📄 হাওয়াযিন প্রতিনিধিদের আগমন (যুল-কা’দা, ৮ম হিজরি)
গনীমাত বণ্টন মাত্র শেষ হয়েছে ঠিক তখন যুহাইর ইবনু সুরাদের নেতৃত্বে হাওয়াযিনের একটি দল এসে হাজির হয়। এসেই তারা নবি -এর হাতে ইসলাম গ্রহণ করেন। আনুগত্যের বাইআত দেওয়া শেষে প্রসঙ্গ তোলেন যুদ্ধে হারানো পরিবার ও সম্পত্তির ব্যাপারে-
“হে আল্লাহর রাসূল, আপনারা যাদের বন্দি করেছেন, তাদের মধ্যে রয়েছে আমাদের মা-বোন-ফুপু-খালারা। তাদের হারিয়ে আমরা নিজেদের মর্যাদাও হারিয়েছি। হে আল্লাহর রাসূল, আমাদের ওপর দয়া করুন। আপনি এমন ব্যক্তি, যার কাছে এটার প্রত্যাশা করা যায়। আমরা আপনার দয়ার প্রতীক্ষায় আছি। আপনি ওই সমস্ত নারীদের অনুগ্রহ করুন, যাদের দুধ আপনি পান করেছিলেন। স্মরণ করুন সে সময়ের কথা যখন শুধু তাদের বুকের দুধেই আপনার পেট ভরত।” তারা সে-সময় কিছু কবিতাও পাঠ করেছিল।
নবি তাদের পরিবার এবং সম্পত্তির মাঝে যেকোনও একটিকে বেছে নেওয়ার সুযোগ দেন। হাওয়াযিন প্রতিনিধিরা জবাব দেন “আমাদের নিকট বংশমর্যাদার সমান আর কিছুই নেই। আপনি আমাদের স্ত্রী-সন্তানদের ফিরিয়ে দিন। মাল-সম্পদ আর গবাদি পশুগুলোর ব্যাপারে আমাদের কোনও দাবি নেই।”
নবি বললেন, "আমি যখন যুহরের সালাত আদায় শেষ করব তখন তোমরা দাঁড়িয়ে যাবে এবং তোমাদের ইসলাম গ্রহণের বিষয়টি প্রকাশ করবে আর বলবে, আমরা তোমাদের দ্বীনি ভাই। আমরা মুসলমানদের মাধ্যমে রাসূল -এর নিকট এবং রাসূল -এর মাধ্যমে মুসলমানদের নিকট সুপারিশ করছি যে, আমাদের বন্দিদের আমাদের নিকট ফিরিয়ে দিন।" তারা নির্দেশানুসারে এ-রকমটাই বলে। এর প্রত্যুত্তরে রাসূলুল্লাহ বলেন, "আমার এবং বানু আবদুল মুত্তালিবের অংশে যা এসেছে, সব ফিরিয়ে দিলাম। আর বাকি সবার সাথে আমি আলোচনা করব।”
তখন মুহাজির-আনসার সবাই বলেন, “আমরা আমাদের অংশও ফিরিয়ে দিচ্ছি।” তবে কয়েকজন গ্রাম্য সাহাবি—যেমন, আকরা' ইবনু হাবিস, উয়াইনা ইবনু হিসন এবং আব্বাস ইবনু মিরদাস (রদিয়াল্লাহু আনহুম)- তাদের অংশ ফিরিয়ে দিতে অস্বীকৃতি জানায়। তাদের অনিচ্ছা দেখে নবি প্রস্তাব করেন, “যারা ফিরিয়ে দিতে রাজি তারা যেন ফিরিয়ে দেয় আর যারা রাজি নয় তারাও যেন ফিরিয়ে দেয়; আমি প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি, আল্লাহ তাআলা আমাদের এরপর সর্বপ্রথম যে গনীমাত দান করবেন তা থেকে এর বদলে তাকে ছয় ভাগ গনীমাত দেওয়া হবে।” এরপর উয়াইনা ইবনু হিসন (রদিয়াল্লাহু আনহু) ছাড়া বাকি দু'জন নবিজি -এর প্রস্তাব মেনে নেয়।
নবি মুক্তিপ্রাপ্তদের প্রত্যেককে একটি করে কিবতি চাদর উপহার দেন। বন্দিদের ফিরিয়ে দেওয়ার পরও হয় দুটি উট, নয়তো বিশটি করে ছাগল রয়ে যায় প্রত্যেকের মালিকানায়।
টিকাঃ
[৪৮৫] বুখারি, ২৩০৭, ২৩০৮।
📄 জি’ইর্রনার উমরা
গনীমাত বণ্টনের ব্যস্ততা শেষ হলে নবি ইহরাম বেঁধে নেন উমরার উদ্দেশ্যে। এটি 'জিই'ররানার উমরা' নামে খ্যাতি লাভ করে। উমরা শেষে মদীনাতেই ফিরে যান রাসূল। অষ্টম হিজরির যুল-কা'দা মাসের শেষ সপ্তাহে ঘরে গিয়ে পৌঁছান।
টিকাঃ
[৪৮৬] বুখারি, ১৭৭৮।
[৪৮৭] ইবনু খালদুন, আত-তারীখ, ২/৪৭; যাদুল মাআদ, ২/১৬০-২০১; ইবনু হিশাম, ৩৮৯-৫০১।
📄 বানূ তামীমের ইসলাম গ্রহণ (মুহাররম, ৯ম হিজরি)
নবম হিজরির মুহাররম মাস। মদীনায় খবর এল যে, বানু তামীম গোত্র আশপাশের অনেক গোত্রকে উস্কানি দিচ্ছে, তারা যাতে মুসলিমদের জিযইয়া না দেয়। নবি উয়াইনা ইবনু হিসন ফাযারি (রদিয়াল্লাহু আনহু)-এর নেতৃত্বে বানু তামীমের ঘাঁটিতে পঞ্চাশ জনের একটি বাহিনী প্রেরণ করেন। সেখানে আক্রমণ করে সেখানকার মরুভূমি থেকে তামীম গোত্রের এগারো জন পুরুষ এবং একুশ জন নারী ও শিশুকে বন্দি করে মদীনায় নিয়ে আসে উয়াইনা (রদিয়াল্লাহু আনহু)।
বানু তামীমের দশ সদস্যের এক প্রতিনিধিদল তড়িঘড়ি করে মদীনায় আসে। মুসলিমদের সামরিক ক্ষমতা ও দক্ষতা সম্পর্কে ভালোই জানা আছে তাদের। তাই বানু তামীম গোত্রপতি প্রস্তাব দেন একটি কবিতা প্রতিযোগিতা আয়োজনের। কাদের কবিরা বেশি পট, সেটাই নির্ণীত হবে এই প্রতিযোগিতায়। চ্যালেঞ্জটি গৃহীত হয় মুসলিম পক্ষ থেকে।
বানু তামীমের সুপ্রসিদ্ধ খতীব উতারিদ ইবনু হাজিব প্রথমে বক্তব্য রাখেন। মুসলিমদের পক্ষ থেকে এর জবাব দেন সাবিত ইবনু কাইস (রদিয়াল্লাহু আনহু)। তারপর বানু তামীম কবিতা আবৃত্তি করতে পাঠায় তাদের শ্রেষ্ঠ কবি যিবরিকান ইবনু বাদুকে। জবাবে হাসসান ইবনু সাবিত (রদিয়াল্লাহু আনহু) এমন কবিতা আবৃত্তি করেন যে, বানু তামীম গোত্র হার মানতে বাধ্য হয়। এরা এমন এক গোত্র, যারা কবিতা শুনে মুগ্ধ হয়ে ইসলামে প্রবেশ করেন। নবি ﷺ তাদের বন্দিদের মুক্তি দিয়ে উপঢৌকনসহ ফেরত পাঠান।
📄 বানূ তাই-এর বিরুদ্ধে অভিযান
রাসূলুল্লাহ-এর তৎপরতা থেমে নেই। দিকে দিকে মানুষের কাছে ইসলামের দাওয়াত প্রদান চলছেই। কখনও কথা, কখনও আচরণ, কখনও চিঠি দিয়ে আবার কখনও-বা শক্তি দিয়ে তিনি মানুষকে সত্যের প্রতি আহ্বান করতে থাকেন। অজ্ঞতা ও বহুত্ববাদের কোলে জন্ম নেওয়া প্রতিটি মিথ্যে উপাস্যের মৃত্যু ঘটিয়ে এক আল্লাহর ইবাদাত সমুন্নত করাই তাঁর উদ্দেশ্য।
এরই ধারায় নবম হিজরির রবীউল আউয়াল মাসে আলি (রদিয়াল্লাহু আনহু)-এর নেতৃত্বে দেড় শ উষ্ট্রারোহী ও অশ্বারোহীর একটি বাহিনীকে নবি ﷺ প্রেরণ করেন 'ফিলস' মূর্তি ধ্বংস করার দায়িত্ব দিয়ে। এটি তায়ি গোত্রের প্রধান উপাস্য দেবতা। কিংবদন্তি হাতিম তায়ি এ গোত্রেরই সন্তান ছিলেন। আলি (রদিয়াল্লাহু আনহু)-এর নেতৃত্বে থাকা মুসলিম বাহিনীটির কাছে ছিল একটি কালো এবং আরেকটি ছোট সাদা পতাকা। কিছু উট ও ছাগলের পাশাপাশি কয়েকজন নারী ও শিশুকে বন্দি করেন তারা। বন্দিদের মাঝে হাতিম তায়ির মেয়ে সাফফানাও ছিলেন।
বন্দিদের নিয়ে বাহিনীটি মদীনায় ফিরে আসে। হাতিম তায়ির সম্মানার্থে তার কন্যাকে বিনা মুক্তিপণে ছেড়ে দেন নবি ﷺ। শুধু তা-ই না, সাথে একটি বাহনও দিয়ে দেন তাকে। সাফফানা সেখান থেকে সোজা চলে যান সিরিয়া। তার ভাই আদি ইবন হাতিম সেখানে পালিয়ে আশ্রয় নিয়েছিলেন। ভাইয়ের কাছে নবিজি -এর অসাধারণ দানশীলতার কথা জানান সাফফানা। এমনকি তাদের বাবাও তাঁর সাথে তুলনীয় নন এই বলে তিনি আদিকে অনুরোধ করেন আগ্রহভরে নবিজি -এর সামনে নিজেকে পেশ করতে।
বোনের কথা আদির মনে ধরে। তাই কোনও ধরনের নিরাপত্তা না নিয়েই তিনি হাজির হন রাসূলুল্লাহ -এর কাছে। নবিজির মুখে ইসলামের মৌলিক বিষয়াদির ব্যাখ্যা শুনে ইসলাম গ্রহণ করেন আদি ইবনু হাতিম (রদিয়াল্লাহু আনহু)।
আদি সেখানে থাকতে থাকতেই দু'জন লোক নবিজি -এর কাছে আসে। একজনের অভিযোগ খাদ্যের অভাবের, আরেকজনের নালিশ সড়কপথে একটি ডাকাতির ঘটনা নিয়ে। তারা চলে যাওয়ার পর রাসূল আদিকে বলেন,
“হে আদি, তুমি কি হীরা দেখেছ? তুমি যদি দীর্ঘ হায়াত পাও তাহলে দেখবে, হীরা থেকে একাকী এক নারী সফর করছে, এমনকি সেখান থেকে এসে কা'বাও তওয়াফ করছে কিন্তু পথে আল্লাহকে ছাড়া আর কাউকে ভয় পাচ্ছে না। এ ছাড়াও দেখবে, পারস্য সম্রাটের ধনভান্ডার তোমাদের হাতে চলে এসেছে। এমন ব্যক্তিকেও দেখবে, যে সোনা-রুপা হাতে নিয়ে তা গ্রহণ করার মতো কাউকে খুঁজছে কিন্তু তেমন কোনও লোককে খুঁজে পাচ্ছে না।”
আদি ইবনু হাতিম (রদিয়াল্লাহু আনহু) তাঁর জীবদ্দশায় নবিজি -এর এই ভবিষ্যদ্বাণী সত্য হতে দেখেছেন। উটের পিঠে চড়ে সফরকারী নারীকে তিনি প্রত্যক্ষ করেছেন। আর তিনি নিজেও পারস্যের ধনভান্ডার জয় করার সময় মুসলিম সৈন্যবাহিনীর সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন।
টিকাঃ
[৪৮৮] আহমাদ, আল-মুসনাদ, ৪/২৫৭, ২৭৮; ইবনু হিশাম, ২/৫৮১; যাদুল মাআদ, ২/২০৫।
[৪৮৯] বুখারি, ৩৫৯৫।