📄 অত্যাসন্ন মৃত্যুর লক্ষণ
সেই যে এক ইয়াহুদি নারী বিষ প্রয়োগ করেছিল নবি -এর খাবারে, সে ঘটনার স্মৃতি মানুষ প্রায় ভুলতেই বসেছে। এমনই সময় বিষক্রিয়া আবারও দৃশ্যমান হতে থাকে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর শরীরে। অবনতি হতে থাকে স্বাস্থ্যের। দশম হিজরি সন থেকেই তিনি কথা ও কাজের মাধ্যমে নিজের আসন্ন মৃত্যুর কথা জানান দিতেন। প্রতিবছর রমাদানের শেষ দশ দিনে ই'তিকাফ করতেন আল্লাহর রাসূল ﷺ। এ মাসে জিবরীল (আলাইহিস সালাম) তাঁকে একবার পুরো কুরআন তিলাওয়াত করে শোনাতেন এবং তিনিও নবি ﷺ-এর তিলাওয়াত শুনতেন। দশম হিজরি সনে ই'তিকাফ করেন বিশ দিন। বলেন যে, জিবরীল (আলাইহিস সালাম) সে বছর তাঁকে দু-বার কুরআনের দাওর করিয়েছেন। ফাতিমা (রদিয়াল্লাহু আনহা)-কে ডেকে নবি ﷺ জানান, 'আমি বুঝতে পারছি— আমার সময় অতি নিকটবর্তী।”
মুআয (রদিয়াল্লাহু আনহু)-কে ইয়েমেনে পাঠানোর সময় ওসিয়ত করা শেষে বলেন, “মুআয, তুমি এই বছরের পর আর হয়তো আমার দেখা পাবে না। হয়তো তুমি আমার এই মাসজিদ আর আমার কবরের পাশ দিয়ে অতিক্রম করবে।” এ কথা শুনে মুআয (রদিয়াল্লাহু আনহু) বিচ্ছেদ-বেদনায় হাউমাউ করে কেঁদে ওঠেন। নবি ﷺ বিদায় হাজ্জের সময়ও একাধিকবার বলেছিলেন, “এই বছরের পর হয়তো তোমাদের সাথে আমার আর কখনও দেখা হবে না। হয়তো এই বছরের পর আর কখনও আমি হাজ্জ করতে আসব না।” সে সময় নাযিল হওয়া সূরা নাসর ও সূরা মাইদার সে আয়াতেও রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর মৃত্যুর ইঙ্গিত রয়েছে। সেই হাজ্জকে বিদায় হাজ্জ (হাজ্জাতুল ওয়াদা') নামকরণের কারণও এটাই। উম্মাতকে তিনি সে বছরই বিদায় জানিয়েছেন।
একাদশ হিজরির সফর মাসে উহুদ পাহাড়ে গিয়ে সেখানে সমাধিস্থ শহীদদের জন্যও এমনভাবে দুআ করেন, যেন তাদের কাছ থেকে বিদায় নিচ্ছেন। ফিরে এসে মিম্বরে উঠে বলেন, "আমি তোমাদের আগে যাব এবং তোমাদের জন্য সাক্ষ্যও দেবো। আল্লাহর শপথ! এখন আমি হাউযে কাউসারকে চোখের সামনে দেখছি পাচ্ছি। আর আমার হাতে জমীনের সমস্ত সম্পদ-ভান্ডারের চাবি দেওয়া হয়েছে। আল্লাহর শপথ! আমি এই ভয় করি না যে, আমার মৃত্যুর পর তোমরা শিরকে লিপ্ত হবে; বরং আমার ভয় হচ্ছে যে, তোমরা দুনিয়া অর্জনে একে অপরের সাথে প্রতিযোগিতায় নেমে যাবে।” সফর মাসের শেষ দিকে এক গভীর রাতে মদীনার 'বাকীউল গারকাদ' কবরস্থানে চলে যান রাসূল । দুআ করেন সেখানে শায়িত মৃতদের জন্য। বলেন, “ইনশা আল্লাহ। শীঘ্রই আমরাও তোমাদের সাথে মিলিত হব।”
টিকাঃ
[৫৪৭] বুখারি, ৪৯৯৮।
[৫৪৮] আহমাদ, আল-মুসনাদ, ৫/২৩৫।
[৫৪৯] বুখারি, ১৩৪৪।
[৫৫০] বুখারি, ৯৭৪।
📄 অসুস্থতার শুরু
সফর মাসের শেষ সোমবার। নবি বাকী' গোরস্থানে একজনের জানাযার সালাত পড়েন। ফিরে আসার পর আয়িশা (রদিয়াল্লাহু আনহা) তাঁকে বলেন যে, মাথাব্যথা করছে। নবি বলেন, “বরং মাথাব্যথা আমার। উফ, আয়িশা! হায় আমার মাথা!” এটা ছিল রাসূল -এর অসুস্থতার সূচনা। স্বাস্থ্যের ক্রমাবনতির কালেও প্রত্যেক স্ত্রীর ঘরে পালাক্রমে থাকতেন নবি । একদিন মাইমূনা (রদিয়াল্লাহু আনহা)-এর ঘরে থাকা অবস্থায় জিজ্ঞাসা করতে থাকেন, “আগামীকাল কার ঘরে থাকব? আগামীকাল কার ঘরে থাকব?” সকল স্ত্রীই বুঝতে পারেন যে, শেষ দিনগুলো তিনি আয়িশার সাথে কাটাতে চাচ্ছেন। অনুমতিও দিয়ে দেন সবাই। ফাদল ইবনু আব্বাস ও আলি ইবনু আবী তালিব (রদিয়াল্লাহু আনহুমা)-এর কাঁধে ভর দিয়ে নবি আয়িশা (রদিয়াল্লাহু আনহা)-এর ঘরে যান।
টিকাঃ
[৫৫১] বুখারি, ৫৬৬৬।
[৫৫২] বুখারি, ৪৪৪২।
📄 ওসিয়ত-নসীহত
আয়িশা (রদিয়াল্লাহু আনহা) বর্ণনা করেন যে, নবিজি -এর জ্বর বাড়তেই থাকে। একদিন তিনি বলেন, “আমার শরীরে সাত মশক পানি ঢেলে দাও, যেগুলোর বাঁধন খোলা হয়নি। যাতে লোকদের ওসিয়ত করতে পারি।” আমরা হাফসা (রদিয়াল্লাহু আনহা)-এর একটি চৌবাচ্চায় বসিয়ে রাসুল -এর শরীরে সেই মশকগুলো থেকে পানি ঢালছিলাম। একসময় তিনি ইশারায় আমাদের থামতে বললেন। তারপর বেরিয়ে গিয়ে সালাতের ইমামতি করেন। সালাত শেষে সবাইকে উদ্দেশ্য করে কিছু কথা বলেন। সেই বক্তব্যে বলেছিলেন, “তোমাদের পূর্ববর্তীরা তাদের নবি ও নেককারদের কবরসমূহকে ইবাদাতখানা বানিয়ে নিয়েছিল। খুব ভালো করে শুনে রাখো! তোমরা কবরসমূহকে ইবাদাতখানা বানাবে না। আমি তোমাদের এ থেকে নিষেধ করছি।” আরও বলেছেন, “ইয়াহুদি ও নাসারাদের ওপর আল্লাহর লা'নত! তারা তাদের নবিদের কবরসমূহকে ইবাদতখানায় পরিণত করেছে।” আরও বলেছেন, “আমার কবরকে তোমরা মূর্তি বানিয়ো না, যার ইবাদাত করা হয়।”
নবিজি -এর কাছে পাওনা আছে, এমন সবাইকে এসে অধিকার দাবি করতে বলেন তিনি। প্রতিপালকের সাথে দেখা করার আগেই তিনি ঋণমুক্ত হতে চান। তারপর সাহাবিদের বলেন, “আল্লাহ তাঁর এক বান্দাকে দুটি জিনিসের যেকোনও একটি বেছে নেওয়ার স্বাধীনতা দিয়েছেন-একটি হলো, ইচ্ছামতো এই দুনিয়ার সম্পদ, আরেকটি হলো, আল্লাহর কাছে থাকা সম্পদ। বান্দাটি আল্লাহর কাছে থাকা সম্পদকেই বেছে নিয়েছে।” আবূ সাঈদ খুদরি (রদিয়াল্লাহু আনহু) বর্ণনা করেন, “এ কথা শুনে আবূ বকর (রদিয়াল্লাহু আনহু) কাঁদতে আরম্ভ করেন এবং বলেন, 'আমার পিতা-মাতা আপনার জন্য কুরবান হোক!” আমরা তাঁর এমন আচরণে অবাক হয়ে গেলাম। একে অপরকে বলাবলি করলাম, 'কী ব্যাপার? সে ব্যক্তি তো ভালো বস্তু-ই বেছে নিয়েছে। আবূ বকর কাঁদে কেন?' কয়দিন পর গিয়ে বুঝলাম যে, নবি বান্দা বলতে নিজেকেই বোঝাচ্ছিলেন। (অর্থাৎ তাঁর আসন্ন মৃত্যুর সংবাদ দিচ্ছিলেন।) ফলে আমাদের চেয়ে আবু বকরের জ্ঞানের শ্রেষ্ঠত্বও উপলব্ধি হলো সবার।”
এ ঘটনার পর আবূ বকরের সাথে নবিজি -এর সখ্য আরও বেড়ে যায়। তিনি তাঁর প্রশংসা করেন এবং মাসজিদের বাকি সব দরজা এখন থেকে বন্ধ করে দিতে বলেন। খোলা রাখতে বলেন শুধু আবূ বকর (রদিয়াল্লাহু আনহু)-এর ঘরের সাথে সংযুক্ত দরজাটি। এটি ছিল বুধবারের ঘটনা। পরদিন বৃহস্পতিবার রাসূলুল্লাহ -এর অসুস্থতা আরও বেড়ে যায়। অনেক কষ্টে বলেন, “এসো। আমি তোমাদের একটা জিনিস লিখে দিয়ে যাই, যাতে তোমরা কখনও পথভ্রষ্ট না হও।” উমর (রদিয়াল্লাহু আনহু)-এর বিপরীতে উপস্থিত সকলকে বলেন, “নবি এখন খুবই কষ্ট পাচ্ছেন। কুরআন তো আমাদের কাছে আছেই। এটিই আমাদের জন্য যথেষ্ট।” নবি -এর পাশে থাকতেই সাহাবিদের মাঝে এ নিয়ে গোলযোগ শুরু হয়ে যায়। নবি আদেশ দিলেন, “আমার নিকট থেকে সবাই উঠে যাও।”
সেদিনই রাসূলুল্লাহ আদেশ দেন, যাতে সকল ইয়াহুদি, খ্রিষ্টান ও পৌত্তলিকদের আরব উপদ্বীপ থেকে বের করে দেওয়া হয়। আরও বলেন যেন মদীনায় আগত সব প্রতিনিধিদলের সাথে ঠিক সেভাবেই উত্তম আচরণ করা হয়, যেভাবে নবি তাদের সাথে উত্তম আচরণ করতেন। সালাত এবং দাসদের প্রতি সদাচরণের গুরুত্ব নিয়েও কথা বলেন তিনি। তিনি আরও বলেন, “তোমাদের কাছে দুটো জিনিস রেখে যাচ্ছি। যতদিন তোমরা এগুলো আঁকড়ে ধরে রাখবে, ততদিন পথভ্রষ্ট হবে না—আল্লাহর কিতাব এবং তাঁর নবির সুন্নাহ।”
টিকাঃ
[৫৫৩] বুখারি, ১৯৮।
[৫৫৪] মুসলিম, ৫৩২।
[৫৫৫] বুখারি, ৪৩৫, ৪৩৬।
[৫৫৬] মালিক, আল-মুওয়াত্তা, ৮৫।
[৫৫৭] বুখারি, ৪৬৬।
[৫৫৮] হাকিম, আল-মুসতাদরাক, ১/৯৩।
[৫৫৯] বুখারি, ৩০৫৩।
📄 সালাতে আবূ বকরের ইমামতি
অসুস্থতা সত্ত্বেও এতদিন নবি সালাতে ইমামতি করে এসেছেন। কিন্তু ওই বৃহস্পতিবারে ইশার ওয়াক্তে ব্যতিক্রম ঘটে। ব্যথা কমাতে নবি চৌবাচ্চায় গোসল করে নেন। কিন্তু উঠে দাঁড়াতে গিয়ে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন তিনি। জ্ঞান ফিরে আসার পর গোসল করেন আবারও। এ-রকম তিনবার ঘটে। শেষে তিনি আবূ বকর (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-কে খবর পাঠান ইমামতি করার জন্য। এই ওয়াক্তের পর থেকে অবশিষ্ট দিনগুলোতে তিনিই ইমামতি করেন। নবিজি -এর জীবদ্দশায় এভাবে মোট সতেরো ওয়াক্ত সালাতের ইমামতি করেন আবূ বকর। শনিবারে কিংবা রবিবারে একটু ভালো বোধ করেন রাসূলুল্লাহ । যুহরের সালাতের জন্য দু'জনের কাঁধে ভর দিয়ে আসেন মাসজিদে। সে সময় আবূ বকর (রদিয়াল্লাহু আনহু) ইমামতি করছিলেন। নবি গিয়ে তার বামদিকে বসে পড়েন। আবূ বকর নবিজির অনুসরণ করছিলেন আর অন্যান্যরা আবূ বকরের অনুসরণ করছিলেন। তিনিই জোরে জোরে তাকবীর বলে সবাইকে অবগত করছিলেন।
টিকাঃ
[৫৬০] বুখারি, ৬৮৭।
[৫৬১] বুখারি, ৬৮৭।