📘 রাসূলে আরাবি ﷺ > 📄 উসমান ؓ-এর বার্তাবহন এবং বাইআতুর রিদওয়ান

📄 উসমান ؓ-এর বার্তাবহন এবং বাইআতুর রিদওয়ান


দূত আসে-যায়, মুসলিমদের উদ্দেশ্য সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করতে থাকে। কিন্তু কুরাইশরা কিছুতেই মানতে রাজি হয় না যে, নবি স্রেফ উমরার জন্যই মক্কায় ঢুকতে চাচ্ছেন। নবিজি ﷺ সিদ্ধান্ত নিলেন যে, এবার নিজের পক্ষ থেকে দূত পাঠাবেন তিনি। উসমান (রাদিয়াল্লাহু আনহু) মক্কায় যাবেন। কুরাইশদের নিশ্চিত করবেন মুসলিমদের উদ্দেশ্য সম্পর্কে। সেই সাথে ইসলামের দিকে আহ্বানও করবেন তাদের। আবার মক্কায় অবস্থানরত মুসলিমদেরও সুসংবাদ দেবেন যে, আল্লাহ তাআলা শীঘ্রই তাদের দ্বীনকে বিজয়ী করতে চলেছেন। অচিরেই তারা প্রকাশ্যে ও নির্ভয়ে ইসলাম পালন করতে পারবেন। তখন আর ঈমান গোপন করে রাখার কোনও প্রয়োজন পড়বে না।

আবান ইবনু সাঈদ উমাবির নিরাপত্তা প্রতিশ্রুতির অধীনে মক্কায় প্রবেশ করেন উসমান (রদিয়াল্লাহু আনহু)। কুরাইশদের কাছে পৌঁছে দেন আল্লাহর রাসূল ﷺ -এর বার্তা। কুরাইশরা তাকে কা'বা তওয়াফ করার অনুমতি দেয়। কিন্তু তিনি রাসূল ﷺ -কে বাদ দিয়ে একাকী তওয়াফ করতে অস্বীকৃতি জানান।

কুরাইশরা উসমান (রদিয়াল্লাহু আনহু)-কে একটু বেশি সময় ধরে রাখে। সম্ভবত তারা চাইছিল মুসলিমদের প্রতি সুনির্দিষ্ট কিছু প্রস্তাবনা তৈরি করে তারপর তাকে ফেরত পাঠাতে। কিন্তু দেরি দেখে মুসলিম শিবিরে গুজব ছড়িয়ে পড়ে যে, উসমানকে শহীদ করে দেওয়া হয়েছে। দূতহত্যা মানে খোলাখুলি যুদ্ধের ঘোষণা। নবি যুদ্ধের পোশাক পরিধান করলেন। তারপর একটি গাছের নিচে দাঁড়িয়ে সাহাবিদের কাছ থেকে শপথ নেন। নবিজির হাতে হাত রেখে সবাই প্রতিজ্ঞা করেন আমৃত্যু লড়ে যাওয়ার এবং যুদ্ধক্ষেত্র থেকে না পালানোর। নিজের এক হাতের ওপর আরেক হাত রেখে নবি বলেন, “এটা উસমানের পক্ষ থেকে শপথ।” ঠিক এমন সময় উসমান (রাদিয়াল্লাহু আনহু) ফিরে আসেন। মুমিনদের যুদ্ধে যেতে হয়নি বটে, কিন্তু ততক্ষণে নিজেদের নিষ্ঠার স্বাক্ষর ঠিকই দিয়ে দিয়েছেন। এই শপথের সন্তুষ্টি ঘোষণা দিয়ে আল্লাহ তাআলা বলেন,

“বৃক্ষতলে আপনার কাছে শপথ নেওয়া মুমিনদের প্রতি আল্লাহ সন্তুষ্ট।”

সেদিন থেকে এই শপথটি 'বাইআতুর রিদওয়ান' নামে পরিচিত হয়। যার অর্থ 'সন্তুষ্টির শপথ'। শপথগ্রহীতারা সকলে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করে নিয়েছেন বলেই এই নামকরণ।

টিকাঃ
৩৮৫. সূরা ফাতহ, ৪৮:১৮।

📘 রাসূলে আরাবি ﷺ > 📄 হুদাইবিয়ার সন্ধি

📄 হুদাইবিয়ার সন্ধি


শপথ গ্রহণের ঘটনাটি সম্পর্কে জানতে পারে কুরাইশরাও। তড়িঘড়ি করে তারা যেকোনও মূল্যে যুদ্ধ পরিহার করে শান্তি স্থাপনে সচেষ্ট হয়। এ উদ্দেশ্যে সুহাইল ইবনু আমরকে পাঠানো হয় পরবর্তী দূত হিসেবে। সুদীর্ঘ আলোচনার পর এই শর্তগুলোর ব্যাপারে সম্মত হয় উভয়পক্ষ:

প্রথমত, মুহাম্মাদ ও তাঁর অনুসারীরা সে বছর উমরা না করেই ফিরে যাবেন। পরের বছর উমরা করতে মক্কায় আসবেন। থাকতে পারবেন শুধু তিন দিন। তিনি ও তাঁর সঙ্গীদের কারও সাথে খাপবদ্ধ একটি তরবারি ছাড়া অন্য কোনও অস্ত্র থাকতে পারবে না।

দ্বিতীয়ত, দশ বছর মেয়াদে একটি শান্তিচুক্তি কার্যকর থাকবে। তৃতীয় কোনও পক্ষ যদি মুসলিমদের সাথে চুক্তি করতে চায়, করতে পারবে। কুরাইশদের সাথে করতে চাইলেও করতে পারবে।

তৃতীয়ত, মক্কা থেকে কেউ মদীনায় পালিয়ে গেলে তাকে মক্কায় ফিরিয়ে দিতে হবে। কিন্তু মুহাম্মাদ ﷺ -এর কোনও অনুসারী মক্কায় ফিরে এলে কুরাইশরা তাকে মদীনায় ফিরিয়ে দিতে বাধ্য থাকবে না।

চুক্তিনামাটি লেখার জন্য আলি (রদিয়াল্লাহু আনহু)-কে ডাকিয়ে আনেন রাসূলুল্লাহ ﷺ। বললেন, “লেখো, 'বিসমিল্লাহির রহমানির রহীম।"

বাগড়া দিয়ে বসল সুহাইল, “আমরা রহমানকে জানি না, চিনি না। আপনি 'বিসমিকাল্লাহুম্মা' লেখেন।” নবি তাতেই সম্মতি দিলেন।

এরপর লিখতে বলেন, 'এই কথার ওপর আল্লাহর রাসূল মুহাম্মাদ চুক্তি করেছেন...।”

আবারও সুহাইলের আপত্তি, “আপনাকে যদি আল্লাহর রাসূল বলে আমরা স্বীকারই করতাম, তাহলে তো আপনাকে বাইতুল্লাহয় যেতে বাধাও দিতাম না, আর আপনার সাথে যুদ্ধও করতাম না।”

নবি বললেন, “তোমরা আমাকে মিথ্যাবাদী সাব্যস্ত করলেও আমি আল্লাহর রাসূল।" তারপর আলিকে বললেন, আগে লেখা "আল্লাহর রাসূল মুহাম্মাদ" অংশটা মুছে দিয়ে “মুহাম্মাদ ইবনু আবদিল্লাহ” লিখতে।

আলি (রদিয়াল্লাহু আনহু) অনুযোগ করলেন, "আল্লাহর কসম! আমি কখনও এমনটি করতে পারি না।” পরে নবি বললেন উল্লেখিত অংশটা কোথায় আছে দেখিয়ে দিতে। আলি (রদিয়াল্লাহু আনহু) তা দেখিয়ে দিলে নবিজি নিজ হাতে সে অংশটুকু মুছে দেন।

তারপর চুক্তিনামার দুটি অনুলিপি লেখা হয়। একটি কুরাইশদের কাছে থাকবে, আরেকটি মুসলিমদের কাছে।

টিকাঃ
৩৮৬. বুখারি, ২৭৩১, ২৭৩২।

📘 রাসূলে আরাবি ﷺ > 📄 আবূ জান্দালের ঈমানজাগানিয়া ঘটনা

📄 আবূ জান্দালের ঈমানজাগানিয়া ঘটনা


চুক্তির আনুষ্ঠানিকতা তখনো চলমান। এমন সময় দৃশ্যপটে হাজির হলেন সুহাইল ইবনু আমরের পুত্র আবূ জান্দাল। শেকলে বেঁধে রাখা হয়েছে তাকে। কারণ, সে ইসলাম গ্রহণ করেছে। তার বাবা সুহাইলের এককথা—তাকে মক্কায় ফিরিয়ে দিতে হবে। নবিজি প্রতিবাদ করলেন, “চুক্তি তো এখনও চূড়ান্ত হয়নি!” সুহাইল বলে উঠল, “তাহলে আপনার সাথে কোনও চুক্তিই করব না।” নবি বললেন, “অন্তত আমার ওয়াস্তে ওকে ছেড়ে দিন!” “না, আপনার অনুরোধেও ছাড়া হবে না ওকে”, এই বলে সুহাইল নির্দয়ভাবে আবূ জান্দালকে মারধর করতে থাকে। আবু জান্দাল চিৎকার করে উঠলেন, “হে মুসলিমগণ, মুশরিকদের সাথে আমি কি আবার মক্কায় ফিরে যাব, যাতে তারা আমাকে আমার দ্বীনের কারণে জুলুম-নির্যাতন করতে পারে!”

নবি সান্ত্বনা দিয়ে বললেন, “আবূ জান্দাল, ধৈর্য ধরো, তোমার এই কষ্টের বিনিময়ে তুমি আল্লাহর কাছে বিরাট প্রতিদান পাবে। তুমিসহ যত নিপীড়িত মুসলিম আছে, সবার জন্য আল্লাহ তাআলা নিশ্চয়ই প্রশস্ততা ও মুক্তির পথ বের করে দেবেন।” উমর ইবনুল খাত্তাব (রদিয়াল্লাহু আনহু) এসব দেখে এতটাই ক্রুব্ধ হন যে, আবূ জান্দালকে বলেন তার বাবাকে খুন করে ফেলতে। তবে আবু জান্দাল নিজেকে সংযত রেখে চুক্তির শর্তগুলো মেনে নেন।

টিকাঃ
৩৮৭. বুখারি, ২৭৩১, ২৭৩২; ইবনু হিশাম, ৩/৩৩২।

📘 রাসূলে আরাবি ﷺ > 📄 সন্ধি নিয়ে অসন্তোষ

📄 সন্ধি নিয়ে অসন্তোষ


শান্তিচুক্তি সম্পাদন শেষে নবি সাহাবিদের বললেন, “উঠো, সবাই নিজ নিজ কুরবানি করে নাও।” কিন্তু কেউই উঠলেন না। পরপর তিন বার নবি একই আদেশ দিলেন। তারপরও কারও মাঝে কোনও নড়াচড়া নেই। দুঃখভারাক্রান্ত মনে উম্মু সালামা (রদিয়াল্লাহু আনহা)-এর কাছে গিয়ে পুরো অবস্থা বর্ণনা করলেন তিনি। উম্মু সালামা (রদিয়াল্লাহু আনহা) পরামর্শ দিলেন যে, নবি যেন নিজে কুরবানি করে চুল কামিয়ে ফেলেন। আর কারও সাথে কোনও কথা না বলেন। নবিজি তা-ই করলেন। মুশরিকদের অন্তর্জালা বাড়িয়ে দেওয়ার জন্য আবূ জাহলের কাছ থেকে হস্তগত হওয়া একটি উটও যবাই করেন তিনি। উটটির নাকে একটি রুপার নথ পরানো ছিল।

সাহাবিরা এবার সক্রিয় হয়ে উঠলেন। নিজ নিজ পশু কুরবানি শেষে মাথা মুণ্ডন করে নিলেন। কিন্তু সদ্য সম্পাদিত চুক্তিটির ভার কারও মন থেকে নামছেই না। কারণ, আপাতদৃষ্টিতে কুরাইশরাই এ চুক্তি থেকে সব সুবিধা হাতিয়ে নিয়েছে। কিন্তু আল্লাহর রাসূল ﷺ -এর প্রতি সমীহবশত কেউ মুখ ফুটে কিছু বলছেন না। অবস্থা এমন হয়েছিল যেন একে অপরকে হত্যা করে ফেলবে। সে সময় তাঁরা একটি গরু বা একটি উট সাত জনের পক্ষ থেকে কুরবানি করেছিল।

এই অসন্তোষের মূল কারণ দুটি। এক. উমরার নিয়তে এসে মক্কায় প্রবেশ করা ছাড়াই ফিরে যেতে হচ্ছে। দুই. উভয় পক্ষের মধ্যে সমতা রক্ষা না হওয়া। বিশেষ করে আগতদের ফিরিয়ে দেওয়া-না দেওয়ার ব্যাপারে রয়েছে অসম শর্ত। আবূ জান্দালের দুর্দশা তো সবাই নিজ চোখেই দেখলেন।

প্রথম কারণটির ব্যাপারে নবি সবাইকে এই বলে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করলেন যে, পরের বছর ঠিকই উমরা পালন করতে পারবে সবাই। এটাই তাঁর সেই স্বপ্নের সঠিক বাস্তবায়ন।

দ্বিতীয় কারণটির ব্যাপারে বললেন যে, 'ইসলাম ত্যাগ করে আমাদের কেউ কুরাইশদের কাছে চলে গেলে, যেন আল্লাহ তাআলাই তাকে আমাদের থেকে দূর করে দিলেন। আর যারা কুরাইশদের থেকে পালিয়ে মদীনায় আসতে চাইবে, আল্লাহ তাআলা তাদের জন্যও কোনো-না-কোনো আশ্রয়স্থল তৈরি করে দেবেন।

এটা কোনও ফাঁকা সান্ত্বনাবাণী ছিল না। আবিসিনিয়াতে তখনো কিছু মুসলিম রয়ে গিয়েছিলেন। তারা সবাই উক্ত চুক্তির আওতামুক্ত। সুতরাং মক্কা থেকে পালিয়ে আসা কেউ চাইলেই সেখানে চলে যেতে পারে।

নবি এভাবে চুক্তির ইতিবাচক দিকগুলো তুলে ধরেন। তারপরও চুক্তিটিকে সার্বিকভাবে সবার কাছে কুরাইশদের জন্য সুবিধাজনক বলেই মনে হতে থাকে। উমর (রাদিয়াল্লাহু আনহু) তো জিজ্ঞেস করেই বসলেন, “ইয়া রাসূলাল্লাহ, আমরা সত্যের ওপর আর ওরা মিথ্যের ওপর, নয় কি?”

নবি জানালেন, “হ্যাঁ, অবশ্যই।”

“আমাদের নিহত সাথিরা জান্নাতি আর ওদের নিহতরা জাহান্নামি, তাই না?”

“হ্যাঁ, কেন নয়!”

“তাহলে আমরা কেন আমাদের দ্বীনের ক্ষেত্রে এই অপদস্থতা গ্রহণ করব? আর আমরা এই অবস্থাতেই ফিরে যাব অথচ এখনও আল্লাহ আমাদের ও তাদের মাঝে কোনও ফায়সালা করেননি।”

নবিজি জবাব দিলেন “ওহে খাত্তাবের ছেলে, নিশ্চয়ই আমি আল্লাহর রাসূল। আর আমি তাঁর অবাধ্য হতে পারি না। তিনিই আমার সাহায্যকারী এবং তিনি কখনোই আমাকে ধ্বংস করবেন না।”

এরপরও উমর (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর মন মানে না। তিনি আবূ বকর (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর কাছে গেলেন এবং একই প্রশ্ন উত্থাপন করলেন। তিনিও হুবহু একই উত্তর দিলেন। সেই সাথে আবূ বকর আরও যোগ করলেন, “মরণ অবধি রাসূলের হাত শক্ত করে ধরে রাখো। কেননা, আল্লাহর কসম! তিনি সত্যের ওপরই রয়েছেন।”

নবিজি ﷺ -এর মনোবল বাড়াতে ও মুসলিমদের সান্ত্বনা দিতে আল্লাহ তাআলা আয়াত নাযিল করলেন,

“নিশ্চয়ই আমি আপনাকে সুস্পষ্ট বিজয় দান করেছি।”

এই ওহি পাওয়ার পর উমরকে ডেকে পাঠান আল্লাহর রাসূল ﷺ। তাকে এই আয়াত তিলাওয়াত করে শোনান। শুনে উমর বলেন, “হে আল্লাহর রাসূল, এটাই কি সুস্পষ্ট বিজয়?"

নবি ﷺ বললেন, “হ্যাঁ।” এই দৃঢ় প্রত্যয়ন শুনে অবশেষে উমরের মন শান্ত হয়। কিন্তু এর আগে তিনি যে আল্লাহর রাসূল ﷺ-এর কথার পিঠে কথা বলে এসেছেন, সে কথা ভেবে পরে প্রচণ্ড অনুশোচনায় পুড়তে থাকেন তিনি। বেশি বেশি দান-সদাকা, নফল সিয়াম ও সালাত আদায় করে উমর (রাদিয়াল্লাহু আনহু) এ ব্যাপারে দীর্ঘদিন আল্লাহর কাছে ক্ষমাপ্রার্থনা করেন।

টিকাঃ
৩৮৮. বুখারি, ২৭৩১।
৩৮৯. মুসলিম, ১৭৮৪।
৩৯০. সূরা ফাতহ, ৪৮: ১।
৩৯১. বুখারি, ২৭৩১।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00