📄 শাক এলাকার বিজয়
মুসলমানরা তাদের পিছু ধাওয়া করে সেখানেও অবরোধ করে ফেলেন। কিন্তু সেখান থেকে তারা অত্যন্ত মযবুত মুকাবিলার পূর্ণ প্রস্তুতি নিয়ে বাইরে বেরিয়ে আসে। তাদের এক বাহাদুর সামনে অগ্রসর হয়ে দ্বন্দযুদ্ধের আহ্বান জানায়। আবূ দুজানা সিমাক ইবনু খরাশা আনসারি (রদিয়াল্লাহু আনহু)-এর তরবারির নিচে কতল হয়ে যায়। এরপর আরেকজন বেরিয়ে আসে। তাকেও আবূ দুজানা (রদিয়াল্লাহু আনহু) নিমিষেই শেষ করে দেয়। এই অবস্থা দেখে বাকি সেনারা দুর্গে ঢুকে পড়ে। তাদের সাথে সাথে মুসলিমরাও সেখানে ঢুকে পড়ে এবং প্রচণ্ড লড়াই শেষে তাদের সেখান থেকেও বিতাড়িত করতে সক্ষম হয়। ফলে আবারও বিশাল পরিমাণ শস্য ও গবাদি পশু তাদের হস্তগত হয়।
ইয়াহুদিরা অগত্যা শাক এলাকার শেষ দুর্গ নিযারে গিয়ে আশ্রয় গ্রহণ করে। অপ্রতিরোধ্য মুসলিমরা এবার অবরোধ করেন নিযার দুর্গ। এ কেল্লাটাই সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয় মনে হচ্ছিল। কারণ, উঁচু এক পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থিত হওয়ায় সেখানে আক্রমণকারীদের পৌঁছানো প্রায় অসম্ভব। ইয়াহুদিরা তাই নারী-শিশুদের এই কেল্লাটাতে রেখেছিল। কোনও মুসলিম সেনাকে পাহাড়ে উঠতে দেখলে সাথে সাথে দুর্গ থেকে পাথর ও তির ছুড়ে মারতে থাকে তারা।
নতুন এই পরিস্থিতি সামাল দিতে মুসলিমরাও তৈরি করেন নতুন যুদ্ধাস্ত্র। নতুন সেই অস্ত্রটির নাম মিনজানীক। এটাকে গুলতির বড় সংস্করণ এবং ট্যাংকের আদিরূপ বলা চলে। এই মিনজানীক ব্যবহার করে বিরাট বিরাট পাথর ছুড়ে মারা হয় নিযারের দেয়ালে। বুদ্ধিটি বেশ কার্যকর প্রমাণিত হয়। এত কঠোরভাবে সুরক্ষিত দুর্গেরও অবশেষে পতন ঘটে। আরও একটি জনবসতির দখল হারিয়ে ইয়াহুদিরা সরে যায় কাতিবাহ অঞ্চলে। আর দখলকৃত দুর্গে মুসলিমরা পান তামা ও মাটির তৈরি মূল্যবান তৈজসপত্র। রাসূল -এর নির্দেশে তারা তা পরিষ্কার করে নেয় এবং রান্নার কাজে ব্যবহার করে।
📄 কাতিবাহ এলাকার বিজয়
আর একটি মাত্র ঘাঁটি বাকি। ক্লান্তিহীন মুসলিম মুজাহিদ বাহিনী সেখানেও হানা দেন। লক্ষ্য সেখানকার বাকি তিনটি দুর্গ। প্রায় দু-তিন সপ্তাহের এক দীর্ঘ অবরোধের পর কামূস দুর্গের পতন হয়। ইয়াহুদিরা এবার দেখল যে, ওয়াতীহ এবং সালালাম দুর্গও একসময় আক্রান্ত হতে বাকি রইবে না। তাই তারা এগিয়ে আসে শান্তিচুক্তির আলোচনায়। নিরাপত্তা নিশ্চিত করার শর্তে তারা সদলবলে নির্বাসনে যেতে রাজি হয়। নবি অনুমতি দেন। সেই সাথে সোনা, রুপা, ঘোড়া ও অস্ত্র ব্যতীত যা কিছু নিয়ে যাওয়া সম্ভব, তাও নেওয়ার অনুমতি প্রদান করেন।
কিন্তু যদি তারা কোনও কিছু লুকিয়ে রাখে কিংবা গোপনে সেগুলো নেওয়ার চেষ্টা করে, তাহলে চুক্তি বাতিল হয়ে যাবে। এরপর ইয়াহুদিরা দুটি কি তিনটি দুর্গ মুসলিমদের কাছে সমর্পণ করে দেয়। ফলে একশটি বর্ম, চারশটি তলোয়ার, এক হাজার বর্শা এবং পাঁচ শ আরব্য ধনুক হস্তগত হয় মুসলিমদের। হিব্রু ভাষায় লেখা কিছু পুস্তিকাও উদ্ধার করা হয়, তবে ইয়াহুদিদের অনুরোধে দয়াবশত সেগুলো তাদের ফিরিয়ে দেওয়া হয়।
তখনো আত্মসমর্পণ পুরোপুরি নির্ঝঞ্ঝাট হয়নি। কিনানা ইবনু আবিল হুকাইক ও তার ভাইসহ কয়েকজন গোত্রপতি মুসলিমদের না জানিয়ে বিপুল পরিমাণ স্বর্ণ, রুপা ও গহনা নিয়ে সটকে পড়তে চাইছিল। প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের দায়ে নিরাপদ-মুক্তির শর্ত বাতিল করে তাদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। বন্দিও করা হয় কয়েকজনকে। বন্দিদের মাঝে কিনানার বিধবা স্ত্রী সফিয়্যা বিনতু হুয়াই ইবনি আখতাবও ছিলেন। নবি পরে তাকে মুক্তি দিয়ে বিয়ে করে উম্মুল মুমিনীনের মর্যাদায় উন্নীত করেন। রদিয়াল্লাহু আনহা।
এভাবেই শেষ হয় দীর্ঘ এক যুদ্ধাভিযানের। একবারে শেষ হয়ে না গিয়ে এরপরে বিচ্ছিন্ন কয়েকটি খণ্ডযুদ্ধও হয়।
অধ্যায়ের যবনিকাপাতের সময় মুসলিম শহীদের সংখ্যা ছিল পনেরো থেকে ১৮ জন, আর ইয়াহুদিদের নিহতের সংখ্যা ছিল ৯৩ জন।
টিকাঃ
[৪২৪] আবূ দাউদ, ৩০০৬।
[৪২৫] ইবনু হিশাম, আস-সীরাহ, ২/৩৩১-৩৩৭; যাদুল মাআদ, ২/১৩৬।
📄 আবিসিনিয়ার মুহাজিরদের প্রত্যাবর্তন ও আবূ হুরায়রা ؓ-এর আগমন
ওদিকে আবিসিনিয়ার রাজার কাছে নবিজি -এর প্রেরিত দূত আমর ইবনু উমাইয়া দামরি (রদিয়াল্লাহু আনহু) সেখানকার সব মুহাজিরকে সাথে নিয়ে ফিরে এসেছেন। এসেই তারা খবর পান যে, নবি খাইবার অভিযানে গেছেন। তাই তাদের একাংশ খাইবারের পথে রওনা হন আর বাকিরা মদীনার অভিমুখে। খাইবারগামীদের মাঝে জা'ফার ইবনু আবী তালিব এবং আবূ মূসা আশআরি (রদিয়াল্লাহু আনহুমা)-ও ছিলেন।
কিন্তু সেখানে পৌঁছে তারা দেখেন যে, যুদ্ধ ইতিমধ্যে জয় হয়ে গেছে। তবে গনীমাত বণ্টন তখনো বাকি। জা'ফারের কপালে চুমু দিয়ে স্বাগত জানান নবিজি । তিনি বলেন, “আল্লাহর কসম! খাইবার-বিজয়, নাকি জা'ফারের আগমন-কোনটাতে যে বেশি খুশি হয়েছি, আমি জানি না!”
জিহাদে অংশগ্রহণকারীদের সাথে জা'ফার (রদিয়াল্লাহু আনহু)-ও গনীমাতের অংশ লাভ করেন। কারণ, তিনিও অংশগ্রহণ করার চেষ্টা করেছিলেন।
সবচেয়ে বেশি হাদীস বর্ণনাকারী সাহাবি আবূ হুরায়রা (রদিয়াল্লাহু আনহু) খাইবার জয়ের পর নবিজি -এর নিকট আগমন করেন। নবি খাইবার অভিযানে বেরিয়ে পড়ার পর তিনি মদীনায় গিয়ে ইসলাম গ্রহণ করেছেন। পরে মদীনার ভারপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে রওনা দিয়েছিলেন সেনাদলে নাম লেখাতে। কিন্তু এসে পৌঁছান যুদ্ধ শেষে। তিনিও খাইবারের গনীমাতের অংশ পেয়েছিলেন।
পরে আসা আরেকজন সাহাবি আবান ইবনু সাঈদ (রদিয়াল্লাহু আনহু)। তিনি নাজদ অঞ্চলে শত্রুর গতিবিধি পর্যবেক্ষণের একটি অভিযানে নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন। তবে নবি তাকে ও তার দলকে খাইবারের গনীমাতের কোনও অংশ দেননি।
টিকাঃ
[৪২৬] হাকিম, আল-মুস্তাদরাক, ৩/২১১; বাইহাকি, দালাইলুন নুবুওয়াহ, ৪/২৪৬।
[৪২৭] বুখারি, ৩১৩৬।
📄 খাইবারের গনীমাত বণ্টন
বিজিত অঞ্চলের শত্রুদের মৃত্যুদণ্ডের বদলে নির্বাসনে পাঠানোর সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়েছিল প্রথমে। তবে অধিকাংশ ইয়াহুদি এই ভূমি ছেড়ে যেতে অনিচ্ছুক। নিরাপত্তা লাভের পর তারা নতুন এক প্রস্তাব দেয় রাসূল -কে-"মুহাম্মাদ, আমাদের এ এলাকায় থাকতে দিন। দেখুন, জায়গাটা আমরা আপনাদের চেয়ে ভালো চিনি। আমরা এখানে চাষাবাদের কাজ করে যত ফল ও ফসল উৎপন্ন হবে তার অর্ধেক আমরা আপনাদের দিয়ে দেবো।”
নবি এই শর্তে তাদের অনুরোধ গ্রহণ করেন যে, মুসলমানদের যখন ইচ্ছা তাদের সেখান থেকে বের করে দেবে। ইয়াহুদিরা এই শর্ত মেনে নিয়ে মুসলিম রাষ্ট্রের করদ হিসেবে দীর্ঘকাল সেখানে শান্তি ও নিরাপত্তা সহকারে বসবাস করে। তবে উমর (রদিয়াল্লাহু আনহু)-এর খিলাফাতকালে আবারও শত্রুতামূলক কর্মকাণ্ড শুরু করেছিল তারা। ফলে তখন তিনি তাদের চূড়ান্তভাবে নির্বাসিত করে সেখান থেকে বের করে দেন।
নবি খাইবারের পুরো গনীমাতকে ছত্রিশটি ভাগে বিভক্ত করেন। প্রতিটি ভাগে থাকে একশটি করে উপভাগ। নবি আঠারো রেখে দেন ভাগ মুসলিম সমাজের টানাপড়েন ও দুর্দিনের জন্য। আর বাকি আঠারো ভাগ বণ্টন করে দেওয়া হয় মুজাহিদদের মাঝে। পদাতিক সেনারা পান এক অনুপাতে, আর অশ্বারোহীরা পান তিন অনুপাতে। সে হিসেবে দুই শ অশ্বারোহী মিলে পান ছয়টি ভাগ, আর বারো শ পদাতিক সেনারা পান বাকি বারোটি ভাগ।
খাইবারের উর্বরতা তুলনাহীন। খেজুর ও শস্যে শ্যামলা এ ভূমি জয় করার পর মুসলিমদের প্রাচুর্যতা ও সচ্ছলতা ফিরে আসে। আয়িশা (রদিয়াল্লাহু আনহা) খুশিতে বলেছিলেন, “বাহ! এবার তাহলে পেটভরে খেজুর খেতে পারব!” খাইবার থেকে ফিরে আসার পর দরিদ্র মুহাজিরদের অভাব দূর হয়ে যায়। আনসারদের থেকে নেওয়া খেজুর গাছগুলো ফিরিয়ে দেন তারা। কারণ, খাইবারের গনীমাতের কল্যাণে তারা এখন আর্থিকভাবে বেশ স্বাবলম্বী।
টিকাঃ
[৪২৮] বুখারি, ২৩৩৮।
[৪২৯] ইবনুল কাইয়িম, যাদুল মাআদ, ২/১৩৭-১৩৮।
[৪৩০] বুখারি, ৪২৪২।
[৪৩১] বুখারি, ২৬৩০; ইবনু হিশাম, ২/৩৩৭-৩৩৮।