📄 আনুগত্য স্বীকার
সাফা পাহাড়ে উঠে আসেন রাসূলুল্লাহ। কা'বা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে এখান থেকে। দুআ করার জন্য হাত তোলেন তিনি। দুআ শেষে দলে দলে মানুষ আসতে থাকে তাঁর কাছে। উদ্দেশ্য, ইসলাম গ্রহণ এবং আনুগত্যের বাইআত গ্রহণ। প্রিয় সাহাবি আবু বকর (রদিয়াল্লাহু আনহু)-এর বাবা আবু কুহাফাও সেদিন ঈমান আনেন (রদিয়াল্লাহু আনহু)। বিষয়টি নবিজি-কে দারুণভাবে আনন্দিত করে। অনেক নারীও সেদিন ইসলাম গ্রহণ করতে আসে। হাত স্পর্শ করা ছাড়া নবি তাদের সবাইকে এই শপথবাক্য পড়ান,
“তোমরা আল্লাহর সাথে কোনোকিছু শরীক করবে না, চুরি করবে না, ব্যভিচার করবে না, সন্তানদের হত্যা করবে না, কারও প্রতি অপবাদ আরোপ করবে না এবং সৎকাজে আমার অবাধ্যতা করবে না।"
সেদিনের বাইআত-গ্রহীতা নারীদের মাঝে আবূ সুফইয়ানের স্ত্রী হিন্দ বিনতু উতবাও ছিলেন। তিনি ঘোমটা দিয়ে ছদ্মবেশে এসেছিলেন, প্রাণ নিয়ে শঙ্কিত ছিলেন। হামযা (রদিয়াল্লাহু আনহু)-এর সাথে তার আচরণ ক্ষমার অযোগ্য। প্রতিশোধ গ্রহণ করবে এই আতঙ্কে তিনি অস্থির। শপথ নেওয়ার পর তিনি বলেন,
“হে আল্লাহর রাসূল, একটা সময় পৃথিবীর বুকে আপনার তাঁবুই ছিল আমার কাছে সবচেয়ে বেশি ঘৃণিত। আর আজ আমার কাছে পৃথিবীজুড়ে আপনার তাঁবুর চেয়ে অধিক প্রিয় কোনও তাঁবু নেই।”
নবি ও জবাব দেন, “যাঁর হাতে মুহাম্মাদের প্রাণ, সেই সত্তার কসম! এমনটিই হওয়ার ছিল।”
নবিজির মাজলিসের নিচে বসে তাঁর কথা অন্যদের কাছে পৌঁছে দিচ্ছিলেন উমর ইবনুল খাত্তাব (রদিয়াল্লাহু আনহু)। শপথ গ্রহণের তদারকের দায়িত্বে ছিলেন তিনি।
কেউ কেউ ইসলামের তরে হিজরত করার বাসনা প্রকাশ করে বাইআত করতে আসেন। কিন্তু নবি বলে দেন,
"মুহাজিররা এতদিনে হিজরতের সব সাওয়াব নিয়ে নিয়েছে। মক্কা যেহেতু বিজিত হয়ে গেছে, তাই মক্কা থেকে আর কোনও হিজরত নেই। তবে হ্যাঁ, জিহাদ এবং নিয়তের দরজা এখনও খোলা রয়েছে। আর যখন আল্লাহর রাস্তায় যুদ্ধ করার আহ্বান আসবে, তখনই বেরিয়ে পড়বে।”
টিকাঃ
[৪৭১] বুখারি, ৩৮২৫।
[৪৭২] বুখারি, ১৮৩৩।
📄 দাগি আসামীদের মৃত্যুদণ্ড
সাধারণ ক্ষমা বহাল থাকলেও কিছু দাগী অপরাধীকে সেদিন মৃত্যুদণ্ড দেন আল্লাহর রাসূল মুহাম্মাদ । তাদের দেখামাত্র হত্যার নির্দেশ দেন, এমনকি তারা কা'বা শরীফের গিলাফ ধরে ঝুলে থাকলেও। অবশেষে তাদের ঘিরে ধরেছে আল্লাহর ক্রোধ। প্রশস্ত পৃথিবী তাদের কাছে সংকীর্ণ হয়ে এসেছে। ইসলামবিরোধী যুদ্ধে অংশগ্রহণের দায়ে দোষী সমগ্র মক্কাবাসী। এর মাঝে মাত্র চার জনকে সেদিন হত্যা করা হয়। ইবনু খাতাল, মিকইয়াস ইবনু সুবাবা, হারিস ইবনু নুফাইল এবং ইবনু খাতালের এক দাসী। কিছু কিছু সূত্রে অবশ্য উল্লেখ করা হয়েছে যে, হারিস ইবনু তালাতিল খুযাঈ এবং উন্মু সা'দও মৃত্যুদণ্ড পেয়েছে। তবে উম্মু সা'দ সম্ভবত ইবনু খাতালের সেই দাসীও হতে পারে। তাই সব মিলিয়ে এমন আসামীর সংখ্যা সর্বোচ্চ ছয়।
আরও চার জন মৃত্যুদণ্ড এড়াতে পেরেছিলেন সেদিন। প্রথমে পালিয়ে গিয়ে লুকিয়েছিলেন তারা। তারপর ফিরে এসে ইসলাম গ্রহণের কথা জানান। ফলে মাফ করে দেওয়া হয় তাদের। এরা হলেন আবদুল্লাহ ইবনু সা'দ ইবনি আবী সার্হ, ইকরিমা ইবনু আবী জাহল, হাব্বার ইবনুল আসওয়াদ এবং ইবনু খাতালের আরেক দাসী। কিছু উৎসে কা'ব ইবনু যুহাইর, ওয়াহশি ইবনু হারব এবং হিন্দ বিনতু উতবার নামও উল্লেখ করা হয়। সব মিলিয়ে সাত জন। রদিয়াল্লাহু আনহুম।
মৃত্যুদণ্ড না পেলেও সফওয়ান ইবনু উমাইয়া, যুহাইর ইবনু আবী উমাইয়া এবং সুহাইল ইবনু আমরসহ অনেকে প্রাণভয়ে লুকিয়ে ছিলেন। পরে তাদের সকলেই ইসলাম গ্রহণ করেন। রদিয়াল্লহু আনহুম।
📄 বিজয়-সালাত
মধ্যাহ্নের দিকে রাসূল তাঁর চাচাতো বোন উম্মু হানি বিনতু আবী তালিব (রদিয়াল্লাহু আনহা)-এর ঘরে যান। তিনি সেখানে গোসল সেরে দুই দুই করে মোট আট রাকাআত সালাত আদায় করেন।
উম্মু হানির দুই মুশরিক দেবর লুকিয়ে ছিল সে ঘরেই। আলি (রদিয়াল্লাহু আনহু) যখন টের পেয়ে গেলেন যে, তার বোন দুই জন মুশরিককে ইচ্ছে করে লুকিয়ে রেখেছে। সাথে সাথে তাদের হত্যা করতে উদ্যত হন। উম্মু হানি (রদিয়াল্লাহু আনহা) এসে নবিজি -এর কাছে অনুযোগ করেন। জবাবে নবি বলেন, "তুমি যাকে নিরাপত্তা দিয়েছ, আমরাও তাকে নিরাপত্তা দিয়েছি।"
টিকাঃ
[৪৭৩] বুখারি, ১১০৩।
[৪৭৪] বুখারি, ৩৫৭।
📄 কা’বার ছাদে বেলালের আযান
যুহরের ওয়াক্ত হলে বিলাল ইবনু রবাহ (রদিয়াল্লাহু আনহু)-কে ডাক দেন নবি ﷺ। তারপর কা'বার ছাদে উঠে তাঁকে আযান দেওয়ার আদেশ করেন। কা'বার ছাদ থেকে বিলালের কণ্ঠে ধ্বনিত হলো আযান। এ তো শুধু সালাতের আহ্বান নয়, ইসলামের প্রতাপ ও বিজয়ের ঘোষণাও বটে। আল্লাহর পবিত্র ঘরে আল্লাহরই বড়ত্ব ঘোষণা হতে শুনে কতই-না শান্তি পেয়েছে মুমিনের কান! আর কতই-না অক্ষম রাগে ফেটে পড়েছে মুশরিকদের হৃদয়! বিশ্বজাহানের রব আল্লাহ তাআলার জন্যই সমস্ত প্রশংসা।