📄 মক্কার পথে
অষ্টম হিজরির ১০ রমাদান। মক্কার উদ্দেশ্যে মদীনা থেকে বেরোলেন নবিজি । সাথে আছেন পুরো দশ হাজার সাহাবি। মদীনার দায়িত্বে রেখেছেন আবূ রুহম গিফারি (রদিয়াল্লাহু আনহু)-কে। জুহফায় এসে নবিজি তাঁর চাচা আব্বাস (রদিয়াল্লাহু আনহু)-এর দেখা পান। ইসলাম গ্রহণ করে মাত্রই সপরিবারে মদীনায় আসছিলেন তিনি।
নবি -এর চাচাতো ভাই আবূ সুফইয়ান ইবনুল হারিস এবং ফুপাতো ভাই আবদুল্লাহ ইবনু আবী উমাইয়াও এ পথ ধরেই যাচ্ছিলেন। 'আবওয়া' নামক স্থানে তারা নবিজির সাথে সাক্ষাৎ করেন। কিন্তু নবিজি তাদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নেন। দু'জনেই এককালে ব্যঙ্গবিদ্রূপের মাধ্যমে অনেক কষ্ট দিয়েছিল রাসূলুল্লাহ -কে। নবিজিকে মুখ ফিরিয়ে নিতে দেখে উম্মুল মুমিনীন উম্মু সালামা (রদিয়াল্লাহু আনহা) নবিজিকে বলেন, “এমন হওয়া তো উচিত নয় যে, আপনারই চাচাতো, ফুপাতো ভাইয়েরা সবচেয়ে বেশি দুর্ভাগা হবে?” আর আলি (রদিয়াল্লাহু আনহু) আবূ সুফইয়ানকে উপদেশ দেন, নবিজি -এর কাছে গিয়ে ইউসুফ (আলাইহিস সালাম)-এর ভাইদের মতো করে ক্ষমা চাইতে। তারা বলেছিল:
“আল্লাহর কসম করে বলছি, আল্লাহ তোমাকে আমাদের ওপর প্রাধান্য দিয়েছেন। আর নিশ্চয়ই আমরা পাপাচারী।”
লজ্জিত আবূ সুফইয়ান নবিজির কাছে এসে ওই কথারই পুনরাবৃত্তি করে। ফলে নবিজি -ও ঠিক সেই জবাবই দেন, যা ইউসুফ (আলাইহিস সালাম) দিয়েছিলেন তাঁর ভাইদের উদ্দেশ্যে:
"আজ তোমাদের প্রতি কোনও আক্রোশ নেই। আল্লাহ তোমাদের ক্ষমা করুন। তিনি সব দয়ালুর চাইতে অধিক দয়ালু।”
ক্ষমা পেয়ে উল্লসিত আবূ সুফইয়ান কয়েকটি পঙ্ক্তি আবৃত্তি করে রাসূলুল্লাহ -এর প্রশংসা করেন এবং নিজের অপারগতা প্রকাশ করেন।
কাদীদে পৌঁছানোর পর নবিজি দেখেন সাহাবিদের সিয়াম ধরে রাখা কষ্টকর হয়ে যাচ্ছে। তাই তিনি নিজে সিয়াম ভেঙে সাহাবিদেরও ভাঙার নির্দেশ দেন। তারপর যাত্রা পুনরারম্ভ করে প্রায় ইশার ওয়াক্তে এসে পৌঁছান মাররুয যাহরানে। প্রতিটি সৈনিককে নিজের জন্য একটি করে আগুন জ্বালাতে বলা হয়। ফলে পুরো এলাকায় জ্বলজ্বল করে জ্বলে ওঠে দশ হাজার আগুন। পুরো বিষয়টি তদারক করেন উমর ইবনুল খাত্তাব (রদিয়াল্লাহু আনহু)।
এতগুলো আগুন দেখে তাঁবুর সংখ্যা চিন্তা করে মাথা ঘুরে যায় মুশরিক সেনাপতি আবূ সুফইয়ান ইবনু হারবের। হাকীম ইবনু হিযাম আর বুদাইল ইবনু ওয়ারাকা তার সাথেই ছিল। তাদের এই দৃশ্য দেখিয়ে বলেন, “এর আগে এত বিরাট শিবির আর আগুন আমার জীবনে কখনও দেখিনি!”
বুদাইল বললেন, “এরা মনে হচ্ছে খুযাআ?”
আবূ সুফইয়ান বললেন, “খুযাআ তো এরচেয়ে অনেক কম এবং দুর্বল। তাদের সাধ্য নেই এতবড় সেনাবাহিনী তৈরি করার।"
টিকাঃ
[৪৫৯] এই আবূ সুফইয়ান এবং মুশরিকদের সেনাপতি আবু সুফইয়ান ইবনু হারব আলাদা ব্যক্তি।
[৪৬০] সূরা ইউসুফ, ১২: ৯১।
[৪৬১] সূরা ইউসুফ, ১২: ৯২।
[৪৬২] ইবনুল কাইয়িম, যাদুল মাআদ, ২/১৬২-১৬৩।
[৪৬৩] বুখারি, ৪২৭৫।
📄 নবিজি ﷺ-এর কাছে আবূ সুফইয়ান
নবিজি -এর খচ্চরের পিঠে চড়ে ঘোরাফেরা করছিলেন আব্বাস (রদিয়াল্লাহু আনহু)। এমন সময় একটি কণ্ঠস্বর শুনে সাথে সাথে চিনে ফেলেন তিনি। ডেকে ওঠেন, “আবু হানযালা নাকি?”
আবূ সুফইয়ান জবাব দেন, “জি। আপনি কি আবুল ফাদল?”
“হ্যাঁ।”
“আমার বাবা-মা আপনার জন্য কুরবান হোক! বলুন তো, ঘটনা কী?”
“ঘটনা কিছুই না। আল্লাহর রাসূল তাঁর সেনাদল নিয়ে বের হয়েছেন। কুরাইশদের ধ্বংস অত্যাসন্ন।”
"আমার বাবা-মা আপনার জন্য কুরবান হোক! এখন উপায়?”
“মুসলিমরা কেউ আপনার উপস্থিতি টের পেলে সাথে সাথে মেরে ফেলবে। আসেন, আমার খচ্চরের পেছনে ওঠেন। আমি আপনাকে সরাসরি নবিজির কাছে নিয়ে যাচ্ছি।”
আবূ সুফইয়ান উঠে বসলেন আব্বাসের খচ্চরের পেছনে। দু'জনে গিয়ে পৌঁছালেন নবিজি -এর সাথে সাক্ষাৎ করতে। উমর ইবনুল খাত্তাব (রদিয়াল্লাহু আনহু) দেখামাত্র বললেন, “আবূ সুফইয়ান, আল্লাহর শত্রু! সমস্ত প্রসংশা আল্লাহর, যিনি তোমাকে কোনও চুক্তি ছাড়াই আমাদের কব্জায় তুলে দিলেন।”
অনাহৃত এই অতিথির কথা নবিজি -কে জানাতে ছুটে গেলেন উমর (রদিয়াল্লাহু আনহু)। আব্বাস (রদিয়াল্লাহু আনহু) খচ্চর চালিয়ে উমরের আগেই পৌঁছে গেলেন। উমর তাতে দমার পাত্র নন। নবিজি -এর কাছে গিয়ে আবূ সুফইয়ানকে হত্যার অনুমতি চান তিনি।
আব্বাস বাধা দিলেন, “আমি নিরাপত্তা দিয়েছি উনাকে।” তারপর তিনি আলতো করে নবিজির মাথায় হাত রেখে বলেন, "আজ রাতে আল্লাহর রাসূলের সাথে শুধু আমি কথা বলব।" উমর বারংবার অনুমতি চাইতে থাকেন আবূ সুফইয়ানকে হত্যার। কিন্তু নবি কিছু না বলে চুপ থাকেন।
কিছুক্ষণ পর আব্বাসকে নবিজি বলেন, "উনাকে (আবূ সুফইয়ানকে) আপনার ঘরে নিয়ে যান। কাল সকালে আমার নিকট নিয়ে আসবেন।”
সকাল হলো, আবূ সুফইয়ানও এল। নবি ﷺ তাঁকে বললেন, "আবূ সুফইয়ান, আপনার জন্য আফসোস! আপনার কি এখনও সময় আসেনি আল্লাহকে একমাত্র উপাস্য বলে মেনে নেওয়ার?”
আবূ সুফইয়ান বললেন, “আমার বাবা-মা আপনার তরে কুরবান হোক! আপনি কতই-না দয়ালু, নম্র আর মহান! আল্লাহ ছাড়া যদি আর কোনো উপাস্য থাকতই, তাহলে আজ পর্যন্ত নিশ্চয়ই সে আমার কোনো-না-কোনো সাহায্য করত।”
নবি ﷺ আবারও বললেন, “আবূ সুফইয়ান, আপনার জন্য আফসোস! আপনার কি এখনও সময় আসেনি আমাকে নবি ও রাসূল বলে মেনে নেওয়ার?”
আবূ সুফইয়ান বললেন, “এটা নিয়ে আমার এখনও একটু সন্দেহ আছে।”
আব্বাস (রাদিয়াল্লাহু আনহু) মাঝপথে বাধা দিলেন, “এটা বোঝার আগে আগেই আপনার গর্দান কাটা যাবে। ইসলাম গ্রহণ করে নিন।” এরপর আবূ সুফইয়ান ইবনু হারব (রাদিয়াল্লাহু আনহু) কালিমাতুশ শাহাদাহ পাঠ করে ইসলামে প্রবেশ করেন।
আব্বাস (রাদিয়াল্লাহু আনহু) অনুনয় করলেন, “ইয়া রাসূলাল্লাহ, আবূ সুফইয়ান মর্যাদা ভালোবাসে। ওনাকে একটু মর্যাদা দিয়ে দিন।”
নবি ﷺ বললেন, “হ্যাঁ। যে কেউ আবূ সুফইয়ানের ঘরে প্রবেশ করবে, সে নিরাপদ। যে কেউ নিজ নিজ ঘরের দরজা আটকে দেবে, সেও নিরাপদ। আর যারা মাসজিদুল হারামের ভেতরে প্রবেশ করবে, তারাও নিরাপদ।”
টিকাঃ
[৪৬৪] মুসলিম, ১৭৮০; তহাবি, শারহু মাআনিল আসার, ৩/৩২০।
📄 নবি ﷺ-এর মক্কায় প্রবেশ
সেদিন সকালেই শিবির ছেড়ে মক্কার উদ্দেশে রওনা হন নবি ﷺ। আব্বাস (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-কে নির্দেশ দেন আবূ সুফইয়ান ইবনু হারব (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-কে উপত্যকার শেষ মাথায় পাহাড়ের চূড়ায় নিয়ে যেতে। মুসলিম বাহিনীর কুচকাওয়াজ যেন ভালো করে চোখে পড়ে তার। আব্বাস তা-ই করেন। আর আবূ সুফইয়ান অবাক বিস্ময়ে দেখেন সাগরের মতো সুবিশাল এক সেনাদলকে।
একেকটি গোত্রের হাতে একেক রঙের পতাকা। একটি দল পার হয় আর আবূ সুফইয়ান তাদের নাম জিজ্ঞেস করেন। গোত্রটির নাম জানার পর বলেন, "এদের সাথে আমার কী সম্পর্ক?”
তারপর সা'দ ইবনু উবাদা (রদিয়াল্লাহু আনহু)-এর নেতৃত্বে দৃপ্ত পদক্ষেপে আসে আনসারদের দলটি। পতাকাবাহী সা'দ ইবন উবাদা আবূ সুফইয়ানকে দেখতে পেয়ে ডেকে ওঠেন, "আবু সুফইয়ান, আজ সংঘর্ষ আর রক্তপাতের দিন, আজকে কা'বার পবিত্রতা উঠিয়ে নেওয়া হয়েছে!!"
আবু সুফইয়ান পাশ ফিরে বললেন, “আব্বাস, ধ্বংস আর রক্তপাতের দিন মুবারক হোক!"
সবশেষে আসা দলটিকে দেখে আবূ সুফইয়ান যথারীতি বললেন, “আব্বাস, এরা কারা?” আব্বাস জানালেন যে, এবার মুহাজির ও আনসারদের সারি সাথে নিয়ে স্বয়ং নবি যাচ্ছেন। আবূ সুফইয়ান আবারো ভালো করে দেখলেন। বললেন, “কার সাধ্যি এদের থামানোর? আপনার ভাতিজার রাজ্য আজ সত্যিই চোখ-ধাঁধানো আকৃতি লাভ করেছে।"
আব্বাস বললেন, “এটি হলো নুবুওয়াত।”
দীর্ঘশ্বাস ফেললেন আবূ সুফইয়ান, “হ্যাঁ। বাস্তবেই।”
সা'দের ওই কথাটি আবূ সুফইয়ানকে ভীষণ ভীত করে রেখেছিল। নবিজির কাছে এ কথার ব্যাপারে অনুযোগ করেন তিনি। রাসূল খুবই রাগ করেন সা'দের এমন দাম্ভিক উক্তি শুনে। জবাব দেন,
“সা'দ মিথ্যা বলেছে। আজকের এই দিনে আল্লাহ তাআলা কা'বাকে সম্মানিত করবেন। আজ কা'বাকে গিলাফ পরানো হবে।”
এই বলে নবি সা'দের হাত থেকে পতাকা ছিনিয়ে নিয়ে তাঁরই ছেলে কাইস (রদিয়াল্লাহু আনহু)-এর হাতে তুলে দেন। বিজয়ের আনন্দের অতিশয্যে মক্কাবাসীদের ওপর হয়তো জুলুম করে ফেলবেন সা'দ (রদিয়াল্লাহু আনহু), এমন শঙ্কা থেকেই নবি এমন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন।
ওদিকে আবূ সুফইয়ান ইবনু হারব (রদিয়াল্লাহু আনহু) দ্রুত মক্কায় ফিরে গিয়ে লোক জড়ো করে ঘোষণা দিলেন,
"ওহে কুরাইশ জনগণ, যে সেনাশিবির দেখেছিলাম, ওটা মুহাম্মাদের। তিনি আজ অপ্রতিরোধ্য এক সেনাদল নিয়ে এগিয়ে আসছেন। আজ তাঁদের কেউ ঠেকাতে পারবে না। এ জন্যে তিনি বলেছেন, যারা যারা আবু সুফইয়ানের ঘরে প্রবেশ করবে, তারা নিরাপদ।"
কেউ একজন রাগত-কণ্ঠে বলে উঠলেন, “আপনার ওপর আল্লাহর লা'নত! আপনার ঘরে কতজন লোকেরই-বা জায়গা হবে?"
আবূ সুফইয়ান বললেন, “এবং যারা নিজ নিজ ঘরের দরজা ভেতর থেকে বন্ধ করে রাখবে, তারাও নিরাপদ। আবার যারা কা'বায় ঢুকে যাবে, তারাও নিরাপদ।” এ কথা শুনেই সবাই ছত্রভঙ্গ হয়ে দ্রুত নিজ নিজ ঘরে, আর কা'বার দিকে ছুটতে থাকে।
এদিকে নবি এসে পৌঁছালেন যূ-তুওয়ায়। খালিদ ইবনুল ওয়ালীদ (রদিয়াল্লাহু আনহু)-কে নির্দেশ দিলেন বামদিকের সেনাসারিকে নিয়ে 'কুদা' হয়ে মক্কার নিম্নভূমিতে প্রবেশ করতে। কুরাইশদের কেউ বাধা দিতে আসলেই কতল। সেনা-সারিটি সাফা পর্বতের কাছে গিয়ে আবার নবি-এর সাথে মিলিত হবে।
নবিজির পতাকাবাহী এবং ডান সেনা-সারির নেতা যুবাইর ইবনুল আওয়াম (রদিয়াল্লাহু আনহু)-কে বলা হলো 'কাদা'র ওপরের অংশ দিয়ে মক্কায় ঢুকতে। সামনে এগিয়ে গিয়ে পতাকা গাড়তে হবে হাজুনে। নবিজি এসে পৌঁছানো পর্যন্ত সেখানেই অপেক্ষা করবেন তিনি। আর পদাতিক বাহিনী ও নিরস্ত্র সেনাদের নেতা আবু উবাইদা ইবনুল জাররাহ (রদিয়াল্লাহু আনহু) 'বাতনু ওয়াদি' দিয়ে মক্কায় নামবেন। তারই পেছন পেছন আসবেন আল্লাহর রাসূল।
কুরাইশরা এ-সময় সফওয়ান ইবনু উমাইয়া, ইকরিমা ইবনু আবী জাহল এবং সাহল ইবনু আমরের নেতৃত্বে খান্দামায় একটি সেনাদল নিযুক্ত করে। এটাই আজ তাদের প্রথম প্রতিরক্ষা-সারি এবং এটাই শেষ। মুসলিম সেনাবাহিনীর হাতে যদি এদের পতন ঘটে, তাহলে মক্কার ওপর মুসলিম-আধিপত্য মেনে নেওয়া ছাড়া আর কোনও বিকল্প রইবে না। আসলেও সেদিন কুরাইশদের সামনে আল্লাহর ফায়সালা মেনে নেওয়া ছাড়া আর কোনও উপায় ছিল না। দীর্ঘ প্রায় একুশ বছর ধরে সব অত্যাচার-আক্রমণকে দাঁতে দাঁত চেপে সহ্য ও প্রতিরোধ করেছে মুসলিমরা। আজ সময় এসেছে অবিসংবাদিত ও চূড়ান্ত বিজয়ী হিসেবে আল্লাহর রাসূল -এর মক্কায় প্রবেশ করার।
খালিদ-বাহিনীর সাথে মাক্কি প্রতিরোধ বাহিনীর হালকা সংঘর্ষ হয়। ফলে বারো জন মুশরিক নিহত হয়, বাকিরা পিঠটান দেয় মক্কার দিকে। এরপর বিনা বাধায় মক্কায় ঢুকে পড়েন খালিদ ইবনুল ওয়ালীদ (রদিয়াল্লাহু আনহু) ও তাঁর দল। নির্বিঘ্নে কুচকাওয়াজ করতে করতে এগিয়ে চলেন মক্কার রাজপথ আর অলিগলি ধরে। অবশ্য তাদের থেকে পৃথক হয়ে পড়া দু'জন সাহাবি শহীদও হয়েছিলেন। অবশেষে সাফা পাহাড়ের কাছে এসে কথামতো নবি -এর সাথে সাক্ষাৎ করেন খালিদ।
ওদিকে যুবাইর (রদিয়াল্লাহু আনহু) হাজনে পৌঁছে ফাতহ মাসজিদের কাছে পতাকা গাড়েন। উম্মু সালামা এবং মাইমুনা (রদিয়াল্লাহু আনহুমা)-এর জন্য সেখানে একটি তাঁবু খাটান তিনি। তারপর তাঁরা নবিজি -এর নির্দেশমতো তাঁর আসার অপেক্ষায় থাকেন। নবিজি সেখানে পৌঁছে একটু বিশ্রাম করে আবূ বকর (রদিয়াল্লাহু আনহু)-কে সাথে নিয়ে আবারও এগোতে শুরু করেন।
অবশেষে আল্লাহর নির্ধারিত সেই মুহূর্ত চলে আসে। তাঁর বান্দারা এখন স্বাধীনভাবে তাঁর ইবাদাত করবে। বিজয়ী, অথচ বিনয়ী বেশে অনুসারীদের মধ্যমণি হয়ে সূরা ফাতহ তিলাওয়াত করতে করতে মক্কায় প্রবেশ করেন মুহাম্মাদ ﷺ। হাজরে আসওয়াদে চুমু দিয়ে কা'বা তওয়াফ করেন তিনি। নিজেদের কব্জায় থাকাকালে কা'বায় ৩৬০টি মূর্তি স্থাপন করেছিল মুশরিকরা। নবি ﷺ তাঁর হাতের লাঠি দিয়ে প্রতিটাকে খোঁচা মারেন আর তিলাওয়াত করেন,
“সত্য এসেছে এবং মিথ্যা বিলুপ্ত হয়েছে। নিশ্চয় মিথ্যা বিলুপ্ত হওয়ারই ছিল। "
“সত্য এসে গেছে আর মিথ্যার উৎপত্তি হবে না এবং এর পুনরুদ্ভবও হবে না।”
লাঠির সেই খোঁচায় মূর্তিগুলো ভেঙে টুকরা টুকরা হয়ে নিজ নিজ চেহারার ওপর পড়তে থাকে।
টিকাঃ
[৪৬৫] বুখারি, ৪২৮০; ইবনু হিশাম, ৩১/৪।
[৪৬৬] সূরা ইসরা, ১৭:৮১।
[৪৬৭] সূরা সাবা, ৩৪ : ৪৯।
[৪৬৮] বুখারি, ৪২৮৭।
📄 কা’বা পবিত্রকরণ ও সালাত আদায়
আল্লাহর ঘর তওয়াফ শেষে উসমান ইবনু তালহাকে ডাকিয়ে আনেন রাসূল। উসমান কা'বার চাবি-রক্ষক। তার কাছ থেকে চাবি নিয়ে নবিজি কা'বার দরজা খোলেন। ভেতরে রাখা মূর্তিগুলোও বের করে এনে ভেঙে ফেলা হয়, মিটিয়ে দেওয়া হয় সব ছবি ও চিত্র। এরপর উসামা ইবনু যাইদ এবং বিলাল (রদিয়াল্লাহু আনহুমা)-কে সাথে নিয়ে নবিজি ভেতরে ঢুকে কা'বার দরজা আটকে দেন। সামনের দেয়ালের দিকে মুখ করে এ থেকে প্রায় তিন হাত দূরত্বে দাঁড়ান তিনি। একটি খুঁটি বামদিকে, দুটি ডানদিকে আর পেছনে তিনটি। সেখানে দাঁড়িয়ে নবি দু-রাকাআত সালাত আদায় করেন। তারপর আল্লাহর হামদ ও সানা পাঠ করতে করতে হেঁটে বেড়ান মাসজিদুল হারাম ঘিরে।
টিকাঃ
[৪৬৯] বুখারি, ১৬০১।