📄 আনসার-মুহাজির দ্বন্দ্ব
মুরাইসী'তে অবস্থানকালে এক আনসারি ও এক মুহাজিরের মাঝে ঝগড়া ও মারামারি বেধে যায়। মুহাজির ব্যক্তিটি আনসার ব্যক্তিকে আঘাত করলে সে তার গোত্রকে “হে আনসার!” বলে উঁচু স্বরে আহ্বান করতে থাকে। ওদিকে অপর ব্যক্তিও “হে মুহাজিরীন!” বলে তার গোত্রকে আহ্বান করে ওঠেন। এতদিন ভাই হয়ে থাকা দুটো জাতির মাঝে স্রেফ জন্মভূমির পার্থক্যের ভিত্তিতে দাঙ্গা বেধে যাওয়ার উপক্রম হয়। মুসলিম ভ্রাতৃত্বের প্রতি হুমকিস্বরূপ জঘন্য এই জাতীয়তাবাদী হাঁক কানে আসামাত্রই রাসূলুল্লাহ বাধা দেন।
রাসূল বললেন, “আমি তোমাদের মাঝে থাকতেই তোমরা এসব জাহিলি যুগের হাঁকডাক শুরু করে দিলে! এগুলো ছেড়ে দাও। এসব দুর্গন্ধযুক্ত।”
সাহাবিরা নিজেদের ভুল বুঝতে পেরে আবারও ভ্রাতৃত্ব ও ঐক্যের পথে ফিরে আসেন। বেশ কয়েকজন মুনাফিকও সে অভিযানে উপস্থিত ছিল। সাথে ছিল তাদের পালের গোদা আবদুল্লাহ ইবনু উবাই। আনসার-মুহাজিরে ঝগড়া বাধতে দেখে তাদের তো পোয়াবারো। মদীনাবাসীদের উদ্দেশ্য করে আবদুল্লাহ ইবনু উবাই ভাষণ দিতে শুরু করে,
“এদের কত বড় সাহস! আমাদের মুখের ওপর কথা বলে? আমাদেরই দেশে এসে আমাদেরই চোখ রাঙাচ্ছে! কথায় আছে না, দুধ-কলা দিয়ে সাপ পুষলে ওই সাপের কামড়েই মরতে হয়। আল্লাহর কসম! এবার মদীনায় ফিরে সম্মানিত লোকেরা এসব লাঞ্ছিত লোকদের বের করে দেবে।”
সে 'সম্মানিত লোক' বলে নিজেকে আর 'লাঞ্ছিত লোক' বলে নবি-কে বুঝিয়েছে। নাউযুবিল্লাহ। সে তাদের আরও বলে,
“এই বিপদ তোমরা নিজেরাই টেনে এনেছ। তাদের নিজ শহরে আশ্রয় দিয়েছ এবং নিজের সম্পদের মালিক বানিয়েছ। শোনো! আল্লাহর কসম! তোমরা তাদের থেকে হাত গুটিয়ে নাও, তাহলে দেখবে তারা তোমাদের শহর ছেড়ে অন্য কোথাও চলে যেতে বাধ্য হবে।”
আবদুল্লাহ ইবনু উবাইয়ের এই বিষ উগরানো প্রত্যক্ষ করছিলেন তরুণ সাহাবি যাইদ ইবনু আরকাম (রদিয়াল্লাহু আনহু)। সাথে সাথে তিনি গিয়ে নবিজি ﷺ -কে বিষয়টি জানান। আবদুল্লাহ ইবনু উবাইকে ডাকিয়ে আনেন নবিজি। জিজ্ঞাসাবাদ করতেই সে রীতিমতো কসম করে তা অস্বীকার করে বসে। সে-যাত্রায় মিষ্টি কথা দিয়ে বেঁচে গেলেও সূরা মুনাফিকূন নাযিল করে আল্লাহ তাআলা নিজেই সবকিছু ফাঁস করে দেন। কিয়ামাত পর্যন্ত আবদুল্লাহ ইবনু উবাই এক ঘৃণিত নাম হয়ে থাকবে।
মজার ব্যাপার হলো, পিতার নামে নাম হওয়া ছেলে আবদুল্লাহ ইবনু আবদিল্লাহ ইবনি উবাই (রদিয়াল্লাহু আনহু) একজন সাচ্চা মুমিন। বাবার এই আচরণে প্রচণ্ড খেপে ওঠেন তিনি। পুরো বাহিনী মদীনায় পৌঁছার আগেই তিনি সেখানে গিয়ে বসে থাকেন। তার পিতা মুনাফিকদের সর্দার আবদুল্লাহ ইবনু উবাই আসামাত্র তার পথরোধ করে মুখের ওপর বলতে থাকেন,
“আল্লাহর কসম! নবিজি অনুমতি দেওয়ার আগ পর্যন্ত আপনাকে এক চুলও সামনে যেতে দেবো না। কারণ, নবিজিই হলেন ইজ্জতওয়ালা, সম্মানিত আর আপনি হলেন লাঞ্ছিত, অপমানিত।”
নবি আবদুল্লাহকে শান্ত করে বাবার পথ ছেড়ে দিতে অনুমতি দেন। গজগজ করতে করতে মদীনায় প্রবেশ করে আবদুল্লাহ ইবন উবাই আর ভাবতে থাকে কীভাবে মুসলিমদের শান্তি বিনাশ করা যায়। দু'জন মানুষের সামান্য ঝগড়ার জের ধরে পিতা-পুত্রে চিরশত্রুতা শুরু হয়। কিন্তু এ ঘটনা থেকে এও জানা যায় যে, তাকওয়া আর ঈমানের বন্ধনই আসল বন্ধন। আর আবদুল্লাহ ইবনু উবাইকে এই অনুমতি প্রদানের ফলে ফিতনাও তখনকার মতো দমে যায়।
টিকাঃ
৩৭১. বুখারি, ৩৫১৮।
৩৭২. বুখারি, ২৫৮৪; তিরমিযি, ৩৩১২।
৩৭৩. ইবনু হিশাম, ২/২৯০-২৯২।
📄 আয়িশা ؓ-এর প্রতি অপবাদ
মুরাইসী' থেকে মদীনা বেশ দীর্ঘ পথ। তখন একটি যাত্রাবিরতি চলছিল। নবি ﷺ -এর সিদ্ধান্তে রাতে আবারও সফর শুরু হয়। এ-রকম যাত্রাকালে আয়িশা (রদিয়াল্লাহু আনহা) সাধারণত একটি হাওদার ভেতরে ঢুকে বসেন। তারপর সেটাকে ধরাধরি করে উটের পিঠে তুলে দেয় কয়েকজন মানুষ।
কিন্তু এবারে একটু ভিন্ন ঘটনা ঘটল। আয়িশা (রদিয়াল্লাহু আনহা) হঠাৎ খেয়াল করলেন যে, তার গলার হারটা খুঁজে পাচ্ছেন না। সেটা খুঁজতে গিয়ে একটু দূরে সরে পড়েন তিনি।
এদিকে মুসলিমরা শিবির ভেঙে পুনরায় সফর আরম্ভ করছে। আয়িশা (রদিয়াল্লাহু আনহা)-এর হাওদার দায়িত্বে থাকা লোকেরাও যথারীতি সেটা উটের পিঠে তুলে দিল। হাওদা জিনিসটা অনেকটা পালকির মতো সবদিকে বন্ধ। তার ওপর আয়িশা (রদিয়াল্লাহু আনহা) খুবই হালকা-পাতলা গড়নের ছিলেন। খালি হাওদা তুলতে গিয়েও তাই কারও কোনও সন্দেহ হয়নি যে, ভেতরে তিনি নেই।
আয়িশা (রদিয়াল্লাহু আনহা) ফিরে এসে দেখেন, তাকে রেখেই সবাই চলে গেছে। তবে তিনি এতে ভয় পেয়ে যাননি। কিছুদূর গিয়ে টের পাওয়ার পর তাকে যে নিতে ফেরত আসবে, তা তো জানা কথা। তাই তিনি নিজ স্থানেই বসে থাকেন এবং একসময় চোখ ভার হয়ে এলে ঘুমিয়ে পড়েন।
আরও একজন সাহাবি সেনাদলের পেছনে ছিলেন, যাতে কাফেলার কোনও ফেলে যাওয়া জিনিস তিনি নিয়ে যেতে পারেন। সফওয়ান ইবনু মুআত্তাল সুলামি (রদিয়াল্লাহু আনহু)। যাত্রাবিরতির স্থানে সেনাবাহিনী কিছু ফেলে গেল কি না, সেটা দেখাশোনার দায়িত্ব তাকে দেওয়া হয়েছিল। সেনাদলের পায়ের ছাপ দেখে দেখে পরে আস্তেধীরে তিনি সবার সাথে গিয়ে যোগ দিতেন। হঠাৎ দূর থেকে তিনি সেখানে একজন ঘুমন্ত ব্যক্তিকে দেখতে পান। একটু অগ্রসর হলে চিনতে পারেন যে, ঘুমন্ত ব্যক্তিটি আয়িশা (রদিয়াল্লাহু আনহা)। কারণ, পর্দার বিধান নাযিল হওয়ার আগে তিনি তাকে দেখেছিলেন।
সফওয়ান (রদিয়াল্লাহু আনহু) তাকে দেখেই বলে উঠলেন, “ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন! এ তো আল্লাহর রাসূলের স্ত্রী।" এ ছাড়া আর কোনও কথা বলেননি। আয়িশা (রদিয়াল্লাহু আনহা) তাঁর এই আওয়াজ শুনে সাথে সাথে জেগে ওঠেন এবং উড়না দিয়ে মুখ ঢেকে ফেলেন। নবিজি ﷺ -এর স্ত্রীর প্রতি সমীহবশত নীরবেই তাঁর উটটি নিয়ে আসেন। আয়িশা (রদিয়াল্লাহু আনহা) তাতে উঠে বসলে তিনি সামনে থেকে উটের লাগাম ধরে হাঁটিয়ে নিয়ে চলেন। ওদিকে মুসলিম সেনাদল পরবর্তী যাত্রাবিরতির জন্য আরেক জায়গায় গিয়ে থেমেছে। দুপুর নাগাদ সফওয়ান ও আয়িশা (রদিয়াল্লাহু আনহুমা) তাদের সাথে গিয়ে মিলিত হন।
দু'জনকে একসাথে দেখে আবদুল্লাহ ইবনু উবাইয়ের মনে আবারও শয়তানি লাফিয়ে ওঠে। অবশেষে নবিজি ﷺ -এর হৃদয়কে ক্ষতবিক্ষত করার এবং তাঁর প্রিয়তমা স্ত্রীর চরিত্রে কালিমা লেপনের মোক্ষম সুযোগ মিলেছে। নিজের বন্ধুদের মধ্যে সে কানকথা ছড়িয়ে দেয় যে, ইচ্ছে করেই পেছনে রয়ে গিয়েছিল ওই দু'জন! এরপর সবক'টা মুনাফিক মিলে এর কান থেকে ওর কানে ছড়িয়ে দিতে লাগল অপবাদটি। মিথ্যে কথা বারবার বললে সেটাকেই একসময় সত্য বলে মনে হয়। তাই সরলমনা অনেক মুসলিমও এই অপপ্রচারে বিশ্বাস করে বসেন। গুজব, কানকথা, আর অপবাদে সরগরম হয়ে ওঠে গোটা মদীনা।
ওদিকে আয়িশা (রদিয়াল্লাহু আনহা) কিন্তু এ ব্যাপারে কিছু জানেনও না। মদীনার ফেরার পরপরই অসুস্থ হয়ে প্রায় এক মাস বিছানায় কাটাতে হয় তাঁর। বাইরের দুনিয়ায় কী হচ্ছে, জানার মতো অবস্থা বা সুযোগ কোনোটিই হয়নি। কিন্তু একটি বিষয় ঠিকই প্রকটভাবে চোখে লাগছে। তার সাথে রাসূলুল্লাহ ﷺ -এর আচরণ ইদানীং কেমন যেন অন্যরকম। আগে কত আদর দিয়ে কথা বলতেন, কাছে আসতেন। এখন শুধু শরীর-স্বাস্থ্যের খোঁজখবর নিয়েই চলে যান, পাশে এসে একটুও বসেন না। সালাম বিনিময় ছাড়া আর কোনও কথাও বলেন না।
ভিত্তিহীন একটা অভিযোগকে মুসলিম সমাজ কীভাবে বিশ্বাস করে আসছে, তা নিয়ে নবি ও নিজেও যথেষ্ট আহত। উম্মুল মুমিনীনদের কারও চরিত্র নিয়েই প্রশ্ন ওঠা অসম্ভব। কিন্তু আয়িশা (রদিয়াল্লাহু আনহা) যেহেতু অপবাদের শিকার হয়েই গেছেন, তাই নবিজিকেও ঘর ও সমাজের স্বার্থে আপাত নিরপেক্ষ আচরণ করতে হচ্ছে। আরও দুঃখের ব্যাপার হলো, পুরো সময়টায় তিনি একবারও ওহি লাভ করেননি। বিষয়টি নিয়ে বিশেষ বিশেষ সাহাবিদের সাথে পরামর্শ করেন তিনি। আলি (রদিয়াল্লাহু আনহু) ইঙ্গিতে তালাকের কথা বললেও উসামা (রদিয়াল্লাহু আনহু)-সহ বাকিরা বিপরীত মত দেন।
পরামর্শ শেষে রাসূল মিম্বরে উঠে আসেন। ঘোষণা করেন যে, নবিজির নিজের ঘরকে ক্ষতবিক্ষতকারীর সাথে বোঝাপড়া করা এখন সমাজেরই দায়িত্ব। নবিজি ﷺ -এর এ কথাকে হৃদয়ঙ্গম করেন আওস গোত্রপতি। গুজবের মূল হোতা আবদুল্লাহ ইবনু উবাইকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার ঘোষণা দেন তিনি। কিন্তু ওদিকে ইবনু উবাই আবার খাযরাজ গোত্রের সদস্য। খাযরাজ গোত্রপতি এ ঘোষণাকে নিজের পুরো গোত্রের বিরুদ্ধে আক্রমণ হিসেবে দেখেন। এর জের ধরে অনেক অনৈক্য ও প্রতিহিংসা ছড়িয়ে পড়ে। নবিজি অতি কষ্টে বিষয়টি মিটমাট করে দিয়ে তাদের আবার এক করে দেন।
ততদিনে আয়িশা (রদিয়াল্লাহু আনহা) কিছুটা সুস্থ হয়ে উঠেছেন। একদিন রাতের বেলা তিনি শৌচাগারে যাচ্ছিলেন। সাথে ছিলেন উম্মু মিসতাহ্ (রদিয়াল্লাহু আনহা)। অন্ধকারে নিজের কাপড়ের সাথে পা বেঁধে হোঁচট খান তিনি। এ-রকম পরিস্থিতিতে নিজের সন্তানের নাম ধরে অভিশাপ দিয়ে বসাটা আরবদের একটি স্বাভাবিক বাচনভঙ্গি। উম্মু মিসতাহও নিজের ছেলের ব্যাপারে এমনটিই বলে ওঠেন। কিন্তু প্রচলিত সব বাচনভঙ্গিই তো আর ইসলামের সাথে যায় না। তাই উম্মু মিসতাহর কথা শুনে তাকে ধমক দেন আয়িশা (রদিয়াল্লাহু আনহা)। উম্মু মিসতাহ্ বলেন যে, 'ঠিকই আছে। কারণ, তার ছেলেও অন্য সবার সাথে মিলে ওসব মিথ্যা কথা রটিয়ে বেড়াচ্ছে।'
“কোন মিথ্যা কথা?” আয়িশার কৌতূহলী জিজ্ঞাসা। উম্মু মিসতাহ্ একটানে পুরো ঘটনা বর্ণনা করেন আর নীরবে শুনে চলেন আয়িশা (রদিয়াল্লাহু আনহা)। তারপর চুপচাপ ঘরে গিয়ে তিনি বাপের বাড়ি যাওয়ার অনুমতি নেন নবি ﷺ -এর কাছ থেকে। বাড়িতে গিয়ে বাবা-মার কাছ থেকেও জানতে পারেন যে, তাকে আর সফওয়ান (রদিয়াল্লাহু আনহু)-কে ঘিরে সারা মদীনায় কানাকানি চলছে। তিন দিন ধরে নিদ্রাহীন একটানা কান্না করে চলেন আয়িশা (রদিয়াল্লাহু আনহা)। অসহায় দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকা আর কান্না করা ছাড়া তার বাবা-মারও কিছু করার ছিল না।
তৃতীয় দিনে নবি আয়িশা (রদিয়াল্লাহু আনহা)-কে দেখতে আসেন। আবেগ নিয়ন্ত্রণে রেখে নবি, সমাজপতি ও স্বামীসুলভ গম্ভীরতায় বলেন, “আয়িশা, তোমার ব্যাপারে তো এটা-ওটা শুনলাম। এখন তুমি যদি নির্দোষ হও, তাহলে আল্লাহ অবশ্যই সেটার সত্যায়ন করবেন। আর যদি গুনাহ করে থাকো তাহলে আল্লাহ তাআলার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করো এবং তাঁর দিকে ফিরে আসো। কেননা বান্দা যখন নিজ অপরাধ স্বীকার করে আল্লাহর নিকট তাওবা করে তখন তিনি তার তাওবা কবুল করে নেন।”
আয়িশা (রদিয়াল্লাহু আনহা) চুপচাপ শুনে যান। সে সময় তাঁর অশ্রু থেমে গিয়েছিল। তারপর বাবা-মাকে অনুরোধ করেন তার পক্ষ থেকে উত্তর দিতে। কিন্তু তাঁরা এর কী জবাব দেবেন ভেবে না পেয়ে দু'জনেই চুপ থাকেন। ফলে আয়িশা (রাদিয়াল্লাহু আনহা) নিজেই দৃঢ়কণ্ঠে বলেন,
"আল্লাহর শপথ! আমি জানি, এই কথা শুনতে শুনতে আপনাদের অন্তরে তা দৃঢ়ভাবে বসে গেছে এবং আপনারা তা সত্য মনে করছেন। সুতরাং এখন যদি বলি, আমি পবিত্র-আর আল্লাহ খুব ভালোভাবেই জানেন যে, আমি পবিত্র-তাহলে আপনারা তা সত্য বলে বিশ্বাস করবেন না। আর যদি আমি এই কথা স্বীকার করি-আর আল্লাহ খুব ভালোভাবেই জানেন যে, আমি পবিত্র-তাহলে আপনারা তা সঠিক বলে মেনে নেবেন। এই জন্য আমি কেবল সেই কথাই বলছি যেমন ইউসুফ (আলাইহিস সালাম)-এর পিতা বলেছিলেন,
'সুতরাং এখন ধৈর্য ধরাই শ্রেয়। তোমরা যা বলছ সে ব্যাপারে আমি কেবল আল্লাহর কাছেই সাহায্য চাই।'
এ কথা বলার পর তিনি পাশ ফিরে শুয়ে পড়েন। ঠিক সেই মুহূর্তে ওহি লাভ করতে শুরু করেন নবি । ওহি গ্রহণ শেষ হওয়ামাত্র নবিজি বলেন, "আয়িশা, আল্লাহ তোমাকে নির্দোষ বলেছেন।”
আয়িশা (রদিয়াল্লাহু আনহা)-কে তাঁর মা বলেন, “উঠে নবিজির দিকে ফিরে বসো (শোকরিয়া জানাও)।”
আয়িশা (রদিয়াল্লাহু আনহা) জবাব দেন “না। ফিরব না, আমি শুধু আল্লাহ তাআলারই প্রশংসা করব।”
এ ঘটনায় নাযিল হওয়া আয়াতগুলো হলো সূরা নূরের ১১ নং থেকে ২০ নং আয়াত পর্যন্ত। এখানে স্পষ্ট করে বলা হয় যে, সতী-সাধ্বী নারীর বিরুদ্ধে অপবাদ আরোপকারীরা পাপাচারী। যারা তা ছড়িয়েছে ও বিশ্বাস করেছে, তারাও অপরাধী, পাপাচারী।
অপবাদদাতাদের জন্য শাস্তির বিধানও বর্ণিত হয়েছে এই আয়াতগুলোতে। সেই সাথে নারীদের ইজ্জত রক্ষার্থে মুসলিম সমাজকে দেওয়া হয়েছে নির্দিষ্ট আচরণবিধি। সন্দেহ এড়িয়ে চলা, অপবাদে বিশ্বাস করতে ও তা ছড়াতে অস্বীকৃতি জানানোকে ঈমানের অঙ্গ বলে ঘোষণা করা হয়েছে।
“তোমাদের মধ্যকার একটি অংশই অপবাদটি উত্থাপন করেছিল। এতে তোমাদের জন্য মন্দ নয়; বরং ভালোই হয়েছে। প্রত্যেকেই পাবে নিজ নিজ অর্জিত পাপের ভাগ। আর প্রচণ্ড শাস্তি পাবে মূল হোতারা। বিশ্বাসীরা যখন গুজবটি শুনতে পেল, তখন কেন নিজেদের লোকদের ব্যাপারে সুধারণা পোষণ করল না? কেন বলল না 'এ এক নির্জলা অপবাদ'? অভিযোগ প্রমাণ করতে চার জন সাক্ষীই-বা আনল না কেন? সাক্ষ্য হাজির করতে না পারায় আল্লাহর কাছে তারাই মিথ্যেবাদী হিসেবে গণ্য হবে। যদি তোমাদের প্রতি দুনিয়া ও আখিরাতে আল্লাহর বিরাট অনুগ্রহ ও দয়া না থাকত, তাহলে ওসব কথার জন্য ভয়াবহ আযাব এসে ধরত তোমাদের। না জেনে তোমরা একে মুখে মুখে ছড়াচ্ছিলে। ভেবেছিলে যে, ওটা তেমন কিছুই না। অথচ আল্লাহর কাছে তা গুরুতর। মিথ্যে অপবাদটি শোনার পর তোমাদের বলা উচিত ছিল, 'আমরা এ নিয়ে কোনও কথাই বলব না। সুবহানাল্লাহ! এ তো বড় মারাত্মক অপবাদ!' যদি সত্যিই মুমিন হয়ে থাকো, তাহলে আর কক্ষনো এমন আচরণ করবে না। এটি আল্লাহর আদেশ। আর আল্লাহ তাঁর আদেশ স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিচ্ছেন। তিনি তো সর্বজ্ঞানী, মহা প্রজ্ঞাময়।”
নবিজি ﷺ -এর বুক থেকে যেন পাথর নেমে গেল। উৎফুল্লচিত্তে সাহাবিদের কাছে গিয়ে আয়াতগুলো তিলাওয়াত করে শোনালেন। ওহির নির্দেশনা অনুযায়ী দু'জন পুরুষ ও একজন নারী সাহাবির জন্য আশিটি করে বেত্রাঘাতের দণ্ড নির্ধারিত হয়। হাসসান ইবনু সাবিত, মিসতাহ ইবনু উসাসা এবং হামনা বিনতু জাহশ (রদিয়াল্লাহু আনহুম) এই দণ্ড ভোগ করে আখিরাতের শাস্তি থেকে রক্ষা পেয়ে যান। কিন্তু মিথ্যুক-নেতা আবদুল্লাহ ইবনু উবাই ও তার সাথি-সঙ্গীদের শাস্তির আওতার বাইরে রাখা হয়।
আইনের চোখ ফাঁকি দিতে পেরেছে ভেবে অনুশোচনা থেকেও বিরত থাকে তারা। কিন্তু কিয়ামাতের দিন তাদের আল্লাহর সামনে দাঁড়াতে হবে। যেদিন না কোনও সহায়-সম্পদ কাজে আসবে, আর না কোনও সন্তান-সন্ততি। সেদিন শুধু তারাই সফল হবে এবং মুক্তি পাবে, যারা 'কলবুন সালীম' সুস্থ ও শুভ্র অন্তর নিয়ে হাযির হবে।
টিকাঃ
৩৭৪. সূরা ইউসুফ, ১২: ১৮৷
৩৭৫. সূরা নূর, ২৪: ১১-১৮।
৩৭৬. বুখারি, ২৬৬১, ইবনু হিশাম, ২/২৯৭-৩০৭; যাদুল মাআদ, ২/১১৩-১১৫।