الْمُؤْمِنِينَ ﴿۱۱۱﴾ وَبَشَّرْتُهُ بِإِسْحَقَ نَبِيًّا مِّنَ الصَّالِحِينَ (۲۱۱) وَبَرَكْنَا عَلَيْهِ وَعَلَى إِسْحَقَ وَمِنْ ذُرِّيَّتِهِمَا مُحْسِنٌ وَظَالِمُ لَنَفْسِهِ مُبِينٌ ﴿۳۱۱)
[ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম) দুআ করলেন] হে আমার রব! আমাকে সু-সন্তান দান করো! ফলে আমি তাঁকে এক ধৈর্যশীল ছেলের সুসংবাদ দিলাম। ছেলেটি যখন তাঁর সাথে চলাফেরা করার বয়সে উপনীত হলো, সে বললো- 'ছেলে আমার! আমি তো স্বপ্নে দেখছি-আমি তোমাকে জবাই করছি; এখন ভেবে দেখো, তোমার কী মত!' সে বললো, 'বাবা! তোমাকে যে কাজের নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে-তুমি তা-ই করো; আল্লাহ চাইলে তুমি আমাকে ধৈর্যশীল পাবে। অতঃপর উভয়ে যখন [আমার নির্দেশের সামনে] আত্মসমর্পণ করলো এবং সে তাঁকে উপুড় করে শোয়ালো, আমি তাঁকে ডাকলাম- 'ইবরাহীম! তুমি তো স্বপ্নকে বাস্তবরূপ দিয়েছো।' এভাবেই আমি সৎকর্মশীল লোকদেরকে প্রতিদান দিয়ে থাকি। সন্দেহ নেই, এটি ছিল একটি স্পষ্ট ও কঠিন পরীক্ষা। আমি তাঁর প্রতিদান দিলাম এক মহান কুরবানির মাধ্যমে; আর তাঁকে পরবর্তী লোকদের মধ্যে স্মরণীয় করে রাখলাম। ইবরাহীমের প্রতি সালাম! এভাবেই আমি সৎকর্মশীল লোকদেরকে প্রতিদান দিয়ে থাকি; সে ছিল আমার এক বিশ্বাসী গোলাম। আমি তাঁকে ইসহাকের সুসংবাদ দিলাম; [সে হবে] নবি-সৎ লোকদের একজন। আমি তাঁকে ও ইসহাককে অনুগ্রহ দিয়েছি; অবশ্য উভয়ের বংশধরের মধ্যে কিছু লোক আছে উন্নত ব্যক্তিত্বের অধিকারী, আর কিছু লোক নিজেদের উপর স্পষ্ট জুলুম করে চলছে।" (সূরা আস-সাফফাত ৩৭:১০০-১১৩)
উপরোক্ত আয়াতসমূহ থেকে প্রতীয়মান হয়, ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম) ছিলেন নিঃসন্তান; তিনি নেক-সন্তানের জন্য আল্লাহ'র নিকট দুআ করেন; এর প্রেক্ষিতে তাঁকে একটি ধৈর্যশীল ছেলে দেওয়া হয়। কিছুদিন পর সেই ছেলেটিকে জবাই করার নির্দেশ দেওয়া হয়। আন্তরিকতার সাথে নির্দেশ পালনের জন্য যা যা করা দরকার-ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম) যখন সবটুকু করে দেখালেন, তখন আল্লাহ খুশি হয়ে ছেলেটিকে জবাই থেকে অব্যাহতি দেন; কারণ তিনি তো স্রেফ এটুকু পরীক্ষা করতে চাচ্ছিলেন, ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম) আল্লাহ'র নির্দেশ পালনে সর্বস্ব ত্যাগ করতে প্রস্তুত কিনা। পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার প্রেক্ষিতে ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম)-কে এসব পুরস্কারে ভূষিত করা হয়: (১) মহান কুরবানির প্রতিদান-যা প্রতিবছর কুরবানির ঈদে কোটি কোটি মানুষ আদায় করে থাকে; (২) পরবর্তী লোকদের মধ্যে স্মরণীয় করে রাখা; এবং (৩) ইসহাক নামক এক পুত্রের সুসংবাদ-যিনি হবেন নবি।
এখানে কয়েকটি বিষয় উল্লেখ্য: প্রথমত, যে ছেলেকে জবাই করার চেষ্টা করা হয়েছিল পুরো বর্ণনায় তাঁর নাম উল্লেখ করা হয়নি। তবে এটুকু সুস্পষ্ট, ছেলেটি ছিল ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম)-এর প্রথম সন্তান। আর ইতিহাসবিদগণ এ বিষয়ে একমত যে ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম)-এর প্রথম সন্তানের নাম ইসমাঈল। দ্বিতীয়ত, জবাইয়ের নির্দেশ পালনের পুরস্কার
হিসেবে আবেক সন্তান ইসহাক এব সুসংবাদ দেওয়া হয়। অতএব, যাকে জবাই করার চেষ্টা করা হয়েছিল সে ছেলে কিছুতেই ইসহাক (আলাইহিস সালাম) হতে পারেন না।
তাছাড়া বাস্তব কর্মপন্থাও প্রমাণ করে, ঘটনাটি ঘটেছে ইসমাঈল (আলাইহিস সালাম) এব ক্ষেত্রে: কারণ কুরআন নাযিলের হাজার বছর আগে থেকেই স্রেফ ইসমাঈল (আলাইহিস সালাম) এর বংশধর আরবরাই তাঁর স্মৃতিচারণের অংশ হিসেবে প্রতিবছর হাজ্জের সময় কৃপবর্ণন করে আসছিলো। পক্ষান্তরে, ঘটনাটি ইসহাক (আলাইহিস সালাম)-এর ক্ষেত্রে ঘটে থাকলে তাঁর বংশধর বনী ইসরাঈলের মধ্যে এরূপ কুরবানির আনুষ্ঠানিকতা থাকতো।
তাহলে হাদীসের কিছু কিছু বর্ণনায় ইসহাক (আলাইহিস সালাম)-এর নাম কেমন করে চলে আসলো? তার উত্তর হলো, ঐতিহাসিক অনেক ঘটনার তথ্য-বিবরণী সংগ্রহ করতে গিয়ে মুসলিম মনীষীদের একটি অংশ ইসরাঈলি/ইয়াহুদি বর্ণনার উপর নির্ভর করেছেন। বলা বাহুলা, ইয়াহুদি পণ্ডিতবর্গ তাওরাত সংরক্ষণের ক্ষেত্রে সততার পরিচয় দিতে ব্যর্থ হয়েছেন। স্বয়ং কুরআন এ বিষয়ে সাক্ষী, তাওরাত ও অন্যান্য আসমানি সহীফা সঙ্কলনের ক্ষেত্রে তারা নানা জালিয়াতির আশ্রয় নিয়েছেন। শত অপরাধ সত্ত্বেও জাহান্নামের আগুন তাদেরকে স্পর্শ করবে না, আর করলেও তা হবে অল্প কয়েক দিনের জন্য; কারণ তারা আল্লাহ'র নেক বান্দাদের সন্তান-এই হলো তাদের আকীদা-বিশ্বাস। তাদের নিকট মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব খোদা-ভীতির উপর নির্ভরশীল নয়, বরং তা নির্ভরশীল পিতৃ-পুরুষদের বংশীয় আভিজাত্যের উপর। ফলে, নিজেদের পূর্ব-পুরুষদের আভিজাত্য প্রমাণ করতে গিয়ে নানা রকমের তথ্য-বিকৃতিতে তারা কোনো কার্পণ্য করেননি। বংশলতিকার দিক দিয়ে আরবরা হলো ইসমাঈল (আলাইহিস সালাম)-এর বংশধর; আর বনী ইসরাঈল হলো ইসহাক (আলাইহিস সালাম)-এর বংশধর। 'আল্লাহ'র নির্দেশে নিজের গলাকে স্বেচ্ছায় ছুরির নিচে পেতে দেয়া'-র এই গৌরবগাথা নিজেদের পিতৃপুরুষের সাথে যুক্ত করা গেলে তাদের বংশীয় আভিজাত্য আরেক দফা বেড়ে যাবে-এই মিথ্যা অহংবোধে আক্রান্ত হয়ে তারা বাইবেলে বর্ণিত উক্ত ঘটনায় ইসমাইল-এর নাম কেটে ইসহাক-এর নাম যুক্ত করে দিয়েছেন।
কুরআনের উক্ত বর্ণনা ছাড়াও খোদ বাইবেলের অপরাপর বাক্য থেকেও তাদের এই জালিয়াতির প্রমাণ পাওয়া যায়। যেমন: ওল্ড টেস্টামেন্টের প্রথম গ্রন্থ 'Genesis / পয়দায়েশ'-এর ২২:১- ১৮ অংশে কুরবানির উক্ত ঘটনা সবিস্তারে আলোচনা করা হয়েছে। সেখানে স্পষ্ট করে ইসহাক (আলাইহিস সালাম)-এর নাম উল্লেখ করা হয়েছে। পয়দায়েশ ২২:২-এ বলা হচ্ছে, 'এখন তোমার পুত্র-একমাত্র পুত্র ইসহাক-কে... কুরবানির জন্য নিয়ে যাও।' এখানে ইসহাক (আলাইহিস সালাম)-কে একমাত্র পুত্র বলা হচ্ছে। অথচ ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম)-এর বয়স যখন ৮৬, তখন তাঁর প্রথম পুত্র ইসমাঈল (আলাইহিস সালাম)-এর জন্ম হয় (দ্রষ্টব্য: পয়দায়েশ ১৬:১৬)। আর ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম)-এর বয়স যখন ১০০, তখন ইসহাক (আলাইহিস সালাম) জন্মগ্রহণ করেন (দ্রষ্টব্য: পয়দায়েশ ২১:৫)। অর্থাৎ, খোদ বাইবেল অনুযায়ী ইসহাক (আলাইহিস সালাম) যখন জন্মগ্রহণ করেন, ততোদিনে ইসমাঈল (আলাইহিস সালাম) বয়স যথারীতি চৌদ্দ। সুতরাং কুরবানির সময় ইসহাক (আলাইহিস সালাম) কিছুতেই ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম)-এর একমাত্র পুত্র হতে পারেন না। বাইবেলে উল্লেখিত 'একমাত্র পুত্র' শব্দগুচ্ছ থেকেও বোঝা যাচ্ছে, এ ঘটনাটি ঘটেছে ইসমাঈল (আলাইহিস সালাম)-এর ক্ষেত্রে; কারণ ইসহাক (আলাইহিস সালাম) এর জন্মের পূর্বে ইসমাঈল (আলাইহিস সালাম) ছিলেন ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম)-এর একমাত্র পুত্র।
পরিশেষে আমাদের আলোচ্য হাদীসের ক্ষেত্রে মনে রাখতে হবে, এ হাদীসের পূর্ণাঙ্গ সনদ (বর্ণনা- পরম্পরা) হলো: আবদুল্লাহ লাইছ ইবনু খালিদ আবু বকর বালখি মুহাম্মদ ইবনু ছাবিত আব্দি মূসা ইবনু আবী বাকর সাঈদ ইবনু জুবাইর। প্রথমত এটি একটি মাকতু' হাদীস-যার
বর্ণনা পরম্পরা তাবিয়ি পর্যন্ত গিয়ে শেষ হয়ে গিয়েছে। উসূলুল হাদীসের নিয়মানুযায়ী, বিশুদ্ধ বর্ণনার পরিপন্থী হলে মাকতু' হাদীস কোনো আইনগত প্রমাণের মর্যাদা লাভ করে না। ইতোমধ্যে উল্লেখ করা হয়েছে যে এর তথ্য কুরআনের বক্তব্যের পরিপন্থী। দ্বিতীয়ত, গ্রন্থটি ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বলের হলেও এর মূল বর্ণনাকারী হলেন তাঁর পুত্র আবদুল্লাহ ইবনু আহমাদ ইবনি হাম্বাল। অথচ তিনি এ হাদীসটি তাঁর পিতার সূত্রে বর্ণনা না করে লাইছ ইবনু খালিদ-এর সূত্রে বর্ণনা করেছেন। সুতরাং এটি আহমাদ ইবনু হাম্বলের বর্ণনা নয়। ইবনু কাসীর তাঁর আল-বিদায়াহ ওয়ান-নিহায়াহ গ্রন্থে (বাইতুল আফকার সংস্করণ, পৃ. ১০৫) আহমাদ ইবনু হাম্বলের মতটি উল্লেখ করেছেন-তাতে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, জবাইয়ের জন্য যাকে নেওয়া হয়েছিল তিনি ছিলেন ইসমাঈল (আলাইহিস সালাম)। অনুবাদক।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00