📄 গনীমাতপ্রাপ্ত সম্পদ ও বন্দিদের বণ্টন
তায়িফ থেকে ফিরে আসার পথে দশ দিন জি'ইব্রনায় অবস্থান করেন মুসলিম বাহিনী। কিন্তু এর মাঝে রাসূল গনীমাত বণ্টন করেননি। এই আশায় যে, হাওয়াযিন গোত্র এসে তাওবা করে হয়তো নিজেদের পরিবার-সম্পত্তি ফেরত নিয়ে যাবে। কিন্তু কেউই আসেনি। অবশেষে নবি গনীমাতের এক-পঞ্চমাংশ গ্রহণ করেন। তারপর বাকি গনীমাত ভাগ করে দেন দুর্বল ঈমানদার নব্য মুসলিমদের মাঝে। যুদ্ধে অংশ নেওয়া অমুসলিমদেরও তিনি একটি বিরাট অংশ প্রদান করেন। উদ্দেশ্য ছিল তাদের মনকে ইসলামের দিকে আকৃষ্ট করা।
যেমন আবূ সুফইয়ানকে ১৬০০ দিরহাম এবং ১০০ উট দেওয়া হয়। তার দুই ছেলে ইয়াযীদ এবং মুআবিয়াকেও একই পরিমাণ দেওয়া হয়। সফওয়ান ইবনু উমাইয়াকে দেওয়া হয় ৩০০ উট। হাকিম ইবনু হিযাম, হারিস ইবনুল হারিস, উয়াইনা ইবনু হিসন, আকরা' ইবনু হাবিস, আব্বাস ইবনু মিরদাস, আলকামা ইবনু আলাসা, মালিক ইবনু আওফ, আলা ইবনু হারিসা, হারিস ইবনু হিশাম, জুবাইর ইবনু মুত'ইম, সুহাইল ইবনু আমর এবং হুওয়াইতিব ইবনু আবদিল উযযাসহ আরও অনেককে দেওয়া হয় একশটি করে উট। এর বাইরেও চল্লিশ-পঞ্চাশটি করে আরও কয়েকজনকে দান করা হয়।
দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়ে খবর, "মুহাম্মাদ প্রশস্ত হৃদয়ে এত অধিক দান করে যে, দারিদ্র্যের ভয় করে না।” গ্রাম্য বেদুইনরা লোভাতুর হয়ে ওঠে। ছুটে এসে রীতিমতো পাওনাদারের ভঙ্গিতে চাইতে থাকে নবি -এর কাছে। কেউ কেউ তো নবি -এর পেছন পেছন দৌড়ে তাঁকে গাছের দিকের সংকীর্ণ রাস্তায় যেতে বাধ্য করে। আরেক বেদুইন এসে পেছন থেকে নবিজির চাদর ধরে জোরে টান দেয়। ফলে চাদরটি নিচে পড়ে যায়। নবি বলেন, "আমার চাদরটা দিয়ে দাও। যাঁর হাতে আমার প্রাণ তাঁর শপথ! যদি আমার কাছে তিহামার গাছের সমসংখ্যক গবাদি পশুও থাকত তাহলে সেগুলোও বিতরণ করে দিতাম। এরপরেও তোমরা আমাকে না পেতে কৃপণ, না ভীরু আর না মিথ্যাবাদী।”
এরপর একটি উটের কুঁজ থেকে কয়েকটি চুল হাতে নিয়ে বলেন,
"আল্লাহর শপথ! আমার নিকট তোমাদের এই গনীমাতের সম্পদ থেকে কিছুই অবশিষ্ট নেই। এমনকি এই চুল পরিমাণও নেই। শুধু গনীমাতের সম্পদের এক-পঞ্চমাংশ রয়েছে। এগুলো আবার তোমাদের নিকটই প্রত্যাবর্তিত হবে। সুতরাং সুতা কিংবা সই পরিমাণও যদি কারও কাছে কিছু থেকে থাকে তাহলে তা ফিরিয়ে দাও। কেননা খিয়ানত কিয়ামাতের দিন খিয়ানতকারীর জন্য লাঞ্ছনা, লজ্জা ও আগুন হয়ে দাঁড়াবে।”
এ কথায় ভয় পেয়ে সবাই সে নির্দেশ পালন করতে থাকে। শত্রুদের কাছ থেকে লব্ধ খুব সামান্য কিছুও এনে জড়ো করে গনীমাতের স্তূপে। নবি তারপর যাইদ ইবনু সাবিত (রদিয়াল্লাহু আনহু)-কে দায়িত্ব দেন এগুলো বণ্টন করার। পুরা গনীমাত থেকে এক-পঞ্চমাংশ রেখে বাকি সম্পদ সবার মাঝে ভাগ করে দেওয়া হয়। সে হিসেবে একজনের অংশ দাঁড়ায়- দেড়টা উট, আড়াইটা বকরি, দশ দিরহাম এবং একটি কয়েদির এক-তৃতীয়াংশ। আর যদি প্রত্যেককে দশ দিরহাম দিয়ে অন্যান্যগুলোর যেকোনও একটি দেওয়া হয় তাহলে একজনের ভাগে আসে—শুধু চারটি উট বা শুধু চল্লিশটি বকরি কিংবা একটি কয়েদির দুই-তৃতীয়াংশ।
টিকাঃ
[৪৮৩] ইবনু আবদিল বার, আল-ইসতীআব, ২/৮১৭।
📄 আনসারদের অভিযোগ এবং রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সম্বোধন
কুরাইশরা যখন দু-হাত ভরে গনীমাত পাচ্ছে, আনসারদের মনে তখন দানা বাঁধছে আশঙ্কা। নবি কি তাহলে তাঁর স্বগোত্রীয়দের কাছে পেয়ে আনসারদের ভুলে গেলেন? সবার শেষে ইসলামে প্রবেশ করা, নিতান্ত অনিচ্ছায় যুদ্ধে আসা লোকগুলো নিয়ে নিচ্ছে বিজয়ের সব ফল। আর পোড়খাওয়া পরীক্ষিত জানবাজ ঈমানদাররা শুধু চেয়ে চেয়ে দেখছেন। আনসারদের মাঝে কেউ বলে উঠলেন, “এটা কেমন আশ্চর্যের কথা, নবিজি শুধু কুরাইশদেরই দিয়ে যাচ্ছেন আর আমাদের ছেড়ে দিয়েছেন অথচ আমাদের তলোয়ারগুলো থেকে এখনও তাদের রক্ত ফোঁটা পড়ছে!” আনসারদের সর্দার সা'দ ইবনু উবাদা (রদিয়াল্লাহু আনহু) গিয়ে এ ব্যাপারে অনুযোগ জানালেন রাসূল -এর কাছে।
নবি সবাইকে একত্র করেন। তারপর তিনি আল্লাহর হামদ ও সানা পাঠ শেষে আবেগঘন এক বক্তব্য রাখেন,
“ওহে আনসার সম্প্রদায়, তোমরা কি অমুক-তমুককে ক'টা বাসন-কোসন দিয়েছি বলে রাগ করেছ? তা তাদের দিয়েছি যাতে তারা ইসলাম গ্রহণ করে। আর তোমাদেরকে সোপর্দ করেছি তোমাদের ইসলামের কাছে। ওহে আনসার সম্প্রদায়, তোমরা কি এতে খুশি না যে, মানুষজন ঘরে ফিরবে ভেড়া-ছাগল-উট নিয়ে আর তোমরা ফিরবে স্বয়ং আল্লাহর রাসূলকে সাথে নিয়ে? সেই সত্তার শপথ যাঁর হাতে মুহাম্মাদের প্রাণ! হিজরত যদি না থাকত তাহলে আমি আনসারদেরই একজন হতাম। সব মানুষ যদি এক পথে যায় আর আনসাররা যায় অন্য পথে, তাহলে আমি আনসারদের পথেরই পথিক হব। হে আল্লাহ, আনসারদের প্রতি রহম করুন! তাদের সন্তানদের এবং তাদের সন্তানদের সন্তানদের প্রতিও রহম করুন।"
নবিজি -এর এ কথা শুনে আনসারদের সামনে সবকিছু স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কান্না করতে করতে সবার অবস্থা এমন হয় যে, দাড়ি পর্যন্ত ভিজে যায়। সবাই বলতে শুরু করেন, "আমরা আমাদের ভাগে আল্লাহর রাসূলকে পেয়ে সন্তুষ্ট।" এরপর আনসাররা রাসূলুল্লাহ-কে সঙ্গে করে বেশ উৎফুল্লচিত্তে চিরচেনা আলোকিত সেই প্রাণের শহর-মদীনায় ফিরে আসেন।
টিকাঃ
[৪৮৪] বুখারি, ৪৩৩০; ইবনু হিশাম, ২/৪৯৯-৫০০/
📄 হাওয়াযিন প্রতিনিধিদের আগমন (যুল-কা’দা, ৮ম হিজরি)
গনীমাত বণ্টন মাত্র শেষ হয়েছে ঠিক তখন যুহাইর ইবনু সুরাদের নেতৃত্বে হাওয়াযিনের একটি দল এসে হাজির হয়। এসেই তারা নবি -এর হাতে ইসলাম গ্রহণ করেন। আনুগত্যের বাইআত দেওয়া শেষে প্রসঙ্গ তোলেন যুদ্ধে হারানো পরিবার ও সম্পত্তির ব্যাপারে-
“হে আল্লাহর রাসূল, আপনারা যাদের বন্দি করেছেন, তাদের মধ্যে রয়েছে আমাদের মা-বোন-ফুপু-খালারা। তাদের হারিয়ে আমরা নিজেদের মর্যাদাও হারিয়েছি। হে আল্লাহর রাসূল, আমাদের ওপর দয়া করুন। আপনি এমন ব্যক্তি, যার কাছে এটার প্রত্যাশা করা যায়। আমরা আপনার দয়ার প্রতীক্ষায় আছি। আপনি ওই সমস্ত নারীদের অনুগ্রহ করুন, যাদের দুধ আপনি পান করেছিলেন। স্মরণ করুন সে সময়ের কথা যখন শুধু তাদের বুকের দুধেই আপনার পেট ভরত।” তারা সে-সময় কিছু কবিতাও পাঠ করেছিল।
নবি তাদের পরিবার এবং সম্পত্তির মাঝে যেকোনও একটিকে বেছে নেওয়ার সুযোগ দেন। হাওয়াযিন প্রতিনিধিরা জবাব দেন “আমাদের নিকট বংশমর্যাদার সমান আর কিছুই নেই। আপনি আমাদের স্ত্রী-সন্তানদের ফিরিয়ে দিন। মাল-সম্পদ আর গবাদি পশুগুলোর ব্যাপারে আমাদের কোনও দাবি নেই।”
নবি বললেন, "আমি যখন যুহরের সালাত আদায় শেষ করব তখন তোমরা দাঁড়িয়ে যাবে এবং তোমাদের ইসলাম গ্রহণের বিষয়টি প্রকাশ করবে আর বলবে, আমরা তোমাদের দ্বীনি ভাই। আমরা মুসলমানদের মাধ্যমে রাসূল -এর নিকট এবং রাসূল -এর মাধ্যমে মুসলমানদের নিকট সুপারিশ করছি যে, আমাদের বন্দিদের আমাদের নিকট ফিরিয়ে দিন।" তারা নির্দেশানুসারে এ-রকমটাই বলে। এর প্রত্যুত্তরে রাসূলুল্লাহ বলেন, "আমার এবং বানু আবদুল মুত্তালিবের অংশে যা এসেছে, সব ফিরিয়ে দিলাম। আর বাকি সবার সাথে আমি আলোচনা করব।”
তখন মুহাজির-আনসার সবাই বলেন, “আমরা আমাদের অংশও ফিরিয়ে দিচ্ছি।” তবে কয়েকজন গ্রাম্য সাহাবি—যেমন, আকরা' ইবনু হাবিস, উয়াইনা ইবনু হিসন এবং আব্বাস ইবনু মিরদাস (রদিয়াল্লাহু আনহুম)- তাদের অংশ ফিরিয়ে দিতে অস্বীকৃতি জানায়। তাদের অনিচ্ছা দেখে নবি প্রস্তাব করেন, “যারা ফিরিয়ে দিতে রাজি তারা যেন ফিরিয়ে দেয় আর যারা রাজি নয় তারাও যেন ফিরিয়ে দেয়; আমি প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি, আল্লাহ তাআলা আমাদের এরপর সর্বপ্রথম যে গনীমাত দান করবেন তা থেকে এর বদলে তাকে ছয় ভাগ গনীমাত দেওয়া হবে।” এরপর উয়াইনা ইবনু হিসন (রদিয়াল্লাহু আনহু) ছাড়া বাকি দু'জন নবিজি -এর প্রস্তাব মেনে নেয়।
নবি মুক্তিপ্রাপ্তদের প্রত্যেককে একটি করে কিবতি চাদর উপহার দেন। বন্দিদের ফিরিয়ে দেওয়ার পরও হয় দুটি উট, নয়তো বিশটি করে ছাগল রয়ে যায় প্রত্যেকের মালিকানায়।
টিকাঃ
[৪৮৫] বুখারি, ২৩০৭, ২৩০৮।
📄 জি’ইর্রনার উমরা
গনীমাত বণ্টনের ব্যস্ততা শেষ হলে নবি ইহরাম বেঁধে নেন উমরার উদ্দেশ্যে। এটি 'জিই'ররানার উমরা' নামে খ্যাতি লাভ করে। উমরা শেষে মদীনাতেই ফিরে যান রাসূল। অষ্টম হিজরির যুল-কা'দা মাসের শেষ সপ্তাহে ঘরে গিয়ে পৌঁছান।
টিকাঃ
[৪৮৬] বুখারি, ১৭৭৮।
[৪৮৭] ইবনু খালদুন, আত-তারীখ, ২/৪৭; যাদুল মাআদ, ২/১৬০-২০১; ইবনু হিশাম, ৩৮৯-৫০১।