📘 রাসূলে আরাবি ﷺ > 📄 নবি ﷺ-এর মক্কায় প্রবেশ

📄 নবি ﷺ-এর মক্কায় প্রবেশ


সেদিন সকালেই শিবির ছেড়ে মক্কার উদ্দেশে রওনা হন নবি ﷺ। আব্বাস (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-কে নির্দেশ দেন আবূ সুফইয়ান ইবনু হারব (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-কে উপত্যকার শেষ মাথায় পাহাড়ের চূড়ায় নিয়ে যেতে। মুসলিম বাহিনীর কুচকাওয়াজ যেন ভালো করে চোখে পড়ে তার। আব্বাস তা-ই করেন। আর আবূ সুফইয়ান অবাক বিস্ময়ে দেখেন সাগরের মতো সুবিশাল এক সেনাদলকে।
একেকটি গোত্রের হাতে একেক রঙের পতাকা। একটি দল পার হয় আর আবূ সুফইয়ান তাদের নাম জিজ্ঞেস করেন। গোত্রটির নাম জানার পর বলেন, "এদের সাথে আমার কী সম্পর্ক?”
তারপর সা'দ ইবনু উবাদা (রদিয়াল্লাহু আনহু)-এর নেতৃত্বে দৃপ্ত পদক্ষেপে আসে আনসারদের দলটি। পতাকাবাহী সা'দ ইবন উবাদা আবূ সুফইয়ানকে দেখতে পেয়ে ডেকে ওঠেন, "আবু সুফইয়ান, আজ সংঘর্ষ আর রক্তপাতের দিন, আজকে কা'বার পবিত্রতা উঠিয়ে নেওয়া হয়েছে!!"
আবু সুফইয়ান পাশ ফিরে বললেন, “আব্বাস, ধ্বংস আর রক্তপাতের দিন মুবারক হোক!"
সবশেষে আসা দলটিকে দেখে আবূ সুফইয়ান যথারীতি বললেন, “আব্বাস, এরা কারা?” আব্বাস জানালেন যে, এবার মুহাজির ও আনসারদের সারি সাথে নিয়ে স্বয়ং নবি যাচ্ছেন। আবূ সুফইয়ান আবারো ভালো করে দেখলেন। বললেন, “কার সাধ্যি এদের থামানোর? আপনার ভাতিজার রাজ্য আজ সত্যিই চোখ-ধাঁধানো আকৃতি লাভ করেছে।"
আব্বাস বললেন, “এটি হলো নুবুওয়াত।”
দীর্ঘশ্বাস ফেললেন আবূ সুফইয়ান, “হ্যাঁ। বাস্তবেই।”
সা'দের ওই কথাটি আবূ সুফইয়ানকে ভীষণ ভীত করে রেখেছিল। নবিজির কাছে এ কথার ব্যাপারে অনুযোগ করেন তিনি। রাসূল খুবই রাগ করেন সা'দের এমন দাম্ভিক উক্তি শুনে। জবাব দেন,
“সা'দ মিথ্যা বলেছে। আজকের এই দিনে আল্লাহ তাআলা কা'বাকে সম্মানিত করবেন। আজ কা'বাকে গিলাফ পরানো হবে।”
এই বলে নবি সা'দের হাত থেকে পতাকা ছিনিয়ে নিয়ে তাঁরই ছেলে কাইস (রদিয়াল্লাহু আনহু)-এর হাতে তুলে দেন। বিজয়ের আনন্দের অতিশয্যে মক্কাবাসীদের ওপর হয়তো জুলুম করে ফেলবেন সা'দ (রদিয়াল্লাহু আনহু), এমন শঙ্কা থেকেই নবি এমন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন।
ওদিকে আবূ সুফইয়ান ইবনু হারব (রদিয়াল্লাহু আনহু) দ্রুত মক্কায় ফিরে গিয়ে লোক জড়ো করে ঘোষণা দিলেন,
"ওহে কুরাইশ জনগণ, যে সেনাশিবির দেখেছিলাম, ওটা মুহাম্মাদের। তিনি আজ অপ্রতিরোধ্য এক সেনাদল নিয়ে এগিয়ে আসছেন। আজ তাঁদের কেউ ঠেকাতে পারবে না। এ জন্যে তিনি বলেছেন, যারা যারা আবু সুফইয়ানের ঘরে প্রবেশ করবে, তারা নিরাপদ।"
কেউ একজন রাগত-কণ্ঠে বলে উঠলেন, “আপনার ওপর আল্লাহর লা'নত! আপনার ঘরে কতজন লোকেরই-বা জায়গা হবে?"
আবূ সুফইয়ান বললেন, “এবং যারা নিজ নিজ ঘরের দরজা ভেতর থেকে বন্ধ করে রাখবে, তারাও নিরাপদ। আবার যারা কা'বায় ঢুকে যাবে, তারাও নিরাপদ।” এ কথা শুনেই সবাই ছত্রভঙ্গ হয়ে দ্রুত নিজ নিজ ঘরে, আর কা'বার দিকে ছুটতে থাকে।
এদিকে নবি এসে পৌঁছালেন যূ-তুওয়ায়। খালিদ ইবনুল ওয়ালীদ (রদিয়াল্লাহু আনহু)-কে নির্দেশ দিলেন বামদিকের সেনাসারিকে নিয়ে 'কুদা' হয়ে মক্কার নিম্নভূমিতে প্রবেশ করতে। কুরাইশদের কেউ বাধা দিতে আসলেই কতল। সেনা-সারিটি সাফা পর্বতের কাছে গিয়ে আবার নবি-এর সাথে মিলিত হবে।
নবিজির পতাকাবাহী এবং ডান সেনা-সারির নেতা যুবাইর ইবনুল আওয়াম (রদিয়াল্লাহু আনহু)-কে বলা হলো 'কাদা'র ওপরের অংশ দিয়ে মক্কায় ঢুকতে। সামনে এগিয়ে গিয়ে পতাকা গাড়তে হবে হাজুনে। নবিজি এসে পৌঁছানো পর্যন্ত সেখানেই অপেক্ষা করবেন তিনি। আর পদাতিক বাহিনী ও নিরস্ত্র সেনাদের নেতা আবু উবাইদা ইবনুল জাররাহ (রদিয়াল্লাহু আনহু) 'বাতনু ওয়াদি' দিয়ে মক্কায় নামবেন। তারই পেছন পেছন আসবেন আল্লাহর রাসূল।
কুরাইশরা এ-সময় সফওয়ান ইবনু উমাইয়া, ইকরিমা ইবনু আবী জাহল এবং সাহল ইবনু আমরের নেতৃত্বে খান্দামায় একটি সেনাদল নিযুক্ত করে। এটাই আজ তাদের প্রথম প্রতিরক্ষা-সারি এবং এটাই শেষ। মুসলিম সেনাবাহিনীর হাতে যদি এদের পতন ঘটে, তাহলে মক্কার ওপর মুসলিম-আধিপত্য মেনে নেওয়া ছাড়া আর কোনও বিকল্প রইবে না। আসলেও সেদিন কুরাইশদের সামনে আল্লাহর ফায়সালা মেনে নেওয়া ছাড়া আর কোনও উপায় ছিল না। দীর্ঘ প্রায় একুশ বছর ধরে সব অত্যাচার-আক্রমণকে দাঁতে দাঁত চেপে সহ্য ও প্রতিরোধ করেছে মুসলিমরা। আজ সময় এসেছে অবিসংবাদিত ও চূড়ান্ত বিজয়ী হিসেবে আল্লাহর রাসূল -এর মক্কায় প্রবেশ করার।
খালিদ-বাহিনীর সাথে মাক্কি প্রতিরোধ বাহিনীর হালকা সংঘর্ষ হয়। ফলে বারো জন মুশরিক নিহত হয়, বাকিরা পিঠটান দেয় মক্কার দিকে। এরপর বিনা বাধায় মক্কায় ঢুকে পড়েন খালিদ ইবনুল ওয়ালীদ (রদিয়াল্লাহু আনহু) ও তাঁর দল। নির্বিঘ্নে কুচকাওয়াজ করতে করতে এগিয়ে চলেন মক্কার রাজপথ আর অলিগলি ধরে। অবশ্য তাদের থেকে পৃথক হয়ে পড়া দু'জন সাহাবি শহীদও হয়েছিলেন। অবশেষে সাফা পাহাড়ের কাছে এসে কথামতো নবি -এর সাথে সাক্ষাৎ করেন খালিদ।
ওদিকে যুবাইর (রদিয়াল্লাহু আনহু) হাজনে পৌঁছে ফাতহ মাসজিদের কাছে পতাকা গাড়েন। উম্মু সালামা এবং মাইমুনা (রদিয়াল্লাহু আনহুমা)-এর জন্য সেখানে একটি তাঁবু খাটান তিনি। তারপর তাঁরা নবিজি -এর নির্দেশমতো তাঁর আসার অপেক্ষায় থাকেন। নবিজি সেখানে পৌঁছে একটু বিশ্রাম করে আবূ বকর (রদিয়াল্লাহু আনহু)-কে সাথে নিয়ে আবারও এগোতে শুরু করেন।
অবশেষে আল্লাহর নির্ধারিত সেই মুহূর্ত চলে আসে। তাঁর বান্দারা এখন স্বাধীনভাবে তাঁর ইবাদাত করবে। বিজয়ী, অথচ বিনয়ী বেশে অনুসারীদের মধ্যমণি হয়ে সূরা ফাতহ তিলাওয়াত করতে করতে মক্কায় প্রবেশ করেন মুহাম্মাদ ﷺ। হাজরে আসওয়াদে চুমু দিয়ে কা'বা তওয়াফ করেন তিনি। নিজেদের কব্জায় থাকাকালে কা'বায় ৩৬০টি মূর্তি স্থাপন করেছিল মুশরিকরা। নবি ﷺ তাঁর হাতের লাঠি দিয়ে প্রতিটাকে খোঁচা মারেন আর তিলাওয়াত করেন,
“সত্য এসেছে এবং মিথ্যা বিলুপ্ত হয়েছে। নিশ্চয় মিথ্যা বিলুপ্ত হওয়ারই ছিল। "
“সত্য এসে গেছে আর মিথ্যার উৎপত্তি হবে না এবং এর পুনরুদ্ভবও হবে না।”
লাঠির সেই খোঁচায় মূর্তিগুলো ভেঙে টুকরা টুকরা হয়ে নিজ নিজ চেহারার ওপর পড়তে থাকে।

টিকাঃ
[৪৬৫] বুখারি, ৪২৮০; ইবনু হিশাম, ৩১/৪।
[৪৬৬] সূরা ইসরা, ১৭:৮১।
[৪৬৭] সূরা সাবা, ৩৪ : ৪৯।
[৪৬৮] বুখারি, ৪২৮৭।

📘 রাসূলে আরাবি ﷺ > 📄 কা’বা পবিত্রকরণ ও সালাত আদায়

📄 কা’বা পবিত্রকরণ ও সালাত আদায়


আল্লাহর ঘর তওয়াফ শেষে উসমান ইবনু তালহাকে ডাকিয়ে আনেন রাসূল। উসমান কা'বার চাবি-রক্ষক। তার কাছ থেকে চাবি নিয়ে নবিজি কা'বার দরজা খোলেন। ভেতরে রাখা মূর্তিগুলোও বের করে এনে ভেঙে ফেলা হয়, মিটিয়ে দেওয়া হয় সব ছবি ও চিত্র। এরপর উসামা ইবনু যাইদ এবং বিলাল (রদিয়াল্লাহু আনহুমা)-কে সাথে নিয়ে নবিজি ভেতরে ঢুকে কা'বার দরজা আটকে দেন। সামনের দেয়ালের দিকে মুখ করে এ থেকে প্রায় তিন হাত দূরত্বে দাঁড়ান তিনি। একটি খুঁটি বামদিকে, দুটি ডানদিকে আর পেছনে তিনটি। সেখানে দাঁড়িয়ে নবি দু-রাকাআত সালাত আদায় করেন। তারপর আল্লাহর হামদ ও সানা পাঠ করতে করতে হেঁটে বেড়ান মাসজিদুল হারাম ঘিরে।

টিকাঃ
[৪৬৯] বুখারি, ১৬০১।

📘 রাসূলে আরাবি ﷺ > 📄 শত্রুদের পরিণাম

📄 শত্রুদের পরিণাম


নবিজি যখন দরজা খুলে বেরিয়ে আসেন, ততক্ষণে চারপাশে কুরাইশদের ভিড় জমে গেছে। দুরুদুরু বুকে তারা বিজয়ী প্রতিপক্ষের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায়। কা'বার দরজার কাঠামো ধরে দাঁড়ান মহানবি । কুরাইশরা সবাই এসে তাঁর সামনে জড়ো হয়। একসময়কার দুর্বিনীত নিপীড়ক, আজ তারা সবাই সবিনয়ে উপস্থিত। নবি একটি দীর্ঘ বক্তব্য রাখেন। বিশদভাবে ব্যাখ্যা করেন ইসলামের কিছু আদেশ-নিষেধ এবং বাতিল করেন সকল মুশরিকি প্রথা-প্রচলন। তারপর প্রশ্ন রাখেন, “কুরাইশগণ, আমার কাছ থেকে কেমন আচরণ আশা করেন?"
কুরাইশরা উত্তর দেয় “সবচেয়ে উত্তম আচরণ। আপনি আমাদের সম্মানিত এক ভাই এবং সম্মানিত এক ভাইয়ের সন্তান।” নবি জবাব দেন,
“আজ আপনাদের প্রতি কোনও আক্রোশ নেই। যান, আপনারা সবাই মুক্ত।”
ধীর পায়ে নেমে এসে মাসজিদ প্রাঙ্গণে বসেন নবি । উসমান ইবনু তালহার হাতে চাবি বুঝিয়ে দিয়ে বলেন, “চাবিটা তোমার কাছে আজীবন থাকবে। যে ছিনিয়ে নিতে চাইবে, সে জালিম।”

টিকাঃ
[৪৭০] তাবারানি, আল-মু'জামুল আওসাত, ১/১৫৫।

📘 রাসূলে আরাবি ﷺ > 📄 আনুগত্য স্বীকার

📄 আনুগত্য স্বীকার


সাফা পাহাড়ে উঠে আসেন রাসূলুল্লাহ। কা'বা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে এখান থেকে। দুআ করার জন্য হাত তোলেন তিনি। দুআ শেষে দলে দলে মানুষ আসতে থাকে তাঁর কাছে। উদ্দেশ্য, ইসলাম গ্রহণ এবং আনুগত্যের বাইআত গ্রহণ। প্রিয় সাহাবি আবু বকর (রদিয়াল্লাহু আনহু)-এর বাবা আবু কুহাফাও সেদিন ঈমান আনেন (রদিয়াল্লাহু আনহু)। বিষয়টি নবিজি-কে দারুণভাবে আনন্দিত করে। অনেক নারীও সেদিন ইসলাম গ্রহণ করতে আসে। হাত স্পর্শ করা ছাড়া নবি তাদের সবাইকে এই শপথবাক্য পড়ান,
“তোমরা আল্লাহর সাথে কোনোকিছু শরীক করবে না, চুরি করবে না, ব্যভিচার করবে না, সন্তানদের হত্যা করবে না, কারও প্রতি অপবাদ আরোপ করবে না এবং সৎকাজে আমার অবাধ্যতা করবে না।"
সেদিনের বাইআত-গ্রহীতা নারীদের মাঝে আবূ সুফইয়ানের স্ত্রী হিন্দ বিনতু উতবাও ছিলেন। তিনি ঘোমটা দিয়ে ছদ্মবেশে এসেছিলেন, প্রাণ নিয়ে শঙ্কিত ছিলেন। হামযা (রদিয়াল্লাহু আনহু)-এর সাথে তার আচরণ ক্ষমার অযোগ্য। প্রতিশোধ গ্রহণ করবে এই আতঙ্কে তিনি অস্থির। শপথ নেওয়ার পর তিনি বলেন,
“হে আল্লাহর রাসূল, একটা সময় পৃথিবীর বুকে আপনার তাঁবুই ছিল আমার কাছে সবচেয়ে বেশি ঘৃণিত। আর আজ আমার কাছে পৃথিবীজুড়ে আপনার তাঁবুর চেয়ে অধিক প্রিয় কোনও তাঁবু নেই।”
নবি ও জবাব দেন, “যাঁর হাতে মুহাম্মাদের প্রাণ, সেই সত্তার কসম! এমনটিই হওয়ার ছিল।”
নবিজির মাজলিসের নিচে বসে তাঁর কথা অন্যদের কাছে পৌঁছে দিচ্ছিলেন উমর ইবনুল খাত্তাব (রদিয়াল্লাহু আনহু)। শপথ গ্রহণের তদারকের দায়িত্বে ছিলেন তিনি।
কেউ কেউ ইসলামের তরে হিজরত করার বাসনা প্রকাশ করে বাইআত করতে আসেন। কিন্তু নবি বলে দেন,
"মুহাজিররা এতদিনে হিজরতের সব সাওয়াব নিয়ে নিয়েছে। মক্কা যেহেতু বিজিত হয়ে গেছে, তাই মক্কা থেকে আর কোনও হিজরত নেই। তবে হ্যাঁ, জিহাদ এবং নিয়তের দরজা এখনও খোলা রয়েছে। আর যখন আল্লাহর রাস্তায় যুদ্ধ করার আহ্বান আসবে, তখনই বেরিয়ে পড়বে।”

টিকাঃ
[৪৭১] বুখারি, ৩৮২৫।
[৪৭২] বুখারি, ১৮৩৩।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00