📄 আনসারদের অভিযোগ এবং রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সম্বোধন
কুরাইশরা যখন দু-হাত ভরে গনীমাত পাচ্ছে, আনসারদের মনে তখন দানা বাঁধছে আশঙ্কা। নবি কি তাহলে তাঁর স্বগোত্রীয়দের কাছে পেয়ে আনসারদের ভুলে গেলেন? সবার শেষে ইসলামে প্রবেশ করা, নিতান্ত অনিচ্ছায় যুদ্ধে আসা লোকগুলো নিয়ে নিচ্ছে বিজয়ের সব ফল। আর পোড়খাওয়া পরীক্ষিত জানবাজ ঈমানদাররা শুধু চেয়ে চেয়ে দেখছেন। আনসারদের মাঝে কেউ বলে উঠলেন, “এটা কেমন আশ্চর্যের কথা, নবিজি শুধু কুরাইশদেরই দিয়ে যাচ্ছেন আর আমাদের ছেড়ে দিয়েছেন অথচ আমাদের তলোয়ারগুলো থেকে এখনও তাদের রক্ত ফোঁটা পড়ছে!” আনসারদের সর্দার সা'দ ইবনু উবাদা (রদিয়াল্লাহু আনহু) গিয়ে এ ব্যাপারে অনুযোগ জানালেন রাসূল -এর কাছে।
নবি সবাইকে একত্র করেন। তারপর তিনি আল্লাহর হামদ ও সানা পাঠ শেষে আবেগঘন এক বক্তব্য রাখেন,
“ওহে আনসার সম্প্রদায়, তোমরা কি অমুক-তমুককে ক'টা বাসন-কোসন দিয়েছি বলে রাগ করেছ? তা তাদের দিয়েছি যাতে তারা ইসলাম গ্রহণ করে। আর তোমাদেরকে সোপর্দ করেছি তোমাদের ইসলামের কাছে। ওহে আনসার সম্প্রদায়, তোমরা কি এতে খুশি না যে, মানুষজন ঘরে ফিরবে ভেড়া-ছাগল-উট নিয়ে আর তোমরা ফিরবে স্বয়ং আল্লাহর রাসূলকে সাথে নিয়ে? সেই সত্তার শপথ যাঁর হাতে মুহাম্মাদের প্রাণ! হিজরত যদি না থাকত তাহলে আমি আনসারদেরই একজন হতাম। সব মানুষ যদি এক পথে যায় আর আনসাররা যায় অন্য পথে, তাহলে আমি আনসারদের পথেরই পথিক হব। হে আল্লাহ, আনসারদের প্রতি রহম করুন! তাদের সন্তানদের এবং তাদের সন্তানদের সন্তানদের প্রতিও রহম করুন।"
নবিজি -এর এ কথা শুনে আনসারদের সামনে সবকিছু স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কান্না করতে করতে সবার অবস্থা এমন হয় যে, দাড়ি পর্যন্ত ভিজে যায়। সবাই বলতে শুরু করেন, "আমরা আমাদের ভাগে আল্লাহর রাসূলকে পেয়ে সন্তুষ্ট।" এরপর আনসাররা রাসূলুল্লাহ-কে সঙ্গে করে বেশ উৎফুল্লচিত্তে চিরচেনা আলোকিত সেই প্রাণের শহর-মদীনায় ফিরে আসেন।
টিকাঃ
[৪৮৪] বুখারি, ৪৩৩০; ইবনু হিশাম, ২/৪৯৯-৫০০/
📄 হাওয়াযিন প্রতিনিধিদের আগমন (যুল-কা’দা, ৮ম হিজরি)
গনীমাত বণ্টন মাত্র শেষ হয়েছে ঠিক তখন যুহাইর ইবনু সুরাদের নেতৃত্বে হাওয়াযিনের একটি দল এসে হাজির হয়। এসেই তারা নবি -এর হাতে ইসলাম গ্রহণ করেন। আনুগত্যের বাইআত দেওয়া শেষে প্রসঙ্গ তোলেন যুদ্ধে হারানো পরিবার ও সম্পত্তির ব্যাপারে-
“হে আল্লাহর রাসূল, আপনারা যাদের বন্দি করেছেন, তাদের মধ্যে রয়েছে আমাদের মা-বোন-ফুপু-খালারা। তাদের হারিয়ে আমরা নিজেদের মর্যাদাও হারিয়েছি। হে আল্লাহর রাসূল, আমাদের ওপর দয়া করুন। আপনি এমন ব্যক্তি, যার কাছে এটার প্রত্যাশা করা যায়। আমরা আপনার দয়ার প্রতীক্ষায় আছি। আপনি ওই সমস্ত নারীদের অনুগ্রহ করুন, যাদের দুধ আপনি পান করেছিলেন। স্মরণ করুন সে সময়ের কথা যখন শুধু তাদের বুকের দুধেই আপনার পেট ভরত।” তারা সে-সময় কিছু কবিতাও পাঠ করেছিল।
নবি তাদের পরিবার এবং সম্পত্তির মাঝে যেকোনও একটিকে বেছে নেওয়ার সুযোগ দেন। হাওয়াযিন প্রতিনিধিরা জবাব দেন “আমাদের নিকট বংশমর্যাদার সমান আর কিছুই নেই। আপনি আমাদের স্ত্রী-সন্তানদের ফিরিয়ে দিন। মাল-সম্পদ আর গবাদি পশুগুলোর ব্যাপারে আমাদের কোনও দাবি নেই।”
নবি বললেন, "আমি যখন যুহরের সালাত আদায় শেষ করব তখন তোমরা দাঁড়িয়ে যাবে এবং তোমাদের ইসলাম গ্রহণের বিষয়টি প্রকাশ করবে আর বলবে, আমরা তোমাদের দ্বীনি ভাই। আমরা মুসলমানদের মাধ্যমে রাসূল -এর নিকট এবং রাসূল -এর মাধ্যমে মুসলমানদের নিকট সুপারিশ করছি যে, আমাদের বন্দিদের আমাদের নিকট ফিরিয়ে দিন।" তারা নির্দেশানুসারে এ-রকমটাই বলে। এর প্রত্যুত্তরে রাসূলুল্লাহ বলেন, "আমার এবং বানু আবদুল মুত্তালিবের অংশে যা এসেছে, সব ফিরিয়ে দিলাম। আর বাকি সবার সাথে আমি আলোচনা করব।”
তখন মুহাজির-আনসার সবাই বলেন, “আমরা আমাদের অংশও ফিরিয়ে দিচ্ছি।” তবে কয়েকজন গ্রাম্য সাহাবি—যেমন, আকরা' ইবনু হাবিস, উয়াইনা ইবনু হিসন এবং আব্বাস ইবনু মিরদাস (রদিয়াল্লাহু আনহুম)- তাদের অংশ ফিরিয়ে দিতে অস্বীকৃতি জানায়। তাদের অনিচ্ছা দেখে নবি প্রস্তাব করেন, “যারা ফিরিয়ে দিতে রাজি তারা যেন ফিরিয়ে দেয় আর যারা রাজি নয় তারাও যেন ফিরিয়ে দেয়; আমি প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি, আল্লাহ তাআলা আমাদের এরপর সর্বপ্রথম যে গনীমাত দান করবেন তা থেকে এর বদলে তাকে ছয় ভাগ গনীমাত দেওয়া হবে।” এরপর উয়াইনা ইবনু হিসন (রদিয়াল্লাহু আনহু) ছাড়া বাকি দু'জন নবিজি -এর প্রস্তাব মেনে নেয়।
নবি মুক্তিপ্রাপ্তদের প্রত্যেককে একটি করে কিবতি চাদর উপহার দেন। বন্দিদের ফিরিয়ে দেওয়ার পরও হয় দুটি উট, নয়তো বিশটি করে ছাগল রয়ে যায় প্রত্যেকের মালিকানায়।
টিকাঃ
[৪৮৫] বুখারি, ২৩০৭, ২৩০৮।
📄 জি’ইর্রনার উমরা
গনীমাত বণ্টনের ব্যস্ততা শেষ হলে নবি ইহরাম বেঁধে নেন উমরার উদ্দেশ্যে। এটি 'জিই'ররানার উমরা' নামে খ্যাতি লাভ করে। উমরা শেষে মদীনাতেই ফিরে যান রাসূল। অষ্টম হিজরির যুল-কা'দা মাসের শেষ সপ্তাহে ঘরে গিয়ে পৌঁছান।
টিকাঃ
[৪৮৬] বুখারি, ১৭৭৮।
[৪৮৭] ইবনু খালদুন, আত-তারীখ, ২/৪৭; যাদুল মাআদ, ২/১৬০-২০১; ইবনু হিশাম, ৩৮৯-৫০১।
📄 বানূ তামীমের ইসলাম গ্রহণ (মুহাররম, ৯ম হিজরি)
নবম হিজরির মুহাররম মাস। মদীনায় খবর এল যে, বানু তামীম গোত্র আশপাশের অনেক গোত্রকে উস্কানি দিচ্ছে, তারা যাতে মুসলিমদের জিযইয়া না দেয়। নবি উয়াইনা ইবনু হিসন ফাযারি (রদিয়াল্লাহু আনহু)-এর নেতৃত্বে বানু তামীমের ঘাঁটিতে পঞ্চাশ জনের একটি বাহিনী প্রেরণ করেন। সেখানে আক্রমণ করে সেখানকার মরুভূমি থেকে তামীম গোত্রের এগারো জন পুরুষ এবং একুশ জন নারী ও শিশুকে বন্দি করে মদীনায় নিয়ে আসে উয়াইনা (রদিয়াল্লাহু আনহু)।
বানু তামীমের দশ সদস্যের এক প্রতিনিধিদল তড়িঘড়ি করে মদীনায় আসে। মুসলিমদের সামরিক ক্ষমতা ও দক্ষতা সম্পর্কে ভালোই জানা আছে তাদের। তাই বানু তামীম গোত্রপতি প্রস্তাব দেন একটি কবিতা প্রতিযোগিতা আয়োজনের। কাদের কবিরা বেশি পট, সেটাই নির্ণীত হবে এই প্রতিযোগিতায়। চ্যালেঞ্জটি গৃহীত হয় মুসলিম পক্ষ থেকে।
বানু তামীমের সুপ্রসিদ্ধ খতীব উতারিদ ইবনু হাজিব প্রথমে বক্তব্য রাখেন। মুসলিমদের পক্ষ থেকে এর জবাব দেন সাবিত ইবনু কাইস (রদিয়াল্লাহু আনহু)। তারপর বানু তামীম কবিতা আবৃত্তি করতে পাঠায় তাদের শ্রেষ্ঠ কবি যিবরিকান ইবনু বাদুকে। জবাবে হাসসান ইবনু সাবিত (রদিয়াল্লাহু আনহু) এমন কবিতা আবৃত্তি করেন যে, বানু তামীম গোত্র হার মানতে বাধ্য হয়। এরা এমন এক গোত্র, যারা কবিতা শুনে মুগ্ধ হয়ে ইসলামে প্রবেশ করেন। নবি ﷺ তাদের বন্দিদের মুক্তি দিয়ে উপঢৌকনসহ ফেরত পাঠান।