📄 যী কারাদ বা গাবার যুদ্ধ (মুহাররম, ৭ম হিজরি)
হুদাইবিয়ার চুক্তির পর কুরাইশদের শত্রুতার গোদ সেরে যায়। কিন্তু বিষফোঁড়া হয়ে টিকে থাকে ইয়াহুদি গোত্রগুলো। অহরহই তারা চুক্তি ভাঙতে থাকে। অন্যান্য গোত্রকেও মুসলিমদের বিরুদ্ধে জোটবদ্ধ হওয়ার জন্য ফুসলাতে থাকে। গোটা খাইবার এবং এর উত্তর দিকের এলাকাটি তাদের মূল কেন্দ্রে পরিণত হয়। এখান থেকেই পরিচালিত হতে থাকে মুসলিমদের বিরুদ্ধে তাদের সকল ষড়যন্ত্র। নবি খাইবার আক্রমণ করার ঠিক তিন দিন আগে ছোট আরেকটি সংঘর্ষ বাধে। এটি গাবার যুদ্ধ নামে পরিচিত। সময়টি ছিল সপ্তম হিজরি সনের মুহাররম মাস।
উহুদের কাছে গাবা চারণভূমিতে রাসূল তাঁর উটগুলো পাঠান। নবিই-এর দাস রাবাহ এবং একজন রাখাল সাথে ছিল। আবূ তালহার ঘোড়ার পিঠে করে তাদের সাথে সালামা ইবনুল আকওয়া'ও ছিলেন। রদিয়াল্লাহু আনহুম।
এমন সময় অতর্কিতে আক্রমণ করে বসে আবদুর রহমান ইবনু উয়াইনা ফাযারি ও তার গুন্ডারা। রাখালকে হত্যা করে সবগুলো উট ছিনিয়ে নিয়ে যায় তারা। সালামা ইবনুল আকওয়া' ঘোড়াটি রাবাহকে দিয়ে মদীনায় দ্রুত সংবাদ পাঠান এবং নিজে একটি পাহাড়ে উঠে মদীনার দিকে ফিরে খুব উঁচু স্বরে তিনবার বিপদসংকেত দেন, “ইয়া সাবাহা!” তারপর চোরদের তির মারতে মারতে ধাওয়া করলেন। দুর্বৃত্তদের বিরুদ্ধে একা হওয়া সত্ত্বেও গাইতে লাগলেন সামরিক সংগীত:
“ধর এটা! আমি হলাম পুত্র আকওয়া'র! আজ আমার হাত থেকে তোদের নেই নিস্তার।"
সালামা (রদিয়াল্লাহু আনহু) একটার পর একটা তির ছুড়ছিলেন। 'ধর এটা' বলে তিনি অবিরাম ধাবিত সে তিরগুলোকেই বুঝিয়েছেন। যখন কেউ ঘোড়ার মুখ ঘুরিয়ে পাল্টা ধাওয়া করতে আসে তখন তিনি গাছের আড়ালে গিয়ে সেখান থেকে তির ছুড়ে মারেন। একসময় তারা পর্বতগিরির সংকীর্ণ রাস্তায় ঢুকে গেলে পাহাড়ের চূড়ার উঠে তিনি কয়েকটি পাথর গড়িয়ে তাদের গায়ে ফেলার ব্যবস্থা করেন।
সালামা ইবনুল আকওয়া' তাদের ধাওয়া করতেই থাকেন ফলে একসময় তারা সবগুলো উট ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়। কিন্তু সালামার তির-বর্ষণ তাতে থামে না। বোঝা হালকা করতে নিজেদের ত্রিশটি কাপড় এবং ত্রিশটি বর্শাও ফেলে দেয় তারা। সালামা (রদিয়াল্লাহু আনহু) সবগুলোর ওপর ছোট ছোট পাথর চাপা দিয়ে চিহ্নিত করে রাখেন, যাতে পরে এসে সহজে খুঁজে পাওয়া যায়। তারপর আবারও ধাওয়া দেন দুর্বৃত্তদের।
চোরেরা এরপর একটি পর্বতগিরির সংকীর্ণ একটি বাঁকে বসে পড়ে। আর সালামা অপেক্ষায় থাকেন পাহাড়ের চূড়ায়। তাকে দেখতে পেয়ে চার জন এগিয়ে আসতে থাকে তাঁর দিকে। সালামা হাঁক ছাড়েন, “তোরা জানিস আমি কে? আমি সালামা ইবনুল আকওয়া'। তোদের সবক'টাকে আমি সহজেই ধরে ফেলতে পারি, তা যত জোরেই দৌড়াস না কেন। কিন্তু তোরা কখনও আমাকে ধরতে পারবি না।” হুমকি শুনে আগুয়ান চোরগুলো পিছিয়ে যায়।
একটু পরেই সালামা দেখতে পান দূরে গাছের আড়াল থেকে নবিজি -এর পাঠানো অশ্বারোহীরা দৌড়ে বেরিয়ে আসছেন। আখরাম, আবু কাতাদা, মিকদাদ (রদিয়াল্লাহু আনহুম) সবাইকে একে একে দেখা গেল। এবার আখরামের সাথে মুশরিক আবদুর রহমানের দ্বন্দ্বযুদ্ধ বাধে। আবদুর রহমানের ঘোড়াটিকে জখম করে দিতে পারলেও তার হাতে শহীদ হন আখরাম (রদিয়াল্লাহু আনহু)। সে পরে আখরামের ঘোড়াটি নিয়ে নেয়। আবু কাতাদা উঠে এসে বর্শার আঘাতে খতম করে জাহান্নামে পাঠান নরাধম আবদুর রহমানকে। পালের গোদাকে পটল তুলতে দেখে বাকি গুন্ডাবাহিনী লেজ তুলে পালাতে শুরু করে। মুসলিম অশ্বারোহীরা পিছু ধাওয়া করেন তাদের। এখনও দৌড়ে দৌড়ে তাদের সাথে আসছেন সালামা ইবনুল আকওয়া' (রদিয়াল্লাহু আনহু)!
সূর্যাস্তের একটু আগে যু-কারাদ পর্বতগিরিতে গিয়ে পৌঁছায় দুর্বৃত্তরা। সারাদিনের পরিশ্রমে তারা ক্লান্ত-বিধ্বস্ত, সেই সাথে প্রচণ্ড তৃষ্ণার্ত। কিন্তু জলাধারের কাছেও ঘেঁষতে পারছে না শুধু একটি সমস্যার কারণে-সালামার ছোড়া তির। সূর্যাস্তের পর ঘোড়ায় সওয়ার হয়ে এসে সাহাবিদেরসহ সালামার সাথে সাক্ষাৎ করলেন নবি। সালামা (রদিয়াল্লাহু আনহু) আরজ করলেন, "নবিজি, ওদের দম ফুরিয়ে এসেছে। আমাকে স্রেফ এক শ জন লোক দিন। আমি তাদের তাদের পশুগুলোসহ আপনার কাছে হাযির করি।”
নবি বললেন, "আকওয়া'র পুত্র! জিতেছ তো তুমিই। এবার শত্রুদের একটু দয়া করো। এরপর বললেন, "এখন তাদের বানু গতফানে মেহমানদারী করানো হচ্ছে।”
সেদিনের দুর্দান্ত বীরত্বের কারণে রাসূল সালামা ইবনুল আকওয়া' (রদিয়াল্লাহু আনহু)-কে পদাতিক ও অশ্বারোহী দুই দলেরই মর্যাদা দেওয়া হয় এবং দুটি অংশই তাঁকে দেওয়া হয়। স্বয়ং নবিজির পেছনে ফিরতি যাত্রায় 'আদবা' উটের পিঠে বসার সৌভাগ্যও লাভ করেন তিনি। একদম কাছ থেকে শোনেন নবিজির ঘোষণা, “আজকের সেরা ঘোড়সওয়ার আবু কাতাদা, আর সেরা পদাতিক সালামা ইবনুল আকওয়া'।”
নবি এই যুদ্ধে বের হওয়ার সময় মদীনার দায়িত্ব ইবনু উম্মি মাকতুম (রদিয়াল্লাহু আনহু)-কে দিয়েছিলেন। আর পতাকা বাহক ছিল মিকদাদ (রদিয়াল্লাহু আনহু)।
টিকাঃ
[৪১৬] বুখারি, ৩০৪১; মুসলিম, ১৮০৬, ১৮০৭; যাদুল মাআদ, ২/১৩৩।
📄 কাযা উমরা পালন (যুল-কা'দা, ৭ম হিজরি)
হুদাইবিয়া চুক্তির পর এক বছর কেটে গেছে। চুক্তির শর্ত অনুযায়ী মুসলিমরা এবার নির্বিঘ্নে উমরা করতে পারবেন। আবূ রুহম কুলসুম ইবনুল হুসাইন গিফারি (রদিয়াল্লাহু আনহু)-এর হাতে মদীনার দায়িত্ব বুঝিয়ে দিয়ে নবি মক্কাভিমুখে যাত্রা করেন। নাজিয়া ইবনু জুনদুব আসলামি (রদিয়াল্লাহু আনহু)-এর তত্ত্বাবধানে আছে নবিজির কুরবানির ষাটটি উট। কুরাইশদের বিশ্বাসঘাতকতার কোনও ঠিক-ঠিকানা নেই। তাই সতর্কতাবশত মুহাম্মাদ ইবনু মাসলামা (রদিয়াল্লাহু আনহু)-এর তত্ত্বাবধানে রেখেছেন অস্ত্রশস্ত্রসহ একশটি ঘোড়া।
যুল হুলাইফায় এসে সাহাবিরা ইহরাম বেঁধে নেন। নবি -এর কণ্ঠে ধ্বনিত হয়, “লাব্বাইক! আল্লাহুম্মা লাব্বাইক!” সহস্র কণ্ঠে তা প্রতিধ্বনিত করেন সাহাবিগণ। শুরু হলো আল্লাহর ঘরে যাত্রার আনুষ্ঠানিকতা। 'ইয়াজাজ' উপত্যকায় পৌঁছে উমরাযাত্রীরা নিরস্ত্র হন। আওস ইবনু খাওলা আনসারি (রদিয়াল্লাহু আনহু)-এর নেতৃত্বে দুই শ জনের একটি দলের কাছে অস্ত্রশস্ত্র জমা থাকে। পেছনে অবস্থান করে উমরাকারীদের নিরাপত্তার বিষয়টি দেখভাল করবেন তারা। মক্কার কাছাকাছি এসে পৌঁছানোর সময় উমরা পালনকারীদের প্রত্যেকের কাছে থাকে একটিমাত্র কোষবদ্ধ তরবারি।
হুদাইবিয়া চুক্তির শর্তে এমনটিই বলা ছিল। 'হাজন' হয়ে 'কাদা' দিয়ে শহরে প্রবেশ করেন তারা। মুখে লাব্বাইক ধ্বনি আর চতুষ্পার্শ্বে তরবারিধারী সাহাবিদের নিয়ে কাসওয়া উটের পিঠে করে মক্কায় ঢোকেন নবি। সবার গন্তব্য কা'বা। উটনীর পিঠে বসেই নবি ﷺ একটি লাঠি দিয়ে হাজরে আসওয়াদ স্পর্শ করেন এবং ওভাবেই কা'বার তওয়াফ করেন। তাঁর সাথে সাথে সব মুসলিমরাও তওয়াফ করেন।
ডান কাঁধ উন্মুক্ত রেখে সবার ইহরাম বাঁধা। উদ্দেশ্য বীরত্ব প্রদর্শন। আল্লাহর পবিত্র ঘরে এক আল্লাহরই উপাসনার অধিকার আদায় করে নিয়েছেন তারা, তাও মুশরিকদের একদম চোখের সামনে দিয়ে।
নবিজি -এর সামনে সামনে চলছেন আবদুল্লাহ ইবনু রাওয়াহা (রদিয়াল্লাহু আনহু)। কাঁধে ঝোলানো তরবারি আর মুখে আবৃত্তি:
'কাফিরজাদারা, সরে দাঁড়া! জায়গা ছেড়ে দে! মর্যাদা আজ নবিজির, চোখ মেলে দেখে নে! আগেও তোদের মেরেছি যাঁহার ঐশী আদেশে, আজও তোদের মারব তাঁরই মহান নির্দেশে। চরম আঘাতে ফাটিয়ে দেবো তোদের মাথার খুলি, আঘাতের চোটে বন্ধুকে আজ বন্ধুও যাবে ভুলি।'
কা'বার উত্তরে 'কুআইকিআন' পাহাড়ে বসে মুশরিকরা তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছিল নবাগতদের। অনিচ্ছা সত্ত্বেও চোখে প্রশংসা। এতদিন শুনে এসেছিল যে, ইসলাম নামক ধর্মটার অনুসারীরা কতগুলো জীর্ণ-শীর্ণ-দুর্বল লোক। ইয়াসরিবের বৈরী আবহাওয়ায় সারাক্ষণ রোগ-শোকে ভোগে। কিন্তু আজ নিজেদের চোখে দেখছে সম্পূর্ণ ভিন্ন দৃশ্য!
এরা যে শক্তপোক্ত, উন্নত শিরের যোদ্ধা! মক্কার সবচেয়ে সুঠাম লোকগুলোর সমানে সমান।
নবিজি -এর বুদ্ধিটি কাজে দিয়েছে। কুরাইশদের মন-মেজাজ সম্পর্কে ভালো করেই জানতেন তিনি। তাই আগেই সাহাবিদের নির্দেশ দিয়ে রেখেছেন, যেন তওয়াফের সময় জোরে জোরে দৌড়ায় সবাই। এতে মুশরিকরা স্বচক্ষে দেখবে মুসলিমদের শক্তি-সামর্থ্য। তবে ইয়েমেনি খুঁটি এবং হাজরে আসওয়াদের মধ্যবর্তী অংশটিতে দৌড়াতে হবে না। এটি দক্ষিণ দিকে, মুশরিকদের দৃষ্টিসীমার বাইরে অবস্থিত।
তওয়াফ শেষে সাফা-মারওয়া পাহাড়দ্বয়ের মাঝে সাঈ করেন নবি ﷺ। সাতবার সাঈ শেষে মারওয়ায় এসে পশু কুরবানি করেন। তারপর মাথার চুল কামিয়ে নেন। সাহাবিরাও তাঁর অনুকরণে একই কাজ সম্পাদন করেন। রাসূল ﷺ তারপর কয়েকজনকে ইয়াজাজে পাঠিয়ে দেন। যারা অস্ত্রশস্ত্র দেখভালের দায়িত্বে ছিল, তারা এসে এখন উমরা সম্পাদন করবে; আর নতুন এই দলটি গিয়ে অস্ত্রাগারের দায়িত্ব নেবে।
মুসলিমরা তিন দিন অবস্থান করেন মক্কায়। এর মধ্যে মাইমূনা বিনতুল হারিস হিলালিয়্যা (রদিয়াল্লাহু আনহা)-কে বিয়ে করেন নবি ﷺ। তিনি হামযা ইবনু আবদিল মুত্তালিব (রদিয়াল্লাহু আনহু)-এর স্ত্রী ছিলেন। আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রদিয়াল্লাহু আনহুমা)-এর ফুপু। নবি ﷺ তাকে প্রস্তাব পাঠালে তিনি তা আব্বাসকে জানান। আব্বাস তখন এই শুভকাজটি সম্পাদন করার যাবতীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। নবি ﷺ সে সময় 'হালাল' অবস্থায় ছিলেন। কারণ, তিনি মক্কায় প্রবেশ করে সর্বপ্রথম উমরা করেন তারপর হালাল হয়ে যান এবং হালাল অবস্থাতেই থাকেন।
চতুর্থ দিনের সকালে নবি ﷺ ফিরতি যাত্রা শুরু করেন মদীনা অভিমুখে। মক্কা থেকে নয় মাইল দূরে 'সারিফ' নামক স্থানে প্রথম যাত্রাবিরতি হয়। আর ওখানেই তাঁর কাছে বধূবেশে প্রেরিত হন মাইমূনা (রদিয়াল্লাহু আনহা)। আল্লাহর এমনই ইচ্ছে, পরিণয়ের স্থানই তার প্রয়াণের স্থান হিসেবে নির্ধারিত ছিল।
মদীনায় ফিরে পুনরায় প্রশাসনিক কাজে ব্যস্ত হন রাসূল ﷺ। প্রেরণ করেন কয়েকটি সশস্ত্র অভিযান। তার মাঝে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুটি হলো মৃতা এবং যাতুস সালাসিল অভিযান।
টিকাঃ
[৪৪০] ইবনু হাজার, ফাতহুল বারি, ৭/৫০০; যাদুল মাআদ, ২/১৫১।
[৪৪১] বুখারি, ১৫৭৫।
[৪৪২] বুখারি, ১৬০০।
[৪৪৩] তিরমিযি, ২৮৪৭।
[৪৪৪] বুখারি, ১৬০২।
[৪৪৫] বুখারি, ৪২৫৭।
[৪৪৬] বুখারি, ১৮৩৭।
[৪৪৭] বুখারি, ৪২৫১।
[৪৪৮] বুখারি, ৫০৬৭।
📄 মূতা অভিযান (জুমাদাল উলা, ৮ম হিজরি)
আগেই উল্লেখ করা হয়েছে যে, বুসরার প্রশাসকের কাছে নবিজি ﷺ-এর চিঠি নিয়ে যাওয়ার সময় শুরাহবীল ইবনু আমর গাসসানির হাতে নির্মমভাবে শহীদ হন হারিস ইবনু উমাইর আযদি (রদিয়াল্লাহু আনহু)। এ কাজটি সরাসরি যুদ্ধঘোষণার শামিল। যাইদ ইবনু হারিসা (রদিয়াল্লাহু আনহু)-এর নেতৃত্বে তিন হাজার সৈনিকের একটি বাহিনী প্রেরণ করেন আল্লাহর রাসূল ﷺ। বাহিনীর সাদা পতাকাটি তুলে দেওয়া হয় যাইদের হাতে। তখন নবি ﷺ বলেন, “যদি যাইদ শহীদ হয়ে যায় তাহলে জা'ফার, আর যদি জা'ফারও শহীদ হয়ে যায় তাহলে আবদুল্লাহ ইবনু রাওয়াহা আমীর হবে।”
হারিসের নিহত হওয়ার স্থানে গিয়ে যাইদ ইবনু হারিসা (রদিয়াল্লাহু আনহু) প্রথমে জনগণকে ইসলামের দিকে আহ্বান করবেন। তারা প্রত্যাখ্যান করলে তবেই শুরু হবে যুদ্ধ।
বাহিনীকে বিদায় দেওয়ার কালে নবিজি কিছু চিরস্মরণীয় উক্তি করেন: “আল্লাহর নামে, আল্লাহর পথে-আল্লাহদ্রোহীদের বিরুদ্ধে লড়াই করো। সাবধান! প্রতিশ্রুতি ভেঙো না, খিয়ানত কোরো না। ওদের শিশু, নারী এবং অশীতিপর বৃদ্ধদের হত্যা করবে না। সন্ন্যাসীদের মঠে আক্রমণ কোরো না, ফলদ গাছ কেটো না এবং কোনও দালানও ধ্বংস কোরো না।”
সানিয়্যাতুল ওয়াদা' পর্যন্ত সেনাদলকে এগিয়ে দিয়ে আসেন আল্লাহর রাসূল ﷺ। দক্ষিণ জর্দানের 'মা'আন' অঞ্চলে গিয়ে শিবির খাটায় সেনারা। কিন্তু সেখানে হাজির হলো এক অপ্রত্যাশিত বিপদ। খুব কাছেই মাআবে বসে আছে হিরাক্লিয়াসের এক লক্ষ সেনা। তাদের সাথে যোগ দিয়েছে আরও এক লক্ষের একটি খ্রিষ্টান দল। পরবর্তী করণীয় সম্পর্কে দুই রাত ধরে সলা-পরামর্শ চলে মুসলিম শিবিরে। অকল্পনীয় সংখ্যালঘুতা নিয়ে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়বে, না মদীনা থেকে সাহায্য আনানো হবে-কোনও সিদ্ধান্তেই আসা সম্ভব হচ্ছিল না। এমন সময় মুসলিম ভাইদের উদ্দেশে এক আবেগঘন বক্তৃতা দেন আবদুল্লাহ ইবনু রাওয়াহা (রদিয়াল্লাহু আনহু):
“আল্লাহর কসম! আপনারা যে জিনিসের আশায় এখানে এসেছেন, সেটাকেই এখন এড়ানোর চেষ্টা করছেন-অর্থাৎ শাহাদাত। আমরা সংখ্যা ও শক্তি দিয়ে কখনও যুদ্ধ করি না; বরং আমরা দ্বীনের শক্তিতেই যুদ্ধ করি, লড়াই করি, যে দ্বীন আল্লাহ আমাদের দান করেছেন। আমাদের সামনে রয়েছে দুটি পুরস্কার-গনীমাত নয়তো শাহাদাত!”
সবাই কথাটি নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করে বললেন, “আল্লাহর শপথ! ইবনু রাওয়াহা সত্য বলেছে।” তাই আগে বেড়ে মৃতায় এসে ঘাঁটি গাড়লেন সাহাবিরা। মযবুত অবস্থান নিলেন বিরাট শত্রু বাহিনীর মুখোমুখি হতে।
বেঁধে যায় এক অভূতপূর্ব অথচ ইতিহাস-বিস্মৃত এক প্রচণ্ড সংঘর্ষ। সদ্য উদীয়মান মুসলিম রাষ্ট্রের ৩০০০ সেনা চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেয় বিশ্বপরাশক্তি রোমান সাম্রাজ্যের দুই লাখ সেনাকে। রোমান বাহিনী সারাদিন লড়াই করেও ক্ষুদ্র এই প্রতিপক্ষের সাথে পেরে ওঠেনি। উল্টো হারিয়েছে নিজেদের সেরা সেরা কিছু সৈনিক।
মুসলিম বাহিনীর পতাকাবাহী যাইদ ইবনু হারিসা (রদিয়াল্লাহু আনহু) বর্শার আঘাতে শহীদ হওয়ার আগ পর্যন্ত বীরবিক্রমে লড়াই করেন। তারপর পতাকা তুলে নেন জা'ফার ইবনু আবী তালিব (রদিয়াল্লাহু আনহু)। যুদ্ধের প্রচণ্ডতম মুহূর্তে বাহন থেকে নেমে শত্রুদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েন তিনি। যুদ্ধ করতে করতে একসময় তাঁর ডান হাতটি কেটে পড়ে যায়। তখন তিনি বাম হাতে পতাকা আঁকড়ে ধরেন। তবুও বীরত্বের সাথে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে থাকেন। পরে শত্রুরা তাঁর বাম হাতটিও কেটে ফেলে। তখনো তিনি অবশিষ্ট দুই বাহু দিয়ে বুকের সাথে চেপে ধরে উঁচু করে রাখেন মুসলিম বাহিনীর পতাকা। অবশেষে তিনিও শাহাদাতবরণ করেন। সে সময় জা'ফার (রদিয়াল্লাহু আনহু)-এর শরীরের সামনের অংশে তরবারির নব্বইটিরও বেশি আঘাতের চিহ্ন দেখা যায়।
এরপর নবিজি -এর নির্দেশানুযায়ী পতাকা তুলে নেন আবদুল্লাহ ইবনু রাওয়াহা (রদিয়াল্লাহু আনহু)। এগিয়ে যেতে যেতে একসময় ঘোড়া থেকে নেমে আক্রমণ শুরু করেন শত্রুদের। অবশেষে তিনিও শাহাদাত লাভ করেন।
সাবিত ইবনু আরকাম (রদিয়াল্লাহু আনহু) একরকম যেন উড়ে এসেই নবিজি -এর পতাকাকে ধুলায় লুটানো থেকে রক্ষা করেন। এরপর তিনি মুসলিমদের আহ্বান করেন কোনও একজনকে নিজেদের আমীর নির্বাচন করে নিতে। মুসলিমদের ঐকমত্যে নতুন সেনাপতি হন খালিদ ইবনুল ওয়ালীদ (রদিয়াল্লাহু আনহু)। যিনি কুরাইশ সেনাপতি হিসেবে আগেও নিজের দক্ষতার স্বাক্ষর রেখেছেন। পতাকা চলে আসে খালিদের হাতে। খালিদ ধেয়ে গিয়ে এত প্রবলভাবে লড়াই করেন যে, সেদিন তার একার হাতেই ভেঙেছিল নয়টি তরবারি।
ওদিকে মদীনায় বসেই সুদূর মৃতায় চলমান যুদ্ধের খবরাখবর ওহির মাধ্যমে জানতে পারেন রাসূলুল্লাহ ﷺ। তিন মুসলিম সেনাপতির সকলেই শহীদ হয়েছেন। নতুন সেনাপতি নিযুক্ত হয়েছেন খালিদ ইবনুল ওয়ালীদ। তখন নবিজি ﷺ তাকে সাইফুল্লাহ (আল্লাহর তরবারি) বলে সম্বোধন করেন।
সূর্যাস্তের সময় উভয় সেনাদল নিজ নিজ শিবিরে ফিরে আসে। এবার শুরু হয় সাইফুল্লাহর সামরিক কলাকৌশলের জাদু। পরদিন সকালে খালিদ (রদিয়াল্লাহু আনহু) সেনাসারিকে নতুন করে সাজান। সামনের সেনাদের পেছনে, পেছনের সেনাদের সামনে নিয়ে আসেন। একইভাবে ডান-বামের সেনাদেরও স্থানান্তর করান। রোমানরা দূর থেকে দেখে ধরে নেয় যে, শত্রুরা তাদের রাজধানী থেকে আরও বাহিনী নিয়ে এসেছে। ঘটনার এই পটপরিবর্তনে মনোবল একেবারেই ভেঙে যায় তাদের।
হালকা কিছু দাঙ্গার পর খালিদ (রদিয়াল্লাহু আনহু) সেনাদলকে নিয়ে আস্তে আস্তে পিছিয়ে আসেন। কিন্তু তা দেখেও রোমানরা এগিয়ে আসার সাহস পায় না। তারা ভাবে যে, শত্রুদের এই পিছিয়ে যাওয়াটা নিশ্চয়ই কোনও ফাঁদ হবে হয়তো। ওদিকে নতুন সেনাও নিয়ে এসেছে, আবার তাদের টেনে মরুভূমির ভেতরেও নিয়ে যাচ্ছে-এই ভেবে তারাও পেছাতে থাকে। সাতদিন ধরে ছোট ছোট খণ্ডযুদ্ধ চালানোর পর উভয় সেনাদল সম্পূর্ণ পিছু হটে। শেষ হয় যুদ্ধ।
এই যুদ্ধে বারো জন মুসলিম শহীদ হন। আর কাফিরদের বহুসংখ্যক সৈন্য নিহত হয়। তবে এদের সঠিক সংখ্যা জানা যায়নি।
টিকাঃ
[৪৪৯] বুখারি, ৫০৬৭।
[৪৫০] ফাতহুল বারি, ৭/৫১১; যাদুল মাআদ, ২/১৫৫।
[৪৫১] মুখতাসারুস সীরাহ, ৩২৭; মুসলিম, ১৭৩১; আবু দাউদ, ২৬১৪, ২৬৩১।
[৪৫২] যাদুল মাআদ, ২/১৫৬; ইবনু হিশাম, ২/৩৭৩-৩৭৪।
[৪৫৩] বুখারি, ৪২৪৪, ৪২৪৫; ইবনু হিশাম, ৪/২০; যাদুল মাআদ, ২/৫৬৯।
[৪৫৪] বুখারি, ৪২৬২।
[৪৫৫] ইবনু হাজার, ফাতহুল বারি, ৭/৫১৩-৫১৪; যাদুল মাআদ, ২/১৫৬।
📄 যাতুস সালাসিলের অভিযান (জুমাদাল আখিরাহ, ৮ম হিজরি)
এই যুদ্ধটি সম্পন্ন হয় মৃতার যুদ্ধের এক মাস পরে অষ্টম হিজরি সনের জুমাদাল আখিরাহতে। মুসলিম সেনাদল একটি জলাধারের পাশের ভূমিতে শিবির গাড়েন। সেখানকার জায়গাটির নাম ছিল 'যাতুস সালাসিল'। এই কারণে অভিযানটির নামও হয় তারই নামে।
মৃতার যুদ্ধেই প্রমাণিত হয়েছে যে, রোমানপন্থী সিরিয়ান আরবরা মুসলিমদের জন্য বড় হুমকি। এদের শায়েস্তা না করলে এরা ইসলামের জন্য বড় বিপদ হয়ে দাঁড়াতে পারে। নবি ﷺ এ উদ্দেশ্যেই মৃতার যুদ্ধের এক মাস পর আমর ইবনুল আস (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর নেতৃত্বে তিন শ জনের এক বাহিনী প্রেরণ করেন। সাথে ছিল ত্রিশটি ঘোড়া। উদ্দেশ্য বালি গোত্রের মিত্রতা আদায়। মায়ের দিক থেকে আমর এ গোত্রেরই বংশধর। যদি গোত্রটির কাছ থেকে নিরপেক্ষতার প্রতিশ্রুতি আদায় করা না যায়, তাহলে রোমানদের পক্ষ নেওয়ার জন্য বালি গোত্রের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক আক্রমণ করা হবে।
সেনাদল সিরিয়ার কাছাকাছি হতেই জানা গেল যে, সিরিয়ানরা আগে থেকেই নিজেদের বড় এক সেনাবাহিনী প্রস্তুত করে রেখেছে। লোকবলের আবেদন জানিয়ে মদীনায় খবর পাঠান আমর। নবি আবূ উবাইদা ইবনুল জাররাহ (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর নেতৃত্বে আরও দুই শ জন দক্ষ সেনা প্রেরণ করেন। তবে সেনাপতি ও আমীর হিসেবে আমর ইবনুল আস (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বহাল থাকেন।
লোকবল এসে পৌঁছানোর পর মুসলিম সেনাদল কাদাআ অঞ্চলের বড় একটি অংশ পার হন। একটি শত্রুদল মুখোমুখি হলে তীব্র আক্রমণ করে তাদের ছত্রভঙ্গ করে দেন মুসলিমরা।
টিকাঃ
[৪৫৬] ইবনু হিশাম, ২/৬২৩-৬২৬; যাদুল মাআদ, ২/১৫৭।