📄 ওসিয়ত-নসীহত
আয়িশা (রদিয়াল্লাহু আনহা) বর্ণনা করেন যে, নবিজি -এর জ্বর বাড়তেই থাকে। একদিন তিনি বলেন, “আমার শরীরে সাত মশক পানি ঢেলে দাও, যেগুলোর বাঁধন খোলা হয়নি। যাতে লোকদের ওসিয়ত করতে পারি।” আমরা হাফসা (রদিয়াল্লাহু আনহা)-এর একটি চৌবাচ্চায় বসিয়ে রাসুল -এর শরীরে সেই মশকগুলো থেকে পানি ঢালছিলাম। একসময় তিনি ইশারায় আমাদের থামতে বললেন। তারপর বেরিয়ে গিয়ে সালাতের ইমামতি করেন। সালাত শেষে সবাইকে উদ্দেশ্য করে কিছু কথা বলেন। সেই বক্তব্যে বলেছিলেন, “তোমাদের পূর্ববর্তীরা তাদের নবি ও নেককারদের কবরসমূহকে ইবাদাতখানা বানিয়ে নিয়েছিল। খুব ভালো করে শুনে রাখো! তোমরা কবরসমূহকে ইবাদাতখানা বানাবে না। আমি তোমাদের এ থেকে নিষেধ করছি।” আরও বলেছেন, “ইয়াহুদি ও নাসারাদের ওপর আল্লাহর লা'নত! তারা তাদের নবিদের কবরসমূহকে ইবাদতখানায় পরিণত করেছে।” আরও বলেছেন, “আমার কবরকে তোমরা মূর্তি বানিয়ো না, যার ইবাদাত করা হয়।”
নবিজি -এর কাছে পাওনা আছে, এমন সবাইকে এসে অধিকার দাবি করতে বলেন তিনি। প্রতিপালকের সাথে দেখা করার আগেই তিনি ঋণমুক্ত হতে চান। তারপর সাহাবিদের বলেন, “আল্লাহ তাঁর এক বান্দাকে দুটি জিনিসের যেকোনও একটি বেছে নেওয়ার স্বাধীনতা দিয়েছেন-একটি হলো, ইচ্ছামতো এই দুনিয়ার সম্পদ, আরেকটি হলো, আল্লাহর কাছে থাকা সম্পদ। বান্দাটি আল্লাহর কাছে থাকা সম্পদকেই বেছে নিয়েছে।” আবূ সাঈদ খুদরি (রদিয়াল্লাহু আনহু) বর্ণনা করেন, “এ কথা শুনে আবূ বকর (রদিয়াল্লাহু আনহু) কাঁদতে আরম্ভ করেন এবং বলেন, 'আমার পিতা-মাতা আপনার জন্য কুরবান হোক!” আমরা তাঁর এমন আচরণে অবাক হয়ে গেলাম। একে অপরকে বলাবলি করলাম, 'কী ব্যাপার? সে ব্যক্তি তো ভালো বস্তু-ই বেছে নিয়েছে। আবূ বকর কাঁদে কেন?' কয়দিন পর গিয়ে বুঝলাম যে, নবি বান্দা বলতে নিজেকেই বোঝাচ্ছিলেন। (অর্থাৎ তাঁর আসন্ন মৃত্যুর সংবাদ দিচ্ছিলেন।) ফলে আমাদের চেয়ে আবু বকরের জ্ঞানের শ্রেষ্ঠত্বও উপলব্ধি হলো সবার।”
এ ঘটনার পর আবূ বকরের সাথে নবিজি -এর সখ্য আরও বেড়ে যায়। তিনি তাঁর প্রশংসা করেন এবং মাসজিদের বাকি সব দরজা এখন থেকে বন্ধ করে দিতে বলেন। খোলা রাখতে বলেন শুধু আবূ বকর (রদিয়াল্লাহু আনহু)-এর ঘরের সাথে সংযুক্ত দরজাটি। এটি ছিল বুধবারের ঘটনা। পরদিন বৃহস্পতিবার রাসূলুল্লাহ -এর অসুস্থতা আরও বেড়ে যায়। অনেক কষ্টে বলেন, “এসো। আমি তোমাদের একটা জিনিস লিখে দিয়ে যাই, যাতে তোমরা কখনও পথভ্রষ্ট না হও।” উমর (রদিয়াল্লাহু আনহু)-এর বিপরীতে উপস্থিত সকলকে বলেন, “নবি এখন খুবই কষ্ট পাচ্ছেন। কুরআন তো আমাদের কাছে আছেই। এটিই আমাদের জন্য যথেষ্ট।” নবি -এর পাশে থাকতেই সাহাবিদের মাঝে এ নিয়ে গোলযোগ শুরু হয়ে যায়। নবি আদেশ দিলেন, “আমার নিকট থেকে সবাই উঠে যাও।”
সেদিনই রাসূলুল্লাহ আদেশ দেন, যাতে সকল ইয়াহুদি, খ্রিষ্টান ও পৌত্তলিকদের আরব উপদ্বীপ থেকে বের করে দেওয়া হয়। আরও বলেন যেন মদীনায় আগত সব প্রতিনিধিদলের সাথে ঠিক সেভাবেই উত্তম আচরণ করা হয়, যেভাবে নবি তাদের সাথে উত্তম আচরণ করতেন। সালাত এবং দাসদের প্রতি সদাচরণের গুরুত্ব নিয়েও কথা বলেন তিনি। তিনি আরও বলেন, “তোমাদের কাছে দুটো জিনিস রেখে যাচ্ছি। যতদিন তোমরা এগুলো আঁকড়ে ধরে রাখবে, ততদিন পথভ্রষ্ট হবে না—আল্লাহর কিতাব এবং তাঁর নবির সুন্নাহ।”
টিকাঃ
[৫৫৩] বুখারি, ১৯৮।
[৫৫৪] মুসলিম, ৫৩২।
[৫৫৫] বুখারি, ৪৩৫, ৪৩৬।
[৫৫৬] মালিক, আল-মুওয়াত্তা, ৮৫।
[৫৫৭] বুখারি, ৪৬৬।
[৫৫৮] হাকিম, আল-মুসতাদরাক, ১/৯৩।
[৫৫৯] বুখারি, ৩০৫৩।
📄 সালাতে আবূ বকরের ইমামতি
অসুস্থতা সত্ত্বেও এতদিন নবি সালাতে ইমামতি করে এসেছেন। কিন্তু ওই বৃহস্পতিবারে ইশার ওয়াক্তে ব্যতিক্রম ঘটে। ব্যথা কমাতে নবি চৌবাচ্চায় গোসল করে নেন। কিন্তু উঠে দাঁড়াতে গিয়ে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন তিনি। জ্ঞান ফিরে আসার পর গোসল করেন আবারও। এ-রকম তিনবার ঘটে। শেষে তিনি আবূ বকর (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-কে খবর পাঠান ইমামতি করার জন্য। এই ওয়াক্তের পর থেকে অবশিষ্ট দিনগুলোতে তিনিই ইমামতি করেন। নবিজি -এর জীবদ্দশায় এভাবে মোট সতেরো ওয়াক্ত সালাতের ইমামতি করেন আবূ বকর। শনিবারে কিংবা রবিবারে একটু ভালো বোধ করেন রাসূলুল্লাহ । যুহরের সালাতের জন্য দু'জনের কাঁধে ভর দিয়ে আসেন মাসজিদে। সে সময় আবূ বকর (রদিয়াল্লাহু আনহু) ইমামতি করছিলেন। নবি গিয়ে তার বামদিকে বসে পড়েন। আবূ বকর নবিজির অনুসরণ করছিলেন আর অন্যান্যরা আবূ বকরের অনুসরণ করছিলেন। তিনিই জোরে জোরে তাকবীর বলে সবাইকে অবগত করছিলেন।
টিকাঃ
[৫৬০] বুখারি, ৬৮৭।
[৫৬১] বুখারি, ৬৮৭।
📄 নবিজির যা ছিল সব সদাকা
রবিবারে নবি তাঁর দাসদের মুক্ত করে দেন। সম্পদ বলতে বাকি ছিল মাত্র সাতটি দীনার। সদাকা করে দেন সেগুলোও। অস্ত্রশস্ত্রগুলো মুসলিম সেনাবাহিনীকে দিয়ে দেন। রাত হলে আয়িশা (রদিয়াল্লাহু আনহা) এক প্রতিবেশিনীর ঘরে তাঁর প্রদীপটি পাঠান। একটুখানি ঘি ঢেলে দিতে বলেন তাতে। যাতে প্রদীপটি জ্বালাতে পারেন। আর নবিজি -এর বর্মটি এক ইয়াহুদির কাছে বন্ধক ছিল ত্রিশ সা' (প্রায় ৬৬ কেজি) যবের বিনিময়ে।
টিকাঃ
[৫৬২] ইবনু সা'দ, তবাকাত, ২/২৩৭-২৩৯।
[৫৬৩] বুখারি, ২০১৬।
📄 রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর জীবনের শেষ দিন
সোমবার। আবূ বকর (রদিয়াল্লাহু আনহু) ফজরের সালাতের ইমামতি করছেন। রাসূলুল্লাহ আয়িশা (রদিয়াল্লাহু আনহা)-এর ঘরের ঘরের পর্দা তুলে সেদিকে তাকান। দেখতে পান সালাতরত সাহাবিদের। মুচকি হাসি ফুটে ওঠে মুখে। নবিজি এসে ইমামতি করবেন ভেবে আবূ বকর একটু পিছিয়ে আসেন। সেদিন নবিজি -এর চেহারায় যে খুশির ছটা দেখা যায়, তা দেখে সাহাবিরাও এত খুশি হয়েছিলেন যে, প্রায় সালাত ছেড়ে দিয়েই তাঁর নিকট চলে আসবেন। কিন্তু নবি হাতের ইশারায় তাদের আগে সালাত সম্পন্ন করে নিতে বলেন। এরপর তিনি ঘরের ভেতর চলে যান এবং পর্দা নামিয়ে দেন।
সেদিনই কিংবা সে সপ্তাহতেই নবি ফাতিমা (রদিয়াল্লাহু আনহা)-কে ডাকিয়ে আনেন। কানে কানে কিছু একটা বলেন তাকে। ফলে কান্নায় ভেঙে পড়েন ফাতিমা (রদিয়াল্লাহু আনহা)। একটু পর মেয়ের কানে নবি আরও কিছু একটা বলেন। এতে ফাতিমা এবার হেসে ওঠেন। আয়িশা (রদিয়াল্লাহু আনহা) সেদিন ফাতিমাকে ডেকে জানতে চেয়েছিলেন নবিজি কী বললেন। কিন্তু ফাতিমা বলেন যে, রাসূল সেটা গোপন রাখতে বলেছেন। নবিজি মারা যাওয়ার পর ফাতিমা (রদিয়াল্লাহু আনহা) প্রকাশ করেন কথাটি। প্রথমবার বলেছিলেন যে, এই রোগেই তাঁর মৃত্যু হবে। তা শুনে ফাতিমা (রদিয়াল্লাহু আনহা) কান্না করেন। পরেরবার বলেন যে, পরিবার-পরিজনদের মাঝে ফাতিমাই প্রথমে নবিজি -এর সাথে মিলিত হবে। ফলে তিনি হেসেছিলেন এই কথাটি শুনে। জান্নাতের নারীদের নেত্রী (সাইয়্যিদা) হবেন ফাতিমা (রদিয়াল্লাহু আনহা) এটিও বলে গেছেন রাসূল। মৃত্যুশয্যায় নবিজির ব্যথা দেখে ফাতিমা (রদিয়াল্লাহু আনহা) কেঁদে বললেন, "আহ! বাবার কী কষ্ট!” নবি উত্তর দেন, “এই দিনের পর তোমার বাবার আর কোনও কষ্ট হবে না!”
তারপর নবি ফাতিমার দুই ছেলে হাসান ও হুসাইন (রদিয়াল্লাহু আনহুমা)কে ডাকিয়ে আনেন। কাছে নিয়ে চুমু দেন তাদের এবং পাশে থাকা স্ত্রীদেরও কিছু নসীহত ও উপদেশ দেন। ব্যথা আস্তে আস্তে বাড়ছে। খাইবারে তাঁকে যে বিষ খাওয়ানো হয়েছে তার বিষক্রিয়া প্রকটভাবে প্রকাশ পেতে শুরু করেছে। নবি যন্ত্রণায় একটি চাদর দিয়ে চেহারা ঢেকে রাখেন। শুধু শ্বাস নেওয়ার প্রয়োজনে তা সরান। এই অবস্থাতেও তিনি বলেন, “ইয়াহুদি-খ্রিষ্টানদের ওপর আল্লাহর লা'নত! তারা তাদের নবিদের কবরসমূহকে ইবাদাতখানা বানিয়েছে।” আরও বলেন, “আরবভূমিতে দুইটি দ্বীন বাকি রাখা হবে না।” সবশেষে বারকয়েক বলেন, “সালাত! সালাত! এবং তোমাদের দাস ও অধীনস্থরা।”
টিকাঃ
[৫৬৪] বুখারি, ৬৮০।
[৫৬৫] বুখারি, ৩৬২৩-৩৬২৬১
[৫৬৬] বুখারি, ৪৪৬২।
[৫৬৭] বুখারি, ৪৪৬৮।
[৫৬৮] বাইহাকি, আস-সুনানুল কুবরা, ৬/১৩৬।
[৫৬৯] ইবনু মাজাহ, ১৬২৫, আহমাদ, আল-মুসনাদ, ৬/২৯০।