📄 রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর জীবনের শেষ দিন
সোমবার। আবূ বকর (রদিয়াল্লাহু আনহু) ফজরের সালাতের ইমামতি করছেন। রাসূলুল্লাহ আয়িশা (রদিয়াল্লাহু আনহা)-এর ঘরের ঘরের পর্দা তুলে সেদিকে তাকান। দেখতে পান সালাতরত সাহাবিদের। মুচকি হাসি ফুটে ওঠে মুখে। নবিজি এসে ইমামতি করবেন ভেবে আবূ বকর একটু পিছিয়ে আসেন। সেদিন নবিজি -এর চেহারায় যে খুশির ছটা দেখা যায়, তা দেখে সাহাবিরাও এত খুশি হয়েছিলেন যে, প্রায় সালাত ছেড়ে দিয়েই তাঁর নিকট চলে আসবেন। কিন্তু নবি হাতের ইশারায় তাদের আগে সালাত সম্পন্ন করে নিতে বলেন। এরপর তিনি ঘরের ভেতর চলে যান এবং পর্দা নামিয়ে দেন।
সেদিনই কিংবা সে সপ্তাহতেই নবি ফাতিমা (রদিয়াল্লাহু আনহা)-কে ডাকিয়ে আনেন। কানে কানে কিছু একটা বলেন তাকে। ফলে কান্নায় ভেঙে পড়েন ফাতিমা (রদিয়াল্লাহু আনহা)। একটু পর মেয়ের কানে নবি আরও কিছু একটা বলেন। এতে ফাতিমা এবার হেসে ওঠেন। আয়িশা (রদিয়াল্লাহু আনহা) সেদিন ফাতিমাকে ডেকে জানতে চেয়েছিলেন নবিজি কী বললেন। কিন্তু ফাতিমা বলেন যে, রাসূল সেটা গোপন রাখতে বলেছেন। নবিজি মারা যাওয়ার পর ফাতিমা (রদিয়াল্লাহু আনহা) প্রকাশ করেন কথাটি। প্রথমবার বলেছিলেন যে, এই রোগেই তাঁর মৃত্যু হবে। তা শুনে ফাতিমা (রদিয়াল্লাহু আনহা) কান্না করেন। পরেরবার বলেন যে, পরিবার-পরিজনদের মাঝে ফাতিমাই প্রথমে নবিজি -এর সাথে মিলিত হবে। ফলে তিনি হেসেছিলেন এই কথাটি শুনে। জান্নাতের নারীদের নেত্রী (সাইয়্যিদা) হবেন ফাতিমা (রদিয়াল্লাহু আনহা) এটিও বলে গেছেন রাসূল। মৃত্যুশয্যায় নবিজির ব্যথা দেখে ফাতিমা (রদিয়াল্লাহু আনহা) কেঁদে বললেন, "আহ! বাবার কী কষ্ট!” নবি উত্তর দেন, “এই দিনের পর তোমার বাবার আর কোনও কষ্ট হবে না!”
তারপর নবি ফাতিমার দুই ছেলে হাসান ও হুসাইন (রদিয়াল্লাহু আনহুমা)কে ডাকিয়ে আনেন। কাছে নিয়ে চুমু দেন তাদের এবং পাশে থাকা স্ত্রীদেরও কিছু নসীহত ও উপদেশ দেন। ব্যথা আস্তে আস্তে বাড়ছে। খাইবারে তাঁকে যে বিষ খাওয়ানো হয়েছে তার বিষক্রিয়া প্রকটভাবে প্রকাশ পেতে শুরু করেছে। নবি যন্ত্রণায় একটি চাদর দিয়ে চেহারা ঢেকে রাখেন। শুধু শ্বাস নেওয়ার প্রয়োজনে তা সরান। এই অবস্থাতেও তিনি বলেন, “ইয়াহুদি-খ্রিষ্টানদের ওপর আল্লাহর লা'নত! তারা তাদের নবিদের কবরসমূহকে ইবাদাতখানা বানিয়েছে।” আরও বলেন, “আরবভূমিতে দুইটি দ্বীন বাকি রাখা হবে না।” সবশেষে বারকয়েক বলেন, “সালাত! সালাত! এবং তোমাদের দাস ও অধীনস্থরা।”
টিকাঃ
[৫৬৪] বুখারি, ৬৮০।
[৫৬৫] বুখারি, ৩৬২৩-৩৬২৬১
[৫৬৬] বুখারি, ৪৪৬২।
[৫৬৭] বুখারি, ৪৪৬৮।
[৫৬৮] বাইহাকি, আস-সুনানুল কুবরা, ৬/১৩৬।
[৫৬৯] ইবনু মাজাহ, ১৬২৫, আহমাদ, আল-মুসনাদ, ৬/২৯০।
📄 মহানবির মহাপ্রয়াণ
নবিজি -এর শক্তি নিঃশেষ হয়ে আসে। বুক ও গলার মাঝে তাঁকে ধরে রেখেছিলেন আয়িশা (রদিয়াল্লাহু আনহা)। ঠিক এমন সময় একটি মিসওয়াক হাতে নিয়ে ঘরে ঢোকেন আয়িশার ভাই আবদুর রহমান ইবনু আবী বকর (রদিয়াল্লাহু আনহুম)। নবিজিকে মিসওয়াকটির দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে আয়িশা জিজ্ঞেস করলেন এটি তাঁর লাগবে কি না। নবি মাথা নাড়েন। আয়িশা সেটি তার ভাইয়ের কাছ থেকে নিয়ে একটু চিবিয়ে নরম করে নবিজির কাছে দেন। রাসূল তা নিয়ে খুব ভালো করে মিসওয়াক করেন। নবি -এর কাছে রাখা এক পাত্রে পানি রাখা ছিল। সেখানে তিনি হাত ডুবিয়ে বারবার মুখ মুছতে থাকেন এবং বলতে থাকেন, “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ! নিশ্চয় মৃত্যুর সময় অনেক যন্ত্রণা আছে।”
তারপর দু-হাত অথবা তর্জনী উঁচিয়ে ছাদের দিকে দৃষ্টি রেখে তিনি নিচু স্বরে কিছু একটা বলেন। আয়িশা (রদিয়াল্লাহু আনহা) খুব কাছে থাকায় কান লাগিয়ে শুনতে পান সেটি। রাসূল বলছেন, “আল্লাহ যাদের নিয়ামাত দিয়েছেন, সে সকল নবী, সিদ্দীক, শহীদ এবং সালিহগণের সঙ্গ। হে আল্লাহ, ক্ষমা করে দিন, রহম করুন আমাকে। হে আল্লাহ, সুউচ্চ বন্ধুর কাছে।” শেষের এই কথাগুলো তিনবার বলেছেন তিনি। আর তা বলার পরপরই নবি তাঁর সুউচ্চ বন্ধুর সাথে গিয়ে মিলিত হন। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রজিউন।
সেদিনটি ছিল সোমবার, ১২ই রবীউল আউয়াল, ১১ হিজরি। তখন রাসূলুল্লাহ এর বয়স হয়েছিল ৬৩ বছর।
টিকাঃ
[৫৭০] বুখারি, ৪৪৪৯।
[৫৭১] বুখারি, ৪৪৩৫।
📄 সাহাবিদের হতবিহ্বলতা
নবিজি -এর মৃত্যুর খবর দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। কলিজা ফাটা এই সংবাদ শোনামাত্র সাহাবিদের পৃথিবী অন্ধকার হয়ে আসতে থাকে। পাগল হওয়ার দশা সকলের। সেদিন তাদের অবস্থা এমন দাঁড়িয়ে ছিল যে, মনে হয় তারা নিজেদের অনুভূতি-শক্তি হারিয়ে ফেলবেন। মদীনায় নবিজি -এর আগমনের দিনটি ছিল সবচেয়ে উজ্জ্বল। আর সবচেয়ে অন্ধকারতম দিনটি ছিল একাদশ হিজরির ১২ রবীউল আউয়াল—নবিজি -এর মৃত্যুর দিন। ওদিকে মাসজিদে নববিতে উমর (রদিয়াল্লাহু আনহু) সবাইকে বলছিলেন যে, আল্লাহ তাআলা মুনাফিকদের পুরোপুরি ধ্বংস করার আগে নবি এ দুনিয়া ত্যাগ করতে পারেন না। নবিজি মারা গেছেন—এ কথা যে-ই বলবে, তাকেই হত্যা করার হুমকি দেন তিনি। আর সে সময় অন্যান্য সাহাবিরা উমর (রদিয়াল্লাহু আনহু)-এর চারপাশে অনুভূতিহীন, দুঃখের নীরব ছবি হয়ে বসে থাকে।
টিকাঃ
[৫৭২] তিরমিযি, ৩৬১৮।
[৫৭৩] ইবনু হিশাম, আস-সীরাহ, ২/৬৫৫।
📄 আবূ বকর (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর প্রত্যয়ী অবস্থান
সেই সোমবার সকালে আবূ বকর (রদিয়াল্লাহু আনহু) নবিজি -এর স্বাস্থ্যের একটু উন্নতি দেখে যান। তিনি সেরে উঠবেন, এই আশা মনে নিয়ে ঘরে ফিরে আসেন আবূ বকর। কিন্তু ঘরে গিয়েই শুনতে পান দুঃসংবাদটি। সাথে সাথে ঘোড়ায় চড়ে ছুটে আসেন মাসজিদে নববিতে। কাউকে কিছু না বলে সোজা চলে যান রাসূল -এর ঘরে। শুয়ে আছেন নবিজি, গায়ে জড়ানো একটি ইয়েমেনি কাপড়। মুখ থেকে কাপড়টি সরিয়ে নবিজি -কে চুমু দেন আবূ বকর (রদিয়াল্লাহু আনহু) এবং বলেন, “আমার পিতা-মাতা আপনার প্রতি কুরবান হোক। আল্লাহ আপনার ভাগ্যে যে মৃত্যু রেখেছিলেন, তারই স্বাদ পেয়েছেন আপনি। এর পর আর কোনও মৃত্যু নেই।”
বিহ্বল মানুষগুলোর সংবিৎ ফিরিয়ে আনতে হবে। তাই আবূ বকর (রদিয়াল্লাহু আনহু) বের হয়ে আসেন মাসজিদে। উমর তখনো সেখানে দাঁড়িয়ে ক্রোধান্বিত হয়ে মৃত্যুসংবাদ অস্বীকার করে চলেছেন। আবূ বকর (রদিয়াল্লাহু আনহু) বললেন, “উমর বসো।” আবূ বকরের অনুরোধ সত্ত্বেও বসলেন না তিনি। আবূ বকর মিম্বরের নিকট গিয়ে আল্লাহর প্রশংসা ও স্তুতি বর্ণনা করলেন। সামনে থাকা দুঃখে কাতর বিমর্ষ মুখগুলোকে উদ্দেশ্য করে বললেন,
“শোনো সবাই! তোমাদের মধ্যে যারা মুহাম্মাদের ইবাদাত করে, তাদের জেনে রাখা উচিত-মুহাম্মাদ মারা গিয়েছেন। আর যারা আল্লাহ তাআলার ইবাদাত করে, তাদের জেনে রাখা উচিত-আল্লাহ চিরঞ্জীব, অমরণশীল। আল্লাহ তাআলা বলেছেন,
'মুহাম্মাদ তো কেবল একজন রাসূল। তাঁর আগেও অনেক রাসূল গত হয়েছেন। তিনিও যদি মারা যান বা নিহত হন, তাহলে কি তোমরা কুফরে ফিরে যাবে? বস্তুত যারা ঈমান ত্যাগ করে, তারা আল্লাহর কোনও ক্ষতি করতে পারে না। নিশ্চয়ই আল্লাহ কৃতজ্ঞদের পুরস্কৃত করেন।”
আবূ বকর (রদিয়াল্লাহু আনহু) সেদিন বলার আগে এ আয়াতটি নিয়ে এভাবে কেউ ভাবেনি। নবি সত্যি একদিন মারা যাবেন, এই চিন্তাও আসেনি কারও মাথায়। আব্বাস (রদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, “আল্লাহর কসম! এই রকম মনে হচ্ছিল যে, লোকজন পূর্বে কখনও এই আয়াত সম্পর্কে জানতই না, যে আল্লাহ তা নাযিল করেছেন। যখন আবূ বকর এই আয়াতটি তিলাওয়াত করলেন তখন সমস্ত মানুষ তাঁর থেকে আয়াতটি গ্রহণ করল এবং শান্ত হলো। এরপর আমি যাকেই শুনি দেখি যে, সে এই আয়াতটিই তিলাওয়াত করছে।"
সেদিন সবচেয়ে অস্থির ছিলেন উমর (রদিয়াল্লাহু আনহু)। পরে তিনি নিজের প্রতিক্রিয়ার বর্ণনা দেন এভাবে,
“আল্লাহর কসম! যখনই আমি আবূ বকরকে এই আয়াতটি তিলাওয়াত করতে শুনি বুঝতে পারি, সংবাদটি সত্য। তারপর আমি এমনভাবে ভেঙে পড়লাম যে, আমার পা আর আমাকে বহন করতে পারছে না। ফলে আমি মাটিতে পড়ে গেলাম আর উপলব্ধি করলাম যে, আসলেই আল্লাহর রাসূল মারা গিয়েছেন।”
টিকাঃ
[৫৭৪] সূরা আ-ল ইমরান, ৩: ১৪৪।
[৫৭৫] বুখারি, ৪৪৪৫৪।