📄 মুহাজির নারীদের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত
হুদাইবিয়া চুক্তির কিছুদিন পরই কয়েকজন মুসলিম নারী এসে নবিজি ﷺ -এর কাছে আশ্রয় চান। মুশরিকরা যথারীতি তাদের ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি করতে থাকে। তাদের দাবি ফিরিয়ে দিয়ে নবি স্মরণ করিয়ে দেন যে, চুক্তিতে নারীদের ব্যাপারে কোনও কথাই উল্লেখ হয়নি। তারা চুক্তির বাইরে। আল্লাহ তাআলাও আদেশ নাযিল করেন,
“হে বিশ্বাসীরা, কোনও বিশ্বাসী নারী হিজরত করে এলে তাদের যাচাই করে দেখো। আল্লাহ তো তাদের ঈমানের ব্যাপারে ভালো করেই জানেন। যদি নিশ্চিত হও যে, তারা ঈমানদার, তাহলে তাদের কুফফারদের হাতে ফিরিয়ে দিয়ো না। কারণ, তারা এখন আর কাফিরদের বৈধ স্ত্রী নয়, কাফিররাও তাদের বৈধ স্বামী নয়। ওদের আগের স্বামীদের দেওয়া মোহর তাদের ফিরিয়ে দাও। আর তোমরা যদি মোহরের বিনিময়ে তাদের বিয়ে করে নাও, তাতেও দোষের কিছু নেই। অনুরূপভাবে, অবিশ্বাসী নারীদের সাথেও বিবাহবন্ধন ছিন্ন করে ফেলো। ফিরিয়ে দিতে বলো পূর্বপ্রদত্ত মোহর। তোমাদের সাথে বিবাহবন্ধনে থাকাকালীন তারা যা খরচ করেছে, সেটিও ফেরত চাইতে বলো তাদের। এটি আল্লাহর সিদ্ধান্ত। তিনিই তোমাদের মাঝে বিচার-ফায়সালা করে থাকেন। আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।”
এভাবে মুসলিম ও কাফিরদের মাঝে বিয়ে চিরতরে নিষিদ্ধ হয়ে যায়। এরপর থেকে হিজরত করে আসা মুসলিম নারীদের নবি ﷺ এই আয়াতের ভিত্তিতে যাচাই করতেন।
“হে নবি, মুমিন নারীরা যখন আপনার কাছে এসে আনুগত্যের শপথ করে যে, তারা আল্লাহ ছাড়া আর কারও উপাসনা করবে না, চুরি করবে না, ব্যভিচার করবে না, তাদের সন্তানদের হত্যা করবে না, জারজ সন্তানকে স্বামীর ঔরস থেকে আপন গর্ভজাত সন্তান বলে মিথ্যা দাবি করবে না এবং ভালো কাজে আপনার অবাধ্য হবে না, তখন তাদের শপথ গ্রহণ করে নিন এবং তাদের জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করুন। নিশ্চয়ই আল্লাহ সতত ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।”
এই আসমানি বিধানগুলো মেনে চলার কথা প্রদান করলেই নবি নারী মুহাজিরদের বাইআত কবুল করে নিতেন। পুরুষদের হাতে হাত রেখে বাইআত গ্রহণ করলেও নারীদের ক্ষেত্রে শুধু মৌখিক উচ্চারণ শোনা হয়। এই নারীদের আর মক্কায় কাফিরদের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হয় না। তা ছাড়া মুসলিম পুরুষরাও তাদের কাফির স্ত্রীদের তালাক দিয়ে দেন এবং মুসলিম নারীরাও কাফির স্বামীদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে আসেন।
টিকাঃ
৩৯২. সূরা মুমতাহিনা, ৬০ : ১০।
৩৯৩. সূরা মুমতাহিনা, ৬০: ১২।
৩৯৪. বুখারি, ২৭৩১, ২৭৩২।
📄 মুসলমানদের চুক্তিতে বানূ খুযাআ
চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার পর বানু খুযাআ মুসলিমদের সাথে সন্ধিবদ্ধ হয়। নবিজির বংশ বানু হাশিমের সাথে বানু খুযাআ গোত্রের মিত্রতা সেই জাহিলি যুগ থেকেই। ওদিকে খুযাআর প্রতিদ্বন্দ্বী গোত্র বানূ বকর। স্বভাবতই তারা কুরাইশদের পক্ষ নেয়। সেই সাথে নিজেদের অজান্তেই হয়ে ওঠে মুসলিমদের মক্কা বিজয়ের আসল অনুঘটক। তার বর্ণনা সামনে আসবে।
📄 আবূ বাসীর ؓ-এর ঘটনা ও মক্কার দুর্বল মুসলিমদের মুক্তি
হিজরত করতে অপারগ মুসলিমদের ওপর কাফিরদের অত্যাচার কখনও থামেনি। এমনই এক অত্যাচারিত মুসলিম আবূ বাসীর (রদিয়াল্লাহু আনহু)। মক্কা থেকে পালিয়ে সোজা মদীনায় পৌঁছে যান। কুরাইশরা নবি ﷺ -এর কাছে দু'জন প্রতিনিধি পাঠিয়ে আবূ বাসীরকে ফেরত চায়। চুক্তির শর্তমতে নবিজি ফেরত পাঠাতে বাধ্য হন।
যুল হুলাইফায় এসে আবু বাসীর (রদিয়াল্লাহু আনহু) তাদের একজনকে কলে-কৌশলে হত্যা করে ফেলেন। অপরজন কোনোমতে প্রাণ নিয়ে ফিরে আসে মদীনায়। রাসূল ﷺ -এর নিকট অভিযোগ জানায়, "আমার সাথের জনকে সে মেরে ফেলেছে। আমাকেও হয়তো হত্যা করে ফেলবে।" এমন সময় আবূ বাসীর (রদিয়াল্লাহু আনহু) সেখানে এসে হাজির। নবিজির তিরস্কার শুনে এবং মুশরিকদের হাতে বন্দি হওয়ার ভয়ে এখান থেকেও পালিয়ে যান তিনি। আশ্রয় নেন উপকূলের কাছে একটি জায়গায়।
খবর পেয়ে আবূ জান্দাল (রদিয়াল্লাহু আনহু)-ও ছুটে এসে যোগ দেন আবূ বাসীরের সাথে। এভাবে একেকজন মুসলিম মক্কা থেকে পালিয়ে যান, আর এসে যোগ দিতে থাকেন এই জায়গায়। এদের হাতেই সেখানে গড়ে ওঠে মুসলিমদের আরেকটি ঘাঁটি। এভাবে শক্তি সঞ্চয় করে মাক্কি মুশরিকদের জন্য নতুন মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়ান তারা। কুরাইশের সিরিয়াগামী প্রত্যেকটা কাফেলাকে আক্রমণ করে তাদের মালপত্র ছিনিয়ে নিতে থাকেন তারা, বন্দি করতে থাকেন কাফেলার সদস্যদের।
ঘরের কাছে মুসলিমদের শক্ত দুর্গ গড়ে উঠতে দেখে কুরাইশদের হাঁটু কেঁপে ওঠে। নবিজি ﷺ -এর কাছে অনুনয় করে তিনি যেন এই দলটিকে মদীনায় ফিরিয়ে নেন। বিনিময়ে চুক্তির একটি শর্ত বাতিল করে দেয় তারা। এখন থেকে মদীনায় পালিয়ে যাওয়া আর কোনও মুসলিম মক্কায় ফিরে আসতে বাধ্য নয়। রাসূল আবূ বাসীরের ঘাঁটিটিকে মদীনায় চলে আসতে বললে খুশিমনে আদেশ পালন করেন তারা।
টিকাঃ
৩৯৫. বুখারি, ২৭৩১, ২৭৩২; ইবনু হিশাম, ২/৩০৮-৩২২; যাদুল মাআদ, ২/১২২-১২৭; ইবনুল জাওযি, তারীখু উমর, ৩৯-৪০।
📄 সন্ধি-চুক্তির প্রভাব
হুদাইবিয়া চুক্তির ফলে নিশ্চিত হওয়া শান্ত পরিবেশে চারদিকে প্রবলবেগে ছড়িয়ে পড়তে থাকে ইসলামের বার্তা। গত ঊনিশ বছরে যতজন মুসলিম হয়েছিল, তার চেয়ে বেশিসংখ্যক মানুষ এই দুই বছরে ইসলাম গ্রহণ করেছে। কারণ, এখন কোনও নিরাপত্তা-হুমকি ছাড়াই মুসলিমরা যেকোনও আরব গোত্রের সাথে মেলামেশা করতে পারে। এ-সময়ই আমর ইবনুল আস, খালিদ ইবনুল ওয়ালীদ ও উসমান ইবনু তালহা (রদিয়াল্লাহু আনহুম)-এর মতো গণ্যমান্য কুরাইশগণ রাসূল ﷺ -এর কাছে এসে ইসলাম গ্রহণের সাক্ষ্য দেন। নিজেদের জীবন, সম্পদ আর ক্ষমতা অর্পণ করেন আল্লাহর পথে। নবিজি তাদের ইসলাম কবুলের ব্যাপারে বলেন, "মক্কা তার হৃদয়ের মণিকোঠাগুলো আমাদের কাছে সঁপে দিয়েছে।”
টিকাঃ
৩৯৬. আলবানি, ফিকহুস সীরাহ, ২২১।