📄 রাসূলুল্লাহ ﷺ ও কুরাইশদের মাঝে আলোচনা
নবি ﷺ -এর এই দৃঢ়প্রত্যয়ী বার্তা কুরাইশদের কাছে পৌঁছে দিলেন বুদাইল ইবনু ওয়ারাকা। কুরাইশরা তখন মিকরায ইবনু হাফসকে পাঠায় নবিজির আলাপ-আলোচনা করতে। তাকেও একই কথা জানানো হয়। তারপর এলেন কিনানা গোত্রের হুলাইস ইবনু ইকরিমা। হুলাইসকে আসতে দেখে নবি সাহাবিদের বললেন, “এই লোকটি সেই গোত্রের, যারা কুরবানির পশুকে অত্যন্ত সম্মান করে। সুতরাং তোমরা তোমাদের কুরবানীর পশুগুলোকে দাঁড় করিয়ে দাও।”
সাহাবিরা পশুগুলোকে দাঁড় করান, সেই সাথে "লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক" ধ্বনিতে মুখরিত করে তোলেন চারপাশ। দৃশ্যটি হুলাইসকে গভীরভাবে নাড়া দেয়। তিনি বলেন, "সুবহানাল্লাহ! এই লোকগুলোকে আল্লাহর ঘরে যেতে বাধা দেওয়া কিছুতেই সঠিক কাজ হতে পারে না। লাখম, জুযাম আর হামির গোত্র ঠিকই হাজ্জ করতে পারবে, আর আবদুল মুত্তালিবের ছেলেরা তা করতে আসলে বাধা পাবে! কা'বার রবের শপথ! কুরাইশরা ধ্বংস হয়ে যাবে, এসব ব্যক্তি কেবল উমরাহ্ই করতে এসেছে।"
মুসলিমদের পক্ষে হুলাইসের ওকালতি শুনে তেলেবেগুনে জ্বলে ওঠে কুরাইশরা, “আপনি চুপচাপ বসে থাকেন। আপনি হলেন গাঁও-গেরামের সহজ-সরল বেদুইন। ওদের চালবাজি সম্পর্কে আপনার কোনও ধারণাই নেই।”
তারপর তারা পাঠায় উরওয়া ইবনু মাসঊদ সাকাফিকে। বুদাইলকে যা বলা হয়েছিল, উরওয়াকেও রাসূল ﷺ একই কথা বলে দেন। উরওয়া একটু ভিন্ন পথে চেষ্টা করে দেখে। বলে, “মুহাম্মাদ, পূর্বে কি কখনও কোনও আরবের ব্যাপারে শুনেছেন যে, তারা তাদের নিজ গোত্রকে ধ্বংস করে দিয়েছে? কিন্তু ঘটনাপ্রবাহ যদি উল্টে যায়, যদি হেরে যান? আপনার চারপাশে তো দেখছি সব প্রতারকের দল বসে আছে। নিশ্চয়ই এরা বিপদের সময় আপনাকে ফেলে পালিয়ে যাবে।”
ক্ষুব্ধ আবূ বকর (রাদিয়াল্লাহু আনহু) পাশ থেকে গর্জে উঠলেন, “যা, তোর লাত দেবীর যোনি চুষ গিয়ে! আমরা বুঝি আমাদের নবিকে ছেড়ে যাব? তাঁকে ফেলে পলায়ন করব?"
উরওয়া মুখের ওপর কিছু বলতে পারল না। কারণ, এই আবূ বকর এককালে তার অনেক উপকার করেছিলেন। আরবদের রীতি অনুযায়ী ঘনিষ্ঠতা প্রকাশ করতে কথার ফাঁকে ফাঁকে উরওয়া রাসূল ﷺ-এর দাড়ি ধরতে চাইছিল। কিন্তু পাশ থেকে মুগীরা ইবনু শু'বা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) তলোয়ারের বাট দিয়ে তার হাতে আঘাত করে সরিয়ে দেন এবং বলেন, “তোমার নাপাক হাত দিয়ে আল্লাহর রাসূলের দাড়ি ধরবে না।”
এবার উরওয়া পাল্টা জবাব দিল, “ওরে নিমকহারাম! তোর গাদ্দারির কারণে আমাকে কত দৌড়াদৌড়ি করতে হচ্ছে, সে খবর আছে?”
মুগীরা ইবনু শু'বা হলেন উরওয়ার ভাতিজা। মুগীরা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) কয়েকজনকে হত্যা করে তাদের সম্পদ ছিনিয়ে নিয়ে এসে ইসলাম গ্রহণ করেন। নবিজি তার ইসলাম গ্রহণকে অনুমোদন দিলেও তার সম্পদ গ্রহণ করা থেকে বিরত থাকেন। মুগীরার মুরব্বি হিসেবে উরওয়া তার পক্ষে মোকদ্দমা লড়ছে। নিহতদের পরিবারের সাথে বিষয়টি সুরাহার চেষ্টা চালাচ্ছে। সে ওদিকে ইঙ্গিত করেই এই কথাটি বলে।
মূলত সুরাহার উদ্দেশ্যে এলেও নবিজি ﷺ -এর প্রতি সাহাবিদের ভালোবাসা, আনুগত্য ও শ্রদ্ধা দেখে উরওয়ার মনে প্রবল প্রতিক্রিয়া হয়। কুরাইশদের কাছে গিয়ে জানায়,
"হে আমার সম্প্রদায়, আমি বহু রাজরাজড়ার দরবার দেখেছি, কায়সার, কিসরা আর নাজাশির জাঁকজমক দেখেছি। কিন্তু আল্লাহর কসম করে বলছি, একটা রাজাকেও মুহাম্মাদের মতো সম্মান পেতে দেখিনি। কী আশ্চর্য! উনি থুতু ফেললেও সেটা নিজেদের হাতে-মুখে মাখতে অনুসারীদের মাঝে কাড়াকাড়ি লেগে যায়। ওজুর পানির ক্ষেত্রেও একই অবস্থা। তিনি কিছু চাইলে সবাই সেটা এনে দিতে প্রতিযোগিতা করে। কিছু বললে সবাই নীরব হয়ে শোনে। খুব বেশি মুহাব্বতের কারণে তাঁর দিকে কেউ পরিপূর্ণভাবে চোখ তুলে তাকায় না। আমি বলি কি, ওদের দেওয়া শর্তগুলো খুবই যৌক্তিক। আপনারা মেনে নিন।”
সমঝোতার চেষ্টা চলাকালীনও একটি সহিংসতার অপপ্রয়াস চালানো হয়। সত্তর-আশি জন মাথা-গরম কুরাইশ তরুণদের একটি দল এর জন্য দায়ী। এক গভীর রাতে তারা তানঈম পর্বত দিয়ে নেমে মুসলিম শিবিরে ঢুকে পড়ে। তবে কোনও ক্ষতি করতে পারার আগেই ধরা পড়ে যায়। নবি তাদের দুষ্কৃতি ক্ষমা করে সবাইকে মুক্তি দিয়ে দেন। আর কুরাইশরা এই নৈতিক পরাজয়ের পর শান্তিচুক্তির দিকে ঝোঁকে। এ প্রসঙ্গেই নাযিল হয় নিম্নোক্ত আয়াত:
“তিনি মক্কার ভেতরে তাদের হাতকে তোমাদের থেকে এবং তোমাদের হাতকে তাদের থেকে সংযত করেছেন, তাদের ওপর তোমাদের বিজয়ী করার করার পর। তোমরা যা কিছু করো আল্লাহ তা দেখেন।”
টিকাঃ
৩৮৩. বুখারি, ২৭৩১, ২৭৩২।
৩৮৪. সূরা ফাতহ, ৪৮ : ২৪।
📄 উসমান ؓ-এর বার্তাবহন এবং বাইআতুর রিদওয়ান
দূত আসে-যায়, মুসলিমদের উদ্দেশ্য সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করতে থাকে। কিন্তু কুরাইশরা কিছুতেই মানতে রাজি হয় না যে, নবি স্রেফ উমরার জন্যই মক্কায় ঢুকতে চাচ্ছেন। নবিজি ﷺ সিদ্ধান্ত নিলেন যে, এবার নিজের পক্ষ থেকে দূত পাঠাবেন তিনি। উসমান (রাদিয়াল্লাহু আনহু) মক্কায় যাবেন। কুরাইশদের নিশ্চিত করবেন মুসলিমদের উদ্দেশ্য সম্পর্কে। সেই সাথে ইসলামের দিকে আহ্বানও করবেন তাদের। আবার মক্কায় অবস্থানরত মুসলিমদেরও সুসংবাদ দেবেন যে, আল্লাহ তাআলা শীঘ্রই তাদের দ্বীনকে বিজয়ী করতে চলেছেন। অচিরেই তারা প্রকাশ্যে ও নির্ভয়ে ইসলাম পালন করতে পারবেন। তখন আর ঈমান গোপন করে রাখার কোনও প্রয়োজন পড়বে না।
আবান ইবনু সাঈদ উমাবির নিরাপত্তা প্রতিশ্রুতির অধীনে মক্কায় প্রবেশ করেন উসমান (রদিয়াল্লাহু আনহু)। কুরাইশদের কাছে পৌঁছে দেন আল্লাহর রাসূল ﷺ -এর বার্তা। কুরাইশরা তাকে কা'বা তওয়াফ করার অনুমতি দেয়। কিন্তু তিনি রাসূল ﷺ -কে বাদ দিয়ে একাকী তওয়াফ করতে অস্বীকৃতি জানান।
কুরাইশরা উসমান (রদিয়াল্লাহু আনহু)-কে একটু বেশি সময় ধরে রাখে। সম্ভবত তারা চাইছিল মুসলিমদের প্রতি সুনির্দিষ্ট কিছু প্রস্তাবনা তৈরি করে তারপর তাকে ফেরত পাঠাতে। কিন্তু দেরি দেখে মুসলিম শিবিরে গুজব ছড়িয়ে পড়ে যে, উসমানকে শহীদ করে দেওয়া হয়েছে। দূতহত্যা মানে খোলাখুলি যুদ্ধের ঘোষণা। নবি যুদ্ধের পোশাক পরিধান করলেন। তারপর একটি গাছের নিচে দাঁড়িয়ে সাহাবিদের কাছ থেকে শপথ নেন। নবিজির হাতে হাত রেখে সবাই প্রতিজ্ঞা করেন আমৃত্যু লড়ে যাওয়ার এবং যুদ্ধক্ষেত্র থেকে না পালানোর। নিজের এক হাতের ওপর আরেক হাত রেখে নবি বলেন, “এটা উસমানের পক্ষ থেকে শপথ।” ঠিক এমন সময় উসমান (রাদিয়াল্লাহু আনহু) ফিরে আসেন। মুমিনদের যুদ্ধে যেতে হয়নি বটে, কিন্তু ততক্ষণে নিজেদের নিষ্ঠার স্বাক্ষর ঠিকই দিয়ে দিয়েছেন। এই শপথের সন্তুষ্টি ঘোষণা দিয়ে আল্লাহ তাআলা বলেন,
“বৃক্ষতলে আপনার কাছে শপথ নেওয়া মুমিনদের প্রতি আল্লাহ সন্তুষ্ট।”
সেদিন থেকে এই শপথটি 'বাইআতুর রিদওয়ান' নামে পরিচিত হয়। যার অর্থ 'সন্তুষ্টির শপথ'। শপথগ্রহীতারা সকলে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করে নিয়েছেন বলেই এই নামকরণ।
টিকাঃ
৩৮৫. সূরা ফাতহ, ৪৮:১৮।
📄 হুদাইবিয়ার সন্ধি
শপথ গ্রহণের ঘটনাটি সম্পর্কে জানতে পারে কুরাইশরাও। তড়িঘড়ি করে তারা যেকোনও মূল্যে যুদ্ধ পরিহার করে শান্তি স্থাপনে সচেষ্ট হয়। এ উদ্দেশ্যে সুহাইল ইবনু আমরকে পাঠানো হয় পরবর্তী দূত হিসেবে। সুদীর্ঘ আলোচনার পর এই শর্তগুলোর ব্যাপারে সম্মত হয় উভয়পক্ষ:
প্রথমত, মুহাম্মাদ ও তাঁর অনুসারীরা সে বছর উমরা না করেই ফিরে যাবেন। পরের বছর উমরা করতে মক্কায় আসবেন। থাকতে পারবেন শুধু তিন দিন। তিনি ও তাঁর সঙ্গীদের কারও সাথে খাপবদ্ধ একটি তরবারি ছাড়া অন্য কোনও অস্ত্র থাকতে পারবে না।
দ্বিতীয়ত, দশ বছর মেয়াদে একটি শান্তিচুক্তি কার্যকর থাকবে। তৃতীয় কোনও পক্ষ যদি মুসলিমদের সাথে চুক্তি করতে চায়, করতে পারবে। কুরাইশদের সাথে করতে চাইলেও করতে পারবে।
তৃতীয়ত, মক্কা থেকে কেউ মদীনায় পালিয়ে গেলে তাকে মক্কায় ফিরিয়ে দিতে হবে। কিন্তু মুহাম্মাদ ﷺ -এর কোনও অনুসারী মক্কায় ফিরে এলে কুরাইশরা তাকে মদীনায় ফিরিয়ে দিতে বাধ্য থাকবে না।
চুক্তিনামাটি লেখার জন্য আলি (রদিয়াল্লাহু আনহু)-কে ডাকিয়ে আনেন রাসূলুল্লাহ ﷺ। বললেন, “লেখো, 'বিসমিল্লাহির রহমানির রহীম।"
বাগড়া দিয়ে বসল সুহাইল, “আমরা রহমানকে জানি না, চিনি না। আপনি 'বিসমিকাল্লাহুম্মা' লেখেন।” নবি তাতেই সম্মতি দিলেন।
এরপর লিখতে বলেন, 'এই কথার ওপর আল্লাহর রাসূল মুহাম্মাদ চুক্তি করেছেন...।”
আবারও সুহাইলের আপত্তি, “আপনাকে যদি আল্লাহর রাসূল বলে আমরা স্বীকারই করতাম, তাহলে তো আপনাকে বাইতুল্লাহয় যেতে বাধাও দিতাম না, আর আপনার সাথে যুদ্ধও করতাম না।”
নবি বললেন, “তোমরা আমাকে মিথ্যাবাদী সাব্যস্ত করলেও আমি আল্লাহর রাসূল।" তারপর আলিকে বললেন, আগে লেখা "আল্লাহর রাসূল মুহাম্মাদ" অংশটা মুছে দিয়ে “মুহাম্মাদ ইবনু আবদিল্লাহ” লিখতে।
আলি (রদিয়াল্লাহু আনহু) অনুযোগ করলেন, "আল্লাহর কসম! আমি কখনও এমনটি করতে পারি না।” পরে নবি বললেন উল্লেখিত অংশটা কোথায় আছে দেখিয়ে দিতে। আলি (রদিয়াল্লাহু আনহু) তা দেখিয়ে দিলে নবিজি নিজ হাতে সে অংশটুকু মুছে দেন।
তারপর চুক্তিনামার দুটি অনুলিপি লেখা হয়। একটি কুরাইশদের কাছে থাকবে, আরেকটি মুসলিমদের কাছে।
টিকাঃ
৩৮৬. বুখারি, ২৭৩১, ২৭৩২।
📄 আবূ জান্দালের ঈমানজাগানিয়া ঘটনা
চুক্তির আনুষ্ঠানিকতা তখনো চলমান। এমন সময় দৃশ্যপটে হাজির হলেন সুহাইল ইবনু আমরের পুত্র আবূ জান্দাল। শেকলে বেঁধে রাখা হয়েছে তাকে। কারণ, সে ইসলাম গ্রহণ করেছে। তার বাবা সুহাইলের এককথা—তাকে মক্কায় ফিরিয়ে দিতে হবে। নবিজি প্রতিবাদ করলেন, “চুক্তি তো এখনও চূড়ান্ত হয়নি!” সুহাইল বলে উঠল, “তাহলে আপনার সাথে কোনও চুক্তিই করব না।” নবি বললেন, “অন্তত আমার ওয়াস্তে ওকে ছেড়ে দিন!” “না, আপনার অনুরোধেও ছাড়া হবে না ওকে”, এই বলে সুহাইল নির্দয়ভাবে আবূ জান্দালকে মারধর করতে থাকে। আবু জান্দাল চিৎকার করে উঠলেন, “হে মুসলিমগণ, মুশরিকদের সাথে আমি কি আবার মক্কায় ফিরে যাব, যাতে তারা আমাকে আমার দ্বীনের কারণে জুলুম-নির্যাতন করতে পারে!”
নবি সান্ত্বনা দিয়ে বললেন, “আবূ জান্দাল, ধৈর্য ধরো, তোমার এই কষ্টের বিনিময়ে তুমি আল্লাহর কাছে বিরাট প্রতিদান পাবে। তুমিসহ যত নিপীড়িত মুসলিম আছে, সবার জন্য আল্লাহ তাআলা নিশ্চয়ই প্রশস্ততা ও মুক্তির পথ বের করে দেবেন।” উমর ইবনুল খাত্তাব (রদিয়াল্লাহু আনহু) এসব দেখে এতটাই ক্রুব্ধ হন যে, আবূ জান্দালকে বলেন তার বাবাকে খুন করে ফেলতে। তবে আবু জান্দাল নিজেকে সংযত রেখে চুক্তির শর্তগুলো মেনে নেন।
টিকাঃ
৩৮৭. বুখারি, ২৭৩১, ২৭৩২; ইবনু হিশাম, ৩/৩৩২।