📄 হুদাইবিয়ার সন্ধি
শপথ গ্রহণের ঘটনাটি সম্পর্কে জানতে পারে কুরাইশরাও। তড়িঘড়ি করে তারা যেকোনও মূল্যে যুদ্ধ পরিহার করে শান্তি স্থাপনে সচেষ্ট হয়। এ উদ্দেশ্যে সুহাইল ইবনু আমরকে পাঠানো হয় পরবর্তী দূত হিসেবে। সুদীর্ঘ আলোচনার পর এই শর্তগুলোর ব্যাপারে সম্মত হয় উভয়পক্ষ:
প্রথমত, মুহাম্মাদ ও তাঁর অনুসারীরা সে বছর উমরা না করেই ফিরে যাবেন। পরের বছর উমরা করতে মক্কায় আসবেন। থাকতে পারবেন শুধু তিন দিন। তিনি ও তাঁর সঙ্গীদের কারও সাথে খাপবদ্ধ একটি তরবারি ছাড়া অন্য কোনও অস্ত্র থাকতে পারবে না।
দ্বিতীয়ত, দশ বছর মেয়াদে একটি শান্তিচুক্তি কার্যকর থাকবে। তৃতীয় কোনও পক্ষ যদি মুসলিমদের সাথে চুক্তি করতে চায়, করতে পারবে। কুরাইশদের সাথে করতে চাইলেও করতে পারবে।
তৃতীয়ত, মক্কা থেকে কেউ মদীনায় পালিয়ে গেলে তাকে মক্কায় ফিরিয়ে দিতে হবে। কিন্তু মুহাম্মাদ ﷺ -এর কোনও অনুসারী মক্কায় ফিরে এলে কুরাইশরা তাকে মদীনায় ফিরিয়ে দিতে বাধ্য থাকবে না।
চুক্তিনামাটি লেখার জন্য আলি (রদিয়াল্লাহু আনহু)-কে ডাকিয়ে আনেন রাসূলুল্লাহ ﷺ। বললেন, “লেখো, 'বিসমিল্লাহির রহমানির রহীম।"
বাগড়া দিয়ে বসল সুহাইল, “আমরা রহমানকে জানি না, চিনি না। আপনি 'বিসমিকাল্লাহুম্মা' লেখেন।” নবি তাতেই সম্মতি দিলেন।
এরপর লিখতে বলেন, 'এই কথার ওপর আল্লাহর রাসূল মুহাম্মাদ চুক্তি করেছেন...।”
আবারও সুহাইলের আপত্তি, “আপনাকে যদি আল্লাহর রাসূল বলে আমরা স্বীকারই করতাম, তাহলে তো আপনাকে বাইতুল্লাহয় যেতে বাধাও দিতাম না, আর আপনার সাথে যুদ্ধও করতাম না।”
নবি বললেন, “তোমরা আমাকে মিথ্যাবাদী সাব্যস্ত করলেও আমি আল্লাহর রাসূল।" তারপর আলিকে বললেন, আগে লেখা "আল্লাহর রাসূল মুহাম্মাদ" অংশটা মুছে দিয়ে “মুহাম্মাদ ইবনু আবদিল্লাহ” লিখতে।
আলি (রদিয়াল্লাহু আনহু) অনুযোগ করলেন, "আল্লাহর কসম! আমি কখনও এমনটি করতে পারি না।” পরে নবি বললেন উল্লেখিত অংশটা কোথায় আছে দেখিয়ে দিতে। আলি (রদিয়াল্লাহু আনহু) তা দেখিয়ে দিলে নবিজি নিজ হাতে সে অংশটুকু মুছে দেন।
তারপর চুক্তিনামার দুটি অনুলিপি লেখা হয়। একটি কুরাইশদের কাছে থাকবে, আরেকটি মুসলিমদের কাছে।
টিকাঃ
৩৮৬. বুখারি, ২৭৩১, ২৭৩২।
📄 আবূ জান্দালের ঈমানজাগানিয়া ঘটনা
চুক্তির আনুষ্ঠানিকতা তখনো চলমান। এমন সময় দৃশ্যপটে হাজির হলেন সুহাইল ইবনু আমরের পুত্র আবূ জান্দাল। শেকলে বেঁধে রাখা হয়েছে তাকে। কারণ, সে ইসলাম গ্রহণ করেছে। তার বাবা সুহাইলের এককথা—তাকে মক্কায় ফিরিয়ে দিতে হবে। নবিজি প্রতিবাদ করলেন, “চুক্তি তো এখনও চূড়ান্ত হয়নি!” সুহাইল বলে উঠল, “তাহলে আপনার সাথে কোনও চুক্তিই করব না।” নবি বললেন, “অন্তত আমার ওয়াস্তে ওকে ছেড়ে দিন!” “না, আপনার অনুরোধেও ছাড়া হবে না ওকে”, এই বলে সুহাইল নির্দয়ভাবে আবূ জান্দালকে মারধর করতে থাকে। আবু জান্দাল চিৎকার করে উঠলেন, “হে মুসলিমগণ, মুশরিকদের সাথে আমি কি আবার মক্কায় ফিরে যাব, যাতে তারা আমাকে আমার দ্বীনের কারণে জুলুম-নির্যাতন করতে পারে!”
নবি সান্ত্বনা দিয়ে বললেন, “আবূ জান্দাল, ধৈর্য ধরো, তোমার এই কষ্টের বিনিময়ে তুমি আল্লাহর কাছে বিরাট প্রতিদান পাবে। তুমিসহ যত নিপীড়িত মুসলিম আছে, সবার জন্য আল্লাহ তাআলা নিশ্চয়ই প্রশস্ততা ও মুক্তির পথ বের করে দেবেন।” উমর ইবনুল খাত্তাব (রদিয়াল্লাহু আনহু) এসব দেখে এতটাই ক্রুব্ধ হন যে, আবূ জান্দালকে বলেন তার বাবাকে খুন করে ফেলতে। তবে আবু জান্দাল নিজেকে সংযত রেখে চুক্তির শর্তগুলো মেনে নেন।
টিকাঃ
৩৮৭. বুখারি, ২৭৩১, ২৭৩২; ইবনু হিশাম, ৩/৩৩২।
📄 সন্ধি নিয়ে অসন্তোষ
শান্তিচুক্তি সম্পাদন শেষে নবি সাহাবিদের বললেন, “উঠো, সবাই নিজ নিজ কুরবানি করে নাও।” কিন্তু কেউই উঠলেন না। পরপর তিন বার নবি একই আদেশ দিলেন। তারপরও কারও মাঝে কোনও নড়াচড়া নেই। দুঃখভারাক্রান্ত মনে উম্মু সালামা (রদিয়াল্লাহু আনহা)-এর কাছে গিয়ে পুরো অবস্থা বর্ণনা করলেন তিনি। উম্মু সালামা (রদিয়াল্লাহু আনহা) পরামর্শ দিলেন যে, নবি যেন নিজে কুরবানি করে চুল কামিয়ে ফেলেন। আর কারও সাথে কোনও কথা না বলেন। নবিজি তা-ই করলেন। মুশরিকদের অন্তর্জালা বাড়িয়ে দেওয়ার জন্য আবূ জাহলের কাছ থেকে হস্তগত হওয়া একটি উটও যবাই করেন তিনি। উটটির নাকে একটি রুপার নথ পরানো ছিল।
সাহাবিরা এবার সক্রিয় হয়ে উঠলেন। নিজ নিজ পশু কুরবানি শেষে মাথা মুণ্ডন করে নিলেন। কিন্তু সদ্য সম্পাদিত চুক্তিটির ভার কারও মন থেকে নামছেই না। কারণ, আপাতদৃষ্টিতে কুরাইশরাই এ চুক্তি থেকে সব সুবিধা হাতিয়ে নিয়েছে। কিন্তু আল্লাহর রাসূল ﷺ -এর প্রতি সমীহবশত কেউ মুখ ফুটে কিছু বলছেন না। অবস্থা এমন হয়েছিল যেন একে অপরকে হত্যা করে ফেলবে। সে সময় তাঁরা একটি গরু বা একটি উট সাত জনের পক্ষ থেকে কুরবানি করেছিল।
এই অসন্তোষের মূল কারণ দুটি। এক. উমরার নিয়তে এসে মক্কায় প্রবেশ করা ছাড়াই ফিরে যেতে হচ্ছে। দুই. উভয় পক্ষের মধ্যে সমতা রক্ষা না হওয়া। বিশেষ করে আগতদের ফিরিয়ে দেওয়া-না দেওয়ার ব্যাপারে রয়েছে অসম শর্ত। আবূ জান্দালের দুর্দশা তো সবাই নিজ চোখেই দেখলেন।
প্রথম কারণটির ব্যাপারে নবি সবাইকে এই বলে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করলেন যে, পরের বছর ঠিকই উমরা পালন করতে পারবে সবাই। এটাই তাঁর সেই স্বপ্নের সঠিক বাস্তবায়ন।
দ্বিতীয় কারণটির ব্যাপারে বললেন যে, 'ইসলাম ত্যাগ করে আমাদের কেউ কুরাইশদের কাছে চলে গেলে, যেন আল্লাহ তাআলাই তাকে আমাদের থেকে দূর করে দিলেন। আর যারা কুরাইশদের থেকে পালিয়ে মদীনায় আসতে চাইবে, আল্লাহ তাআলা তাদের জন্যও কোনো-না-কোনো আশ্রয়স্থল তৈরি করে দেবেন।
এটা কোনও ফাঁকা সান্ত্বনাবাণী ছিল না। আবিসিনিয়াতে তখনো কিছু মুসলিম রয়ে গিয়েছিলেন। তারা সবাই উক্ত চুক্তির আওতামুক্ত। সুতরাং মক্কা থেকে পালিয়ে আসা কেউ চাইলেই সেখানে চলে যেতে পারে।
নবি এভাবে চুক্তির ইতিবাচক দিকগুলো তুলে ধরেন। তারপরও চুক্তিটিকে সার্বিকভাবে সবার কাছে কুরাইশদের জন্য সুবিধাজনক বলেই মনে হতে থাকে। উমর (রাদিয়াল্লাহু আনহু) তো জিজ্ঞেস করেই বসলেন, “ইয়া রাসূলাল্লাহ, আমরা সত্যের ওপর আর ওরা মিথ্যের ওপর, নয় কি?”
নবি জানালেন, “হ্যাঁ, অবশ্যই।”
“আমাদের নিহত সাথিরা জান্নাতি আর ওদের নিহতরা জাহান্নামি, তাই না?”
“হ্যাঁ, কেন নয়!”
“তাহলে আমরা কেন আমাদের দ্বীনের ক্ষেত্রে এই অপদস্থতা গ্রহণ করব? আর আমরা এই অবস্থাতেই ফিরে যাব অথচ এখনও আল্লাহ আমাদের ও তাদের মাঝে কোনও ফায়সালা করেননি।”
নবিজি জবাব দিলেন “ওহে খাত্তাবের ছেলে, নিশ্চয়ই আমি আল্লাহর রাসূল। আর আমি তাঁর অবাধ্য হতে পারি না। তিনিই আমার সাহায্যকারী এবং তিনি কখনোই আমাকে ধ্বংস করবেন না।”
এরপরও উমর (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর মন মানে না। তিনি আবূ বকর (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর কাছে গেলেন এবং একই প্রশ্ন উত্থাপন করলেন। তিনিও হুবহু একই উত্তর দিলেন। সেই সাথে আবূ বকর আরও যোগ করলেন, “মরণ অবধি রাসূলের হাত শক্ত করে ধরে রাখো। কেননা, আল্লাহর কসম! তিনি সত্যের ওপরই রয়েছেন।”
নবিজি ﷺ -এর মনোবল বাড়াতে ও মুসলিমদের সান্ত্বনা দিতে আল্লাহ তাআলা আয়াত নাযিল করলেন,
“নিশ্চয়ই আমি আপনাকে সুস্পষ্ট বিজয় দান করেছি।”
এই ওহি পাওয়ার পর উমরকে ডেকে পাঠান আল্লাহর রাসূল ﷺ। তাকে এই আয়াত তিলাওয়াত করে শোনান। শুনে উমর বলেন, “হে আল্লাহর রাসূল, এটাই কি সুস্পষ্ট বিজয়?"
নবি ﷺ বললেন, “হ্যাঁ।” এই দৃঢ় প্রত্যয়ন শুনে অবশেষে উমরের মন শান্ত হয়। কিন্তু এর আগে তিনি যে আল্লাহর রাসূল ﷺ-এর কথার পিঠে কথা বলে এসেছেন, সে কথা ভেবে পরে প্রচণ্ড অনুশোচনায় পুড়তে থাকেন তিনি। বেশি বেশি দান-সদাকা, নফল সিয়াম ও সালাত আদায় করে উমর (রাদিয়াল্লাহু আনহু) এ ব্যাপারে দীর্ঘদিন আল্লাহর কাছে ক্ষমাপ্রার্থনা করেন।
টিকাঃ
৩৮৮. বুখারি, ২৭৩১।
৩৮৯. মুসলিম, ১৭৮৪।
৩৯০. সূরা ফাতহ, ৪৮: ১।
৩৯১. বুখারি, ২৭৩১।
📄 মুহাজির নারীদের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত
হুদাইবিয়া চুক্তির কিছুদিন পরই কয়েকজন মুসলিম নারী এসে নবিজি ﷺ -এর কাছে আশ্রয় চান। মুশরিকরা যথারীতি তাদের ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি করতে থাকে। তাদের দাবি ফিরিয়ে দিয়ে নবি স্মরণ করিয়ে দেন যে, চুক্তিতে নারীদের ব্যাপারে কোনও কথাই উল্লেখ হয়নি। তারা চুক্তির বাইরে। আল্লাহ তাআলাও আদেশ নাযিল করেন,
“হে বিশ্বাসীরা, কোনও বিশ্বাসী নারী হিজরত করে এলে তাদের যাচাই করে দেখো। আল্লাহ তো তাদের ঈমানের ব্যাপারে ভালো করেই জানেন। যদি নিশ্চিত হও যে, তারা ঈমানদার, তাহলে তাদের কুফফারদের হাতে ফিরিয়ে দিয়ো না। কারণ, তারা এখন আর কাফিরদের বৈধ স্ত্রী নয়, কাফিররাও তাদের বৈধ স্বামী নয়। ওদের আগের স্বামীদের দেওয়া মোহর তাদের ফিরিয়ে দাও। আর তোমরা যদি মোহরের বিনিময়ে তাদের বিয়ে করে নাও, তাতেও দোষের কিছু নেই। অনুরূপভাবে, অবিশ্বাসী নারীদের সাথেও বিবাহবন্ধন ছিন্ন করে ফেলো। ফিরিয়ে দিতে বলো পূর্বপ্রদত্ত মোহর। তোমাদের সাথে বিবাহবন্ধনে থাকাকালীন তারা যা খরচ করেছে, সেটিও ফেরত চাইতে বলো তাদের। এটি আল্লাহর সিদ্ধান্ত। তিনিই তোমাদের মাঝে বিচার-ফায়সালা করে থাকেন। আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।”
এভাবে মুসলিম ও কাফিরদের মাঝে বিয়ে চিরতরে নিষিদ্ধ হয়ে যায়। এরপর থেকে হিজরত করে আসা মুসলিম নারীদের নবি ﷺ এই আয়াতের ভিত্তিতে যাচাই করতেন।
“হে নবি, মুমিন নারীরা যখন আপনার কাছে এসে আনুগত্যের শপথ করে যে, তারা আল্লাহ ছাড়া আর কারও উপাসনা করবে না, চুরি করবে না, ব্যভিচার করবে না, তাদের সন্তানদের হত্যা করবে না, জারজ সন্তানকে স্বামীর ঔরস থেকে আপন গর্ভজাত সন্তান বলে মিথ্যা দাবি করবে না এবং ভালো কাজে আপনার অবাধ্য হবে না, তখন তাদের শপথ গ্রহণ করে নিন এবং তাদের জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করুন। নিশ্চয়ই আল্লাহ সতত ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।”
এই আসমানি বিধানগুলো মেনে চলার কথা প্রদান করলেই নবি নারী মুহাজিরদের বাইআত কবুল করে নিতেন। পুরুষদের হাতে হাত রেখে বাইআত গ্রহণ করলেও নারীদের ক্ষেত্রে শুধু মৌখিক উচ্চারণ শোনা হয়। এই নারীদের আর মক্কায় কাফিরদের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হয় না। তা ছাড়া মুসলিম পুরুষরাও তাদের কাফির স্ত্রীদের তালাক দিয়ে দেন এবং মুসলিম নারীরাও কাফির স্বামীদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে আসেন।
টিকাঃ
৩৯২. সূরা মুমতাহিনা, ৬০ : ১০।
৩৯৩. সূরা মুমতাহিনা, ৬০: ১২।
৩৯৪. বুখারি, ২৭৩১, ২৭৩২।