📘 রাসূলে আরাবি ﷺ > 📄 সাহাবিদের হতবিহ্বলতা

📄 সাহাবিদের হতবিহ্বলতা


নবিজি -এর মৃত্যুর খবর দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। কলিজা ফাটা এই সংবাদ শোনামাত্র সাহাবিদের পৃথিবী অন্ধকার হয়ে আসতে থাকে। পাগল হওয়ার দশা সকলের। সেদিন তাদের অবস্থা এমন দাঁড়িয়ে ছিল যে, মনে হয় তারা নিজেদের অনুভূতি-শক্তি হারিয়ে ফেলবেন। মদীনায় নবিজি -এর আগমনের দিনটি ছিল সবচেয়ে উজ্জ্বল। আর সবচেয়ে অন্ধকারতম দিনটি ছিল একাদশ হিজরির ১২ রবীউল আউয়াল—নবিজি -এর মৃত্যুর দিন। ওদিকে মাসজিদে নববিতে উমর (রদিয়াল্লাহু আনহু) সবাইকে বলছিলেন যে, আল্লাহ তাআলা মুনাফিকদের পুরোপুরি ধ্বংস করার আগে নবি এ দুনিয়া ত্যাগ করতে পারেন না। নবিজি মারা গেছেন—এ কথা যে-ই বলবে, তাকেই হত্যা করার হুমকি দেন তিনি। আর সে সময় অন্যান্য সাহাবিরা উমর (রদিয়াল্লাহু আনহু)-এর চারপাশে অনুভূতিহীন, দুঃখের নীরব ছবি হয়ে বসে থাকে।

টিকাঃ
[৫৭২] তিরমিযি, ৩৬১৮।
[৫৭৩] ইবনু হিশাম, আস-সীরাহ, ২/৬৫৫।

📘 রাসূলে আরাবি ﷺ > 📄 আবূ বকর (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর প্রত্যয়ী অবস্থান

📄 আবূ বকর (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর প্রত্যয়ী অবস্থান


সেই সোমবার সকালে আবূ বকর (রদিয়াল্লাহু আনহু) নবিজি -এর স্বাস্থ্যের একটু উন্নতি দেখে যান। তিনি সেরে উঠবেন, এই আশা মনে নিয়ে ঘরে ফিরে আসেন আবূ বকর। কিন্তু ঘরে গিয়েই শুনতে পান দুঃসংবাদটি। সাথে সাথে ঘোড়ায় চড়ে ছুটে আসেন মাসজিদে নববিতে। কাউকে কিছু না বলে সোজা চলে যান রাসূল -এর ঘরে। শুয়ে আছেন নবিজি, গায়ে জড়ানো একটি ইয়েমেনি কাপড়। মুখ থেকে কাপড়টি সরিয়ে নবিজি -কে চুমু দেন আবূ বকর (রদিয়াল্লাহু আনহু) এবং বলেন, “আমার পিতা-মাতা আপনার প্রতি কুরবান হোক। আল্লাহ আপনার ভাগ্যে যে মৃত্যু রেখেছিলেন, তারই স্বাদ পেয়েছেন আপনি। এর পর আর কোনও মৃত্যু নেই।”
বিহ্বল মানুষগুলোর সংবিৎ ফিরিয়ে আনতে হবে। তাই আবূ বকর (রদিয়াল্লাহু আনহু) বের হয়ে আসেন মাসজিদে। উমর তখনো সেখানে দাঁড়িয়ে ক্রোধান্বিত হয়ে মৃত্যুসংবাদ অস্বীকার করে চলেছেন। আবূ বকর (রদিয়াল্লাহু আনহু) বললেন, “উমর বসো।” আবূ বকরের অনুরোধ সত্ত্বেও বসলেন না তিনি। আবূ বকর মিম্বরের নিকট গিয়ে আল্লাহর প্রশংসা ও স্তুতি বর্ণনা করলেন। সামনে থাকা দুঃখে কাতর বিমর্ষ মুখগুলোকে উদ্দেশ্য করে বললেন,
“শোনো সবাই! তোমাদের মধ্যে যারা মুহাম্মাদের ইবাদাত করে, তাদের জেনে রাখা উচিত-মুহাম্মাদ মারা গিয়েছেন। আর যারা আল্লাহ তাআলার ইবাদাত করে, তাদের জেনে রাখা উচিত-আল্লাহ চিরঞ্জীব, অমরণশীল। আল্লাহ তাআলা বলেছেন,
'মুহাম্মাদ তো কেবল একজন রাসূল। তাঁর আগেও অনেক রাসূল গত হয়েছেন। তিনিও যদি মারা যান বা নিহত হন, তাহলে কি তোমরা কুফরে ফিরে যাবে? বস্তুত যারা ঈমান ত্যাগ করে, তারা আল্লাহর কোনও ক্ষতি করতে পারে না। নিশ্চয়ই আল্লাহ কৃতজ্ঞদের পুরস্কৃত করেন।”
আবূ বকর (রদিয়াল্লাহু আনহু) সেদিন বলার আগে এ আয়াতটি নিয়ে এভাবে কেউ ভাবেনি। নবি সত্যি একদিন মারা যাবেন, এই চিন্তাও আসেনি কারও মাথায়। আব্বাস (রদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, “আল্লাহর কসম! এই রকম মনে হচ্ছিল যে, লোকজন পূর্বে কখনও এই আয়াত সম্পর্কে জানতই না, যে আল্লাহ তা নাযিল করেছেন। যখন আবূ বকর এই আয়াতটি তিলাওয়াত করলেন তখন সমস্ত মানুষ তাঁর থেকে আয়াতটি গ্রহণ করল এবং শান্ত হলো। এরপর আমি যাকেই শুনি দেখি যে, সে এই আয়াতটিই তিলাওয়াত করছে।"
সেদিন সবচেয়ে অস্থির ছিলেন উমর (রদিয়াল্লাহু আনহু)। পরে তিনি নিজের প্রতিক্রিয়ার বর্ণনা দেন এভাবে,
“আল্লাহর কসম! যখনই আমি আবূ বকরকে এই আয়াতটি তিলাওয়াত করতে শুনি বুঝতে পারি, সংবাদটি সত্য। তারপর আমি এমনভাবে ভেঙে পড়লাম যে, আমার পা আর আমাকে বহন করতে পারছে না। ফলে আমি মাটিতে পড়ে গেলাম আর উপলব্ধি করলাম যে, আসলেই আল্লাহর রাসূল মারা গিয়েছেন।”

টিকাঃ
[৫৭৪] সূরা আ-ল ইমরান, ৩: ১৪৪।
[৫৭৫] বুখারি, ৪৪৪৫৪।

📘 রাসূলে আরাবি ﷺ > 📄 খলীফাতুল মুসলিমীন নির্বাচন

📄 খলীফাতুল মুসলিমীন নির্বাচন


নবি -এর মৃত্যুর পরপরই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল একজন খলীফা নির্বাচন করা। যিনি জনসাধারণ এবং রাষ্ট্রীয় কাজে নবি -এর স্থলাভিষিক্ত হবেন। আলি (রদিয়াল্লাহু আনহু) মনে করেন যে, তিনিই এ ক্ষেত্রে অগ্রগণ্য। নবিজি -এর মিশনের শুরু থেকেই তিনি তাঁর খুব কাছের মানুষ এবং নিকটাত্মীয়। তাই আলি ও যুবাইর (রদিয়াল্লাহু আনহুমা)-সহ বানু হাশিমের আরও অনেকে গিয়ে ফাতিমার বাড়িতে জড়ো হয়। আনসাররা সমবেত হন আরেক জায়গায়। তারা চাইছিলেন, পরবর্তী নেতা তাদের মাঝ থেকেই আসুক। বাকি মুহাজিররা আবূ বকর ও উমর (রদিয়াল্লাহু আনহুমা)-এর সাথে সাথেই রয়েছে। আবূ বকর ও উমর দু'জনে আনসারদের নিকট উপস্থিত হলেন। আবূ উবাইদাসহ অন্যান্য মুহাজিরও উপস্থিত হন সেখানে। আনসাররা তাদের শ্রেষ্ঠত্ব ও উপযুক্ততা তুলে ধরেন। এভাবে অনেক আলাপ-আলোচনা ও কথা কাটাকাটির পর আবূ বকর (রদিয়াল্লাহু আনহু) একটি গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য রাখেন, “আপনারা যে সমস্ত শ্রেষ্ঠত্ব ও যোগ্যতার কথা উল্লেখ করেছেন, সত্যিকারার্থেই আপনারা তার উপযুক্ত। কিন্তু আরবরা প্রশাসনিক ব্যাপারে কুরাইশদের অপ্রতিদ্বন্দ্বী বলে জানে। কুরাইশের বাইরের কোনও শাসককে তারা মেনে নেবে না। বংশ-পরিবারের দিক দিয়েও কুরাইশরা অন্যদের চেয়ে সেরা।”
তারপর উমর এবং আবু উবাইদার হাত ধরে আবূ বকর (রদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, “আমি আপনাদের জন্য এই দু'জনের মধ্যে যেকোনও একজনকে খলীফা হিসেবে পছন্দ করছি।"
একজন আনসার বলেন, “আমাদের মধ্য থেকে একজন, আর আপনাদের মধ্য থেকে একজন আমির হলে কেমন হয়?” আবারও শুরু হতে থাকে শোরগোল। উমর (রদিয়াল্লাহু আনহু) হঠাৎ করে আবূ বকরকে হাত বাড়িয়ে দিতে বলেন। আবু বকর (রদিয়াল্লাহু আনহু) হাত বাড়িয়ে দেন। অতঃপর উমর, মুহাজির এবং আনসার সবাই একে একে তাঁর হাতে হাত রেখে বাইআত গ্রহণ করেন। অবশেষে আবূ বকর (রদিয়াল্লাহু আনহু)-ই নবিজির খলীফা হিসেবে নির্বাচিত হন।

📘 রাসূলে আরাবি ﷺ > 📄 দাফন-কাফন

📄 দাফন-কাফন


মঙ্গলবার রাসূল -এর পবিত্র দেহ কাপড় পরিহিত অবস্থাতেই ধুয়ে দেন আব্বাস, আলি, আব্বাসের দুই ছেলে ফাদল ও কুসাম, নবিজি -এর মুক্ত করা দাস শুকরান, উসামা ইবনু যাইদ এবং আওস ইবনু খাওলা (রদিয়াল্লাহু আনহুম)। আব্বাস ও তার ছেলেরা নবিজির দেহ এপাশ-ওপাশ করান। উসামা ও শুকরান পানি ঢালেন। আলি হাত দিয়ে শরীর ধৌত করেন। আর আওস তুলে ধরে রাখতে সাহায্য করেন নবিজির দেহ। পানি ও বরইপাতা দিয়ে তিনবার ধোয়া হয় নবিজির শরীর। কুবায় সা'দ ইবনু খাইসামার একটি কুয়া ছিল 'গারস' নামে। সেখান থেকেই আনা হয় পানি। জীবদ্দশায় নবি এখান থেকে পানি পান করতেন।
গোসলের পর তিনটি ইয়েমেনি সুতি কাপড় দিয়ে তাঁর পবিত্র দেহে কাফন পরানো হয়। তাতে জামা এবং পাগড়ি ছিল না। চাদরে তাঁর শরীর মুড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। আয়িশা (রদিয়াল্লাহু আনহা)-এর ঘরে ঠিক যে জায়গায় নবি ইন্তিকাল করেন, সেখানেই কবর খোঁড়েন আবূ তালহা (রদিয়াল্লাহু আনহু)। কবরটি ছিল লাহদ, যার পাশে কুলুঙ্গির মতো থাকে। নবিজি -কে খাটিয়ায় শোয়ানো হয়। সাহাবিরা দশজন দশজন করে এসে ইমাম ছাড়া একাকী সালাতে জানাযা আদায় করেন। প্রথমে নবিজির পরিবারের সদস্যরা, তারপর মুহাজিরগণ, তারপর আনসারগণ, তারপর নারী ও শিশুরা। মঙ্গলবার সারাদিন এবং বুধবারের রাতের বেশির ভাগ সময় জুড়ে চলতে থাকে জানাযার সালাত আদায়। বুধবার গভীর রাতে সমাধিস্থ হন আল্লাহর রাসূল।

টিকাঃ
[৫৭৬] ইবনু মাজাহ, ১৬২৮।
[৫৭৭] ইবনু সা'দ, তবাকাতুল কুবরা, ২/২৭৭-২৮৮।
[৫৭৮] বুখারি, ১২৬৪; মুসলিম, ৯৪১।
[৫৭৯] মালিক, আল-মুওয়াত্তা, ১/২৩১; ইবনু সা'দ, ২/২৮৮-২৯২।
[৫৮০] আহমাদ, আল-মুসনাদ, ৬/৬২, ২৭৪।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00